Home রুপুর বিয়ে রুপুর বিয়ে পর্ব ৩২

রুপুর বিয়ে পর্ব ৩২

রুপুর বিয়ে পর্ব ৩২
Bobita Ray

মা বা রুপু কেউ বিনয়ের কষ্ট বুঝে না। কেউ না। মা কেন এত ডাকাডাকি করছে? মা কী বুঝতে পারছে না। রুপুর সঙ্গ ছেড়ে বিনয়ের এখন কোথাও যেতে ইচ্ছে করছে না। কোথাও না। রুপু কয়েকপা হেঁটে গিয়ে দরজায় হাত রাখল। দরজার ছিটকানি খোলার আগেই বিনয় পেছন থেকে রুপুকে জাপ্টে ধরল। পাগলের মতো রুপুর ঘাড়ে, পিঠে, মাথায় চুমু খেতে লাগল। ক্ষণিকের মোহে রুপু আবেশে চোখদুটো বুঁজে ফেলল। নিঃশ্বাস ক্রমশ ভারি হয়ে এলো। রুপুর ঘোর কাটতেই রুপু স্বাভাবিক কণ্ঠে বলল,

“ছাড়ো আমাকে।”
বিনয় জেদি কণ্ঠে বলল,
“না ছাড়ব না। তুমি এখন আমাকে ছেড়ে কোথাও যেতে পারবে না। আমার এখন তোমাকে চাই চাই চাই।”
রুপু হেসে ফেলল। বলল,
“তোমার মা যেভাবে দরজা ধাক্কাধাক্কি করছে। আর একটু হলেই দরজা ভেঙে ফেলবে। দরজা ভেঙে যদি দেখে, তার আদরের ছেলে বউয়ের সাথে অন্তরঙ্গ সময় কাটাচ্ছে। অবাকের চূড়ান্ত হয়ে এখানেই স্ট্রোক করে ফেলবে।”
বিনয় বিড়বিড় করে বলল,
“তুমি মাকে চলে যেতে বলো।”
“আমি কেন তোমার মাকে চলে যেতে বলব।”
“আমার জন্য বলবে।”
“তোমার প্রয়োজন হলে তুমি বলো। আমি বলতে পারব না।”
বীথি রানী হতবাক হয়ে গেল। কাঁদো কাঁদো কণ্ঠে বলল,

“কী হলো রে বিনয়? তুই এখনো দরজা খুলছিস না কেন? তুই তো কখনো এমন করিস না। দরজাটা খুল বাবা। চিন্তায় আমার প্রেশার বেড়ে যাচ্ছে।”
মাকে উপেক্ষা করার সাধ্য বিনয়ের নেই। কোনকালে ছিলও না। বিনয় দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজেই দরজা খুলে দিল। মাকে দেখে হাসার চেষ্টা করল। বীথি রানী বিনয়কে দেখে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল। বিনয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিল। থুতনিতে হাত রেখে চুমু খেল। বলল,
“তুই আমার সাথে চলতো বাবা। সকাল থেকে কিচ্ছু খাসনি। আমি তোকে নিজে হাতে ভাত মেখে খাইয়ে দেব।”
“আমি এখন খাব না মা। আগে ঝামেলাটা মিটুক৷”
বীথি রানী বিরক্তি চেপে বলল,
“ঝামেলার কিছু নেই। তোর বউকে তো চিনিস। খুব সেয়ানা। এত সহজে চলে যাবে ভেবেছিস? কোথাও যাবে না দেখিস। মিছিমিছি তোকে ভয় দেখাচ্ছে।”

