রুপুর বিয়ে পর্ব ৩৩
Bobita Ray
এক অসহায় মায়ের আর্তনাদ কেন যেন আজ রুপুর হৃদয় স্পর্শ করতে পারল না। কী হয়েছে বিনয়ের? ভদ্রতা করে হলেও কথাটা জিজ্ঞেস করা উচিত ছিল। রুপুর ইচ্ছেই করল না। বীথি রানী মরিয়া হয়ে বলল,
“হ্যালো..হ্যালো রুপু, তুমি কী আমার কথা শুনতে পাচ্ছ?”
কোনরকম আবেগ না দেখিয়ে, রুপু চট করে ফোনের লাইন কেটে দিল।
রুপু যখন গন্তব্যে পৌঁছাল। তখন ঘড়িতে রাত নয়টা বেজে কুড়ি মিনিট৷ এতরাতে অচেনা জায়গায় এসে রুপুর একটু ভয় ভয় করছে৷ তবে ভয়কে মোটেও পাত্তা দিল না রুপু। ব্যাগপত্র নিয়ে সহজ স্বাভাবিক ভঙ্গিতে একটা রিকশায় উঠে বসল৷ রিকশাওয়ালা বলল,
“কোথায় যাইবেন?”
কোথায় যাবে রুপু সত্যিই বুঝতে পারছে না। রুপুর অফিসের ঠিকানা ছাড়া অন্যকোনো ঠিকানা জানা নেই। সেই অফিস কী এতরাতে খোলা থাকবে? আর থাকলেই কী রাতটা কাটানো যাবে? ঝোঁকের মাথায় এতরাতে এখানে আসা একদম উচিত হয়নি। রাতটা রুপুর কোন বান্ধবীর বাসায় থেকে গেলেই বরং ভালো হতো৷ রুপু রিকশাওয়ালাকে অফিসের ঠিকানা বলল। রিকশাওয়ালা বলল,
“ভাড়া কিন্তু ডাবল দিতে হইব।”
রুপু দ্বিমত করল না। বলল,
“কত দিতে হবে?”
“দুশো টাকা।”
“এত টাকা কেন?”
রিকশাওয়ালা উদাস কণ্ঠে বলল,
“টাকা দিলে যামু। না দিলে না যামু। এত কথার কারবার নাই।”
“আচ্ছা যান। দেখে চালাবেন।”
রুপুর অফিসে পৌঁছাতে মাত্র কুড়ি মিনিট লাগল। কুড়ি মিনিটের রাস্তায় লোকটা গুনে গুনে ২০০ টাকা ভাড়া নিল। অন্যসময় হলে লোকটাকে বেশ কড়া করে কয়েকটা কথা শোনানো যেত। এখন কোন কথা বলতে ইচ্ছে করছে না।
অফিস কোথায়! এতো উঁচু প্রচীরে ঘেরা সুন্দর দোতলা বাড়ি। বাড়ির সামনে রুপুদের অফিসের ব্যানার টাঙানো না থাকলে রুপু ধরতেই পারত না৷ এটা একটা অফিস। বাড়ির গেইটের সামনে দারোয়ানকে দেখে রুপু এগিয়ে গেল। বলল,
“এই অফিসে কী কেউ আছে?”
“আপনি কাকে চান?”
