প্রেমের বাজিমাত পর্ব ৪৫
রোজ ও রুশা
‘ ক্লাবজুড়ে এক অদ্ভুত চাপা উত্তেজনা।
শামসুল আজমীর চৌধুরীর ব্যক্তিগত ক্লাব— যেখানে সাধারণত তার লোকজনের হাঁকডাক, রাজনৈতিক নেতাদের আনাগোনা আর ক্ষমতার দাপটে পুরো পরিবেশ ভারী হয়ে থাকে— আজ সেখানে নেমে এসেছে অস্বাভাবিক নীরবতা। চারদিকে কঠোর নিরাপত্তা। প্রবেশপথে সশস্ত্র পুলিশ। ভেতরে সিআইডি অফিসার। কোথাও র্যাব, কোথাও সেনাবাহিনীর সদস্য।
প্রতিটা করিডোর, প্রতিটা দরজা, প্রতিটা চলাচল নজরদারির মধ্যে।
কিন্তু সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হলো—
এই নিরাপত্তা কে দিয়েছে, কার আদেশে দিয়েছে, তা কেউ জানে না। প্রথমে শামসুল ভেবেছিল,
হয়তো তাকে প্রোটেকশন দিতেই এসব ব্যবস্থা।
কিন্তু ধীরে ধীরে তার মনে হতে লাগল—তাকে পাহারা দেওয়া হচ্ছে না…তাকে ঘিরে ফেলা হয়েছে।
যেন সে কোনো মন্ত্রী নয়,
ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি।
তার বুকের ভেতর কেমন অস্বস্তি জমতে থাকে।
অন্যদিকে দেশের বিভিন্ন ভোটকেন্দ্রে ভোট গণনা শুরু হয়ে গেছে। বড় বড় স্ক্রিনে লাইভ ফলাফল ভেসে উঠছে।
একটার পর একটা কেন্দ্রে—
“বাঁশ মার্কা” এগিয়ে। জাওয়াদ খানের নাম ঘোষিত হচ্ছে বিজয়ী হিসেবে।
শামসুলের মুখের রঙ বদলে যায়। অসম্ভব!
জনগণ তো তার নামেই পাগল। তার দাপটে শহর কাঁপে। তার ইশারায় প্রশাসন নড়ে।
তাহলে সে পিছিয়ে যাচ্ছে কিভাবে?
তার মাথায় হঠাৎ একটা নাম আসে—
এডভোকেট এম এল এ কাজল খান।
চোখ সরু হয়ে আসে শামসুল আজমীর চৌধুরীর।
“না…! না…!
তুমি এটা করতে পারো না সুন্দরী।
সুন্দর পরিপাটি হ্যান্ডসাম মানুষ টা কেমন এলো মেলো দেখাচ্ছে মুহূর্তে! পরনে দামি পাঞ্জাবি চেপে ধরে দুই হাত দিয়ে! তার বহু বছরের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা হঠাৎ তাকে সতর্ক করে দেয়। সবকিছু যেন অদ্ভুতভাবে সাজানো। খুব হিসাব করে।
আর সবচেয়ে বড় বিষয়—
তাকেই কেন এত কড়া নিরাপত্তায় রাখা হয়েছে?
নিলয় আজমীর চৌধুরী পাশে বসে রাগে ফুঁসছে।
মুষ্টিবদ্ধ হাত। চোয়াল শক্ত। সে বুঝে গেছে—
সরকারি বড় কর্মকর্তারা আর তাদের কথায় উঠবে-বসবে না। যাদের দিয়ে এতদিন কাজ করিয়েছে,
আজ তারা নির্লিপ্ত। সবাই যেন আগে থেকেই প্রস্তুত ছিল।
নিলয় দাঁড়িয়ে গিয়ে রাগে একজন অফিসারের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে ওঠে—
“ কি হচ্ছে এখানে ? আমাদের এভাবে আটকে রাখা হয়েছে কেন?
উত্তরে প্রশাসনের বড় কর্মকর্তা বলে উঠে —
‘ এখন ভোট গণনার সময়!
” আমরা আমাদের লোকেদের সাথে যোগাযোগ করতে পারব না?
নিলয় আজমীর চৌধুরীর কথায় পতিউত্তর করলেন লোকটা —
‘ ভোট চুরি হবে না তার গ্যারান্টি কি?”
– চারপাশের অফিসাররা নির্লিপ্ত।
একজন সিআইডি অফিসার ধীর গলায় সামনে এগিয়ে আসে।
“ চিন্তা করবেন না। আপনাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই আমাদের দায়িত্ব। দুই পক্ষকেই নিরাপত্তার আওতায় রাখা হয়েছে। সম্পূর্ণ ভোট গণনা নিরপেক্ষ কর্তৃপক্ষের তত্ত্বাবধায়নে চলছে। যাতে কোনো ধরনের কারচুপি না হয়।
নিলয় রাগে দাতে দাঁত চেপে বলে ওঠে—
“ তাই বলে আমরা আমাদের লোকেদের সাথে কথা বলতে পারব না?
“ আপাতত সকল যোগাযোগ বন্ধ থাকবে।
কথাটা শুনে শামসুলের বুকের ভেতর ধক করে ওঠে–
” যোগাযোগ বন্ধ?
– তাহলে তার গোপন আস্তানা? সবকিছু? তার মাথার ভেতর বিশৃঙ্খলা শুরু হয়।
সে তো এই নির্বাচন ক্ষমতায় থেকেই করতে চেয়েছিল।
কারণ ক্ষমতায় থাকলে প্রশাসন হাতের মুঠোয় থাকে।
কিন্তু এবার সেটা হয়নি। জাওয়াদ খানকে সামনে এনে সে ভেবেছিল, জাওয়াদ খানকে অপমান করবে।
রাজনৈতিকভাবে শেষ করবে।
কিন্তু এখন মনে হচ্ছে—
সে ভুল মানুষকে চ্যালেঞ্জ করেছে।
আর সেই ভুলের পেছনে দাঁড়িয়ে আছে এক নারী।
এডভোকেট এমএলএ কাজল খান। শামসুলের কপালে ঘাম জমে। হঠাৎ তার মনে পড়তে থাকে গত কয়েক মাসের ছোট ছোট ঘটনা। কাজল খানের অস্বাভাবিক নীরবতা। নাভানের রহস্যময় আত্মবিশ্বাস। জাওয়াদ খানের হঠাৎ নির্বাচনে ফিরে আসা।
সবকিছু কি তাহলে আগে থেকেই পরিকল্পিত ছিল?
