সাঁঝের মায়া আকাশপ্রিয়া ক্রসওভার পর্ব
দুর এ দিলশাদ্ দুআা
তিতিরের খেয়াল হলো অনেকক্ষণ যাবৎ এখানে থেমে আছে তাঁদের গাড়ি। রাত গভীর হচ্ছে, অথচ এই জঙ্গলের রাস্তা এখনো পার হতে পারেনি তারা। তিতিরের পাশে রাখা ব্যাগট্যাগ ঈশান হাত নিয়ে ব্যাক সিটে রাখতে ঘুরলো। নিজের কান্নামাখা মুখটা ওড়নায় মুছে নিলো তিতির। আচমকা চোখ পরলো সামনের দিকে।
একহাত চলে গেলো ঈশানের হাতের দিকে। খামচে ধরলো ঈশানের বাহু। অস্ফুটস্বরে চিৎকার করে উঠলো,
—’ঈ-ঈশান ভাইই…’
তিতিরের আচমকা চিৎকারে তড়িৎ সোজা হয়ে সামনে তাকালো ঈশান। আঁকাবাঁকা রাস্তার মোড়। গভীর হচ্ছে রাত, বিপদ আপদ সব-ভাবেই হতে পারে। মেয়েটার চিৎকারে তাই একটু চমকেই তাকাতে হয়েছে ঈশান। তবে সামনে তাকাতেই বড্ড বিরক্ত হলো সে। একটা শেয়াল! স্বাভাবিক ব্যাপার এটা। এই জঙ্গলের পথে, এমন রাতে অনেক পশুপাখিই দেখা যেতে পারে। শেয়াল তো স্বাভাবিকই । মানুষজনের আনাগেনা নেই। নিস্তব্ধতায় ঘেরা রাস্তা, শেয়াল অহরহ চলাচল করে, করবেই।সামান্য শেয়াল দেখে এভাবে আকাশ-পাতাল এক করে চিৎকার করে কে!
একটা রামধমক দেওয়ার নিয়ত করে তিতিরের দিকে তাকালো ঈশান। সে মেয়ে এক হাতে ঈশানের শার্ট খামচে ভয়ার্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে গাড়ির সামনে শেয়ালটার দিকে। এই মূহুর্তে শেয়াল আর তিতির একে অপরের দিকে গোলগোল চোখে তাকিয়ে।
ঈশান চোখমুখ অন্ধকার করে গম্ভীর গলায় বললো,
—’শেয়াল আজ প্রথম দেখলি?’
তিতির ঠোঁট উল্টায়। ঈশানের বাহুর কাছটা এখনো খাঁমচে ধরা। মিনমিন গলায় বললো,
—’এর আগে কোথা থেকে দেখবো? আমি কি এরকম ঝোপজঙ্গলের রাস্তায় রাতবিরেতে আপনার মতো চলাফেরা করি? কিন্তু… কিন্তু ঈশান ভাই, ওটা তো শেয়াল না।’
রাস্তায় পার হতে গিয়ে থমকে থাকা শেয়ালটার দিকে বড্ড হতাশ দৃষ্টিতে তাকালো ঈশান। শেয়ালটা বোধহয় ইতস্ততবোধ করছে। রাস্তা পার হবে, নাকি কি করবে সম্ভবত বুঝে উঠতে পারছে না। এক পা সামনে দিয়ে গাড় বাঁকিয়ে তাকিয়ে আছে ওদের দিকে।ঈশান তেতে ওঠা কন্ঠে বললো,
—’জলজ্যান্ত শেয়াল দাড়ানো। শেয়াল না- মানে কি? আর তুই রয়েছিস গাড়ির ভিতর। ও তোকে খেয়ে ফেলবে?’
তিতির অসন্তোষ প্রকাশ করলো নিজের মুখের ভাবভঙ্গিতে। ঈশানের শেষ কথাটুকু তার পছন্দ হয়নি। বরাবর মামীরা বলে এসেছে, কোনো মূহুর্তেই নেগেটিভ চিন্তা বা কথাবার্তা না বলতে। তিতির গম্ভীর গলায় বললো,
—’ কি আশ্চর্য! খেয়ে ফেলবে মানে কি! এ আবার কি ধরনের অলক্ষুণে কথাবার্তা ! পথেঘাটে বের হয়েছেন। ভালো কথা মুখে আসে না? ‘
কথাটুকু বলেই খানিকটা চুপ করলো। শুকনো ঢোক গিলে বললো,
—’কিন্তু ওটাকে দেখে ভয় পাইনি তো? ‘
তিতির আদতে কি দেখে ভয় পাচ্ছে সেটার দেখা পাচ্ছে না ঈশান। তবে মেয়েটা হাতের ইশারা করতেই তাকালো সেদিকে। চোখে পরলো এবারে। রাস্তায় ওপাশে একটা মানুষ দাড়িয়ে। গাড়ির হেডলাইটের আলোয় চোখে পরছে মানুষটাকে। তবে মুখ স্পষ্ট দেখতে পাওয়া যাচ্ছে না। কাঁধে একটা ঝোলা জাতীয় কিছু। সে বেচারাও শেয়াল বাবাজির মতোই উঁকিঝুঁকি মারছে থেমে থাকা গাড়িটার দিকে।
গাড়ির ঠিক সামনে দাড়িয়ে থাকা শেয়ালটা এখনো জ্বলজ্বল চোখে তাদের দিকেই তাকানো। ঈশান কথা বাড়ায় না। দু বার হর্নে চাপ দিতেই শেয়ালটা ছুটে পালালো। তিতির অদূরে দাড়িয়ে থাকা মানুষটার দিকে দেখিয়ে আমতা আমতা কন্ঠে বললো,
—’ ও-ওটা কি মানুষ? ‘
ঈশান দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে,
—’ আরেকটা শেয়াল তো মনে হচ্ছে না।’
—’বাজে কথা বলবেন না। লোকটা এদিকেই এগিয়ে আসছে। গাড়ি ছাড়ছেন না কেনো? চোর ডাকাত হতে পারে তো।’
লোকটি এরইমধ্যে ঈশানদের গাড়ির পাশে চলে এসেছে। তিতির ভয়ে চুপসে গেলেও ঈশান বরাবরই সতর্ক মানুষ। অভিজ্ঞ চোখ ভালোমন্দের পার্থক্য করতে পারে খুব সহজেই। তারপরও একহাত এরইমধ্যে চলে গিয়েছে নিজের প্যান্টের পকেটে। লোডেড রিভলবার সঙ্গে থাকে সবসময়। লোকটা আদতে ওদের দিকই এগিয়ে আসছে । তবে দুরত্ব মিটতেই ঈশানের হাত সরে আসলো রিভলবারের ওপর থেকে। হাফ ছাড়লো যেনো। লোকটা সম্ভবত ওদের গাড়ি খারাপ হয়েছে মনে করে এগিয়ে এসেছে। স্থানীয় যেহেতু, মাঝপথে এভাবে গাড়ি থেমে থাকতে দেখে এটা মনে করাই স্বাভাবিক। লোকটি আসতেই গাড়ির কাচ নামিয়ে ফেললো ঈশান। লোকটা ঈশানকে দেখে অমায়িক হাসলো। তারপর আধো গলায় বললো,
—’ঈশান বাবা, আশ্রমে যাইতেছেন বুঝি?’
মৃদু হেসে মাথা নাড়লো ঈশান। নরম গলায় বললো,
—’তোমাকে না বলেছি এতো রাতে পথেঘাটে বের হবে না…বাড়িতে খুঁজছে তো।’
—’চইলা যাবো এখনি।’
—’মাছের বিক্রি আজকাল কেমন?’
—’আলহামদুলিল্লাহ। তোমাগো দোয়ায় ভালোই।’
তিতির হা করে তাকিয়ে। ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করলো,
—’ঈশান ভাই, চেনেন লোকটাকে?’
ঈশান তিতিরের দিকে ঘাড় ফিরিয়ে চাঁপা কন্ঠে বললো,
—’ভূত না । মানুষই।’
তিতির ঠোঁট উল্টায়। লোকটাকে চেনে কথাটা বললেই হতো। এতো হেয়ালি করার কি আছে! লোকটি উঁকি দিয়ে দেখলে তিতির কে। ঈশানের দিকে তাকিয়ে একগাল হেসে বললো,
—’কেডা এইডা?’
ঈশান বাঁকা চোখে তিতিরকে অবলোকন করে গম্ভীর ভাবে বললো,
—’ফুপাতো বউ।’
লোকটা ঠিক কি শুনলো, সেটা বোধহয় নিজেও বুঝে উঠতে পারলো না। ভ্রু জোড়া তুলে বোকা বোকা কন্ঠে প্রশ্ন করলো,
—’বুঝলাম না বাপ। ফুপাতো বোইন কইলা নাকি বউ কইলা।’
তিতিরের চোখজোড়া বোধহয় বিষ্ফরিত হলো। এ লোক বলে কি এতক্ষণে! নিজের এলাকায় কাউকে না হয় জানায় না সে বিবাহিত। তাই বলে সব জায়গায় এটা চলবে! ঈশান একইভাবে বললো,
—’ তোমার একটা ছেলে থাকলে বিয়ে দিতাম। বড় হয়ে গিয়েছে মেয়েটা । সুন্দর না?’