লোকটাকে কী রুপু বিপদের কথা বলে সাহায্য চাইবে? না, সরাসরি সাহায্য চাওয়া ঠিক হবে না। রুপু মনে মনে কথা গুছিয়ে নিল। বলল,
“এখানে আমার চাকরি হয়েছে। আমি এখানে আগে কখনো আসিনি। তাই ভাবলাম, চাকরিতে জয়েন করার কিছুদিন আগে গিয়ে দেখি। পরে ভাবলাম, চাকরি যখন হয়েই গেছে। এত দেখাদেখির কিছু নেই। ব্যাগপত্র নিয়ে সোজা চলে এলাম। রাস্তায় এমন জ্যামে পড়লাম। টানা পাঁচ ঘণ্টা জ্যামে বসে থেকে কানা রাতে এসে এখানে পৌঁছালাম৷ এসেই যে এমন বিপদে পড়ব। কল্পনাও করতে পারিনি। এখানে আমি তেমন কিছু চিনি না। এতরাতে কোথায় বাসা খুঁজব। কোথায় থাকব। বুঝতে না পেরে সরাসরি অফিসের সামনে চলে এসেছি।”
দারোয়ানের রুপুকে দেখে খুব মায়া হলো। নরম স্বরে বলল,
“এতরাতে একা একা আসা আপনার মোটেও উচিত হয়নাই। এই পোড়া দেশে শেয়াল-কুকুরের অভাব নাই। পথে যদি কোন বড় ধরনের বিপদ হইতো।”
উত্তরে রুপু হাসার চেষ্টা করল। দারোয়ান গেইট খুলে দিল। বলল,
“ভেতরে আসেন।”
রুপু ব্যাগপত্র নিয়ে গেইটের ভেতরে প্রবেশ করে মুগ্ধ হয়ে গেল। এত সুন্দর বাড়ি আগে কখনো রুপু দেখেছে নাকি সঠিক মনে পড়ছে না। এই বাড়ির মানুষ যে কী পরিমান শৌখিন ও রুচিশীল। তা এই বাড়িটা সচক্ষে না দেখলে কেউ বিশ্বাসই করবে না। বাড়ির একপাশে বিশাল ফুলের বাগান। বাগানে বাহারি রকমের ফুল ফুটে আছে। আরেকপাশে শানবাঁধানো পুকুর৷ পুকুরে অজস্র পদ্মফুল ও লাল শাপলাফুল ফুটে আছে। পুকুরের জলও স্বচ্ছ গাঢ় সবুজ।
দারোয়ান বলল,
“এই বাড়ির একতলার পুরোটা প্রকল্পের কাছে আগামী পাঁচ বছরের জন্য ভাড়া দেওয়া হইছে। আপনি মনে হয়, সেই প্রকল্পেই চাকরি পেয়েছেন।”
“এই বাড়িতে কোন মানুষ থাকে না?”
“একজন থাকে।”
“একজন মানে? কে থাকে?”
“এই বাড়ির মালকিন থাকে।”
“আর কেউ থাকে না?”
“আর কে থাকব? মালকিনের ছেলে-মেয়ে সব বিলেতে থাকে। আত্মীয়-স্বজন ঢাকা থাকে।
এই বাড়ির মালিক আর মালকিন শুধু এইখানে থাকতো। বছর তিনেক আগে এই বাড়ির মালিক রোগে শোকে ভুগে মারা গেছে। শুধু বৃদ্ধা মালকিন দুটো কাজের মেয়েকে নিয়ে এই বাড়িতে পড়ে আছে। ছেলে-মেয়েরা কতবার মালকিনকে নিয়ে যাইতে চাইছে। মালকিন এইদেশ ছেড়ে যাইতে রাজি হয় না। আপনি এইখানে দাঁড়ান। আমি বড়মার (মালকিন) সাথে কথা বলে আসি। দেখি, আপনার রাতটা থাকার একটা ব্যবস্থা করতে পারি নাকি।”