বিনয় মায়ের কথায় খুব একটা ভরসা পেল না। বীথি রানী একপ্রকার জোর করেই রুপুর সামনে দিয়ে বিনয়কে নিয়ে গেল। রুপু আনমনে হেসে ফেলল। এই সম্পর্কের বাঁধন থেকে বের হয়ে যেতে ওর যতটা খারাপ লাগবে ভেবেছিল। ততটা খারাপ লাগছে না। বরং শান্তি শান্তি লাগছে। বিনয় কী পারত না। তার মাকে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে ঘরে পাঠিয়ে রুপুর কাছে থাকতে। অন্ততকাল তো আর থাকতে হতো না। এই একটুখানি সময়ই তো মাত্র। বাস্তবতা খুবই কঠিন৷ বিনয়ের মতো ছেলেটা সহজে পাল্টায় না। এরা মায়ের আঁচলের তলায় থাকতে ভালোবাসে। মায়ের ভুলগুলো কখনো চোখে আঙুল দিয়ে ধরিয়ে দেয় না। বরং মায়ের ভুলকে ঠিক বলে প্রশ্রয় দেয়।
‘যে মেয়ে এদের মতো ছেলেদের ভালোবেসে গোটা একটা জীবন এদের সাথে থাকার সিদ্ধান্ত নেয়। সেই মেয়ের মতো দুঃখী মেয়ে এই পৃথিবীতে আর দুটো নেই।’

রুপু সারাঘর হেঁটে বেড়াল। আসবাবপত্র ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখল। কতগুলো মাস এই ঘরে ছিল রুপু। ঘরের প্রতি বড্ড মায়া পড়ে গেছে। রুপু ব্যালকনিতে গিয়ে দাঁড়াল। ব্যালকনির রেলিং ঘেঁষে দুটো জংলী কবুতর মনের আনন্দে গুটি গুটি পায়ে হেঁটে বেড়াচ্ছে। কখনো কখনো খাবার ভেবে ফুলগাছে ঠোকর দিচ্ছে। কখনোবা কবুতর তার সঙ্গীনির গায়ে ঠোঁট ঘষে দিচ্ছে। রুপু দুঃখ ভুলে কবুতর দুটির কাণ্ডকারখানা গভীর মনোযোগ দিয়ে দেখতে লাগল। কখন রুপুর চোখের কোণে বিন্দু বিন্দু জল জমলো। রুপু টেরই পেল না। রুপুর চোখের জল গাল বেয়ে ঝরে পড়তেই রুপু অবাক হয়ে গাল স্পর্শ করল। রুপু কী ইচ্ছে করলে এই সংসারটা টিকিয়ে রাখতে পারতো না? অবশ্যই পারতো। খুব ভালোভাবেই পারতো। কিন্তু বিনয়ের মতো মেরুদণ্ডহীন মানুষের সাথে সংসার করতে গেলে নিজের আত্মসম্মান পুরোপুরি বিসর্জন দিতে হতো। বিনয়ের মায়ের সাথে রুপুর প্রায় প্রতিদিন ঝগড়া লেগে থাকতো। এই যুক্তিতর্ক ঝগড়া করে ঠিক কতদিন সংসারটা টিকিয়ে রাখতে পারত রুপু? কতদিন?
শাশুড়ী যেমনই হোক। বিনয়টা যদি একটু বুদ্ধিমান হতো। কাকে কখন কোথায় কোন কথা বলতে হবে। এই বুঝটা যদি ওর থাকতো। মায়ের সামনে বউকে কিংবা বউয়ের সামনে মাকে ছোট করে যদি কথা না বলতো। তাহলে রুপুর যত কষ্টই হোক। ঠিকই সংসারটা টিকিয়ে রাখতো। বিনয়ের রুপুর প্রতি উদাসীনতা, একচোখোমুতে রুপু সত্যিই বড্ড হাঁপিয়ে উঠেছে।
বীথি রানী ঘণ্টাখানেক পরে বিনয়ের ঘরে এলো। রুপুকে বলল,