তার বুকের ভেতর ভয় ধীরে ধীরে বাস্তব রূপ নিতে থাকে। ঠিক তখনই টিভির পর্দায় চূড়ান্ত ফলাফল ঘোষণা হয়। বাশ মার্কা বিজয়ী।
চারপাশে উল্লাস। মালার পর মালা পড়ানো হচ্ছে জাওয়াদ খানকে। সাংবাদিকদের সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলছেন তিনি। শামসুলের চোখ লাল হয়ে যায়। এক ঝটকায় সামনে থাকা টিভিটা ভেঙে ফেলে সে। কাঁচ ভাঙার শব্দে পুরো হল কেঁপে ওঠে।
আর ঠিক তখনই— পেছন থেকে ভেসে আসে শক্ত, দৃঢ়, পরিচিত এক নারীকণ্ঠ।
“ শামসুল আজমীর চৌধুরী…
একজন মন্ত্রী হয়েও রাষ্ট্রবিরোধী কার্যকলাপ, অবৈধ অস্ত্র চক্র পরিচালনা, গুম এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের দায়ে আপনাকে গ্রেফতার করা হচ্ছে।
শামসুল ঘুরে তাকায়। আর মুহূর্তেই তার চোখ বিস্ফারিত হয়ে যায়। সামনে দাঁড়িয়ে—এডভোকেট এমএলএ কাজল খান। সাদা-কালো পরিপাটি শাড়ি। চোখে কঠিন দৃঢ়তা। হাতে আইনি কাগজপত্র।
তার পাশে দেশের উচ্চপদস্থ পুলিশ কর্মকর্তা, সিআইডি এবং বিশেষ বাহিনীর সদস্যরা। আজ যেন তিনি শুধু একজন রাজনীতিবিদ নন— একটা ঝড়। নিলয় দাঁড়িয়ে চিৎকার করে ওঠে—
“ হু দা হেল আর ইউ?!
আপনারা কি বলতে চাইছেন?!
কাজল খান ধীরে ধীরে তার দিকে তাকায়।
তার ঠোঁটে হালকা তাচ্ছিল্যের হাসি।
“ বলতে চাইছি না, নিলয় আজমীর চৌধুরী । আজ প্রমাণ কথা বলবে। অনেক বছর ধরে যেগুলো চাপা ছিল—আজ সব বের হবে।
নিলয় হতবিহ্বল।
“ হোয়াট?!
“ তুমি তোমার বাবার কতটা অপরাধের সাথে জড়িত আমরা এখনও জানি না। তবে আপাতত তুমিও নজরদারিতে থাকবে।
ঠিক তখনই সামনে এগিয়ে আসে শামসুল আজমীর চৌধুরী । কাজল খানের সাথে চোখে চোখে কিছু নীরব কথা হয় তাদের।
এক যুগের বেশি বোঝাপড়া যেন এক মুহূর্তে বিনিময় হয়ে যায়। তারপর কাজল খান হঠাৎ কাঁপা গলায় বলে ওঠেন—
” ভয় দেখিয়ে লাভ নেই শামসুল তোকে একটা চমক দেখাই! জাদু ও বলতে পারিস!
— পর মুহুর্তে গলা উচিয়ে ডাকে!
“ ভাই…এদিকে আয়…!
সবাই অবাক হয়ে তাকায়।
ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে আসে দুজন মানুষ।
একজন—জিহান তালুকদার। এক যুগ পর অন্ধকার বন্দিদশা থেকে মুক্ত হওয়া এক মানুষ। আর আরেকজন
তার পাশে মধ্যবয়সী এক নারী। চেহারায় ক্লান্তি। পরনে ফ্যাকাশে আকাশী শাড়ি। শরীর শুকিয়ে গেছে। চোখের নিচে গভীর কালচে দাগ। কিন্তু সেই চোখে এখনও জীবনের বেচে থাকার আকুতি আছে। শামসুলের শরীর হঠাৎ কেঁপে ওঠে। তার ঠোঁট শুকিয়ে যায়।
“ না…… এটা অসম্ভব…!
কাজল খান ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে আসে।
তার কণ্ঠ এবার আর শুধু একজন আইনজীবীর নয়—
একজন বোনের,একজন মায়ের, একজন প্রতিশোধ নেওয়া নারীর।
“ চিনতে পারছিস শামসুল? এদের তো তুই মৃত বলেছিলি । দুই যুগ ধরে অন্ধকারে লুকিয়ে রেখেছিলে।
কারণ এরা বেঁচে থাকলে তোর সত্যি বের হয়ে আসত।”
চারপাশ নিস্তব্ধ। শামসুলের বুক ধড়ফড় করছে।
কাজল খান এবার সবার সামনে সত্যিটা বলতে শুরু করেন—
চারদিকে ক্যামেরার ফ্ল্যাশ।
মাইক্রোফোনের মাথাগুলো একসাথে এগিয়ে এসেছে।
সাংবাদিকদের চিৎকারে পুরো হলরুম ভারী হয়ে উঠেছে।
“ ম্যাম! আপনি কী বলতে চাচ্ছেন? শামসুল আজমীর চৌধুরীর বিরুদ্ধে কি সরাসরি অভিযোগ আনছেন?
সব শব্দ থামিয়ে ধীরে সামনে এগিয়ে এলো এডভোকেট কাজল খান। তার চোখে অদ্ভুত শান্ত আগুন।
পাশে দাঁড়িয়ে আছে জিহান তালুকদার, তৌহিদা জিহান , জাওয়াদ খান, নাভান… আর দূরে দাঁড়িয়ে শামসুল আজমীর চৌধুরী। তার চোখে স্পষ্ট অস্থিরতা।
কাজল খান মাইক্রোফোনের সামনে দাঁড়িয়ে ধীরে বলল—
“ আজ বহু বছর পরে আমি কিছু সত্যি বলবো।
যে সত্যিগুলো চাপা দিতে গিয়ে বহু মানুষের জীবন শেষ হয়ে গেছে।
চারদিক নিস্তব্ধ। কাজল ধীরে হাত বাড়িয়ে জিহানের দিকে দেখাল।
“ এই মানুষটা… আমার ফুফাতো ভাই। গাজীপুরের সবচেয়ে প্রভাবশালী তালুকদার পরিবারের একমাত্র উত্তরাধিকারী— জিহান তালুকদার।
তারপর তৌহিদার দিকে তাকালো ।
“ আর এই নারী… তৌহিদা খান। জাওয়াদ খানের একমাত্র বোন। সম্পর্কে আমার ননদ !
