Home প্রেমের বাজিমাত প্রেমের বাজিমাত পর্ব ৪৪

প্রেমের বাজিমাত পর্ব ৪৪

প্রেমের বাজিমাত পর্ব ৪৪
রোজ ও রুশা

পরীক্ষা শেষ হয়েছে আজ প্রায় এক মাস পেড়িয়েছে। পুরো ক্যাম্পাসটাই যেন ধীরে ধীরে আবার আগের ছন্দে ফিরছে। ক্লাসের চাপ নেই, লাইব্রেরির সামনে আর আগের মতো ভিড় নেই, তবুও কিছু মানুষের জীবনে যেন অদ্ভুত এক শূন্যতা জমে আছে।
নাভান হঠাৎ করেই কোথাও চলে গিয়েছিল। কেউ জানে না কোথায়, কেন, কিংবা কার জন্য। যাওয়ার আগে শুধু নিজের দায়িত্বগুলো ভাগ করে দিয়েছিল সৃজন, অধীর, আর ঝিনুকের ওপর। তারপর কোনো খোঁজ নেই। ফোনে না, মেসেজে না— যেন মানুষটা হাওয়ায় মিলিয়ে গিয়েছিল। আর এই এক মাসে সবচেয়ে বেশি বদলে গেছে হেরা।
আগের সেই তর্কপ্রিয়, জেদি, চোখে আগুন নিয়ে কথা বলা মেয়েটা এখন অস্বাভাবিক রকম শান্ত। এতটাই শান্ত যে তাকে দেখে ভয় লাগে। সে আর অযথা কারো সাথে ঝগড়া করে না, কাউকে উত্তর দেয় না, এমনকি তিতিরের কটাক্ষেও খুব একটা প্রতিক্রিয়া দেখায় না।

‘ তবে তিতির থেমে থাকার মেয়ে নয়।
‘ সেদিন ক্যাম্পাসে সবার সামনে নাভানের বলা কথাগুলো এখনো বুকের ভেতর কাঁটার মতো বিঁধে আছে তার। অপমানটা হয়তো খুব বড় ছিল না, কিন্তু মানুষটার আচরণটাই তাকে ভেঙে দিয়েছিল। তাই এরপর আর ভুলেও নাভানের সাথে কথা বলেনি হেরা।
অথচ মনের ভেতরটা প্রতিদিন তাকে খুঁজেছে।

‘ কফিশপে জাওয়াদ খানের সাথে সেই কথোপকথনের পর থেকেই হেরা যেন আরো গুটিয়ে গিয়েছিল। পরীক্ষার শেষ দিনটাতেও সবাই যখন হাসি-আড্ডায় ব্যস্ত, হেরা তখন চুপচাপ জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। তার চোখে তখন এক অদ্ভুত শূন্যতা।
‘ নাভান কি সত্যিই এত ব্যস্ত ছিল যে একবারও খোঁজ নেওয়ার সময় পায়নি? এই প্রশ্নটাই প্রতিদিন তাকে ভেতর থেকে পোড়াত।
তবে এই পুরো এক মাসে সৃজন আর অধীর ছায়ার মতো পাশে ছিল হেরার। তিতির যখনই কোনোভাবে তাকে অপমান করার চেষ্টা করেছে, ওরা দুজন ঠিক দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়েছে।
একদিন ক্যান্টিনের সামনে তিতির ইচ্ছে করেই বলেছিল—
“ কিছু মানুষকে দেখলে করুণা লাগে। নিজেকে সামলাতে পারে না, আবার বড় বড় স্বপ্ন দেখে।”
হেরা কিছু বলার আগেই অধীর ঠান্ডা গলায় বলেছিল,

“ নিজেকে ছোট না করলে অন্য কাউকে ছোট দেখানো যায় না তিতির।
আর পাশে দাঁড়িয়ে থাকা সৃজন তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে যোগ করেছিল —
“ বনুকে নিয়ে আর একটা কথা বললে ভালো হবে না।”
সেদিন পুরো পরিবেশটাই থমকে গিয়েছিল।
হেরা অবাক চোখে তাকিয়ে ছিল ওদের দিকে। কারণ এই এক মাসে সে বুঝেছে— রক্তের সম্পর্কের বাইরেও কিছু মানুষ থাকে, যারা নিঃশব্দে আগলে রাখে।
তবুও রাতের বেলা একা হলে নাভানের কথাই মনে পড়ে তার। ছেলেটার রাগী চোখ, হঠাৎ করে ধমক দেওয়া, আবার অদ্ভুতভাবে আগলে রাখা… সবকিছু।
অভিমান বড় অদ্ভুত জিনিস।
যাকে সবচেয়ে বেশি মিস করা হয়, অভিমানটাও তার ওপরই সবচেয়ে বেশি জমে।

‘ হেরার বুকজুড়ে এখন ঠিক ততটাই জমে আছে না-বলা হাজারটা অভিযোগ। অভিযোগগুলো কিসের, কেন—তা সে নিজেও স্পষ্ট করে জানে না। শুধু জানে, ভেতরে ভেতরে কিছু একটা তাকে প্রতিনিয়ত পোড়াচ্ছে। একটা অদ্ভুত অস্থিরতা, একরাশ অভিমান আর না-পাওয়া অনুভূতি তার বুকের ভেতর জট বেঁধে আছে।
‘ এক মাসে নাভান একবারও তার সামনে আসেনি। ফোন করেনি। এমনকি তার কণ্ঠস্বর পর্যন্ত শোনেনি হেরা। অথচ অদ্ভুতভাবে এই নীরবতাই তাকে আরও বেশি অস্থির করে তুলছে।
রাত গভীর হলে বুকের ভেতর হাহাকার করে ওঠে—
কেন নাভান আর আসে না? কেন তাকে খুঁজে না?
কেন একবারও জোর করে বলে না— “তুমি আমার স্ত্রী।
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে গিয়েই হেরা আরও বেশি ক্লান্ত হয়ে পড়ে।
সে নিজেকেই বুঝতে পারে না।
যে মানুষটাকে সে এতদিন দূরে ঠেলে দিতে চেয়েছে, আজ তার অনুপস্থিতিই কেন এত কষ্ট দিচ্ছে?
হেরা চোখ বন্ধ করলেই মনে পড়ে সেই অনাকাঙ্ক্ষিত বিয়ের কথা। একটা জোরপূর্বক সম্পর্ক। যে সম্পর্কে তার কোনো মতামত ছিল না। নাভান জোর করেই তাকে নিজের জীবনের সাথে বেঁধে ফেলেছিল

‘ হেরা সেই দিনটাকে আজও মন থেকে মেনে নিতে পারেনি।
‘ কারণ তার হৃদয়ে তো আগে থেকেই আরেকজন ছিল।
তার প্রথম ভালোবাসা। তার গোপন অনুভূতি।
কিশোরীর মনে জন্মানো সেই নিষ্পাপ অনুভূতি আজও হেরার বুকের গভীরে জীবন্ত। এমন একজন মানুষ, যাকে সে পুরোপুরি কখনও পায়নি, তবুও অদ্ভুতভাবে ভালোবেসে গেছে। সেই প্রথম প্রেমের স্মৃতি এখনও তাকে তাড়া করে বেড়ায়।
কিন্তু সমস্যাটা অন্য জায়গায়।
বিয়ের পর থেকে নাভানের উপস্থিতি, তার জোর করে যত্ন নেওয়া, অধিকার ফলানো, রাগ, অভিমান—সবকিছু ধীরে ধীরে হেরার ভেতরে অন্যরকম একটা অনুভূতির জন্ম দিয়েছে। আর সেই অনুভূতিটাই এখন তাকে সবচেয়ে বেশি ভয় দেখায়। কারণ সে বুঝতে পারছে না—সে আসলে কাকে ভালোবাসে?
তার প্রথম প্রেমকে? নাকি সেই মানুষটাকে, যাকে সে সারাক্ষণ ঘৃণা করার চেষ্টা করেছে?
নাভানকে ভাবতে গেলেই তার রাগ হয়। মনে হয়, এই মানুষটা তার জীবনটা এলোমেলো করে দিয়েছে। তার স্বাধীনতা কেড়ে নিয়েছে। তাকে একটা সম্পর্কে বেঁধে ফেলেছে, যেটা সে কখনও চায়নি। তবুও…

