সমাপ্তির ওপাড়ে পর্ব ৩৭
জাবিন ফোরকান
সাল ২০০৫।
পহেলা বৈশাখের সকালবেলা। বাংলা নববর্ষের দিনটি আরেফিন পরিবারে বেশ উৎসবমুখরভাবেই উদযাপিত হয়। সকালে ইলিশ পান্তা, বিকালে মেলায় ঘুরতে যাওয়া, উত্তেজনা ঘিরে থাকে সারাটা দিন।
বেশ ভোরে ঘুম ভাঙতেই তাই প্রস্তুতি নিয়ে ফেলেছে জায়দান। জাফর কিছুদিন আগে বিজনেস ট্রিপে গিয়েছিলেন সিঙ্গাপুর, সেখান থেকে লাল সাদা বর্ণের একটা জ্যাকেট এনেছিলেন বড় ছেলের জন্য। গোসল সেরে সেটাই জায়দান শরীরে জড়িয়ে নিলো।
এবার ক্লাস সেভেনের শিক্ষার্থী সে। এর মধ্যেই ঘর বোঝাই হয়েছে ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং, কম্পিউটার মেকানিজম, হোয়াইট হ্যাক এক্সপার্ট, কোয়ান্টাম ফিজিক্স বিষয়ক মোটা মোটা বইসমূহে। শখের বশে অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে পিতাকে বলে বলে সুদূর ইউরোপ থেকে সংগ্রহ করা আইনস্টাইনের রিসার্চের ডিরেক্ট কপি অবধি আছে তার কাছে। সেটা বর্তমানে বিছানার উপর পরে আছে, রাতে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়তে ব্যাস্ত ছিল সে।
রিসার্চ কপিটা মহামূল্যবান অলংকারের মতন নিজের ক্লোজেটের সিন্দুকে ঢুকিয়ে রেখে জায়দান পরিপাটি হয়ে ঘর থেকে বেরোলো।
বাইরে পা রাখতেই অতি সাধের, অতি আগ্রহের ঘ্রাণটা নাকে গেলো। সরিষার তেলে তাজা ইলিশ মাছ ভাঁজার ঘ্রাণ। একদম বুক ভরিয়ে দেয় যেন। জেসমিনের হাতের ইলিশ মাছ ভাজা এবং সাত রকমের ভর্তা ছাড়া পহেলা বৈশাখে পান্তাভাত জমে না। আশাহীনতার মাঝেও আশা নিয়ে সিঁড়ি বেয়ে তরতর করে লাফিয়ে নামলো জায়দান।
দেখা মিললো কাঙ্ক্ষিত দৃশ্যটির। হলঘরের মেঝেতে পাটি বিছিয়ে বসেছেন জেসমিন। অঙ্গে জড়ানো লাল টুকটুকে শাড়ি। জননীকে নতুন বউয়ের মতন লাগছে, চোখের মাঝে প্রতিফলিত হওয়া দৃশ্যটার মুগ্ধতা জায়দানকে বিভোর করে তুললো।
পাত পেড়ে বসেছেন জেসমিন। মাটির পাত্রে পান্তাভাত, হরেক রকমের ভর্তা, আঁচার এবং ইলিশ ভাজা সাজিয়ে রাখা। ছোট ছেলে আয়দান মায়ের মতন লাল পাঞ্জাবী পরে বহু আয়েশ করে বসে আছে। সন্তানকে সযত্নে মাছ মাখিয়ে পান্তা ভাতের গ্রাস তুলে দিচ্ছেন জেসমিন।
জায়দানের বুকের ভেতর কেমন যেন করে উঠল। মুগ্ধতা এবং আশঙ্কার এক মিশ্রণ জাগ্রত হলো অন্তরে। ইতস্ততবোধ করলো সে। জানে, তার ওই দৃশ্যে সামিল না হওয়াই ভালো হবে। কিন্তু কাঙাল যে খুব করে নিজের আশা পূরণ করতে চায়!
ইতস্তত করেই এগোলো জায়দান। পাটির উপর নিজের ছোট ভাইয়ের পাশে আস্তে করে বসলো। তার উপস্থিতিতে জেসমিনের শান্ত, হাস্যোজ্জ্বল চেহারায় খানিক উচ্ছ্বাসের ভাটা পড়লো। তবে খুব একটা ভ্রুক্ষেপ না করে তিনি ভালোমত ইলিশের কাঁটা বেছে ভাত মেঝে আয়দানের গালে তুলে দিলেন। জায়দান চেয়ে দেখলো, অতঃপর না পারতে আবদার করে বসলো,
“ক্ষুধা লেগেছে। আমাকেও খাইয়ে দিবে আম্মু?”