“তোমার বাবা এখনো আসছে না কেন, বলতো?”
“একবার বললাম তো।”
“তুমি কী সত্যিই চাকরির জন্য আলাদা থাকবে?”
“হুঁ।”
“অসম্ভব। আমার বিনয়ের বউ হয়ে থাকতে চাইলে তোমার চাকরির ভূত মাথা থেকে নামাতে হবে।”
“দুঃখিত। ভূতটা খুব ঘাড়ত্যাড়া। তাকে কিছুতেই মাথা থেকে নামানো সম্ভব না।”
“ভালো করে ভাবো। ভেবে বলো। তুমি একবার চাকরির ভূত মাথায় নিয়ে এই বাড়ির চৌকাঠ পার হলে আমি কিন্তু আমার বিনয়ের বউ বলে তোমাকে আর কখনো মানব না।”
“সে আপনার ইচ্ছে।”
“মেয়েমানুষের এত জেদ ভালো না।”
“তো কার জেদ ভালো? আপনার সোনার আংটি বাঁকা টাইপ বড় ছেলের মতো মানুষের?”
“তুমি বড্ড বেশি কথা বলো।”
“আপনিও।”

বীথি রানী রাগতে গিয়েও রাগ করল না। এখন কোনরকম রাগারাগি করা যাবে না। মাথা ঠাণ্ডা রাখতে হবে। রুপু বীথি রানীর মুখের দিকে তাকিয়ে মিষ্টি করে হাসল। রুপুর হাসি দেখে বীথি রানীর গা জ্বলে গেল। দাঁতে দাঁত চেপে নিজেকে সামলে নিল। রুপু আফসোস করে বলল,
“আপনাকে দেখে মাঝে মাঝে আমার খুব হিংসে হতো মা। আপনি কী সুন্দর ছক কষে সংসার করেন। নিজের বরকেও হাতের মুঠোয় রেখেছেন। আবার ছেলেকেও।”
“কী বলতে চাইছ তুমি?”
“বলতে তো কতকিছুই ইচ্ছে করে। যাইহোক আপনার ছেলে কোথায়?”
“ও শো-রুমে গেছে।”
রুপু বেশ অবাক হলো। রুপু ভেবেই নিয়েছিল, বিনয় আজকের দিকটা অন্তত রুপু পাশে থাকবে। নিজের ভাবনায় গড়মিল দেখে, রুপুর এখন নিজের উপরই ভীষণ বিরক্ত লাগছে। বীথি রানী কৈফিয়ত দেবার ভঙ্গিতে বলল,
“বিনয় যেতে চাচ্ছিল না। তুমি যে ভয় ওর মনে ঢুকিয়েছ। ছেলে তো আমার তোমাকে ছাড়া সবকিছু অন্ধকার দেখছে। অনেক বুঝিয়ে, তোমাকে আটকে রাখার ভরসা দিয়ে তারপর ওকে শো-রুমে পাঠাতে সক্ষম হয়েছি।”
“এত আয়োজন করে ওকে পাঠালেন কেন?”
“তোমার জন্য।”
“আমার জন্য?”
“হ্যাঁ। তুমি যদি ওর চোখের সামনে দিয়ে সত্যি সত্যি চলে যাও। ও সহ্য করতে পারবে না৷ কিংবা তোমাকে যেতেই দেবে না।”

“আমি চলে যাবার পরে ওকে কী জবাব দিবেন?”
“তখনকারটা তখন দেখা যাবে। ও আমাকে খুব বিশ্বাস করে। আমি যা বলব। ও তাই বিশ্বাস করে নেবে।”
“আমি চলে গেলে আপনি কী খুব খুশি হবেন?”
“খুশী হবো নাকি জানি না। তবে আমার ছেলের জন্য আমি আমার মনের মতো একটা বউ আনব।”
“আমাকেও তো আপনিই পছন্দ করে এনেছিলেন। পরে যদি এই বউও পছন্দ না হয়। তখন কী করবেন?”
বীথি রানী বিরক্ত চাপতে পারল না। কণ্ঠে রাগ ঢেলে বলল,
“পরেরটা পরে দেখা যাবে। তোমার যদি সত্যিই যাওয়ার ইচ্ছে থাকে। তোমাকে এখুনি যেতে হবে।”
“পাগল হয়েছেন? এই ফাঁকা বাড়ি থেকে আমি কাউকে কিছু না বলে চলে যাব। আর সেই সুযোগে আপনি আমার নামে চোরের অপবাদ দিবেন৷ ইচ্ছেমতো আমার নামে বদনাম করবেন। সেই সুযোগ আমি আপনাকে ভুলেও দেব না। বাবা আসুক। বাবার কাছে বিদায় নিয়ে তারপর ধীরেসুস্থে যাব।”
“জানতাম। তুমি এমনকিছুই বলবে। ভয় নেই। বিনয়ের বাবা আসছে।”
“চমৎকার। আপনার বুদ্ধিতে এই প্রথম মুগ্ধ হলাম। যাইহোক আপনি এখন যেতে পারেন। আমি একটু একা থাকতে চাচ্ছি।”