‘ নাভান দূরে চলে গেলে বুকের ভেতর শূন্য লাগে।
তার কণ্ঠস্বর না শুনলে অস্থির লাগে।
কেউ যখন নাভানের নাম নেয়, হেরার মন অকারণে থমকে যায়। এই দ্বন্দ্বই ধীরে ধীরে তাকে নিঃশেষ করে দিচ্ছে।
একদিকে তার প্রথম ভালোবাসার স্মৃতি, অন্যদিকে নাভানের অদৃশ্য টান।
দুই অনুভূতির মাঝখানে দাঁড়িয়ে হেরা যেন নিজেকেই হারিয়ে ফেলছে। তাই সে সিদ্ধান্ত নিয়েছে—
ডিভোর্স চাই।
‘ এই পবিত্র সম্পর্ক থেকে মুক্তি চায়।
কারণ যতদিন নাভানের নাম তার নামের পাশে জড়িয়ে থাকবে, ততদিন সে শান্তি পাবে না।
সে বাবাকে বলেছে। বোঝানোর চেষ্টা করেছে। কিন্তু কোনো লাভ হয়নি। সবাই যেন এই সম্পর্কটাকেই টিকিয়ে রাখতে চায়। অথচ কেউ বুঝতে চায় না, প্রতিদিন ভেতরে ভেতরে কতটা ভেঙে যাচ্ছে হেরা।
সে মুক্তি চায়। নিজেকে এই অদ্ভুত টানাপোড়েন থেকে মুক্ত করতে চায়।

ক্যাম্পাসের কোলাহল কিছুটা থেমে গেলেও শহরের বাতাসে এখন অন্য এক উত্তেজনা— নির্বাচন। চারদিকে পোস্টার, মাইকিং, মিছিল আর ক্ষমতার হিসাব-নিকাশ।
অধীর, সৃজন আর নাভান— তিনজনই এখন ভীষণ ব্যস্ত। বিশেষ করে নাভান। দিনের বেশিরভাগ সময়ই কাটছে নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণায়। কখনো দলীয় মিটিং, কখনো কর্মীদের সঙ্গে আলোচনা, কখনো আবার বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে মানুষের সমস্যার কথা শোনা।
জাওয়াদ খানও এখন রাজনীতির মাঠে বেশ সক্রিয়। যদিও রাজনীতি কখনোই তার পছন্দের জায়গা ছিল না। ছোটবেলা থেকেই বাবার রাজনৈতিক জীবন দেখে বড় হয়েছে ঠিকই, কিন্তু নিজের কখনো এই জগতে নামার ইচ্ছে ছিল না তার। তবুও অদ্ভুতভাবে সে জড়িয়ে গেছে এই ক্ষমতার খেলায়। কেন জড়িয়েছে— তার সঠিক কারণ আজও কেউ জানে না। হয়তো আরও গভীরে লুকিয়ে আছে অন্য কোনো কারণ।

‘ এদিকে এডভোকেট এম এল এ কাজল খান— আপাতত চুপচাপ আছেন।
তার এই নীরবতা শামসুলকে ভাবিয়ে তুলেছে। কারণ সে জানে, কাজল খান কখনো অকারণে নীরব থাকেন না। এখন তাকে বিরক্ত করার মতো কেউ নেই। সবাই ব্যস্ত নিজেদের কাজে। আর সেই ফাঁকে সে নীরবে তথ্য সংগ্রহ করে যাচ্ছে। শামসুল আজমির চৌধুরীর বিরুদ্ধে কিছু একটা খুঁজছে সে। এমন কিছু, যা পুরো খেলাটাই বদলে দিতে পারে।
অন্যদিকে বিরোধী দলে শামসুল আজমির চৌধুরী আর তার ছেলে নিলয় চৌধুরী একসাথে মাঠে নেমেছে।
বাপ-ছেলে দুজনের চোখেই এখন একটাই লক্ষ্য— যেকোনোভাবে ক্ষমতা দখল করা।
জাওয়াদ খানের প্রতীক “বাশ মার্কা”
আর শামসুল আজমির চৌধুরীর প্রতীক “বদনা মার্কা”
এই বদনা মার্কা নিয়েই শহরে হাসাহাসির শেষ নেই।
প্রচারণার সময় প্রতিপক্ষ কর্মীরা খোঁচা মেরে বলে—
“ভোটের পর হাতে বদনা ধরিয়ে দেব!”

কেউ আবার বাঁশ হাতে নিয়ে বিদ্রূপ করে মিছিল করছে। এসব দেখে নিলয়ের রাগে মুখ শক্ত হয়ে যায়।
কারণ সে জানে, রাজনীতি শুধু পোস্টার আর মিছিল না— এটা ক্ষমতার যুদ্ধ। আর এই যুদ্ধে অপমানও অস্ত্র।
নিলয় কখনো প্রফেশনালী রাজনৈতিক দলের মানুষ ছিল না। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে ছাত্র রাজনীতি করেছে ঠিকই, কিন্তু সেটা ছিল মূলত নিজের প্রভাব বজায় রাখার জন্য। মেয়েদের মাঝে জনপ্রিয়তা, ক্যাম্পাসে আধিপত্য— এসবই ছিল তার আগ্রহ।
কিন্তু এখন পরিস্থিতি বদলে গেছে।
শামসুল আজমির চৌধুরী ধীরে ধীরে ছেলেকে নিজের মতো গড়ে তুলছে। প্রতিদিন তাকে বোঝাচ্ছে—
“ক্ষমতা ছাড়া পৃথিবীতে কিছুই টেকে না।
টাকা আর রাজনৈতিক পাওয়ার থাকলে মানুষ মাথা নিচু করে চলে।
আর নিলয়ও সেই কথাগুলো বিশ্বাস করতে শুরু করেছে। তার মাথায় এখন একটাই নাম— হেরা।
সে মনে করে, যদি ক্ষমতা আর অর্থ তার হাতে আসে, তাহলে একদিন হেরাও তার কাছে ফিরে আসবে।
হয়তো ভালোবাসা দিয়ে নয়… প্রভাব দিয়ে।
হেরা অবশ্য স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে—

“রাজনীতি আর ভালোবাসা এক জিনিস না।
ক্ষমতা থাকলেই কাউকে পাওয়া যায় না।
তবুও নিলয় থামেনি। বরং আরও গভীরভাবে জড়িয়ে পড়েছে বাবার রাজনৈতিক খেলায়।
কিন্তু শামসুল আজমির চৌধুরীর উদ্দেশ্য আরও ভয়ংকর। সে শুধু নির্বাচন জিততে চায় না— সে পুরো শহরের নিয়ন্ত্রণ চায়।
‘ বহু বছরের লালসা তার চোখে স্পষ্ট।
অঢেল টাকা, অগাধ ক্ষমতা, প্রশাসনের উপর নিয়ন্ত্রণ সবকিছু নিজের হাতে চাই তার।
কাজল খানকে সরানোর জন্য এর আগেও বহুবার চেষ্টা করেছে সে। মিথ্যা মামলা, মিডিয়ায় অপপ্রচার, রাজনৈতিক চাপ— কিছুই বাদ রাখেনি।
কিন্তু প্রতিবারই ব্যর্থ হয়েছে। কারণ এডভোকেট এম এল এ কাজল খান অন্যরকম মানুষ।
তিনি শুধু একজন রাজনীতিবিদ নন, একজন ন্যায়পরায়ণ আইনজীবীও। ক্ষমতা ব্যবহার করে মানুষকে ভয় দেখানোর বদলে তিনি আইনের মাধ্যমে মানুষের পাশে দাঁড়াতে বিশ্বাস করেন। শহরের সাধারণ মানুষ তাকে সম্মান করে ঠিক এই কারণেই।
নির্বাচনী প্রচারণার মাঝেও তাকে প্রায়ই দেখা যায় কোনো অসহায় মানুষের মামলা বিনা ফিতে লড়তে।
কখনো থানায় গিয়ে নিরপরাধ কাউকে ছাড়িয়ে আনছেন, কখনো আবার কোনো দরিদ্র নারীর পাশে দাঁড়িয়ে আইনি সহায়তা দিচ্ছেন।

তার মধ্যে রাজনীতিবিদের চেয়ে একজন সচেতন নাগরিকের পরিচয়টাই বেশি ফুটে ওঠে।
আর এটাই শামসুল আজমির চৌধুরীর সবচেয়ে বড় ভয়। কারণ মানুষ ক্ষমতাকে যতটা ভয় পায়, ন্যায়বিচারকে তার চেয়েও বেশি সম্মান করে।
এদিকে নাভান আর নিলয়ের কর্মিদের মাঝেও রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব দিন দিন তীব্র হয়ে উঠছে।
একসময় তারা একসাথে আড্ডা দিত, হাসত, গল্প করত। কিন্তু এখন রাজনৈতিক মতভেদ তাদের মাঝখানে দেয়াল তুলে দিয়েছে।
একদিন প্রচারণার সময় উত্তপ্ত তর্কে জড়িয়ে পড়ে নাভান আর নিলয় ।

