রুপুর বিয়ে পর্ব ৩১
Bobita Ray
বীথি রানীর চিৎকার-চেঁচামেচিতে রুপুর ঘুম ভাঙল। রুপু কাঁচা ঘুম ভেঙে ধড়ফড়িয়ে উঠে বসল। মাথা ভো ভো করছে। মস্তিষ্ক সচল হতে কয়েক সেকেন্ড সময় লাগল। আশেপাশে তাকিয়ে দেখল, ঘরে বিনয় নেই। রুপু দীর্ঘশ্বাস ফেলল৷ বিছানা পরিপাটি করে গুছিয়ে ঘর ঝাড়ু দিল। তারপর সময় নিয়ে দাঁত ব্রাশ করে স্নান করল। এখন এককাপ চা না খেলে চলবেই না। বড্ড আলসেমি লাগছে। বসার ঘর ডিঙিয়ে রান্নাঘরে যেতে ইচ্ছে করছে না। ঘরে চুপচাপ বসে থাকতেও ভালো লাগছে না। এমনিদিন স্নান করে সিঁথিভর্তি করে সিঁদুর পরে রুপু। আজ সিঁদুর পরতে নিয়ে কী মনে করে যেন সিঁদুরের কৌটা রেখে দিল।
বিনয় সাত-সকালেই মায়ের কাছে রুপুর ব্যাপারে সবকিছু বলে দিয়েছে। তার জের ধরেই বীথি রানী রুপুর গুষ্টি ধুয়ে দিচ্ছে। চিৎকার-চেঁচামেচি করছে খুব।
রুপুর কোনরকম মানসিক প্রস্তুতি ছিল না। আরেকটু সময় পেলে ভালো হতো। রুপু যতটুকু সময় পেল, মনে মনে নিজেকে গুছিয়ে নিল। তারপর খুব স্বাভাবিক ভাবে ঘরের বাইরে পা রাখল। বসার ঘরে গিয়ে দেখল,
বিনয় মাথানিচু করে সোফায় বসে আছে। শাশুড়ীমা ছেলের মাথায় খুব যত্ন করে তেল ঠেসে দিচ্ছে আর আপনমনে গজগজ করছে। পাশেই রুপুর শ্বশুর চিন্তিত মুখে টিভির রিমোট হাতে নিয়ে বসে আছে।
রুপুকে দেখে বীথি রানী তেলেবেগুনে জ্বলে উঠল। জোর গলায় বলল,
“নবাবের বেটির এতক্ষণে ঘুম ভেঙেছে। এই তোমার কী বুদ্ধিশুদ্ধি একটুও নেই। রাতে আমার ছেলেকে কী সব ভুলভাল বলেছ? ছেলেটা আমার সারারাত একফোঁটা ঘুমাতে পারেনি।”
রুপু আরাম করে সোফায় বসল। ময়নার মাকে ডেকে বলল,
“চটজলদি আমাকে এককাপ চা দাওতো।”
এখানে এখন সেই লেভেলের বাস্তবসম্মত নাটক হবে। এত জমজমাট আসর ছেড়ে ময়নার মায়ের একটুও যেতে ইচ্ছে করছে না। অনিচ্ছা সত্বেও বিরক্তি চেপে ময়নার মাকে উঠতে হলো।
রুপুর ভাবভঙ্গি দেখলেই বীথি রানীর মাথা প্রচণ্ড গরম হয়ে যায়। ভয়ংকর সব ইচ্ছে মাথায় চেপে বসে। বীথি রানী কড়া কণ্ঠে বলল,
“কী হলো কথা বলতেছ না কেন? এই মেয়ে এই তোমার বাবা-মা কী তোমাকে সংসার করতে পাঠাইছে নাকি চাকরি করতে পাঠাইছে। বিয়ের পর থেকে আমার সহজ-সরল ছেলেটাকে একদণ্ড শান্তি দাও না তুমি। সারাক্ষণ চাপের উপরে রাখো। এত তেজ আর জেদ নিয়ে আর যাইহোক সংসার হয় না কিন্তু। তোমার চাকরি করা লাগবে কেন? এই-তো তোমার শ্বশুর এখানেই বসে আছে। তার সামনেই বলো, আমরা কিসের অভাবে রাখছি তোমাকে? খাওয়া-পরার কষ্ট দেই? নাকি চাকরানীর মতো রাখছি। উল্টো তোমার ছোটলোক বাপই তোমাকে গয়না কম দিয়েছে। সেই গয়না তোমার শ্বশুর তোমাকে নিজে গড়িয়ে দিয়েছে। এরথেকেও আর কী সুখ চাও তুমি? কপাল ভালো আমার ছেলের বউ হয়েছ। নাহলে যে বাটপার বাপের ঘরে জন্ম নিয়েছ না। এরথেকে ভালো ঘরে তো বিয়ে হতোই না। যাওবা হতো। বাপের বাটপারির জন্য কথা শুনতে শুনতে জনম যাইতো তোমার।”
রুপুর চোখদুটো লাল টকটকে হয়ে গেল। কান্না চেপে রাখতে গিয়ে চোখের ভেতরে প্রচণ্ড জ্বালাপোড়া করছে। তারপরও এই মূর্খ মহিলার সামনে বসে এক ফোঁটা চোখের জল ফেলল না রুপু। নিজেকে চট করে সামনে নিল। বীথি রানীর চোখে চোখ রেখে হিম শীতল কণ্ঠে বলল,
“আমার বাবা আপনার সাথে কী বাটপারি করেছে?”