কাজল খানের কণ্ঠ ধীরে কেঁপে উঠল।
“ আমার বাবা-মা যখন এক্সিডেন্টে মারা যায়, তখন আমি খুব ছোট। পৃথিবীতে আমার বলতে কেউ ছিল না।
সেই সময় জিহান ভাই আমার জন্য ঢাল হয়ে দাঁড়ায়।
ও শুধু ভাই ছিল না… বাবার মত আগলে রাখতো আমাকে।
জিহান তালুকদারের চোখ নিচু হয়ে আসে।
কাজল আবার বলতে শুরু করে—
“ আমার মামী আমাকে নিজের মেয়ের মতো ভালোবাসতো। আর মামাজান… তিনি ছিলেন আমার দ্বিতীয় বাবা। কিন্তু সব বদলে যায়, যখন তিনি বিয়ে করে নিয়ে আসেন শামসুল আজমির চৌধুরীর মাকে। বাবা মা সেই ছোট থাকতেই মারা যায় আমার মামীর হঠাৎ চলে যাওয়াটা আমরা কেউ মেনে নিতে পারিনি। আমার খুব একা হয়ে গিয়েছিলাম তখন । যখন এরা আমাদের পরিবারে পা রাখে, তখন থেকে সব শেষ হতে থাকে। আর এই যে শামসুল আজমী র চৌধুরী যে পদবীটা বানিয়েছে না? নিজের নামে। তা কেবল তার বানানো পদবী। আমরা তো জানি না সে আসলে কোন ধর্মের।
সাংবাদিকদের মধ্যে গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে।
কাজল খানের চোখে এবার আগুন ঝরে ।
“ হ্যাঁ। আজমীর চৌধুরী আমাদের রক্তের কেউ না।
তার পরিচয় কী… সে নিজেও জানে না।
তার মা আমার মামাকে ফাঁসিয়ে তালুকদার বাড়িতে ঢুকেছিল।
শামসুল আজমীর চৌধুরী রাগী চোখে তাকায় কাজল খানের দিকে –কাজল খান থামল না।
“ আমরা তখন ছোট ছিলাম। কিছু বুঝতাম না।
কিন্তু ধীরে ধীরে বুঝতে পারি… এই বাড়িতে ভালোবাসার চেয়ে লোভি মানুষ বেশি।
জাওয়াদ খান নিঃশব্দে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে। বোনকে সেই যে ঝাপটে ধরে রেখেছে,একবার ও বাধন হালকা করে নি । কাজল খান এবার শামসুলের দিকে তাকাল।
“ শামসুলের জন্ম নিয়েও একদিন কথা উঠেছিল।
মামাজান তাকে কখনো অবহেলা করেননি।
নিজের সন্তানের মতো মানুষ করতে চেয়েছিলেন।
কিন্তু তার মা… সবসময় সম্পত্তি, ক্ষমতা আর রাজনীতি নিয়ে ব্যস্ত ছিল। মামা রাজনৈতিক দিক থেকে অনেক ক্ষমতাবান ছিলো। আর সেই রাজনৈতিক ক্ষমতার লোভ ধিরে ধিরে এই মানুষটার মনে ঢুকে, যা আমাদের জীবন তছনছ করে দেয় —
সাংবাদিকদের ক্যামেরা এবার শামসুল আজমীর চৌধুরীর মুখে ধরব । রক্ত চক্ষু নিয়ে তাকিয়ে আছে তার না পাওয়া তেজি ভালোবাসা কাজলরেখার দিকে —
কাজল খান এর গলা শক্ত হয়ে ওঠে–
“ মামাজান চাইতেন না শামসুল রাজনীতিতে জরাক।
কিন্তু তার ‘ মা ‘ চাইতো— জিহান ভাইয়ের মতো সমস্ত ক্ষমতা আর সম্পত্তি তার হায়ে যাক। আর সেই লোভ… ধীরে ধীরে বিষ হয়ে ওঠে।
জিহান তালুকদার এবার সামনে এগিয়ে আসে।
তার ভারী কণ্ঠ পুরো হল কাঁপিয়ে দেয়। মুখ ভর্তি চাপ দাড়ি, সেই বডি সেই সুন্দর্য নেই এখন তার চোখে মুখে। বেচে আছে এটাই তো বেশি। আহত সুরে বলে উঠে —
“ শামসুল ছোটবেলা থেকেই আমাকে সহ্য করতে পারতো না। কারণ বাবা আমাকে বিশ্বাস করতো। ব্যবসা, সম্পত্তি, রাজনৈতিক দায়িত্ব— সব আমার হাতে ছিল। আমি অল্প বয়সে সব দায়িত্ব কাধে নিয়েছিলাম। সব ঠিক ছিলো কিন্তু যখন থেকে তার মা শামসুল কে নিয়ে আসে আমাদের বাসায় তখন থেকে সব উলোট পালট হয়ে যায়।
সে তীক্ষ্ণ চোখে শামসুলের দিকে তাকায়।
“ প্রতিদিন বাড়িতে ঝগড়া হতো।
আমার এসব একদম ভালো লাগতো না। আমায় প্রতিদিন আমার সৎ মা খোটা দিতো। যাতে আমি বের হয়ে যাই ওই বাড়ি থেকে। আমার আত্নমর্যাদা সব সময় প্রখোর ছিলো। তাগড়া যুবক তখন, ইনকাম করি দু হাত ভরে। এতো এতো ইনকাম করি আমি, তাই মনে হয়েছিলো ওই বাড়ি থেকে বের হয়ে যাই। শান্তিতে থাকুক ওই মহিলা আর তার ছেলে।
তারপর একে একে বলতে থাকে তাদের বিয়ের ঘটনা কিভাবে বন্ধুর বোনের সাথে বিয়ে। কিভাবে তার বোনেকে বিয়ে দেয়া হয়, তারপর কিভাবে তাদের ফাঁসানো হয়। সেদিন কেনো নিজের বোনের সাথে জরিয়ে নিজেকে অপরাধী করেছে। জিহান তালুকদার চোখের পানি মুছে বলতে থাকে–
” বাবা যখন মারা যায় তখন সব সম্পত্তি আমার নামে করে দিয়ে গিয়েছিলো । আর আমার বা আমার সন্তানের যদি কিছু হয় তা এতিম খানা, মাদ্রাসার দখলে চলে যাবে। বাবাকে কবর দিয়ে যখন জানতে পারি এসব তখন একটু সন্দেহ হয় তাদের উপর। বাবাকে রিতিমতো প্রেসার দিয়ে মারা হয়েছিলো। মানসিক টর্চার করে। তখন শামসুল আর তার মায়ের সাথে আমার বিবাধ হয়। আমি সেদিন সত্যিই নিরুপায় ছিলাম।