“ রাজনীতি মানুষের সেবা করার জায়গা!
রাগান্বিত গলায় বলেছিল নাভান।
সঙ্গে সঙ্গে তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়েছিল নিলয়।
“সেবা? ক্ষমতা ছাড়া কেউ কাউকে চিনেও না।
নাভানের চোখ কঠিন হয়ে উঠেছিল।
“ ক্ষমতার জন্য মানুষকে ব্যবহার করা রাজনীতি না।”
উত্তরে নিলয় বলেছিলো–
“ আর দুর্বল হয়ে বেঁচে থাকাও রাজনীতি না!”
কঠোর স্বরে জবাব এসেছিল ওপাশ থেকে।
চারপাশের বাতাস মুহূর্তেই ভারী হয়ে উঠেছিল।
দুই দলের কর্মীরাও উত্তেজিত হয়ে উঠেছিল।
মনে হচ্ছিল, সামান্য একটা শব্দেই বড় কিছু ঘটে যাবে।
ঠিক সেই সময় দূর থেকে জাওয়াদ খান এগিয়ে এসে নাভানের কাঁধে হাত রাখে। তার চোখে ছিল সতর্কতা।
কারণ সে জানে— রাজনীতির আগুন একবার জ্বলে উঠলে সেটা সম্পর্ক, বন্ধুত্ব, ভালোবাসা— সবকিছু পুড়িয়ে দেয়।
আর ঠিক তখনই শহরের অন্য প্রান্তে আরও ভয়ংকর কিছু ঘটছিল। গভীর রাত। চারপাশ নিস্তব্ধ।
একটি গোপন কক্ষের ভেতরে মুখোমুখি বসে আছে দুই পুরুষ আর একজন মহিলা।
ঘরের ম্লান আলো দেয়ালজুড়ে নিরাপত্তা ক্যামেরা।
বাইরে কঠোর পাহারা।

তিনজনের মুখেই অদ্ভুত কঠোরতা।
কথা খুব কম হচ্ছে, কিন্তু প্রতিটি শব্দ যেন বিষের মতো বিষাক্ত ।
মহিলাটি নিচু গলায় কিছু বলতেই টেবিলের ওপাশে বসা লোকটির চোখ সরু হয়ে আসে।
অন্যজন ধীরে ধীরে আঙুল দিয়ে টেবিল চাপড়াতে থাকে।
সেই রাতের কথোপকথন কেউ শোনেনি।
এমনকি দেয়ালও যেন কান বন্ধ করে রেখেছে।
কিন্তু শেষ মুহূর্তে তিনজনের চোখের ভাষা স্পষ্ট করে দিচ্ছিল—খুব বড় কিছু ঘটতে চলেছে।
তার দুদিন পর হঠাৎ করেই নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে কয়েকটি এলাকায় প্রচারণা সাময়িক বন্ধ ঘোষণা করা হয়।
অভিযোগ ওঠে— নিলয় নিজের প্রভাব ব্যবহার করে প্রশাসনের উপর চাপ সৃষ্টি করছে।
কোথাও বিরোধী দলের পোস্টার ছিঁড়ে ফেলা হচ্ছে, কোথাও সাধারণ মানুষকে ভয় দেখানো হচ্ছে, আবার কোথাও গোপনে টাকার বিনিময়ে ভোট কেনার চেষ্টা চলছে। শহরের বাতাসে তখন ভয় আর উত্তেজনা একসাথে মিশে গেছে।
আর সেই সময় আদালতের সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে সাংবাদিকদের সামনে শান্ত গলায় এডভোকেট এম এল এ কাজল খান বলেছিলেন—

“ রাজনীতি মানে ক্ষমতার অপব্যবহার না।
রাজনীতি মানে মানুষের পাশে দাঁড়ানো।
যেদিন ক্ষমতা মানুষের ভয় হয়ে দাঁড়াবে, সেদিন সেই ক্ষমতা ধ্বংস হবেই। আইন সবার জন্য সমান। জনগন যাকে নির্বাচিত করবে তাকেই মেনে নিতে হবে!
তার কণ্ঠে কোনো চিৎকার ছিল না।
তবুও কথাগুলো শহরের প্রতিটি মানুষের মনে গিয়ে আঘাত করেছিল।
কারণ সবাই বুঝতে শুরু করেছে—
এই নির্বাচন শুধু ভোটের লড়াই না।
এটা ন্যায় আর ক্ষমতার মধ্যকার যুদ্ধ।

“কি ব্যাপার সুন্দরী… আমার সাথে গেম খেলছো না তো, ডার্লিং?”
শামসুল সোফায় হেলান দিয়ে বসে কথাটা বলল। ঠোঁটে হালকা হাসি, কিন্তু চোখে স্পষ্ট সন্দেহ।
ঘরের ভেতর অদ্ভুত চাপা উত্তেজনা। যেন দু’জন মানুষ কথা বলছে না— নীরব যুদ্ধ চালাচ্ছে।
কাজল খান ধীরে ধীরে কফির কাপে চুমুক দিলেন। একবারও বিচলিত হলেন না। তার এই শান্ত স্বভাবটাই বরাবর শামসুলকে পাগল করে দেয়।
“কোনোভাবে যদি শুনি তুই জাওয়াদের সাথে মিলে আমার বিরুদ্ধে কিছু করেছো …”
শামসুল এবার সামনে ঝুঁকে এল,
“তাহলে দুইটা মানুষ খুন হবে। খুন…! আর সেটা আমি নিজ হাতে করবো ডার্লিং।
কথাটা বলেই সে কাজল রেখার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। সম্ভবত ভয় দেখতে চেয়েছিল।
কিন্তু এডভোকেট এম এল এ কাজল খান ঠান্ডা চোখে তাকিয়ে রইলেন তার দিকে। তারপর ধীরে ধীরে কাপটা নামিয়ে রাখলেন।

“শোন শামসুল,
তার কণ্ঠ শান্ত, কিন্তু ধারালো।
“ নির্বাচনের বাজি তুই নিয়েছিস, আমি না। তোদের ঝামেলায় আমায় জড়াবি না।”
শামসুল ভ্রু কুঁচকে তাকাল।
কাজল রেখা এবার সোফায় হেলান দিয়ে বসলেন। চোখেমুখে বিরক্তির ছাপ স্পষ্ট।
“ আর আমাকে ভয় দেখানোর চেষ্টা করিস না।
তোর ড্রাগস পাচারের ভিডিও আমার কাছে আছে।
কোথা থেকে কত টাকা সরিয়েছিস, কাকে কিনেছিস, কার মুখ বন্ধ করেছিস— সব হিসাব আছে আমার কাছে। তাই তুই যতটা ভাবছিস আমাকে চাপে রাখবি… আসলে তার চেয়ে বেশি নিজেই ফাঁদে আটকে পরবি। যাহচ্ছে হতে দে, তুইতো জাওয়াদ কে এসবের ভিতর টেনেছিস। এখন আমায় এসব বলে কি প্রমান করতে চাচ্ছিস? আর আমায় চাপ দিলে আমিও যে ভর ছেরে বসে থাকবো না!
শামসুলের চোয়াল শক্ত হয়ে যায়।
“আমায় থ্রেট দিচ্ছো সুন্দরী?
সে নিচু গলায় বলল।

কাজল খান এবার মৃদু হেসে উঠলেন। সেই হাসিতে কেমন যেন তীক্ষ্ণ অপমান লুকানো।
“ তুইও আমায় থ্রেট দিয়ে ভালো করিস নি শামসুল আজমীর চৌধুরী!
কথাটা শুনে শামসুল দাঁতে দাঁত চেপে তাকিয়ে থাকে।
তার রাগ হচ্ছে। ভীষণ রাগ। কারণ এত বছর পরেও এই মহিলাকে সে বুঝতে পারে না।
ক্ষমতা দেখিয়েছে।অপেক্ষা করেছে। মানুষ সরিয়েছে।
তবুও কাজলরেখাকে নিজের দিকে টানতে পারে নি।
কারণ এই মহিলা আজও জাওয়াদ খান নামের উপর চলে। কিন্তু কেনো এটাই বুঝতে পারে না শামসুল। এতো বছর একা থেকেছে , প্রতারিত হয়েছে তাও কেনো এতো ভালোবাসা সেটাই বুঝে না শামসুল আজমীর চৌধুরী —
“এত বছর পরেও, কি আছে ওর মধ্যে, যা আমার মধ্যে নেই? রাজনৈতিক ক্ষমতা এখন আমার হাতের মুঠোয় দেখো সুন্দরী।
কাজল খান এবার ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালেন।
তার চোখদুটো ঠান্ডা হয়ে উঠেছে।