বীথি রানী দ্বিমত করল না। চলে গেল।
রুপুর ফোন বাজছে। অয়নের ফোন। রুপু ফোন রিসিভ করে বলল,
“কেমন আছো অয়ন?”
“ভালো আছি। তোমার কী অবস্থা?”
“আমার চাকরির ব্যাপারে মায়ের কাছে শুনেছ নিশ্চয়ই।”
“বউদি আমার একটা রিকুয়েষ্ট রাখবে?”
“বলো?”
“এইসব চাকরির ভূত মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলো বউদি৷”
“তারপর?”
“তারপর বিসিএস-এর জন্য প্রিপারেশন নাও। জীবনে সফল হতে গেলে ইগোটাকে একপাশে সরিয়ে রাখতে হবে।”
“আমার কোন ভাই নেই অয়ন। তোমাকে আমি ছোট ভাইয়ের মতো দেখি। তোমার এই ইচ্ছেটা আমি একদিন পূরণ করব অয়ন।”
“নয়টা-পাঁচটা ডিউটি করে তুমি পারবে না বউদি।”
“আমার মনের জোর সাঙ্ঘাতিক লেভেলের হাই। ইচ্ছেশক্তিও প্রচুর। এ-ই দুটো যখন আছে। চেষ্টা করতে ক্ষতি কী।”
“তারপরও তুমি দাদার সাথে সংসার করবে না?”
“আমাদের সংসারটা আদৌও হয়েছিল কী অয়ন?”
“হয়নি বলছ?”

“সংসারে স্বাদ পুরোপুরি গ্রহন করলে কী আর তোমার দাদাকে ছেড়ে চলে যাবার কথা ভাবতাম।”
অয়ন হতাশ হয়ে বলল,
“আমার দাদাটা এত বোকা কেন বউদি?”
“সে-তো নিজে ইচ্ছেতে বোকা হয়নি। তাকে বোকা করে রাখা হয়েছে।”
“তো তুমি চালাক বানাও।”
“আমার দ্বারা সম্ভব হবে না অয়ন। তবে মজার ব্যাপার কী জানো? আমি চলে গেলে তোমার দাদা এমনিতেই চালাক হয়ে যাবে।”
“তুমি থাকতে হলে ক্ষতি কী?”
“লাভ-ক্ষতির হিসেব নিয়ে এখন কথা বলতে ইচ্ছে করছে না অয়ন।”
অয়ন দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
“আমাদের কখনো ভু্লে যেওনা বউদি।”
“তোমার সাথে বাবার সাথে আমার দারুণ কিছু সুখস্মৃতি আছে। এই সুখস্মৃতিগুলো তোমাদের কখনো ভুলতে দেবে না। এখন রাখি কেমন! ভালো থেকো।”
“তুমিও ভালো থেকো বউদি।”

