সমাপ্তির ওপাড়ে পর্ব ৩৯
জাবিন ফোরকান
ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নেমেছে। গাড়ির কাঁচে ছিটকে পড়ছে বৃষ্টিফোঁটা। বেশ মোহনীয় এক সঙ্গীতের সৃষ্টি করেছে তা। সাঁই সাঁই করে ক্ষণে ক্ষণে সড়ক বেয়ে ছুটে যাচ্ছে যানবাহন। সবকিছু থেকে আড়ালে, সড়কের একদম একপাশে থেমে থাকা গাড়ির ভেতর থেকে বৃষ্টিভেজা দৃশ্যগুলো দেখাচ্ছে স্বপ্নের ন্যায়।
ভীষণ উষ্ণতায় ছেয়ে আছে আমার সমস্ত অস্তিত্ব। শরীর লেপ্টে আছে পুরুষালী এক সুগঠিত শরীরের সঙ্গে। দুজনই বৃষ্টিতে খানিকটা ভিজে গিয়েছি। খোলা রাস্তায় বাইকের কাছে দাঁড়ানো অসম্ভব ছিল। কখন যে গাড়ি অবধি চলে এলাম, ঘোরের মধ্যে টের পাইনি। ঠোঁটজুড়ে শুধুই ভালোবাসার মানুষটার ঠোঁটের স্বাদ, সমস্ত শরীরজুড়ে তার হাতের বেহায়া স্পর্শ আমায় পাগল করে দিচ্ছে যেন। নিষিদ্ধ বস্তুর প্রতি মানুষের আকর্ষণ তীব্র। আমি না পারছি তাকে দূরে ঠেলতে, না পারছি নিজেকে থামাতে।
গাড়ির ব্যাকসিটে শুয়ে আছি আমি। আমার উপর ঝুঁকে রয়েছে জায়দান। গাড়ির ভেতরটা বেশ চাপা। লম্বা হওয়ার দরুণ এই স্থানটুকু জায়দানের জন্য ভীষণ সংকীর্ণ। সামান্য একটু নড়লেও বুঝি গাড়িসমেত গোটা জগৎ কেঁপে উঠছে। অথচ তার কোনো পরোয়া নেই। সে মজে আছে আমাতে। আমার পরনের পোশাকের উপর দিয়ে কোমরে চেপে গিয়েছে তার হাত। ঠোঁটজোড়া ব্যাস্ত আমার ভেতর থেকে সবটুকু মায়া নিংড়ে নিতে। নিঃশ্বাস প্রশ্বাস নেয়ার সুযোগটুকু অবধি দিচ্ছেনা সে আমায়। যেন একটুখানি বিরতি দিলেই মুহূর্তটি শেষ হয়ে যাবে।
না পারতে নিচের ঠোঁটে কামড় বসাতেই সামান্য গুঙিয়ে উঠে জায়দান আমার ঠোঁট ছেড়ে দিলেও তৎক্ষণাৎ মুখ ডোবালো আমার গলায়। তার তপ্ত কোমল ঠোঁট আমার ত্বকজুড়ে উত্তপ্ত ছাপ ফেলে গেলো। কেঁপে উঠলাম, খামচে ধরলাম জায়দানের পিঠ।
“জা…জায়দান…?”
“কল মি হানি।”
ফিসফিস করে আমার বুকের উপরের বিউটিবোনের উপর মোক্ষম এক কামড় বসিয়ে দিলো বান্দা। চাপা চিৎকার দিয়ে উঠলাম। উজ্জ্বল ত্বক লালচে হয়ে উঠল কামড়ের দাগে। আধখোলা নয়ন মেলে দেখলাম সেই দৃশ্য। নিজের ত্বকে ফুটে উঠতে থাকা ভালোবাসার গাঢ় চিহ্ন। কাঁপুনি খেলে গেলো শরীর ছাপিয়ে অন্তর অবধি।
“স…স্টপ…প্লীজ!”
