Home ফিরে এসো অনুরাগে ফিরে এসো অনুরাগে শেষ পর্ব

ফিরে এসো অনুরাগে শেষ পর্ব

ফিরে এসো অনুরাগে শেষ পর্ব
নওরিন কবির তিশা

মহাকালের অবিনশ্বর রথচক্রে পিষ্ট হয়ে সময়ের স্রোতে নিমেষেই অতলান্ত গর্ভে তলিয়ে গেছে একেকটি দিন।নিয়তির অলক্ষ্য আবর্তনে বিদায় নিয়েছে প্রহর, আর দিনপঞ্জিকার জীর্ণ পাতা থেকে এক এক করে খসে পড়েছে দীর্ঘ আট-আটটি মাস।তৃষা এখন আট মাসের অন্তঃসত্ত্বা;ওর দেহগড়নে মাতৃত্বের চিরন্তন রূপটি আজ স্পষ্ট; উদরটি বেশ স্ফীত, পা দুটোতে এসেছে মৃদু ফোলা ভাব।
অলস অপরাহ্নের নরম আলোয় দোতলার ঝুলবারান্দায় আরামকেদারা পেতে বসে বাইরের দূর সীমানার দিকে চেয়ে আছে তৃষা। পাশে রাখা ফোনটায় লুপে চলছে মেসেঞ্জারে আসা আর্যর সেই চেনা, গভীর কণ্ঠের ভয়েস মেসেজ। দিনকয়েক আগে তৃষা যখন আদুরে গলায় শুধিয়েছিল ও আর্যর ঠিক কী হয়, তখন আর্য জবাবে গেয়ে শুনিয়েছিল এই গানটি,,

“Tu hi hai aashiqui,
Tu hi aawargi,
Tu hi hai Zindagi,
Tu hi Juda…”
প্রতিদিন এই একাকী অলস সময়গুলোয় আর্যর এই কণ্ঠটুকুই তৃষার বেঁচে থাকার পরম রসদ হয়ে ওঠে। ও আনমনে পেটে হাত বুলিয়ে এক অদ্ভুত সুখের আবেশে চোখ দুটো বুজলো।
আকস্মিক ছেদ পড়ল নির্জনতায়। প্রতিদিনের চিরচেনা নিয়মে ফলের থালা হাতে চঞ্চল পদক্ষেপে, “মা! ও মা!” করতে করতে কক্ষে প্রবেশ করল টুইংকেল। এই দীর্ঘ আট মাসের ব্যবধানে ও যেন বেশ খানিকটা বড় হয়ে উঠেছে। চপলতাটুকু আগের মতো থাকলেও ওর স্বভাবের মাঝে এখন এক অদ্ভুত পরিপক্বতা।
সবচেয়ে বড় কথা, তৃষার প্রতি ওর যত্নের বহর এখন দেখার মতো। তৃষার ভেতরে যে আরেকটি ছোট্ট নতুন প্রাণ বড় হচ্ছে, নিজের একটা ভাই বা বোন আসবে–এই অনাবিল খুশিতে ও সারাক্ষণ ডানা কাটা পরীর মতো তৃষার চারপাশে ঘুরঘুর করে। কখন তৃষার কোনটা লাগবে, কখন ফল খেতে হবে, একেবারে অভিজ্ঞদের মতো সবকিছুর তদারকি করে ও।
টুইংকেল ফলের থালাটা পাশে রেখে কোমরে হাত দিয়ে বেশ শাসন করার ভঙ্গিতে বলল,,
— মা! আবার তুমি বারান্দায় এসে বসে আছ? বাতাস লাগছে তো! আর এই যে অ্যাপেল কাটিংটা রেখে গিয়েছিলাম, একটা পিসও মুখে তোলোনি কেন, হুম? দিস ইজ নট ফেয়ার!
তৃষা চোখ মেলে টুইংকেলের পুঁচকে অভিভাবকত্ব দেখে হেসে ফেলল। ও টুইংকেলের তুলতুলে গালটা আলতো করে টেনে দিয়ে বলল,,

— আরে বাবা, এই তো জাস্ট একটু ফ্রেশ এয়ার নিতে এলাম। আর তোমার এই আপেলগুলো না একদম মিষ্টি না, কেমন যেন পানসে!
টুইংকেল ওমনি চোখ কপালে তুলে বড়দের মতো মাথা নাড়ল,,
— ওহ গড মা! ডোন্ট মেক এক্সকিউজেস। ডক্টর আঙ্কেল কী বলেছে মনে নেই? নাও, হাঁ করো তো!
ও নিজের ছোট্ট হাত দিয়ে একটা আপেলের টুকরো তৃষার মুখের সামনে ধরল। তৃষা আর না করতে পারল না, বাধ্য মেয়ের মতো কামড় দিয়ে বলল:
— উমম, আচ্ছা বাবা খাচ্ছি। কিন্তু তুমি এত কেয়ার করতে কোত্থেকে শিখলে বলো তো, মাই লিটল প্রিন্সেস?
টুইংকেল গর্বে বুক ফুলিয়ে চটপট জবাব দিল,,
— আই অ্যাম গোয়িং টু বি আ বিগ সিস্টার, মা! সো রেসপন্সিবিলিটি তো আমারই, তাই না?
মেয়ের মুখে দায়িত্বের কথা শুনে তৃষার মনের ভেতরটা আবার এক অজানা ভালোবাসায় ভরে উঠল। ও টুইংকেলকে টেনে নিজের বুকের কাছে জড়িয়ে ওর ছোট্ট ললাটে চুমু এঁকে বলল,,
— হুম, প্রিন্সেস তোমার-ই। কিন্তু এই দায়িত্বের চক্করে মা যে তার প্রিন্সেসটাকে কাছে পাচ্ছে না তাকে খেয়াল করেছো?

হামিদা বেগমরা বিশেষ একটি পারিবারিক প্রয়োজনে দিনকয়েক হলো গ্রামে গিয়েছেন। কোলাহলমুখর এই তিলোত্তমা শহরে এখন কেবল আদ্রিয়ান আর মেহসানা। তবে আজকের সকালটা যেন কোনো এক অলক্ষ্য নিয়মে ভীষণ এলোমেলো কাটছিল। সকালের রান্নাবান্না সারতে মেহসানার বেশ খানিকটা দেরি হয়ে যাওয়ায় আদ্রিয়ান সকালের আহারটুকু না করেই তাড়াহুড়ো করে হসপিটালের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে গিয়েছিল। এমনকি দুপুরের খাবারটাও ও সঙ্গে নিয়ে যাওয়ার অবকাশ পায়নি।
তাই মেহসানা ভার্সিটির ক্লাস শেষ করেই একছুটে বাসায় এসেছিল। আদ্রিয়ানকে কয়েকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করলেও ওপাশ থেকে কোনো সাড়া মেলেনি—ফোনটা অবিরাম বেজেই যাচ্ছিল। তীব্র আকুলতা আর একরাশ সূক্ষ্ম অভিমান বুকে চেপে মেহসানা নিজেই হসপিটালের উদ্দেশ্যে রওনা হলো। ওর সুপ্ত ইচ্ছে ছিল আদ্রিয়ানকে একপ্রকার জোর করেই হসপিটাল থেকে বাসায় ফিরিয়ে আনবে, তারপর দুজনে মিলে একসাথে নিভৃতে লাঞ্চটা সারবে।
হসপিটালের দীর্ঘ করিডোর পেরিয়ে আদ্রিয়ানের কেবিনের দোরগোড়ায় এসে পৌঁছাতেই মেহসানার চঞ্চল পায়ের গতি থমকে গেল ‌আচমকা। দরজার স্বচ্ছ কাঁচের অন্তরাল দিয়ে ভেতরের দৃশ্যপটে চোখ পড়তেই ওর ভেতরের সমস্ত শান্ত ভাব নিমেষেই কর্পূরের মতো উড়ে গেল।

কেবিনের অভ্যন্তরে আদ্রিয়ানের ঠিক মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে এক নব্য লেডি ইন্টার্ন। মেয়েটি কেবল আদ্রিয়ানের সাথে পেশাগত কথাই বলছে না, বরং বেশ আঠার মতো লেপ্টে থাকার ভঙ্গিতে সুযোগ বুঝে ওর গায়ের ওপর ঢলে পড়ার চেষ্টা করছে। কথার ছলে তার চপল হাসির ছটা আর আদ্রিয়ানের সাথে এমন গা ঘেঁষাঘেঁষির দৃশ্য দেখে মেহসানার মাথার প্রতিটি রগ চট করে অগ্নিশর্মা হয়ে উঠল। বুকের গহীনে এক তীব্র ঈর্ষার দাবানল জ্বলে উঠল ওর।
ও আর এক মুহূর্তও আর সেখানে স্থির দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না। উল্টো পায়ে করিডোর ধরে হনহন করে বেরিয়ে আসতে চাইল। ওর হরিণচোখ দুটো তখন চরম ক্ষোভ আর অভিমানে টলমল করছে।
ঠিক তখনই কেবিনের পাল্লা খোলার শব্দ হলো। মেহসানাকে তপ্ত পায়ে চলে যেতে দেখে আদ্রিয়ান ঝড়ের বেগে পরিস্থিতি আঁচ করতে পারল। ও দ্রুত ওই ইন্টার্ন মেয়েটিকে ওখানেই থামিয়ে দিয়ে, নিজের সমস্ত গাম্ভীর্য বিসর্জন দিয়ে মেহসানার পিছে পিছে ছুটে এলো। করিডোরের মাঝখানের উন্মুক্ত জায়গায় মেহসানার নরম হাতটা খপ করে চেপে ধরে ও একপ্রকার সজোরে টেনে নিজের দিকে ঘোরাল; কিছুটা হাঁপাতে হাঁপাতে ব্যাকুল কণ্ঠে বলল,,
— মেহু! লিসেন টু মি! তুমি যেরকম ভাবছ ব্যাপারটা মোটেও সেরকম নয়। শ্যি ওয়াজ জাস্ট আস্কিং অ্যাবাউট আ পেশেন্ট কেস। প্লিজ, এভাবে রিঅ্যাক্ট করো না!
মেহসানা এক ঝটকায় নিজের হাতটা ছাড়িয়ে নেওয়ার বিফল চেষ্টা করে তীব্র ক্ষোভ মেশানো গলায় বলল,,