“ সবকিছু টাকা দিয়ে মাপিস না শামসুল।
ঘর নিস্তব্ধ। তিনি ধীরে ধীরে তার দিকে এগিয়ে এলেন।
“তুই রাজনীতিতে এসেছিস টাকার জোরে।
মানুষ কিনে। ভয় দেখিয়ে। আর আমি রাজনীতি শিখেছি মাথা খাটিয়ে।
শামসুল কিছু বলতে গেলে কাজল রেখা হাত তুলে থামিয়ে দিলেন।
“না, আজ তুই শুনবি।
তার কণ্ঠ এবার তেজি হয়ে উঠল।
“ তুই ভাবিস ক্ষমতা মানে বন্দুক, টাকা আর মানুষ পোষা। কিন্তু রাজনীতি তার থেকেও ভয়ংকর জিনিস।
এখানে মানুষ হাসতে হাসতে সামনের মানুষটাকে শেষ করে দেয়।
শামসুল চোখ সরু করে তাকিয়ে থাকে।
কাজল খান তীক্ষ্ণ স্বরে বললেন—

“ গভীর পানির মাছকে দুর্বল ভেবে ভুল করেছিস তুই।
এতো বছরে আমাকে একটুও ভাঙতে পারলি না।
আর আজ ভাবছিস ভয় দেখিয়ে,,,,,, হা হা! কি ভাবছিস আমি তোর পাশে দাঁড়াবো?
তিনি একটু ঝুঁকে এলেন শামসুলের দিকে।
“শোন… টাকা দিয়ে ক্ষমতা কেনা যায়।
কিন্তু চাল বদলানোর মগজ সবার থাকে না!!
শামসুল এবার রাগে টেবিলে ঘুষি মারল।
“ নিজেকে খুব বড় খেলোয়াড় ভাবো তুমি সুন্দরী ?
কাজল খান ঠান্ডা হেসে বললেন—
“না! আমি শুধু তোর মতো খেলোয়াড়দের শেষ কোথায় হয় সেটা খুব ভালো জানি।
” রাজনৈতিক রাজাকে ভয় দেখাচ্ছো সুন্দরী,,রাজা কতোটা শক্তিশালি তা জানা নেই তোমার।
” রাজনীতি দাবা খেলা শামসুল। এখানে রাজা যত শক্তিশালী হোক, একটা ভুল চালেই পুরো বোর্ড উল্টে যায়। আর তুই কি করেছিস তা তুই ভালো জানিস। নিজের হাতেই নিজের রাজাকে ফাঁদে ফেলেছিস । লোভ আর ক্ষমতা তোকে জানোয়ার বানিয়ে ফেলেছে! রাজনীতি দাবা খেলার মতো। তুই শুধু টাকা দিয়ে গুটি কিনেছিস। আর আমি… চাল বদলাতে শিখেছি।
শোন ! টাকা দিয়ে ক্ষমতা কেনা যায়।
কিন্তু সম্মান, প্রভাব আর মানুষের মন ওগুলো মগজ দিয়ে বানাতে হয়। সেখানেই তুমি ব্যবসায়ী রয়ে গেছিস
আর আমি রাজনীতিবিদ হয়ে গেছি।

দেখতে দেখতে নির্বাচনের দিন একেবারে দরজায় এসে দাঁড়িয়েছে। চারদিকে চাপা উত্তেজনা, পোস্টারে ভরা দেয়াল, মাইকিংয়ের শব্দ, কর্মীদের ছোটাছুটি— পুরো শহর যেন রাজনীতির উত্তাপে জ্বলছে।
নির্বাচনের আগের রাত থেকেই নিলয়ের ভেতরে অদ্ভুত এক অস্থিরতা কাজ করছিল।
সে রাজনীতির সাথে নতুন নয় এমন না প্রফেশনাল ভাবে নেয় নি কখনো । কিন্তু ছোটবেলা থেকেই বাবার সঙ্গে মিটিং-মিছিল, ক্ষমতার খেলা, মানুষকে ব্যবহার করা— সবই দেখে এসেছে। কিন্তু তাতে তার ভ্রুক্ষেপ ছিল না। তার সমস্ত মস্তিষ্ক তখন ব্যস্ত ছিল মেয়ে নেশায়! তাই তো রাজনীতি করেছে টুকটাক। সেটা ভার্সিটি কলেজে সীমাবদ্ধ ছিল। আড়ালে অনৈতিক ব্যবসা সাথে জড়িয়ে বাবাকে টপকিয়ে দেশের সীমানা পেরিয়ে বিদেশেও প্রভাব বিস্তার করছে এখন। কিন্তু তার নাম আড়ালে অনেক গভিরে যা সহজে কেউ পাবে না ।
” এদিকে শামসুল কিছুটা অবাক এত বছর পর জাওয়াদ খান বাহিরে থেকেও দেশে এসে রাজনীতিতে নামার পর জাওয়াদ খানের এতটা প্রভাব তৈরি করবে , এটা সে কখনো কল্পনাও করেনি শামসুল আজমির চৌধুরী ও নিলয় চৌধুরী।
লোকটা যেন ধীরে ধীরে পুরো শহরটাকেই নিজের মুঠোয় বন্দী করে ফেলছে। প্রশাসনের করিডোর থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের আড্ডা— সবখানেই এখন একটাই নাম উচ্চারিত হয় নিচু স্বরে, সতর্ক দৃষ্টিতে।
ভয়, সম্মান, বিস্ময়— তিনটেই যেন একসাথে জড়িয়ে আছে তার নামের সাথে। শেহতাজ খান নাভানের বাবা, এডভোকেট এম এল এ কাজল খানের স্বামী।

ঢাকার রাজনীতির অন্দরে সে এখন নতুন এক আলোচিত মুখ নাভান। অথচ এই ছেলেটা কখনো সামনে এসে ক্ষমতার বড়াই করেনি। সে চুপচাপ ছিল, নির্লিপ্ত ছিল। কিন্তু তার নীরবতার আড়ালেই লুকিয়ে ছিল ভয়ংকর এক প্রভাব।
সবাই ভাবে নাভান নিজের যোগ্যতায় উঠেছে।
কেউ বলে তার ব্যক্তিত্ব, কেউ বলে তার বুদ্ধি, আবার কেউ বলে তার ভয়ংকর ঠান্ডা মাথার সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা— এগুলোই তাকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে। কিন্তু খুব কম মানুষই জানে, তার পিছনে রয়েছে আরও লম্বা এক ছায়া।আর সেই ছায়ার নাম—
অ্যাডভোকেট এম.এল.এ কাজল খান।
এই সত্যিটা সবার আগে বুঝেছিল নিলয়।
সে স্পষ্ট বুঝতে পেরেছিল, নাভানের উত্থান এত সহজ নয়। কেউ না কেউ তাকে আড়াল থেকে শক্ত করে আগলে রেখেছে। আর সেই মানুষটা যে তার নিজের মা— সেটা বুঝতে তার খুব বেশি সময় লাগেনি।
নিলয় নিজের বাবাকেও বলেছিল কথাটা।
তার বাবা প্রথমে নাভানকে সন্দেহ করলেও একটা বিষয় কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারেননি—
অ্যাডভোকেট কাজল খান এই খেলায় জড়িত! এই নির্বাচনে আড়ালে তার প্রভাব রয়েছে!
কারণ কাজল খান সবসময় নিজেকে নিরপেক্ষ রেখেছেন। রাজনীতিতে থেকেও তিনি কখনো প্রকাশ্যে নিজের ক্ষমতার অপব্যবহার করেননি।
বরং মানুষ তাকে চিনেছে একজন ঠান্ডা মাথার, হিসেবি, দূরদর্শী নারী হিসেবে। তাই তাকে এই অন্ধকার খেলায় কল্পনা করাটাই কঠিন।

কিন্তু নিলয় জানে, আড়ালের গল্প সবসময় সামনে দেখা গল্পের মতো হয় না।
শামসুলের সাথে কাজল খানের গোপন কথোপকথনের বিষয়টা সে জানে না। কিন্তু অনুভব করতে পারে—
এই খেলাটা শুধু রাজনীতির নয়। এখানে ভয় আছে, হুমকি আছে, সম্পর্ককে অস্ত্র বানানোর নির্মম ক্ষমতা আছে।
কাজল খান সরাসরি কিছু না বললেও শামসুলকে বুঝিয়ে দিয়েছিল—রাজনীতির এই খেলায় সীমা অতিক্রম করলে, খুব ক্ষতি হবে! আর সেই ভয়ে আজো শামসুলকে দ্বিধায় রাখে।
অন্যদিকে নিলয় প্রতিদিন জ্বলছে প্রতিহিংসার আগুনে।
কারণ তার চোখে নাভান সবসময় ছিল “ক্ষমতার ছেলে”যে নিজের মায়ের রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে ভার্সিটি এরিয়ায় রাজ করেছে, প্রভাব বিস্তার করেছে, মানুষের উপর আধিপত্য দেখিয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে নাভানের নাম মানেই ছিল এক অদৃশ্য কর্তৃত্ব। যেটা সে করে নি, নিজ বাবা মন্ত্রী থাকার পরেও এতো বড়াই করে নি।

