Home প্রেমের বাজিমাত প্রেমের বাজিমাত পর্ব ৪৩

প্রেমের বাজিমাত পর্ব ৪৩

প্রেমের বাজিমাত পর্ব ৪৩
রোজ ও রুশা

রাত তখন ঠিক তিনটা ছুঁইছুঁই। চারদিক নিস্তব্ধ, যেন পুরো শহর গভীর কোনো অচেনা ঘুমে ডুবে আছে। দূরের কোনো গলিতে কুকুরের ক্ষীণ ডাকে মাঝে মাঝে নীরবতার পর্দা কেঁপে উঠছে শুধু। আকাশে আধখানা চাঁদ মেঘের আড়াল থেকে উঁকি দিচ্ছে । তার ফ্যাকাশে আলো এসে পড়েছে বিশাল দোতলা বাড়িটার উপর।
ঠিক সেই সময় ধীরে ধীরে শামসুলের বাড়ির বিশাল কালো গেট খুলে গেল। শব্দটাও যেন ইচ্ছে করেই চাপা রাখা হয়েছে। তারপর গেটের ভেতর থেকে বেরিয়ে এলো একদম ঝকঝকে সাদা রঙের দামি গাড়ি। গাড়িটার হেডলাইট অন্ধকার চিরে সামনের রাস্তা আলোকিত করলেও, পুরো ব্যাপারটার মধ্যে অদ্ভুত এক গোপনীয়তা লুকিয়ে আছে ।

সবচেয়ে বিস্ময়ের বিষয় ছিল— গাড়িতে বসে থাকা মানুষটা। এই মানুষটাকে দিনের আলোয় যারা দেখে, তারা কখনোই বিশ্বাস করবে না রাতের এই মানুষটাই সেই শামসুল। সমাজের চোখে ভদ্র, মার্জিত, দানশীল, দেশপ্রেমিক এক জনপ্রিয় নেতা । প্রতিদিন সাদা পাঞ্জাবি-পায়জামায় নিজেকে ঢেকে রাখা লোকটা আজ সম্পূর্ণ অন্য রূপে। তার গায়ে গাঢ় সাদা শার্ট, উপর দিয়ে দামি কোর্ট, চোখে কালো ফ্রেমের চশমা । মুখের শান্ত ভাবটাও আজ কেমন কঠিন, নিষ্ঠুর দেখাচ্ছে।
তার হাতে ছিল কালো চামড়ার ছোট্ট একটা ব্যাগ। ব্যাগটা সে এমনভাবে শক্ত করে ধরে রেখেছে, যেন ওটার ভেতর লুকিয়ে আছে তার সমস্ত ভয় কিংবা সমস্ত অপরাধের ইতিহাস।
অদ্ভুত ব্যাপার হলো— তার সঙ্গে আজ কোনো বডিগার্ড নেই। নেই ব্যক্তিগত সহকারী, নেই বিশ্বস্ত ড্রাইভারদের ভিড়। যে মানুষ একা রাস্তায় বের হওয়ার কথা কল্পনাও করে না, সে আজ গভীর রাতে সম্পূর্ণ নিরবে কোথাও চলে যাচ্ছে।

বাড়ির একটু দূরে, রাস্তার অপর পাশে অন্ধকারে দাঁড়িয়ে ছিল এক মহিলা। কালো শাল দিয়ে নিজেকে ঢেকে রেখেছে সে। তার তীক্ষ্ণ চোখ দুটো এক মুহূর্তের জন্যও গাড়িটার দিক থেকে সরছে না। চোখে ছিল সন্দেহ, ভয় আর বহুদিনের জমে থাকা কোনো সত্য উদঘাটনের নেশা।
মহিলার বুকের ভেতর অজানা অস্থিরতা জমে উঠছিল। কারণ সে জানে— শামসুল শুধু সমাজসেবী নয়। মানুষের সামনে যেই মুখোশ পরে সে ঘুরে বেড়ায়, তার আড়ালে লুকিয়ে আছে ভয়ংকর এক অন্ধকার।
দিনের আলোয় সে এতিমখানায় দান করে, অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ায়, সরকারের বড় বড় মঞ্চে দেশপ্রেমের ভাষণ দেয়। সংবাদপত্রে তার হাসিমাখা ছবি ছাপা হয় “জনদরদী নেতা” শিরোনামে। কিন্তু রাতের অন্ধকার জানে অন্য গল্প।
এই মানুষটাই গোপনে দেশের কোটি কোটি টাকার সম্পদ পাচার করে বিদেশে পাঠায়। ক্ষমতার আড়ালে লুকিয়ে চালায় ভয়ংকর সব অবৈধ ব্যবসা। তার একেকটা হাসির পেছনে লুকিয়ে থাকে শত মানুষের কান্না। একেকটা দানের আড়ালে চাপা পড়ে থাকে অসংখ্য অপরাধের রক্তাক্ত ইতিহাস।
সাদা গাড়িটা ধীরে ধীরে রাস্তা পেরিয়ে অন্ধকারের ভেতর মিলিয়ে যেতে লাগলো।
আর সেই মহিলা…

সে স্থির চোখে তাকিয়ে রইলো গাড়িটার পেছনে। তার ঠোঁট ধীরে ধীরে কেঁপে উঠলো।
“ আজ হয়তো সত্যিটা বের হবেই, শামসুল…।
চারপাশের নীরব রাত যেন তার কথাটা শুনে আরও ভারী হয়ে উঠলো।
আজ বহুদিন পর প্রিয়র ফোন থেকে একটা মেসেজ এসেছে।
” হেরা কলিজা আমার। এখন তুই তোর ডায়রিটা পরতে পারিস। আর আমি এখন হাত নাড়াতে পারি। কথা বলতে পারি না, কিন্তু হাত নাড়াতে পারি।দেখ তোর প্রিয় তোকে নিজে টাপিং করে মেসেজ দিয়েছে। খুব দ্রুত ফিরবো। তোর ওখানে সব ঠিক আছেতো? শোন যা হচ্ছে মেনে নে, হতে দে। আর আমার না বলা কথা গুলো তুই ডায়রি খুললেই পাবি।
হেরা মেসেজ দেখে হতোবাক। রুশাও কাদছে আজ। কিন্তু মেসেজ আর ডায়রির আগা মাথা বুঝে নি সে। জাস্ট এতো টুকু মাথায় কেচ করেছে। প্রিয় হাত নাড়াতে পারছে, হয়তো খুব দ্রুত সুস্থ হয়ে যাবে প্রিয়। তারপর আবার একসাথে হবে তারা।

ওয়াশরুমে দিকে যাওয়ার জন্য করিডোর পেরোচ্ছিল হেরা। চারপাশে তখন অদ্ভুত নিরবতা, দূরে কোথাও কয়েকজনের হাসির শব্দ ভেসে আসছে ক্ষীণভাবে। হেরা দ্রুত পায়ে হেঁটে যাচ্ছিল, এমন সময় আচমকাই কেউ তার হাত শক্ত করে টেনে ধরে।
চমকে উঠে ঘুরতেই দেখে নিলয়।
কিছু বুঝে ওঠার আগেই নিলয় তাকে পাশের একটা ফাঁকা রুমে নিয়ে আসে। দরজাটা আধখোলা, ভেতরে মৃদু অন্ধকার। হেরার বুক ধড়ফড় করতে থাকে।
“কি ব্যাপার? তুমি আমার ফোন ধরছো না কেন?
নিলয়ের কণ্ঠে রাগ, অভিমান আর অস্থিরতা একসাথে মিশে আছে। হেরা নিজের হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করে। চোখে স্পষ্ট বিরক্তি।
” নিলয়, আপনি এমন করে টেনে আনলেন কেন? এটা কি ম্যানার্সের মধ্যে পড়ে?
নিলয় তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকায় তার দিকে। চোখদুটো লালচে, যেন অনেক রাত না ঘুমানো ক্লান্তি জমে আছে সেখানে।

” তুমি আমায় ম্যানার্স শেখাচ্ছো?
তার কণ্ঠ ভারী হয়ে আসে।
” আমি তোমার এই অবহেলা সহ্য করতে পারছি না, হেরা। ভিতরটা জ্বলে পুড়ে যাচ্ছে আমার। জীবনে প্রথমবার আমি কাউকে এতটা ভালোবেসেছি। আমি তোমাকে হারাতে পারবো না… তুমি আমার ফুল…।
শেষ কথাটা বলার সময় তার গলা কেঁপে ওঠে।
হেরা কিছুক্ষণ নিশ্চুপ থাকে। তারপর ধীরে ধীরে বলে—
” আপনি ভুল বুঝছেন। আপনি আমার শুধু বন্ধু। আমি আপনাকে বন্ধুর চোখেই দেখি। প্লিজ, এসব বলে আমাকে বিব্রতকর অবস্থায় ফেলবেন না।
নিলয়ের মুখ মুহূর্তেই বদলে যায়। চোখে জমে ওঠে আহত এক দৃষ্টি।
” তাহলে কি অন্য মেয়েদের মতো তুমিও ক্ষমতা দেখে ভালোবাসো?
সে তিক্ত হেসে বলে–

” ক্ষমতা কিন্তু আমারও কম নেই, হেরা। চাইলে আমি…।
” স্টপ ইট!
হেরা এবার একটু জোরেই বলে ওঠে–
” আপনি কি বলছেন এসব?
“হ্যাঁ, আমি ঠিকই বলছি!”
নিলয় এগিয়ে আসে আরও–
” কারণ আমি বুঝতে পারছি, তুমি দূরে সরে যাচ্ছো। তুমি বদলে যাচ্ছো। আর এই বদলে যাওয়ার কারণ…।
সে থেমে যায়। দাঁত দাত চেপে উচ্চারণ করে—
” নাভান!
হেরা বিস্মিত চোখে তাকায়।