কারণ এই লোক আর তার মা আমার স্ত্রী তৌহিদা আর আমার ছোট্ট মেয়ের উপর নজর দারি করে রেখেছিলো। এমন এক অন্ধকার ছায়া নেমে এসেছে, যেখান থেকে তাদের বাঁচানো আমার একার পক্ষে প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠেছিল। আর শামসুল ভালো করে জানতো জাওয়াদ আমার সাথে থাকলে কখনো হাড়াতে পারবে না। তাই কাজল রেখাকে ঢাল হিসেবে ব্যাবহার করে। এতে এক ঢিলে দুই পাখি মরবে। জাওয়াদ ভুল বুঝবে কাজল রেখাকে, তাদের বিচ্ছেদ হলে সে কাজল কে বিয়ে করবে। কারন কাজল রেখার উপর প্রথম থেকে তার কু দৃষ্টি ছিলো। আর ভুল বুঝাবুঝি হলে জাওয়াদ আর আমার মধ্যে বন্ধুত্ব শেষ হয়ে যাবে। আমরা আলাদা হয়ে যাবো আমরা। হয়েছেও তাই। শামসুল ভিতরে ভিতরে বাবার থেকে কু মতলব করে তার ক্ষমতা, টাকা-পয়সা আর প্রভাব এত দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে ফেলেছিল যে, সে চাইলে মুহূর্তের মধ্যেই আমার পরিবারের মানুষ কে খুন করে ফেলতো।
আর তার কথা মতো সেদিন মানুষের সামনে আমি
আমার,ভাই-বোনের সম্পর্ক নিয়েও এমন কিছু কথা বলেছিলাম, যা বলতে গিয়ে ভিতরে ভিতরে আমি নিজেই মরেছি।
কাজল রেখা হয়তো ভেবেছিল আমি নিষ্ঠুর, স্বার্থপর। কিন্তু কেউ জানত না, আমি আসলে নিজের স্ত্রী আর সন্তানকে বাঁচানোর জন্যই নিজের সংসার, নিজের সম্মান, নিজের সম্পর্ক— সবকিছু বিসর্জন দিয়েছিলাম ।
আমি বুঝে গিয়েছিলাম, সেই দিন থেকেই আমার জীবনে আর ভালো কিছু অপেক্ষা করছে না। তবুও চেষ্টা করেছিলাম… শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত চেষ্টা করেছিলাম।
শামসুল আমাকে এমনভাবে চারদিক থেকে ঘিরে ফেলেছিল যে আমি যেন এক অদৃশ্য জালে আটকে গিয়েছিলাম। বের হওয়ার কোনো পথ ছিল না। আমি তৌহিদাকে বোঝানোর চেষ্টা করেছি, অনেকবার করেছি। জাওয়াদ কেও বুঝিয়েছি যাতে সম্পর্কটা না ভাঙে। কিন্তু তখন পরিস্থিতি এতটাই ভয়ংকর হয়ে উঠেছিল যে কেউ আর কাউকে বিশ্বাস করতে পারছিল না। তৌহিদা আমার কথাকে অবিশ্বাস করেছিল। আমি তাকে দোষ দিই না… কারণ আমি নিজেও তখন অসহায় ছিলাম।
আমি জানতাম, শামসুল আমাদের উপর নজর রাখছে। আমাদের বাড়ির ভেতরেও তার লোক ছিল। আমরা কোথায় যাচ্ছি, কী করছি— সব খবর তার কাছে পৌঁছে যাচ্ছিল। তার পরিকল্পনাও ছিল ভয়ংকর।
সে চেয়েছিল আমরা বাইরে বের হই, তারপর একটা সাজানো দুর্ঘটনার মাধ্যমে আমাদের মেরে ফেলা হোক।অথবা আমার নিষ্পাপ মেয়েটাকে আগুনে পুড়িয়ে শেষ করে দেওয়া হোক। যখন তারা বিদেশে ব্যাক করে তখন আমিও ছুটে গিয়েছিলাম তাদের পিছু যাতে সম্পর্ক না ভাঙে। তৌহিদাকে বুঝাতে চেয়েছিলাম, সে বের হয় উকিলের কাছে যাওয়ার জন্য। তার পিছু আমিও যাই।
জানতাম না সেখানেও ফাদ পেতে রেখেছিলো শামসুল।
আমাদের গাড়ির দুর্ঘটনার ঠিক আগ মুহূর্তে হয়তো তারা হিসাব বদলায়। আমাকে তখনই মেরে ফেললে সম্পত্তি, টাকা-পয়সা আর অনেক কিছু হাতছাড়া হয়ে যেতে পারত। তাই সেদিন আমাকে বাঁচিয়ে রাখা হয়েছিল। কিন্তু আমার মেয়েকে নিয়ে তারা যা পরিকল্পনা করেছিল, তা ভাবলেও এখনো আমার বুক কেঁপে ওঠে। সেদিন খুব অল্প সময়ের মধ্যে আমি তৌহিদাকে সবটা বলার চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু কোথায় যাব, কাকে বিশ্বাস করব, কীভাবে বাঁচব— কিছুই বুঝে উঠতে পারছিলাম না। সময় খুব কম ছিল, আর চারপাশে শুধু আতঙ্ক। আমি তৌহিদাকে অনেকভাবে বোঝানোর চেষ্টা করেছি, কিন্তু সে আমাকে বিশ্বাস করেনি। শেষ মুহুর্তে জানতে পারি আমার মেয়েকে নিয়ে পরিকল্পনা। জাওয়াদ কে ফোন দিচ্ছিলাম বহুবার সে ফোন ধরে নি। পর মুহুর্তে, একটা মেসেজ করেছিলাম, কিন্তু শামসুলের লোক আমার ফোন নিয়ে নেয়। তৌহিদা এর আগে রাগে জাওয়াদ কে বলেছিলো একটা কথা, তার কিছুক্ষন পর আরেকটা মেসেজ দেয়। যাতে আমাদের মেয়েকে রক্ষা করে আর তাকে আমাদের পরিচয় ছাড়া বড় করে। শামসুল যদি জানতো তাহলে তাকে মেরে ফেলতো। শামসুলের কথাটা সেদিন সুযোগ হয় নি বলার।
তারপর থেকেই শামসুল আমাদের জীবনের অন্ধকার অধ্যায়ের অংশ হয়ে ওঠে। এক যুগ এর বেশি সময় ধরে আমরা সেই অন্ধকারের মাঝেই বন্দি ছিলাম।
