ফিরে এসো অনুরাগে পর্ব ৪৮ (২)
নওরিন কবির তিশা
নিশুতি রাত; নিস্তব্ধতা গ্রাস করেছে চরাচর। নির্জনতা ভাঙছে প্রবালে আছড়ে পড়া সামুদ্রিক গর্জন। ঘড়ির কাঁটায় তখন রাত এগারোটা বেজে ৫৭ মিনিট।সেন্ট মার্টিনের বিলাসবহুল ‘ব্লু মেরিন রিসোর্ট’-এর কক্ষটিতে মায়াবী আবছায়া অন্ধকার। দরজার এপাশে এক জোড়া সতেজ কাঠগোলাপের তোড়া হাতে অবস্থান করছে শাড়ি পরিহিত তৃষা আর টুইংকেল ।
আর্যকে একপ্রকার মিথ্যা অজুহাতে, সুকৌশলে এত রাতে রুমের বাইরে পাঠিয়েছে তৃষা। তবে উদ্দেশ্যটা খুব মিষ্টি; আজ বাইশে অক্টোবর মাত্র তিন মিনিটের ব্যবধানে একত্রিশের কোটায় তা রাখবে আর্য। আকস্মিক দরজার হাতল নড়ে ওঠার মৃদু শব্দ হলো। বিস্মিত আর্য কক্ষে প্রবেশমাত্র ওর দৃষ্টিগোচর হলো
সমগ্র রুম ঘুটঘুটে অন্ধকারে নিমজ্জিত। ও কিছু বলতে যাবে তার আগেই ঘড়ির কাঁটা ছুঁয়ে গেল রাত বারোটার ঘর। মুহূর্তের স্নিগ্ধ আলোকসজ্জায় উদ্ভাসিত হয়ে উঠল পুরো ঘর।আর্য কিছু বুঝে ওঠার আগেই, এতক্ষণ নিস্পৃহ ও শান্ত থাকা টুইংকেল এক লাফে গিয়ে আর্যর পা জড়িয়ে ধরে চিলতে হেসে চিৎকার করে উঠল,,
– হ্যাপি বার্থডে পাপা!
আর্য হচকিত নয়নে তাকাল। ঠিক ওর সম্মুখেই শাড়ির আঁচল উড়িয়ে, ওর বিমোহিত চোখের ওপর নিজের গভীর ও অনুরাগী দৃষ্টি স্থাপন করে, ঠোঁটের কোণে এক চিলতে ভালোবাসার হাসি ফুটিয়ে মৃদু স্বরে তৃষা বলল,,
– হ্যাপি বার্থডে, মাই ক্যাপ্টেন!
বিস্ময়ের রেশটুকু আর্যর চোখের কোটরে তখনো স্পষ্ট। ও পলকহীন দৃষ্টিতে চেয়ে রইল তৃষার পানে; চাঁদের ম্লান আলো আর ঘরের মৃদু লণ্ঠনের আভায় নীলাম্বরী তৃষাকে কোনো অপার্থিব মায়ার মতো ঠেকছে। আর্য এক পা এগিয়ে এসে টুইংকেলকে কোল ঘেঁষে তুলে নিল, ওর কপালে পরম মমতায় একটা চুমু খেয়ে তৃষার দিকে তাকিয়ে গভীর, মাদকতাময় কণ্ঠে বলল,
– সো, দিস ওয়াজ দ্য সিক্রেট মিশন, মিসেস এহসান? আর আমি ভাবছিলাম এত রাতে হুট করে আমার জন্য ব্ল্যাক কফি আনার ডিমান্ড কেন তুললে! ইউ বোথ আর গ্রেট কনসপিরেটরস, আই মাস্ট সে!
তৃষা আলতো হেসে টেবিলের উপর বিদ্যমান কেকটির দিকে ইঙ্গিত করল। কেকের ওপর জ্বলজ্বল করছে দুটি মোমবাতি, শিখাগুলো উন্মাদ পবনের তোড়ে কিঞ্চিত কম্পিত। তৃষা আর্যর হাত ধরে টেবিলের কাছে টেনে নিয়ে এসে বলল,
– অনেক বেশি কথা বলেন আপনি! নাও, স্টপ টকিং অ্যান্ড কাট দ্য কেক। টাইম কিন্তু পার হয়ে যাচ্ছে!