— ওহ রিয়ালি, ডেক্টর আদ্রিয়ান? পেশেন্ট কেস নিয়ে ডিসকাশন বুঝি ওভাবে গায়ের ওপর গাইড ঢলে পড়ে করতে হয়? দিস ইজ সো ডিসগাস্টিং! আপনার ফোন রিসিভ করার মতো সময় হয় না, লাঞ্চ করার সময় হয় না, অথচ কেবিনে বসে এমন ফ্লার্ট করার ব্যাকুলতা ঠিকই থাকে, তাই না?
— দেখো, তুমি যেমনটা ভাবছো তেমনটাই একদমই নয়।
মেহেসানা পুনরায় ঝটকায় নিজেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করল,,
— আমি কি ভাবছি না ভাবছি,সেটা নিয়ে আপনার ভাবার প্রয়োজন নেই মিস্টার। আমারই ভুল হয়েছিল আপনার প্রতি অতিরিক্ত দরদ দেখি হাত পুড়িয়ে রান্না করা।
আদ্রিয়ান এবার মেহসানার দুই কাঁধ শক্ত করে আঁকড়ে ধরে ওর চোখের কৃষ্ণগহীনে তাকাল। ওর কণ্ঠে একাধারে অনুনয় আর গভীর ভালোবাসা মিশ্রিত ধমক,,

— মেহু, জাস্ট স্টপ ইট! লুক অ্যাট মাই আইজ। তুমি খুব ভালো করেই জানো আমার এই লাইফে তুমি ছাড়া অন্য কোনো মেয়ের কোনো এক্সিস্টেন্স নেই। আই অ্যাম সো সরি যে আমি ফোনটা খেয়াল করতে পারিনি, ওটা সাইলেন্ট ছিল। বাট প্লিজ, ডোন্ট মিসআন্ডারস্ট্যান্ড মি!
আদ্রিয়ানের বলিষ্ঠ শক্ত বন্ধন হতে নিজেকে মুক্ত করার প্রয়াসে ছটফট করতে লাগলো। ডাগর নেত্র কার্নিশ বেয়ে টুপটাপ গড়িয়ে পড়ল দু ফোঁটা অশ্রুকণা। সন্তর্পণে সেটি লুকিয়ে ভেজা কন্ঠে ও বলল,,
— হাত ছাড়ুন! জাস্ট লিভ মি অ্যালোন! কোনো অধিকার নেই আপনার আমার ওপর এভাবে জোর খাটানোর।
আদ্রিয়ান বাঁধন আরও কিছুটা শক্ত করে থমথমে গলায় বলল,,
— অধিকার নেই মানে? মেহু, আই অ্যাম ইয়োর হাজব্যান্ড!
— হাজব্যান্ড? ওহ রিয়ালি?
মেহসানা একটা তিক্ত, তাচ্ছিল্যের হাসি হাসল। সেই হাসিতে কোনো আনন্দ ছিল না, ছিল কেবল বুকফাটা আর্তনাদ। ও আদ্রিয়ানের চোখের দিকে সোজা তাকিয়ে কাঁপানো গলায় বলল,,

— নামের পাশে একটা কাগজের সিলমোহর বসিয়ে দিলেই বুঝি হাজব্যান্ড হওয়া যায়, মিস্টার আদ্রিয়ান? আজ আমাদের বিয়ের দীর্ঘ কয়েকটা মাস পার হয়ে গেছে। অথচ আমাদের রিলেশনশিপটা কেমন, আপনি জানেন না? ইটস নট ইভেন নরমাল! আজও আমরা দুজন দুটো আলাদা মেরুর বাসিন্দা হয়ে আছি। যেখানে কোনো স্বাভাবিকতাই নেই, সেখানে আপনি কোন অধিকারের কথা বলছেন?
মেহসানার অবাধ্য চোখের জল ওর শার্টের ওপর টুপটুপ করে খসে পড়ছে। আদ্রিয়ান স্তব্ধ হতেই মেহেসানা এই সুযোগে এক ঝটকায় ওর শিথিল হয়ে আসা হাত দুটো সরিয়ে দিল। চোখের জলটা হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে মুছে অত্যন্ত শীতল, কিন্তু ভাঙা গলায় বলল,,
— একটা নরমাল সম্পর্কে যেটুকু ভরসা আর টান থাকে, আমাদের মাঝে তার কিছুই গড়ে ওঠেনি। তার ওপর প্রতিনিয়ত এমন একেকটা দৃশ্য… আই জাস্ট কান্ট টেক দিস অ্যানিমোর, আদ্রিয়ান। দিস ইজ টু মাচ ফর মি!
আর একটা মুহূর্তও আদ্রিয়ানের উত্তরের অপেক্ষায় মেহসানা সেখানে দাঁড়িয়ে রইল না। করিডোরের ভিড় ঠেলে ও প্রায় দৌড়ে হসপিটালের প্রধান ফটকের দিকে এগোতে লাগল। তবে আদ্রিয়ানও দামবার পাত্র নয়। ওর তো কোন দোষ নেই। যত দূরত্ব সব তো মেহেসানার কারণেই। মেহেসানাই তো এতদিনে সম্পর্কটাকে নরমাল করতে দেয়নি তাহলে আজ কেন ওকে দোষারোপ করলো?

বাসায় ফিরেই দরজায় ছিটকিনি লাগিয়েছে মেহেসানা। পিছু পিছু এসেছে আদ্রিয়ানও। তবে সেদিকে কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই মেহেসানার।আদ্রিয়ানের ধৈর্যেরা এবার বাঁধ ভাঙলো গেল। ও দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে অবিরাম করাঘাত করতে লাগল,,
— মেহু! ওপেন দ্য ডোর! উই নিড টু টক!
মেহসানার কোনো সাড়াশব্দ নেই। আদ্রিয়ানের মেজাজ এবার সপ্তমে চড়ল। ও একপ্রকার চিৎকার করে বলল,,
— মেহু, জাস্ট ওয়ান লাস্ট ওয়ার্নিং! তুমি যদি নেক্সট থার্টি সেকেন্ডস-এর মধ্যে দরজা না খোলো, আমি কিন্তু সত্যি দরজা ভেঙে ফেলব! আই অ্যাম সিরিয়াস!
তবুও ভেতরটা নিথর, নিস্তব্ধ। আদ্রিয়ান আর কালক্ষেপণ করল না। নিজের শরীরের পুরো শক্তি দিয়ে দরজায় সজোরে ধাক্কা দিতেই পুরোনো ছিটকিনিটা মড়মড় করে ভেঙে গেল। হুড়মুড় করে ঘরে ঢুকেই আদ্রিয়ান থমকে দাঁড়াল।
দৃষ্টিগোচর হলো,মেহসানা বিছানায় পিঠ ঠেকিয়ে ফ্লোরে বসে আছে। দুই হাঁটুর মাঝে মুখ গুঁজে ও ফুঁপিয়ে কাঁদছে। ওর কাঁধদুটো কান্নার বেগে থরথরিয়ে কাঁপছে। আদ্রিয়ানের ভেতরের সমস্ত রাগ এক নিমেষে কর্পূরের মতো উড়ে গিয়ে একরাশ মায়া আর হাহাকার এসে জমা হলো সেথায়। ও ধীর পায়ে এগিয়ে গিয়ে হাঁটু গেড়ে বসল ‌মেহসানার সম্মুখে।
অত্যন্ত সন্তর্পণে মেহসানার মুখটা নিজের মুঠোয় পুরে ওপরে তোলার চেষ্টা করল। মেহসানা বাধা দিলেও আদ্রিয়ান এবার নাছোড়বান্দা। ওর লাল হয়ে যাওয়া চোখ আর অশ্রুকণায় সিক্ত মুখশ্রী দেখে আদ্রিয়ানের বুকটা হু হু করে উঠল।