জেসমিন জমে গেলেন। অতঃপর বরফশীতল দৃষ্টিতে দেখলেন জায়দানকে। কোনোকিছু উচ্চারণ না করে ঘুরে মাটির পাত্রে ভাত বাড়তে লাগলেন। মাছ এবং ভর্তা রেখে সেটা খানিকটা অবহেলা নিয়ে ঠেলে দিলেন বড় ছেলের দিকে। চেয়ে রইলো জায়দান একদৃষ্টে, অনুভূতিহীন।
“হাত থাকতে অন্যের কাছে আবদার করছো কেন?”
কথাটা বুকে এসে লাগলো বুঝি। ঠোঁটে ঠোঁট চেপে ফেললো জায়দান, অতঃপর মিনমিন করলো,
“আয়দানকে খাইয়ে দিচ্ছ তাই….”
“ও ইলিশ মাছের কাঁটা বেছে খেতে পারেনা, ছোট মানুষ। তুমি কি ছোট নাকি? বাচ্চাদের মতন আচরণ করবেনা আমার সামনে।”
জায়দান আর কিছু বললোনা। স্থির তাকিয়ে থাকলো জননীর অবহেলায় ঠেলে দেয়া ভাতের দিকে। দৃশ্যটা লক্ষ্য করলো আয়দান। কি যেন ভাবলো মনে মনে। জেসমিন তার মুখে গ্রাস তুলে দিতে উদ্যত হতেই সে মায়ের কব্জি ধরে বলে উঠলো,
“ভাইয়াকেও খাইয়ে দাও, মাম্মি। প্লীজ?”
থমকে গেলেন জেসমিন। ভাইয়ের এমন আবদার কানে যেতেই প্রসারিত নয়ন মেলে ঘুরে তাকালো জায়দান। না চাইতেও তার বাদামী চোখে জ্বলজ্বল করে উঠল আশার চমক। জেসমিনকে ছোট ছেলের আবদারে নাখোশ দেখালো।
“তোমাকে না বলেছি, সোনা, মাম্মির উপর কথা বলবে না?”
তার বকাটুকুও এত আদুরে শোনালো যে মন বুঝি বরফের মতন গলে যাবে। আয়দান সামান্য ঠোঁট ফোলাতেই হেসে উঠলেন জননী।
“আচ্ছা আচ্ছা। আমার প্রিন্সের আবদার কি আমি ফেলতে পারি? নাও, এটা খাও, ওকে দিচ্ছি আমি।”
হেসে ফেললো আয়দান। মহা আনন্দে ভাত খেয়ে নিলো। জেসমিন আরেক গ্রাস মাখাতে শুরু করলেন। অত্যন্ত উত্তেজনায় নড়েচড়ে বসলো জায়দান। ঘাড় টানটান করে মুখ বাড়িয়ে দেখলো মায়ের কাজ। ইলিশ মাছ ছাড়িয়ে কাঁটা বেছে নেয়া ছাড়াই ভাত মেখে ফেললেন জেসমিন! অদূর থেকেও স্পষ্ট দেখা গেলো তীক্ষ্ণ কাঁটাগুলো। যখন তিনি গ্রাসটুকু তুললেন, তখন কাঁটার তীক্ষ্ণ ফলাগুলো উঁচু হয়ে চিকচিক করছে, প্রস্তুত তারা গলায় ফোঁটার জন্য।
জায়দানের মুখের সামনে গ্রাসটুকু ধরলেন জেসমিন। খানিক ঝাঁঝালো কন্ঠে বললেন,
“হ্যাবলার মতন তাকিয়ে আছো কেন? খাও!”