” নাভানকে এর মধ্যে টানছেন কেন ?
নিলয় হঠাৎ দুহাতে হেরার কাঁধ ধরে ফেলে। তার চোখে তখন ভয়ংকর অসহায়ত্ব।
” কারণ আমি তোমাকে হারাচ্ছি!
কাঁপা কণ্ঠে বলে সে–
” তুমি বুঝতে পারছো না হেরা, আমি পাগল হয়ে যাচ্ছি। তোমার সাথে কথা না হলে আমার দম বন্ধ হয়ে আসে। রাতে ঘুমাতে পারি না। সারাক্ষণ মনে হয় তুমি অন্য কারো হয়ে যাচ্ছো…পুরুপুরি।
তার গলার স্বর ধীরে ধীরে ভেঙে আসে।
” প্লিজ হেরা… নাভানকে সরিয়ে দাও তোমার জীবন থেকে। আমি সহ্য করতে পারি না ওকে তোমার আশেপাশে দেখতে। তুমি শুধু আমার কাছে চলে আসো। আমি তোমাকে অনেক ভালো রাখবো। তোমার চোখে একফোঁটা কান্নাও আসতে দিবো না।
হেরা স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে।
নিলয় এবার তার হাত দুটো নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে প্রায় আকুতির সুরে বলে—

” আমি কখনো কারো কাছে মাথা নত করিনি। কিন্তু আজ তোমার কাছে করছি। শুধু একবার বলো তুমি আমার হবে। আমি সব ছেড়ে দিতে পারবো, সবকিছুর সাথে লড়তে পারবো… শুধু তোমাকে ছাড়া বাঁচতে পারবো না।
তার চোখের কোণে চিকচিক করে জল জমে ওঠে।
” তুমি জানো না হেরা, তোমাকে অন্য কারো পাশে ভাবলেই বুকের ভিতরটা ছিঁড়ে যায়। মনে হয় কেউ আমার নিঃশ্বাস কেড়ে নিচ্ছে। আমি সত্যি তোমাকে খুব ভালোবাসি…”
শেষ কথাটা বলতেই নিলয়ের গলা পুরোপুরি ভেঙে যায়।
আর হেরা…
সে শুধু নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে থাকে। কারণ এই মুহূর্তে নিলয়ের চোখের সেই অসহায় ভালোবাসা দেখে তার নিজের বুকের ভেতরেও অদ্ভুত এক ভারী অনুভূতি জমে উঠেছে। কিন্তু ভালোবাসা যে জোর করে হয় না।

” এই জিবনে আপনাকে ভালোবাসার চোখে দেখতে পারবো না আমি। আমার মনে যে অন্য কারো বসবাস অনেক বছর আগে থেকে।
হেরা জানে না কেন আজ সে এমন কথাগুলো বলেছে। কথাগুলো যেন তার নিজের হৃদয়ের গভীর থেকে হঠাৎ করেই বেরিয়ে এসেছিল। অথচ এতদিন সে নিজের মনকে শক্ত করে বেঁধে রেখেছিল। কোনো অনুভূতিকে প্রশ্রয় দেয়নি, কাউকে নিজের হৃদয়ের কাছেও আসতে দেয়নি। কারণ তার হৃদয়ে বহু বছর ধরে একজনের অস্তিত্ব ছিল—একজন অদেখা মানুষ। এক গোপন প্রেমিক। যাকে সে কখনো চোখে দেখেনি। অথচ নিঃশব্দে ভালোবেসে গেছে কিশোরি বয়স থেকে !
সেই মানুষটা বারবার তাকে বিপদের হাত থেকে বাঁচিয়েছিল। কখনো ছায়ার মতো, কখনো অদৃশ্য রক্ষাকর্তার মতো পাশে থেকেছে। আর সেই কারণেই হয়তো হেরা নিজের প্রথম অনুভূতিটাকে এত পবিত্র করে রেখেছে। সে বিশ্বাস করত, প্রথম ভালোবাসা কখনো মিথ্যে হয় না। তাই তো আজ পর্যন্ত অন্য কাউকে ভালোবাসার সাহস করেনি। না নিলয়কে, না অন্য কাউকে।
তবুও আজকাল সবকিছু যেন বদলে যাচ্ছে।

নাভানকে সে দূরে রাখতে চায়। ঠিক যেভাবে নিলয়কে দূরে সরিয়ে রেখেছিল। কিন্তু অদ্ভুতভাবে সেই অসভ্য, উদ্ধট গিটারওয়ালা ছেলেটার কথাই বারবার মনে পড়ে যায় তার। মনের বিরুদ্ধে গিয়েও সে অনুভব করছে, ধীরে ধীরে নাভানের দিকে টেনে নেওয়া হচ্ছে তাকে। গভীর কোনো অতলে ডুবে যাচ্ছে সে, যেখান থেকে আর নিজেকে টেনে তোলা যাচ্ছে না। কিন্তু এটা তো সে চায় না!
সে তো তার প্রথম অনুভূতির মানুষটাকে চায়। সেই অদেখা প্রেমিক কে । যার জন্য এত বছর অপেক্ষা করে এসেছে। যাকে অনুভব করতে চায় পুরো হৃদয় দিয়ে। তাহলে নাভানের জন্য বুকের ভেতর এত উথাল-পাথাল কেন? কেন তাকে দেখলে হৃদস্পন্দন বদলে যায়? কেন মন ছটফট করে তার জন্য? কেন তার কণ্ঠস্বর শুনলেই ভেতরটা কেঁপে ওঠে?

এই “কেন”-এর উত্তর হেরার জানা নেই।
আজকাল সে নিজেই নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলছে। বারবার সেই দিনের কথা মনে পড়ে—পবিত্র সেই “কবুল” বলার মুহূর্ত। কেন সে দ্বিতীয়বার কবুল বলেছিল? কেন নাভানকে জোর করে থামাতে পারেনি? কেন তখন তার মন অন্যরকম হয়ে গিয়েছিল? সেই মুহূর্তটা কি শুধুই পরিস্থিতির চাপ ছিল, নাকি তার হৃদয়ের দুর্বলতা?
নিজেকে নিজেই ধিক্কার দিতে ইচ্ছে করে হেরার।
নাভান তো তার কাজিন! তার বাবার একমাত্র ছেলে! শুধুমাত্র এই সম্পর্কটার কারণেই তো তাকে কিছু বলতে পারছে না। কিন্তু তাকে তো দূরে রাখা উচিত। তাও যতবার সে নাভানকে নিচে নামাতে চেয়েছে, ততবার নিজেই আরও গভীরভাবে তার মধ্যে ডুবে গেছে।
প্রিয়র কথা মনে পড়ে হেরার।
সে তো নেপাল থেকে এখানে এসেছিল এক অহংকারী মানুষটার অহংকার মাটিতে মিশিয়ে দিতে। কিন্তু নিয়তি আবারও তার সাথে নিষ্ঠুর খেলা খেলল। কেন সেই অহংকারী মানুষটার সাথেই তাকে জড়িয়ে দিল? কেন তার প্রতি ঘৃণার বদলে অন্যরকম অনুভূতি জন্ম নিতে লাগল? কেন সে পারছে না তার কোনো ক্ষতি করতে? এমনকি অহংকারটুকুও ভাঙতে পারছে না!

না, আর নয়।
এবার তাকে শক্ত হতে হবে। নিজেকে কঠিন করে দাঁড় করাতে হবে। এই সম্পর্কের গভীরে সে আর জড়াতে চায় না। কারণ তার হৃদয়ে তো অন্য কেউ আছে—তার গোপন প্রেমিক, তার প্রথম ভালোবাসা জি ম্যানকে ।
সেই মানুষটা তো বলেছিল—
যেখানেই যাক, যত দূরেই থাকুক, একদিন ঠিক ফিরে আসবে। শুধু হেরাকে অপেক্ষা করতে হবে।
তাহলে হেরা কেন অপেক্ষা ধরে রাখতে পারছে না?
হঠাৎ তার মনে ভয় জাগে। যদি একদিন সেই মানুষটা সত্যিই ফিরে আসে, আর এসে দেখে হেরার বিয়ে হয়ে গেছে? তখন কী হবে? যে মানুষটাকে সে কখনো দেখেনি, শুধুমাত্র চিঠির মাধ্যমে অনুভব করেছে, তার প্রতি এত গভীর ভালোবাসা কীভাবে জন্মেছিল?
মানুষটার অনুভূতিগুলো এত প্রখর ছিল যে, অজান্তেই হেরা তার প্রেমে পড়ে গিয়েছিল।
আর সেই মানুষটা তো বলেছিল, হেরার বিশ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই সে ফিরে আসবে। খুব কাছে আসবে। তার জন্মদিনেই নাকি সে নিজের পরিচয় দেবে।
প্রিয়র কথাগুলো আজ আবার মনে পড়ে হেরার।
প্রিয় প্রথমেই বলেছিল, “তোমার বয়স বিশ হলেই ডায়েরিটা খুলবে।”
ডায়েরি…