রুপু বীথি রানীর সামনে বসে পুনরায় ব্যাগ গোছাল। বিধান বাবুর দেওয়া চার ভরি গয়নাসহ বৌভাতের অনুষ্ঠানে রুপু যতটুকু স্বর্ণ উপহার পেয়েছিল। সবটুকু গয়না বুঝিয়ে দিল। শুধু নিজের বাবার দেওয়া তিনভরি গয়নার ভেতরে দুইভরি গয়না সাথে নিল। যে একভরি গয়না রুপুর শ্বশুরকে বিক্রি করতে দিয়েছিল রুপু। সেই গয়নার দাম বাবদ রুপুকে ডাবল পরিমাণ টাকা দিল বিধানবাবু। রুপু একটাকাও বেশি নিল না। গয়না বেচার টাকা রেখে বাকি টাকা শ্বশুরকে ফেরত দিয়ে দিল।
বিদায়বেলা বীথি রানী রুপুর সামনে এলো না। ঘরে গিয়ে বসে রইল। রুপুও আর দেখা করতে গেল না। শুধু শ্বশুরের পায়ে হাত রেখে প্রণাম করল। বিধানবাবু রুপুর মাথায় হাত রাখল। বলল,
“আমি তোকে মন ভরে আশীর্বাদ করি মা। আর আমি ওখানে সবরকম ব্যবস্থা করে রেখেছি। তোর যদি ইচ্ছে হয়..
“বাবা প্লিজ। এই ব্যাপারটা এখন থাক। ঠিকমতো ঔষধ খাবেন। আর এত সিগারেট খাবেন না-তো বাবা৷ আগে একটা দুটো খেলেও আমি কিন্তু খেয়াল করেছি। ইদানীং আপনি প্রচুর পরিমাণে স্মোক করেন।”
“সকালে বাপবেটি একসাথে ছাদে বসে চা খাওয়াটা খুব মিস করব রে মা৷” কথাটা বলতে বলতে বিধানবাবু চোখ মুছল।

রুপু অন্যদিকে তাকিয়ে রইল। এই বয়সে কান্না করা যতটা না লজ্জার। তার থেকেও বেশি লজ্জার কান্নার দৃশ্য কেউ দেখে ফেললে। এই অতি ভালো মানুষটাকে রুপুর লজ্জায় ফেলতে ইচ্ছে করল না।
রুপু ব্যাগপত্র নিয়ে যখন বাবার বাড়িতে পৌঁছাল। তখন দুপুরের কড়া রোদ সরে গিয়ে প্রকৃতিতে শীতল ছায়া বিরাজ করছে। কয়েকটা কাক কা কা করে গাছের ডাল থেকে আকাশে উড়ে গেল। রুমা মেয়েকে দেখে ভয়ে কেঁদে ফেলল। অনিন্দ্য রুপুর সামনে এসে দাঁড়াল। বেশ কড়া কণ্ঠে বলল,
“কার অনুমতি নিয়ে তুমি আমাদের কিছু না জানিয়ে শ্বশুরবাড়ি থেকে একা একা চলে এলে?”
এমনি সময় রুপুর বাবা রুপুর সাথে তুই তুই করে কথা বলে। যখন অতিরিক্ত রেগে যায়। তখনই শুধু তুমি তুমি করে কথা বলে। রুপু একটুও ঘাবড়াল না। অত্যন্ত স্বাভাবিক কণ্ঠে বলল,
“আমার খুব জল তেষ্টা পেয়েছে মা। এক গ্লাস ঠাণ্ডা জল দাও তো।”
“জল খেতে হলে তোমাকে শ্বশুরবাড়িতে গিয়েই জল খেতে হবে। ব্যাগ হাতে নাও। চলো আমি তোমাকে দিয়ে আসছি।”