লোকটা প্রাণভরে হাসলো। ঈশান বিয়ের কথা তোলায় লোকটার ধারনা পরিষ্কার হলো। ফুপাতো বোনই বলেছে বোধহয়। বউকে নিশ্চয়ই কেউ বিয়ে দিতে চায়না। লোকটা মাথা ঝাকালো সঙ্গে সঙ্গে।
—’খুব সুন্দর বাপ, তোমার বোইনডা। আমার একটা পোলা থাকলে সত্যিই নিয়া যাইতাম ওরে। ‘
—’আফসোস!”
—’তোমার দাদি কইলো তোমারেও বিয়া করাইছে। তা বউমা কই? এহনো দেখালাম না।’
ঈশান দীর্ঘশ্বাস ফেললো। বড্ড উদাসীন, অনিহার সাথে তিতিরের দিকে ইশারা করে বললো,
—’এইটাই । সম্পর্কে বউ হয় । ফুপাতো বোন থেকে এখন বউ। তবে খালি বউ না বলে -ফুপাতো বউ বলা যায়। সোপিজ একটা। সাজিয়ে রাখি আমার ঘরে। একে ধরাছোঁয়া যায়না। ‘
তিতিরের মাথা রাগে দপদপ করে উঠছে। যাকে তাকে এভাবে দুঃখ প্রকাশ করতে হবে! এ আবার কি কথা! সে সোপিজ? তিতির কথা বলে না। শীরদাড়া সোজা করে গাল ফুলিয়ে বসে রয়। লোকটার বোধহয় এতক্ষণে বোধগম্য হলো ঈশানের কথাগুলো। হো হো করো হেসে উঠলো। ঈশান যে মজা করছিলো বউকে ফুপাতো বোন বলে,সেটা মাথায় আসতেই এই হাসি। বারবার করে দোয়া দিয়ে বিদায় দিলো ওদের দুজনকে।
ঈশান-তিতির যখন চন্দ্রা দেওয়ানের আশ্রমে পৌছালো তখন রাত্রির হয়েছে বেশ । বৃদ্ধা অবশ্য নাতি-নাতনীদের জন্য জেগেই ছিলেন। চশমা চোখে এটে ধর্মপুস্তকের পাতা ওলটাচ্ছিলেন মনোযোগ সহকারে। ওরা দুজন আশ্রমে ঢুকতেই দারোয়ান এগিয়ে এলো ওদের ব্যাগগুলো নিতে। ঈশানকে এখানকার সকলে খুব ভালো করেই চেনে। বছর দু’য়েক আগে বেশ নিয়মিত যাতায়াত ছিলো তার এখানে। তবে কাজের ব্যাস্ততায় বিগত দু বছর যেমন বাড়িতেও ফিরতে পারেনি, তেমন এখানেও আসা হয়ে ওঠেনি। দারোয়ান সালাম ঠুকে ওদের নিয়ে গেলো বৃদ্ধাশ্রমের ভিতরে। পাশাপাশি অনাথ আশ্রম আর বৃদ্ধাশ্রম। সবই দেওয়ানদের করা। ঈশানের দাদু নিজ হাতে করে গিয়েছিলো সব। স্বামীর প্রতিষ্ঠা করা এই কাজগুলো অতি যত্নের সাথে দেখেশুনে রাখেন চন্দ্রা দেওয়ান। তাছাড়া তার ছেলেরা তো আছেই। প্রায় প্রতিমাসেই বেশ কয়েকটা করে দিন বৃদ্ধা এখানে কাটাতে আসেন। তাছাড়া আরও কিছু ভবন নির্মানের কাজ চলছে, সে নিজে থেকে সে-সবের তদারকি করতে ঈদ শেষ হতেই চলে এসেছেন। এ মাসটা এখানেই থেকে যাবেন। ঈশান তিতিরকে দেখেই হাতের বই রেখে দু হাত বাড়িয়ে দিলো।
—’পুত্তুল, আসছো? দাদাভাই কোথায়?’
তিতির দ্রুত পায়ে এসে বসলো তার কাছে। বৃদ্ধা দু’হাতে জড়িয়ে নিলেন নাতনিকে। ঈশানও ঢুকলো প্রায় সাথে সাথেই। গাড়ি পার্কিং করো আসছে সে। এরপর বেশ সময় ধরে চললো গল্প গুজব। এতোটা জার্নি করে, এতোটা পথ এসেছে। তারওপর ফ্রেশ না হয়েই জাঁকিয়ে গল্প জুড়ে দিয়েছে। রাতের খাবারও নিশ্চয় খাওয়া হয়নি। বৃদ্ধা এবারে তাড়া দিলেন ওদের।
—’দাদাভাই, তোমাদের জন্য রুম ঠিক করাই আছে। রনু নিয়ে যাবে ঘরে। আজ আর রাত জেগে কাজ নেই। এতোটা পথ জার্নি করে এসেছো। খাবার খেয়ে ঘুমিয়ে পরো। সকালে কথা হবে। ‘
ঈশান তিতিরের জন্য বরাদ্দকৃত ঘরটা বেশ বড় আর গোছানো। বলাবাহুল্য ঈশান এর আগে আসলে এখানেই উঠতো। তার জন্য রাখা থাকতো এই ঘরটা। এখনো পরিপাটি করেই রাখা। মিনিট দশেকের মাথায় ওদের জন্য খাবারও দিয়ে যাওয়া হলো। ঈশানের সত্যিই খিদে পেয়েছে, খিদের চোটে চোখে অন্ধকার দেখছে একপ্রকার।
—’ আশপাশটা খুব সুন্দর তাইনা?’
তিতির এরইমধ্যে হাতমুখ ধুয়ে পোশাক পাল্টে বের হয়েছে। মাথা মুছতে মুছতে দক্ষিণের জানালা গুলো সব হাট করে খুলে দিচ্ছে। ওদিকটা সত্যিই সুন্দর। সরু একটা নদী চলে গিয়েছে আঁকাবাকা পথ ধরে। হু হু করে বাতাস ঢুকছে ঘরে, ফুরফুরে মেজাজে সে হাওয়া খেতে ব্যাস্ত।
আর ঈশান? সে বেচারা হাড়েহাড়ে টের পাচ্ছে সে আর বর্তমানে ব্যাচেলর নেই, বিবাহিত ব্যাচেলর সে। স্যুটকেসে বউয়ের কাপড়চোপড়ের নিচে তলিয়ে যাওয়া বাদ আছে তার। নিজের জামাকাপড় খুঁজতে মহাব্যাস্ত। দু’দিনের সফর। এক স্যুটকেসে তিতির সব নিয়ে এসেছে। ঈশান নিজের জামাকাপড় খুঁজেই পাচ্ছে না তিতিরের জামাকাপড়ের ভিরে। সব মেয়েলি জিনিসপত্রে ঠাসা স্যুটকেস টা।
—’ এতো রঙবেরঙের এসব কয়টা নিয়ে এসেছিস! আমার মনোযোগ নষ্ট করার ধান্দা খালি। এখন নিজের কিচ্ছু চোখেই দেখছি না। আমার কাপড়চোপড় কোথায় সব?’
তিতির টেবিলের ওপর রাখা খাবার প্লেটে সার্ভ করে দিচ্ছিলো। ঈশানের কন্ঠস্বরে পিছু ফিরতেই হা হয়ে গেলো মুখ। মৃদু আর্তনাদ করে বসলো। ঈশানের হাতে তার তিন- তিনটে ইনার। ঈশান সেগুলোর দিকে বড্ড আগ্রহ নিয়ে তাকিয়ে আছে। ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখে যাচ্ছে মন দিয়ে।
তিতির বোধহয় উড়ে এসে হুমড়ি খেয়ে পরলো ঈশানের সামনে। ছোঁ মেরে নিয়ে নিলো কাপড়গুলো। ঝটপট সে-সব স্যুটকেসে রেখে ধমকে উঠলো একপ্রকার।
—’ এতো এভাবে দেখার কি আছে ? দেখেননি জীবনে? প্রয়োজনীয় জিনিসই সব। নিজের জিনিসপত্রের কথা আমাকে বললেই হতো। সব বের করে দিতাম।’
বিবাহিত পুরুষ! জামাকাপড় খুঁজে না পেলেও বউয়ের ধমক! জামাকাপড়ের ভাজ থেকো উঁকিঝুকি দেওয়া তিতিরের আন্ডারগার্মেন্টস্ গুলোকে ইশারা করে ঈশান ঠোঁট উল্টে বললো,
—’ এতো চেচাচ্ছিস ক্যানো? আমি বলবো না তো কে বলবে?’
তিতির বিরক্ত মুখে ইনারগুলো আবার ভালোমতো গুঁজে ফেললো। ঈশানকে ঠেলে সরিয়ে গম্ভীর কন্ঠে বললো,
—’ কেউ না। সরুন দেখি। কাপড় বের করে দিতে দিন। টি শার্ট পরবেন তো? ট্রাউজার কালোটা দেই?’
