Home রুপুর বিয়ে রুপুর বিয়ে পর্ব ৩৪

রুপুর বিয়ে পর্ব ৩৪

রুপুর বিয়ে পর্ব ৩৪
Bobita Ray

খুব ভোরে রুপুর ঘুম ভাঙল। ঘুম থেকে উঠে জানালার পাশে দাঁড়াতেই রুপু মুগ্ধ হয়ে গেল। সবুজ স্বচ্ছ জলে পদ্মফুলের গা ঘেঁষে একফালি মিঠে রোদ পুকুরে পড়েছে। আকাশের সূর্যটা জলের গায়ে মিশে মনের সুখে নাচানাচি করছে। পাখির কিচিরমিচির-এ চারপাশ মুখোরিত। এত সুন্দর মনোমুগ্ধকর পরিবেশ দেখে, রুপুর মনটা নিমিষেই ভালো হয়ে গেল। এখন এককাপ চা পেলে মন্দ হতো না।
কে যেন দরজায় কড়া নাড়ছে।
রুপু দরজা খুলে দিল। দেখল, দরজার ওপাশে ঠাম্মি হাসিমুখে দাঁড়িয়ে আছে। ঠাম্মিকে দেখে রুপুর মুখেও হাসি ফুটে উঠল। বিনয়ী কণ্ঠে বলল,

“ঘরে আসুন ঠাম্মি।”
“এখন ঘরে আসব না। তুমি চটজলদি হাত-মুখ ধুয়ে পুকুর পাড়ে এসো।”
রুপু পুকুর পাড়ে গিয়ে দেখল, ঠাম্মি কিশোরী মেয়েদের মতো জলে পা ডুবিয়ে বসে বসে মনের সুখে চা খাচ্ছে৷ রুপুও ঠাম্মির পাশে গিয়ে বসল। ঠাম্মি বলল,
“জলে পা ডুবিয়ে বসো রুপু।”
রুপু জলে পা ডোবাতেই চমকে উঠল।
তড়িঘড়ি করে পা তুলে বসল। রুপুর ভীতু মুখের দিকে তাকিয়ে ঠাম্মি হেসে ফেলল। বলল,
“ভয় পেও না। মাছে তোমার পা ঠুকরচ্ছে।”
প্রথমবার একটু ভয় ভয় করলেও এখন রুপুর বেশ আনন্দ লাগছে। মাছগুলো খাবার ভেবে রুপুর পা কুটুস কুটুস করে ঠুকরে দিচ্ছে। ঠাম্মি ফ্লাক্স থেকে চা ঢেলে চায়ের কাপটা রুপুর হাতে তুলে দিল। রুপু চায়ে চুমুক দিয়ে আবেশে দুচোখ বুঁজে ফেলল। এত চমৎকার সকাল বহুদিন উপভোগ করা হয়নি। ঠাম্মি বলল,
“গতকাল রাতে এত ক্লান্ত ছিলে তুমি। তোমার সাথে তো ভালো করে আলাপই করতে পারলাম না। বাড়িতে কে কে আছে তোমার?”

যে মানুষটা আয়োজন করে রুপুকে এত সুন্দর সকাল উপহার দিয়েছে। বিপদের সময় আশ্রয় দিয়েছে। কেন যেন সেই মানুষটার কাছ থেকে আজ আর কোনকিছু লুকাতে ইচ্ছে করল না। তাছাড়া মনের গোপন কুঠুরিতে কথা চেপে রাখতে রাখতে রুপু বড্ড হাঁপিয়ে উঠেছে। মন অস্থির হয়ে আছে। বুকের ভেতরে গুমোট বেঁধে আছে। মানসিক শান্তির জন্য হলেও কথাগুলো কাউকে না কাউকে একসময় বলতেই হতো।
রুপু সংক্ষেপে ঠাম্মিকে সবকিছু খুলে বলল। সবশুনে ঠাম্মি দীর্ঘশ্বাস ফেলল। আনমনা হয়ে বলল,
“বাবা-মায়েরা সবসময় সন্তানের ভালো করতে গিয়ে সন্তানের সবচেয়ে বড় ক্ষতিই কেন করে বলোতো, রুপু?’’
রুপু উদাস হয়ে বলল,
“আমি জানি না ঠাম্মি।”
“তোমার কথাশুনে বা কর্মকাণ্ডে মনে হচ্ছে, তুমি খুব স্বাধীন চেতনার মেয়ে। তারপরও আমার একটা অনুরোধ রাখবে?”
রুপু হালকা হাসার চেষ্টা করে বলল,