তৌহিদাকে গুটি হিসেবে ব্যবহার করে প্রতিনিয়ত আমার ব্যাংক থেকে টাকা তোলা হতো। ধীরে ধীরে সবকিছু এমনভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছিল, যেন আমি নিজের জীবন আর সম্পদের উপরও অধিকার হারিয়ে ফেলেছি। এভাবেই বছরের পর বছর চলতে থাকে সেই শোষণ।
আমাদের পূর্বপুরুষদের রেখে যাওয়া এত সম্পদ ছিল যে, চাইলে পরবর্তী একশো বছরও নিশ্চিন্তে বেঁচে থাকা যেত। কিন্তু সেই আধিপত্য আজ আমাদের জন্য অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেই সম্পদই আমাদের জীবন থেকে এক যুগ এর বেশি সময় কেড়ে নিয়েছে।
তৌহিদা এবার কাঁপা গলায় বলল—
“সেদিন যদি আমি জিহানের কথাটা একটু শুনতাম, তাহলে হয়তো আজ আমাদের জীবনে এত বড় সর্বনাশ নেমে আসত না। মানুষ অনেক সময় চোখের সামনে সত্যি দেখেও ভুল করে ফেলে। কাউকে অন্ধের মতো বিশ্বাস করা যেমন ভুল, তেমনি কোনো কারণ ছাড়াই অবিশ্বাস করাটাও ভয়ংকর। আর সেই অবিশ্বাসই ছিল আমাদের জীবনের সবচেয়ে বড় কাল।”
কথাগুলো বলতে বলতে তৌহিদার চোখ ভিজে উঠল। ঠোঁট কাঁপছিল তার।
“আমাদের বন্দি করে রাখা হয়েছিল… আমাকে আর জিহানকে বাঁচিয়ে রাখা হয়েছিল শুধু সম্পত্তির জন্য। কারণ আমরা মারা গেলে সব সম্পত্তি সরকারের হাতে চলে যেত। তাই আমাদের বেঁচে থাকাটা ছিল তাদের স্বার্থের জন্য, আমাদের জীবনের জন্য নয়…”
ক্লাবের মধ্যে একসাথে শোরগোল উঠে যায়।
এক সাংবাদিক চিৎকার করে বলে—
“মানে আপনাদের জোর করে আটকে রাখা হয়েছিল?তাও এক যুগ কেউ এসব কিছুই জানতো না।
জিহান তালুকদার তিক্ত হেসে ওঠে।
শামসুলের আরেকটি পরিকল্পনাও সেদিন ব্যর্থ হয়ে যায়। তৌহিদার পাঠানো মেসেজ পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গেই জাওয়াদ খান দ্রুত সেখানে চলে আসে। নিজের একমাত্র বোনের মেয়েকে আড়াল করে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার পর পুরো বাড়িটিতে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হয়। আর শামসুলের লোকরা তাকে ভুল খবর পাঠায়। জিহান তালুকদারের বংশের আর কেউ নেই। আর তাদের এক্সিডেন্ট হয়।
কিন্তু না— জিহান তালুকদারের একমাত্র মেয়ে মারা যায়নি। জীবিত অবস্থাতেই জাওয়াদ খানের মেয়ের পরিচয়ে সে নতুনভাবে বেঁচে আছে। নাভানের বুক ধক করে ওঠে।
শামসুল হঠাৎ হেসে ওঠে।
ভয়ংকর সেই হাসি।
— আমায় কেন সবাই অবহেলা করেছে বলো তো?
আমার বাবা কে, আমি আজও জানি না। এই অপরাধটা কি আমার ছিল? আমি কি ইচ্ছে করে জন্মেছি । তাহলে কেন মানুষ আমার দিকে আঙুল তোলে? কেন “জারজ” শব্দটা ছুঁড়ে দিয়ে বারবার মনে করিয়ে দেয় আমি নাকি অসম্পূর্ণ?
শামসুল আজমীর তিক্ত হেসে মাথা নিচু করল। সেই হাসির ভেতর জমে ছিল বছরের পর বছর না-পাওয়ার কষ্ট।
— ভালোবেসে কাউকে নিজের করে চাইছিলাম… সেটাও নাকি ভুল। বহুবার ফিরিয়ে দিয়েছে আমায়। শুধু আমার পরিচয়ের জন্য। কেউ কখনো মানুষটা দেখেনি, সবাই শুধু আমার জন্ম দেখেছে। আমি তো দেখতে খারাপ না বরং ১০ জন ছেলের থেকে আমি একাই একটা ছেলে ছিলাম।
আমি একটু আহ্লাদ করে কিছু চাইলে সেটাও বিলাসিতা হয়ে যায়। জানো সুন্দরী, মানুষ বলে আমি খারাপ হয়ে গেছি। কিন্তু কেউ কখনো জানতে চায়নি কেন আমি এমন হলাম।
যে ছেলে ছোটবেলা থেকে অবহেলা পায়, ভালোবাসার বদলে অপমান শুনে বড় হয়, সে তো একসময় শক্ত হবেই। কারণ নরম থাকলে মানুষ তাকে বাঁচতে দেয় না।
তার কণ্ঠ ভারী হয়ে এলো।
— সবাই ক্ষমতা চায়, সবাই ভালোবাসা চায়, সবাই নিজের একটা মানুষ চায়। আমি চাইলে দোষ কোথায়?
আমি তো শুধু একটু আপন হতে চেয়েছিলাম… একটু আদর, একটু স্বীকৃতি, একটু ভালোবাসা।
তাহলে কেন সবকিছু থেকে আমাকেই বঞ্চিত হতে হলো বলতে পারো সুন্দরী? কেনো আমার দিকে আঙুল তোলে সবাই?
কাজল ধীরে সামনে এগিয়ে আসে।
তার চোখে ঘৃণা।
“ ক্ষমতা চাওয়া দোষ না। ভালোবাসা চাওয়া দোষ নয়।
কিন্তু সেই ক্ষমতার জন্য মানুষ মারতে যাওয়া দোষ।মানুষ কে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া দোষ। সংসার ভাঙা দোষ।
একটা শিশুকে মারতে চাওয়া দোষ। জোর করে অধীকার চাওয়া দোষ। জোর করে আর যাই হোক ভালোবাসা হয় না।
শামসুল চিৎকার করে ওঠে—
“ ওই মানুষটা কখনো আমাকে ছেলে মনে করেনি!”
জিহান এবার গর্জে ওঠে—
“ কারণ তুমি মানুষ ছিলে না!