টুইংকেল আর্যর কোল থেকে নেমে খুশিতে তালি বাজিয়ে উঠল,
– ইয়েস পাপা! কুইক, কুইক! আই ওয়ান্ট টু টেস্ট দ্য চকোলেট!
আর্য তৃষা আর টুইংকেলকে নিজের দুই বাহুর বন্ধনে জড়িয়ে ধরে একসাথে কেকের ওপর ছুরি চালাল। মোমবাতির আলোয় তিনটি মুখের প্রতিচ্ছবি এক টুকরো নিখাদ সুখের জলছবি হয়ে ধরা দিচ্ছে। আর্য কেকের প্রথম অংশটুকু কেটে টুইংকেলের মুখে তুলে দিল, তারপর আলতো করে এক টুকরো কেক তৃষার ওষ্ঠপুটে ছুঁইয়ে দিতেই তৃষা দুষ্টুমির ছলে আর্যর আঙুলে আলতো কামড় কাটার ভঙ্গি করল। আর্য মুচকি হেসে তৃষার কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে কি যেনো বলল। সঙ্গে সঙ্গে লজ্জায় নুইয়ে পড়া তৃষা আর্যর বুকে আলতো ধাক্কা দিয়ে বলল,
– বাচ্চার সামনে অন্তত একটু ভদ্র হোন, ক্যাপ্টেন!
বলেই টুইংকেলের দিকে সম্মেলিত দৃষ্টি নিক্ষেপ করলো দুজনে,তবে সারাদিনের সফরের ক্লান্তি আর সমুদ্রের নোনা হাওয়ার তোড়ে ছোট্ট রাজকুমারীর চোখের পাতা ততক্ষণে ভারী হয়ে এসেছে। ও সোফার এক কোণে মাথা রেখেই অঘোরে তলিয়ে গেছে ঘুমের দেশে। ওর নিষ্পাপ মুখখানিতে তখনো লেগে আছে কেকের সামান্য চকোলেট ক্রাস্ট।
তৃষা মৃদু হেসে এগিয়ে গেল। ও টুইংকেলকে আলতো করে কোলে তুলে নিয়ে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে বিছানার পাশ থেকে ঘুরে দাঁড়াতেই ওর দৃষ্টিগোচর হলো আর্য এতক্ষণ ধরে একমনে ওর প্রতিটি নড়াচড়া অবলোকন করছিল। ওর স্থির, তৃষ্ণার্ত দৃষ্টি তৃষার বুকের ভেতর এক অদ্ভুত কম্পনের সৃষ্টি করল। আর্য ধীর কদমে তৃষার একদম মুখোমুখি এসে দাঁড়াল। লোনা বাতাসের শীতলতাকে তুচ্ছ করে আর্যর শরীরের চেনা মদির ঘ্রাণ তৃষাকে আবার আচ্ছন্ন করে তুলতে ব্যস্ত।
তৃষা আনমনে ধীরপায়ে এক কদম পিছিয়ে নিজেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার একটা দুর্বল চেষ্টা করতেই আর্য ক্ষিপ্র হস্তে তবে পরম যত্নে তৃষার কোমর জড়িয়ে নিজের দৃঢ় বাহুবন্ধনে আবদ্ধ করল,
– কোথায় যাচ্ছেন ম্যাডাম?
আচমকা এই বাঁধনে তৃষার শ্বাস আটকে যাওয়ার উপক্রম;ও চোখের পলক দ্রুত ফেলে, কিছুটা আমতা-আমতা করে, তোতলানো কন্ঠে বলল,
– ক . ক…কোথায় আবার যাব? আ…আমি ঘুমাতে যাচ্ছি। ছাড়ুন এবার!
আর্যর ঠোঁটের কোণে তখন এক চিলতে চতুর-মাদকতাময় হাসি। ও তৃষাকে আরও এক চুল কাছাকাছি টেনে নিল, এতই কাছে যে ওর তপ্ত নিঃশ্বাস তখন তৃষার কপোলে আছড়ে পড়ছে। আর্য গভীর চোখে তৃষার চোখের দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল,
– ঘুমাতে যাচ্ছেন মানে?