যখন পাত্তা না পেতো তখন বাবার নাম একবার উল্লেখ করেছিলো কিন্তু তাও তার উপস্থিতিতে সিনিয়ররা পর্যন্ত হিসেব করে কথা বলত নাভানের সাথে ।
কেউ তাকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করার সাহস পেত না।
আইন, প্রশাসন, ছাত্ররাজনীতি—
সবখানেই যেন তার অদৃশ্য হাত ছিল।
কিন্তু নিলয়ের ধারণাটা সম্পূর্ণ ভুল।
কারণ নাভান কখনোই নিজের পরিচয় তৈরি করেনি মায়ের ক্ষমতার উপর দাঁড়িয়ে।
বরং সে সবসময় চেষ্টা করেছে রাজনীতি থেকে দূরে থাকতে। কাজল খানের ছেলে হয়েও নিজেকে আড়ালেই রেখেছে। ক্ষমতার চেয়ে নিজের পরিচয়কে বড় করতে চেয়েছে। তার আসল ভয়ংকর দিকটা ছিল অন্য জায়গায়। নাভানের দুটো পরিচয় আছে।
একটা পরিচয় সবাই দেখে—
শান্ত, গম্ভীর, হিসেবি এক যুবক।
যে খুব কম কথা বলে, কিন্তু তার উপস্থিতিই চারপাশ নিস্তব্ধ করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। অন্যায়কে অন্যায় বলার সাহস রাখে।

আরেকটা পরিচয় আছে আড়ালে—
যেখানে সে ভয়ংকর ঠান্ডা মাথার খেলোয়াড়।
যে নিজের আবেগ লুকিয়ে রেখে মানুষকে পড়তে পারে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। আর প্রয়োজন হলে সম্পূর্ণ শহরের গতিপথ বদলে দেওয়ার ক্ষমতাও রাখে।
সে কখনো রাজনীতিকে ভালোবাসেনি।
রাজনীতির নোংরা খেলাকে বরং ঘৃণা করত।
কিন্তু ভাগ্যের সবচেয়ে অদ্ভুত পরিহাস—
যে ছেলে সারাজীবন নিজেকে এই খেলা থেকে দূরে রাখতে চেয়েছে, সেই ছেলেকেই শেষ পর্যন্ত রাজনীতির মাঠে নামতে হয়েছে। তাও নিজের জন্য নয়।
নিজের বাবার জন্য।
এই প্রথম নাভান প্রকাশ্যে লড়ছে।
এই প্রথম সে নিজের নামকে সামনে এনেছে।
কারণ এবার বিষয়টা ক্ষমতার নয়— বিষয়টা তার প্রিয় মানুষ এর ।
যার সাথে নাভানের সম্পর্ক সবসময় দূরত্বে ভরা ছিল। আড়ালে বাবাকে কতো মিস করে গেয়েছিলো গান। গিটার টা তার শখের। খুব শখের।

এখন পুরো শহর দেখছে এক অদ্ভুত দৃশ্য—
যে ছেলে কখনো বাবার পাশে দাঁড়ায়নি না দাঁড়িয়েছে বাবা। সেই ছেলেই আজ সবার সামনে বাবার ঢাল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
আর সবচেয়ে অবাক করা বিষয়—
কাজল খান কিছুই করছেন না।না কোনো বাধা।
না কোনো আপত্তি।
কারণ তিনি জানেন, এবার নাভান রাজনীতি করছে ক্ষমতার জন্য নয় । সে লড়ছে নিজের রক্তের মানুষের জন্য। আর এই লড়াইয়ে নাভান সবচেয়ে বেশি ভয়ংকর।
আর সেই কারণেই নিলয়ের ভিতরে জমে আছে ভয়ংকর এক জেদ। জাওয়াদ খানকে হারানো এখন তার কাছে শুধুমাত্র রাজনৈতিক প্রতিশোধ নয়… ব্যক্তিগত যুদ্ধ।
কারণ মানুষটা বারবার হেরাকে তার কাছ থেকে দূরে সরিয়ে দিয়েছে।বারবার অপমান করেছে।
বারবার বুঝিয়ে দিয়েছে— “নিলয় কখনো হেরার যোগ্য না।” সেই অপমানই আজ আগুন হয়ে জ্বলছে তার ভেতরে।
তাই বাবার সাথে হাত মিলিয়ে রাজনীতিতে নামার মূল উদ্দেশ্যই ছিল একটাই— জাওয়াদ খানকে নিচে নামানো। তার ক্ষমতার মাটি টেনে ধরা।

সকালে ভোট শুরু হতেই পুরো শহরের পরিবেশ বদলে গেল। প্রতিটা ভোটকেন্দ্রে টানটান উত্তেজনা।
কোথাও কর্মীদের স্লোগান, কোথাও পুলিশের কড়া নজরদারি, কোথাও চাপা ফিসফাস।
প্রথম ভোটটা প্রতিপক্ষ দুই দল দিয়েই এসেছে।
খবরটা ছড়িয়ে পড়তেই দুই পক্ষের মাঝেই চাপা অস্বস্তি তৈরি হয়।
ভোট দেওয়ার পর একসাথে বসেছিল জাওয়াদ খান, শামসুল আজমীর চৌধুরী, এডভোকেট এম এল এ কাজল খান আরো কিছু নামি দামি প্রশাসনের লোক!
উপরে উপরে সবাই স্বাভাবিক থাকলেও ভেতরে ভেতরে প্রত্যেকেই হিসাব কষছে। বিশেষ করে এডভোকেট কাজল খান
চুপচাপ বসে থাকলেও তার চোখদুটো ভয়ংকর ঠান্ডা।
সে এমনভাবে পুরো ভোটের সিস্টেম সাজিয়েছে যেন একটা ভোটও এদিক-সেদিক না হয়।
প্রতিটা কেন্দ্রেই তার লোক ছড়িয়ে আছে।
কে কোথায় দাঁড়াবে, কোথায় সমস্যা হতে পারে, কোন কেন্দে কারা হামলা করতে পারে— সব হিসাব তার মাথায়।
অন্যদিকে নাভান পুরো ব্যাপারটা দূর থেকে পর্যবেক্ষণ করছিল।
সাদা শার্টের হাতা গুটানো, চোখেমুখে বিরক্তিহীন কঠিন ভাব। চারপাশে এত উত্তেজনা, এত চাপ— অথচ ছেলেটার ভেতরে কোনো অস্থিরতা নেই।
কিন্তু একটা জায়গায় সে ভয়ংকর সতর্ক—
তার বাবা নিজের নিরাপত্তা নিয়ে কখনো ভাবে না।

এদিকে বন্ধু মহল সবাই যেন নিজ জীবনে ঠিকঠাক চলছে। সৃজন এখন আগের মতো আর ভেঙে পড়ে না। সময়ের সাথে সাথে ছেলেটা অনেকটাই বদলে গেছে—এখন সে আবেগে ভেসে যায় না, বরং দায়িত্বকে নিজের কাঁধে শক্ত করে ধরে রাখে।
রোজকে তাদের বাসা থেকে আনার পর সৃজন যেন এক নতুন মানুষ। তার প্রতিটা সিদ্ধান্তে এখন পরিপক্বতা দেখা যায়। কোনো কিছুতেই আর গাফিলতি নেই, নেই অবহেলা। রোজের প্রতিটা প্রয়োজন সে নিখুঁতভাবে দেখভাল করছে—ছোট ছোট বিষয়েও তার নজর তীক্ষ্ণ।