মাথা নাড়লো ঈশান। ঠোঁট টিপে অদেখা হাসে। এতো সামান্যতেই এতোটা রাঙিয়ে গেলে চলবে কি করে! এই দুরত্ব কতদিন? হাতেগোনা কিছু সময়! তারপর? আর দশটা স্বামী স্ত্রীর মতো সম্পর্ক একবার তৈরি হলে, ছুটে পালাবে এসব সামান্য বিষয়ে লজ্জা।
তিতির ঈশানের হাতে টি শার্ট আর ট্রাউজার গুঁজে দিয়ে মুখ লুকিয়ে ছুটলো টেবিলের দিকে। যেতে যেতেই বললো,
—’খাবার ঠান্ডা হয়ে যাবে। দ্রুত বের হবেন। পানি ঠান্ডাই আছে। যান জলদি।’’
ঈশান গেলো না। ধীরেসুস্থে নড়েচড়ে উঠলো। মেয়েটাকে একমুহূর্তের জন্য বিরক্ত করার সুযোগ হাতছাড়া করতে মন চাইলো না ঈশানের। কন্ঠে একরাশ দুষ্টুমি এনে কপট আফসোসে বললো,
—’ একটা জিনিস এতদিন খেয়াল করিনি। আগের মাপই আছে? দ্যাটস্ নট ফেয়ার ওয়াইফি। বিবাহিত নারীদের বিয়ের আগের কাপড়চোপড় কেনো বিয়ের পরেও গায়ে লাগবে? এটা মানা যায়না। একদম যায়না। তাও আবার সে নারী যদি হয় ঈশান আরশাদ এর বিবাহিত বউ। মানা যায়না! সিরিয়াসলি মনে হচ্ছে আমার কাজে লেগে পরা উচিত। ‘
তিতিরের কান ঝনঝন করে উঠলো। কি যে অসভ্য কথাবার্তা। পিছন ঘুরে কিছু বলবে তার আগেই ঈশান ঢুকে পরেছে বাথরুমে।
—’খায়িয়ে দে। এতোক্ষণ টানা ড্রাইভ করে হাত অবশ হয়ে আসছে।’
ঈশান এসে বসেছে তিতিরের মুখোমুখি। তিতির মানা করে না। প্লেটে খাবার সাজিয়েই রেখেছিলো । ঈশান সদ্য শাওয়ার নিয়ে বের হয়েছে। উদাম শরীরে ,পানি এখনো মোছা হয়নি ভালো করে। টুপটাপ পানি গরিয়ে পরছে মাথা একঝাঁক ভেজা চুল থেকে।
তিতির সেদিকে একনজর দিয়ে দৃষ্টি সংযত করলো। হার্টবিট ছোটাছুটি করে ঈশানকে এই রুপে দেখলে। সুন্দর মতো লোকমা বানিয়ে মুখে তুলে দিচ্ছে ঈশানের। সারাদিন পর খাবার পেটে পরছে ছেলেটার। গভীর তৃপ্তিতে খাবার খেতে ব্যাস্ত।
—’ঈশান ভাই?’
—’উমম।’
—’এদিকটা খুব সুন্দর বলেন?’
—’মোটামুটি। ‘
—’কাল আশেপাশে ঘুরে দেখাবেন। কেমন?’
—’হুমম, ঠিক আছে।’
—”নানুআপু একদিন ব’লে ছিলো পাশেই কি একটা নদী আছে। সেটার পাশে নাকি অনেকেই ক্যাম্পিংও করে?’
তিতিরের হাত তার মুখের সামনে। খাবারের লোকমা বানিয়ে ধরে আছে। তিতিরের কবজি টেনে সেটা মুখে নিতে নিতে ঈশান বললো,
—’ উমম, আমি আর নয়ন একবার করেছিলাম ক্যাম্পিং।’
তিতিরের চোখজোড়া জ্বলজ্বল করো উঠলো এ যাত্রায়। চন্দ্রা দেওয়ান এর আশ্রমে এই প্রথমবার আসা হলো তার। তবে এখানকার গল্প সে প্রচুর পরিমাণে শুনেছে। সিলেটের এদিকটা যে কতটা সুন্দর। প্রকৃতি, পাহাড় সব মিলিয়ে নাকি অন্যরকম পরিবেশ। তারাও একই শহরে। তাদের এলাকাও কম সুন্দর নয়। তবুও এদিকটা প্রকৃতির বেশি কাছে মনে হয়। তাবু , ক্যাম্পিং এসবের গল্পও শুনেছে অনেক। বরাবরের শখ ছিলো তার। ভাইবোনেরা সবাই মিলে একবার আসবে এখানে ক্যাম্পিং করতে।
তিতির আবদারের স্বরে বললো,
—’ আমরা এইবার ক্যাম্পিং করলো কেমন হয়?’
ঈশানের দৃষ্টি নিজের ফোন স্ক্রিনে। গম্ভীর গলায় বললো,
—’ভালো না।’
তিতির অসন্তুষ্ট হলো বেজায়। হাতের প্লেট শব্দ করে টেবিলে রাখতে রাখতে বললো,
—’সমস্যা কি করলে?’’
ঈশান নিজের হাতের ফোনটা তিতিরের মুখের দিকে ধরতে ধরতে বললো,
—’আবহাওয়া সংবাদ শুনিস কিছু? ঝড় হবে। ক্যাম্পিং এ গিয়ে ঝড়বৃষ্টির কবলে পরলে তখন? তখন কি করবি? তাছাড়া আজ সামান্য একটা শেয়াল দেখেই যে চিৎকার জুড়েছিলি। তখন তাবুতে থাকতে গিয়ে কি ঝামেলা পাকাবি সেটা আমি বেশ টের পাই।’
তিতির মুখ গোমরা করে বসা, ঈশান যে রাজি হবে তো এটা তো জানা কথা! ঈশান সেই গোমরা মুখের দিকে একনজর দিয়ে গম্ভীর গলায় বললো,
—’খাওয়া এখন। ‘
চন্দ্রা দেওয়ান এর আশ্রমে সারাদিন সময় কাটিয়েছে ঈশান তিতির। দিদার সাথে তাদের অনাথ আশ্রম, বৃদ্ধাশ্রম সব ঘুরে ঘুরে দেখেছে। তাদের সাথে গল্পগুজবে কেটে গিয়েছে গোটা একটা দিন। তিতির, ঈশানের আড়ালে চেপে ধরেছিলো তার নানুআপু কে। ঈশানকে ক্যাম্পিং এর জন্য রাজি করাতে। তবে সেটা সম্ভব হয়নি। তিতিরকে নিয়ে তাবুতে, বাইরে রাত্রী যাপনে মোটেই রাজি নয় ঈশান। আবহাওয়ার কথা বলা যায়না। মাঝরাতে ঝড়বৃষ্টি নামলে কি গতি হবে তাদের! যদিও গোটা এলাকা অত্যন্ত নিরাপদ। যে জায়গায় তিতির যাওয়ার বায়না করছে, সেটাও দেওয়ানেরই জায়গার মধ্যে পরে।
তবুও ঈশানকে রাজি করাতে না পেরে রীতিমতো কথাবার্তা বন্ধ করে দিয়েছে তিতির। বিকেল হয়ে এসেছে। আছরের আজান পরেছে খানিক আগেই। দিনের আলো ফুরিয়ে আসছে। সবুজে সবুজে ছেয়ে থাকা আশ্রম। উঠোনের এককোনে বড়সড় কাঠালগাছের নিচো মাঝারি একটা দোলনা। তিতির পা দুলিয়ে বসে আছে সেটায়। ওদিকে বৃদ্ধারা সকলে হাটাহাটি করছে বিকেল বলে। অন্য পাশে অনাথ আশ্রমের বাচ্চাগুলোর ছোটাছুটি দেখতে পাওয়া যাচ্ছে। তিতির এতক্ষণ ওদের সাথেই ছিলো।
ঝিরিঝিরি বাতাস বইছে। ঈশান -তিতিরের রুমের সবগুলো জানালা খুলে রাখা। অসময়েই বেশ শীত লাগছে ঈশানের। ঘরে এসি,ফ্যান সাথে বাইরের বাতাস। সব একসাথে। বাইরে মানুষজনের হৈ হল্লা কানে ভেসে আসছে।
ঈশান ঘুমিয়েছিলো দুপুরবেলা । ঘুম ভেঙে আশেপাশে দেখতে পাওয়া গেলো না তিতিরকে। ফ্রেশ হয়ে সেও এসে দাড়ালো বাইরে। দোতলার করিডরে দাড়াতেই চোখে পরলো নিচে দোলনায় অসহায় তিতিরকে। ভীষন দুখি দুখি মুখ করে বসে আছে। সারাদিন একটা কথাও বলেনি ঈশানের সাথে। মেয়েটার মুখ দেখে হাসি পেলো ঈশানের। ঈশান ট্রাউজারের পকেটে দু হাত গুজলো। গম্ভীর মুখে নেমে এলো নিচে। তিতিরের মুখোমুখি এসে দাড়িয়ে হালকা স্বরে বললো,
—’ এ দুনিয়ায় মনে হচ্ছে তোর কেউ-ই নেই। এখানে বসে আছিস ক্যানো? দিদা কোথায়?’