রুপুর খুব ক্লান্ত লাগছে। বাবার কঠোরতার সাথে সেই ছোটবেলা থেকে পরিচিত রুপু। তারপরও আজ আর চুপ করে থাকতে ইচ্ছে করছে না। বাবাকে কঠিন কিছু কথা শুনিয়ে দিতে খুব ইচ্ছে করছে। রুপু নিজেকে সামলে নিল। বলল,
“আজকের রাতটাই শুধু এখানে থাকতে এসেছি বাবা। আগামীকাল ভোরেই চলে যাব।”
“আগামীকাল না৷ তুমি এখুনি যাবে। বরং আগামীকাল এসে তুমি একমাস থেকে যেও। আমি আপত্তি করব না।”
“আমি এখন ওই-বাড়িতে যেতে চাচ্ছি না বাবা।”
“তুমি যাবে। এখুনি আমার সাথে যাবে। আদৌও তারা তোমাকে ফেরত নেবে নাকি সেই গ্যারান্টি দিতে পারছি না। তবে যেভাবেই হোক আমি তোমাকে রেখে আসব। দরকার হলে তাদের পায়ে ধরব।”
রুপু বেশ চমকাল। তার এই বাবাকে বড্ড অচেনা লাগছে। কোথায় গেল বাবার সেই নীতি কথা, আদর্শ। মা জল হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। রুপুর হাতে জলের গ্লাসটা দেবার সাহস পাচ্ছে না। সারাটা জীবন রুপু নিজেকে খুব শক্ত মনের মানুষ ভাবতো। অথচ বাবা-মায়ের ব্যবহারে আজ এত কান্না পাচ্ছে। চিৎকার করে কাঁদতে পারলে যদি বুকের গুমোট বাঁধা ভাব একটুখানি কমতো। রুপু নিজেকে সামলে নিয়ে বলল,

“আমার দাঁড়িয়ে থাকতে খুব কষ্ট হচ্ছে বাবা।”
“দাঁড়িয়ে থাকতে কষ্ট হলে চলো যাই। রিশকায় উঠে আরাম করে বসবে। আশা করি, তোমার কষ্ট দূর হবে।”
রুমা বিড়বিড় করে বলল,
“এত কঠোর হইয়ো না। একটু নরম স্বরে কথা বলো। মেয়েটা আমার না বুঝে একটা ভুল নাহয় করেই ফেলেছে।”
“তুমি কোন কথা বলবে না রুপুর মা। যাও ঘরে যাও।”
রেগে গেলে মানুষটা অন্যরকম হয়ে যায়। তখন রুমার ভয় ভয় করে। রুপু বলল,
“বাবা আমার একটা চাকরি হয়েছে।”
রুপু ভেবেছিল বাবা খুব খুশি হবে। খুশি নাহলেও অবাক হবে খুব। বাবা খুশিও হলো না। অবাকও হলো না। কঠিন মুখে বলল,
“চাকরি পেয়েই কী বিনয়ের সাথে সেপারেশনের সিদ্ধান্ত নিলে তুমি? এতই সহজ ভাবো, তুমি এই দুনিয়াদারী। ঝোঁকের মাথায় এমন কিছু করো না রুপু। যার মাশুল সারাজীবন ভোগ করতে হয় তোমাকে।”
“আমার প্রচণ্ড মাথাব্যথা করছে বাবা।”
“দুঃখিত মাথা ব্যথার ঔষধ আমাদের ঘরে নেই। তবে বিনয়ের ঘরে থাকতে পারে। চলো খোঁজ নিয়ে দেখি।”
রুপু হাসিমুখে বলল,

“আমি আসছি বাবা।”
এই প্রথম অনিন্দ্য চমকে উঠল। বলল,
“আসছি মানে? কোথায় যাচ্ছ তুমি?”
“দেখি কোথায় যাওয়া যায়। তবে ভয় নেই তোমাদের ঘাড়ে চেপে বসব না।”
“আত্মীয়-স্বজনকে মুখ দেখাব কী করে আমি?
তোমার একটা ভুল সিদ্ধান্তের জন্য অথৈয়ের জীবনটাও পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যাবে। ওকে ভালো ঘরে বিয়েই দিতে পারব না৷”
“আমাকে নিয়ে যদি খুব বেশি সমস্যা সৃষ্টি হয়। সবাইকে বলো তোমার একটা মেয়ে মরে গেছে।”
রুমা ভীতু কণ্ঠে বলল,
“রুপু.. এসব কী বলছিস তুই?”
“আমি ঠিকই বলছি মা। আর একটা কথা। আমাকে বিয়ে দেবার সময় সাতভরি গয়না দেবার কথা বলে মাত্র তিনভরি গয়না দিয়েছিলে। সেই একই ভুল অথৈয়ের বেলায় করো না প্লিজ৷ কথার হুল যে কী বিষাক্ত মা..
মা তোমাদের একটা ছেলে সন্তান হয়নি দেখে তোমার খুব আফসোস ছিল। আর কখনো আফসোস করো না মা। আমি নিজেকে এমনভাবে প্রতিষ্ঠিত করব৷ তোমরা ছেলে হওয়ার দুঃখ একদিন ঠিকই ভুলে যাবে।”
অনিন্দ্য কড়া কণ্ঠে বলল,