জায়দান আমার হুডি কখন খুলেছে নিজেও জানিনা। এবার সে জামাটা খুলতে সবেমাত্র হাত বাড়িয়ে নামিয়ে নিচ্ছিল কাঁধ থেকে। অথচ আমার মুখ থেকে ওই কথাটুকু বেরোনোর সঙ্গে সঙ্গে সে থেমে গেলো। নিজের স্পর্শ হটিয়ে নিয়ে হাঁটুর উপর ভর দিয়ে বসলো। ভীষণ হাঁপাচ্ছে সে। খানিকটা এলোমেলো হয়ে পড়া জ্যাকেট এবং শার্টের আড়ালে ত্বকজুড়ে ঘামের ফোঁটা চিকচিক করছে তার। মুখটা লালচে হয়ে আছে। কিসের তাড়নায় তা বুঝতেই আমি লজ্জায় সংকুচিত হয়ে গেলাম। অজান্তেই দুহাত বুকের উপর চেপে উঠে বসে পড়লাম গাড়ির সিটে। আমার অবস্থা খেয়াল করে জায়দান জবরদস্তি করলোনা। নিজেকে সামলে খানিকটা দূরে সরে বসলো আমাকে স্থান দিতে।
অদ্ভুতুড়ে এক নীরবতা নেমে এলো আমাদের মাঝে। শুধু ঝমঝম বর্ষণধ্বনি। অস্বস্তিকর এক অনুভূতি। গাড়ির ভেতর এখন এতটাই গরম লাগছে যে কিছুক্ষণ বাদেই হাত বাড়িয়ে এসিটা অন করতে বাধ্য হলো জায়দান। নীরবে দেখলাম আমি সবকিছু। দীর্ঘ সময় বাদে অস্ফুট স্বরে মুখ খুললাম,
“এসব ঠিক হচ্ছেনা।”
জায়দান নিশ্চুপ। আমি নিজে থেকেই যুক্ত করলাম,
“আম…আমাদের এভাবে…কাছাকাছি আসাটা ঠিক হচ্ছেনা।”
নিরুত্তর বান্দা। নিজের ভেতর থেকে কেমন যেন রাগ বেরিয়ে এলো। লজ্জায় নত হয়ে যাওয়া মুখে মিনমিন করলাম,
“তুমি অন্য কারো বাগদত্ত।”
জায়দান বোধ হয় জাদু জানে। ইতোমধ্যেই সে নিজের স্বাভাবিক রূপে ফিরে এসেছে। মাথা কাত করে অত্যন্ত প্রশান্ত দৃষ্টিতে সে আমায় দেখলো। খানিকটা সময় নিলো। তারপর জানালো,
“আমি আরওয়াকে বিয়ে করছিনা, সাবিন।”
বিদ্যুৎ চমকায়নি, অথচ আমি ঠিকই চমকে উঠলাম। ঝট করে মাথা ঘুরিয়ে প্রসারিত দৃষ্টিতে দেখলাম প্রিয়তমকে।
“কেন?”
আমার অবুঝ প্রশ্নে জায়দান বুঝি হাসলো। কে জানে! এই লোকটাকে তো কোনোদিন হাসতে দেখিনি ঠিকমতো, সুখে হাসলে তাকে কেমন লাগে তাও বলতে পারছিনা। শুধু তার পরিহাসের হাসি চিনি আমি। আমার দিকে নিজের একটি হাত বাড়িয়ে গাল ছুঁয়ে দিলো জায়দান। নির্লিপ্ত অথচ গভীর বাদামী সমুদ্র আমায় পর্যবেক্ষণ করলো আপাদমস্তক।
“কারণটার দিকে আমি বর্তমানে তাকিয়ে আছি।”
খুশির জোয়ার খেলে গেলো ভেতরে। ইচ্ছা হলো ঝাঁপিয়ে পড়ি ওই প্রশস্ত, প্রস্তুত বুকের মাঝে। অথচ পারলাম না। দগদগে স্মৃতিগুলো আমায় শান্তি দিলোনা। অজান্তেই খানিকটা দূরত্ব টেনে জানালার কাছে সিধিয়ে গেলাম। অভিমানী কন্ঠে বললাম,
“তুমি কি ভেবেছ, মিষ্টি মিষ্টি কথা বললেই চিড়ে ভিজে যাবে? তুমি আসলে ওই ওলোলে আলেওয়ালা টাইপ মেয়েই ডিজার্ভ করো। আরওয়া মিষ্টি, আর মিষ্টি তোমার একদম সহ্য হয়না! রাইট, ইউ ডিজার্ভ হার অ্যান্ড শি ডিজার্ভস ইউ!”