তিতির শুরুতে জবাব দেয় না। চোখমুখ অন্ধকার করে বসা। ঈশান নির্বিকার মুখে এসে বসে তিতিরের পাশে। পা দিয়ে আটকায় দোলনার নড়াচড়া। সেদিকে ভ্রু কুচকে তাকালো তিতির।
—’আমার কোনো কিছুই আপনার পছন্দ হয়না? দোলনায় দোল খাচ্ছিলাম সেটাও সহ্য হচ্ছে না।’
—’সহ্য হচ্ছে না। সত্যিই হচ্ছে না। সমস্যা কি তোর? সারাদিন কথা বলছিস না কেনো? দুপুরে খায়িয়ে দিতে বললাম। তখনও বাচ্চাদের মতো মুখে ঠুসে ঠুসে চলে আসলি। দশ লোকমার ভাত তিনবারে শেষ করে দিয়ে। অল্পের জন্য খাবার গলায় আটকে মরিনি।’
আবার এলোমেলো কথার ভঙ্গি। তিতির বিরক্ত মুখে বললো,
—’ তবুও তো মানা করিনি। দিয়েছি তো খায়িয়ে।’
ঈশান অদেখা হাসে। দুপুরের কথা মনে পরে। শান্ত গলায় বলে,
—’তুই-ই তো দিবি। কে আর আছে।’
—’ফুপাতো বউ আমি?’
—’না তো। ফুপাতো বাদ দিয়ে শুধু বউ। ‘
—’সোপিজ আমি?’
—’ আরেহ বাবা, তুই খুব সুন্দর। তাই বলেছি।’
—’এখন কথা ঘোরাচ্ছেন! মানুষের সমানে তো বউ পরিচয় দিতে লজ্জা পান।’
ঈশান দু হাতে মাথার চুল ঠেলে দিলো। ওপরে আকাশের দিকে মাথা উঁচিয়ে বললো,
—’ তা পাই। সত্যিই। প্রথম বিয়ে তো। একটু আধটু লজ্জা পাই। পরের গুলাতে আর লজ্জা করবে না। তাইনা? কি বলিস?’
তিতির চোখ রাঙায়। ঈশান তাকায়ও না তার দিকে। মুখ দেখে মনে হচ্ছে সে মহা সিরিয়াস। তিতির দাঁতে দাঁত পিষে বললো,
—’ডিভোর্স লেটার পাঠিয়ে দিয়ে যে কয়টা খুশি বিয়ে করে ফেলেন। ‘
—’পারমিশন দিচ্ছিস?’
তিতির অগ্নিদৃষ্টি তাক করে তাকিয়ে থাকে ঈশানের দিকে। তাকে রাগাতে যে কথাগুলো বলছে তা সে বেশ টের পাচ্ছে। রাগ করতে চাচ্ছে না,তবুও রাগ প্রকাশ পেয়েই যাচ্ছে। ঈশান আরও একটু ঘেষে আসলো। এ বারে ভীষন নরম সুরে বললো,
—’ এসেছিস দু’দিন এর জন্য। আবহাওয়ার খবর শুনিস নি? এর মধ্যে কি ক্যাম্পিং নিরাপদ? ‘
—’দিদা বলেছে এসব জায়গা আমাদেরই। তাহলে নিরাপদ নয় কেনো?’
—’ঝর উঠে তোকে আর তোর তাবু উড়িয়ে নিয়ে গেলে তখন কাকে দোষ দিবি? আমি সারারাত তোকে পাহাড়া দেবো? এর থেকে ঘরে থাক। খেয়ে দেয়ে শান্তির ঘুম দে বিছানায়।’
—’ আর কবে আসা হবে তার নেই ঠিক। চলুন না, বেশি এমন-সেমন মনে হলে ঝটপট চলে আসবো। দূরে তো নয়।’
ঈশান স্থির হয়ে তাকিয়ে রয় কিছুক্ষণ। তিতিরের মায়াবী মুখটার দিকে তাকিয়ে এই মূহুর্তে সত্যিই মানা করতে ইচ্ছে হচ্ছে না। অগত্য সারাদিনের ঘ্যানঘ্যান মানতে হলো এ যাত্রায়। চন্দ্রা দেওয়ারের ম্যানেজার কে ডেকে সব প্যাকিং করে দিতে বললো। ম্যানেজার জানালো তিনি নিজে গিয়ে তাবু ঠিকঠাক করে দিয়ে আসবেন।
সকাল সকাল সিলেটের উদ্দেশ্যে রওনা দিয়ে দিয়েছিলো আকাশ -প্রিয়া। দুপুরে আকাশের একটা মিটিং আছে হোটেল গ্র্যান্ড সুলতানে। প্রিয়া ট্রেনে যেতে বায়না করলেও আজ সে সময় হয়ে উঠবে না। এতো দূরের পথ, তারমধ্যে মিটিং ঠিক দুপুরেই। চাইলেও ট্রেনের লম্বা জার্নিতে সময়ে কুলাবে না। অগত্যা মেয়েটার বায়না ফেলে রেখে ফ্লাইট বুক করেছে আকাশ। তাতে অবশ্য প্রিয়ার মনটন বেশ খারাপ। তবে সবকিছুতে আশকারা দিলে চলবে কেনো! সিলেটের আবহাওয়া আজ বেশ সুন্দর। বৃষ্টি বৃষ্টি ভাব জন্য হয়তো আরও একটু সতেজ প্রকৃতি। আগামীকালই ফিরে যাওয়ার কথা ওদের। শিয়া সদ্য একা থাকবে না হলে। আর এই অবস্থায় তাকে কটেজে একা রেখে যার যার মতো বাইরে থাকে কারোরই মন সায় দিচ্ছে না আজকাল। এখানে আসার পর সারাদিনের অফিশিয়াল সব কাজ সামলে নিয়ে প্রিয়ার মন ভালো করার নিমিত্তে শহরের আশপাশ ঘুরতে বের হয়েছে আকাশ। রাস্তার দু পাশে গাছগাছালী পরিপূর্ণ। নয়নতারার ঝাড় । প্রিয়া এই প্রথমবার পা রেখেছে সিলেটে। বলা যায় চট্টগ্রামের বাইরে ঢাকা বাদে অন্য কোনো জেলাতে এই প্রথম আসা তার। যদিও তাড়াহুড়োয় শাড়ি নিয়ে আসেনি, এ কথা গোটা দিনে কম করে হলেও শতবার উচ্চারণ হয়েই গিয়েছে।
গাড়ি আঁকাবাকা রাস্তা ধরে চলছে। জায়গা বুঝে গাড়ি থেকে বারবার নামছে প্রিয়া । প্রেয়সীর মন রক্ষার্থে আকাশও ছুটছে পিছু পিছু । শহর ছেড়ে বেশখানিকটা ভিতরের দিকে চলে এসেছে ওরা। অবশ্যই প্রিয়ার বায়নায়।
প্রিয়া গাড়ির কাচ নামিয়ে মাথা বের করে মহা উৎসাহে দেখে যাচ্ছে আশপাশ টা। আচমকা ডেকে উঠলো আকাশকে,
—’আকাশ?’
আজকাল আকাশকে নাম ধরেই ডাকে প্রিয়া। অবশ্যই সেটা আকাশের ধমকের ভয়ে। একে তো আপনি ডাকে,তার ওপর আর কি বলে সম্মোধন করবে সেটা টের পায়না। নাম ধরে ডাকতে নাকি ইতস্তত হয়। বিয়ের ছয়মাসের মাথায় এসে এটা বললে ভালো লাগে। অগত্যা দু চারটা ধমক রেগুলার দিতে হয় আকাশকে। আজকাল মোটামুটি অভ্যস্ত হয়েছে। যদি আপনি থেকে এখনো তুমিতে আসেনি মেয়েটা। এটার কাজও জলদিই শুরু করতে হবে। আকাশ মিহি কন্ঠে উত্তর নেয়,
—’হুম।’
—’ওদিক থেকে আসার সময় যে নদী টা দেখলাম সেটা কি এই জঙ্গলের ওপাশেই?’
রাস্তার একপাশে উঁচু টিলাগুলো, অন্য পাশে বিস্তৃত জঙ্গল। গাছাপালায় ছেয়ে আছে হাতের ডানদিকটা। প্রিয়ার কথায় মাথা ডানে ফেরালো আকাশ। মাথা নাড়লো। নদীর নামটা ঠিক কি জানা নেই তার। প্রিয়া মাথা উঁচিয়ে ওদিকে তাকিয়ে বললো,
—’ ওদিকটায় সরু রাস্তা দেখা যাচ্ছে। সোজা নদী অবধি চলে গিয়েছে কি? যাবেন? ওপাশে নিশ্চয় অনেক সুন্দর। ‘
প্রায় সাথে সাথেই রাস্তার কিনারা ঘেঁষে গাড়িটা থামালো আকাশ। ওদিকটায় গাড়ি চলাচলের রাস্তা মনে হচ্ছে না। গেলেও হয়তোবা পায়ে হেঁটে এগোতে হবে। প্রিয়ার দিকে তাকিয়ে বললো,
—’ একটা দিনে কোথাও ঘোরাতে পারলাম না, পাখি। আর এক দু’দিন থাকতে চাও কি?’