“রাখার মতো কথা হলে অবশ্যই রাখব ঠাম্মি।”
তারপরও ঠাম্মি ইতস্তত করতে লাগল। বলল,
“তুমি একা মানুষ। কোথায় কোন বিপদ ওঁৎ পেতে আছে। সে-তো আমি বা তুমি কেউ জানি না।
তোমার বাসা ভাড়া করে থাকার দরকার নেই। তুমি বরং আমার কাছে থেকেই চাকরি করো। আসলে আমি একা একা থাকতে থাকতে বড্ড হাঁপিয়ে উঠেছি। আমার ছেলে-মেয়েরা প্রচুর ব্যস্ত। তাদের সব কাজের সময় হলেও শুধু মায়ের সাথে প্রতিদিন দশ মিনিটের জায়গায় একঘণ্টা কথা বলার বড্ড সময়ের অভাব। প্রতিদিন চাতক পাখির মতো অপেক্ষা করে থাকি। কখন আমার ছেলে-মেয়েরা ফোন করে আমার সাথে কথা বলবে। কত অপেক্ষা কত উত্তেজনা। অথচ যখন ওরা আয়োজন করে ফোন দেয়। হ্যালো বলার পরেই মনে হয়, দশ মিনিট শেষ হয়ে যায়। আমার একটা কথা বলার মানুষ নেই। আমার একটা গল্প করার সঙ্গী নেই।”

রুপু মেঘ না চাইতেই জল পেয়ে গেল। তবে রুপু কারো দয়ায় বা করুণায় থাকতে চায় না। কারো আশ্রিতা হয়ে তো আরও না। ঠাম্মিকে দুটো শর্ত জুড়ে দিল রুপু। শর্ত দুটো যদি ঠাম্মি মানে তাহলে অবশ্যই রুপু এখানে থাকবে। রুপুর প্রথম শর্ত হলো: রুপু এই বাড়িতে বিনে পয়সায় থাকবে না। রুপুর কাছ থেকে প্রতিমাসে ঘর ভাড়া বাবদ টাকা নিতে হবে। আর দ্বিতীয় শর্ত হলো; রুপু নিজের খাবার নিজে রান্না করে খাবে। ঠাম্মির দুটোর একটা শর্তও মানার ইচ্ছে ছিল না। নিজের প্রয়োজনে রুপুকে এই বাড়িতে রাখতে চেয়েছিল ঠাম্মি। রুপুর জেদ কিংবা দৃঢ়তার কাছে ঠাম্মিকে হার মানতেই হলো। থাকুক রুপু ঘর ভাড়া দিয়েই। তবুও দিনশেষে ঠাম্মির সাথে গল্প করার কিংবা ঠাম্মির বিপদে পাশে থাকার মতো একজন মানুষ তো থাকুক।
রুপু বিমল কাকাকে (দারোয়ান) সাথে নিয়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় সব জিনিসপত্র একে একে কিনে ফেলল। ঠাম্মির কাছ থেকে রুপু যে ঘর ভাড়া নিয়েছে। সেই ঘরটাও রুপু নিজের মনের মতো করে সাজিয়ে নিল। যদিও ঘরে আগে থেকেই আসবাবপত্র ছিল।