রোজের প্রতি তার ভালোবাসাটা অদ্ভুত, কিন্তু খুব স্থির এবং গভীর। সেটা দেখানোর জন্য বড় বড় কথা নেই, আছে শুধু কাজের মাধ্যমে যত্ন, দায়িত্ব আর নীরব ভালোবাসা। এই পরিবর্তনটা দেখে সবাইও বেশ সন্তুষ্ট—সৃজনকে এখন আর আগের সেই ভাঙা মানুষ হিসেবে নয়, বরং একজন দায়িত্বশীল, স্থির এবং বিশ্বাসযোগ্য মানুষ হিসেবে দেখছে। ঝিনুকও কম না।
তুষারের সাথে তার খুনসুটি আগের মতোই চলছে, কিন্তু প্রয়োজনের সময় মেয়েটা অনেক সিরিয়াস হয়ে যায়।
অধীর আর রুশা—এখন যেন এক প্রাণ, এক শ্বাসে বাঁধা দুটো নাম। ঘণ্টা পেরোতেই কথা না হলে অধীরের ভেতরটা অস্থির হয়ে ওঠে। পাগলের মতো ছুটে যায় তার “লাল গোলাপি” রুশার কাছে।
কিছুদিন আগের ঘটনা—রুশা হঠাৎ পড়ে গিয়ে পায়ে আঘাত পেয়েছিল। সেই মুহূর্তে অধীর যেন নিজের ভেতরকার সবটা হারিয়ে ফেলেছিল। ছোটাছুটি করে একগাদা ওষুধ এনে ফেলেছিল, যা দেখে বন্ধুমহল অবাক হয়ে হাসাহাসিও করেছিল। হাসির ভিড়ের মাঝেও অধীরের চোখে ছিল একটাই ভয়—রুশার কষ্ট।
ড্রেসিং করাতে গিয়ে একদিন অল্প উত্তেজনায় সে অস্থির হয়ে উঠেছিল; ডাক্তার ব্যথা দিতেই মুহূর্তের আবেগে তার আচরণ একটু কঠোর হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু সেটা কোনো ক্ষতির ইচ্ছা ছিল না—ছিল রুশার প্রতি অন্ধ টান আর অস্থির ভালোবাসার অগোছালো প্রকাশ। এরপর থেকেই সে নিজেই ড্রেসিং শিখে নেয়, প্রতিদিন নিজের হাতে খুব যত্ন করে রুশার ব্যান্ডেজ বদলে দিত। রুশা তখন শুধু চুপচাপ তাকিয়ে থাকত—অধীরের এই পাগলামি, এই নিঃশব্দ যত্ন তাকে এক অদ্ভুত বিস্ময়ে আচ্ছন্ন করে রাখত।

সবাই নিজের নিজের জায়গা থেকে যেন এক অদ্ভুত ভারসাম্যে দাঁড়িয়ে আছে।শুধু একটা জায়গায় এখনও অস্বস্তি রয়ে গেছে—নাভান আর হেরা।
তাদের মাঝের দূরত্বটা এখনও পুরোপুরি কমেনি।
নাভান চাইলে হেরার কাছে যেতে পারত।
জোর করতে পারত। নিজের অধিকার দেখাতে পারত।কিন্তু সে তা করেনি ইচ্ছে করেই। হেরাকে সময় দিচ্ছে।
কারণ সে জানে—মেয়েটা এখনও নিজেকে গুছিয়ে নেওয়ার যুদ্ধের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
এখনও সে নিজের বাবার সম্পর্ক ঠিক করতে পারেনি। তার উপর নতুন রহস্য এসে সবকিছু আরও জটিল করে তুলেছে। নাভান আপাতত তাকে চাপ দিচ্ছে না।
তবে এটা না যে সে হেরার খোঁজ রাখে না।
বরং প্রতিনিয়তই কোনো না কোনোভাবে হেরাকে নজরে রাখছে।
এর আগেই নিলয়কে হেরার আশেপাশে ঘেঁষতে নিষেধ করে দিয়েছে সে। তারপরও নিলয় থামেনি।
বারবার কোনো না কোনোভাবে হেরার সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করছে। নিজের উন্মাদ ভালোবাসা প্রকাশ করছে। কিন্তু এবার হেরা নিরব।
সম্পূর্ণ নিরব। কারণ তার হাতে এখন আরও বড় একটা রহস্য এসে ধরা দিয়েছে। নেপালে পড়ে থাকা সেই ডায়েরি।যেটার ভেতরে লুকিয়ে আছে বহু বছরের অজানা সত্য।
সে নেপালে যেতে পারছে না এখন।
নির্বাচন শেষ না হওয়া পর্যন্ত সম্ভবও না।
কিন্তু ডায়েরিটা একবার হাতে পেলেই—
হয়তো সব রহস্যের পর্দা একটু হলেও সরে যাবে।

ভোট গণনা শুরু হওয়ার কিছুক্ষণ পর যখন কয়েকটা কেন্দ্র থেকে মারামারির খবর আসতে শুরু করল, তখনই নাভানের চোখের দৃষ্টি বদলে গেল।
একজন লোক দৌড়ে এসে হাঁপাতে হাঁপাতে বলল–
“ ভাই, ১২ নাম্বার কেন্দ্রটায় সমস্যা শুরু হইছে। দুই দলের মধ্যে হাতাহাতি হইতেছে!
আরেকজন এসে বলল–
“ নিলয়ের লোকজন নাকি ব্যালট নিয়ে ঝামেলা করতেছে!
পরিস্থিতি খারাপ হতে খুব বেশি সময় লাগল না।
কিছুক্ষণের মধ্যেই বাইরে স্লোগানের শব্দ বাড়তে লাগল।তারপর—ভাঙচুর,চিৎকার,দৌড়াদৌড়ি।
হঠাৎ কোথাও একটা গুলির শব্দ শোনা গেল।
চারপাশ মুহূর্তেই বিশৃঙ্খলায় ভরে উঠল।
নাভান সাথে সাথে দাঁড়িয়ে গেল।
তার চোয়াল শক্ত হয়ে উঠেছে।
সে ঠান্ডা গলায় বলল–
“বাবা এখান থেকে সরে যাও।”
জাওয়াদ খান বিরক্ত হয়ে তাকালেন।

“ আমি পালাবো?
নাভান নির্বিকার।
“ এটা পালানো না। তুমি টার্গেট।
কারণ সে খুব ভালো করেই জানে—
আজকের রাতের আসল লক্ষ্য জাওয়াদ খান।
নিলয় আর শামসুল আজমীর চৌধুরী সরাসরি জাওয়াদ খানকে আঘাত করতে চায়।
রাজনৈতিকভাবে, ব্যক্তিগতভাবে— সবদিক থেকেই।
আর সেই কারণেই নাভান কোনো রিস্ক নিতে চাইল না।
সে নিজে সামনে দাঁড়িয়ে পুরো পরিস্থিতি সামলাতে লাগল। আর জাওয়াদ খানকে নিরাপদ জায়গায় সরিয়ে নেওয়ার দায়িত্ব দিল সৃজন আর ঝিনুককে।
অধীরকে ইচ্ছে করেই দূরে রাখা হয়েছে।
ছেলেটা এসব দেখতে পারে না। রক্ত দেখলে তার হাত কেঁপে ওঠে। গুলির শব্দে মুখ ফ্যাকাশে হয়ে যায়। এই সহিংসতা তার জন্য না।

ঢাকার খান বাড়িটা আজ যেন অদ্ভুত এক নীরবতায় ডুবে আছে। বাইরে পুরো শহর জ্বলছে রাজনৈতিক উত্তেজনায়, আর ভিতরে এই বিশাল বাড়ির ড্রইংরুমে জমে আছে অজানা আতঙ্ক।
দেয়ালে টাঙানো বড় টিভিটার সামনে বসে আছে রোজ, রোসা আর হেরা।তিনজনের চোখই স্থির হয়ে আছে নিউজ চ্যানেলের দিকে। একটার পর একটা লাইভ ফুটেজ ভেসে উঠছে পর্দায়— কোথাও মিছিল, কোথাও ভাঙচুর, কোথাও আবার রক্তাক্ত মানুষকে স্ট্রেচারে তুলে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।
জাওয়াদ খানের কড়া নির্দেশ,
“ কেউ বাড়ির বাইরে যাবে না। এক পা-ও না।”
আর সেই কথাটা অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলছে তারা।
বিশেষ করে হেরা। তার বুকের ভিতরটা কেমন হাহাকার করে উঠছে বারবার।
কারণ সে খুব ভালো করেই জানে—
নিলয় যেভাবে পরিস্থিতি গরম করছে, তাতে আজ কিছু একটা ভয়ংকর হবেই।
নির্বাচনটা সুন্দরভাবেও হতে পারত।
শান্তিপূর্ণভাবেও শেষ করা যেত।
কিন্তু না… ক্ষমতার নেশা মানুষকে অন্ধ করে দেয়।
নিলয় যেন মরিয়া হয়ে উঠেছে।
একের পর এক আক্রমণ, ভয় দেখানো, মানুষ পাঠানো— সবকিছুতেই আগুনে ঘি ঢালছে সে।
আর অন্যদিকে নাভান…

সে এমন মানুষ না যে চুপচাপ সব সহ্য করবে।
হেরা চোখ বন্ধ করল এক মুহূর্তের জন্য।
তার মনে হচ্ছিল বুকের ভিতর কেউ পাথর চেপে ধরেছে।
আঙুলগুলো ঠান্ডা হয়ে আসছে।
রোজ ফিসফিস করে বলল,
“আল্লাহ… এসব কোথায় গিয়ে থামবে?
রুশা চুপচাপ।
তার চোখেও স্পষ্ট ভয়।
কিন্তু হেরা কোনো উত্তর দিতে পারল না।
তার সমস্ত মনোযোগ আটকে আছে টিভির পর্দায়।
স্ক্রিনে ভেসে উঠল আরেকটা লাইভ দৃশ্য।
চারপাশে বিশৃঙ্খলা। সাংবাদিকদের চিৎকার, মানুষের দৌড়াদৌড়ি, পুলিশের সাইরেন— সব মিলিয়ে যেন যুদ্ধক্ষেত্র।
সেখানে স্পষ্ট দেখা গেল সৃজন, ঝিনুক আর তুষার নাভানের পাশে দাঁড়িয়ে আছে।
তিনজনের চোখেমুখে ভয় নেই, বরং অদ্ভুত এক দৃঢ়তা।
কারণ তারা নিজেদের রক্ষা করতে জানে।
মারামারি, সংঘর্ষ— এসব তাদের জন্য নতুন কিছু নয়।
তুষারের শার্ট ছিঁড়ে গেছে কাঁধের কাছে।
সৃজনের ঠোঁটের কোণে শুকিয়ে যাওয়া রক্ত।
ঝিনুকের চোখে আগুনের মতো রাগ।