একনজর নিজের জননীর মুখ, আরেকনজর তার হাতের ভাতের খাঁজে খাঁজে লোকানো কাঁটাভর্তি গ্রাসের দিকে তাকালো জায়দান। জেসমিন যেন তার দিকে এক নীরব চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছে। তিনি নিশ্চিত ছেলে এই গ্রাস মুখে তুলবেনা।
অথচ জায়দান কোনো প্রতিক্রিয়া করলোনা। কিছু বললো অবধি না। ঝুঁকে চুপচাপ মায়ের হাত থেকে গ্রাসটুকু খেয়ে নিলো। হতবাক হয়ে রইলেন জেসমিন, স্তব্ধ হয়ে চেয়ে রইলেন জায়দানের মুখপানে। নীরবে চিবিয়ে গেলো সে, সামান্য ব্যথার অভিব্যক্তি অবধি ফুটলনা পাথরের মতন শক্ত হয়ে যাওয়া চেহারায়।
জেসমিন এবার আরো এক গ্রাস মাখালেন। খেয়ে নিলো জায়দান। আবারো একবার। এবারেও বড় ছেলে তার নির্বিকার। আয়দান দৃশ্যটি দেখছেনা কারণ তার হাতে একটি ভিডিও গেইমসের ডিভাইস, সেটি নিয়েই ব্যস্ততা। জেসমিন এবার আর পারলেন না। মাছের ভেতর পিঠের বড় কাঁটার অংশ থাকে, যেটা মানুষ বিড়াল কুকুরকে খেতে দেয়, সেই কাঁটা ভেঙে গ্রাস মাখিয়ে ছেলের মুখের সামনে ধরলেন। ঠোঁটে ঝুললো তার স্নিগ্ধ হাসি।
জায়দান মায়ের দিকে অপলক চেয়ে রইল। তার শুষ্ক ঠোঁটে খুবই ক্ষীণ এক পরিহাসের উপাখ্যান প্রকাশ পেলো বুঝি। জেসমিনের নয়নজুড়ে বহু আশা নিয়ে চেয়ে জায়দান শুধালো,
“যদি আমি এই গ্রাস খেয়ে নেই, তবে কি তুমি আমাকে ভালোবাসবে আম্মু?”
জমে গেলেন জেসমিন। কোনো জবাব দিতে পারলেন না কিছুক্ষণ। পরমুহুর্তে গম্ভীর গলায় জানালেন,
“তুমি যতদিন চুপ থাকবে, আমি ততদিন তোমাকে ভালোবাসবো।”
শক্ত একটি ঢোক গলাধঃকরণ করলো জায়দান। চেয়ে রইলো জননীর দিকে, অমোঘ এক চাহুনি মেলে। ঝুঁকে এসে গ্রাসটুকু মুখে নিলো। নিঃশ্বাস আটকে চেয়ে রইলেন জেসমিন। জায়দান চিবিয়ে চিবিয়ে যখন ঢোক গিললো, তখন তার চোখের পাতা শক্তভাবে বুঁজে এলো। কেঁপে উঠলো শরীর সামান্য। ওইটুকুই। খানিক বাদে সে যখন দৃষ্টি মেললো, তখন তার বাদামী নয়ন কেমন যেন লালচে হয়ে উঠেছে।
“আই লাভ ইউ, আম্মু।”
বিড়বিড় করল জায়দান। পরক্ষণেই দ্রুত উঠে পড়লো। একবারও পিছন ফিরে আর তাকালোনা। সিঁড়ি বেয়ে দুই তলায় উঠতে উঠতে তার ভীষণ রকম কাশি আরম্ভ হলো। কোনমতে হাঁচড়ে পাঁচড়ে যখন সে নিজের রুমে পৌঁছালো তখন সমস্ত শরীর গুলিয়ে উঠছে তার। এক ছুটে বাথরুমে ঢুকে সিংকে ঝুঁকলো। কাশির জোরে বুঝি সমস্ত অস্তিত্ব ভেঙেচুরে যাচ্ছে।
দীর্ঘ কয়েক মিনিটের নরক যন্ত্রণার পর বমি করে ফেললো জায়দান। ভেতর থেকে উগড়ে এলো বুঝি সবকিছু। একদলা র*ক্ত বেরোলো, তার সঙ্গে গলায় বিদ্ধ হয়ে থাকা কাঁটাখানি। হাঁপাতে হাঁপাতে র*ক্তা*ক্ত ঠোঁটে নিষ্পলক চেয়ে রইলো জায়দান। ভয়ানক দৃশ্যটিও তার পাথুরে মুখে একফোঁটা অনুভূতির সঞ্চারণ করতে সক্ষম হলোনা।
সাল ২০০৯।