হঠাৎ করেই শব্দটা মাথার ভেতর ঝড় তোলে। এই ডায়েরির সাথেই কি জড়িয়ে আছে তার জি ম্যানের পরিচয়? কোনো সূত্র? কোনো সত্য?
কিন্তু যতই ভাবছে, মাথার ভেতর সবকিছু আরও জট পাকিয়ে যাচ্ছে।
কিছুই বুঝতে পারছে না হেরা। আর কেনই বা আজ প্রিয় তাকে এই মেসেজ দিলো?
শুধু বুকের ভেতর অদ্ভুত এক অস্থিরতা জমে উঠছে—
প্রথম ভালোবাসার অপেক্ষা আর বর্তমান অনুভূতির টানাপোড়েনে ধীরে ধীরে ভেঙে পড়ছে সে।
নিলয় কে উপক্ষা করে চলে আসে হেরা। আর নিলয় ঠাই দাঁড়িয়ে হেরার যাওয়ার পানে চেয়ে থাকে — রাগ খোব হয় নাভানের উপর। নাভানের জন্য সে তার হেরা ফুল কে নিজের করতে পারছে না।

ঝিনুকের সঙ্গে কী যেন খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা করছিল নাভান। দু’জনের মুখই অস্বাভাবিক গম্ভীর। দেখে মনে হচ্ছিল, মজা বা সাধারণ কোনো কথা না—বরং এমন কিছু, যেটা নিয়ে দু’জনেই বেশ চিন্তিত।
অন্যদিকে একটু দূরে রোজ, রুশা আর হেরা বসে নোট দেখছিল। আজ পরীক্ষা, তাই চারপাশে সবাই শেষ মুহূর্তের পড়া নিয়ে ব্যস্ত। কারও হাতে বই, কারও হাতে সাজেশন, কেউ আবার মুখস্থ করা লাইন বিড়বিড় করছে।
হেরা হঠাৎ চোখ তুলে চারপাশে তাকাতে গিয়ে থমকে যায়। শেহতাজ খান নাভান।
ছেলেটার হাতে কিছুই নেই। না কোনো বই, না নোট, এমনকি একটা কলমও না। যেন পরীক্ষা দিতে নয়, অন্য কোনো কারণে এসেছে।
হেরা বিরক্ত হয়ে ভ্রু কুঁচকে অন্যদিকে তাকায়। মনে মনে বলে—
“লোকটার কোনো দায়িত্ববোধ আছে?
ঠিক তখনই আচমকা কোথা থেকে যেন তিতির এসে নাভানকে জড়িয়ে ধরে।
ঘটনাটা এত দ্রুত ঘটে যে নাভান নিজেও খানিকটা চমকে ওঠে। আশেপাশের অনেকেই তাকিয়ে থাকে তাদের দিকে।
তিতির নাভানের বুকের সঙ্গে মুখ চেপে ধরে কাঁপা গলায় বলে ওঠে—

“ আই মিস ইউ বেবি… আমি তোমাকে অনেক মিস করেছি। তুমি এতদিন আমাকে দেখতে যাওনি কেন? জানো, ওই লোকগুলো আমার হাতে কত সুই দিয়েছে! আমি বলেছি আমার কষ্ট হয়… তবুও ওরা এসব করেছে …।
নাভান একটু অস্বস্তি নিয়ে ধীরে ধীরে তিতিরকে নিজের থেকে আলাদা করে।
“ তিতির, তুমি এখানে এলে কীভাবে?
তিতির ঠোঁট ফুলিয়ে বলে—
“ আমি নিজেই ড্রাইভ করে এসেছি। ওরা আমাকে আসতে দিতে চায়নি। কিন্তু আমি তো তোমাকে না দেখে থাকতে পারি না। আমার তোমাকে দেখার তৃষ্ণা পেয়েছে…।
নাভান নিচু গলায় বুঝিয়ে বলার চেষ্টা করে—
“এভাবে একা আসা ঠিক না। তোমাকে যা বলা হয়েছে, সেটা মানা উচিত ছিল।
তিতির সঙ্গে সঙ্গে মাথা নাড়ে।
“ ওই ডাক্তার কিছু জানে না। আমার কোনো অসুখ হয়নি। আমি কেন ওখানে পড়ে থাকব? আমার একটাই রোগ… আর একটাই মেডিসিন।”
সে মিষ্টি করে হাসে।
“সেটা তুমি, বেবি।
কথাগুলো ঝিনুক শুনতে পেলেও দূরে বসে থাকা বাকিরা স্পষ্ট শুনতে পায় না। তাদের কাছে শুধু মনে হচ্ছিল, খুব কাছের কেউ অনেকদিন পর দেখা করেছে।
কিন্তু হেরার ভেতরটা কেমন যেন জ্বলে উঠছিল।

কারণ তিতিরের সেই অধিকার ফলানো আচরণ তার একদম সহ্য হচ্ছিল না।
হেরা চোখ সরিয়ে আবার নোটে মন দিতে যাবে, ঠিক তখনই তিতির হঠাৎ তাদের দিকে এগিয়ে আসে।
এদিকে নাভানের ফোন আসায় সে সাইডে চলে যায়। তিতির আর ঝিনুক কে রেখে। তিতির এই সুযোগে
কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই গট গট পায়ে হেরাদের সামনে যায় । আচমকা হেরার হাত থেকে নোটগুলো কেড়ে নিয়ে মাঠের ঘাসে ছুঁড়ে ফেলে দেয়।
রোজ আর রুশা চমকে ওঠে।
হেরা মুহূর্তেই দাঁড়িয়ে যায়।
তিতির আঙুল তুলে হেরার দিকে তাকিয়ে বলে ওঠে—
“এই মেয়ে! তুমি কী ভাবো নিজেকে? আমার বেবির আশেপাশে ঘোরাঘুরি করবে আর আমি চুপ করে থাকবো? নিজের শরীর দেখিয়ে একজনের পর একজনের সাথে রিলেশন করবে?
হেরা অবিশ্বাস্য চোখে তাকিয়ে থাকে।
তিতির আরও এগিয়ে আসে

“শোনো, তোমার কোনো অস্তিত্ব নেই শেহতাজ খান নাভানের জীবনে। সো, তুমি ওর কাছ থেকে দূরে থাকবে। আমি এসে গেছি এখন। আর হ্যাঁ, ওসব সম্পর্ক কোন সম্পর্কই না। এক্সিডেন্টলি হওয়া কোন সম্পর্ক হয় না। নাভানের সাথে নিজের নাম জরিয়ে রাখা এটা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলো। নাভান বেবির সাথে থাকাটা তোমার মতো মেয়েদের জন্য নয়। নাভান সেকেন্ড হ্যান্ড কোনো কিছুই পছন্দ করে না। বুঝেছো? আমায় দেখো নাভান ব্যাতিত কোনো ছেলের বাতাস ও শরীরে লাগতে দেই না।
হেরার চোখ ধীরে ধীরে রাগে লাল হয়ে ওঠে।
সে নিচু হয়ে মাটিতে পড়ে থাকা নোটগুলো তুলে নেয়। তারপর ধীরে ধীরে তিতিরের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়।
তার ঠোঁটে ঠান্ডা হাসি

“কথা শেষ?
তিতির ভ্রু কুঁচকে তাকায়।
হেরা এবার কড়া গলায় বলে ওঠে—
” আপনি নাকি হসপিটালে ছিলেন এতদিন? আপনাকে দেখে তো কোন দিক থেকে অসুস্থ মনে হয় না। আই মিন মানসিক রোগী। কারণ একজন অসুস্থ ব্যক্তির মাথায় এমন কুরুচিপূর্ণ কথা কখনোই আসেনা। নিজের অসুস্থতাকে কাজে লাগাচ্ছেন, মাথায় ব্যান্ডেজ আর হাতে ক্যানোলা নিয়ে নাটক করলেই সবাই আপনার কথায় নাচবে ভাবছেন?
তিতির ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে।
“ তুমি আমার সঙ্গে এভাবে কথা বলছ কেনো?
“ যেভাবে বলা দরকার, সেভাবেই বলছি। আপনি মুখে মধু নিয়ে কথা বলেছেন নাকি? মিস তিতির পাখি!
হেরার চোখে এবার স্পষ্ট আগুন।
“ আর একটা কথা ভালো করে শুনে রাখুন , আপনার বেবিকে বলবেন যেন আমার আশেপাশে না ঘুরে। আমি ওর পেছনে ঘুরি না ওকে!
তিতির দাঁতে দাঁত চেপে বলে—

“তোমার সাহস তো কম না!” আমি অসুস্থতা নিয়ে নাটক করি?
“ সাহস দেখাইনি এখনো?
হেরা এবার এক পা সামনে এগিয়ে আসে।
‘ আমার সামনে এসব নাটক চলবে না। বুঝেছেন ?
তিতির রাগে কাঁপতে কাঁপতে বলে—
“নাভান শুধু আমার! তুমি ওর কাছ থেকে দূরে থাকবে। এটা ফার্স্ট অ্যান্ড লাস্ট ওয়ার্নিং! আর বিহেভিয়ার ভালো করবে। বড়দের সাথে কিভাবে কথা বলতে হয় তাও জানো না। ম্যানারলেস মেয়ে কোথাকার।
“ ওয়ার্নিং?
হেরা হেসে ওঠে।

“তুমি আমাকে ওয়ার্নিং দিচ্ছ? আগে নিজের আচরণ ঠিক করো। তারপর অন্যকে শেখাতে আসবে।
দু’জনের মাঝে উত্তেজনা এতটাই বেড়ে যায় যে, আশেপাশে দাঁড়িয়ে থাকা সবাই নিঃশব্দে তাকিয়ে থাকে।
ঝিনুক অস্বস্তি নিয়ে এদিক সেদিক তাকায়। নাভান বলে দিয়েছে তিতিরের সাথে যাতে কেউ মিসবিহেভ না করে, তাই আপাতত সবাই চুপ। হায়দার চৌধুরী ফোন দিয়েছিল মেয়ের ব্যাপারে কথা বলতে । নাভান কলটা কেটে দিয়ে দ্রুত এগিয়ে এসে দেখে হেরা এত বকবক করে যাচ্ছে আঙ্গুল উঁচিয়ে। সামনে নাভানকে আগে লক্ষ্য করেছিল তিতির সেজন্য কান্না কান্না নাটক করে মেয়েটা। কিন্তু হেরা উল্টো দিকে থাকায় নাভানকে দেখতে পায়নি।
তিতিরের চোখ তখন ভেজা। আর সেই দৃশ্য দেখেই নাভানের চেহারা বদলে যায়।
সে হেরার সামনে দাঁড়িয়ে ঠান্ডা গলায় বলে—