শানবাঁধানো পুকুরের সামনে যেতে রুপুর খুব ইচ্ছে করছিল। তবে গেল না। লোকটার কথামতো বাগানের একপাশে দাঁড়িয়ে রইল। মিনিট দশেক পরে দারোয়ান হাসি হাসি মুখে এসে বলল,
“ব্যাগপত্র আমার হাতে দেন। আর শিগগিরই চলুন বড়মা আপনাকে দেখার জন্য অস্থির হয়ে গেছে।”
রুপু অন্যদিকে তাকিয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। বিপদ কেটে গেছে। এখন আর আগের মতো ভয় করছে না। রুপু দারোয়ানের পিছু পিছু সোজা দোতালায় উঠে গেল। মেইন দরজা খোলাই ছিল। একজন ৬০/৬৫ বয়সী বৃদ্ধা মহিলা রুপুকে দেখে এগিয়ে এসে জড়িয়ে ধরল। খুশি খুশি গলায় বলল,
“দ্যাখো মেয়ের কাণ্ড। আমি তো বিমলের (দারোয়ান) মুখে তোমার কথাশুনে প্রচণ্ড অবাক হয়েছি। এইযুগের মেয়েরা যে কী সাহসী। তা কল্পনার করা যায় না। এসো এসো।”
রুপু বৃদ্ধাকে দেখে মুগ্ধ হয়ে গেল। এত বয়স হয়েছে হাতে লাঠি আর মাথায় ধবধবে পাকা-চুল না থাকলে বোঝার উপায় ছিল না। এখনো গায়ের রঙ দুধে-আলতা। কী সুন্দর চোখ-মুখ। কী তার অমায়িক ব্যবহার।
বৃদ্ধা রুপুর হাত ধরে সোফায় বসিয়ে দিল। নিজেও রুপুর পাশে বসল। আন্তরিক কণ্ঠে বলল,
“তুমি আমাকে ঠাম্মি বলে ডেকো কেমন? তোমার বয়সী আমার নাতি-নাতনি আছে। আমার খুব অল্প বয়সে বিয়ে হয়েছিল তো।”
কথাগুলো বলে বৃদ্ধা হেসে ফেলল। বলল,
“আমার কথায় মোটেও বিরক্ত বোধ করো না। আমি কথা বেশি বলতে ভালোবাসি। তা মেয়ে তোমার নাম কী?”
“রুপু।”
“বাহ খুব সুন্দর নাম তো। তোমার সাথে গল্প পরে করব। চলো তোমাকে থাকার ঘর দেখিয়ে দেই।”
রুপু ব্যাগপত্র হাতে নিয়ে উঠে দাঁড়াল। ঘরে যেতে যেতে খেয়াল করল। কাজের মেয়েদুটো খুব কৌতূহল নিয়ে রুপুকে দেখছে।
ঘরটা খুব সুন্দর পরিপাটি করে গোছানো। রুপুর খুব পছন্দ হলো। বৃদ্ধা বলল,
“রুপু, ওইদিকে বাথরুম। তুমি ফ্রেশ হলে ফ্রেশ হও। স্নান করলে স্নান করো। আমি ততক্ষণে দেখে আসি, তোমার খাবারের ব্যবস্থা কতদূর হলো।”
রুপু জলের কল ছেড়ে অনেকক্ষণ আনমনা হয়ে ঝর্ণার নিচে বসে রইল। চোখের জল আজ আর বাঁধ মানছে না। গা খুব ঘিনঘিন করছে। সাবান দিয়ে অনেকক্ষণ বুক ঘষেও কাজ হচ্ছে না। শরীরের ভেতরে রাগে, দুঃখে, ক্ষোভে, জেদে চিড়বিড় করছে।
রুপু স্নান করে খুব স্বাভাবিক ভাবে বাথরুম থেকে বের হলো। ঠাম্মি রুপুকে দেখে মিষ্টি করে হাসল। চিরচেনা ভঙ্গিতে বলল,
“খাবে চলো।”
রুপু দ্বিমত করল না। খেতে বসে বলল,
“এত খাবার কে খাবে?”