– ঘ-ঘুমাতে যাচ্ছি মানে ঘুমাতে যাচ্ছি। ব-ব-বিস্তর ঘুম আসছে আমার
আর্য ওষ্টাধর প্রান্তে বক্র হাসির রেখা ফুটিয়ে বলল,,- এত নার্ভাস কেন ম্যাম?
– আ-আপনাকে। মানে আপনার মতলব সুবিধার লাগছে না।
– উহুম…! আমি কি কিছু করেছি?
তৃষা আর্যর বুকের ওপর দুহাত রেখে নিজেকে সামান্য দূরত্বে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করতে করতে বলল,
– করেননি, তবে করার ধান্দায় আছেন! এই যে এভাবে মাঝরাতে একটা মেয়েকে আটকে রেখেছেন, একে কী বলে শুনি? ক্যাপ্টেন এহসানের কি আইনের প্রতি কোনো শ্রদ্ধা নেই?
আর্য তৃষার কোমরে জড়িয়ে থাকা বাহুডোর আরেকটু শক্ত করে, ওর মুখের আরও কাছাকাছি ঝুঁকে এল; তৃষার কানের লতিতে নিজের ওষ্ঠাধর ছুঁইয়ে একদম ফিসফিসে গলায় বলল,
– নিজের বিবাহিতা স্ত্রীকে নিজের জন্মদিনে ভালোবাসার জালে আটকে রাখাটা কোনো অপরাধের আওতায় পড়ে না, মিসেস এহসান। আর তাছাড়া, এখানে কিসের জন্য এসেছি সেটা কি ভুলে গেলেন ম্যাডাম? আজ রাতে তো আপনার কোনো নিস্তার নেই!
আর্যর তপ্ত নিঃশ্বাসের ছোঁয়া তৃষার ঘাড়ে এক তীব্র শিহরণ জাগিয়ে তুলল। তৃষা বিস্ফোরিত নয়নে তাকাল আর্যর দিকে। ওর দুই গালে তখন লজ্জার গাঢ় লালিমার আস্তরন পড়েছে,ও চোখ দুটো জোড়ালোভাবে বুজে ফেলে কোনোমতে বলল,
– আপনি… আপনি কিন্তু খুব দুষ্টু হয়ে যাচ্ছেন, ক্যাপ্টেন! ছাড়ুন না, টুইংকেল জেগে যাবে তো!
– ও গভীর ঘুমে। আর আজ আমাদের মাঝে কাউকে আসতে দিচ্ছি না ম্যাডাম। আজকের রাতটা শুধু তোমার আর আমার।
আর্যর কণ্ঠের সেই আদিম ব্যাকুলতা আর তীব্র অনুরাগ তৃষার সমস্ত প্রতিরোধকে এক মুহূর্তেই বালির বাঁধের মতো গুঁড়িয়ে দিল। আর্য ওর এক হাত দিয়ে তৃষার চিবুকটা আলতো করে উঁচিয়ে ধরল। লণ্ঠনের ম্লান আলোয় নীলাম্বরী শাড়িতে তৃষাকে অপ্সরার ন্যায় অপার্থিব লাগছে। আর্যর তৃষ্ণার্ত চোখজোড়া তৃষার কাঁপতে থাকা ওষ্ঠপুটে এসে থমকে দাঁড়াল।
রুমের খোলা জানালা দিয়ে সেন্ট মার্টিনের নোনা বাতাস শাঁ শাঁ করে ভেতরে ঢুকে তৃষার শাড়ির আঁচলটাকে অবাধ্য করে তুলছে। বাইরে প্রবালে আছড়ে পড়া সমুদ্রের গর্জন যেন ওদের হৃদস্পন্দনের দ্রুত তালের সাথে একাত্ম হয়ে গেছে। আর্য আর এক মুহূর্তও সময় নষ্ট করল না;পরম আবেশে ও নিজের ঠোঁট দুটো ডুবিয়ে দিল তৃষার কম্পিত ওষ্ঠাধরে।