জায়দান চুপ করে শুনে গেলো আমার কথা। অভিযোগ পেশ করতে দিলো। রাগী গলায় বলতে লাগলাম,
“আর একদম সাবিন সাবিন করবেনা! আমি তোমার কেউ না, গট ইট? তোমার লজ্জা করেনা এতকিছুর পরেও ওই থোবরাটা নিয়ে আমার পিছনে ঘুরঘুর করো? আর কয়েক বছর পেরোলেই বাচ্চা গাচ্চারা তোমাকে আংকেল ডাকা শুরু করবে, আর তুমি এখন নির্লজ্জের মতন কাজকারবার করে বেড়াচ্ছ। অসহ্যকর ইতর লোক একটা!”
সামান্য একটু কাছে সরে এসে জায়দান আমার মুখের দিকে মুগ্ধ নয়নে তাকালো। যেন আমি তাকে গালমন্দ নয় বরং ভালোবাসার আলাপ করছি। তাতে আমার মেজাজ আরও ক্ষিপ্ত হয়ে উঠলো।
“ঐভাবে মাতাল গরুর মতন তাকালেই ভেবেছ আমি আইসক্রিমের মতন গলে যাবো? নেভার! তোমার চোদ্দ গুষ্টির সম্পর্কে আমার খুব ভালো অভিজ্ঞতা আছে। নতুন করে নিজের জীবনকে জাহান্নাম বানানোর ইচ্ছা আমার নেই।”
“আমি তো সব ছেড়ে তোমার কাছে এসেছি, তবুও এত অনীহা?”
হঠাৎ করে গম্ভীর গলায় বলে উঠলো জায়দান। আমি সামান্য থমকালাম। আমার দিকে নিগূঢ় নয়নে চেয়ে আছে বাদামী জহরতজোড়া। জায়দান নিজের পুরাতন রূপ বরণ করলো। কেমন শীতলতা ঘিরে ধরলো তার অবয়বকে। গাড়ির এসির ঠান্ডায় প্রথমবারের মতন শিরশির করে উঠলো আমার শরীর।
“তুমি বলেছিলে আমার মতন পারফেক্ট মানুষেরা কেন তোমায় ভালোবাসে না। অথচ, শুরু থেকে আমি কোনোদিন পারফেক্ট ছিলাম না। মানুষ কখনো পারফেক্ট হয়না, সাবিন। দোষ – গুণ – ভুল – ত্রুটি সবারই থাকে। তুমি আমায় সেদিন একটা কথা বলেছিলে, আমার মনে লেগেছিল খুব। আমরা মানুষেরা কেন অন্যের ভালোটাকে ভালোবাসলেও, খারাপটাকে ভালোবাসি না? ভালো খারাপ মিলিয়েই তো ভালোবাসা। তবে আমাদের ভালোবাসা কি মানুষটার প্রতি, নাকি শুধু তার গুণের প্রতি?”
নির্বাক হয়ে চেয়ে থাকলাম আমি। সদ্য এক দুই শব্দে বাক্য শেষ করা লোকটা আজ গড়গড় করে রীতিমত ভাষণ দিচ্ছে বিষয়টা যতটা না বিস্ময়কর, তার চাইতেও বড় বিস্ময়ের ব্যাপার তার অনুভূতির বহিঃপ্রকাশ। মুখটা পাথুরে নেই, তাতে চাপা আবেগ আমি স্পষ্ট অনুভব করতে পারছি।
“সেদিন থেকেই আমার মনস্থির হয়ে গিয়েছিল। অথচ এই বোকা আমিটা উপলব্ধি করতে দেরী করে ফেলেছি, যে তোমায় ছাড়া আমার চলবেই না! অনুভূতি সবসময় আমাকে ধাঁধায় ফেলে দেয়। নিজের একটা অনুভূতির অর্থ বুঝতে বুঝতে আমার যেন গোটা জনম পেরিয়ে গিয়েছে। আমি তোমাকে তোমার দোষ, গুণ, ভুল, ভালো সব সমেতই ভালোবেসে ফেলেছি সাবিন। এতে কোনো মিথ্যা নেই। অস্বীকার করার ভিত্তি নেই। আই অ্যাম ম্যাডলি ইন লাভ উইথ ইউ, সো মাচ দ্যাট ইট হার্টস!”