— কী হয়েছে এমন করছো কেন? মেহু, জাস্ট লুক অ্যাট মি! ওই মেয়েটার সাথে আমার বিন্দুমাত্র কোনো রিলেশন নেই। ট্রাস্ট ম্যি!
মেহসানা ঝটকায় নিজের মুখটা সরিয়ে নিল। ধরা গলায় অভিমান উগরে দিয়ে বলল,,
— রিলেশন থাকুক বা না থাকুক, তাতে আমার কী? আমি জাস্ট আপনার এই ‘হাজব্যান্ড’ ট্যাগটা নিয়ে টায়ার্ড। আপনি আমাকে প্রমিস করেছিলেন সবকিছু নরমাল করবেন, বাট আপনি তো নিজের প্রফেশন আর ওই মেয়েদের অ্যাটেনশন নিয়েই বিজি!
আদ্রিয়ান এবার মেহসানার খুব কাছে সরে এল। ওর কপালে নিজের কপাল ঠেকিয়ে গাঢ় স্বরে বলল,,
— আই অ্যাম বিজি? মেহু, আমি বিজি থাকি কারণ আমি চাই না সবসময় তোমাকে দেখতে। কজ তোমাকে দেখলেই আমার ভিতরটা উলটপালট হয়ে যায়। সামলাতে পারি না নিজেকে। আর ওই মেয়েদের কথা বলছো? দিস ইজ সো চাইল্ডিশ! তুমি কি জানো না আদ্রিয়ানের হার্টবিট কার জন্য চলে?
মেহসানা ভেজা চোখে আদ্রিয়ানের দিকে তাকাল। আদ্রিয়ান ওর চোখের এক ফোঁটা জল ঠোঁট দিয়ে মুছে নিয়ে ফিসফিস করে বলল,,

— এই কয় মাসের দূরত্বটা কি কেবল আমার একার ছিল মেহু? তুমিও তো আমাকে কাছে আসার সুযোগ দাওনি। দিস সাইলেন্স ইজ কিলিং মি টু! এবার কি এই দেওয়ালটা ভাঙা যায় না? জাস্ট ফর ওয়ান্স, ট্রাস্ট মি উইথ অল ইয়োর হার্ট।
মেহসানার ভেতরের জমাটবদ্ধ অভিমানের পাহাড়টা আদ্রিয়ানের ওই তপ্ত নিঃশ্বাস আর আকুলতার ছোঁয়ায় যেন মুহূর্তেই গলে জল হয়ে গেল। ও আর নিজেকে সামলাতে পারল না; কান্নার তোড়ে আদ্রিয়ানের শার্টের কলারটা খামচে ধরে ওর প্রশস্ত বুকে মুখ লুকাল। ওর অবাধ্য অশ্রুকণায় আদ্রিয়ানের শার্টের বুকটা ভিজে একাকার, কিন্তু আদ্রিয়ান আজ সরালো না ওকে। বরং পরম আবেশে দুহাতে মেহসানাকে আগলে নিল নিজের বুকের মাঝে।
মেহসানার কান্নার বেগ একটু কমলে আদ্রিয়ান ওর কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল,,
— জাস্ট লুক অ্যাট আস মেহু! কত সময় নষ্ট করেছি আমরা এই ইগো আর সাইলেন্সের পেছনে। আমার তো মনে হচ্ছে আজ থেকেই আমাদের নতুন করে পথ চলা শুরু। দিস ইজ আওয়ার রিয়েল স্টার্ট, মাই লাভ!
মেহসানা আদ্রিয়ানের বুক থেকে মুখ তুলে ভেজা চোখে ওর দিকে তাকাল। আদ্রিয়ানের চোখের সেই গভীর তৃষ্ণা আর ভালোবাসা দেখে ও লজ্জা পেয়ে আবার চোখ নিচু করে নিল। আদ্রিয়ান এক হাত দিয়ে মেহসানার চিবুক উঁচিয়ে; ঠোঁটের কোণে তখন এক দুষ্টুমিভরা হাসির রেখা ফুটিয়ে গভীর দৃষ্টিতে মেহসানার ঠোঁটের দিকে তাকিয়ে মৃদু স্বরে বলল,,

— মেহু, আই থিঙ্ক আই ডিজার্ভ আ লিটল কম্পেনসেশন। এই যে এত ছোটাছুটি করালে আমাকে, তার জন্য কি কোনো গিফট পাবো না?
আদ্রিয়ানের কণ্ঠের সেই নেশাক্ত সুরে মেহসানা শিউরে উঠল। ও আদ্রিয়ানের কথার গূঢ় অর্থ বুঝতে পেরে লজ্জায় লাল হয়ে আড়ষ্ট কন্ঠে বলল,,
— আ… আদ্রিয়ান! কী বলছেন এসব? এখন তো মাত্র সন্ধ্যা!
আদ্রিয়ান এবার হালকা শব্দ করে হেসে উঠল। মেহসানার কোমর জড়িয়ে ধরে ওকে আরও নিবিড়ভাবে নিজের সাথে মিশিয়ে নিয়ে নেশাতুর কণ্ঠে ফিসফিস করল,,
— সো হোয়াট? যখন মিয়া-বিবি রাজি, তখন সন্ধ্যা আর রাত কী? লাভারদের জন্য দিন-ক্ষণের কোনো ক্যালেন্ডার নেই মিসেস আদ্রিয়ান! আমার আট মাসের খরা কাটানোর জন্য এই মুহূর্তটাই পারফেক্ট। নাকি তুমি রাজি নও?
শেষ কথাটা বন্ধন খানিক শিথিল করে সন্ধিহান কণ্ঠে শুধালো আদ্রিয়ান। মেহেসানা তৎক্ষণাৎ না বোধক মাথা নাড়িয়ে বলল,
— না, না!

পরক্ষণেই জিভ কাটল ও! ছিঃ কত বড় হ্যাংলামো করে ফেলল! এদিকে মেহসানার এমন অকপট স্বীকারোক্তিতে আদ্রিয়ানের ঠোঁটের কোণের হাসিটা আরও চওড়া হলো। ও মেহসানার লজ্জারাঙা মুখটা দুই হাতের আঁজলায় ভরে নিয়ে কপালে দীর্ঘ এক উষ্ণ চুম্বন এঁকে দিল। মেহসানা আষ্টেপৃষ্ঠে আদ্রিয়ানকে জড়িয়ে ধরে নিজের মুখ লুকাল ওর ঘাড়ে। এক অজানা আবেশে ওর সর্বাঙ্গ তখন থরথরিয়ে কাঁপছে।
আদ্রিয়ান মেহসানাকে পাজাকোলা করে তুলে নিয়ে ধীর পায়ে বিছানার দিকে এগিয়ে গেল। নরম শয্যায় ওকে শুইয়ে দিয়ে আদ্রিয়ান নিজেও ওর খুব কাছে নেমে এল। ঘরের আবছা আলোয় মেহসানার কাজল ধোয়া চোখ আর ওষ্ঠের কম্পন আদ্রিয়ানকে এক আদিম নেশায় আচ্ছন্ন করে ফেলল। ও মেহসানার কানের লতিতে ঠোঁট ছুঁইয়ে ফিসফিস করে বলল,,
— আরে বউ লজ্জা পাও, কেন? আমরা আমরাই তো!
আদ্রিয়ানের এমন সোজাসাপ্টা আর রসিকতাপূর্ণ মন্তব্যে মেহসানা যেন লজ্জায় আরও কুঁকড়ে গেল। ও দুই হাত দিয়ে নিজের মুখ ঢেকে ফিসফিস করে বলল,,

— আদ্রিয়ান, প্লিজ! এভাবে বলবেন না। আমার কেমন যেন লাগছে!
আদ্রিয়ান মেহসানার হাত দুটো আলতো করে সরিয়ে দিল। ওর চোখে তখন এক নিবিড় তৃষ্ণা, কিন্তু মেহসানার জড়তাটুকু দেখে ও মৃদু হাসল। মেহসানার চিবুকটা উঁচু করে ধরে ও বেশ আদুরে গলায় বলল,,
— কেমন লাগছে মেরি জান?
মেহসানা আদ্রিয়ানের বুকের লোমশ অংশে আঙুল বুলাতে বুলাতে কাঁপানো গলায় বলল,,
— আপনি বড্ড বেশি কথা বলেন আদ্রিয়ান। জাস্ট শাট আপ!
আদ্রিয়ান এবার আর কথা বাড়াল না। মেহসানার লজ্জারাঙা ওষ্ঠের খুব কাছে নিজের মুখটা নিয়ে এসে নিচু স্বরে বলল,,
— ওকে মিসেস আদ্রিয়ান, কথা না হয় বন্ধই করে দিলাম। এবার শুধু ভালোবাসার ভাষা চলুক?
আদ্রিয়ানের তপ্ত নিঃশ্বাস মেহসানার ঠোঁটে আছড়ে পড়তেই ও অজান্তেই চোখ দুটো বুজে ফেলল। আদ্রিয়ান অত্যন্ত সাবধানে মেহসানার শাড়ির আঁচলটা একটু সরিয়ে ওর কাঁধে এক দীর্ঘ উষ্ণ পরশ এঁকে দিল। মেহসানা শিউরে উঠে আদ্রিয়ানকে আরও শক্ত করে জাপ্টে ধরল। ঘরের কোণে জ্বলতে থাকা সেই নিস্তেজ আলোটা যেন ওদের এই দীর্ঘ প্রতীক্ষিত প্রেমের সাক্ষী হয়ে রইল। বাইরের পৃথিবীর সমস্ত কোলাহল ছাপিয়ে তখন ওই ঘরে কেবল দুটি হৃদস্পন্দনের তাল লয় এক হতে শুরু করল।