“তুমি খাবে। খাও তো। আমি মন ভরে দেখি।”
একা একা খেতে রুপুর খুব অস্বস্তি লাগছে। ঠাম্মি
রুপুর পাশে বসে মুগ্ধ চোখে রুপুর খাওয়া দেখছে। রুপু খেতে খেতে ভদ্রতা করে বলল,
“আপনি একটু কিছু খান।”
“আমি রাতে ভাত খাই না। রাত আটটায় দুটো রুটি খাই। আমার কাজের মেয়েদুটো শুধু রাতে ভাত খায়। ওদের খাওয়াও শেষ।”
রুপু গরম ধোঁয়া ওঠা ভাতে লেবু কচলে ডাল দিয়ে মেখে নিল। রুই মাছ ভাজা দিয়ে ডাল-ভাত খেতে গিয়ে মনে হলো; অমৃত খাচ্ছে।
ঠাম্মি বলল,
“তোমাকে ডাল-ভাত খেতে দিয়ে আমারই খারাপ লাগছে। কী করব বলো? আমার ঘরে বাসি খাওয়ার নিয়ম নেই। কোনকিছু রান্না করা ছিল না। তোমাকে দেখে মনে হলো, তুমি প্রচণ্ড ক্ষুধার্ত। তাই মিনতিকে শটকার্টে ডাল-ভাত রান্না করতে বললাম। আর সাথে দুই পিস মাছ ভেজে দিতে বললাম।”
এই অচেনা মানুষটার আন্তরিক ব্যবহারে রুপুর চোখে জল এসে যাচ্ছে। নিজেকে সামলে নিয়ে বলল,
“খুব ভালো করেছেন। এত তৃপ্তি করে বহুদিন খাই না।”
ঠাম্মি ঘড়ি দেখে বলল,
“আমার ঘুমানোর সময় হয়ে গেছে। তুমিও খেয়ে ঘুমাতে যাও। বেঁচে থাকলে তোমার সাথে সকালে গল্প করব।”
সত্যিই ঘুমে রুপুর দুচোখ জড়িয়ে আসছিল। ঠাম্মির ব্যবহারে রীতিমতো মুগ্ধ রুপু। অন্যকেউ হলে যতরাতই হোক। রুপুকে গোটে গোটে সবকিছু জিজ্ঞেস করতো। তারপর ঘুমাতে যেতে বলতো।
রাতে অথৈ ফোন দিয়ে কেঁদে ফেলল। বলল,
“তোর কী হয়েছে দিদি?”
রুপু দায়সারা ভাবে বলল,
“কী হবে, কিছুই হয়নি।”
“তুই এখন কোথায়? বাবা প্রচণ্ড ভয় পেয়েছে। তোর চিন্তায় অস্থির হয়ে আছে। মা খুব কাঁদছে।”
“আমার জন্য অস্থির হওয়ার কিছু নেই। বাবা-মাকে আমার জন্য চিন্তা করতে মানা কর।”
“তুই এখন কোথায় আছিস? বলনা, প্লিজ দিদি।”
“অথৈ আমার প্রচণ্ড ঘুম পেয়েছে। আমি এখন ফোন রাখছি।”
“ফোন রাখিস না দিদি। তোকে খুব দরকারি একটা কথা বলার জন্য ফোন করেছি।”
রুপুর ঠোঁটের কোণে হাসি খেলে গেল। বলল,
“তোর দরকারি কথাটা আমি বোধহয় জানি অথৈ।”
“জামাইবাবু হাসপাতালে দিদি।”
রুপু কী খুব অল্প সময়ের জন্য চমকে উঠল? উঠল বোধহয়। চট করে নিজেকে সামলে নিয়ে স্বাভাবিক কণ্ঠে বলল,
“অসুখ হয়েছে। ঠিকমতো ঔষধ খেলেই সেরে যাবে। এত আপসেট হবার কিছু নেই।”
“তোর চলে যাবার শোক সইতে না পেরে মানুষটা অসুস্থ হয়ে পড়েছে। জামাইবাবু নাকি তার মায়ের সাথে রীতিমতো পাগলামি করছিল। তোর তাকে ছেড়ে যাওয়া সে কিছুতেই মেনে নিতে পারেনি। তোর কী মানুষটার জন্য একটুও খারাপ লাগছে না দিদি?”
রুপুর বিয়ে পর্ব ৩২
“না, খারাপ লাগছে না৷”
“তুই এত নির্দয় কেন দিদি?”
“কোমলমতী হয়েই বা কী হতো। সেই তো তোর মতো অন্যের দুঃখে কাঁদতে হতো।”
রুপু ফোনে কথা বলতে বলতে গভীর ঘুমে তলিয়ে গেল। কিংবা গভীর ঘুমের ভান করল। অথৈ হ্যালো হ্যালো করে একসময় অধৈর্য হয়ে ফোনের লাইন কেটে দিল।