কান্না পেয়ে গেলো। অথচ অশ্রু সংবরণ করে রাখলাম বহু কষ্টে। দিনের পর দিন যে কথাগুলো শুনতে চেয়েছি, সেই কথাগুলো বাস্তবে কানে এসে ধরনা দিচ্ছে আজ। এই গভীর অনুভূতি সহ্য করা দায়। জায়দান আমার দিকে ঘুরে বসলো। নিজের দুই হাতের আজলায় আমার মুখটি নিয়ে সুগভীর দৃষ্টিতে চেয়ে মোলায়েম কন্ঠে বলল,
“তুমি জানো তোমাকে আমার এত কেন ভালো লাগে? কারণ তোমার শক্তি। সাবিন, তোমার মধ্যে কি আছে বলো তো যে এভাবে আমায় টেনে নিলো তোমার ভালোবাসায়? তুমি হয়ত ভেবে থাকবে আমার ভদ্র, নম্র, মিষ্টিভাসী মেয়েদের পছন্দ। ঠিক আরওয়ার মতন। অথচ সাবিন, আমি কোনোদিন মুখ ফুটে বলতে পারিনি যে আমার তোমার বেয়াদবি ভালো লাগে! আমার তোমার রাগ ভালো লাগে! আমার তোমার সততা ভালো লাগে, ভালো লাগে তোমার হার না মানা মনোবল! আই ফেল ফর আ ব্যাড উইমেন, অ্যান্ড আই অ্যাম ড্যাম প্রাউড অব ইট!”
“চুপ করো তুমি! দোহাই লাগে, প্লীজ!”
হাহাকার করে উঠলাম। অশ্রু ঠিকরে গড়ালো দুচোখ বেয়ে। দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে গেলো। জায়দান আমায় নিজের অতি সন্নিকটে টেনে নিলো। সিট থেকে তুলে উঠিয়ে বসালো উরুতে, নিজের কোলে। দীর্ঘ দুবাহু জড়িয়ে গেলো আমার সমস্ত শরীরজুড়ে। মুখ গুঁজে দিলো আমার বুকের মাঝে, টানলো দীর্ঘ এক প্রশ্বাস। সামান্য শিউরে উঠলাম আমি। পাল্টা আঁকড়ে ধরে নিজের বুকে চেপে ফেললাম তাকে। দলিত মথিত হয়ে গেলাম বুঝি আমরা একে অপরের মাঝে। তার মাথায় চিবুক ঠেকিয়ে ফিসফিস কন্ঠে বললাম,
“আমার এভাবে দূর্বল করোনা। আমি তোমার মতন শক্ত মনোবল রাখিনা। আর একটুখানি…এরপর আমি তোমায় ফেরাতে পারবনা।”
জায়দানের কন্ঠস্বর অত্যন্ত বিষন্ন শোনালো।
“কেন ফিরিয়ে দিতে চাইছ?”
শক্তভাবে তাকে আঁকড়ে রেখে জবাব দিলাম,
“নিজেকে কষ্ট দিতে চাইনা আর। তাই।”
“আমাকে ভালোবাসা কষ্ট বুঝি?”
“হুম। খুব কষ্ট।”
জায়দান আমার বুকে আরো একটু মুখ গুঁজে চাপা গলায় বললো,
“যদি ওয়াদা করি আর কষ্ট পেতে দেব না?”