রুপুর বাবার বাড়ি শ্বশুরবাড়ি থেকে ঘন ঘন ফোন আসছে। রুপুর এখন আর কারো সাথে কথা বলতে ইচ্ছে করছে না। রুপু ফোন সুইচড অফ করে নিজের মতো করে দুতিন-দিন কাটাল।
যেসকল নারীরা প্রকল্পে প্রশিক্ষণ নেবে। আজ তাদের ইন্টারভিউ। ইন্টারভিউে হাতে গোনা কয়েকজন শুধু বাদ পড়ে। তাছাড়া সবাই টিকে যায়। আগামীকাল থেকে নিয়মিত ক্লাস শুরু হবে। একতলায় মোট ছয়টা কক্ষ। পাঁচটা কক্ষে মোট আড়াইশো নারী প্রশিক্ষণ নেবে। প্রতিটা কক্ষে পঞ্চাশ জন করে নারী বিভিন্ন ট্রেডের উপরে প্রশিক্ষণ নেবে। একসাথে পঞ্চাশ জনের জায়গা হবে না দেখে, প্রতিটা কক্ষে পঁচিশটা করে চেয়ার পাতা হয়েছে। সকাল দশটা থেকে দুপুর একটা পর্যন্ত পঁচিশ জন নারী একসাথে বসে ক্লাস করবে। এবং দুপুর দুটো থেকে বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত পঁচিশ জন নারী ক্লাস করবে। আর একটা কক্ষে বড় স্যার সহ রুপুরা মোট পাঁচজন ট্রেইনার বসবে।
রুপু আজ খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠে স্নান করে পাটভাঙা শাড়ি পরল। হালকা সাজগোছ করে অফিসে চলে এলো। একে একে আরও তিন ম্যাম ও একজন স্যার এসে পৌঁছেছে। সবার সাথে রুপুর পরিচয় হলো। বড় স্যার এখনো এসে পৌঁছায়নি। খুব শীঘ্রই চলে আসবে। গতকাল দপ্তরিও চলে এসেছে। দপ্তরি ছেলেটার নাম হাবিব। অল্প বয়স। তবে কাজ করে রকেটের গতিতে। এসেই কাজে লেগে পড়েছে। প্রকল্পের প্রতিটা কক্ষ ঝেড়ে মুছে ঝকঝকে চকচকে করে ফেলেছে। চেয়ার-টেবিল থরে থরে সাজিয়ে বেলুন-টেলুন দিয়ে সাজিয়ে হুলস্থুল কাণ্ড করে ফেলেছে৷ সাথে অবশ্য রুপু ও বিমল কাকাও ছিল।

বিজনেস ম্যানেজমেন্টের অ্যান্ড ই-কমার্স ম্যামের নাম রুনা আক্তার। খুব হাসিখুশি ও প্রাণবন্ত মানুষ৷ রুনা ম্যাম বিবাহিত। দুই বাচ্চার মা।
ফ্যাশন ডিজাইন ম্যামের নাম লাবনী ঘোষ। ম্যামের বিয়ের একমাসের মাথায় হাসবেন্ড বাইক এক্সিডেন্ট করে মারা গেছে। সেই ঘটনার প্রায় সাত বছর হতে চলল। ম্যাম আর বিয়ে করেনি। বাবার বাড়িতে থেকে চাকরি করছে।
ইন্টেরিয়র অ্যান্ড ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট স্যারের নাম আয়নাল মিয়া। স্যারের দুই মেয়ে। মেয়েদের বিয়ে হয়ে গেছে।
ক্যাটারিং বা খাদ্য ব্যবস্থাপনায় রুপু ক্লাস করাবে।
বিউটিফিকেশনের ম্যামের নাম রেবেকা আক্তার৷ রেবেকা ম্যাম খুব আন্তরিক ও হাসিখুশি একজন মানুষ। ম্যামের বিয়ের উপযুক্ত একটা মেয়ে আছে। ওনার হাজবেন্ড আরেকটা বিয়ে করে সংসার পেতেছে। সেই ঘরে দুটো ছেলে-মেয়ে হয়েছে। রেবেকা ম্যামের মেয়ের জন্য ওনাদের এখনো ডিভোর্স হয়নি। যদিও ওনার সাথে কোনরকম যোগাযোগ নেই। শুধু মেয়ের সাথে ভদ্রলোক যোগাযোগ রেখেছে।
আর বড় স্যারের নাম ঈশান মজুমদার। ভদ্রলোক অবিবাহিত। ২৯/৩০-এর উপরে বয়স হবে না। পড়াশোনা শেষ করে একটা বেসরকারি ব্যাংকে কিছুদিন চাকরি করেছে। ব্যাংকের চাকরিটা তার পছন্দ হয়নি দেখে, ছেড়ে দিয়ে এই চাকরিতে জয়েন করেছে। পাশাপাশি চাকরির পড়া পড়ছে।