চারদিকে নিস্তব্ধতা নেমে আসে।
শামসুলের চোখ লাল হয়ে যায়।
জিহান তালুকদার দাঁত চেপে বলে—
“ বাবা তোকে মানুষ করতে চেয়েছিল।
কিন্তু তুই ছোটবেলা থেকেই শুধু ক্ষমতা চিনেছিস ।
তোর মা প্রতিদিন তোর মাথায় ঢুকিয়েছে—
‘সব তোর হতে হবে।’ আসলে কি জানিস গাছ যেমন ফল তো তেমন হবেই।
— নিলয় স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে আছে নিজের বাবার দিকে। এ কি শুনছে সে। দু পা পিছিয়ে যায় নিলয়। হাত ধরে সিয়াম। মাথা ভন ভন করে ঘুরছে নিলয়ের। অপরাধ তো সেও কম করে নি। কতো সত্য মিথ্য সামনে এসেছে। কিন্তু আজ এ কেমন সত্য সামনে আসলো যে নিজে ভেঙে চুড়ে যাচ্ছে সে।
টিভির পর্দায় একের পর এক সত্য প্রকাশ হতে থাকে। হেরার চোখ বেয়ে টপটপ করে পানি ঝরছে। সেই কান্না যেন নিলয় উপলব্ধি করতে পারছে। হেরার মুখ মনে পরতে বুকটাকে মোচড় দিয়ে যেনো কেউ ছিঁড়ে ফেলছে।
তার বাবা… তার ভালোবাসার মানুষটাকেই মারতে চেয়েছিল! এই সত্যটা যেন কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছে না সে।
পুলিশ অফিসাররা শামসুলকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যায়। সঙ্গে নিলয়কেও নিয়ে যাওয়া হয় তদন্তের জন্য। চারপাশ ধীরে ধীরে ফাঁকা হয়ে আসতেই জিহান তালুকদারের বোনের পায়ে হাত দিতে যাবে। হঠাৎ কেঁপে ওঠে কাজল রেখা । ঠিক তখনই কাজল খান আচমকা দূরে সরে যায়–
“ এই কী করছিস ভাই ?
“ তোকে আমার চামড়া দিয়ে জুতো বানিয়ে দিলেও এই নামের কলঙ্ক কোনোদিন মুছবে না রে!
যে বোনটাকে আমি নিজের জীবন দিয়ে আগলে রেখেছিলাম… সেই পবিত্র সম্পর্কটাকেই আমি নিজের হাতে নোংরা অপবাদে ঢেকে দিয়েছি। শুধু আমার স্ত্রী আর সন্তানকে বাঁচানোর জন্য!
কিন্তু দেখ… আমি কতটা হতভাগা!
আমার কথায় বিশ্বাস করে তুই দূরে সরে গেলেও পারতি কিন্তু তুই জাস নি … অথচ যাদের জন্য এসব করতে বাধ্য হয়েছি , তারা আমাকে একবারও বুঝল না।
তুই ঠিকই বুঝেছিলি বলে …আজ আমি মুক্তি পেয়েছি ওই নরক থেকে…”
কথাগুলো বলতে বলতেই জিহান তালুকদারের চোখ বেয়ে অনবরত অশ্রু ঝরতে থাকে।
জাওয়াদ খান নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে থাকে।
তার নিজের বুকটাও আজ অপরাধবোধে পুড়ছে।
কাজল খান ধীরে ধীরে আবার বলতে শুরু করে—
“ ভাই… আমি তো সেই কবে মরে যেতাম।
কিন্তু তোর ছায়ার নিচে বেঁচে ছিলাম। তোকে যে আমি চিনি ভাই। আমি সেদিনি বুঝেছি এসব এর পিছনে অন্য কিছু। তারপর থেকেই আমি লড়াই করে গেছি।
আমি জানতাম ‘তাইতো শামসুলের কাছাকাছি থেকেছি নিজেকে এমন ভাবে প্রতিষ্ঠিত করেছি যাতে তার বিরুদ্ধে লড়তে পারি। এতদিন প্রমাণ এর জন্য কিছুই করতে পারিনি। আর তার ক্ষমতা এতটাই প্রভাব করেছিল যে নির্বাচন থেকে না নামিয়ে তাকে কিছুতেই কোন কিছু করা যাচ্ছিল না। তার জন্য অবশ্য জাওয়াদ অনেকটা হেল্প করেছেন আমাদের প্ল্যানেই সেও ছিল। নির্বাচন, কথা কাটাকাটি সবকিছু আমাদের প্ল্যান মাপে হয়। যাতে মনোযোগটা অন্যদিকে ডাইভার্ট আমরা করতে পারি। শুধু জাওয়াদ জানতো না তার বোন এখনো বেঁচে আছে সেটা আমি বলিনি, শুধু নাভান আর আমি জানতাম এসব । আমি আজ সফল শত্রুকে কিভাবে বস করে নিজের কাজ হাসিল করতে হয় আমি পেরেছি। কিন্তু তার শাস্তি এখানেই শেষ নয়। আরো কঠিন শাস্তি রয়েছে আগে ডোজ সামলে নিক তারপর নেক্সট ডোজ আমি কাজল খান দিব।
হঠাৎই জাওয়াদ খানের ফোনে কল আসে। ওপাশে রুশার কাঁপা গলা—
“হেরা কেমন জানি করছে…ছোট বাবা।
লাউড বাড়ানো ছিলো বিধায় সবাই শুনতে পায়।
কথাটা শোনামাত্র নাভান এক মুহূর্তও দেরি করল না। যেন বুকের ভেতরটা ধরফরিয়ে উঠল তার। ছুটে বেরিয়ে গেল সে।
নাভানকে এভাবে ছুটে যেতে দেখে পাশেই দাঁড়ানো কাজল খান কাঁপা গলায় বলল—
তোর মেয়ে, মেহেরিমা তালুকদার হেরা। মামার পরিচয় এতদিন বড় হয়েছে। আর নভান তার কাছে যাচ্ছে। চল দেরি করা যাবে না। হয়তোবা কিছু হয়েছে, এসব দেখে নিজেকে কন্ট্রোল করতে পারেনি খুব নরম স্বভাবের হয়েছে তোর মতো। যতই তেজ দেখাক ভিতরে একদম নরম।
মেয়েটার কথা শুনতেই বুকের ভেতর মোচড় দিয়ে উঠল জিহান তালুকদারের । চোখের কোণে অদ্ভুত এক জ্বালা অনুভব করল সে। কাজল খান বিষয়টা বুঝতে পেরে নিজের সাথে নিয়ে নিল। আর জাওয়াদ খানও দেরি না করে ছুটে গেল নাভানের পিছু পিছু। তৌহিদা, জিহান সহ — সবাই একে একে চলে গেল।
এতক্ষণ ধরে তৌহিদা জিহান জাওয়াদ খানের বুকে মুখ লুকিয়ে ছিল। কত বছর পর নিজের ছোট বোনকে সামনে থেকে দেখছে সে! এত কিছু শুনে ক্রুদ্ধ হয়ে গিয়েছিল। সে তো ছেলে আর বউ এর কথামতো শুধু নির্বাচনে প্ল্যানে সামিল হয়েছে কিন্তু তার জন্য যে এত বড় সারপ্রাইজ অপেক্ষা করছে কল্পনার বাহিরে ছিল। দুইজন প্রিয় মানুষকে সামনে দেখে বাকরুদ্ধ হয়ে গিয়েছে। বন্ধুর চোখের দিকে তাকাতে পারছে না সে বন্ধুকে বিশ্বাস করেনি বন্ধুর চোখের ভাষা বোঝেনি তাইতো চুপচাপ মাথা নিচু করে বোনকে জাপটে ধরে দাঁড়িয়ে ছিল সবার কথা শুনছিল।
বন্ধুর চোখের দিকে তাকানোর সাহস তার নেই। আজ নিজের কাছেই নিজেকে ভীষণ ছোট মনে হচ্ছে।
বন্ধুত্ব কি এমনই হওয়ার কথা ছিল?