“তোমার সমস্যা কী?
হেরা হতভম্ব হয়ে তাকায়।
নাভান এবার আরও কঠিন গলায় বলে—
“ সবসময় ঝগড়া না করলে তোমার চলে না?
সেরা হতভম্ব হয়ে নাভানের দিকে তাকিয়ে বলে —
“ আমি ঝগড়া করেছি? এই ব্যায়াদপ মেয়েই তো আগে।
নাভান ধমকে ওঠে হেরাকে!
“Enough!
নাভানের গর্জে ওঠা কণ্ঠে মুহূর্তের মধ্যেই পুরো পরিবেশটা নিস্তব্ধ হয়ে গেল।
চারপাশে এত মানুষ থাকা সত্ত্বেও যেন হঠাৎ সব শব্দ থেমে গেছে। শুধু বাতাসের ভারী চাপা শব্দ আর উত্তেজনার তীক্ষ্ণতা টের পাওয়া যাচ্ছে।
নাভান তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে হেরার দিকে তাকিয়ে দাঁত চেপে বলল—
তিতির অসুস্থ তুমি চোখে দেখতে পাচ্ছো না? তারপরও ওর সাথে এই tone-এ কথা বলার সাহস পাও কীভাবে? বাবা- কি তোমাকে এটাই শিখিয়েছে —someone is sick আর তুমি তার সাথে argue করবে, মুখে মুখে তর্ক করবে?

‘ মানুষের সাথে কীভাবে কথা বলতে হয় সেটাও জানো না তুমি। কেউ একটা কথা বলল আর সেটাই repeat করে উল্টা attitude দেখাতেই হবে ? এত উগ্রতা কিসের? সব কথায় reaction দিতে হবে নাকি?
Seriously, grow up. সব সময় loud হয়ে বা rude behave করে কেউ বড় হয় না। তোমার problem কী জানো? তুমি respect দিতে জানো না। আর respect না জানলে relationship, friendship, কোন কিছুই টিকে না। তিতিরের শরীর খারাপ, তার পাশে calm হয়ে দাঁড়ানোর বদলে তুমি তাকে আরও mentally disturb করছো? Idiot এর মতো behave করা বন্ধ করো। আর আগে মানুষকে respect করতে শেখো।
নাভা নের এমন রাগে অপমানে চোখের পলকে হেরার মুখের রং বদলে গেল। রাগ, অপমান আর বিস্ময় মিলেমিশে কেমন এক তীব্র অনুভূতি জমাট বাঁধল ভেতরে। হেরা ধীরে ধীরে মাথা তুলে নাভানের চোখে চোখ রেখে বলল—

“একদম আমার শিক্ষা নিয়ে কথা বলবেন না।
তার কণ্ঠ কাঁপছিল না, বরং অদ্ভুত শক্ত ছিল।
কিন্তু সেই শক্ত গলার আড়ালেও বুকের ভেতরটা কেঁপে যাচ্ছিল। নাভান ঠান্ডা অথচ কড়া স্বরে হেসে উঠল।
“ সবাই তোমার মতো বেয়াদব না, মিসেল গার্ল। পৃথিবী শুধু তোমাকে ঘিরে না। বড়দের সম্মান করতে জানতে হয়। তিতির তোমার বড়। আর যেখানে আমি কথা বলছি, সেখানে আমার কথার উপর কথা বলছো কেন? মানুষকে কিভাবে সম্মান দিয়ে কথা বলতে হয়, সেটাও এখনো জানো না।কখন কি করতে বা বলতে হয় কিছু ধারনা নেই তোমার?
প্রতিটা শব্দ যেন ছুরি হয়ে এসে বিঁধতে লাগল হেরার ভেতরে। চারপাশে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলোর চোখ হঠাৎ তাকে আরও অসহায় করে তুলল।

মনে হচ্ছিল, সবার সামনে কেউ তাকে সজোরে থাপ্পড় মেরেছে।
এক মুহূর্তের জন্য তার গলা শুকিয়ে এলো।
হাতে শক্ত করে ধরা নোটগুলো কুঁচকে গেল মুঠোর চাপে।
কিন্তু তার চেয়েও বেশি কুঁচকে গেল ভেতরের অনুভূতিগুলো।
কারণ নাভানের প্রতিটা কথাই বুকের গভীরে ধারালো কাঁটার মতো বিঁধে রইল।
এরপর নাভান তিতিরের দিকে তাকিয়ে মুহূর্তেই গলার স্বর নরম করে ফেলল।
“ চলো।
নাভান যাওয়ার আগে হেরা বলে উঠে–
” আপনার গার্লফ্রেন্ড এর ধারনা আমি আপনার পিছু পিছু ঘুরি। তাই আমি বলছে আপনাকে যেনো আশেপাশে না দেখি আমার।

নাভান কিছু বলে না চুপ করে শুনে হেরার কথা। বিরক্ত হয় তিতির কে গার্লফ্রেন্ড বলাতে গর্ধভ এর মতো যাকে তাকে তার সাথে জুরে দিচ্ছে। তিতির সামনে আছে বিধায় কিছু বলছে না। তা না হলে কে কার গার্লফ্রেন্ড তা আজ বুঝিয়ে দিতো এই শেহতাজ খান নাভান।
তিতির ঠোঁটের কোণে বিজয়ী হাসি টেনে ইচ্ছে করেই একবার হেরার দিকে তাকাল।
সেই দৃষ্টিতে ছিল অহংকার, তাচ্ছিল্য আর জয়ের উন্মাদনা।
তারপর সে নাভানের হাত জড়িয়ে ধরে ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে যেতে উদ্যত হয়।
আর হেরা…

সে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
যেন তার চারপাশের পৃথিবীটা থেমে গেছে। নাভান কে প্রতিক্রিয়া করতে না দেখে, চোখ দুটো লাল হয়ে উঠেছে রাগে আর অপমানে। তার কণ্ঠ এবার আগের চেয়েও ধারালো।
“ আর হ্যাঁ, আপনি আমার সাথে কিভাবে কথা বলছেন, সেটা আগে ঠিক করুন। গলা উঁচু করে কথা বলবেন না আমার সাথে। আমি আপনার সব কথা চুপচাপ শুনে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকব, এতটা দুর্বল মেয়ে আমি নই।
চারপাশে আবার নিস্তব্ধতা নেমে এলো।
হেরা এক পা সামনে এগিয়ে এলো।

“ আর একটা কথা… আঙুল তুলবেন না আমার দিকে। কারণ আমি অন্যায় সহ্য করে চুপ থাকার মতো মেয়ে না। সম্মান করতে জানি বলেই এতক্ষণ চুপ ছিলাম। কিন্তু তার মানে এই না যে, যেভাবে ইচ্ছা অপমান করবেন আর আমি মাথা নিচু করে সব মেনে নেব।
হেরার চোখে তখন পানি চিকচিক করছিল, কিন্তু সেই পানির মাঝেও ছিল ভীষণ আত্মসম্মান।
নাভান কয়েক সেকেন্ড চুপ করে তাকিয়ে রইল হেরার দিকে। হয়তো সে নিজেও বুঝতে পারেনি, এই মেয়েটা এতটা দৃঢ় হয়ে তার সামনে দাঁড়াতে পারবে।

আর হেরা…
তার বুকের ভেতর তখন ঝড় বয়ে যাচ্ছে।
কারণ সে যতই নিজেকে শক্ত দেখাক না কেন, নাভানের কথাগুলো তাকে ভেতর থেকে ভীষণভাবে আঘাত করেছে।
রাত অনেক গড়িয়ে গেছে। শহরের অভিজাত ক্লাবটার ভেতর তখনো মৃদু আলো জ্বলছে। কাঁচের গ্লাসে বরফ ঢালার টুংটাং শব্দ, হালকা মিউজিক আর সিগারেটের ধোঁয়ায়, চারপাশ ঝাপসা।
এক কোণে বসে আছে নিলয়। চোখ দুটো রক্তিম, এলোমেলো চুল, হাতে আধাভর্তি ড্রিংকের গ্লাস। কিন্তু আজ তার নেশা মদের না… তার নেশা একটাই— হেরা।
সামনের সোফায় বসে থাকা সিয়াম বিরক্ত গলায় বলে উঠলো—

“এতো ড্রিংক করিস না দোস্ত। নিজেকে শেষ করে ফেলছিস।
নিলয় হঠাৎ গ্লাসটা শক্ত করে ধরে অস্পষ্ট গলায় বলে উঠলো—
“ আমার হেরাকে লাগবে… আমার হেরা কে চাই… যে কোনো কিছুর বিনিময়ে আমি আমার হেরাকে চাই…।
তার কণ্ঠে এমন এক উন্মাদনা ছিল, যেন পৃথিবীর সবকিছু হারিয়ে ফেললেও সে তার হেরা ফুল কে হারাতে পারবে না। সিয়াম দীর্ঘশ্বাস ফেলে মাথা নাড়ল।
“তোকে আগেই বলেছিলাম… মেয়েদের বিশ্বাস করতে নেই। ওই মেয়ে তোর সাথে এতোদিন থেকে এখন নাভান কে পেয়ে ভুলে গেছে। সব মেয়ে এক!
কথাটা শেষ হতেই নিলয়ের চোখ মুহূর্তে জ্বলে উঠলো। সে ঝটকা মেরে উঠে দাঁড়িয়ে সিয়ামের কলার চেপে ধরলো।