পরিতাপের হাসি হাসলাম খানিক। তার চুলে আঙুল বুলিয়ে কানে ঠোঁট ছুঁয়ে নিচু কন্ঠে ব্যক্ত করলাম,
“তুমি আমার জন্য নিজের পরিবার ছাড়তে পারবেনা। আর তোমার পরিবার আমাকে মানতে পারবেনা। এত না পারার হিসাবে পূর্ণতা কিভাবে মেলে?”
“আমি মিলিয়ে নেবো। আমার দুনিয়া চাইনা, আমার তোমাকে চাই, মাই ওয়াইফ!”
শিহরণ খেলে গেলো আমার সমস্ত শরীরে। দুহাতে জায়দানের গাল চেপে বুক থেকে মুখ তুলে গভীর দৃষ্টিপাত করলাম।
“কি বলছ তুমি?”
আমার দুহাতের উপর নিজের দুহাত চেপে চুমু খেলো জায়দান।
“আমি যে ভালোবাসার স্বপ্ন দেখতাম, সেই ভালোবাসা শুধুই একতরফা। এই একতরফা অনুভূতি আমার জীবনের ৩২ টা বছর কেড়ে নিয়েছে। আমি এবার নিজের জন্য বাঁচতে চাই। আর নিজের বলতে তো আমার একটামাত্র তুমিই আছো, বউ আমার!”
আর উপেক্ষা করা যায়না। আমার অন্তরাত্মায় কাঁপুনি খেলে গেলো যখন শক্ত করে জায়দানের কাঁধ খামচে ধরলাম। তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে শুধালাম,
“তুমি আমার নাম ধরে ডাকা বন্ধ করে বউ বলে ডাকছ কেন?”
জায়দানের অভিব্যক্তি থেকে গভীর আবেগটুকু বিদায় নিলো। এর পরিবর্তে রহস্য নিয়ে সে তাকালো আমার মুখপানে। উত্তর না করে ঝুঁকে এলো, আমার ঠোঁটের সন্নিকটে নিজের ঠোঁট নিয়ে এসে ফিসফিস করল,
“কারণ তুমি তো আমারই বউ। তোমাকে ডাকবো না তো কাকে ডাকবো?”
হঠাৎ করেই শীতটুকু বিদায় নিলো। গাড়ির ভেতরে কিছুক্ষণ আগের সেই উত্তাল উত্তপ্ত পরিবেশ ফিরে এলো। জায়দানের হাতজোড়া আমার পিঠ বেয়ে কোমরে নেমে এলো। ঠোঁটের একদম কাছে তার ঠোঁট জোড়ার উপস্থিতি আমাকে ঘায়েল করে ফেলেছে বুঝি। সহ্য করা দায়। নিজেকে সংযত করার চেষ্টা করলাম।
“জায়…দান…দুষ্টুমি না…সত্যি করে বলো তুমি…”
“বলো, মাই ওয়াইফ। কি জানতে চাও তুমি?”
কেঁপে কেঁপে উঠলাম আমি। অবাধ্য স্পর্শ আমার জামার ভেতরে চলে গিয়েছে। পিঠের ত্বকে ছোঁয়া যেন জ্বালিয়ে দিচ্ছে সবকিছু। নিজেকে নিয়ন্ত্রণের ব্যর্থ প্রচেষ্টা করতে করতে অস্ফুট স্বরে আবেশিত হয়ে বললাম,
“ওয়াদা… করো।”
“কি ওয়াদা?”
“আমি সারাক্ষন তোমার আম্মুর সাথে ঝগড়া করব, রাজী?”
“কবুল, বউ।”
“আয়দান শালাটাকে থাপড়ে পিঠের চামড়া তুলে ফেলব!”
“কবুল, ওয়াইফ।”
“আমার যা ইচ্ছা তাই করব। কিন্তু তুমি পারবেনা। তোমাকে সবসময় আমাকে ভালোবাসতে হবে!”
“তিন কবুল, মাই ওয়াইফ!”