প্রিয়া মাথা নাড়ে ডানে বায়ে। চাইলেও থাকা সম্ভব নয়। আকাশের ব্যাস্ততা যতটা, তার থেকেও বড় প্রিয়ার ভার্সিটির ইনকোর্স পরীক্ষা কয়েকদিন পরেই। আর সবাই অফিসে গেলে শিয়া সদ্য একা ওই কটেজ টায়। এখানে ঘোরাঘুরি মনে সায় দেবে না তার। এখানে আসার ঘন্টাখানেকের মাথাতেই ফোন এসেছিলো কটেজ থেকে। শিয়ার ক্রমাগত বমি হচ্ছে। খেতে তো পারেই না আজকাল। ওদের চট্টগ্রাম ফিরে যাওয়ার ফ্লাইট আগামীকাল বিকেলে। ততক্ষণ যতটুকু ঘুরে দেখানো যায় মেয়েটাকে। প্রিয়া ডানে বায়ে মাথা নেড়ে শান্ত গলায় বললো,
—’ নাহ। পরে আসবো সবাই মিলে। এখন চলুন। ওদিকটা দেখে আসি।’
আকাশ নামলো আগে গাড়ি থেকে। বেলা ফুরিয়ে আসছে। অন্ধকার নামার আগে ঘুরে আবার ফিরে আসা যাবে বলে মনে হচ্ছে না । তবুও মানা করা হলো না। গাড়ি যথাসম্ভব সাইটে পার্কিং করে প্রিয়ার নরম হাতটা নিয়ে নিলো নিজের হাতের মুঠোয়।
প্রায় পনেরো মিনিটের জঙ্গলের দীর্ঘ পথ পারি দিয়ে জঙ্গলের ওপাশে এসে থমকাতে হলো ওদের। সামনে যতদূর চোখ যায় সবুজ আর নীলের ছড়াছড়ি। ওপাশে ভারতের সীমানা সম্ভবত। তার ওপাশে ভারতের মেঘালয়ের পাহাড়গুলো মাথা তুলে দাড়িয়ে। এপাশে সরু এঁকেবেঁকে চলা নদী। তার আশপাশ সাদা পাথরের ছড়াছড়ি। প্রিয়া স্তম্ভিত হয়ে গেলো একপ্রকার। দু হাতে খামচে ধরলো আকাশের কোমড়ের বাঁ পাশের শার্টের অংশ। অদূরে পাহাড় আর আকাশে ভেসে থাকা মেঘের দিকে তাকিয়ে মন্ত্রমুগ্ধ সে।
সূর্যাস্ত হচ্ছে এরইমধ্যে। ঝিরিঝিরি হাওয়ার রেশ কেটে গিয়ে বাতাসের তান্ডব শুরু হয়েছে প্রায়।
শক্তপোক্ত হাতটা প্রিয়ার কোমড় টেনে এনে ঠেকালো নিজের সাথে। খোলা চুলগুলো কানের পিঠে গুঁজে দিয়ে বললো,
—’ভালো লাগছে?’
—’খুউব। আমাদের এরকম পাহাড়ের ওপর একটা ঘর হলে কেমন হতো? মেঘের ওপর বাড়ি।’
আকাশ প্রিয়ার কপালে কপাল ঠেকিয়ে শান্ত গলা বললো,
—’মেঘের ওপর ঘর তৈরি সম্ভব হলে এক্ষুনি লেগে পরতাম সেটা করতে। তা যখন সম্ভব না, আমার যা আছে, যতটুকু আছে তাতে বোধহয় কম সুখে রাখবো না, পাখি।’
প্রিয়ার দু হাত ততক্ষণে স্থান করে নিয়েছে আকাশের প্রস্যস্ত কোমড়ে। পাখিরা ঘরে ফিরছে ব্যাস্ত হয়ে। শীতল বাতাসে ছলছল শব্দ হচ্ছে পানিতে। আকাশের বুকে আলতো চুমু খেলো প্রিয়া। পাথরের দিকে তাকিয়ে ইশারা করলো সেখানে যাওয়ার।
উঁচু একটা পাথরের ওপর প্রিয়ার দু-হাত আঁকড়ে দাড় করিয়ে দিলো আকাশ। মেয়েটা এখন আকাশের থেকে বেশ লম্বা হয়ে গেছে। প্রিয়া দু হাত ছড়িয়ে চোখবুঁজে টেনে নিলো শীতল বাতাস।
—’ ইশশ এতো সুন্দর একটা জায়গায় আগে আসিনি ক্যানো বলুন তো।’
—’আমি নিজের আসিনি।’
—’বেশ করেছেন। পৃথিবীর যত সুন্দর জায়গা সব সর্বপ্রথম আমার সাথে দেখার ভাগ্য হোক আপনার। আমি ছাড়া কোথাও যেতে যেনো না পারেন আপনি।’
আকাশ দু হাতে জড়িয়ে ধরে প্রিয়ার লতানো কোমড়। গ্রে কালার একটা আনারকলি গায়ে। ওড়নাটা গলায় সুন্দর মতো জড়ানো। বাতাসে এদিকওদিক ওড়াউড়ি করছে সেটা। আকাশ প্রিয়ার বুক পর্যন্ত এই মূহুর্তে। বিনাবাক্যে মুখ গুঁজল নরম সত্ত্বার ভাজে। শ্বাস টানলো জোরে জোরে।
—’ তোমার -আমার একে অপরের গন্তব্য আজীবন একে-অপরে এসেই শেষ হোক,পাখি। পৃথিবীর সব ভালোবাসায় আমি যেনো তোমাকে মুড়িয়ে রাখতে পারি।’
চন্দ্রা দেওয়ানের আশ্রমের দু’জন মানুষ এসেছে ঈশানদের সাথে। ক্যাম্পিং করা মুখের কথা! তার ওপর দেওয়ান বাড়ির পুতুলের জন্য চন্দ্রা দেওয়ানের চিন্তা আরও একটু বেশিই। একরাতের জন্য যত আয়োজন করা হচ্ছে ঈশান হতাশ চোখে সে-সব দেখতে ব্যাস্ত। দিদা বা তার বউ –কাউকেই মানা করার উপায় নেই তার। বুকে আড়াআড়ি হাত ভাজ করে লোক দুটোর কাজ দেখতে ব্যাস্ত। ক্যাম্পিং এর মজা হলো সব নিজ হাতে করা। এতো আলিশান ভাবেই যদি সব ব্যাবস্থা করা হয় তাহলে কষ্ট করে তাবু তে না থেকে চার দেয়ালের ঘরে থাকলেই হয়। তা কাকে বোঝাবে সে! তিতির নিজেও খানিকটা হতাশই অবশ্য। সে আর ঈশান মিলেই সবটা করতে পারতো। তবে সে আবার দেওয়ান বাড়ির অতি আদরের কিনা!
নদী তীর ঘেঁষে হাটতে হাঁটতে বেশ দূরে চলে এসেছে ঈশান তিতির। বেলা ফুরিয়ে গেছে। ওদিকে সাঁঝের আলোতে জ্বলজ্বল করছে গোটা আকাশটা। আগুনরঙা চারিপাশ। তবে আবহাওয়া কিন্তু মোটেই তপ্ত নয়। বরং ঈশানের চিন্তাটা সত্য করে দিতে আবহাওয়াও যেনো এলোমেলো হতে মরিয়া আজকে। ক্ষনে ক্ষনেই বিশাল আকাশের এদিকসেদিক আলোর রেখা চোখে পরছে। ঈশানের হাতে তিতিরের জুতোজোড়া। সে মেয়ে পানির কিনারায় জুতো খুলে ছুটছিলো এদিক-সেদিক। ঈশান আলগোছে সেটা হাতে তুলে নিয়ে পিছু পিছু আসছে। তিতিরের অগোচরে মৃদু হাসছে বারবার । কোমড় ছড়ানো খোলা চুলগুলো ওর ছোটাছুটির সাথে সাথেই দুলছে এদিক-সেদিক।
ঈশানকে পাগল করতে আরও একবার মেয়েটার শরীরে শাড়ি। কালো শাড়ি! ফর্শা শরীরে ফুলস্লিভ ব্লাউজ আষ্টেপৃষ্টে শরীরে মিশে আছে। খোলা চুলগুলো ভুলেও কোনোভাবে সরে গেলে দেখতে পাওয়া যাচ্ছে মখমলের মতো অর্ধনগ্ন পিঠটা। বেশখানিকটা ব্যাকলেস। ঈশান জোরে জোরে শ্বাস ফেলছে তখন থেকে। মেয়েটা প্রজাপতির মতো উড়ছে বের হওয়া মাত্রই।
তিতির কতশত বার যে প্রশ্ন করলো জায়গা পছন্দ হচ্ছে কি-না। ঈশান ততবারই উত্তর দিতে অপরাগ। তার সামনে ময়ূরীর মতো রমনীকে ছেড়ে এ দুনিয়ার কোনো দিকে তার দৃষ্টিপাত হলে তবে তো! এই একমাত্র নারী যার সৌন্দর্যের কাছে বাকিসব সৌন্দর্য ফিকে।
পথ চলতে চলতে তিতির ঘুরে দাড়ালো আচমকা। ঈশান তখনও বেশ খানিকটাই দূরে। সে থামলো না। নিজ গতিতে পা চলছে সামনের দিকে। তিতির চোখেমুখে রাজ্যের কৌতুহল নিয়ে আচমকা জিজ্ঞেস করে বসলো,
—’ আপনি এরকম বদলে গেলেন কি করে?’