এস এস সি পরীক্ষার শেষ দিন আজ। শিক্ষার্থীদের চোখেমুখে বিরাট উচ্ছলতা। পরীক্ষার হলের গেটের সামনে অভিভাবক এবং নিউজ চ্যানেলের সাংবাদিকদের উপচে পড়া ভীড়। ছেলে মেয়েরা বেরিয়েই বন্ধু বান্ধবদের সঙ্গে বিরাট হেসে আনন্দ বিনিময় করছে, বাকিরা দৌঁড়ে দৌঁড়ে চলে যাচ্ছে অভিভাবকের বুকে। বাবা মায়েরা অত্যন্ত আবেগ নিয়ে ছেলেমেয়েদের আগলে নিচ্ছেন। আজ কোথায় সেলিব্রেট করতে যাওয়া হবে, কোন রেস্টুরেন্টে খাওয়া হবে, কোন পার্কে ঘোরা হবে সেসব নিয়ে চলছে বিস্তর পারিবারিক আলাপ।
সবকিছুর মাঝে সুদীর্ঘ একটি অস্তিত্ব হল থেকে বেরিয়ে এলো সবার শেষে। ইতোমধ্যে ছয় ফুটের কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছে জায়দানের উচ্চতা। রোবটের মতন ভাবভঙ্গি। একদম একলা সে। পরনে পরিপাটি ইউনিফর্ম, হাতে ক্লিপবোর্ডের ফাইল এবং গ্লুকোজ ওয়াটার। এত এত ভীড় এবং কলোরোল ছাপিয়ে সে নিঃশব্দে গেটের বাইরের দিকে এগোলো।
সবসময় বাইরে গাড়ি অপেক্ষা করে। তবে আজ নেই দেখেও জায়দান খুব একটা বিস্মিত হলোনা। হাতঘড়ি দেখলো। খুব সম্ভবত গাড়ি নষ্ট হয়ে গিয়েছে, নয়ত ড্রাইভার চাচাকে নিয়ে জেসমিন কোথাও বেড়িয়েছেন। ড্রাইভার চাচা অবশ্য ভালো মানুষ, ঠিকই পৌঁছে যাবেন কোনো না কোনো বাহানায় জায়দানকে তুলে নিতে। তাই সুস্থিরভাবে সড়কের ধারে অপেক্ষা করতে লাগলো সে। সবকিছু থেকে দূরে, একাকী।
ঘটনাটা অতর্কিতেই ঘটলো। ছেলেদের দল ছুটে আসছিল খুশিতে উন্মাদ হয়ে। তাড়া করছে তারা একে অপরকে ভীষণ এক মজার খেলায়। হঠাৎ করে পাশ ঘেঁষে বেরোতে গিয়ে ভুলবশত জায়দানকে ধাক্কা দিয়ে বসলো একজন। তীব্র বেগে ছুটে আসার দরুণ ধাক্কাটা এত জোরে লাগলো যে জায়দান ছিটকে গেলো। হুড়মুড় করে গিয়ে মুখ থুবড়ে পড়ল সড়কের ধারের ফুটপাথের উপর। পাশেই চলছিল কনস্ট্রাকশনের কাজ। গাদা গাদা ইট এনে সাজিয়ে রাখা হয়েছিল। সেই ইটের উপর পড়ল জায়দানের মাথাটা।
মুহূর্তে র*ক্তে ভেসে গেলো চারপাশ। জায়দান উঠে বসলো তৎক্ষণাৎ, এক হাতে রুমাল বের করে নিজের মাথা চেপে ধরলো। চুঁইয়ে চুঁইয়ে নেমে রক্তিম ধারা তার ধবধবে সাদা শার্টের কাঁধ রাঙিয়ে বুক অবধি নেমে গেলো। ছেলের দল মুহূর্তেই ছুটে এলো। আশেপাশে থাকা কয়েকজন অভিভাবক এবং মধ্যবয়স্ক লোকও দৌঁড়ে এলো। জায়দানকে ধরাধরি করে লাগোয়া একটি সিমেন্টের বেঞ্চে বসিয়ে দেয়া হলো। যে ছেলে তাকে ধাক্কা দিয়েছে বারবার সরি বলতে বলতে পানি দিলো খানিকটা।
“আহারে! কি বাজেভাবে ফেটেছে!”
“এইটা কোনো ইট রাখার জায়গা হইলো?”
“ঠিক বলেছেন! ছেলেমেয়েদের স্কুলের সামনে একটু সাবধান থাকবেনা? প্রশাসন করে কি?”
“ছেলেটাকে হাসপাতালে নেয়া জরুরী।”
আশেপাশের মানুষগুলোর উদ্বিগ্ন কথাবার্তা শুনে জায়দান বললো,
“আপনারা প্লীজ শান্ত হন, এত প্যানিক করবেন না।”
সকলে হতবাক হয়ে চেয়ে রইলো। বিদ্ধস্ত ছেলেটা, তখনো মাথার পাশ বেয়ে র*ক্ত গড়াচ্ছে, চেহারা এবং কাঁধ সম্পূর্ণ র*ক্তে রঞ্জিত। অথচ ছেলেটা কত নির্বিকার! যেন কিছুই হয়নি তার। পুরুষ মানুষ ঠিক আছে। তাই বলে এতটাও অনুভূতিহীন হওয়াটা রীতিমত অস্বাভাবিক নয় কি?