” মেয়ে বলছিস কেন? সম্মান দিয়ে কথা বল! আর একবার আমার হেরাকে নিয়ে বাজে কথা বললে ভুলে যাবো তুই আমার বন্ধু!
সিয়াম থমকে গেল।
নিলয়ের চোখে তখন ভয়ংকর এক ভালোবাসা। যে ভালোবাসা মানুষকে পাগলও বানায়, ধ্বংসও করে।
ঠিক তখনই পাশে দাঁড়িয়ে থাকা নেন্সি ধীরে ধীরে এগিয়ে এলো। মেয়েটার চোখ টলমল করছে। এতক্ষণ ধরে চুপচাপ শুনছিল সে। কিন্তু আর পারলো না।
কাঁপা গলায় বলে উঠলো—
“ কি ভুল বলেছে সিয়াম? তুমি ওই মেয়ের জন্য নিজেকে শেষ করে দিচ্ছ নিলয়! কি যাদু করেছে ওই মেয়ে তোমার ওপর?
নিলয় বিরক্ত চোখে তাকালো। কিন্তু তিতির থামলো না।
“ আমি প্রথম দিন থেকেই বলেছি… হেরা তোমাকে ভালোবাসে না। তুমি শুধু নিজেকে কষ্ট দিচ্ছো। অথচ আমি… আমি তো আজও তোমাকে পাগলের মতো ভালোবাসি!
শেষ কথাটা বলতে বলতে নেন্সির গলা ভেঙে গেল।
সে ধীরে ধীরে নিলয়ের সামনে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ে। চোখ বেয়ে টপটপ করে পানি পড়ছে।

“তুমি আমাকে বারবার ফিরিয়ে দিয়েছো… অপমান করেছো… তবুও দেখো, আমি যেতে পারিনি।
একটা মেয়ের ভালোবাসা কতটা গভীর হলে সে নিজের সম্মান ভুলে একজন মানুষের কাছে পড়ে থাকতে পারে জানো?
চারপাশ নিস্তব্ধ। নেন্সির বুক চেপে ধরে কাঁদতে কাঁদতে বলে উঠলো—
“ আমি তোমাকে ভালোবাসি নিলয়। এতটাই ভালোবাসি যে তোমার পাশে অন্য কাউকে ভাবলেই আমার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসে। তুমি চাইলে আমি পুরো পৃথিবীর বিরুদ্ধে যেতে পারি। তোমার জন্য নিজের জীবনও দিয়ে দিতে পারি…।
তার কণ্ঠে অসহায়তা ছিলো, ছিল নিঃস্বার্থ ভালোবাসার আর্তনাদ। কিন্তু নিলয়ের মুখে কোনো কোমলতা ফুটলো না।
বরং সে দাতে দাঁত চেপে টেবিলের ওপর থাকা গ্লাসটা শক্ত করে ধরে বললো—

“স্টপ! এক্ষুনি বন্ধ কর এসব!
তার গর্জনে সবাই কেঁপে উঠলো।
“ আর একটা শব্দ বলবি না! গ্লাসটা দেখছিস? ভেঙে পুরোটা তোর পেটে ঢুকিয়ে দিব!
নেন্সি কেঁপে উঠলো।
তবুও চোখ সরালো না।
নিলয় পাগলের মতো চুলে হাত চালিয়ে বলতে লাগলো—
“তোদের দেখলেই আমার ঘৃণা হয়! যারা বিয়ের আগে নিজের শরীর বিলিয়ে দিতে দু বার ভাবে না।
নেন্সি এবার ধীরে বলে উঠলো—
“ মেয়েদের বেলায় এসব কেনো। কোন বইয়ে লিখা আছে বিয়ের আগে ছেলেরা এসব করতে পারবে? প্রথম প্রথম তো কত মেয়ের সাথে ডেটিংয়ে গিয়েছো । সেটা কি তোমার হেরা জানে?
নিলয় হঠাৎ থেমে গেল।
কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে ধীরে ধীরে হাসলো। সেই হাসিতে কষ্ট ছিল।

“ না… হেরা জানে না।
তারপর বুকের ওপর হাত রেখে ফিসফিস করে বললো–
“হেরা শুধু নিলয়ের দিন কে চেনে রাত কে নয় । হ্যাঁ, আমি ডেটিং করেছি… অনেক মেয়ের সাথে ঘুরেছি… কিন্তু আমার পবিত্র ফুলটা আসার পর আর কারো দিকে তাকাইনি আমি।
নিলয়ের চোখ ভিজে উঠলো।
“ আমি তাকেই ভালোবেসেছি… এমনভাবে ভালোবেসেছি যে এই জীবন, এই দুনিয়া, ওই আখিরাত, সব জায়গায় শুধু তাকে চাই। যে কিছুর বিনিময়ে হোক… হেরা আমার । দরকার হলে আমি সব ধ্বংস করে দিব তাকে নিজের করে রাখতে।
নেন্সি হাউমাউ করে কেঁদে উঠলো।
“ নিলয়! তুমি মরীচিকার পিছনে ছুটছো! যে মেয়েটা তোমাকে ভালোবাসেই না তার জন্য নিজেকে শেষ করছো! আর আমি? আমি তো তোমার জন্য সবকিছু করতে রাজি!
সে নিলয়ের হাত ধরে নিজের কপালে ঠেকালো।

“একবার… শুধু একবার আমাকে সুযোগ দাও। আমি তোমাকে এত ভালোবাসবো যে তুমি সব ভুলে যাবে। যে নারী তোমাকে ফেলে দিয়েছে, আমি সেই নারীর শূন্যতা আমার ভালোবাসা দিয়ে ভরে দিব…।
নিলয় ধীরে ধীরে হাত সরিয়ে নিল।
তার কণ্ঠ এবার অদ্ভুত শান্ত।
“না নেন্সি… আমি কারো ভালোবাসা চাই না।”
এই দুনিয়াতেও না… আখিরাতেও না…
সে চোখ বন্ধ করে যেন হেরার মুখ কল্পনা করলো।
তার ঠোঁটে মৃদু হাসি ফুটে উঠলো।
“আমি শুধু আমার ফুলের ভালোবাসা চাই। জানো ? ওই পবিত্র মুখটার দিকে তাকালে আমি সব ভুলে যাই। আমার ভিতরের সব অন্ধকার থেমে যায়…।
নেন্সি কাঁদতে কাঁদতে বললো—
“ পাপিষ্ঠের ভালোবাসা কখনো পবিত্র হয় না।
নিলয় ধীরে ধীরে নেন্সির দিকে তাকালো। চোখে অদ্ভুত শূন্যতা।
“ তুই জানিস আমি পাপিষ্ঠ… তাহলে কেন এখনো আমার পিছনে পড়ে আছিস?
নেন্সি ম্লান হাসলো–

“ কারণ আমি এই পাপিষ্ঠকেই ভালোবাসি। পৃথিবীর সবাই তোমাকে দোষী বললেও আমার চোখে তুমি আমার ভালোবাসা। আমি তোমাকে ভালোবেসেছি… ভালোবাসি… আর মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ভালোবেসে যাব।
নিলয় চোখ ফিরিয়ে নিল।
তার কণ্ঠ এবার নির্মম।
“ এই দুনিয়ায় তোর আশা কখনো পূরণ হবে না। আমি তোকে ভালোবাসি না… আর কোনোদিনও বাসবো না।
নেন্সির বুকটা যেন ছিঁড়ে গেল।
কিন্তু নিলয় থামলো না।
নিলয় উপরের দিকে তাকিয়ে বিষাক্ত গলায় বলে উঠলো—
“ যদি কোনোদিন আমার হেরা আমার না হয়… তাহলে অভিশাপ লাগুক এই পৃথিবীর সব সুখের ওপর। আমি যেমন জ্বলছি, তেমনি সবকিছু জ্বলে যাক। কারণ আমি হেরাকে ছাড়া বাঁচবো না… কখনো না…।
নেন্সি এবার কান্না মিস্ত্রিত কন্ঠে বলে ওঠে–

‘ নিলয় তাহলে আমার সাথে কেনো সময় কাটিয়েছিলে?
” তুমি সুযোগ দিয়েছো তাই।
নেন্সির চোখ বেয়ে নীরব অশ্রু গড়িয়ে পড়লো। নিলয় তাকে তাহলে কোনোদিন ভালোবাসে নি। বুক টা মুহুর্তে মোচড় দিয়ে উঠে নেন্সির।
এ কেমন ভালোবাসা মানুষকে বাঁচাতেও পারে… আবার শেষও করে দিতে পারে।
ন্যান্সির চোখ দুটো কান্নায় ফুলে লাল হয়ে আছে। কতদিন হয়ে গেল—সে অপেক্ষা করছে নীলয়ের জন্য। প্রতিটা সকাল শুরু হয়েছে একরাশ আশা নিয়ে, আর প্রতিটা রাত শেষ হয়েছে অবহেলার তীব্র যন্ত্রণায়। তবুও সে থেকেছে, ভালোবেসেছে, বিশ্বাস করেছে। কিন্তু আজ যেন তার ধৈর্যের শেষ সীমাটুকুও ভেঙে গেছে।
কাঁপা হাতে চোখের পানি মুছে ন্যান্সি ধীরে ধীরে দরজার দিকে এগিয়ে যায়। যাওয়ার আগে একবার পিছনে তাকায় সে। সেই দৃষ্টিতে ছিল অভিমান, ঘৃণা, আর ভেঙে যাওয়া এক পবিত্র ভালোবাসার আর্তনাদ।
ভাঙা কণ্ঠে সে বলে ওঠে—