বীথি রানী ভড়কে গেল। এতক্ষণ রাগের মাথায় যা-তা বলতে বলতে বীথি রানী ভুলেও গিয়েছিল রুপু আর পাঁচটা টিপিক্যাল বউয়ের মতো না।
“কী হলো, কথা বলছেন না কেন? বলুন, আমার বাবা আপনার সাথে কী এমন বাটপারি করেছে।”
বীথি রানী নিজেকে সামলে নিয়ে উচ্চ কণ্ঠে বলল,
“তোমাকে সাতভরি গয়না দেওয়ার কথা বলে মাত্র তিনভরি গয়না দিয়েছে। এটা বাটপারি না?”
“আপনারা তো আর যৌতুক চাননি। আমার বাবা খুশি হয়ে আমাকে গয়না দিতে চেয়েছিল। আমার বাবা যদি আমাকে একটাও গয়না নাও দিতো। তাহলেও আমার আফসোস থাকতো না। আমার বাবা আমাকে কী গয়না দিল না দিল সেইসব নিয়ে আপনার এত মাথা ব্যথা কেন? সৎ সাহস থাকলে আপনি সত্যি করে বলুনতো, আপনি কত ভরি গয়না সাথে নিয়ে এ-ই বাড়িতে বউ হয়ে এসেছিলেন? কী হলো, চুপ করে আছেন কেন, বলুন?”
“(নিশ্চুপ।)”
রুপুর ঠোঁটের কোণে তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটে উঠল। শাশুড়ীর চোখের দিকে তাকিয়ে বলল,
“আমার ছোটলোক বাপ তো আমাকে তার সামর্থ্য অনুযায়ী যতটুকু পেরেছে। ততটুকু দিয়েই শ্বশুরবাড়িতে পাঠিয়েছে। আপনার বাপ তো মনে হয় তা-ও দিতে পারেনি।”
বীথি রানীর চোখে জল এসে গেল। বিধানবাবুর সামনে গিয়ে বলল,
“দেখলে, দেখলে তো তোমার প্রিয়ারের বউমা আমাকে তোমাদের সামনে কীভাবে অপমান করল। তুমি কী এখনো চুপ করে থাকবে? বিনয়ের বউকে কিছুই বলবে না তুমি? এইদিন দেখার জন্যই কী ভগবান আমাকে বাঁচিয়ে রেখেছে।”
বিধানবাবু আমতা আমতা করে বলল,
“ইয়ে বীথি তোমাদের শাশুড়ী-বউমার ঝগড়ায় মনে হয় আমার কথা বলা ঠিক হবে না। কারণ তোমরা দুজনই মারমুখী হয়ে আছো। কেউ কাউকে একচুলও ছেড়ে কথা বলছ না। তোমাদের ঝগড়ার মাঝখানে আমি কী বলতে কী বলব। শেষে তোমরা তোমরা মিল হয়ে যাবে। আমিই তোমাদের কাছে খারাপ হয়ে থাকব। কী দরকার জেনে-বুঝে মেয়েলি ঝগড়ায় নিজেকে জড়ানোর।”
রুপু বলল,
“বাবা আপনি ছাদে যান। আমি আসছি।”
বিধানবাবু তাড়াহুড়ো করে উঠে চলে গেল।
বীথি রানী ইশারায় বিনয়কেও চলে যেত বলল। বিনয় বিনাবাক্যব্যয়ে উঠে চলে গেল। এখনই সময়। এখন রুপুকে অত্যন্ত কঠিন কিছু কথা শোনাবে বীথি রানী।
রুপু খুব তৃপ্তি করে চায়ে চুমুক দিল। বীথি রানীকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“আপনার ছেলে আপনাকে কী এমন বলেছে। যে সাত-সকালে আপনি চিৎকার করে বাড়ি মাথায় তুলেছেন।”
“বিনয় তো ভুল কিছু বলেনি। শোন রুপু, চাকরি যদি করতেই হয়। এ-ই বাড়িতে থেকেই তোমাকে চাকরি করতে হবে। এই বাড়ির বউ হয়ে বাড়ির বাইরে গিয়ে চাকরি করতে পারবে না তুমি।”
“কেন আপনার ছেলে আপনাকে বলেনি। আমি আর এ-ই বাড়ির বউ হয়ে থাকতে চাচ্ছি না।”
বীথি রানী চমকে উঠে বলল,
“মানে?”