তৃষা আলতো করে আর্যর কাঁধের শার্টটা খামচে ধরল। এক অদ্ভুত, মাদকতাময় ভালোলাগায় ওর সারা শরীর অবশ হয়ে আসছে ওর। আর্যর ঠোঁটের ছোঁয়ায় যেন হাজার ওয়াটের বিদ্যুৎ খেলা করে গেল ওর শিরায় শিরায়। আর্য পরম যত্নে, গভীর অনুরাগে তৃষাকে নিজের বাহুবন্ধনে মিশিয়ে নিতে নিতে ওর অধরের সুধা পান করতে লাগল।
দীর্ঘক্ষণ পর যখন আর্য তৃষার ওষ্ঠাধর মুক্ত করল, তখন তৃষার শ্বাসপ্রশ্বাস দ্রুত চলছে, বুকটা হাপরের মতো ওঠানামা করছে। আর্য ওর কপালে নিজের কপাল ঠেকিয়ে কিছুক্ষণ শান্ত হয়ে রইল, যেন এই গভীর ভালোবাসার মুহূর্তটাকে নিজের আত্মার মাঝে আজীবনের জন্য বন্দি করে নিচ্ছে। তারপর আলতো করে তৃষাকে পাঁজাকোলা করে তুলে নিল নিজের শক্ত বাহুতে।
তৃষা চমকে উঠে আর্যর গলা জড়িয়ে ধরে মৃদু স্বরে বলল,
– কী করছেন?
আর্য কোনো উত্তর দিল না। ঠোঁটের কোণে সেই চতুর-মাদকতাময় হাসিটা ধরে রেখেই ও তৃষাকে নিয়ে বিছানার দিকে পা বাড়াল। বিছানায় তৃষাকে আলতো করে শুইয়ে দিয়ে ও নিজেও ওর ওপর ঝুঁকে এল। চাঁদের আলো তখন জানালার পর্দা গলে ওদের ওপর এসে পড়েছে, আর সেই মায়াবী আলো-আঁধারিতে আর্য আর তৃষা হারিয়ে গেল এক নিবিড়, অনুরাগময় ভালোবাসার অতল সাগরে; যেখানে শুধু সমুদ্রের গর্জন আর ওদের দ্রুত হওয়া হৃদস্পন্দনই রইল একমাত্র সাক্ষী।
– মাঝরাতে কফি খাওয়ার ভূত চেপেছে?
পেছন থেকে ভেসে আসা পৌরুষ কণ্ঠে হকচকিয়ে তাকালো মেহেসানা ।আকস্মিক ভয়ে ওর হাত-পা রীতিমতো কাঁপতে শুরু করেছে। বুকের ভেতর হৃৎপিণ্ডটা কামারের নেহাইয়ের মতো পিটছে।মায়ের মৃত্যুর পর থেকেই এই এক অদ্ভুত ব্যাধি ওকে গ্রাস করেছে। রাত বাড়লেই একাকীত্ব আর স্মৃতির মিছিল এসে চোখের ঘুম কেড়ে নেয়। আজও তার ব্যতিক্রম হয়নি।
মাঝরাত অবধি বিছানায় ছটফট করার পর যখন মাথার ভেতরের যন্ত্রণাটা অসহ্য ঠেকছিল, তখনই একটু উপশমের আশায় পা টিপে টিপে রান্নাঘরে এসেছিল ও। আদ্রিয়ান পাশেই গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন ছিল, তাই ওকে আর জাগানোর প্রয়োজন বোধ করেনি মেহসানা। কিন্তু হুট করে যে আদ্রিয়ান এভাবে ওর পেছনে এসে দাঁড়াবে, তা ও ভাবতেও পারেনি।মেহসানা নিজেকে সামলে নিয়ে আড়ষ্ট গলায় বলল,
– অ্যাকচুয়ালি মাথা যন্ত্রণা করছিল। তাই আর কি!