‘ শোনো নিলয়… আমার পবিত্র ভালোবাসার মর্যাদা তুমি কখনোই বুঝলে না। যে ভালোবাসা তোমার জন্য নিজের সবকিছু ত্যাগ করতে রাজি ছিল, সেই ভালোবাসাকেই তুমি পায়ে ঠেলে দিলে। মনে রেখো, তোমার এই পাপিষ্ঠ জীবনে আর কখনো সত্যিকারের ভালোবাসা জুটবে না।
আমার মতোই হেরা তোমাকে বারবার ফিরিয়ে দেবে… বারবার অপমান করবে। মিলিয়ে নিও আমার কথা। ওই মেয়েটার জন্যই একদিন তোমার ধ্বংস হবে। তুমি শেষ হয়ে যাবে নিলয়… পুরোপুরি শেষ হয়ে যাবে।
কথাগুলো বলেই ন্যান্সি আর দাঁড়ায় না। দ্রুত পায়ে বেরিয়ে যায় ক্লাব থেকে। তার চলে যাওয়ার শব্দটুকুও যেন ক্লাবের বাতাসকে ভারী করে তোলে।
ন্যান্সির শেষ কথাগুলো নিলয়ের কানে বারবার বাজতে থাকে। মুহূর্তের মধ্যেই তার চোখ রক্তবর্ণ হয়ে ওঠে। প্রচণ্ড রাগে সামনে থাকা গ্লাসটা ছুড়ে ফেলে দেয় মেঝেতে।
ঝনঝন শব্দে কাঁচ ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে। নিলয় উন্মাদের মতো চিৎকার করে ওঠে। তার নিঃশ্বাস ভারী হয়ে যাচ্ছে, চোখে-মুখে এক অদ্ভুত অস্থিরতা।
সিয়াম দ্রুত এগিয়ে এসে তাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে।

‘ দোস্ত, শান্ত হ। এভাবে মাথা গরম করলে কিছু হবে না। আগে ঠান্ডা মাথায় ভাব, কোথায় থাকবি, কী করবি, সব প্ল্যান করতে হবে। রাগ দিয়ে কিছু ঠিক হয় না।
কিন্তু নিলয় যেন কিছুই শুনছে না। তার ভেতরের মানুষটা আজ সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে। সে দুহাতে নিজের চুল খামচে ধরে অসহায় কণ্ঠে বলে ওঠে—
” দোস্ত… আমি শুধু হেরাকে চাই। আমি আর কিছু চাই না। এই জীবন, এই নেশা, এই অন্ধকার… সব ছেড়ে দেব আমি। বিশ্বাস কর, আমি ভালো হয়ে যাব। আমি সত্যিই ভালো হয়ে যাব দোস্ত।
কিন্তু হেরা… হেরা যদি আমার না হয়, তাহলে আমার পৃথিবীতে আর কিছুই থাকবে না। সব শেষ হয়ে যাবে। আমি বাঁচতে পারব না…
তার কণ্ঠটা ধীরে ধীরে ভেঙে যায়।
সিয়াম কিছুক্ষণ চুপ থেকে নিলয়ের দিকে তাকিয়ে থাকে। তারপর নিচু স্বরে প্রশ্ন করে—

” তুই এই মেয়েটাকে এত ভালোবাসিস কেন বলতো? পৃথিবীতে সুন্দর মেয়ের অভাব আছে নাকি? আর তোর জন্য কতো সুন্দরী মেয়েরা পাগল জানিস তুই?
নিলয় ফাঁকা চোখে সামনে তাকিয়ে থাকে। যেন নিজের ভেতরের অনুভূতিগুলো ভাষায় সাজানোর চেষ্টা করছে। তারপর খুব ধীরে ধীরে বলে—
‘ আমি জানি না দোস্ত… সত্যি জানি না কেন ওকে এত ভালোবাসি।
হেরার ওই পবিত্র মুখটা… ওই নিষ্পাপ চোখ… ওই সরলতা… আমাকে কোথাও গিয়ে আটকে দিয়েছে।
ওর দিকে তাকালে মনে হয় পৃথিবীটা শান্ত হয়ে যায়।
ওর সাথে কথা বললে আমার কানে যেন শান্তির সুর বাজে… বুকের ভেতরটা ঠান্ডা হয়ে যায়।
দিনের হাজার অশান্তির মাঝেও ওর একটা হাসি আমার মন জুড়িয়ে দেয়।
হেরাকে দেখলে মনে হয় আমার সব তৃষ্ণা মিটে যায়।

ওর সাথে কয়েক কদম হাঁটলেও পুরো দিনটা ভালো কেটে যায় আমার।
আমি জানি না এটাকে কি বলে দোস্ত… কিন্তু ওকে ছাড়া আমি নিজেকে কল্পনা করতে পারি না।
নিলয়ের চোখে তখন নেশা নেই, রাগ নেই—শুধু এক গভীর ভালোবাসার ছায়া।
ভালোবাসা আসলে অদ্ভুত এক অনুভূতি।
এটা রূপ দেখে হয় না, হিসাব করে হয় না।
কাউকে বারবার দেখার ইচ্ছে, তার কণ্ঠ শুনলে বুকের ভেতর শান্তি নেমে আসা, তার উপস্থিতিতে নিজের ভাঙা মনটাও ধীরে ধীরে ভালো হয়ে যাওয়া—এসবের নামই হয়তো ভালোবাসা।
আর সেই ভালোবাসাই আজ নিলয় নামের ছেলেটাকে ধীরে ধীরে ধ্বংসও করছে, আবার বদলে দিতেও শিখাচ্ছে। নিলয় ক্লাবের মাঝে নেশা অবস্থায় গানের মঞ্চে গিয়ে গান ধরে ! চোখ বন্ধ করে গাইতে থাকে ভাঙা গলায়!

জিসে জিন্দেগী তুন্ত বারি হ্যায়,
ক্যা ইয়ে ওহ মাকাম মেরা হ্যায়
ইয়াহা চেন সে বাস রুক যায়ু
কিছু দিল হয়ে মুঝে কেহতা হ্যায়
জজবাত নায়ে সে মিলে হ্যায়,
জানে ক্যা আসার হোয়ে হুয়া হ্যায়
ইক আস মিলি ফির মুঝকো,
জো কুবল কিসিনে কিয়া হ্যায়
কিসি সাহার কি গাজল,
জো দে রহে কো সুকুন কে পাল
কোই মুঝকো ইউঁ মিলা হ্যায়,
জ্যায়সে বাঞ্জারে কো ঘর
নয়ে মৌসাম কি সাহার,
ইয়া সার্দ মে দোপহর
কোই মুঝকো ইউঁ মিলা হ্যায়,
জ্যায়সে বাঞ্জারে কো ঘর ।

সিয়াম অবাক দৃষ্টিতে একজন পাপিষ্ঠ প্রেমিক এর পাগলামি দেখে যাচ্ছে।
হয়তো সত্যিকারের ভালোবাসা এমনই হয়—একবার যদি কারও হৃদয় কোনো নির্দিষ্ট মানুষের কাছে আটকে যায়, তাহলে পৃথিবীর আর কাউকে ভালো লাগে না। চারপাশে হাজার মানুষ থাকুক, নতুন নতুন মুখ আসুক, তবুও মনটা শুধু সেই একজনের কাছেই ফিরে যেতে চায়। নয়তো নিজের চোখের সামনে প্রিয় মানুষটাকে অন্য কারও সাথে ঘনিষ্ঠ হতে দেখেও কেন একজন মানুষ তাকে ভালোবেসে যায়? কেন ভুলতে পারে না? সেই প্রশ্নের উত্তর আজও সিয়ামের জানা নেই।

ন্যান্সিকে সে ভীষণ ভালোবাসে। এতটাই ভালোবাসে যে মেয়েটার সামান্য হাসিও তার বুকের ভিতর আলো জ্বেলে দেয়। অথচ সেই ন্যান্সিই আজ নিলয়ের জন্য পাগলামি করে। সবার সামনে নিলয়ের নাম নিয়ে কাঁদে, ছুটে যায়, ব্যাকুল হয়ে ওঠে। এই দৃশ্যগুলো প্রতিদিন সিয়ামের বুকের ভেতর অদৃশ্য ছুরির মতো বিঁধে থাকে। ধীরে ধীরে তাকে ভিতর থেকে শেষ করে দেয়।
কিন্তু তবুও সে ন্যান্সিকে ঘৃণা করতে পারে না।
কারণ ভালোবাসা কখনো যুক্তি মানে না। কে কাকে ভালোবাসে, এসব দেখে না । ভালোবাসা মানুষকে অদ্ভুত রকমের অসহায় বানিয়ে দেয় যখন দেখে, এতো ভালোবাসার পরো প্রিয় মানুষটা বুঝে না তার ভালোবাসার আর্তনাদ।
সিয়ামের খুব কাঁদতে ইচ্ছে করে। বুক ফেটে চিৎকার করে বলতে ইচ্ছে করে—