নিজেকে রুখতে পারলাম না আর। আমার ঠোঁটজোড়া আছড়ে পড়লো জায়দানের ঠোঁটের উপর। সাড়া দিলো প্রিয়তম, ভীষণভাবে। এবার আর কোনো দ্বিধা নেই। আমার নীরব অনুমতি টের পাচ্ছে তার সমস্ত অস্তিত্ব। তার হাতজোড়া ক্রমশ আমার জামা টেনে উপরে তুলতে লাগলো। উন্মোচিত ত্বক শিরশির করে উঠলো, ঠান্ডায় নয়, ভীষণ উত্তেজনায়। জায়দানের পরনের শার্টের বোতাম খুলতে খুলতে হন্যে হয়ে বলতে গেলাম,
“কিন্তু…”
“আর কোনো কিন্তু নয়, ওয়াইফ। তুমি আমার।”
আমি উদ্যোগ নেয়ার আগেই নিজের শার্টটা খুলে গাড়ির কোথাও ছুঁড়ে ফেলল জায়দান। গাড়ির মৃদু হলদেটে আলোয় তার সুগঠিত শরীর উন্মুক্ত হতেই জমে গেলাম আমি। কাঁপা কাঁপা হাত ছুঁয়ে দিলো তার বুক, অতঃপর চাপা কোমর এবং উদর। জায়দানের মাথা ঝুলে পড়লো সিটের উপর, আবেশিত গলায় গুঙিয়ে উঠল সে। সেই আওয়াজ আমার মাঝে ভূকম্পন তুলে দিলো। নখের আঁচড় গেঁথে গেলো তার উন্মুক্ত পেশীবহুল কাঁধে। ঝুঁকে এসে তার উঁচু হয়ে থাকা অ্যাডামস অ্যাপেলে ঠোঁট ছুঁয়ে প্রগাঢ় চুম্বন এঁকে ফিসফিস করলাম,
“আমাদের ডিভোর্স…”
আমি সম্পূর্ণ উচ্চারণ অবধি করতে পারলাম না। এর আগেই জায়দান আমার চুলের মুঠি খামচে ধরে ফেললো। এক ঝটকায় মুখ তুলে নিজের চোখের সঙ্গে দৃষ্টি মেলালো। হিংস্র, ক্ষুধার্ত আকাঙ্ক্ষার দৃষ্টি আমায় নিঃশেষ করে ফেললো।
“আমি তোমাকে কোনোদিন তালাক বলেছি, মাই বিলাভড ওয়াইফ?”
ঐখানেই আমার গোটা জগৎ থমকে গেলো। জমে গেলো সম্পূর্ণ শরীর। নিষ্পলক চেয়ে রইলাম জায়দানের নয়নমাঝে।
দুই বছর অতীত:
উকিলের অফিসের কেবিনের জানালার সামনে নীরবে দাঁড়িয়ে আছে জায়দান। স্থির ফাঁপা দৃষ্টি আবদ্ধ বাইরের দিকে। কিছুক্ষণ আগেই তার জীবনের একটা অধ্যায় সমাপ্ত হয়েছে। তবে, আদও হয়েছে কি?
“ড. আরেফিন?”
উকিলের ডাকে হুশ ফিরল জায়দানের। মাথা কাত করে ঘুরে দেখল। মধ্যবয়স্ক লোকটা তার নিকটে এসে দাঁড়িয়েছে।
“কিছু মনে না করলে, একটা কথা বলি?”
“বলুন।”
উকিল খানিকটা সময় ইতস্তত করে অবশেষে বলেই ফেলল,
“আপনি আপনার স্ত্রীকে ডিভোর্স দেয়ার সময় তালাক বললেন না?”