আদ্রিয়ান কোনো কথা না বলে আরও দু-কদম এগিয়ে এল। মেহসানার কাঁপতে থাকা হাত থেকে কফির জার আর চামচটা আলতো করে নিজের দখলে নিল। ওর শান্ত চোখজোড়া মেহসানার বিবর্ণ মুখের ওপর নিবদ্ধ। আদ্রিয়ান কফির মগে গরম জল ঢালতে ঢালতে নিচু স্বরে বলল,
– আমাকে ডাকা উচিত ছিলো না?
মেহসানা উত্তর দিল না;নিস্পৃহ চোখে আদ্রিয়ানের কফি বানানোর নিখুঁত ভঙ্গি লক্ষ্য করতে লাগল। কফি তৈরি শেষ করে আদ্রিয়ান মগটা মেহসানার ঠোঁটের সামনে ধরল। ধোঁয়া ওঠা কফির সুবাস এক নিমেষে পুরো রান্নাঘরের গুমোট ভাবটা কাটিয়ে দিল। আদ্রিয়ান গভীর চোখে তাকিয়ে আলতো আদেশে বলল,
– সাবধানে, গরম আছে।
মেহসানা মগে ওষ্ঠাধর ছোঁয়াতেই কফির উষ্ণতা ওর ভেতরটা জুড়িয়ে দিল। আদ্রিয়ান নিজের বুড়ো আঙুল দিয়ে মেহসানার কপালে জমে থাকা সূক্ষ্ম ঘামের বিন্দুগুলো মুছে দিয়ে বলল,
– ল্যাম্পপোস্ট হতে পারি বাট হাসবেন্ড হিসেবে খুব বেশি খারাপ হবো না নিশ্চয়ই! সো,ডোন্ট সাফার অ্যালোন। আই অ্যাম অলওয়েজ হেয়ার।
আদ্রিয়ানের যত্নশীল রূপ আর ভরসা জোগানো কণ্ঠস্বর মেহসানার বুকের ভেতরের অবাধ্য যন্ত্রণাটাকে মুহূর্তেই শান্ত করে দিল। কিছু মুহূর্ত স্থবির থেকে একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে জানলার বাইরে দৃষ্টি নিবদ্ধ করল ও।
স্নিগ্ধ রোদ্দুর মুখশ্রীতে খেলা করতেই তন্দ্রাচ্ছন্নতা টুটলো তৃষার। প্রতিদিনের ন্যায় আজও আর্যর নগ্ন বক্ষদেশ বরাবর নিজের অবস্থান টের পেল ও। ঘুম ঘুম চোখে আর্যর মুখশ্রীতে দৃষ্টি বুলিয়েই আলতো করে আর্যর বুক থেকে মাথা তুলতে চাইল, কিন্তু ওঠার আগেই আর্যর শক্ত বাহুডোর ওকে আরও নিবিড়ভাবে নিজের সাথে জড়িয়ে নিল।
আর্য চোখ না খুলেই মুচকি হাসল। ওর গভীর, ঘুম-জড়ানো কণ্ঠস্বর তৃষার কানের কাছে প্রতিধ্বনিত হলো,
– এত সকালে ম্যাডামের কোথায় যাওয়ার তাড়া, শুনি?