“ আমিও তো তোমাকে ভালোবাসি ন্যান্সি… আমিও তো তোমার জন্য রাত জেগে থাকি…” আশা নিয়ে বসে আছি দিনের পর দিন।
কিন্তু ছেলেদের কান্না যেন সমাজ দেখতে পছন্দ করে না। তাই সিয়ামও কাঁদে না। অন্তত প্রকাশ্যে না। সে শুধু নীরবে কষ্ট পায়। গভীর রাতে একা ছাদের কোণে বসে সিগারেটের ধোঁয়ার সাথে নিজের যন্ত্রণা উড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। অথচ ভেতরে ভেতরে সে প্রতিদিন একটু একটু করে ভেঙে যাচ্ছে।
সবচেয়ে বড় কষ্ট কী জানো?
সে নিজের প্রিয় মানুষটাকে নিজের বন্ধুর জন্য হারিয়ে ফেলছে, তবুও কিছু বলতে পারছে না।
কারণ নিলয় শুধু তার বন্ধু না—নিলয় তার জীবনের সবচেয়ে বড় ঋণ।
মানুষটা খারাপ, খুব খারাপ। অবৈধ কাজের সাথে জড়িত। শহরের অন্ধকার জগতের পরিচিত এক নাম। সবাই তাকে ভয় পায়, ঘৃণা করে, পাপিষ্ঠ বলে। কিন্তু সেই পাপিষ্ঠ ছেলেটাই একদিন মৃত্যুর দোরগোড়া থেকে সিয়ামকে ফিরিয়ে এনেছিল।

যখন পুরো পৃথিবী মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল, তখন নিলয় হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল।
আত্মীয়-স্বজন সবাই দূরে সরে গিয়েছিল। ক্যান্সারে আক্রান্ত বাবা-মায়ের চিকিৎসার খরচ জোগাতে জোগাতে সিয়াম তখন প্রায় শেষ হয়ে যাচ্ছিল। ভালো পরিবারের ছেলে হয়েও সৎ পথে টিকে থাকতে পারেনি সে। অনেক চেষ্টা করেছিল। ছোটখাটো চাকরি করেছে, মানুষের দরজায় দরজায় ঘুরেছে। কিন্তু এই সমাজ দরিদ্র আর অসহায় মানুষের সততাকে মূল্য দেয় না।
অভাব মানুষকে বদলে দেয়।
নিয়তি তাকে ধীরে ধীরে ঠেলে দিয়েছিল অন্ধকার পথে।
আর ঠিক তখনই নিলয় তার পাশে দাঁড়িয়েছিল। হয়তো নিজের স্বার্থে, হয়তো বন্ধুত্বের টানে—কিন্তু দাঁড়িয়েছিল। মাথায় ভরসার হাত রেখেছিল। যে কাজ কেউ করেনি, সেটা নিলয় করেছিল। বাবা-মায়ের চিকিৎসার খরচ থেকে শুরু করে সিয়ামের বেঁচে থাকার শেষ আশাটুকুও সেই মানুষটাই ফিরিয়ে দিয়েছিল।
তাই নিলয় পাপিষ্ঠ জেনেও সিয়াম তাকে ছেড়ে যেতে পারে না।
ভালো মানুষ তার জীবনে অনেক ছিল, কিন্তু বিপদের দিনে কেউ পাশে দাঁড়ায়নি। কেউ বলেনি, “ভয় পাস না, আমি আছি।” শুধু নিলয় বলেছিল। কিছু হবে না আমার সাথে থাক!
তাই আজও, যে কোনো পরিস্থিতিতে সিয়াম নিলয়ের পাশে ঢাল হয়ে দাঁড়ায়। মানুষটা যত অপরাধই করুক, যত অন্ধকারেই ডুবে থাকুক, সিয়ামের কাছে নিলয় শুধু একজন অপরাধী না—সে এমন একজন, যার কারণে আজও সে বেঁচে আছে।

আর এই ঋণ কোনোদিন শোধ করা যাবে না।
তবুও মাঝে মাঝে গভীর রাতে সিয়ামের বুকটা হাহাকার করে ওঠে। কারণ মানুষটা তার জন্য নিজের জীবন পর্যন্ত দিতে পারে, তাই তো নেন্সির সাথে রিলেশন করার পরো কিছু বলতে পারে নি, চুপ চাপ মেনে নিয়েছিলো।
সে শুধু দূর থেকে দেখে গিয়েছে নিঃশব্দে অসহায়ের মতো।
গান শেষ হতেই হাটু গেরে বসে অসহায় বাচ্চাদের মতো এই প্রথম কেদে উঠে নিলয় আজমীর চৌধুরী। হাতে থাকা গিটার এর তার এমন ভাবে টান দিয়েছে গিটারের তামার তার গুলোর দাড়ালো সুতোগুলো এতোটাই শক্ত যে নিলয়ের হাত কেটে অঝোরে রক্ত পরতে থাকে।সিয়াম আতকে উঠে—
” এ কি করলি দোস্ত অনেক রক্ত ঝরছে চল দ্রুত রক্ত বন্ধ করতে হবে!
নিলয় হেসে জবাব দেয় —
” আমার পাপিষ্ঠ হৃদয়ে পবিত্র ফুলের আগমনে ভালোবাসার রক্ত ঝরছে।
নিলয় রক্তাক্ত হাত বুকের বা পাশে নিয়ে বলে উঠে–
” সামান্য এই রক্ত দেখে এমন করছিস? আর এই বুকে যে রক্তের ঝর্ণা বয়ে যাচ্ছে তা দেখতে পাচ্ছিস না দোস্ত।

রাত প্রায় নয়টা।
শহরের অভিজাত কফিশপের ভিআইপি কর্নারটা পুরো দখল করে বসে আছে নাভান,অধীর,সৃজন,ঝিনুক, জাওয়াদ খান । সামনে কিছু ফাইল, ল্যাপটপ, পোস্টারের ডিজাইন, কয়েক কাপ ঠান্ডা হয়ে যাওয়া কফি—সব মিলিয়ে পরিবেশ টা কাজের বুঝাই যাচ্ছিলো–
কিন্তু কাজের চেয়ে কথা কাটাকাটিই বেশি হচ্ছে।
আর সেই ঝামেলার মূল কারণ—নাভান।
কালো শার্টের হাতা কনুই পর্যন্ত গুটানো।
চোখেমুখে সেই চিরচেনা গম্ভীর ভাব।
কথা কম বলে, কিন্তু যেটুকু বলে সেটা সরাসরি গিয়ে লাগে সবার বুকে!
জাওয়াদ খান ফাইল থেকে চোখ না তুলেই বললেন–
” আমার মেয়ের সাথে কি হয়েছে আজ? তাকে অপমান করার মানে কি?
নাভান ভ্রু কুঁচকে তাকালো বাবার দিকে। চোখেমুখে স্পষ্ট বিরক্তির ছাপ ফুটে উঠতেই জাওয়াদ খান ধীরে কফির কাপে চুমুক দিলেন। তারপর ভারী গলায় বললেন–

“ বিরক্ত হয়ে লাভ নেই, শেহতাজ । আজ বাসায় ফিরে আম্মাজানের মুখে যা শুনেছি, তারপর চুপ করে থাকা আমার পক্ষে সম্ভব না। আমার মেয়ে যা চাইবে, সেটাই হবে। ও ডিভোর্স চাচ্ছে । তাই কি করবে ভাবো।
কিছুক্ষণ থেমে সকালে জাওয়াদ খান হেরার বলা কতাগুলো মনে করে —
“ বাবা, আমি তোমার ছেলের সাথে থাকতে চাই না। তোমার ছেলেকে বলে দাও, সে যেন আমার আশেপাশে না আসে। আমার ব্যাপারে কোনো কথা না বলে । আমি এই সম্পর্ক রাখতে চাই না। যত দ্রুত সম্ভব আমাকে এই সম্পর্ক থেকে মুক্তি দাও।
তিতির তার সাথে খারাপ বিহেভ করেছে আর নাভান তাকে সবার সামনে কথা শুনিয়েছে । নিলয় আবার উল্টো পালটা কথা বলেছে তাই রাগে জিতে এসব বলেছে হেরা বাবাকে। কারন জানে বাবা বলে দিবে অসভ্য গিটার ওয়ালাকে।

কথাগুলো বাতাসে ভেসে উঠতেই টেবিলের চারপাশে নেমে এলো নিস্তব্ধতা।
নাভান কয়েক সেকেন্ড নিশ্চুপ হয়ে বসে রইল। তার চোখের দৃষ্টি ধীরে ধীরে বদলে যেতে লাগল। চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল, মুখের পেশিগুলো টানটান হয়ে গেল। যেন ভেতরে জমে থাকা রাগ আর অপমান একসাথে বিস্ফোরিত হওয়ার অপেক্ষায়।
হঠাৎ টেবিলের উপর রাখা কাঁচের গ্লাসটা শক্ত করে চেপে ধরল সে।
পরমুহূর্তেই — তীক্ষ্ণ শব্দ তুলে গ্লাসটায় ফাটল ধরে গেল।
ঝিনুক চমকে উঠল। অধীর আর সৃজন একে অপরের দিকে তাকালো নিঃশব্দে। আর জাওয়াদ খান স্থির চোখে তাকিয়ে রইলেন নিজের ছেলের দিকে।
ডিবোর্স কথাটা শুনে নাভানের রাগ তখন মাথার উপর উঠে গেছে।
সে ঠান্ডা অথচ বিষাক্ত কণ্ঠে বলল–