রাতের আঁধার ঘনীভূত হয়ে নামছে ধরিত্রীর বুকে। বাইরের ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক আর হিমেল হাওয়ার শব্দ দোতলার এই নিভৃত ঘরটাকেও ছুঁয়ে যাচ্ছে। তৃষা ইদানীং শরীরের ভারীত্বের কারণে ঘরের বাইরে খুব একটা যেতে পারে না; বিছানাই এখন ওর প্রধান সঙ্গী। মাতৃত্বের এই শেষ মুহূর্তগুলো যেন এক অদ্ভুত ক্লান্তিতে মোড়ানো।
বিছানায় হেলান দিয়ে বসে তৃষা আনমনে জানলার ওপাশে তাকিয়ে ছিল। ঠিক তখনই ছোট্ট টুইংকেল একটা ভারী প্লেট দুহাতে সামলে টলমলে পায়ে ঘরে ঢুকল কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে মেয়েটার। টুইংকেল প্লেটটা টিপয়ের ওপর রেখে বেশ গাম্ভীর্যের সাথে বলল,,
— মা! অনেক লেট হয়ে গেছে। এবার একদম কথা না বাড়িয়ে খেয়ে নাও তো।
তৃষা মেয়ের এই অদ্ভুত যত্নশীলতার দিকে অপলক চেয়ে রইল। টুইংকেল ছোট হাতে একটা লোকমা মাখিয়ে তৃষার মুখের সামনে ধরল। কিন্তু ওর ছোট্ট আঙুলগুলো ঠিকমতো খাবারটা ধরে রাখতে পারছিল না; দু-এক দানা ভাত প্লেটের পাশে উপচে পড়ল।তৃষা মুচকি হেসে আলতো করে টুইংকেলের হাতটা ধরে বলল,,

— থাক না মা! আমি নিজে খেয়ে নেব। তোমার কষ্ট হচ্ছে তো।
টুইংকেল চট করে হাত সরিয়ে নিয়ে চোখ বড় বড় করে বলল,,
— একদম না!তুমি তো এখন ঠিকমতো হাতও তুলতে পারো না। সো, ডিস্টার্ব কোরো না একদম। হাঁ করো!
ও আবারও একটা লোকমা তুলে ধরার চেষ্টা করল। এবার কিছুটা খাবার তৃষার কামিজের ওপর পড়ে গেল। টুইংকেল খানিকটা অপ্রস্তুত হয়ে নিজের ফ্রক দিয়ে ওটা মোছার চেষ্টা করতে করতে ভেঁজা কন্ঠে বলল,,
— স্যরি মা! আমি না, ঠিক তোমার মতো পারছি না। তুমি কত সুন্দর করে আমাকে খাইয়ে দিতে, তাই না?
মেয়ের চোখে জল দেখে তৃষার বুকের ভেতরটা হু হু করে উঠল। ও টুইংকেলকে টেনে নিজের কোলঘেঁষে বসাল। ওর কপালে এক দীর্ঘ চুমু এঁকে শান্ত গলায় বলল,,
— আরে আমার কিউটি পাইটা! সামান্য তে কেউ কাঁদে নাকি? লক্ষ্মী মা আমার। তুমি যে আমার কত বড় লাকি চার্ম, তা কি জানো?
টুইংকেল মায়ের বুকে মাথা রেখে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তারপর উঠে দাঁড়িয়ে চোখের পানি মুছে বলল,,
— আচ্ছা, তুমি এখন লক্ষ্মী মেয়ের মতো খেয়ে নাও। আমি নিচে গিয়ে দাদুকে দেখে আসি। আর শোনো, কোনো দরকার হলে কিন্তু জোরে ‘টুইংকেল’ বলে ডাকবে, ওকে?
তৃষা হেসেই ফেলল মেয়েটার এমন পাকা কথায়। টুইংকেল খাবারের প্লেটটা তৃষার সামনে সুন্দর করে গুছিয়ে দিয়ে ছোট ছোট কদমে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। তৃষা একা ঘরে আবার সেই নিস্তব্ধতায় ডুব দিল।

নিশীথিনীর গভীরতা ধরিত্রী আঁকড়ে ধরেছে। ইদানিং আর্যর সঙ্গে যোগাযোগ কমেছে তৃষার। ইদানিং বলতে দিন দুইয়েক হবে হয়তো। তবে কারণটা অজানা! এদিকে তৃষা এখনো নিজের অবস্থার কথা জানায়নি আর্যকে। নানান চিন্তারা হানা দিলো মন মস্তিষ্কে। তবে মাতৃত্বের ভারে ক্লান্ত শরীর অবসাদগ্রস্ত। মস্তিষ্ক নির্দেশনা নিতে বন্ধ করে নিদ্রার অতল গহব্বরে ডুব দিল। ভারী হয়ে আসা চোখের পাতা ততক্ষণে বুঁজে এসেছে।

ফজরের আযান প্রতিধ্বনিত হচ্ছে; মিষ্টি প্রভাতে মৃদু উষ্ণতা। নিদ্রার অতলে তলিয়ে থাকা আদ্রিয়ানের শক্ত বাহু বন্ধন হতে নিজেকে ছাড়ানোর প্রয়াসে মত্ত মেহেসানা। সমগ্র শরীর ব্যথায় জর্জরিত। তবুও নামাজের প্রহর যাতে না ফুরায় তার জন্যই এত ব্যস্ততা।কিন্তু মেহসানার এই অতি সামান্য নড়াচড়াও আদ্রিয়ানের অতন্দ্র পাহারা এড়াতে পারল না। আদ্রিয়ান ঘুমন্ত অবস্থাতেই বাঁধন আরও শক্ত করে নিজের দিকে টেনে নিল।
চোখ পিটপিট করে তাকাতেই ওর দৃষ্টিতে একরাশ দুষ্টুমি আর প্রশান্তি ঝিলিক দিয়ে উঠল। ও ভারি গলায় আধবোজা চোখে শুধাল,

— কী হয়েছে অ্যাংরি বার্ড? এত ছটফট করছ কেন? আরও কিছুক্ষণ ঘুমোতে দাও না।
কাল রাত থেকেই আদ্রিয়ান মেহেসানাকে এই নামে সম্বোধন করছে। প্রথমে বিরক্ত লাগলেও বারবার শুনতে শুনতে যেন অভ্যস্ত হয়েছে ও। আদ্রিয়ানের কপালে জমা অবাধ্য চুলগুলো সরিয়ে দিয়ে কোমল স্বরে ও বলল,,
— আজান হয়ে গেছে, মিস্টার। এখন তো উঠতে হবে, নামাজ পড়ব না? প্লিজ, হাতটা ছাড়ুন।
আদ্রিয়ান এবার একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মেহসানার আরও গভীরে মুখ লুকাল। এক অদ্ভুত ঘোরে ও ফিসফিস করে বলল,,
— নামাজ তো তুমি পড়বেই, কিন্তু এই মুহূর্তে তোমার এই উষ্ণতা ছেড়ে উঠতে মন চাইছে না। নয়টা মাস তো উপোস রেখেছ আমায়, আজ একটুও কি বাড়তি ছাড় দেওয়া যায় না?
মেহসানা লজ্জা পেয়ে আদ্রিয়ানের বুকে ছোট করে একটা কিল বসাল। আদ্রিয়ান এবার মৃদু হেসে ওর বাঁধন কিছুটা শিথিল করল। মেহসানা বিছানা ছেড়ে ওঠার জন্য গা ঝাড়া দিতেই হঠাত থমকে গেল। এক চরম বিস্ময় আর লজ্জায় ওর সারা শরীর পাথরের মতো স্থির হয়ে গেল।

ও খেয়াল করল, ও একা নয়; ও মূলত আদ্রিয়ানের বড়সড় শার্টটার ভেতরেই ঢুকে আছে। গত রাতের সেই অগোছালো মুহূর্তগুলোতে কখন যে ওর জামা অবহেলায় মেঝের এক কোণে আশ্রয় নিয়েছে তার ইয়াত্তা নেই। এখন আদ্রিয়ানের সাথে প্রায় একাত্ম হয়ে ওর বুকের উষ্ণতায় সিঁটিয়ে আছে ও।
লজ্জায় মেহসানার মুখ দিয়ে কোনো কথা সরল না। ও পুনরায় ঝটপট আদ্রিয়ানের গায়ের সাথে সেঁটে গেল, যেন এই মুহূর্তে আদ্রিয়ানের বুকটাই ওর দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ নিরাপদ আশ্রয়। মেহসানার এই আকস্মিক কুঁকড়ে যাওয়া দেখে আদ্রিয়ান পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝতে পারল। ওর ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল। ও মেহসানার চুলে আঙুল বুলাতে বুলাতে নিচু স্বরে বলল,,

— কী হলো? এখন আবার আমায় এত শক্ত করে জাপ্টে ধরলে যে? নামাজ পড়ার তাড়াহুড়ো কি তবে শেষ হয়ে গেল মিসেস আদ্রিয়ান?
মেহসানা আদ্রিয়ানের ঘাড়ের কাছে মুখ গুঁজে ফিসফিস করে বলল,,
— আপনি খুব বাজে মিস্টার! নিচে তাকান একবার… আমার কাপড়… আমি কীভাবে উঠব এখন?
আদ্রিয়ান এবার মেহসানাকে পাজাকোলা করে কোলে তুলে নিল। ওর কাজল ধোয়া ভেজা চোখে চোখ রেখে অত্যন্ত মায়াভরা অধিকার নিয়ে বলল,,
— তোমায় আর ভাবতে হবে না। চলো, আজ না হয় দুজনে মিলেই পবিত্র হয়ে নিই। একসাথে নামাজ পড়ে আমাদের এই নতুন জীবনের দোয়া করব।
মেহসানা আর কোনো প্রতিবাদ করল না। চুপ করে ঘাপটি মেরে পড়ে রইলো আদ্রিয়ানের বলিষ্ঠ বাহুবন্ধনে।