জায়দানের মুখটা শক্ত হয়ে গেলো। দাঁতে দাঁত চেপে ফেললো সে। প্রথমটায় ইচ্ছা হলো, উত্তর করবেনা। অথচ শেষমেষ করলো,
“ডিভোর্স তো হয়েছেই। ওর নোটিশে নিজেই ব্যবস্থা করেছেন আপনি।”
“হ্যাঁ, সেটা ঠিক। আইনীভাবে হয়েছে সবটাই। কিন্তু ঐযে, একটা খুঁতখুঁত ভাব তো থেকেই যায়। তাছাড়া আইনের মারপ্যাচ প্রচুর। আপনি মুখে তালাক না বললে, কাগজে না লিখলে আপনার এক্স ওয়াইফ কিন্তু পরবর্তীতে সেই ফাঁকফোকর ব্যবহার করে নিজেকে ইসলামিকভাবে এখনো আপনার স্ত্রী হিসাবে দাবী করতে পারে। সে ডিভোর্সকে এক তালাক গণ্য করতে পারে, যেহেতু আপনি মৌখিকভাবে তাকে বায়েন তালাক দেননি। আলেম ওলামাদের মধ্যেও এই নিয়ে কিন্তু মতভেদ আছে। কেউ ভাবে ডিভোর্স হলো বায়েন তালাক, কেউ মনে করে ইসলামী শরীয়তে বায়েন তালাক না বলা অবধি ডিভোর্সের ভ্যালু নেই। সে এই সুযোগ ব্যবহার করলে তখন কি করবেন আপনি?”
জায়দান স্থির চেয়ে রইলো। উকিল স্পষ্টত দেখলেন, লোকটার ঠোঁটজুড়ে অত্যন্ত অস্পষ্ট ক্ষীণ এক বাঁকা হাসির রেখা ফুটে উঠেছে।
“তাই নাকি? আমি তো জানতামই না!”
শিউরে উঠলেন উকিল। জায়দান মুখে বললেও উকিল স্পষ্টত টের পেলেন, জায়দান আরেফিন আগে থেকেই সবকিছু জানতো! সবকিছু!
বর্তমান।
হাসপাতালের সামনের সড়কে যাত্রী ছাউনীর নিচে বসে পা দুলিয়ে বৃষ্টি দেখছে মিসির। কিছুক্ষণ আগে ডাক্তার তাকে রোগী কোথায় গিয়েছে, গেল কিভাবে এই নিয়ে ধমক শুনিয়েছে। সবকিছু কোনমতে সামাল দিয়ে বেচারা একটুখানি মাত্র বসেছে। এদিকে বন্ধু সেই যে গিয়েছে, তার আর দেখাও নেই। উপরন্তু ঝুম বৃষ্টি।
পকেট থেকে ফোন বের করে জায়দানের নাম্বার ডায়াল করল মিসির। গত এক ঘন্টা যাবৎ ফোন রিসিভ করছেনা এই বান্দা। অবিশ্বাস্যভাবে এবার করলো!
“হ্যালো! এই শালা! কোথায় তুই? তোদের ভাগের গালি ডাক্তার আমাকে শুনিয়ে দিয়ে গিয়েছে!”
ওপাশ থেকে উত্তর নেই কোনো। মিসির ভ্রু কুঁচকে খেঁকিয়ে উঠলো,
“ব্যাটা আমার গাড়ি কোথায়? বৃষ্টি বিলাস করতে করতে ক্যাবে ঘুরবো নাকি আমি?”
“ওহ, এটা তোর গাড়ি।”
জায়দানের কন্ঠস্বর প্রয়োজনের তুলনায় খানিকটা ভারী এবং কর্কশ শোনালো। মিসিরের ভ্রু এবার কুঁচকে যাওয়ার বদলে উঁচু হলো কৌতূহলে।
“সত্যি করে বল তো! তোরা কোথায়? কি করছিস? আর আমার সাধের গাড়িটাই বা কোথায়?”
“গাড়িটা….আমাকে বিক্রি করবি, মিসির?”
মিসির রীতিমত হা হয়ে গেলো।
“কিঃ? আমার গাড়ি! আমার বাপের দেয়া উপহারের গাড়ি আমি তোর কাছে বিক্রি করতে যাব কেন?”
ওপাশ থেকে নীরবতা। অতঃপর ভেসে এলো,
সমাপ্তির ওপাড়ে পর্ব ৩৮
“ঠিক আছে। অপেক্ষা কর। আমি গাড়িটা ওয়াশ করিয়ে পাঠিয়ে দেবো।”
“হ্যা…হ্যালো? হ্যালো!”
লাইন কেটে গিয়েছে। মিসির আহাম্মক বনে নিজের ফোনের স্ক্রীনের দিকে চেয়ে রইলো। ব্যাপারটা কি হলো?