“ অভদ্র একটা মেয়ে বানিয়েছো তুমি। একেবারে অবুঝ। কোনো ম্যানার্স জানে না। কার সাথে কীভাবে কথা বলতে হয় সেটাও শেখাওনি। পরিস্থিতি না বুঝে বক বক করতে থাকে। আর মেয়ের সাথে তাল মিলাচ্ছো। কেমন বাবা তুমি? বাবা মেয়ে দুইজন এক ।
জাওয়াদখান কপাল কুঁচকালো।
নাভান থামলো না।
“ সত্যি বলতে কী, তোমার মেয়েকে আমার মা কী দেখে ছোট বেলায় পছন্দ করেছে সেটা একমাত্র উনিই জানে। না নিজে কিছু বুঝে, না কাউকে বুঝতে দেয়। আর মেয়েকে এসব শিক্ষা দিয়েছো তুমি ? তোমার কার্বন কপি বানাচ্ছো?
জাওয়াদ খান এবার ধীরে ধীরে কাপটা নামিয়ে রাখলেন। চোখ সরু করে ছেলের দিকে তাকিয়ে বললেন–
“ আমি আমার মেয়েকে সঠিক শিক্ষা দিয়েছি। চেনা নেই জানা নেই হুট করে তোমায় ভালোবেসে ফেলবে? মেনে নিবে?
নাভান হেসে উঠল ব্যঙ্গ করে।

” বিয়ে হয়েছে কবুল পরেছে এখন মেনে নিবে না? এখন ডিভোর্স দিতে চাচ্ছে কি পরিকল্পনা। আর তুমি কষিয়ে থাপ্পড় মারলে না কেনো? সাহস কতো বড় আমায় ডিভোর্স দেয়ার পরিকল্পনা করা?
জাওয়াদ খান কফির কাপে চুমুক দিয়ে শান্ত গলায় বললেন–
“ ডিভোর্সের কথা বলাতে তোমার মুড এমন হয়েছে যেন রাষ্ট্রপতি পদ হারিয়েছো?
তোমার একটা সমস্যা জানো? তুমি কিছু হলে রেগে যাও!
নাভান মোবাইলের স্ক্রিনে চোখ রেখেই শান্ত গলায় বলল–
“একটা না। অনেক সমস্যা আমার!
অধীর মাথা নিচু করল।
সৃজন ঠোঁট কামড়ে হাসি আটকানোর চেষ্টা করছে।
জাওয়াদ খান এবার তাকালেন ছেলের দিকে।

“ আমার মেয়ের সাথে তুমি যেভাবে কথা বলো, অন্য কেউ হলে এতদিনে কি করতো আল্লাহ মালুম?
নাভান ধীরে ধীরে চোখ তুলল। চোখদুটো শান্ত,
কিন্তু সেই শান্তির মধ্যেই ভয়ংকর ঠান্ডা অ্যাটিটিউড।
“তোমার মেয়ে অন্য কাউকে বিয়ে করেনি।
টেবিলে কয়েক সেকেন্ড সবাই চুপ হয়ে থাকে।
জাওয়াদ খান ভ্রু কুঁচকে বললেন–
“তুমি নিজেকে কী ভাবো?”
নাভান এবার কফির কাপে চুমুক দিল।
“তোমার জামাই।
সৃজন এবার সত্যি সত্যিই কাশি তুলে ফেলল।
অধীর বিড়বিড় করল–
“ আমার গম্ভীর ভাই এর আত্মবিশ্বাস আলাদা লেভেলের…।
জাওয়াদ খান ঠোঁট বাঁকিয়ে বললেন-

“ জামাই হয়েছো বলে মাথায় উঠবা না। মেয়ে মানলে তবেই জামাই এর জায়গা দিবো!
নাভান চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে আছে। মুখে সেই চিরচেনা নির্লিপ্ত ভাব। যেন সামনে বসে থাকা মানুষটা তার জন্মদাতা পিতা নন, পাশের বাসার আন্টির হাজবেন্ড। সে শান্ত গলায় বলল—
” বাবা-মেয়ের ক্যারেক্টার একই রকম। না বুঝে কথা বলো, তারপর ভাব দেখাও খুব ইনোসেন্ট । এসব শিক্ষা পেয়েই বড় হয়েছো তুমি । আর মেয়েকে ও এসব শিক্ষা দিচ্ছো?
জাওয়াদ খান কফির কাপ নামিয়ে ধীরে ধীরে সোজা হয়ে বসলেন। তার নিজের ক্যারেক্টার নিয়ে তারই ছেলে টিপ্পনী কাটছে!

” তোমাকে তোমার মা এসব শিক্ষা দিয়েছে? বাবার সাথে কিভাবে কথা বলতে হয় শিখায়নি?
–নাভান মাথা কাত করল।
” বাবা তো পাশে ছিল না। তাই কোর্সটা করা হয় নি । থাকলে হয়তো “বাবার সাথে ভদ্রভাবে ঝগড়ার সাবজেক্টটা পড়ে ফেলতাম।
জাওয়াদ খান চোখ ছোট করে তাকালেন।
” কি বলতে চাচ্ছো? তোমার আরো বাবা দরকার ছিল?
নাভান গম্ভীর মুখেই বলল—
” হলে মন্দ হতো না। অন্তত একজন ব্যস্ত থাকলে আরেকজন সময় দিত।
সৃজন পাশে বসে কাশি চেপে মরার অবস্থা।
জাওয়াদ খান এবার রেগে গেলেন।
” তুমি যে দিন দিন নির্লজ্জ হচ্ছো সেটা বুঝতে পারছো?
নাভান ঠান্ডা গলায় উত্তর দিল—

কেনো, তোমার সামনে কি আমি তোমার মেয়েকে চুমু খেয়েছি? আর আমি যদি নির্লজ্জ হই, তাহলে তুমি কি? এই age-এ এসে বউয়ের আঁচল ধরে ঘুরো—seriously? তোমাদের রোমান্স দেখে মাঝে মাঝে single মানুষদের rights নিয়ে ভাবতে হয়, সত্যি বলছি।I mean, একটু তো বুঝো—সবাই এইভাবে couple mood-এ থাকে না।
অধীর নিজের মতোই জুসের গ্লাস হাতে নিয়ে চুপচাপ বসে আছে। তার ভেতরের শান্ত ভাবটা বাইরে থেকে দেখে বোঝার উপায় নেই, কিন্তু যারা তাকে চেনে তারা জানে—এটা কোনো সাধারণ নীরবতা না। এটা অভিজ্ঞতার তৈরি এক ধরনের নির্লিপ্ততা।

তার ভাই যে ঠোঁট কাটা, সেটা সে জানে। নেপালের সেই ঘটনাটা এখনও তার মাথায় ঘুরে বেড়ায়—সৃজন আর ঝিনুক কে বলেছিলো কিন্তু তারা যেনো কিছু বিশ্বাস করে নি এমন ভাব ধরেছিলো অধীরের কথায়!
এবার বুঝুক এই গিটার ওয়ালা হিরো উপরে এক আর ভিতরে আরেক । সৃজন আর ঝিনুক একে অপরের দিকে মাঝে মাঝে তাকাচ্ছে, চোখে স্পষ্ট অবিশ্বাস আর কৌতূহল।
ঠিক তখনই নাভানের কথা চলতে থাকে। তার কথার ধরন, তার আত্মবিশ্বাস, আর মাঝে মাঝে নির্লজ্জ রকমের খোলামেলা মন্তব্য—সব মিলিয়ে পরিবেশটা আরও অস্বস্তিকর হয়ে উঠছে। নাভানের মুখ থেকে বের হওয়া কিছু কথা শুনে ঝিনুক একবার হঠাৎ থেমে যায়, আর সৃজন ভ্রু কুঁচকে তার দিকে তাকায়। জাওয়াদ খান গলা খাকারি দিয়ে বলে উঠে নাভানের উদ্দেশ্য–
” তুমি কি বাবা-মায়ের প্রেম দেখার জন্য গোয়েন্দা লাগিয়েছো? আমাদের মধ্যে ঢুকছো কেন?
নাভান দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল

” তুমি তো আমাদের মধ্যেই ঢুকে পড়ো। কাবাবের হাড্ডির মতো। পার্থক্য হলো তুমি বাবা বলে বেঁচে যাও।
জাওয়াদ খান ভ্রু তুললেন।
নাভান এবার বিরক্ত মুখে বলল—
” এই নির্বাচন এক হাতে সামলাচ্ছি। এত কিছু করছি। But তুমি মন্ত্রী হওয়ার পর আমার সাথেই সবার প্রথম মির্জাফরি করবে— এটা ক্লিয়ার আমার কাছে ।
জাওয়াদ খান চুপ করে তাকিয়ে রইলেন।
” তুমি কি আমার মেয়েকে ভালোবাসো?
নাভান কয়েক সেকেন্ড চুপ থাকল, তারপর এমন ভাব করল যেন প্রশ্নটা তার কাছে unnecessary।
” ভালোবাসা জিনিসটা তোমাদের বাপ-মেয়ের সাথে যায় না। আর honestly তোমার মেয়ের প্রতি আমার কোনো curiosity-ও নাই। মাথাব্যথা ছাড়া আর কিছু দেয় না।
জাওয়াদ খান ধীরে বললেন—

” তাহলে আমার মেয়ে থাকুক বা না থাকুক, তাতে তোমার কী আসে যায়?
নাভান এবার সোজা হয়ে বসল।
” আমার সাথে নাম জড়িয়েছে মানেই সে আমার অধিকার? এই logicটা তুমি আর তোমার মেয়ে দুইজনেই মাথা সেভ করে রাখবে।
সে একটু থেমে বলল—

প্রেমের বাজিমাত পর্ব ৪২

” এখন একটু busy আছি, তাই না হলে তোমার মেয়ে যেই মুখ দিয়ে divorce শব্দটা উচ্চারণ করেছে, সেই জবান বন্ধ করে দিতাম। মেয়েকে শিক্ষা দাও ভালো মতো। তা না হলে দেখবে এই শেহতাজ খান নাভান কতোটা রুড!

প্রেমের বাজিমাত পর্ব ৪৪