“তোমার কামাই খাওয়ার আগে যেন আমাদের মৃত্যু হয়৷”
রুপু মনে মনে বলল,
“শুধু শিক্ষিতই হলে বাবা। আফসোস সুশিক্ষায় সুশিক্ষিত হতে পারলে না। অথচ তোমাকে নিয়ে একটা সময় পর্যন্ত আমি কী যে গর্ব করেছি। এখন ভাবতেও আমার আফসোস লাগে।”
রুপু একটা লোকাল বাসে উঠে বসল। অচেনা মফস্বলে কোথায় গিয়ে উঠবে রুপু? পৌঁছাতেও তো অনেক রাত হয়ে যাবে। রাতদুপুরে কে রুপুকে আশ্রয় দেবে? প্রচণ্ড জলের তেষ্টা পেয়েছে। বাবার সাথে অভিমান করে জল খাওয়া হয়নি। খিদেয় নাড়িভুড়ি উল্টে যাবার জোগাড় হয়েছে। আজ সারাদিনে শুধু এককাপ চা ছাড়া আর কিছুই খাওয়া হয়নি। চেনা রাস্তা ছেড়ে বাসটা অচেনা রাস্তায় ছুটে চলছে। চাপা কষ্টে রুপুর বুকের ভেতরে ব্যথা করতে লাগল। মাথায় নানান রকম দুশ্চিন্তায় আচ্ছন্ন হয়ে আছে।
বাসের হেল্পার যখন ভাড়া নিতে এলো। রুপু বলল,
“আমাকে এক বোতল জল কিনে দিতে পারবেন?”
হেল্পার আন্তরিক ভাবে বলল,
“কেন পারুম না। সামনের স্টেশানে বাস থামলেই কিনে দিমু। জলের সাথে কী আরকিছু লাগব দিদি?”
নিত্যন্ত গরীব ঘরের অল্পবয়সী একটা ছেলে। গায়ের রঙ কালো। হাড় জিরজিরে শরীর। ছেলেটার দিকে তাকালে বড় বড় চোখ আর সাদা ঝকঝকে দাঁতগুলো সবার প্রথমে নজর কাড়ে। এই ছেলেটার আন্তরিকতায় রুপু মুগ্ধ হয়ে গেল। বলল,

“এক প্যাকেট বিস্কুট দিলেই হবে।”
হেল্পার টাকা নিয়ে চলে গেল। মিনিট দশেক পরে জলের বোতল আর বিস্কুটের প্যাকেট রুপুকে ডেকে হাতে দিল। দশ টাকার একটা নোট রুপুর হাতে দিয়ে বলল,
“দিদি দশটাকা ফিরছে।”
“তুমি রেখে দাও।”
“না দিদি। এই টাকা আমি নিতে পারুম না।”
রুপু হেসে ফেলল। বলল,
“আচ্ছা তাহলে ফেরত দাও।”