তবুও তারা নাভানের চারপাশে দেয়ালের মতো দাঁড়িয়ে আছে। হঠাৎ ক্যামেরাটা জুম হতেই হেরার নিঃশ্বাস যেন থেমে গেল। নাভানের হাত থেকে রক্ত ঝরছে।
ঝরঝর করে। সাদা শার্টের হাতা পুরো লাল হয়ে গেছে।
কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার—
নিজের রক্তের দিকে তার কোনো খেয়ালই নেই।
বরং সে একটা আহত ছেলেকে দুই হাতে ধরে দ্রুত হাসপাতালের দিকে নিয়ে যাচ্ছে।
চারপাশে মিডিয়ার ফ্ল্যাশ।
সাংবাদিকরা মাইক নিয়ে ঘিরে ধরছে তাকে।
“ শেহতাজ খান নাভান ! এখানে কী হয়েছে? এটা কি পরিকল্পিত হামলা? আপনার উপরও বিরোধী দল আক্রমণ করেছে ?

কিন্তু নাভান একবারও পিছনে তাকাল না।
তার চোখে তখন শুধুই কঠিন আগুন আর ভয়ংকর স্থিরতা। যেন পুরো শহর জ্বলে গেলেও সে থামবে না।
হেরার হাত কাঁপতে শুরু করল।
রিমোটটা প্রায় হাত থেকে পড়ে যাচ্ছিল।
তার বুকের ভিতরটা মোচড় দিয়ে উঠল।
রক্ত…নাভানের রক্ত।
কয়েক সেকেন্ডের জন্য তার চারপাশের সব শব্দ যেন বন্ধ হয়ে গেল। শুধু টিভির স্ক্রিনে সেই রক্তমাখা হাতটাই দেখতে পাচ্ছে সে।
সাংবাদিকদের ভিড় যেন ক্রমেই আগ্রাসী হয়ে উঠছিল।
ক্যামেরার ফ্ল্যাশ একের পর এক জ্বলছে। চারপাশে দলীয় কর্মীদের গুঞ্জন, উত্তেজনা— সব মিলিয়ে পুরো পরিবেশ ভারী।
ঠিক তখনই একজন সিনিয়র সাংবাদিক সামনে এগিয়ে এলো।মাইক্রোফোনটা প্রায় নাভানের মুখের সামনে ধরে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিল—

“ শেহতাজ খান নাভান, আপনার বাবা জাওয়াদ খান তো বছরের পর বছর দেশের বাইরে ছিলেন। দেশের রাজনীতি, মানুষের বাস্তবতা, গ্রামের কষ্ট— এগুলো থেকে তিনি বিচ্ছিন্ন ছিলেন। তাহলে হঠাৎ দেশে ফিরে এত বড় রাজনৈতিক অবস্থান কীভাবে পেলেন? এটা কি শুধুই আপনার নামের প্রভাব? নাকি আপনার মা অ্যাডভোকেট এম এল এ কাজল খানের রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করেই তিনি ক্ষমতার মঞ্চে উঠেছেন?
প্রশ্নটা শেষ হতেই চারপাশে চাপা শব্দ উঠল।
কেউ বিরক্ত, কেউ কৌতূহলী।
নাভান কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল।
তারপর ধীরে মাথা তুলল।
চোখদুটো অস্বাভাবিক ঠান্ডা।
সে সাংবাদিকের দিকে তাকিয়ে ধীর গলায় বলল—
“ আপনাদের একটা সমস্যা কী জানেন?”
চারপাশ নিস্তব্ধ।

“ আপনারা ভাবেন রাজনীতি মানেই উত্তরাধিকার… কারো নাম… কারো ছায়া। অথচ একটা মানুষ নিজের যোগ্যতায় জায়গা তৈরি করতে পারে— সেটা মানতে আপনাদের কষ্ট হয়।
সাংবাদিক আবার কিছু বলতে যাবে, নাভান থামিয়ে দিল।
“ আমার বাবা দেশের বাইরে ছিলেন, ঠিক। কিন্তু দেশের বাইরে থাকা মানে দেশকে ভুলে যাওয়া না। দেশের জন্য কাজ শুধু মাটিতে দাঁড়িয়ে করতে হয় না। অনেকেই দেশের ভেতরে থেকেও দেশের ক্ষতি করে… আবার কেউ হাজার মাইল দূরে থেকেও দেশের জন্য নিজের সময়, অর্থ, প্রভাব— সবকিছু ব্যয় করে।
তার কণ্ঠ এবার আরও ভারী হয়ে উঠল।
“ আর একটা কথা পরিষ্কার করে শুনে রাখুন…
জাওয়াদ খান কারো দয়ার উপর রাজনীতি করছে না।”
চারপাশে চাপা গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে।
নাভান এবার এক পা সামনে এগিয়ে এল।

“ তিনি আমার নাম ব্যবহার করে দাঁড়াননি। আমি বরং আজ এই জায়গায় দাঁড়িয়ে আছি তার তৈরি করা ভিত্তির উপর।
সাংবাদিক থমকে গেল।
নাভান ঠান্ডা হাসল।
“ আর আমার মায়ের নাম টেনে রাজনৈতিক গল্প বানানোর চেষ্টা করবেন না। কাজল খান নিজের পরিচয়ে যথেষ্ট বড় একজন মানুষ। তাকে কারো ‘সিঁড়ি’ বানানোর প্রয়োজন পড়ে না।”
কথাটা শেষ হতেই আশেপাশে থাকা অনেকেই চুপ হয়ে যায়। নাভান এবার চারপাশে তাকাল।
তার চোখে তখন স্পষ্ট আত্মবিশ্বাস আর অদ্ভুত এক রাজনৈতিক দৃঢ়তা।
“ আপনারা বারবার একটা পরিবারকে কেন্দ্র করে প্রশ্ন করেন। অথচ ভুলে যান— রাজনীতি কোনো পরিবারের সম্পত্তি না।
সে মাইক্রোফোনটা ধীরে সরিয়ে দিল।
“মানুষ যদি যোগ্য মনে করে, তাহলে তারা জায়গা দেয়। আর যদি অযোগ্য মনে করে— নাম, পরিচয়, ক্ষমতা কিছুই টিকিয়ে রাখতে পারে না।
একজন সাংবাদিক আবার বলল—
“ তাহলে আপনি বলছেন, আপনার বাবার বর্তমান অবস্থানের পেছনে আপনার বা আপনার মায়ের কোনো প্রভাব নেই?”
নাভান এবার সরাসরি তার চোখে চোখ রাখল।
তার ঠোঁটের কোণে হালকা বাঁকা হাসি ফুটে উঠল।

“প্রভাব আছে।”
চারপাশ আবার নীরব।
সাংবাদিকদের ভিড় যেন ক্রমেই আগ্রাসী হয়ে উঠছিল।
ক্যামেরার ফ্ল্যাশ একের পর এক জ্বলছে। চারপাশে দলীয় কর্মীদের গুঞ্জন, উত্তেজনা— সব মিলিয়ে পুরো পরিবেশ ভারী।
ঠিক তখনই একজন সিনিয়র সাংবাদিক সামনে এগিয়ে এলো। মাইক্রোফোনটা প্রায় নাভানের মুখের সামনে ধরে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিল—
“ তাহলে আপনি বলছেন, আপনার বাবার বর্তমান অবস্থানের পেছনে আপনার বা আপনার মায়ের কোনো প্রভাব নেই?”
নাভান এবার সরাসরি তার চোখে চোখ রাখল।
তার ঠোঁটের কোণে হালকা বাঁকা হাসি ফুটে উঠল।
“প্রভাব আছে।”
চারপাশ আবার নীরব।
“ তবে সেটা নামের না… শিক্ষার।
আমি আর মা দু’জনই একটা জিনিস শিখেছি— মাথা নত করে রাজনীতি করা যায় না।”
কথাটা বলেই সে সামনে হাঁটা শুরু করল।
পেছনে সাংবাদিকদের চিৎকার, নতুন নতুন প্রশ্ন, ক্যামেরার ঝলকানি চলতেই থাকল।
কিন্তু শেহতাজ খান নাভান আর একবারও পেছনে তাকাল না। সাংবাদিক এবার আরেকটু সামনে এগিয়ে এল। তার কণ্ঠে এবার সরাসরি চ্যালেঞ্জ।