না কি সে-ই বন্ধুত্ব নামের সবচেয়ে বড় কলঙ্ক?
সে তো কখনোই বুঝতে পারেনি বন্ধুর চোখের ভাষা। বুঝতে পারেনি জিহান তালুকদার কতটা ভেঙে পড়েছিল, কতটা সাহায্য চেয়েছিল নিঃশব্দে।
কিন্তু আজ নাভানকে দেখে তার বুকটা হাহাকার করে উঠল। এই ছেলেটা না বলা কথাও বুঝে যায়।
বন্ধুদের জন্য পাগলের মতো ছুটে যায়।
আর সৃজন…
যার সাথে নাভানের রক্তের কোনো সম্পর্ক নেই, সেই ছেলেটাও নাভানের পাশে দেয়ালের মতো দাঁড়িয়ে থাকে। কখনো বড় ভাই হয়ে, ঝিনুক কখনো বড় বোনের মতো আগলে রাখে তাকে। আর অধীর সে তো ভাই বলতে পাগল।
এদের দেখেই বোঝা যায়—
প্রকৃত বন্ধুত্ব আসলে রক্তের সম্পর্কের চেয়েও গভীর হয়।
হঠাৎ করেই জাওয়াদ খানের বুকের ভেতর অদ্ভুত এক দহন ছড়িয়ে পড়ল।
নিজের ব্যর্থতার আগুনে সে দগ্ধ হতে লাগল।
একজন সত্যিকারের বন্ধু হতে না পারার যন্ত্রণা তাকে ভেতর থেকে শেষ করে দিচ্ছিল।
তবুও…
ছেলের বন্ধুদের দিকে তাকিয়ে বুকের এক কোণে তীব্র গর্বও অনুভব করল সে। ছেলেদের এই নিঃস্বার্থ বন্ধুত্ব দেখে আজ সত্যিই গর্ব হচ্ছে তার।
কারণ পৃথিবীতে এখনো এমন কিছু সম্পর্ক বেঁচে আছে—যেখানে না বলা কষ্টও বুঝে নেওয়া হয়,
আর প্রয়োজনে জীবন দিয়েও পাশে দাঁড়ানো হয়।
হেরাকে তাড়াহুড়ো করে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। হঠাৎ করেই মেয়েটা পুরোপুরি সেন্সলেস হয়ে পড়ে। এমনটা তার আগে একবার হয়েছিল—যেদিন সে নিজের আসল পরিচয় জানতে পেরেছিল। আর আজ… আজ জানতে পেরেছে তার বাবা-মা বেঁচে আছেন। এত বছরের শূন্যতা, কষ্ট, অভিমান আর হঠাৎ করে পাওয়া অসম্ভব এক সুখ—সবকিছু একসাথে যেন তার মন-মস্তিষ্ক নিতে পারেনি।
অনেকক্ষণ ধরেই হেরা অস্বাভাবিক চুপচাপ ছিল। মুখে কিছু বলতে পারছিল না, শুধু ফ্যালফ্যাল করে সবার দিকে তাকিয়ে ছিল। যেন অনুভূতিগুলো গলায় এসে আটকে গেছে। তারপর হঠাৎ করেই চোখ ঝাপসা হয়ে আসে তার। শরীরটা দুলে ওঠে আর পরের মুহূর্তেই ফ্লোরে লুটিয়ে পড়ে সে।
গঠনা দেখে রোজ আর রুশা ভয়ে চিৎকার করে ওঠে। রুশা কাঁপা হাতে সঙ্গে সঙ্গে ফোন দেয়। এদিকে দ্রুত গাড়ি বের করা হয়, ড্রাইভারকে ডাকা হয়। দু’জন মিলে কোনোভাবে হেরাকে ধরে গাড়িতে তোলে। যাওয়ার আগেই তুষারকে কল করে সব জানিয়ে দেওয়া হয়েছিল, যেন হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই সব ব্যবস্থা করে রাখতে পারে।
হাসপাতালে পৌঁছানোর পুরো পথটাই যেন আতঙ্কে জমে ছিল। রোজ বারবার হেরার মুখে হাত বুলিয়ে ডাকছিল,
— “হেরা… চোখ খোলো প্লিজ…”এই পাখি
রুশার চোখ বেয়ে শুধু পানি পড়ছিল।
হাসপাতালে পৌঁছাতেই নাভানের কথামতো তুষার আগে থেকেই সব প্রস্তুত করে রেখেছিল। ডাক্তাররা দ্রুত হেরাকে নিয়ে ভিতরে চলে যায়। আর বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা সবাই নিঃশ্বাস বন্ধ করে অপেক্ষা করতে থাকে… যেন একটা মুহূর্তও কয়েক বছরের সমান ভারী হয়ে উঠেছে।
হাসপাতালের কেবিনটায় এক অদ্ভুত নীরবতা নেমে এসেছে।
সাদা আলোয় ভেসে থাকা ছোট্ট রুমটার ভেতরে শুধু মনিটরের টুপটাপ শব্দ শোনা যাচ্ছে। যেন প্রতিটা শব্দ সবাইকে মনে করিয়ে দিচ্ছে—কিছুক্ষণ আগেও কত বড় একটা ভয় তাদের বুকের ভেতর জমে ছিল।
বিছানায় শুয়ে আছে হেরা।
জ্ঞান ফিরেছে বেশ কিছুক্ষণ হলো, কিন্তু তার চোখদুটো এখনও ভেজা। মনে হচ্ছে এত বছরের জমে থাকা অভিমান, না-পাওয়া, কষ্ট আর ভালোবাসা—সব একসাথে বের হয়ে আসতে চাইছে।
জাওয়াদ খান মেয়ের মাথার পাশে বসে আছেন।
যে মানুষটাকে সবাই সবসময় কঠিন, দৃঢ় আর অটল দেখেছে, আজ তার চোখও ভিজে উঠেছে।
তৌহিদা জিহান হেরাকে জড়িয়ে ধরে বসে আছে।
রুশা ও রোজ চুপচাপ এক কোণে দাঁড়িয়ে সব দেখছে।
আর নাভান?