প্রভাতের স্নিগ্ধ কিরণ মুখমণ্ডলে আছড়ে পড়তেই দীর্ঘ পল্লব দুটো কেঁপে উঠল তৃষার। তন্দ্রাচ্ছন্ন আবেশে ও যখন চোখ দুটো পিটপিট করে মেলল, এক অদ্ভুত ভালো লাগায় ছেয়ে গেল মনটা। কিন্তু সেই সোনালি আলোকচ্ছটা মুহূর্তেই যেন কোনো এক অশরীরী ছায়ায় ঢেকে গেল। তৃষা আবছা দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখল, জানলার ধারে এক দীর্ঘদেহী পুরুষ অবয়ব দাঁড়িয়ে আছে। বাইরের রৌদ্র ছটার বিপরীতে মুখটা স্পষ্ট দেখা না গেলেও সেই অতি পরিচিত কাঠামো চিনতে তৃষার মস্তিষ্কের এক সেকেন্ডও সময় লাগল না।
ও ধড়ফড়িয়ে উঠে বসল। হৃৎপিণ্ডের ধুকপুকানি কণ্ঠনালিতে এসে বিঁধছে। । ও কি স্বপ্ন দেখছে? নাকি দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসাদে ওর মস্তিষ্ক আজ বিভ্রম তৈরি করছে? তৃষাকে অস্থির হতে দেখে সেই ছায়ামূর্তি ধীর কদমে এগিয়ে এল। খাটের পাশে এসে হাঁটু গেড়ে বসে অত্যন্ত আদুরে ভঙ্গিতে তৃষার কপালে ঠোঁট ছোঁয়াল। সেই চেনা স্পর্শ, সেই চেনা গায়ের ঘ্রাণ—তৃষার সারা শরীর এক লহমায় জমে বরফ হয়ে গেল।
ও একদৃষ্টে তাকিয়ে থেকে অস্ফুট স্বরে কেবল একটি শব্দই উচ্চারণ করতে পারল,,
— ক্যাপ্টেন?
আর্য ওর গাঢ় স্বরে উত্তর দিল,,

— বলুন ম্যাডাম? আপনার হুকুম তামিল করতে আপনার এই অধম সেবক হাজির।
কণ্ঠস্বরটা কানে যেতেই তৃষার সমস্ত সংশয় কর্পূরের মতো উড়ে গেল। এটা ভ্রম নয়, এটা ওর রক্ত-মাংসের আর্য! মুহূর্তেই ওর দুচোখ বেয়ে বাঁধভাঙা অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। আর্য আলতো হাতে সেই নোনা জল মুছে দিয়ে তৃষার ললাটে পুনরায় গভীর এক চুম্বন এঁকে দিল। আর্যর তো আসার কথা ছিল আরও দিনকয়েক পর, কিন্তু ঝামেলার জট দ্রুত খুলে যাওয়ায় ও কাউকেই না জানিয়ে এই সাতসকালে সারপ্রাইজ দিতে ছুটে এসেছে।
পুরো ঘরটা তখনো ভোরের ধূসর আলো-আঁধারিতে ঘেরা। কেউ কাউকে খুব একটা স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে না। আর্য তৃষাকে নিবিড়ভাবে নিজের বুকের মাঝে টেনে নিল। তৃষা আর্যর শার্টের কলারটা খামচে ধরে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। আর্য ওর চুলে বিলি কাটতে কাটতে বলল,,
— স্যরি বউজান! অনেক অপেক্ষা করিয়েছি না?
তৃষা কোনোমতে নিজেকে সামলে নিয়ে উঠে বসল। আর্যর মুখটা ভালো করে দেখার নেশায় ও পাশ থেকে বেডসাইড ল্যাম্পটা জ্বালিয়ে দিল। হলদেটে আলোয় আর্য তৃষার দিকে তাকাতেই ওর চোখের মণি দুটো বিস্ময়ে স্থির হয়ে গেল। তৃষার দেহগড়নের সেই আমূল পরিবর্তন, মাতৃত্বের সেই পূর্ণতা আর্যর চোখ এড়াল না।আর্য চমকে উঠে অবোধের মতো প্রশ্ন করল,,

— তৃষা! একি? তোমার… কি হয়েছে? শরীর এমন…?
তৃষা আর্যর বিস্ময়ভরা মুখ দেখে মুচকি হাসল। ওর হাতটা আলতো করে নিজের স্ফীত উদরের ওপর রাখল। আর্যর হাতের তালুতে যেন এক নতুন প্রাণের স্পন্দন মৃদু আঘাত করল। তৃষা ওর চোখের দিকে তাকিয়ে পরম তৃপ্তিতে ফিসফিস করে বলল,,
— আপনি পুনরায় বাবা হতে চলেছেন ক্যাপ্টেন।
আর্য মুহূর্তের জন্য বাকরুদ্ধ হয়ে গেল। মেরুদণ্ড বেঁয়ে নেমে গেল একরাশ অদ্ভুত শিহরণের ঝর্না। ওর হাতটা বেশ গতিতে কম্পিত। তৃষা ওর অস্থিরতা বুঝতে পেরে আর্যর বলিষ্ঠ হাতের উপর নিজের ফুলে ওঠা হাতটা রাখলো। ও স্পষ্ট দেখতে পেলো আর্যর তীক্ষ্ণ মুখমণ্ডল বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে এক ফোঁটা অশ্রুকনা বোধ হয়।ছেলেদের কাঁদতে নেই এই বোধটাও লোপ পেয়েছে ওর।
তৃষাকে এক লহোমায় বুকে জড়িয়ে নিলো ও; কিঞ্চিৎ ঝুঁকে তৃষার গলায় মুখ ডোবালো। সামান্য ঝাঁকুনি দিল বোধহয় ওর দেহ, তৃষা অবাক নেত্রে চেয়ে আছে। এ কোন আর্য? এ কেমন রূপ ওর? পরক্ষণেই ওকে বিস্ময়ের চূড়ান্তে পৌঁছে দিয়ে এক ঝটকায় ওকে নিজের কোলে তুলে নিল আর্য।
তৃষা বিস্ফোরিত নয়নে চাইলো;দুই হাতে শক্ত করে ওর কাঁধ আঁকড়ে ধরে বলল ,,

— কি করছেন? আল্লাহ পড়ে যাবে তো!
তৃষার আতঙ্কিত স্বর আর্যর কানে পৌঁছাল কি না সন্দেহ! সে তখন এক অদ্ভুত ঘোরের মধ্যে, এক উন্মাদের মতো তৃষাকে কোলে নিয়ে ঘরময় পায়চারি করছে। আর্যর চোখের কোণে তখনো নোনা জলের রেখা, কিন্তু ঠোঁটের কোণে এক পৃথিবী জয়ের হাসি। ও তৃষাকে আরও নিবিড়ভাবে বুকের সাথে লেপ্টে ধরে ওর কপালে বারবার পাগলের মতো চুমু খেতে খেতে বলতে লাগল,,
— আল্লাহ! তৃষা! তুমি কি ধারণা করতে পারছ আমার এখন কেমন লাগছে?
তৃষা আর্যর কাঁধ শক্ত করে খামচে ধরে কাঁপা গলায় বলল,,
— আরে ক্যাপ্টেন, পাগলামি ছাড়ুন! আমি তো পড়েই যাব। এই অবস্থায় আমাকে এভাবে কে কোলে তোলে? আপনার তো কমনসেন্সও লোপ পেয়েছে দেখছি!
আর্য এবার হঠাৎ থেমে গেল। তৃষার চোখের খুব কাছে নিজের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিবদ্ধ করে গাঢ় স্বরে বলল,,
— কমনসেন্স? বউজান গো! আজ আমার সেন্স বলতে কিচ্ছু অবশিষ্ট নেই। তুমি ভাবলে কী করে যে আমি আমার এই ছোট্ট জগতটাকে হাত থেকে পড়ে যেতে দেব? আমার এই কোলটা তোমার আর আমাদের এই বেবিটার জন্য দুনিয়ার সবচেয়ে সেফেস্ট প্লেস।
আর্য অত্যন্ত সতর্কতার সাথে তৃষাকে বিছানার নরম গদিতে বসিয়ে দিল। এরপর মেঝের ওপর হাঁটু গেড়ে বসে তৃষার স্ফীত উদরে আলতো করে মাথা ঠেকাল। ওর গলার স্বর এবার বেশ ভেজা ও আবেগপ্রবণ,,

— হেই লিটল সোল, আই এম স্যরি। পাপা বড্ড দেরি করে ফেলেছে তোমার কাছে আসতে। বাট আই প্রমিস, এখন থেকে প্রতিটা সেকেন্ড আমি তোমাদের পাহারা দেব। কোনো মিশন, কোনো ডিউটি আমাকে তোমাদের কাছ থেকে আর এক মুহূর্তের জন্যও আলাদা করতে পারবে না।
তৃষা আর্যর এলোমেলো চুলে আঙুল বুলাতে বুলাতে আর্দ্র গলায় বলল,,
— টুইংকেল কিন্তু অলরেডি নিজেকে বড় বোন ঘোষণা করে দায়িত্ব নিয়ে নিয়েছে। ও জানলে তো খুশিতে আকাশ মাথায় তুলবে!
আর্যর ঠোঁটে এক মায়াবী হাসি ফুটে উঠল। ও তৃষার হাতের তালুতে গভীর এক চুমু খেয়ে বলল,,
— ওহ, সো আই হ্যাভ আ কম্পিটিটর অলরেডি?
ওদের কথোপকথন এর মাঝেই হঠাৎ গুটিগুটি পায়ে কক্ষে প্রবেশ করল টুইংকেল। ওর ছোট্ট দুহাতে ধরা একটা কাঁচের গ্লাস ভর্তি তৃষার পুষ্টিকর জুস। যা ইদানীং ওর প্রাতঃরাশের অবিচ্ছেদ্য অংশ। টুইংকেলের নজর তখনো গ্লাসের দিকে, যাতে এক ফোঁটা জুসও বাইরে না পড়ে।
— মা! এই যে তোমার সকালের ম্যাজিক ড্রিঙ্ক চলে এসেছে। একদম না করবে না কিন্তু, আমি আজ অনেক কষ্ট করে…
কথাটা শেষ হওয়ার আগেই ওর নজর গেল বিছানার পাশে হাঁটু গেড়ে বসে থাকা মানুষটির দিকে। টুইংকেল থমকে দাঁড়াল। ওর দুচোখে এক আকাশ বিস্ময়! হাতের গ্লাসটা কোনোমতে টিপয়ের ওপর রেখেই ও এক চিৎকার দিয়ে উঠল,,