“মানে খুব সোজা মা। আমি আর আপনার ছেলের সাথে সংসার করতে চাচ্ছি না।”
“খুব বার বেড়েছে তোমার, তাই না? কিসের এত অহংকার তোমার? চাকরি করে আর কয়টাকা বেতন পাবে তুমি।”
“যে কয়টাকা পাই না কেন, সম্মানের সাথে তো মাথা উঁচু করে বাঁচতে পারব।”
বীথি রানী হেসে ফেলল। হাসির ধরনটা রুপুর ভালো লাগল না। কেমন গা রি রি করে উঠল। বীথি রানী চাপা কণ্ঠে বলল,
“আমার ছেলেকে দিয়ে তোমার এখন আর পোষাচ্ছে না। তাই তো? চাকরি করার নাম করে কী বাইরে খারাপ কাজ কারবার করতে যাচ্ছ। সেই কথা আমাকে স্পষ্ট করে বললেই পারতে।”
“কেন আপনিও আমার সাথে যাইতেন নাকি?”
“রুপু… তোমার সাহস তো কম না। তুমি..তুমি আমাকে..
“এত অস্থির হচ্ছেন কেন মা? আগে পুরো কথাটা শুনুন, যে মা ছেলেকে বউয়ের কাছে ঘুমাতে পাঠিয়ে সারারাত নিজে ঘুমাতে পারে না। ছটফট করে। ছেলে-ছেলের বউ ঘরের ভেতরে কী করছে না করছে সেইসব দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে আড়ি পেতে শুনে। যে মা ছেলে রাতে ঘরে ফিরলে বউয়ের কাছে যেতে না দিয়ে নিজের ঘরে ছেলেকে বসিয়ে ঘণ্টার পর ঘন্টা গল্প শোনায়। বিবাহিত ছেলেকে বউয়ের সাথে ভাত খাওয়ার সুযোগ করে না দিয়ে নিজে ছেলেকে নিয়ে ভাত খেতে বসে যায়। ছেলে শখ করে বউয়ের জন্য ফুল আনলে মা হিংসায় ফুলগুলো নষ্ট করে ফেলে। সেই মা আর যাইহোক তাকে আমার সুস্থ মস্তিষ্কের মানুষ বলে মনে হয় না। আপনার নিজের ভেতরে পাহাড় সমান ক্রটি নিয়ে আপনি আমার দোষগুণ বিচার করার কে?”
বীথি রানী হিষ্টিরিয়া রোগীর মতো অতিরিক্ত রাগে কাঁপতে কাঁপতে বলল,
“তুই কী নিজের মতো সবাইকে খারাপ ভাবিস নাকি? চাকরি করা তো তোর বাহানা মাত্র। তুই যে নাঙ্গের সাথে ফষ্টিনষ্টি করতে যাচ্ছিস। আমি বুঝি না মনে করেছিস?”