নিজেরাই উদ্যোগ নিলো আশেপাশের জনগণ।
“তোমার অভিভাবক কোথায়?”
নির্লিপ্ত উত্তর করতে লাগলো জায়দান।
“আসেনি। আমি একাই পরীক্ষা দিতে আসি।”
“কেউ দিয়ে নিয়েও যায়না?”
“গাড়ি আসে। আজ এখনো আসেনি। হয়ত আসতে দেরী হবে।”
“তোমার আব্বুর ফোন নাম্বার দাও।”
“আব্বু বাংলাদেশে নেই।”
“তাহলে আম্মুরটা দাও।”
“আম্মুকে ফোন দিয়ে লাভ নেই। আমাকে কষ্ট করে একটা রিকশা ঠিক করে দিন, আমি হাসপাতালে চলে যেতে পারব।”
মানুষগুলো এতটা অবাক জীবনে হয়নি। একে অপরের দিকে বিস্ময় নিয়ে তাকালো তারা। একজন জোর করেই বলল,
“তবুও। ফোন দেয়া দরকার। তুমি ছোট মানুষ। অভিভাবকের জানার অধিকার আছে।”
জায়দান শেষমেষ জেসমিনের ফোন নাম্বার দিলো। লোকটা দ্রুত কল করলো। ফোন রিসিভ হতেই সবটা জানালো যে তার ছেলের মাথা ফে*টে গিয়েছে। সবকিছু শুনে ওপাশ থেকে জেসমিন জবাব দিলেন,
“আমি আমার ছোট ছেলেকে আনতে যাচ্ছি। ওদের স্কুলে আজ পিকনিক। আমাকে না পেলে ও ভয় পাবে।”
লোকটা ভ্রু কুঁচকে জায়দানের দিকে তাকালো। অসম্ভব অবিশ্বাস নিয়ে বলে উঠলো,
“আর আপনার বড় ছেলে?”
“ও তো বড়ই। রিকশায় উঠিয়ে দিন, হাসপাতালে চলে যাবে।”
“কিন্তু…হ্যা…হ্যালো!”
ফোন কেটে গিয়েছে বুঝতে পেরে লোকটা আহাম্মক বনে জায়দানের দিকে চেয়ে রইলো। নির্লিপ্ত জায়দান ততক্ষণে নিজের শীতকালীন মাফলারটা শক্তভাবে মাথার চারপাশে পেঁচিয়ে নিয়েছে। আশেপাশে ভীড় জমে থাকলেও কারো সাহায্য সে নিলোনা। নিজে থেকেই উঠে দাঁড়ালো। অতঃপর সামনের অভিভাবকদের দিকে চেয়ে বললো,
“আজকে মানিব্যাগটা আনতে ভুলে গিয়েছি। আমাকে একশো টাকা আর নিজের ফোন নাম্বারটা কেউ দিন। আমি বাসায় পৌঁছে ফোনে টাকা পাঠিয়ে দেব। অগ্রিম ধন্যবাদ।”
সেদিন অবশ্য জায়দানের রিকশার প্রয়োজন পড়েনি। তার সেন্টার স্কুলের প্রধান শিক্ষকের গাড়ি তাকে হাসপাতালে নিয়ে যায়। সঙ্গে ছিল একজন শিক্ষক এবং দুজন ছেলে যাদের দলের হুড়োহুড়িতেই জায়দানের ধাক্কাটা লেগেছিল। তবে হাসপাতালে গিয়ে সবাই বুঝল, তাদের কোনো সাহায্যের দরকারই ছিলোনা। জায়দান একাই ডাক্তারের সাথে দেখা করলো, সবকিছু বললো। যখন মাথায় দুটো সেলাই পড়লো, তখনো একদম শান্ত হয়ে চুপচাপ বসে রইলো। সামান্যতম বেদনাও ফুটে ওঠেনি তার চেহারায়। নিজেই প্রেসক্রীপশন এবং ওষুধ সংগ্রহ করে সবকিছু বুঝে নিলো। বাকিরা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখলো শুধু।
ছেলেটা স্বয়ংসম্পূর্ণ? নাকি আদতে একা? বুঝে উঠতে পারেনি কেউ।
সাল ২০১৬।