ইন্টারভিউ পর্ব বেশ ভালোভাবেই সম্পূর্ণ হয়েছে। সন্ধ্যা ছটা বাজে। রুপুর ট্রেডে যে পঞ্চাশ জন মহিলা টিকেছে। তাদের নাম ঠিকানা ফোন নম্বর রুপুর সামনে একটা খাতায় লেখা। এখন একে একে সবাইকে ফোন করে আগামীকাল ক্লাসে জয়েন করার কথা বলতে হবে। রুপুর একে একে সবাইকে ফোন দিয়ে আগামীকাল ক্লাসে জয়েন করার কথা বলতে বেশ আনন্দ লাগছে। রুপুর মাধ্যমে মেয়েরা যদি কিঞ্চিৎ পরিমাণ কিছু শিখেও স্বাবলম্বী হতে চায়। তাহলে রুপুর নিজেকে ধন্য মনে হবে। ঠাম্মি এসে রুপুর পাশে নিঃশব্দে বসল। রুপু একেক পর এক ফোনকল করে কথা বলছে। আবার কিছু নম্বর বন্ধ দেখাচ্ছে। ঠাম্মি বলল,
“চাকরিটা কেমন লাগছে তোমার?”
রুপুর চোখে উচ্ছ্বাস। মুখটা হাসি হাসি। বলল,
“বেশ লাগছে।”
“তোমার কী ধারণা মেয়েগুলো স্বাবলম্বী হবার জন্য এখানে প্রশিক্ষণ নিতে আসছে?”
রুপু কিছু বলল না। ঠাম্মি বলল,

“প্রশিক্ষণ নিতে না ছাই। খেয়াল করে দেখেছ, বেশির ভাগ মেয়েগুলো আশেপাশের গ্রাম থেকে আসছে। এদের বয়স মাঝামাঝি। এরা গৃহিণী। এদের স্বাবলম্বী হবার কোন ইচ্ছে নেই। তোমাদের প্রকল্প ৮০ দিনের প্রশিক্ষণ করানোর বিনিময়ে প্রতিটা মেয়েকে একসাথে বারো হাজার টাকা ভাতা দেবে। সেই টাকার লোভেই মূলত মেয়েগুলো আসছে। তিনঘণ্টা বসে থেকে যদি বারো হাজার টাকা পাওয়া যায় খারাপ কী।”
রুপু এবারও কিছু বলল না। ঠাম্মি বলল,
“এই রুপু চা খাবে?”
“এখন চা খেতে ইচ্ছে করছে না।”
“একটু খাও। ভালো লাগবে।”
রুপু অনিচ্ছা সত্ত্বেও চায়ের কাপ হাতে নিল। চায়ে চুমুক দিয়ে রুপুর সত্যি সত্যি ভালো লাগছে। ঠাম্মি বলল,
“তোমার ক্যাটারিং-এর জিনিসপত্র কেনার জন্য কতটাকা দিল?”
“আমি সঠিক জানি না। বড় স্যার জানে।”
“সব জিনিস কেনা হয়ে গেছে?”
“হয়েছে। অল্পকিছু বাকি আছে।”