— পাপা! তুমি? ওহ মাই গড, পাপা!
টুইংকেল যেন নিজের চোখকেও বিশ্বাস করতে পারছিল না। আর্য দুহাত বাড়িয়ে দিতেই ও এক দৌড়ে গিয়ে আর্যর শক্ত বুকের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। আর্যও ওকে দুহাতে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে ওর মাথায় আর গালে অজস্র চুমু এঁকে দিল। আর্য যখন ভোরে বাসায় পা রেখেছিল, তখন টুইংকেল তার নিজের ঘরে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন ছিল। আর্য সেই ঘুমন্ত পরীর কপালে সন্তর্পণে একটি চুমু খেয়েই তৃষার ঘরে এসেছিল।
আর্য টুইংকেলকে কোলে তুলে নিয়ে ওর নাক টেনে দিয়ে বলল,,
— কী অবস্থা আমার প্রিন্সেসের? আমি না আসতেই নাকি তুমি পুরো বাড়ির দায়িত্ব নিয়ে নিয়েছ? দিস ইজ ভেরি গুড!
টুইংকেল আর্যর গলা জড়িয়ে ধরে অভিমানে ঠোঁট ফুলিয়ে বলল,,
— তুমি অনেক পচা পাপা! এত দেরি কেন করলে? জানো পাপা, আমার একটা ছোট ভাই বা বোন আসছে! আমি সব খেয়াল রাখি ওর।
আর্যর চোখে আবারও আর্দ্রতা জমে উঠল। ও তৃষার দিকে একবার তাকিয়ে টুইংকেলকে আরও কাছে টেনে নিয়ে বলল,,

— জানি তো মা! এখন থেকে আমাদের টিমে তিনজন নয়, চারজন মেম্বার। পাপা আর প্রিন্সেস মিলে এবার মা আর লিটল বেবিকে গার্ড দেব, কেমন?
টুইংকেল খুশিতে প্রফুল্ল কণ্ঠে বললো,,
— ওকে পাপা!
ওদের বাবা-মেয়ের এই খুনসুটি আর অকৃত্রিম ভালোবাসা দেখে তৃষার চোখের কোণে আনন্দের জল চিকচিক করে উঠল। আর্যর এক হাত টুইংকেলের পিঠে, আর অন্য হাতটা পরম মমতায় তৃষার হাতের ওপর। ভোরের সেই স্নিগ্ধ আলোয় ঘরটা যেন এক পূর্ণাঙ্গ সুখী পরিবারের প্রতিচ্ছবি। আর্য তৃষার দিকে তাকিয়ে চোখ টিপে ইশারায় বলল,,
— দেখলে ম্যাডাম? টিম কিন্তু রেডি! এখন শুধু আমাদের এই ছোট্ট মেহমান আসার অপেক্ষা।

— কী খাবেন?
রান্নাঘরের মৃদু আলোয় খুন্তি হাতে ব্যস্ত মেহসানা পেছন থেকে আসা চেনা পায়ের শব্দে ঘুরে না তাকিয়েই প্রশ্নটি করল। আদ্রিয়ান ফ্রেশ হয়েই সোজা নিচে নেমে এসেছে; মেহসানাকে উনুনের পাশে দেখে ওর ভ্রু দুটো কুঁচকে গেল সামান্য। ও দ্রুত এগিয়ে এসে মেহসানার হাত থেকে খুন্তিটা কেড়ে নিয়ে একপ্রকার ধমকের সুরে বলল,,
— তোমাকে না বলেছি এখন রেস্ট নিতে? রান্নাঘরে কে আসতে বলেছে, হুম?
মেহসানা আলতো করে একটা নিশ্বাস ফেলে আদ্রিয়ানের দিকে তাকিয়ে বলল,,
— তা রান্না না করলে খাবেন কী, মিস্টার? পেট তো আর শুধু ভালোবাসায় ভরবে না!
— কেন, বাইরে থেকে খাবার অর্ডার করা যেত না?
মেহসানা এবার একটু কোমর বেঁকিয়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করতেই সারা শরীরের সুপ্ত ব্যথাটা যেন চিলিক দিয়ে উঠল। ও ওষ্ঠাধর কামড়ে ধরে কোনোমতে নিজেকে সামলে নিয়ে বলল,,
— বাইরের খাবার রোজ রোজ কেন খাবেন? আমি তো ভালোই আছি, পারব রান্না করতে।
— হ্যাঁ, সে তো দেখতেই পাচ্ছি!
আদ্রিয়ান মেহসানাকে আলতো করে ধরে রান্নাঘরের একটা টুলের ওপর বসিয়ে দিল। তারপর নিজেই কড়াইয়ের দিকে মনোযোগ দিয়ে অবলীলায় খুন্তি নাড়তে শুরু করল। আদ্রিয়ানের এই পারদর্শী রূপ দেখে মেহসানা কিছুটা অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। আদ্রিয়ান রান্না করতে করতেই মেহসানার দিকে আড়চোখে চেয়ে মৃদু হাসল; অত্যন্ত কোমল স্বরে বলল,,

— এখন আর অবাধ্য মেয়ের মতো তর্ক কোরো না, মেহু। লক্ষ্মী মেয়ের মতো ওপরে নিজের ঘরে যাও। টি-টেবিলের ওপর দেখবে একটা পেইন কিলার রাখা আছে, ওটা আগে খেয়ে নাও। তারপর আমি নিজেই খাবার নিয়ে ওপরে আসছি। আজ না হয় ডক্টর আদ্রিয়ান তার পেশেন্টের পাশাপাশি তার অর্ধাঙ্গিনীরও একটু তদারকি করল!
— কিন্তু..!
এবার কিছুটা ধমকের দৃষ্টিতে তাকালো আদ্রিয়ান,,
— তোমাকে কি বলেছি আমি?
মেহেসানা আর দ্বিধা করলো না। চটজলদি পদক্ষেপে প্রস্থান করল।

দেখতে দেখতে সময়ের চাকা ঘুরে প্রতিক্ষার প্রহর ফুরিয়ে এসেছে। আসন্ন অতিথির আগমনীর মাহেন্দ্র ক্ষণে সকলের মাঝে যেমন আনন্দ বিপরীত রয়েছে ঠিক তেমনি একরাশ উৎকণ্ঠা। তৃষার ডেলিভারি ডেট একদম দোরগোড়ায় হওয়ায় বাড়ির সবাই যেন তটস্থ। আর্যর এক মুহূর্তের জন্য চোখের আড়াল হতে দিচ্ছে না ওকে।
এমন উত্তেজনার মাঝেও আজ ছোট্ট টুইংকেলের স্কুলে যাওয়াটা ছিল অনিবার্য। অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটা ক্লাস টেস্ট থাকার কারণে আফজাল চৌধুরী নিজেই ওকে নিয়ে স্কুলে এসেছেন। তবে ফেরার পথে একটু দেরি হয়ে যাওয়ায় টুইংকেল স্কুলের পাশের পার্কে একটা কাঠের বেঞ্চে বসে অপেক্ষা করছিল। মধ্যগগনের সূর্যটা আজ বড্ড বেশ তেজি; রোদের কড়া আঁচ যেন পিচঢালা পথ থেকে ঠিকরে বের হচ্ছে।
হঠাৎ করেই টুইংকেলের চিন্তায় ছেদ পড়ল। ধপ করে একটা ভারী শরীর ওর ঠিক পাশেই বেঞ্চিতে এসে বসল। টুইংকেল কিঞ্চিৎ ভ্রু কুঁচকে পাশ ফিরে তাকাল। দেখল, ওর থেকে বয়সে বেশ বড়–প্রায় চোদ্দ-পনেরো বছরের এক কিশোর বসে আছে। ছেলেটির পরনে নীল রঙের একটা ফুটবল জার্সি, পায়ে স্পাইক আর ট্রাউজার। বয়সের তুলনায় উচ্চতা যেমন দীর্ঘ, গায়ের রঙও তেমন দুধে-আলতা ফর্সা। ওর অবাধ্য বাবরি চুলগুলো কপাল ছাপিয়ে চোখের ওপর এসে পড়ছে, যা ওর গাম্ভীর্যপূর্ণ চেহারায় এক অনন্য সৌন্দর্যের অবতারণা করছে।
টুইংকেল বেশ দাপটের সাথে শুধাল,,