আজ জায়দানের লন্ডনের ফ্লাইট। বুয়েট থেকে গ্র্যাজুয়েট হয়ে সে এম এস সির জন্য ভর্তি হয়েছে ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনে। বাংলাদেশে এটাই শেষ সময়। পি এইচ ডি সম্পন্ন করার আগ অবধি স্থায়ীভাবে কখনো দেশে ফেরা হবেনা।
আরেফিন বাড়িতে কোনো আড়ম্বর নেই। এই বাড়ির বড় ছেলে রীতিমত এক দশকের জন্য কোথাও চলে যাচ্ছে তা বোঝার কোনো উপায়ই নেই। জাফর নেই। তিনি কোম্পানিতে। তবে জায়দানের সঙ্গে তার কথা হয়েছে। সরাসরি এয়ারপোর্টে থাকবেন তিনি, ছেলেকে বিদায় জানাতে। আয়দানও বাড়িতে নেই। বয়সে কিশোর হলেও এর মধ্যেই বেশ উড়ুউড়ু স্বভাব। স্কুলের কোন এক মেয়ে বান্ধবীর বার্থডে পার্টি, সেটা নাকি আবার শেরাটন হোটেলে। সেখানেই চলে গিয়েছে বন্ধুদের সঙ্গে। কেউ তাকে জিজ্ঞেস করেও দেখেনি, সে যে ওই পার্টিতে যাচ্ছে সেটার নিশ্চয়তা কোথায়। স্বস্তির ব্যাপার হলো বিদায় নিয়েই গিয়েছে আয়দান। তার বিদায় ছিল এরকম,
“গুডবাই ব্রো! সি ইউ হোয়েন ইউ আর ওল্ড!”
জায়দান ভাইয়ের কথা ভাবতে ভাবতে প্রস্তুত হয়ে গেলো। লাগেজ এবং জিনিসপত্র সব তৈরী। ড্রাইভার চাচা এসে ইতোমধ্যে নিয়ে গিয়েছেন সেগুলো গাড়িতে তুলতে। জায়দান যখন নিজের ঘর থেকে বেরোলো তখন সমস্ত বাড়িজুড়ে পিনপতন নীরবতা।
সিঁড়ির গোড়ায় দাঁড়ানো কিশোরী রোজিনা। মেয়েটা সকালে স্কুলে যায়, রাতে নিজের মায়ের পাশাপাশি এই বাড়ির কাজে টুকটাক সাহায্য করে। এই নিয়ে অবশ্য জায়দান বেশ কয়েকবার কথা উঠিয়েছে। আগে আরো বেশি করতো, কিন্তু কিশোরী বয়সে ঘরের কাজকর্ম শিশুশ্রম বলে জায়দান আপত্তি তোলার পর মাত্রাটা কমে গিয়েছে। রোজিনার যদি ইচ্ছাই হয়, সে প্রাপ্তবয়ষ্ক হলে নাহয় কাজ করতে পারবে। রোজিনাকে দেখে জায়দান থামলো। মেয়েটার চোখ কেন ছলছল করছে সে বুঝতে পারলোনা।
“কাদঁছ কেন?”
রোজিনা হাতের উল্টোপিঠে চোখ মুছে নিয়ে বললো,
“ভাইজান, আপনি চইলা যাইতেসেন! ঘরটা একদম খালি হইয়া যাবে। আপনি আবার কবে আসবেন ভাইজান?”
জায়দান অবাক না হয়ে পারলোনা। তার অস্তিত্ব কেউ কামনা করে বিষয়টা প্রথম তার জন্য।
“আমার থাকা না থাকায় কি আসে যায়?”
“আসে যায় ভাইজান। আমাকে অংক পড়াইবো কে?”
“টিচার ঠিক করেই তো দিয়েছি।”
“টিচার তো টিচারই। টিচার তো আর ভাই হয়না!”
কিশোরীর দিকে চেয়ে জায়দান কিছুই বোধ করলোনা। তবুও করা উচিৎ বিধায় একটি হাত বাড়িয়ে রোজিনার মাথায় রেখে বলল,
“দশটা বছর চোখের পলকে কেটে যাবে। তুমি কিশোরী থেকে রমণী হবে। ভালোভাবে পড়াশোনা করো। আম্মু, আয়দান, আব্বু আর নিজের মায়েরও খেয়াল রেখো মেয়ে, কেমন?”