রুপুর পাশে একজন মহিলা বসেছিল। মহিলা নেমে যেতেই বুড়ো মতো এক ভদ্রলোক এসে রুপুর পাশে বসল। লোকটার বসার ভঙ্গি অস্বাভাবিক। রুপুর খুব অস্বস্তি লাগছে। লোকটা ফোনে কথা বলতে বলতে রুপুর গায়ের উপরে ঢলে পড়ছে। এমনভাব করছে যেন ইচ্ছে করে পড়েনি। ভুলে হয়ে গেছে। বাইরে সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছে। সব আলো কেটে গিয়ে প্রকৃতির বুকে একটু একটু করে অন্ধকার নামছে। রাত যত গভীর হবে। অন্ধকার তত ঘনীভূত হবে।
লোকটা রুপুর বুকে কৌশলে হাত রাখতেই রুপু জমে গেল। সারাশরীর ঝাঁকুনি দিয়ে উঠল। ঘৃণায় গা গুলিয়ে উঠল। বমি পাচ্ছে খুব। অন্যমনস্ক থাকার জন্যই এমন হয়েছে। লোকটা রুপুর দিকে তাকিয়ে খুব নোংরা ইঙ্গিত করে জিহ্বা দিয়ে ঠোঁট চাটল। রুপুর শরীর রি রি করে উঠল। দম বন্ধ হয়ে আসছে।
ইচ্ছে করছে এই বুড়োর গালে কষিয়ে থাপ্পড় মারতে। রুপু নিরুপায় হয়ে বসে রইল। একে তো অচেনা জায়গা৷ তারউপরে রাত হয়ে গেছে। প্রমাণ ছাড়া এই লোককে থাপ্পড় মারা ঠিক হবে না।
লোকটা সুযোগ বুঝে আবারও রুপুর বুকে হাত রাখতে গিয়ে ব্যথায় কুঁকড়ে উঠল। রুপু ইচ্ছেমতো সেফটিপিন দিয়ে লোকটার হাত খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে জখম করে দিল।
আশেপাশের সবাই কৌতূহলী হয়ে লোকটার দিকে তাকাল। বলল,

“কী হয়েছে আপনার?”
লোকটা চট করে হাত লুকিয়ে ফেলল। হাসার চেষ্টা করে বলল,
“কিছু না।”
ঠিক তখনই রুপু ইচ্ছে করে লোকটার গা ভরে বমি করে দিল। লোকটা লজ্জায় ঘৃণায় মুখ বিকৃতি করে রুপুকে মনে মনে খুব খারাপ ভাষায় একটা গালি দিয়ে উঠে গেল। রুপু হেল্পারকে ডেকে পাশের সিটের ভাড়া দিয়ে দিল। গন্তব্যে পৌঁছানো পর্যন্ত এই দুটি সিট এখন শুধু রুপুর।
একের পর এক ফোন আসছে। কখনো বাবা ফোন করছে। কখনো মা। কখনো বিনয় আবার কখনোবা অথৈ। রুপুর এখন কারো সাথে কথা বলতে ইচ্ছে করছে না। ফোনটা সুইচঅফ করে রাখতে গিয়ে দেখল, বিনয়ের মা ফোন করেছে। অসময়ে ভদ্রমহিলার ফোন পেয়ে রুপু বেশ চমকাল। কৌতূহল চেপে রাখতে না পেরে ফোন রিসিভ করল। বীথি রানী অতিরিক্ত ভয় পাওয়া কণ্ঠে হড়বড় করে বলল,

রুপুর বিয়ে পর্ব ৩১

“হ্যালো..হ্যালো রুপু বলছ? তুমি কোথায় এখন? যেখানেই থাকো না কেন, শিগগিরই বাড়িতে চলে আসো। আমার বিনয়টা যেন কেমন করছে। আমি মা হয়ে ওর কষ্ট সহ্য করতে পারতেছি না। আমার অন্তর পুড়ে যাইতেছে। আমি হাতজোড় করে অনুরোধ করছি। তুমি এখুনি চলে আসো রুপু।”
কথাগুলো বলতে বলতে বীথি রানী সশব্দে কেঁদে ফেলল।

রুপুর বিয়ে পর্ব ৩৩

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here