ভ্রু উঁচুলো ঈশান। গম্ভীর কন্ঠে বললো,
—’ কি বদলেছি ? আবার কি চোখে পরলো?’
—’ উহু, আজকের কিছু না। তবে সেই শুরুর আপনি আর আজকের আপনি– আমি কিছুতেই মেলাতে পারি না। অথৈ সাগরে হাবুডুবু খাই।’
—’ এতো চিন্তার সাগরে হাবুডুবু না খেয়ে, আমার প্রেম সাগরে হাবুডুবু খেয়ে দেখতে পারিস। অবসেসড্ হয়ে যাবি। ট্রাস্ট মি।’
তিতির ঠোঁট টিপে দুষ্টু হাসলো। নিচু হয়ে দু হাতের আজলায় নিলো টলটলে পানি। সেটা শূন্যে ছুঁড়ে উচ্চস্বরে বললো,
—’আমার ভিতর আপনি নিজেই তো ডুবে আছেন। আমাকে আর কি ডোবাবেন?’
কথাটা ভয়াবহ সত্যি। ঈশান নিজেই তো ডুবে আছে। অতলে তলিয়ে গিয়েছে। হালাল সম্পর্কের জোর অন্য রকম। শুরুতে প্রেম টের না পেলেও, বৈধ হওয়ার পর থেকেই ডুবতে শুরু করেছে ঈশান। মেয়েটা আজকাল তার সেই দূর্বলতাও ধরে ফেলছে! ঈশান আরশাদ দেওয়ান কারোর প্রতি গভীরভাবে পিছলে গেছে, আর সেই ব্যাক্তি সেটা টেরও পাচ্ছে।
মেয়েটা তো আজ বাদে কাল মাথায় উঠে তান্ডব চালাবে। এমনিই সে আবার দেওয়ান বাড়ির রাজকন্যা। এখন নিজেই অবশ্য রাজ করছে। ঈশান খুকখুক কেশে গলা পরিষ্কার করলো যেনো৷ দ্রুত পায়ে সামনে এগিয়ে দুরত্ব ঘোচালো তিতিরের সাথে। হাতের জুতোজোড়া তিতিরের পায়ের কাছে রেখে জলদি পরে ফেলতে বললো সেটা। তিতির বাধ্য মেয়ে। এ যাত্রায় পায়ে গলিয়ে নিলো জুতোজোড়া। আবার ঘুরে সামনের দিকে হাটা ধরবে তখনই টান পরলো শাড়ির আঁচলে। ঈশান শাড়ির ফিনফিনে আঁচল টা তিতিরের অর্ধ উন্মুক্ত পিঠের ওপর তুলে দিতে দিতে বললো,
—’ উপোষ রেখে এভাবে খাবারের লোভ দেখাতে হয়না। কমনসেন্সের বড্ড অভাব তোর।’
তিতির আড়ষ্ট মুখ নিয়ে ফিরে তাকায়। কয়েক সেকেন্ড স্থির তাকিয়ে থেকে ঈশানের দৃষ্টিতে দৃষ্টি মিলিয়ে বলে ওঠে,
—’কেউ চাইলে উপোষ ভেঙে ফেললেই পারে।’
কথাটা কেমন একটা ঝোঁকের বশে বলে ফেলেছে তিতির। বলে অবশ্য লজ্জায়ও পরে গিয়েছে। বাঁকা হাসলো ঈশান। পকেটে হাত গুঁজতে গুঁজতে বললো,
—’পরে ম্যারেটাল রে*প এর বদনাম দিবি?’
মুখ মলিন হলো তিতিরের। এই এক জিনিস নিয়ে ঈশানের কথা তার ভীষন খারাপ লাগে। তাদের শুরুর এলোমেলো সম্পর্কের, এলোমেলো ব্যবাহরের জের ধরে ঈশান এখনো মান অভিমান করে! কই তিতিরের ওই কথাগুলোর থেকেও ঈশানের কাজ, ব্যবহার তো আরও যন্ত্রনা দায়ক ছিলো। হোক সেটা অভিনয়। কিন্তু ছিলো তো। সে তো মনে রাখেনি। ঈশানের ভালোবাসায় সব ভুলেছে সে। তিতির মাথা ঝুকিয়ে শান্ত গলায় বললো,
—’আর দেবো না।’
ঈশানের খসখসে হাতের তালু এসে ছুঁয়ে দিয়েছে তিতিরের গ্রীবাদেশ। সেখানে আকড়ে ধরেই হিসহিসিয়ে বললো,
—’ ভেবে কথা দেওয়া উচিত মিসেস দেওয়ান। পরে কথা রাখতে পারেন না তো। আমার ভীষন কষ্ট হয়ে যায়। পুরুষমানুষ আমি। আপনার বৈধ পুরুষ। বৈধ নারীকে প্রতিবার এতো কাছে পেয়েও গভীরে ছুঁয়ে দিতে না পারার আক্ষেপে জ্বলে পুড়ে ছাঁই হই প্রতিনিয়ত। একদিন অন্তত নিজ থেকে দু কদম এগিয়ে এসে সে আগুন নেভাতেই পারেন। আপনার অনুমতির অপেক্ষায় থাকি তো আমি। বোঝেন না?’
চোখ মারলো ঈশান। তিতির সলজ্জ দু কদম এগিয়ে এলো। জুতোজোড়া খুলে নিজের মোমের মতো নগ্ন পা তুলে দিলে ঈশানের পায়ের ওপর। সেটায় ভার রেখে উচু হয়ে জড়িয়ে ধরলো ঈশানের কাধ। রক্তিম মুখটা এগিয়ে কিছু বলতে যাবে তার আগেই ওপাশ থেকে শোনা গেলো একটা পুরুষালি কন্ঠ।
—’এক্সকিউজ মি?’
ঈশানের পায়ের ওপর থেকে নেমে ছিটকে পিছিয়ে এলো তিতির। আজ পূর্নিমা হওয়ার কথা ছিলো। কিন্তু গোটা আকাশ জুড়ে কালো মেঘের ঘনঘটা। চাঁদ লুকিয়েছে মেঘের আড়ালে। সন্ধ্যার যেটুকু আলো অবশিষ্ট ছিলো সেটাও মিলিয়েছে। আপাতত বেশ ভালোরকম তিমির চারিদিকে। ঝটপট ফোনের আলো জ্বাললো ঈশান। ওপাশের মানুষটার হাতেও একটা ফোন। তিতির ঘেষে দাঁড়ালো ঈশানের কাছাকাছি। অচেনা জায়গা, রাতের বেলা। কে না কে! তবে মানুষটি কাছে আসতেই চোখ পরলো সুদর্শন পুরুষের পাশে আরও একজন অতি রূপবতী নারীর দিকে। মুখটা বেশ শুকনো লাগছে। ভয়ার্ত মুখে চেপে ধরে আছে সাথের মানুষটার হাত।
ঈশান দু পা এগোতেই বন্ধ হলো ওপাশের মানুষের ফোনের আলো। গম্ভীর কন্ঠস্বর শুনতে পাওয়া গেলো তার থেকে।
—’ আপনারা কি স্থানীয়? নাকি টুরিস্ট?’
ঈশান ডানে বায়ে মাথা নাড়লো গম্ভীর মুখে।
—’স্থানীয় বলতে পারেন। ‘
ওপাশের পুরুষটি হাত বাড়িয়ে দিলো।
—’আকাশ এহনাজ চৌধুরী। ‘
আকাশরা যতক্ষণে ঘোরাঘুরি শেষ করে ফিরে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হচ্ছে তখন রাতের অন্ধকার প্রকৃতিজুড়ে। সেই সরু রাস্তা পেরিয়ে অনেকটা এগিয়ে চলে এসেছে দুজন। এমন ঘন জঙ্গলের মধ্যে নামমাত্র রাস্তাটা এই আঁধারে খুজে পায়নি ওরা। বাধ্য হয়ে নদীর তীর ঘেষে এগিয়ে এসেছে এদিকটায়। ঈশান কপালে ভাজ ফেলে শান্ত স্বরে জিজ্ঞেস করলো,
—’চৌধুরী গ্রুপ অফ ইন্ডাস্ট্রির ওনার? শাহজাহান চৌধুরীর…? ‘
আকাশ হাসলো। মাথা নাড়লো। হাসিমুখে বললো,
—’আমার বাবা।’
হাতের আলোটা খানিকটা উঁচিয়ে ধরলো ঈশান। এতক্ষণ এতটুকুন আলোতে কারোর মুখই স্পষ্ট দেখতে পাওয়া যাচ্ছিলো না।
—’আমি ঈশান আরশাদ দেওয়ান। আমাকে এতো সহজে ভুলে গেলে কি করে হবে বাডি! দ্যাটস নট ফেয়ার। লাস্ট এক্সামে ফিজিক্সে চৌধুরী সাহেব কে আমি আড়াই মার্কে হারিয়ে টপ স্টুডেন্ট হয়েছিলাম। সেই ইগো পুষে এখন না চিনতে পারাটা কি ভালো দেখায়?’