“একটু বুদ্ধি করে মেয়েগুলোকে ক্লাস করাবে রুপু। তাই দেখবে তোমার বাজার খরচটা বেছে যাচ্ছে।”
রুপু এবারও কিছু বলল না। রুপুর খুব ইচ্ছে ছিল। প্রতিদিন যাই রান্না করবে মেয়েগুলোকে একটু একটু করে খেতে দেবে। এটা বোধহয় সম্ভব না। কারণ সব স্যার ম্যামকে দেবার পরে এতগুলো মেয়েকে দেবার মতো সত্যিই কী কিছু থাকবে। রুপু দীর্ঘশ্বাস ফেলে ফোন করায় মনোযোগ দিল।
প্রথমদিন ক্লাসে গিয়ে রুপু প্রচণ্ড অবাক হলো। এরা সবাই এলোমেলো হয়ে বসে এমন জোরে জোরে কথা বলছে আর হাসাহাসি করছে। মনে হচ্ছে এটা কোন ক্লাস না। মাছের বাজার। কিংবা ছোটদের ক্লাস। আজকাল বোধহয় ছোটটাও এত হৈচৈ করে না। রুপুকে দেখে অবশ্য মেয়েগুলো চুপ করল। রুপু আন্তরিক ভাবে বলল,
“কেমন আছেন সবাই?”

মেয়েগুলো উঠে দাঁড়াল। চিৎকার করে বলল,
“ভালো আছি। আপনি কেমন আছেন ম্যাডাম?”
রুপু হেসে ফেলল। বলল,
“এভাবে চিৎকার করে বলতে হয় নাকি? এরপর থেকে ভদ্রভাবে আস্তে করে বলবেন।”
“আচ্ছা ম্যাডাম।”
“আপনারা প্লিজ দাঁড়িয়ে থাকবেন না। যার যার সিটে বসুন।”
সবাই বসল। রুপু বলল,
“আজ যেহেতু প্রথমদিন। আমরা প্রথমেই পরিচয় পর্বটা সেরে নেই। আমি রুপু। শিক্ষাগত যোগ্যতা…
রুপু নিজের পরিচয় দিল। তারপর সবাইকে নাম ঠিকানা শিক্ষাগত যোগ্যতা জিজ্ঞেস করল। পরিচয় পর্ব শেষ করে বলল,

“এখানে আপনারা যারা আছেন। সবাই কী বিবাহিত?”
কিছু মেয়ে না বলল। রুপু বলল,
“বিবাহিত কে কে হাত তুলুন তো?”
১৮/১৯ জন মেয়ে একসাথে হাত তুলল।
“প্রায় সবাই বিবাহিত। আচ্ছা আপনারা কী কেউ কিছু করেন?”
“না ম্যাডাম।”
শুধু স্টুডেন্ট মেয়ে ৬ জনের ভেতরে চারজন বলল, তিনজন টিউশনি করে। আর একজন কোচিং সেন্টারে পড়ায়।
“বাহ চমৎকার। তবে সংখ্যাটা খুবই কম। আমাদের সবাইকেই কিছু না কিছু করতে হবে। চাকরিই যে করতে হবে। এমন কোন কথা নেই। আপনারা ঘরে বসেই কিছু না কিছু করার চেষ্টা করবেন। এখানে উপস্থিত প্রায় প্রত্যেকটা মেয়ে বিবাহিত এবং গৃহিণী। আপনারা ভোরে উঠে রাত দশটা পর্যন্ত বিরতিহীন সংসারের কাজ করেন। তারপরও আপনাদের শুনতে হয়। কী করেন সারাদিন। সেই-তো শুয়ে-বসে খান। ঠিকমতো বাচ্চা মানুষ করতে পারেন না। যত ভুল যত ব্যর্থতা। অলিখিত ভাবে আপনাদের ঘাড়েই চাপিয়ে দেওয়া হয়। একটা শখের জিনিস কিনতে গেলেও বরের কাছে হাত পেতে টাকা চাইতে হয়। যাদের ভাগ্য ভালো। তারা সহজেই পেয়ে যায়। আবার যাদের ভাগ্য খারাপ। তাদের টাকা তো দেয়ই না। উল্টো কটুকথা শুনতে হয়। টাকা কামানোর মুরোদ নেই। ভাঙার উস্তাদ। অলক্ষ্মী। এই ধরনের আরও কতকথা। অথচ যদি সংসারের পাশাপাশি নিজে ইনকাম করতেন। পরিমাণে অল্প হোক। তবুও নিজের উপার্জনের একটা রাস্তা থাকতো। এই মানুষগুলোই আপনার সাথে নরম স্বরে কথা বলতো। পেছনে বদনাম করলেও সামনে ভালো ব্যবহার করতো। সবচেয়ে বড় কথা সম্মান না করলেও কখনো অসম্মান করতো না। আপনারা সবাই মনে জেদ আর সাহস রাখবেন। যারা গ্রামে থাকেন। তারা হাঁস, মুরগি কিংবা গরু ছাগল পুষবেন। আবার যারা মফস্বলে থাকেন। তারা এখান থেকে কোর্স কম্পিলিট করে অনলাইন অফলাইনে যেকোনো একটা বিজনেস করবেন। এখন হোম মেড খাবারের কিন্তু প্রচুর চাহিদা। আপনাদের সবার হাতেই কমবেশি স্মার্টফোন আছে। এই ফোনটাকেও কিন্তু আপনারা কাজে লাগাতে পারেন। একটা পেইজ খুলে নিবেন। তারপর অল্প পুঁজি দিয়ে হোম মেড খাবার কিংবা বেকিং শুরু করবেন। কী আমার কথা শুনতে কী কারো বিরক্ত লাগছে?”
সবাই মন্ত্রমুগ্ধের মতো রুপুর কথা শুনছিল। সবাই একসাথে বলল,