— তুমি আমার পাশে বসলে কেন? আরও তো বেঞ্চ খালি আছে!
ছেলেটি কোনো উত্তর দেওয়ার আগেই টুইংকেলের চোখ আটকে গেল ওর কপালে। সেখান থেকে টাটকা রক্ত গড়িয়ে পড়ছে। টুইংকেল আঁতকে উঠে ওর ছোট্ট হাত দুটো দিয়ে ছেলেটার কপাল আঁকড়ে ধরার চেষ্টা করল; ব্যাকুল কণ্ঠে বলল,,
— ওহ গড! তোমার কি হয়েছে? র ক্ত পড়ছে কেন এভাবে?
ছেলেটি প্রথমে একটু বিরক্ত হয়ে হাতটা ঝটকা দিয়ে সরিয়ে দিতে চাইল। কিন্তু সম্মুখে বসে থাকা ছোট্ট মেয়েটির নীলা দৃষ্টিতে স্পষ্ট উদ্বেগ দেখে ও থমকে গেল। একদৃষ্টে টুইংকেলের পুতুলসম মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে গম্ভীর স্বরে বলল,,
— ফুটবল খেলতে গিয়ে পড়ে গিয়েছিলাম। ইটস ওকে!
টুইংকেল এবার বড়দের মতো শাসন করার ভঙ্গিতে মাথা নাড়ল,,

— একটুও ওকে না! এভাবে কেউ খেলা করে? জানো আমার মা কী বলে? সবসময় সাবধানে থাকতে হয়। কপালটা ফেটে গেলে তোমার কষ্ট হবে না?
ছেলেটি অবাক হয়ে এই পুঁচকে মেয়েটির পাকনা পাকনা কথাগুলো শুনছিল। ঠিক তখনই রাস্তার ওপাশে একটা বেল বাজানোর শব্দ হলো। টুইংকেল হুট করে কথা থামিয়ে সেদিকে তাকাল। একটা রঙিন আইসক্রিমের ভ্যান ধীরলয়ে রাস্তা পেরিয়ে যাচ্ছে। টুইংকেলের ডাগর চোখ দুটো ওই ভ্যানটার ওপর স্থির হয়ে গেল; এক মুহূর্তের জন্য ওর সব গাম্ভীর্য ভুলে ও বেশ তৃষ্ণার্ত চোখে তাকিয়ে রইল।
ছেলেটি লক্ষ্য করল মেয়েটির দৃষ্টির পরিবর্তন। ও সিট থেকে উঠে দাঁড়িয়ে পকেটে হাত দিল। অত্যন্ত ধীরস্থির কণ্ঠে টুইংকেলকে জিজ্ঞেস করল,,
— তুমি আইসক্রিম খাবে?
টুইংকেল ওর দিকে ফিরে তাকাল। তারপর ঠোঁট উল্টে করুণ স্বরে বলল,,

— খেতে তো খুব ইচ্ছে করছে, কিন্তু আমার কাছে তো টাকা নেই! আর দাদু এখনো আসছে না!
সুদর্শন সেই কিশোরটি এবার মৃদু হাসল—যা ওর গম্ভীর মুখে একদম বিরল। ও কোনো কথা না বলে গটগট করে ভ্যানটার দিকে এগিয়ে গেল। কিছুক্ষণ পর হাতে একটা স্ট্রবেরি আইসক্রিম নিয়ে ফিরে এল। আইসক্রিমটা টুইংকেলের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল,,
— নাও খাও। শোনো, ছোটদের কাছে টাকা থাকতে হয় না। পকেটে টাকা না থাকলেও আইসক্রিম খাওয়া যায়, যদি পাশের জন বড় হয়।
টুইংকেল একগাল হাসি দিয়ে আইসক্রিমটা হাতে নিল। আইসক্রিম ওর বড্ড প্রিয় কিনা! পরক্ষণেই ওর মনে পড়ে গেল পারিবারিক নিষেধাজ্ঞা, ও চট করে হাতটা সরিয়ে নিল। আইসক্রিমটা প্রায় ছেলেটার বুকের কাছে ঠেলে দিয়ে মাথা নাড়িয়ে বলল,,

— উঁহু! তোমার আইসক্রিম তুমিই নাও। আমি খাব না।
ছেলেটা খানিকটা অবাক হলো। ওর তীক্ষ্ণ ভ্রু দুটো কিঞ্চিৎ কুঁচকে গেল। গম্ভীর স্বরে শুধাল,,
— কেন? একটু আগে তো বললে খেতে ইচ্ছে করছে। এখন আবার ফিরিয়ে দিচ্ছ কেন?
টুইংকেল বেশ গাম্ভীর্যের সাথে হাত দুটো বুকের ওপর আড়াআড়ি করে বেঁধে বলল,,
— পাপা বলেছে স্ট্রেঞ্জারদের দেওয়া কিছু খেতে নেই। আর দাদুমণি বলেছে, কেউ যদি কিছু দিয়ে ভুলিয়ে-ভালিয়ে নিয়ে যেতে চায়, তবে সে হলো পচা লোক। আমি তো তোমাকে চিনিই না!
টুইংকেলের এমন পাকা পাকা যুক্তি শুনে জায়ানের ঠোঁটের কোণে আবারও সেই বিরল হাসিটা ফুটে উঠল। ও আইসক্রিমের কাঠিটা টুইংকেলের আরও কাছে বাড়িয়ে দিয়ে বলল,,
— তুমি তো অনেক পাকা পাকা কথা বলো দেখছি! তা আমাকে দেখে কি তোমার কিডন্যাপার মনে হয়?
টুইংকেল এবার মাথা ডানে-বামে সজোরে নাড়াল। যার অর্থ—না, তা মনে হয় না। ছেলেটা দেখতে বেশ হিরোদের মতো, কিডন্যাপাররা কি আর এত সুন্দর হয়? ছেলেটা এবার আশ্বস্ত করে বলল,,

— তাহলে নিতে পারো। আমি কোনো পচা লোক নই।
টুইংকেল কিছুক্ষণ দোনামনা করল। আইসক্রিমের লোভ আর সতর্কতার মাঝে একটা লড়াই চলল ওর মনে। শেষমেশ লোভটাই জিতে গেল। ও আইসক্রিমটা হাতে নিয়ে খুব সাবধানে একটা কামড় দিয়ে বলল,,
— আচ্ছা, তোমার নামটা কী?
ছেলেটি ওর গভীর, তীক্ষ্ণ চোখের মণি দুটো টুইংকেলের ওপর স্থির করে ধীর গলায় উত্তর দিল,,
— শাহরিজ চৌধুরী জায়ান।
টুইংকেল ওর চোখের দিকে তাকিয়ে স্তব্ধ হয়ে গেল। জায়ানের চোখের মণি দুটো স্বাভাবিকের চেয়ে একটু বেশি গাঢ়,ওষ্ঠের নিচের ছোট্ট একটা লালচে তিল। জায়ান এবার পাল্টা প্রশ্ন করল,,
— তোমার নাম কী?
টুইংকেল একগাল আইসক্রিম মুখে নিয়েই হেসে বলল,

— টুইংকেল!
— শুধুই টুইংকেল? আর কোনো নাম নেই?
টুইংকেল এবার ওর পুরো নামটা বলতে যাবে, ঠিক তখনই দূর থেকে আফজাল চৌধুরীর হন্তদন্ত কণ্ঠস্বর কানে এল। তিনি প্রায় দৌড়াতে দৌড়াতে পার্কে ঢুকলেন,,
— দাদুভাই! দাদুভাই তুমি এখানে? দ্রুত চলো! তোমার মাকে হসপিটালে নেওয়া হয়েছে।
খবরটা শোনা মাত্রই টুইংকেলের হাত থেকে আইসক্রিমটা প্রায় পড়ে যাওয়ার উপক্রম হলো। ও জায়ানের দিকে শেষবারের মতো একবার তাকিয়ে কোনো কথা না বলেই আফজাল চৌধুরীর হাত ধরে হন্তদন্ত হয়ে পার্ক থেকে বেরিয়ে গেল। ওর নামটা আর জায়ানের কানে পৌঁছানো হলো না।
জায়ান স্তব্ধ হয়ে টুইংকেলের চলে যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে রইল। কেন জানি না, এই অপরিচিত ছোট্ট মেয়েটার উদ্বেগ আর চপলতা ওর মনে এক অদ্ভুত রেখাপাত করে গেছে। ও যখন ওখান থেকে উঠে যেতে চাইল, হঠাৎ দেখল বেঞ্চের ওপর একটা সোনালি জিনিসের ঝিলিক।

ও নিচু হয়ে ওটা হাতে তুলে নিল। দেখল, একদম নক্ষত্রের মতো আকৃতির ‌একটা ছোট্ট সোনার দুল। আসার সময় বা যাওয়ার তাড়াহুড়োয় হয়তো টুইংকেলের কান থেকে খসে পড়েছে ওটা। জায়ান কানের দুলটার ওপর আঙুল বোলাল। ওর ঠোঁটের কোণে এক অদ্ভুত মায়াবী আর রহস্যময় হাসি খেলে গেল। ও দুলটা সযত্নে নিজের পকেটে ভরে রাখল।এক অদ্ভুত মাহেন্দ্রক্ষণে ওদের পরিচয় হতে হতেও হলো না। জায়ান মনে মনে ভাবল,
“আবারও কি দেখা হবে আমাদের, ছোট্ট নক্ষত্র?”