রুপু ঘৃণাভরে বীথি রানীর দিকে তাকিয়ে থুতু ফেলল। গা গোলাচ্ছে। বমি পাচ্ছে খুব। এই মানুষটাকে রুপু এতদিন সহজ-সরল মানুষ বলেই জানতো। মানুষটা রাগের মাথায় রুপুকে এত খারাপ কথা বলবে। রুপু কল্পনাও করেনি। রুপু শাশুড়ীর রাগ চায়ের কাপের উপরে মিটাল। শরীরের সর্বশক্তি দিয়ে চায়ের কাপ আছড়ে ভাঙল রুপু। বীথি রানী ভয় পেয়ে কয়েকপা পিছিয়ে গেল। তবে দমে গেল না। দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
“তোর বিষদাঁত আজ আমি ভাঙব। এখুনি ফোন দেব তোর বাবা-মাকে। তারা আগে আসুক। তাদের মেয়ের কীর্তিকলাপ দেখে যাক।”
“আমার বাবা-মাকে খবরদার এখানে টানবেন না আপনি। এতদিন সংসার আপনার ছেলের সাথে আমি করেছি। আমার বাবা-মা করেনি। তাই যা বলার আমাকে বলুন। আর আপনি আমার সাথে বস্তিগিরি করতেছেন কেন? আজকাল বস্তির মানুষও এত খারাপ ভাষা প্রয়োগ করে না। আপনাদের মা-ছেলের নাটক অনেক সহ্য করেছি। আর করতে ইচ্ছে করছে না। ভেবেছিলাম সংসারটা যে ভাবেই হোক। আমি টিকিয়ে রাখব। কিন্তু আপনার আজকের ব্যবহারে সেই ইচ্ছেটাই মরে গেছে আমার।”
“তোর মতো ডাইনিকে আমার ছেলের দরকার নেই। তুই অনেক জ্বালিয়েছিস আমাকে। অনেক অপমান করেছিস। ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে এতদিন কিচ্ছু বলিনি আমি তোকে। হেসেই উড়িয়ে দিয়েছি। তুই পেত্নীর মতো এতদিন আমার ছেলের ঘাড়ে চেপে বসেছিলি। দয়া করে এবার মুক্তি দিয়ে সত্যি সত্যি বিদায় হ। আমি খুব শীঘ্রই আমার ছেলেকে ভালো মেয়ে দেখে বিয়ে দেব।”
রুপু এত দুঃখের মাঝেও হেসে ফেলল। বলল,
“কে করবে আপনার ভেড়ুয়া ছেলেকে বিয়ে?”
“কে করবে মানে? আমার ছেলের জন্য মেয়ের অভাব হবে নাকি রে… তোর বাপ যেমন লোভে পড়ে তোকে আমার ছেলের কাছে গছিয়েছে। এইরকম কত মেয়ের বাপ আসবে যাবে।”
“আপনাকে একটা অনুরোধ করি। জানি রাখবেন না। তারপরও করি, দয়া করে অন্যকোনো মেয়ের জীবন নষ্ট করবেন না। সবাই তো আর রুপু না।”
“তোর অনুরোধ তোর কাছেই রাখ।”
রুপু ছাদে গিয়ে দেখল, বিধানবাবু চিন্তিত ভঙিতে হাটাহাটি করছে। রুপু স্বাভাবিক কণ্ঠে বলল,
“বাবা?”
“আয়রে মা। কাছে আয়। বোস এখানে।”
বিধানবাবু রুপুকে নিয়ে দোলনায় বসল। বলল,
“এসব কী শুনছি মা?”
“আপনি ঠিকই শুনেছেন বাবা।”
“তোর চাকরি করার ইচ্ছে। বেশ তো চাকরি কর। তবুও আমার ছেলেটাকে ছেড়ে যাসনে মা। বড় আশা করে তোকে এ-ই বাড়ির বউ করে এনেছি। জানি, বীথি তোর সাথে খুব খারাপ ব্যবহার করে। আমি তোর ব্যর্থ বাপ। তাই প্রতিবাদ করতে পারি না। কিন্তু তুই যখন তোর সাথে অন্যায় হলে প্রতিবাদ করিস। আমার খুব ভালো লাগে। আমার নীরব সম্মতি থাকে।”
“আমি খুব দুঃখিত বাবা। আপনার এই আবদারটা রাখতে পারব না।”
“এতবড় সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে মাথা গরম করিস না। চাকরি হয়েছে। চাকরিতে জয়েন কর। আমি সমস্ত ব্যবস্থা করে দিচ্ছি।”
“আমি খুব সরি বাবা। আমি আপনার কোনরকম হেল্প নেব না। আমি নিজেই সবটা ম্যানেজ করব।”
“বাপ বলে ডেকেছিস। অথচ বাবার হেল্প নিবি না বলছিস? খুব কষ্ট পাইলামরে মা।”
“ঠিকাছে আপনি শুধু আমার একটা হেল্প করুন।”
“কী করতে হবে বল মা।”
“আপনি শুধু আমার একভরি স্বর্ণ বিক্রি করে দিন।”
“গয়না বেচা লাগবে না। তোর টাকা লাগলে আমি দেব।”
“বাবা প্লিজ।”
বিধানবাবু দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
“বেশ।”
“বাবা আর একটা কথা ছিল।”
“বল?”