“বিরক্ত লাগছে না ম্যাডাম। শুনতে খুব ভালো লাগছে।”
রুপুর চাকরি জীবন বেশ কাটছে। প্রতিদিন একটা করে খাবারের আইটেম রান্না করা শেখানোর পাশাপাশি কীভাবে অল্প পুঁজি দিয়ে ব্যবসা শুরু করতে হবে। সেগুলোও খুব দক্ষভাবে শেখাচ্ছে রুপু। একজন মহিলা রুপুর কথায় প্রবাহিত হয়ে নিজের জমানো টাকা দিয়ে প্রায় বিশটা ছোট ছোট হাঁসের বাচ্চা কিনে ফেলেছে। কথাটা শুনে রুপুর এত ভালো লেগেছে।
রুপুর চাকরি জীবনের এগারো দিনের মাথায় এক বিষণ্ন বিকেলে বিনয় এসে উপস্থিত হলো। রুপু তখন ক্লাস নিচ্ছিল। আর একটু পরেই ছুটি হয়ে যাবে। রুপু তখনো জানে না। বাইরে বিনয় রুপুর জন্য চাতকপাখির মতো মরিয়া হয়ে অপেক্ষা করছে। অফিস ছুটির পর রুপু দোতলায় যাওয়ার জন্য প্রথম সিঁড়িতে পা রাখতেই সেই চিরচেনা কন্ঠস্বর শুনতে পেল। বিনয় ব্যাকুল হয়ে ডাকল।

“রুপু..?”
রুপু চমকে উঠে পেছন ফিরে বিস্ময়ঝরা চোখে তাকাল। এই বিনয়কে রুপু চিনতে পারছে না। শরীর শুকিয়ে গেছে। রাত জাগতে জাগতে চোখের নিচে ঘন কালির স্তর পড়েছে। মাথার চুলগুলো উসকোখুসকো।
বিনয় দৌড়ে এসে আচমকা শরীরের সর্বশক্তি দিয়ে রুপুকে জাপ্টে ধরল। রুপুর পা জোড়া বরফের মতো জমে গেল। নড়তে পর্যন্ত পারল না। বিনয় রুপুকে জড়িয়ে ধরে ব্যাকুল হয়ে কাঁদছে। রুপুর ভেতরে কোনরকম ভাবান্তর হলো না। শুধু বিড়বিড় করে বলল,

রুপুর বিয়ে পর্ব ৩৩

“তুমি কখন এলে?”
“অনেক.. অনেকক্ষণ এসেছি রুপু।” বিনয় কান্নার দমকে কোন কথা বলতে পারছে না।
“তোমার সাথে আর কেউ আসেনি?”
বিনয় হাসার চেষ্টা করল। রুপুকে ছেড়ে দিয়ে উল্টো হাতে চোখের জল মুছে চাপা কণ্ঠে ফিসফিস করে বলল,
“আমি বাড়ি থেকে পালিয়ে এসেছি রুপু।”

রুপুর বিয়ে পর্ব ৩৫

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here