তৃষা লজ্জায় আর্যর বুকে মুখ লুকিয়ে মৃদু স্বরে বলল,
– ছাড়ুন না, সকাল হয়ে গেছে।
আর্য এবার চোখ মেলে তাকাল। ওর সেই চেনা, মাদকতাময় দৃষ্টি তৃষার হৃদস্পন্দন বাড়িয়ে দিচ্ছে। তৃষার কপালে আর ওষ্ঠপুটে ভালোবাসার গভীর পরশ এঁকে দিয়ে আজ আর খুব বেশি বাক্যব্যয় না করে আলতো করে ওকে নিজের পাঁজাকোলা করে তুলে নিল। তৃষা চমকে উঠে ওর গলা জড়িয়ে ধরল। আর্য কোনো কথা না বলে, ঠোঁটে চতুর হাসির রেখা ফুটিয়ে তৃষাকে নিয়ে ধীর কদমে ওয়াশরুমের দিকে পা বাড়াল।
সৈকতের এক শান্ত প্রান্তে একাকী দাঁড়িয়ে তৃষা, সমুদ্রের অবাধ্য ঊর্মিমালা ওর পায়ের কাছে এসে ফেনা তুলছে।সারাদিনের ঘুরাঘুরির ক্লান্তি আর ভ্যাপসা গরমে তৃষার কণ্ঠনালী কিছুটা শুকিয়ে আসায় আর্য আর টুইংকেল গিয়েছে ওর জন্য ডাব আনতে। তৃষা একমনে সমুদ্রের রূপ দেখছিল, ঠিক তখনই ওর ঠিক পাশ ঘেঁষে এক জোড়া হাই হিলের খটখট শব্দ কর্ণগোচর হল । এই বালির মধ্যে কার হিল জুতো পরে কার হাঁটার শখ জাগল ভেবে তৃষা কিছুটা বিরক্ত হয়ে পাশ ফিরতেই ওর চোখজোড়া সরু হয়ে এল।
তৃষার মুখের সমস্ত স্নিগ্ধতা মুহূর্তেই উবে গিয়ে সেখানে স্থান নিল তীব্র অসন্তোষ। ওর ঠিক সম্মুখেই সানগ্লাস কপালে তুলে দাঁড়িয়ে আছে মাহেরিন! ওর ঠোঁটে সেই পরিচিত অহংকারী আর বিদ্রূপাত্মক হাসি। তৃষাকে ওভাবে একা দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে মাহেরিন এক পা এগিয়ে এসে বাঁকা স্বরে বলল,
– ওহ হোয়াট আ সারপ্রাইজ! তৃষা না? তা এখানেও একা একা দাঁড়িয়ে সমুদ্রের নোনা জল মাপছ বুঝি? তোমার সেই সো-কল্ড ক্যাপ্টেন হাজবেন্ড তোমাকে এই নির্জন সৈকতে একলা ফেলে অন্য কোথাও হাওয়া খেতে গিয়েছে বুঝি?
মাহেরিনের এই চিরাচরিত সস্তা খোঁচা এবার তৃষার বুকে তীরের মতো বিঁধল না। দিন বদলেছে, তৃষার ভেতরের সেই ভয়ার্ত মেয়েটাও এখন আর্যর ভালোবাসার জোরে অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসী। ও মাহেরিনের চোখের দিকে সরাসরি দৃষ্টি নিবদ্ধ করে অত্যন্ত শান্ত কিন্তু মোক্ষম জবাব দিয়ে বলল,
– গেট আ লাইফ, মাহেরিন! নিজের মেন্টালিটিটা এবার একটু আপগ্রেড করুন। কার বর কাকে কতটা প্যাম্পার করছে, সেটা জাজ করার জন্য নিজের একটা হ্যাপি ফ্যামিলি থাকা দরকার। আমার হাজব্যান্ড আমার ছোট ছোট নিডসগুলো খেয়াল রাখে—এই যেমন এখন আমার জন্য ডাব আনতে গেছে। অন্যের বরের খোঁজ না নিয়ে নিজের এই ফ্রাস্ট্রেটেড লাইফ আর লোনলিনেসটা বরং সমুদ্রের জলে ভাসিয়ে দিন। কাজে দেবে!
তৃষার মুখ থেকে এমন সপাটে এবং যৌক্তিক উত্তর আশা করেনি মাহেরিন। ও রাগে পুরো থমকে গেল, মুখাবয়ব মুহূর্তেই লোহিত হয়ে উঠল। ও দাঁতে দাঁত চেপে কিছু একটা বলতে যাবে, ঠিক তখনই পেছন থেকে ভেসে এলো এক গম্ভীর এবং সুপরিচিত কণ্ঠস্বর,
– এনি প্রবলেম, মিসেস এহসান?