হাসপাতালের প্রতিটি কোণাও যেন কেঁপে উঠছে আর্যর হুংকারে। ওটির দরজার ওপর জ্বলতে থাকা লাল আলোটা যেন তৃষার যন্ত্রণার প্রতিচ্ছবি হয়ে বিঁধছে আর্যর চোখে। কিছুক্ষণ আগে তৃষার সেই তীব্র যন্ত্রণাকাতর মুখ আর আর্তনাদ দেখে আর্যর মতো ইস্পাতকঠিন হৃদয়ের মানুষেরও পায়ের তলার মাটি সরে গিয়েছিল। শ্রাবণের অঝোর ধারার মতো ওর দুচোখ বেয়ে অবিরল অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে।
ও একবার দেয়ালে কপাল ঠেকিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করছে, আবার পরক্ষণেই ওটির বন্ধ দরজার সামনে গিয়ে পাগলের মতো পায়চারি করছে। ঠিক সেই মুহূর্তে আফজাল চৌধুরী আর টুইংকেল হন্তদন্ত হয়ে সেখানে এসে পৌঁছালেন। করিডোরের এক কোণে মেহসানা আর আদ্রিয়ানও তটস্থ মুখে দাঁড়িয়ে ছিল। টুইংকেল ওর পাপা-কে এভাবে ভেঙে পড়তে দেখে থমকে গেল।
ওর ছোট্ট মনে এক অজানা আতঙ্ক দানা বাঁধল। ও দৌড়ে গিয়ে মেহসানাকে জড়িয়ে ধরে ধরা গলায় জিজ্ঞেস করল,,

— মিমি! পাপার কী হয়েছে? পাপা কাঁদছে কেন? মায়ের কী হয়েছে?
মেহসানা নিচু হয়ে টুইংকেলকে বুকে টেনে নিল; ওর মাথায় হাত বুলিয়ে আর্দ্র গলায় বলল,,
— কিছু হয়নি মামণি। তোমার মা একটু অসুস্থ তো, তাই পাপা ভয় পেয়েছে। তুমি একদম চিন্তা কোরো না, সব ঠিক হয়ে যাবে।
সময় যেন আর কাটছে না। প্রতিটি সেকেন্ড যেন একেকটি যুগের সমান ভারি হয়ে আর্যর ওপর চেপে বসছে। হাসপাতাল টার একপাশে নামাজের সুবন্দবস্ত আছে। হামিদা বেগম আর জাহানারা বেগম সেখানেই জায়নামাজ পেতে বসে অস্ফুট স্বরে মোনাজাত করছেন।
হঠাৎ ওটির দরজা খুলে গেল। একজন নার্স দ্রুতপদে বেরিয়ে এসে উচ্চস্বরে ডাকলেন,,
— তৃষা নেওয়াজের ফ্যামিলি? আপনারা কি আছেন এখানে?
আর্য এক লাফে নার্সের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। ওর কণ্ঠস্বর রুদ্ধ, চোখ দুটো রক্তবর্ণ, কম্পিত কণ্ঠে-প্রস্তুত ভঙ্গিমায় উন্মাদের ন্যায় ও বলল,

— হ্যাঁ, হ্যাঁ, আমি..আমি ওর হাসবেন্ড আর্য এহসান!
নার্স আর্যর সেই উন্মাদের মতো অবস্থা দেখে মৃদু হেসে বললেন,,
— কংগ্রাচুলেশনস মিস্টার আর্য! আপনাদের কোল আলো করে ফুটফুটে এক পুত্রসন্তান এসেছে। মা ও ছেলে দুজনেই এখন সুস্থ আছেন।
“আলহামদুলিল্লাহ!”—পরিবারের সকলের সমস্বরে উচ্চারিত এই একটি শব্দে হাসপাতালের গুমোট পরিবেশটা নিমেষেই আনন্দাশ্রুতে ভরে উঠল। আফজাল সাহেব আনন্দে কেঁদে ফেললেন, জাহানারা বেগম সিজদায় লুটিয়ে পড়লেন।
কিছুক্ষণ পর নার্স নীল রঙের নরম কাপড়ে মোড়ানো ছোট্ট এক টুকরো মাংসপিণ্ড আর্যর দিকে বাড়িয়ে দিলেন। আর্য কাঁপাকাঁপা হাতে ওর কলিজার টুকরোকে কোলে নিল। শিশুটির গায়ের রঙ একদম তৃষার মতো দুধে-আলতা, আর নাক-চোখের গড়ন ঠিক আর্যর প্রতিচ্ছবি। আর্য ওর ছোট্ট কপালে ঠোঁট ছুঁইয়ে গাঢ় এক চুম্বন এঁকে দিল। ওর চোখের নোনা জল টুপ করে গিয়ে পড়ল নবজাতকের নরম গালে।
মেহেসোনার হাত ছেড়ে টুইংকেল এগিয়ে এলো,,

— পাপা?
আর্য প্রশান্তির হাসি হেসে ছেলেকে নিজের মেয়ের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল,,
— তোমার ছোট্ট ভাই এসেছে সোনা!
টুইংকেল আবেগে আপ্লুত হয়ে ওকে নিতে গিয়েই দেখলো নিতান্তই এক মাংসপিণ্ড ও। আকারে গোলুমোলু হলেও টুইংকেল এর কাছে বড্ড ছোট ঠেকলো, ও ঠোঁট উল্টে বলল,,
— ভাই তো অনেক ছোট পাপা!
পরিবারের সকলেই এগিয়ে এসেছিল। টুইংকেলের এমন মন্তব্যে হাসলো একযোগে সবাই। অতঃপর শুরু হলো নবজাতক কে নিয়ে উচ্ছ্বাস। অথচ আর্যর মন এখনো পড়ে আছে ওটির ওপারে; প্রেয়সীনির কাছে।

কিছুক্ষণ বাদেই তৃষাকে কেবিনে শিফট করা হলো। আর্য সন্তানকে কোলে নিয়েই তৃষার কাছে ছুটে গেল। তৃষা তখন তন্দ্রাচ্ছন্ন অবস্থায় শুয়ে আছে, ওর ফ্যাকাসে মুখে ক্লান্তির মাঝেও এক স্বর্গীয় আভা খেলা করছে। আর্য ওর শিথানে বসে তৃষার কপালে নিজের কপাল ঠেকাল। অত্যন্ত আবেগী কণ্ঠে ফিসফিস করে বলল,,
— বউজান গো! দেখো , আমাদের রাজপুত্র চলে এসেছে। থ্যাঙ্ক ইউ বউজান! আমাকে পূর্ণতা দেওয়ার জন্য অনেক ধন্যবাদ।
তৃষা আধোবোজা চোখে আর্য আর তাদের ছোট্ট সন্তানের দিকে তাকিয়ে ম্লান হাসল। ওর এক হাত আর্যর হাতের ওপর, আর অন্য হাতটা পরম মমতায় নিজের সন্তানের গায়ে। পরক্ষণেই বলল,,
— টুইংকেল?
দেখো অবস্থা! সদ্য জন্মানো নবজাতককে ছেড়ে মেয়েকে খুঁজছে! আর্য হাসলো একপল। টুইংকেল গুটিগুটি পায়ে এগিয়ে এসে মায়ের পাশে বসলো,,

— তুমি ঠিক আছো মা?
টুইংকেলকে দেখেই হাসলো তৃষা,,— হুম মাম্মা!
আর্য এসে ওদের পাশে দাঁড়ালো। কোলে তখনো পিচ্চিটা! পরপর টুইংকেল আর তৃষার ললাটে চুম্বন এঁকে বলল,,
— সব তো হলো‌। এখন তবে আমার প্রিন্সের নাম কি হবে?
তৃষা হাসলো, টুইংকেলের দিকে চেয়ে বলল,,
— টুইংকেলের ভাই টমেটো হোক তাহলে!
হাসির রোল পরল! আর্য বললো,
— আমি আমার ছেলের নাম কিন্তু ঠিক করেই রেখেছি।
তৃষা জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকালো; ভ্রু নাঁচিয়ে শুধালো,,
— কি?
আর্য ছেলের দিকে চেয়ে বলল,
— শ্রেয়ান! ও আমার শ্রেয়ান এহসান!
নাম শুনে হাসলো তৃষা সঙ্গে টুইংকেল।আর্য পিচ্চিটাকে পার্শ্ববর্তী বেডে শুইয়ে দিল। টুইংকেল ভাইয়ের পাশে গিয়ে বসে ছোট্ট ছোট্ট আঙ্গুল গুলো নিয়ে খেলায় মত্ত হলো। আর্য তৃষার কাছে চেয়ার টেনে বসতেই। তৃষা ওদের দিক থেকে দৃষ্টি সরিয়ে আর্যর হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় পুরে নিয়ে ওর চোখের অতল গভীরতায় তাকাল; আলতো হেসে ফিসফিস করে বলল,,

ফিরে এসো অনুরাগে পর্ব ৪৯

— আমার জীবনের সবটুকু শূন্যতা আপনি আর আমাদের এই ছোট্ট পৃথিবীটা দিয়ে পূর্ণ করে দিলেন, ক্যাপ্টেন।
আর্য ওর হাতের পিঠে ওষ্ঠ ছোঁয়ালো; প্রগাঢ় মায়ায় জড়ানো কণ্ঠে উত্তর দিল,,
— তুমি পাশে থাকলে পৃথিবীর কোনো শূন্যতাই আর আমাকে স্পর্শ করার সাহস পাবে না, বউজান। আমার এই হাহাকার ভরা মরুভূমিতে তুমিই শ্রাবণের ধারা। আজীবন এভাবেই সবটুকু মায়া নিয়ে আমার এই শূন্য বুকে ফিরে এসো অনুরাগে।

সমাপ্ত