রোজিনা কান্নার কারণে আর কিছু উচ্চারণ করতে পারলনা। শুধু মাথা দোলালো। জায়দান নিজের হাতঘড়ির দিকে তাকিয়ে অতঃপর খানিক উদাসী হয়ে অন্দরমহলের প্রবেশপথ দেখলো। রোজিনা বুঝতে পেরে জানালো,
“ম্যাডামের নাকি মাথা ব্যথা। ঘরে শুইয়া আছে।”
জায়দান মাথা দুলিয়ে নিঃশব্দে এগোলো অন্দরমহলে। লম্বা পা ফেলে পৌঁছে গেলো জেসমিনের রুমের সামনে। দরজাটা হাল্কা চাপানো। ভেতরটা অন্ধকারাচ্ছন্ন। ঢুকতেই বিছানায় কম্বলে মোড়া জেসমিনকে নজরে এলো জায়দানের। চোখজোড়া বন্ধ। পরম শান্তিতে ঘুমিয়ে জননী।
নিগূঢ় নৈঃশব্দ্য হয়ে পায়ে পায়ে পৌঁছালো জায়দান নিকটে। আস্তে করে বসলো বিছানার পাশে। জেসমিনের ঘুম ভাঙলো না। ঐভাবে অনেকটা সময় বসে থাকার পর অতি সাবধানে কম্বল সরিয়ে জেসমিনের একটি পা উন্মুক্ত করল সে। নিজের হাতে যত্ন নিয়ে ছুঁয়ে দিলো ত্বক। অতি মুগ্ধতায় তুলতুলে নরম পায়ের পাতায় চেয়ে ঝুঁকে নিজের ঠোঁটে ছোট্ট এক সম্মানের চুমু এঁকে দিলো সে, জন্মদাত্রীর পদতলে। বিড়বিড় করলো,
“মায়ের পায়ের নিচে সন্তানের বেহেশত। এই বেহেশত একদিন আমার হোক।”
জেসমিন ঘুমের ঘোরে শুনলেন কি শুনলেন না জায়দান জানেনা। পা ঢেকে সে উঠে দাঁড়ালো। জননীর ঘুমন্ত মুখশ্রী পর্যবেক্ষণ করলো প্রাণভরে। আগে যে টান, যে অসীম মুগ্ধতা এবং উষ্ণতা সে অনুভব করতো, সেটা আর এলোনা। ভেতরটা শুধুই ফাঁপা। অনুভূতি বলে কিছু নেই। তবুও ব্যাকুল এক আকাঙ্ক্ষা যেন। কাঁপা কাঁপা আঙুলে মায়ের কপালে ছড়িয়ে থাকা চুলগুলো ছুঁয়ে জায়দান প্রানভরে বুঝি অন্তিমবারের মতন দেখলো তাকে। কেমন যেন নিষ্পাপ, শিশুসুলভ এক সত্তা। একটি ঢোক গিললো সে। অতঃপর ফিসফিস করলো,
“আমি চুপ থেকেছি, আম্মু। এতদিনে আমায় একটুখানি ভালোবাসতে পেরেছ কি?”
জায়দান জবাব পেলনা। সেই আশাও করলোনা। উঠে পড়লো। মায়ের মুখটা অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে নিয়ে সে উল্টো ঘুরল। যেমন নিঃশব্দে এসেছিল, তেমন নিঃশব্দেই বেরিয়ে গেলো ঘর থেকে।
বর্তমান।
সাবিন ঘুমিয়ে পড়েছে কিছুক্ষণ আগেই। ধরিত্রীতে রাত নেমে এসেছে। জায়দান নীরবে একটি আরামকেদারায় বসে এতক্ষণ যাবৎ একটি বই পড়ছিল। সেটি বন্ধ করে দিয়ে উঠে এলো সে এবার। কেমন যেন অতিরিক্ত ক্লান্ত লাগছে। চোখ থেকে চশমা খুলে টেবিলে রাখলো। অতঃপর বিছানার কাছে সরে এলো।
পরম শান্তিতে ঘুমিয়ে তার ভালোবাসার মানুষটা। এমন এক ভালোবাসা, যে ভালোবাসাকে আগলে রাখতে পারেনি জায়দান। মায়ের ভালোবাসার কাঙাল হয়ে সে বিসর্জন দিয়েছিল স্ত্রীর ভালোবাসা। কিন্তু দিনশেষে সে পেয়েছে শুধুই শূন্যতা। আগেও একলা ছিল, আজও তাই আছে।