“আমি আপনার দেওয়া গয়নাগুলো ফেরত দিতে চাই।”
“আমি গয়নাগুলো কিছুতেই ফেরত নেব না মা।”
“আপনি না নিতে চাইলেও আমি রেখে যাব। এমনিতেই এই গয়নার জন্য অনেক খোঁটা শুনেছি আমি। সামান্য কিছু গয়নার জন্য সারাজীবন অভিশাপের বোঝা মাথায় নিতে পারব না আমি আর।”
বিধানবাবু বুকচিরে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। এতদিন সবকিছু তো ঠিকই ছিল। তার এত কষ্টে গড়া সুখের সংসারে কার নজর লাগল? সবকিছু চোখের পলকেই কেমন এলোমেলো হয়ে গেল।
রুপু মায়ের ফোন রিসিভ করতেই রুমা ভীতু কণ্ঠে বলল,
“তোর কী হয়েছে রুপু? তুই নাকি খুব পাগলামি করছিস?”
রুপু দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
“এইসব কথা কে বলেছে তোমাকে?”
“তোর শাশুড়ী ফোন করে বলল। তোর বাবা রওনা হয়েছে।”
রুপু চমকে উঠে বলল,
“বাবা রওনা হয়েছে মানে? বাবা কী এখানে আসছে নাকি?”
“হুঁ।”
রাগে, দুঃখে রুপুর শরীর কাঁপতে লাগল। তার বাবা-মা এত বোকা কেন? অন্তত রুপুর সাথে কথা বলে কী রওনা হওয়া উচিত ছিল না।
“তুমি এক্ষুনি বাবাকে ফোন করে বাড়ি চলে যেতে বলো মা।”
“তোর বাবা তোর উপরে খুব রেগে আছে। আমার কথা শুনবে না।”
“মা প্লিজ। বাবাকে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে ম্যানেজ করো। বাবা যেন এখন কোনভাবেই এই বাড়িতে না আসে।”
“আমার খুব ভয় করছে রুপু। সত্যি করে বলতো মা, তোর কী হয়েছে? কেন তুই বিনয়ের মতো এত নম্র-ভদ্র ভালো ছেলের
সাথে সংসার করতে চাচ্ছিস না। তুই কী আমাদের কথা একবারও ভাববি না?”
রুপুর খুব ক্লান্ত লাগছে। তিল কখন তাল হয়ে গেল রুপু বুঝতেই পারল না। খুব সামান্য একটা ব্যাপার নিয়ে বিনয়ের মায়ের এত জল ঘোলা করার কিছুই ছিল না। রুপুর জন্য রুপুর বাবা অসম্মানিত হলে রুপু মানতেই পারবে না। রুপু হতাশা ঝেড়ে ফেলে দৃঢ় কণ্ঠে বলল,
“আমার দিব্যি মা। তুমি বাবাকে যে করেই হোক। বাড়ি চলে যেতে বলো। আমি বিকালে আসছি।”
রুমাকে কোনকথা বলার সুযোগ না দিয়েই রুপু ফোন রেখে দিল।
রুপু দ্রুত হাতে ব্যাগ গুছিয়ে নিল। রুপুর কাণ্ড দেখে বিনয় ভয় পেয়ে তাড়াহুড়ো করে মাকে ডাকতে গেল। বীথি রানী সঙ্গে সঙ্গে ছুটে এলো। রুপুর ব্যাগ গোছানো দেখে বলল,
“কোথায় যাচ্ছ তুমি?”
“কোথায় যাচ্ছি তা জেনে আপনি কী করবেন?”