সে কেবিনের একপাশের দাঁড়িয়ে আছে দুই হাত বুকের ওপর ভাঁজ করে। মুখ গম্ভীর। চোখের নিচে ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট। মনে হচ্ছে এই কয়েক ঘণ্টাতেই সে আরও কয়েক বছর বড় হয়ে গেছে।
তুষার কয়েকবার এসে তাকে স্বাভাবিক করার চেষ্টা করেছে।
“ ভাই, রিল্যাক্স । তোমার রোগী বউ এখন পুরোপুরি স্টেবল।
নাভান ধীরে মাথা তোলে। অধীর নাভানের পাশেই ছিলো, এমন কি ঝিনুক, রোজ রুশা, সৃজন সবাই বড়দের মধ্যে কথা হচ্ছে আর সেটাই ছোটরা চুপচাপ দেখে যাচ্ছে। তুষারের কথার সাথে সাথে অধীর
গম্ভীর মুখেই বলে—
‘ রোগী স্টেবল হইছে ঠিক আছে… কিন্তু আমার ভাইয়ের লাইফ এখনও আইসিইউতে।”
তুষার হেসে ফেলে।
” আরে সালা বাবু, সমস্যা কোথায় তোমার ভাই এর? সে স্টেচু কেনো?
অধীর নিঃশ্বাস ফেলে বলে—
‘ ভাই এর সমস্যা হইলো,ভাই মানুষ না… পারিবারিক দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর ।
রুশা কটমট চোখে তাকায় একটু সিরিয়াস হয় না এই ছেলেটা । ঠিক তখনই জিহান তালুকদার ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালেন। পুরো কেবিন নিস্তব্ধ হয়ে যায়।
তিনি কিছুক্ষণ স্থির চোখে হেরার দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর গভীর, ভারী গলায় বললেন—
“ আমার মেয়েকে এতদিন আগলে রাখছিস তুই… এর জন্য আমি সারা জীবন কৃতজ্ঞ থাকব।
একটু থামলেন।
“ হেরা যেখানে থাকতে চায়, সেখানেই থাকবে। জাওয়াদ খানের কাছেও থাকতে পারবে… আবার আমার কাছেও। আমি তাকে কোনো জোর করব না।”
কথাটা শুনে কেবিনের বাতাসটাই যেন ভারী হয়ে যায়।
হেরা ধীরে ধীরে মাথা তোলে। বাবার দিকে তাকায়। হেরা যখন আব্বু বলে ডেকেছিলো তখন শুধু অঝোরে কান্না করেছে জিহান তালুকদার। সেই দৃশ্য মন ভরে দেখেছে জাওয়াদ খান। যাক বন্ধুর একটা জিনিস কে তো সে যত্ন করে রেখেছে। জিহান তালুকদার অনেকক্ষণ চুপ থেকে শান্ত স্বরে বলে—
“ আমি আমার বোনকে নিয়ে একাই থাকব।”
একটা মুহূর্তে যেন সব শব্দ থেমে যায়।
তোহিদা হঠাৎ ভেঙে পড়ে। সে দ্রুত জিহানের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। তারপর কাঁপতে কাঁপতে তার হাত দুটো ধরে ফেলে।
“ এমন কোরো না, জিহান… প্লিজ…”
তার গলা ভেঙে যাচ্ছে।
“ অনেক বছর হয়ে গেছে। আমরা কেউ ভালো ছিলাম না। তুমি না… আমিও না।”
চোখের পানি মুছারও শক্তি নেই তার।
“ একটা ভুল… একটা রাগ… একটা অবিশ্বাস… আমাদের পুরো জীবন শেষ করে দিয়েছে।”
জিহান নির্বিকার দাঁড়িয়ে আছেন।
তৌহিদা আবার বলে ওঠে—
“ হ্যাঁ, আমি ভুল করেছি। তোমাকে বুঝিনি। তোমার ভালোবাসাকে অবিশ্বাস করেছি। কিন্তু সেই শাস্তি তো আমরাও পেয়েছি! এক যুগের বেশি সময় ধরে জ্বলেছি আমরা।”
তার কণ্ঠ কেঁপে ওঠে।
“ এখন অন্তত আমাদের আর দূরে সরিয়ে দিও না। ভাই ভালো নেই… আমিও না। মানুষ ভুল করে জিহান। তখন পরিস্থিতি স্বাভাবিক ছিল না। আমরা রাগে, কষ্টে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম ডিভোর্স এর । কিন্তু একটা ভুলের জন্য কি পুরো জীবন শেষ করে দিবে?
কেবিনে উপস্থিত সবাই নিঃশব্দে শুনছে।
জিহান ধীরে চোখ বন্ধ করলেন।
তার চোয়াল শক্ত হয়ে আছে। কিন্তু তিনি কিছু বললেন না। সেই নীরবতাই যেন সবচেয়ে কঠিন উত্তর।
ঠিক তখনই রুম থেকে ধীরে ধীরে উঠে যেতে যেতে বির বির করতে থাকে নাভান।
— এতোক্ষন এই নাটকের জন্য অপেক্ষা করছিলাম
“মাঝে মাঝে মনে হয়, আমি যেন —সবার সমস্যার সমাধান করার জন্যই জন্মেছি। যে বয়সে মানুষ নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবে, ক্যারিয়ার নিয়ে ভাবে, প্রেম করে শান্তিতে দুটো কথা বলে… সেই বয়সে আমি বসে আছি কার রাগ কমাবো, কার ভুল ঢাকবো, আর কার কারণে আবার নতুন ঝামেলা বাঁধবে সেই হিসাব নিয়ে।
একবার বাবার সমস্যা, একবার মায়ের কষ্ট, তারপর পরিবারের বাকিদের আলাদা আলাদা নাটক।
প্রেমের বাজিমাত পর্ব ৪৪
কত কষ্ট করে সবকিছু ঠিক করলাম… কত ঝড় গেল মাথার উপর দিয়ে… নিজের রাগ, কষ্ট, অভিমান সব চেপে শুধু এই পরিবারটা ভেঙে না পড়ুক সেই চেষ্টা করেছি। আর এখন যখন ভাবলাম, যাক অবশেষে একটু শান্তি পাব, অসুস্থ হওয়া বউটার পাশে বসে দু’দণ্ড স্বাভাবিকভাবে কথা বলবো—তখনই আবার নতুন অধ্যায় শুরু। আমার তো এখন সত্যিই সন্দেহ হয়, আমার শান্তিতে থাকা বোধহয় সবার সহ্য হয় না।
তাদের কর্মকাণ্ড দেখে হাসিও পায় কখনো কখনো। কারণ এরা সমস্যা তৈরি করে এমন ভাব নিয়ে দাঁড়ায়, যেন সমাধানটাও আমি জন্মগত দায়িত্ব হিসেবে নিয়ে এসেছি।