আকাশের ভ্রু জোড়া কুচকে এলো। আলো আঁধারির খেলায় এতক্ষণে সম্ভবত ঈশানের মুখটা স্পষ্ট অবলোকন করলো। জ্বলে উঠলো মস্তিষ্ক। চকচক করে উঠলো তীক্ষ্ণ চোখজোড়া। ঈশানের হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে কাধ মেলালো দুজন।
—’ হোয়াট আ কো -ইন্সিডেন্ট ভাই। কত বছর পর! তাও এমন ভাবে? কান্ট ইমাজিন।’
—’আমি কিন্তু নাম শোনার সাথে সাথে চিনে ফেলেছি।’
—’আমার কল্পনাতেও ছিলো না। সিলেট তোমার শহর। তাই বলে এভাবে, এমন জায়গায় দেখা হবে। এতোগুলো বছর পর। ভাবিনি। স্বাভাবিক পথেঘাটে হলে মানা যায়, এমন জঙ্গলের ধারে!’
হাই স্কুল জীবনে বছর তিনেক একই ক্যাডেট স্কুলের স্টুডেন্ট ছিলো দুজন। পারিবারিক ব্যবসার সূত্রেও পরিচয় আছে দুই পরিবার। আকাশের দাদা শাহজালাল চৌধুরী এবং ঈশানের দাদা আরশেদ দেওয়ান একসময়ের উদ্বিয়মান ব্যবসায়ি। প্রতিদ্বন্দ্বী কম বন্ধু ছিলো বেশি। যদি আকাশ বা ঈশান দুজনের কেউ-ই কখনো ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলো না। দুই টপ স্টুডেন্ট এর মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি রেশারেশি বলতে যা হয় আরকি! তবে সেসব নেহাৎ ছেলেমানুষী। সময়ের স্রোতে কেটে গেছে বছরের পর বছর। দুজন দুজনেরই নিজের জায়গায় সুপ্রতিষ্ঠিত আজকে। সুতরাং এতদিন পর দেখা হওয়ায় নস্টালজিক অনূভুত হওয়াই স্বাভাবিক। আরও বেশকিছু সময়ই চললো দুজনের কথোপকথন। দুই রমনী তাদের স্বামীদের পাশে দাড়িয়ে সেসব কথা গিলতে ব্যাস্ত। স্ত্রীদের পরিচয়ও দিলো দু’জনই বেশ সম্মানের সাথে।
ঈশান আশেপাশে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো,
—’এভাবে কো ইন্সিডেন্টলি না হয় এতদিন পর দেখা হয়ে গেলো। কিন্তু এখানে…আই মিন ঘুরতে?’
প্রিয়া ততক্ষণে বেশ স্বাভাবিকই হয়েছে। ওপাশে ঈশানের পাশে তিতিরকে দেখে সম্ভবত। জঙ্গলের পার ঘেষে এলোমেলো রাস্তায় চলে এসেছে। অ্যাক্সিডেন্টলি নিজের ফোন রেখে এসেছে গাড়িতে, আর আকাশের ফোন প্রায় বন্ধ হওয়া হওয়া অবস্থা। খানিক আগে সেটা অবশ্য বন্ধ হয়েও গিয়েছে। ঘুটঘুটে অন্ধকারে পথ খুঁজে পাওয়াই দুষ্কর। তারমধ্যে প্রকৃতির রুষ্টতা দেখে মনে হচ্ছে আকাশপাতাল ভেঙে বৃষ্টি নামলো বলে। প্রিয়া প্রচন্ড ভয় পাচ্ছে। এমন এক ঝড়ের রাতে রিয়ান তাকে নিয়ে গিয়েছিলো। সেই একটা মানসিক ট্রমা এখনো আছে বইকি। সময় কেটেছে বহুদিন,বহুমাস কিন্তু মস্তিষ্ক থেকে সেই বিভীষিকাময় স্মৃতি কি আর এতো সহজে মোছার জিনিস! আকাশ প্রিয়ার হাত চেপে আছে। শান্ত গলায় বললো,
—’বিজনেস পারপাসে আসা সিলেট। কালই ফিরবো। এখানে এসে হুট করে আটকা পরে গিয়েছি। ফোন অফ। একটা অ্যাক্সিডেন্টের পর থেকে প্রিয়া বেশ ঝড়বৃষ্টি ভয় পায়। সাথে সারাউনডিং এর একটা ব্যাপার তো আছেই। লোকজন খুঁজছিলাম আরকি।’
প্রিয়া যে ভীষন ভয় পাচ্ছে তার তার চোখমুখ দেখেই বোধগম্য হচ্ছে সবার। আকাশকে ওপাশ থেকে আকড়ে আছে রীতিমতো। ঈশানের পাশ থেকে তিতির এগিয়ে এসে দাড়ালো প্রিয়ার পাশে। নরম গলায় বললো,
—’ ইট’স ওকে। ভয় পাচ্ছো কেনো? সবাই আছি তো এখানে।’
তিতির খেয়াল করলো প্রিয়া কাঁপছে রীতিমতো। ঈশান এদিক ওদিক আলো তাক করলো। তারা নিজেরাও তাদের তাবুর এড়িয়া থেকে বেশ দূরে চলে এসেছে।
—’ গাড়ি এনেছেো?’
—’রোডে পার্ক করা।’
—’বৃষ্টি নেমে পরার আগে জঙ্গল পেরোতে হবে। না হলে মিসেস চৌধুরী আরও ভয় পেয়ে যাবে।’
মচমচ পাতার শব্দ হচ্ছে জোড়ালো ভাবে। বাতাসের তান্ডবে গাছপালা গুলো ক্রমশ হেলে পরছে বারবার। এই বুঝি মাথাী ওপর দুমদাম আছড়ে পরে গাছের ডালপালা। তিতির আর প্রিয়া দু’জনেই বেশ সামনে। আকাশ, ঈশান পিছু পিছু হাঁটছে। পায়ের গতি বেশ দ্রুতই সবার। বন্য বিভিন্ন পশুপাখি হাকডাক করছে।
—’বিয়ের কতদিন? ‘
আকাশের প্রশ্নে সামনে প্রিয়ার হাত আঁকড়ে হেটে চলা তিতিরের দিকে তাকালো ঈশান। মৃদু হেসে বললো,
—’আড়াই মাস প্রায়। তোমার?’
—’মাস ছয়েক।’
—’যাহ্। জীবনের চূড়ান্ত গেমে চৌধুরী সাহেব জিতলো তাহলে।’
—’তা জিতলাম।’
হাসলো আকাশ। এরইমধ্যে ঝিরঝির বৃষ্টি শুরু হয়ে গিয়েছে মনে হয়। ছাতা নেই কারোর কাছে। তারওপর আকাশদের এগিয়ে দিয়ে ঈশানরা আবার একই পথে ফিরবে। ঝড় জলের মাত্রা বেশি হলে ফেরা বেশ সমস্যাই হবে।
পরিবার, বিজনেস পারিপার্শ্বিক সব নিয়েই আলাপ হচ্ছে দু’বন্ধুর।
আকাশ সামান্য খুকখুক করে কন্ঠ নামিয়ে ঈশানকে উদ্দেশ্য করে বললো,
—’ মেয়ে জাতীতে তো ভাই তোমারও এলার্জি ছিলো। অথচ ঈশান আরশাদ দেওয়ান এরকম পরিবেশে অন্ধকারে বউয়ের সাথে রোমান্স করছিলো। ব্যাপারটা ইমেজের সাথে গেলো না তো।’
ঈশান বাঁকা হাসলো আকাশের কথায়। কপট আফসোস কন্ঠে ভর করলো তার। সে-ও আকাশের ন্যায় কন্ঠ নামিয়েই বললো,
—’ সেই বরাবরের মতো এতোদিন পর দেখা হয়েও আমার কিছু না কিছুতে তো ঠিকই ব্যাগড়া দিয়ে দিলে। রোমান্স টা শেষ হতে দিতে অন্তত।’
—’ আমার একটা ইমেজ আছে তো নাকি! লুকিয়ে অন্যের রোমান্স কিভাবে দেখি!’