“কী করব মানে? আমার ছেলে ভালো দেখে তোমার সাথেই সংসার করতে চাচ্ছে। তোমাকে এখন কোথাও যেতে দেওয়া হবে না। তোমার বাবাকে খবর দিয়েছি। সে আগে আসুক। তারপর একটা মীমাংসা হোক।”
“কোন মীমাংসার দরকার নেই। বাবাকে আমি আসতে মানা করে দিয়েছি।”
“মানা করে দিয়েছ মানে? তুমি মানা করার কে?”
বীথি রানী বিনয়কে বলল,
“দেখেছিস তোর বউয়ের চোপার ধার। কোন গুরুজন মানে তোর বউ? এই বউ নিয়ে তুই এখনো সংসার করতে চাস কোন জ্ঞানে?”
বিনয় মাথা নিচু করে ফেলল। রুপু যেমনই হোক না কেন! বিনয় রুপুর সাথেই সংসার করবে। রুপু হেসে ফেলল। বলল,
“আপনার কোন ভয় নেই। আপনার ছেলে আমার সাথে সংসার করতে চাইলেও আমি ওর সাথে সংসার করব না। নিশ্চিন্ত থাকেন।”
এই প্রথম বীথি রানীর নিজের প্রিয় ছেলের উপরে প্রচণ্ড রাগ লাগছে। আপদটা যখন নিজে থেকেই বিদায় হতে চাচ্ছে। কেন তার অতি ভালো ছেলেটা জেদ করে আপদটাকে নিজের কাছে আটকে রাখতে চাচ্ছে।
”একি তুমি আমার ব্যাগ ধরে টানছ কেন? ব্যাগ ছাড়ো বলছি।”
বিনয় রুপুর ব্যাগখানা আরও শক্ত করে চেপে ধরল। জেদি কণ্ঠে বলল,
“না ছাড়ব না। আর না আমি তোমাকে কোথাও যেতে দেব।”
বীথি রানী হতবাক হয়ে বিনয়ের কাণ্ড দেখতে লাগল। রুপু শব্দ করে হেসে ফেলল। বলল,
“আজব তো। তুমি তোমার মায়ের আদর্শ ছেলে হয়ে মায়ের সামনে বউয়ের সাথে রঙঢঙ করছ কেন?”
বিনয়ের খুব হতাশ লাগছে। মাকে এখন এইঘরে ডেকে আনা বড্ড ভুল হয়েছে। মা প্লিজ তুমি এখন যাও। এই কথাটা মুখ ফুটে বলতেও তো পারবে না বিনয়। মাকে না ডেকে ঘরের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ করে দিয়ে রুপুকে জাপ্টে ধরে পাগলের মতো আদর করা উচিত ছিল। রুপু যদি বিনয়ের অতিরিক্ত আদরেও পোষ না মানতো। তাহলে রুপুর পাদু’টো শক্ত করে চেপে ধরত বিনয়।
বিনয়ের আকুতি বোধহয় বুঝতে পারল রুপু। শাশুড়ীমাকে বলল,
“মা আপনি জান তো। আপনার ছেলের সাথে আমার দরকারি কিছু কথা আছে।”
বীথি রানীর এখন এইঘর ছেড়ে একটুও যেতে ইচ্ছে করছে না৷ রুপু যে পরিমাণ ঠোঁটকাটা। শেষে বিনয়ের সামনে এমন লজ্জাজনক কথা বলে দেবে। ছেলের সামনে লজ্জার আর শেষ থাকবে না।
রুপুর বিয়ে পর্ব ৩০
বীথি রানী ঘর ছেড়ে চলে গেল। রুপু ঘরের দরজা আটকে দিয়ে বিনয়ের খুব কাছে এসে দাঁড়াল। ফিসফিস করে বলল,
“আমাকে কী খুব আদর করতে ইচ্ছে করছে তোমার? ইচ্ছে করলে মন ভরে আদর করতে পারো। আমি বাঁধা দেব না।”
বিনয় রুপুর হাত জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে ফেলল। কান্নার দমকে কোনকথা বলতেই পারল না বিনয়।
বিনয়ের কান্নার শব্দে বীথি রানীর বুকের ভেতরে ছ্যাত করে উঠল। জোরে জোরে দরজা ধাক্কাধাক্কি করে অস্থির হয়ে বলল,
“বিনয় কী হয়েছে তোর? কাঁদছিস কেন? আমার কিন্তু খুব চিন্তা হচ্ছে। দরজাটা খুল বাবা।”