সাবিনের উপর ঝুঁকে এলো সে। অত্যন্ত দরদ নিয়ে সে দেখলো মুখটাকে। কাটা ছেঁড়া হয়েছে এদিক সেদিক। বুকে বিঁধলো তা তীরের মতন। সহ্য করতে পারলোনা আর অন্তর। নুয়ে একে একে সে সাবিনের মুখজুড়ে ছড়িয়ে থাকা প্রতিটি অস্থায়ী দাগে নিজের ঠোঁটের আদর বুলিয়ে দিলো। যেন এই দাগগুলোই সাবিনের করা প্রতিটি ভুল। যা অতি যত্ন নিয়ে নিজের স্নেহে একটু একটু করে মিটিয়ে ফেলছে জায়দান।
বেশ অনেকটা সময় পর থামলো সে। ওষুধের প্রভাবে গভীর নিদ্রায় আচ্ছন্ন সাবিন। বাদামী নয়নজোড়া কিসের তাড়নায় যেন সামান্য কেঁপে উঠল।
“তোমার মতন করে কেউ কোনোদিন আমায় আগলে রাখেনি, মাই ওয়াইফ।”
ফিসফিস করলো জায়দান, সন্নিকটে এসে সাবিনের কপালে গাঢ় চুম্বন ছুঁয়ে অস্ফুট স্বরে বলল,
“তুমি আমার ভেতর লোভ জাগ্রত করেছ। আমি যে বুঝে গেছি লোভের কি স্বাদ! এই অপরাধের শাস্তিস্বরূপ আমার সারাটা জীবন তোমার হয়ে যাক। মায়ের পায়ের নিচের বেহেশতের আশা আর করিনা, আমার এখন তোমার ভালোবাসার বেহেশত চাই। আমাকে করুণা করে হলেও একটুখানি আদর দেবে তুমি, তাইনা? আমি জানি তুমি দেবে, মাই প্রিটি লিটল ক্রেজি ওয়াইফ।”
সাবিন শুনলোনা। ঘুমিয়ে পড়লে ভূমিকম্প ছাড়া তাকে জাগানোর উপায় নেই জানা আছে জায়দানের। আর সময়ক্ষেপণ করলোনা সে। ধীরে ধীরে নিজের পরনের শার্ট খুলে নিলো। ভেতরে হাতছাড়া সাদা ট্যাঙ্ক টপ আছে। ওটা পরেই সে বিছানায় উঠে এলো। যদিও কেবিনে কাউচের ব্যবস্থা আছে, চাইলেই সেখানে ঘুমিয়ে থাকা যায়, তবুও জায়দান বিছানাটাই পছন্দ করলো। আস্তে করে একপাশে শুয়ে ধীরে ধীরে কম্বলের ভেতর ঢুকে সাবিনকে বাহুডোরে আগলে নিলো সে। সাবিন ঘুমের ঘোরে গুঙিয়ে উঠে বিড়ালছানার মতন তার প্রশস্ত বুকে মুখ গুঁজে ফেলল।
যখন জায়দান চোখ বুঁজলো, তখন টের পেলো বহুদিন বাদে তার বুকটা কেমন ভরা ভরা লাগছে। অন্তরে একটি প্রার্থনা বাক্য প্রতিধ্বনিত হলো তার,
“আল্লাহ্, তুমি আমার সব নিয়ে নাও, এইটুকুমাত্র আবেগটাকে আমার জন্য ছেড়ে দাও।”
সাবিনের সাথে আজ জায়দান থাকছে বিধায় বাসায় চলে এসেছে মীরা। ইতোমধ্যে নিজের জিনিসপত্র নিয়ে আসতে শুরু করেছে সে আগের বাসায়। আবারো ভরে উঠেছে একটা সময় ফাঁকা ফেলে যাওয়া মীরার রুমটি। সাবিন ফিরে যখন দেখবে, তখন তার চাইতে খুশি দুটো মানুষ হবেনা মীরা খুব ভালো মতোই জানে। সকল কাজ শেষ করে উঠতে উঠতে অনেক রাত হয়ে গেলো। কোনমতে ঘুমানোর আগে দুটো ভাত যখন সে মুখে দিচ্ছিল, তখনি কলিং বেলের আওয়াজ। মীরা জানে, এত রাতে কারো আসার কথা না।
সমাপ্তির ওপাড়ে পর্ব ৩৬
অতিরিক্ত সতর্ক সে আজকাল। দরজায় পিপহোল নেই বিধায় হাত ধুয়ে পেপার স্প্রে নিলো। অপর হাতে একটা ধারালো ছু*রি নিজের পিছনে লুকিয়ে হেঁটে গেলো। বড় করে দম নিয়ে অবশেষে সে সাহস করে দরজা খুলেই দিলো।
ওপাশের মানুষটা মীরাকে ভূত দেখার চাইতেও অধিক চমকিত করলো। দাঁতে দাঁত চেপে গেলো।
“মে আই কাম ইন….মীরা?”
দরজার ওপাশে দাঁড়ানো আয়দান আরেফিন এতটা মৃদু আঁচে উচ্চারণ করলো যে মীরা তার কন্ঠস্বরটুকু শুনতেই পেলনা।