—’ ঘুরেফিরে এতটুকুন মেয়ে কোথা থেকে খুঁজে পেলে। বয়স কম লাগছে তো। বাচ্চা বাচ্চা।’
আকাশ মৃদু হাসলো ঈশানের কথায়।
—’ অয়ন ভাইয়ের শালিকা। হয়ে গেছে কোনোভাবে। যদিও প্রেমে পরার পর যেনেছি বাকিসব। বাই দ্যা ওয়ে। আমাকে বলছো। তোমারও একই কেস লাগলো।’
ঈশান ঘাড় ডললো মৃদু হেসে। হালকা ঘাড় নেড়ে বললো,
—’ আমার তোমার মতো লাভ ম্যারেজ হয়নি। ফোর্স অ্যান্ড অ্যারেন্জ ম্যারেজ বলা যায়। কাজিন ছিলো, দিদার আবদারে এখন বউ।’
আকাশের পায়ের গতি খানিকটা কমেই এলো। ভ্রু জোড়া তুলে বললো,
—’ ঈশান আরশাদ কে জোর করা যায়? উহু। মানতে পারলাম না। কুছ তো থা…’
ঈশানের হাসি প্রশ্যস্ত হলো বেশ খানিকটা। তিতির আর প্রিয়া খানিক সামনে গল্প গুজবে মেতেছে। হেঁটে চলছে নিজমনে। এরইমধ্যে ভাবসাব হয়ে গেছে দু’জনেরই। ঈশান অনেকটা আপন মনেই বললো,
—’ছিলো কি? কে জানে? আগে বুঝিনি। আজকাল টের পাই। ছিলো… অনেক কিছুই ছিলো। প্রথম দেখা থেকেই ছিলো। কিন্তু প্রেমহীন জীবনে প্রথম বসন্তের আগমন টের পেয়েছি অনেক পরে। ‘
—’ ভালোবাসা দেরিতেই টের পাওয়া ভালো। রয়ে-সয়ে তৈরি হওয়া ভালোবাসার অনুধাবন বেশি হয়, গভীর হয়…’
বৃষ্টির গতি বেরেছে এরইমধ্যে। জঙ্গলেের স্যাতস্যাতে পরিবেশ পেরিয়ে পিচঠালা রাস্তায় এসে উঠেছে দুই দম্পতি। অদূরেই দেখতে পাওয়া যাচ্ছে আকাশের ব্ল্যাক মার্সিডিজ’টা। ওদের এখানে দাঁড়াতে বলে দ্রুত গাড়ি ঘুরিয়ে নিয়ে আসলো আকাশ। বৃষ্টির তীব্রতা বাড়ায় ঈশান -তিতিরকেও এসে উঠে বসতে বললো গাড়িতে।তবে এখন এখানে সময় নষ্ট করলে ফিরে যেতে আরও সময় লেগে যাবে। রাত গভীর হলে এই পথ ভেঙে মেয়েটাকে নিয়ে ফেরা দুষ্কর হয়ে যাবে।
আকাশ গাড়ি থেকে একটা ছাতা বের করে বাড়িয়ে দিলো ঈশানের হাতে।
—’ এটা ছাড়া এই মূহুর্তে তোমার সাহায্য ফিরিয়ে দেওয়ার মতো কিছু নেই, বাডি। অনেক হেল্প হলো। না হলো ওয়াইফ নিয়ে ঝামেলায়ই পরে যেতাম বৃষ্টির মধ্যে। ‘
তিতির-প্রিয়াও বিদায় দিলো একে অপরকে। ঈশান ছাতা ধরে আছে দুজনের মাথার ওপর। আকাশদের গাড়ি প্রস্থান করতেই তিতির ফিরলো ঈশানের দিকে।
এতক্ষণ এতজন সাথে ছিলো বলে হয়তো ওর মনের ভাব বোঝা যায়নি। তবে গাড়ির আলো মিলিয়ে যেতেই ঈশানকে তাড়া দিলো হাঁটা ধরতে।
ঝুমঝুম বৃষ্টি আছড়ে পরছে ছাতার ওপরে। যদিও ঈশানের বলিষ্ঠ শরীরের পাশাপাশি এতটুকুন একটা ছাতার নিচে দু’দুটো মানুষ মোটেই জায়গা হওয়া সম্ভব-পর নয়। ঈশান সেই হেতুতে ছাতাটা একটু বাঁকিয়েই রাখলো তিতিরের দিকে। যেনো মেয়েটা ভিজে না যায়।
একই পথে ফিরছে দুজন। অজস্র অচেনা পোকামাকড়ের ডাক কানে এসে বাজছে। ঈশান নির্বিকার। তিতিরের পাশাপাশি যতটা পারা যায় তাল মিলিয়ে হেঁটে চলছে। একটা শব্দও করছে না দু’জনের কেউই। তিতির এবার খানিকটা বিরক্ত মুখেই বললো,
—’আ-আপনি কিছু বলছেন না ক্যানো?’
—’কি বলবো?’
—’কিছু তো বলবেন। এরকম জায়গায় চুপচাপ কি আর ভালো লাগে? ‘
—’রোমান্স চাস?’
—’ইশশশ কি কথা! সেটা কখন বললাম আমি?’
—’তাহলে হাঁটছিস,হাঁটতে থাক। এসে গেছি প্রায়।’
ঝড় হলে ভীষন চিন্তার হয়ে যেতো বিষয়টা। ভাগ্য ভালো শুধু বৃষ্টি। তবুও সেটাই বা কম ঝামেলার নাকি। সাপ পোকাদেরও ভরসা কোথায়!
তিতির একপ্রকার লেপটে গিয়েছে ঈশানের শরীরের সাথে। শুধু মাথা বাঁচানো কারবার এই ছাতাটায়। দু’জনেই ভিজে একাকার। তিতিরের কালো শাড়ি সর্বাঙ্গে মিশে আছে। ঈশানেরও একই ঘটনা। ঈশান খানিকটা দুরত্ব করলো তিতিরের নরম শরীর থেকে। ভীষন অসুবিধা হচ্ছে তার। তবে তিতির সেটা হতে দিলো না এবারেও।
—’ এতো কাছে ঘেঁষছিস ক্যানো? ‘
—’কাছে এলে সমস্যা কি! এমনিতে তো কাছে চান। এখন সরিয়ে দিচ্ছেন ক্যানো?’
ঈশান ঠোট কামড়ে ধরে বেশ খসখসে কন্ঠে বললো,
—’তাবু অবধি যেতে দিবি তো নাকি? এতোদিন তো কাছেই ঘেঁষতে দিচ্ছিলি না। আর আজ পারমিশন দিয়ে, নিজেই কনট্রোল রাখতে পারছিস না? কি চাস তুই? আমি কনট্রোল হারাই? ঘুরেফিরে ঝোপঝাড়ে তো তোরই ইন্টারেস্ট বেশি দেখছি।’
চারপাশে বহু আগেই আঁধার নেমেছে। ঘুটঘুটে অন্ধকার যাকে বলে। ঈশানের হাতের ওই ফোনের আলো টুকু ছাড়া আর কয়েক কিলোমিটার এর মধ্যে সম্ভবত কোনো আলো খুঁজে পাওয়া যাবে না। তারওপর বৃষ্টি! এই জঙ্গলে ভয় পাওয়ায়ই তো স্বাভাবিক। অথচ এই ভয়ের মধ্যেও ঈশানের লাগামহীন কথায় শীরদাড়া বেয়ে শীতল স্রোত নেমে গেলো। আরেকদফা বিদ্যুৎ চমকাতেই হাতের বাঁধন দৃঢ় করে ভয়ার্ত কন্ঠে বললো,
—’ঝোপঝাড়ে কার ইন্টারেস্ট বেশি সেটা কথা শুনলেই বোঝা যায়। মাথায় ওই বাসর টা ছাড়া আর আছে টা কি? পরিস্থিতি বোঝে না, কিছু না। এই দূর্যোগের মধ্যেও বাসর মাথা থেকে যায় না…’
ঈশানের পায়ের গতি আরও দ্বিগুণ হয়েছে যেনো। তিতির রীতিমতো ছুটছে ঈশানের সাথে সাথে। একহাতে শাড়ি উঁচিয়ে অন্য হাতে ঈশানের হাত শক্ত করে আকড়ে রাখা। ঈশান কেমন শব্দ করে হাসলো। বাঁকা গলায় বললো,
—’ কথা ঘুরাবি না। তখন নিজেই বলেছিস পারমিশন আছে এখন। দু কদম এগিয়ে সেটাই বুঝিয়েছিলি। মিথ্যা ছিলো সেটা?’
তিতির ইতস্তত করে মিহি স্বরে বললো,
—’সেটা কখন বললাম? মিথ্যে ক্যানো থাকবে?’
ঈশান আত্মপক্ষ সমর্থন করার সুযোগ পেয়ে গেলো যেনো দৃঢ় গলায় বললো,
সাঁঝের মায়া পর্ব ৪৮
—’ তাহলে? আমি কি গাধা? গ্রিন সিগনাল পেয়েছি। তাও বিয়ের এতোদিনের মাথায়। নিঃশ্বাস -প্রশ্বাসে এখন ওই একই শব্দ৷ বাসর! তাবু অবধি চল। তুইও একই জিনিস চাইবি। একই শব্দ বলে তরপাবি।’
তিতির লাজুকপাখির মতো সেটে থাকে ঈশানের তপ্ত দেহের সাথে। তিতির কাঁপছে এখন রীতিমতো। শীত করছে তার। ঈশানের কথার কোনো প্রতিত্তরই করলো না। ঈশান আচমকা মাথা ঝুকিয়ে আনলো তিতিরের কানের কাছে। পা থমকালো দুজনেরই। তিতির মাথা ঘুরিয়ে ঈশানের দিকে তাকাতে অবধি পারলো না। ঈশানের শীতল ঠোঁটের স্পর্শ পেলো নিজের নরম কানের লতিতে। ঈশান আলতো কামড় বসালো সেথায়। চোখ বুজে ফেললো তিতির। দু হাত খামচে ধরলো ভেজা শাড়ির অংশটুকু। ঈশান ফিসফিস করে মাতাল কন্ঠে বললো,
—’ আজ তোকে আমার নামের তসবি পরাবো, তিতির। বি প্রিপেয়ারড,বেইবি।’