“ তাহলে আপনি বলতে চাইছেন, আপনার বা আপনার মায়ের কোনো প্রভাবই নেই এই দলে? জাওয়াদ খানের রাজনৈতিক উত্থানের পেছনে আপনাদের নাম ব্যবহার হয়নি? মানুষ কি শুধু হঠাৎ করেই তাকে গ্রহণ করে নিল?”
প্রশ্নটা শেষ হতেই চারপাশে আবার গুঞ্জন উঠল।
নাভান কিছুক্ষণ চুপ করে সাংবাদিকটার দিকে তাকিয়ে রইল। তার সেই চিরচেনা ঠান্ডা দৃষ্টি।
তারপর খুব ধীরে বলল—
“ আপনারা একটা জিনিস খুব সহজে ভুলে যান।”
চারপাশ নিস্তব্ধ।
“ মানুষ কোনো নামকে বছরের পর বছর সম্মান দেয় না… যদি সেই নামের পেছনে কাজ না থাকে।
সাংবাদিক থমকে গেল।
নাভান এবার গম্ভীর গলায় বলতে শুরু করল—

“ আমার বাবা দেশের বাইরে ছিলেন, ঠিক। কিন্তু সেই সময়েও বাংলাদেশের হাজার হাজার মানুষের সাথে তার যোগাযোগ ছিল। দেশের গরিব মানুষদের জন্য তিনি যেভাবে সাহায্য করেছেন, যেভাবে কাজ করেছেন— সেটা নতুন কিছু না।”
সে এবার চারপাশে তাকাল।
“ বড় বড় রাজনৈতিক দলের অনেক নেতাই জানে, জাওয়াদ খান কত বছর ধরে নীরবে মানুষের পাশে ছিল। ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে না… পোস্টার লাগিয়ে না… বরং আড়াল থেকে।”
তার কণ্ঠে এবার চাপা দৃঢ়তা।
“ মানুষ কাউকে একদিনে গ্রহণ করে না।
বিশ্বাস তৈরি করতে সময় লাগে। সম্মান অর্জন করতে আরও বেশি সময় লাগে।”
একজন সাংবাদিক আবার বলে উঠল—

“তবুও আপনার জনপ্রিয়তা তো অস্বীকার করার উপায় নেই। আপনার নামের প্রভাব নেই বলবেন?”
নাভানের ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি ফুটল।
“মানুষ যদি আমাকে পছন্দ করে… তাহলে নিশ্চয়ই কোনো কারণ আছে।”
চারপাশে হালকা গুঞ্জন।
“ আমি কখনো মানুষের ক্ষতি চাইনি। মানুষ আমাকে যেভাবে চেনে, আমি কেমন— সেটা তারা জানে। আর মানুষ যখন কাউকে বিশ্বাস করে, তখন তার পরিবারকেও সম্মান দেয়।
সে এবার মাইক্রোফোনের দিকে একটু ঝুঁকে এল।
“ আমার নাম ব্যবহার হয়েছে কি না, সেটা নিয়ে এত চিন্তা করার দরকার নেই। গুরুত্বপূর্ণ হলো— মানুষ কাকে বিশ্বাস করছে।”
তার গলা আরও ভারী হয়ে উঠল।
“ কারণ এই দেশের মানুষ বোকা না। তারা খুব ভালো করেই বুঝে কে অভিনয় করছে আর কে সত্যি পাশে দাঁড়িয়েছে।”
সাংবাদিক চুপ।
নাভান এবার শেষবারের মতো বলল—
“ আর একটা কথা মনে রাখবেন…
সম্মান কখনো জোর করে আদায় করা যায় না।
মানুষ নিজেরাই দেয়।”
কথাটা বলেই সে ধীরে মাইক্রোফোন সরিয়ে সামনে এগিয়ে গেল।
পেছনে ক্যামেরার ঝলকানি চলতেই থাকল।
কিন্তু সেই মুহূর্তে পুরো মঞ্চে সবচেয়ে ভারী জিনিস ছিল— শেহতাজ খান নাভানের শান্ত অথচ ধারালো উত্তর।
নাভানের কথার পরও সাংবাদিক থামল না।
সে আবার মাইক্রোফোন এগিয়ে দিল।

— “ তাহলে আপনি বলতে চাইছেন, আপনারা কেউ কারো অবস্থান ব্যবহার করেননি? আপনার মা নিজের জায়গা তৈরি করেছেন, আপনার বাবা নিজের জায়গা… আর আপনি নিজের? এটা কি বাস্তবে সম্ভব?”
চারপাশে চাপা গুঞ্জন উঠল।
নাভান কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল।
তারপর খুব ধীরে মাথা তুলল।
চোখে অদ্ভুত শান্ত একটা দৃঢ়তা।
“ গর্ব করে একটা কথা বলতে পারি…”
চারপাশ নিস্তব্ধ হয়ে গেল।
“এই মানুষটা আমার জন্মদাতা বাবা।
আর অ্যাডভোকেট এমএলএ কাজল খান আমার জন্মদাতা মা।”
তার কণ্ঠে অহংকার ছিল না— ছিল সম্মান।
“ আমি তাদের পরিচয়ে ছোট হই না। বরং গর্ববোধ করি।”
সাংবাদিকরা একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে।
নাভান এবার ধীরে বলল—

“ ঠিক যেমন আমি তাদের নিয়ে গর্ব করি… তেমনি তারাও আমাকে নিয়ে গর্ব করে। এটাই পরিবার।”
চারপাশে হালকা গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে।
“ হয়তো আমার বাবা-মা দীর্ঘ সময় দূরে ছিলেন।
লং ডিস্ট্যান্স ছিল।কিন্তু একটা জিনিস কখনো দূরে যায়নি— তাদের সততা।”
তার গলা ভারী হয়ে উঠল।
“ তারা দু’জনই নিজের জায়গা নিজেরা তৈরি করেছে।
আমার মা নিজের যোগ্যতায় মানুষের সম্মান পেয়েছে।
আমার বাবা নিজের কাজ দিয়ে মানুষের বিশ্বাস অর্জন করেছে।আর আমি… আমি চেষ্টা করছি নিজের পরিচয় নিজে গড়তে।”
একজন সাংবাদিক কিছু বলতে যাবে, নাভান থামিয়ে দিল।
“ কারো ছায়ায় দাঁড়িয়ে না।
কারো নাম ভাঙিয়ে না।”
তার চোখ এবার সরাসরি ক্যামেরার দিকে।
“ আমি যে শিক্ষা পেয়েছি, সেটা ক্ষমতার না… চরিত্রের।
আমার বাবা-মা আমাকে শিখিয়েছে— মানুষ বড় হয় পদবিতে না, সততায়।”
চারপাশ একদম চুপ।

“ তারা পবিত্র ছিল বলেই আমি আজও মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারি।তাদের সম্পর্ক নিয়ে মানুষ প্রশ্ন তুলতে পারে… কিন্তু তাদের চরিত্র নিয়ে না।”
তার কণ্ঠে এবার চাপা তেজ।
“ কারণ তারা কখনো কাউকে ঠকিয়ে নিজেদের অবস্থান তৈরি করেনি।”
সাংবাদিক ধীরে বলল—
“ তাহলে আপনি বলতে চাইছেন, আপনাদের তিনজনের পরিচয় আলাদা?”
নাভানের ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি ফুটল।
“ পরিচয় আলাদা।
কিন্তু সম্মান এক। রক্ত এক। ভালোবাসা, মায়া সব এক।
সে একটু থামল।
“ আমার মা কাজল খান হয়ে উঠেছে নিজের লড়াইয়ে।
আমার বাবা জাওয়াদ খান হয়েছে নিজের কর্মে।
আর শেহতাজ খান নাভান… সে কারো বিকল্প না।”
সেও তাও নিজ কর্মে।
চারপাশে মুহূর্তের জন্য নিস্তব্ধতা নেমে এলো।

প্রেমের বাজিমাত পর্ব ৪৩

“ আমি তাদের সন্তান— এটাই আমার গর্ব।
কথাটা বলেই নাভান মাইক্রোফোন সরিয়ে সামনে এগিয়ে গেল।
পেছনে ক্যামেরার আলো ঝলসে উঠছিল বারবার।
আর সেই আলোয় সবচেয়ে স্পষ্ট ছিল—
একটা ছেলের চোখে তার বাবা-মায়ের প্রতি অটুট সম্মান।

প্রেমের বাজিমাত পর্ব ৪৫