পুনর্বার মাহেরিনের মুখোমুখি হতেই মেজাজ সপ্তমে চড়লো আর্যর। তবে টুইংকেলের নিষ্পাপ মুখশ্রীতে একবার তাকিয়ে ও তৃষার পাশে এসে দাঁড়াল। অনাকাঙ্ক্ষিত আবর্জনার ন্যায় এক ঝলক তাকাতে গিয়েও তাকালো না মাহেরিনের দিকে। আর্য তৃষার দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত যত্নশীল কণ্ঠে বলল,
– এই নাও তোমার ডাব। রোদে মুখটা একদম শুকিয়ে গেছে।
মাহেরিন আর্যর এই অবহেলা সহ্য করতে না পেরে তীব্র আক্রোশে ফুঁসে উঠল। ও দাঁতে দাঁত চেপে তৃষাকে লক্ষ্য করে কিছু একটা বলতে যাবে, ঠিক তখনই আর্যর হাত ধরে থাকা ছোট্ট টুইংকেল নিজের ডাগর চোখ দুটো বড় বড় করে মাহেরিনের দিকে তাকাল। ওর পুতুলতুল্য কপালে কয়েকটা সূক্ষ্ম কুঞ্চন রেখা ভাসিয়ে ছোট্ট স্মৃতির মণিকোঠায় কিছু একটা হাতড়াচ্ছে ও ।
মুহূর্ত কয়েকের ব্যবধানেই ও মাহেরিনকে চিনতে পেরে ঝট করে তৃষার শাড়ির আঁচল টেনে ধরে আঙুল উঁচিয়ে বলল,,
– বানি! বানি! লুক হেয়ার! সি,হু ইজ দিস!
তৃষা ভ্রু জোড়া সামান্য কুঁচকে মেয়ের দিকে তাকাল। টুইংকেল তখন খিলখিল করে হেসে উঠে আর্যর দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত সরল কণ্ঠে আওড়াল,
– পাপা, তুমি চেনো একে? দিস ইজ দ্যাট পচা আন্টি! ও না সেদিন এক বুড়ো দাদুকে সঙ্গে করে নিয়ে আমাদের বাসায় এসেছিল! আন্টি, তোমার সেই দাদু কোথায়?
টুইংকেলের এই অনাবিল, নিষ্পাপ বাচ্চার মুখের চরম সত্য ভাষণে মাহেরিনের পায়ের তলার বালি যেন এক নিমেষে সরে গেল। মাহেরিনের মুখটা মুহূর্তের মধ্যেই লজ্জায় অপমানে নীলচে বর্ণ ধারণ করেছে। তৃষা নিজের হাসির বেগ সামলাতে না পেরে ওড়না দিয়ে মুখ চেপে ধরল। টুইংকেল মাহেরিনের বরের বয়সের বিশাল ব্যবধানটাকে যেভাবে সরল মনে দাদু বলে সম্বোধন করেছে, তা মাহেরিনের অহংকারী হৃদয়ে তীরের মতো বিঁধেছে। আর্যর ওষ্ঠাধরের কোণেও তখন এক চিলতে চতুর-বক্র হাসির রেখা ফুটে উঠেছে, তবে ও নিজেকে সামলে নিয়ে গম্ভীর মুখে টুইংকেলের গালটা আলতো করে টিপে দিয়ে বলল,
– প্রিন্সেস, বড়দের সাথে এভাবে কথা বলতে নেই। চলো, ডাবটা খেয়ে আমরা অন্য পাশে যাই।
আর্য টুইংকেলের হাত ধরে বালুকাবেলা ধরে ধীর কদমে সামনে এগিয়ে গেল। তৃষা ওদের পেছনে যাওয়ার জন্য এক পা বাড়াল, কিন্তু ঠিক মাহেরিনের সমান্তরালে আসতেই ও থমকে দাঁড়াল। মাহেরিনের সেই অপমানে কুঁকড়ে যাওয়া থমথমে মুখের দিকে তাকিয়ে তৃষা নিজের ওড়নার আঁচলটা কাঁধে টেনে নিল। ওষ্ঠাধরের কোণে অবজ্ঞাপূর্ণ হাসির রেখা ঝুলিয়ে ও মাহেরিনের কানের কাছাকাছি সামান্য ঝুঁকে এসে অত্যন্ত শান্ত অথচ গা-জ্বলা তীক্ষ্ণ কণ্ঠে ফিসফিস করে বলল,
ফিরে এসো অনুরাগে পর্ব ৪৮
– বাচ্চার মুখের সত্যি কথাটা বড্ড তিতা লাগল, তাই না মাহেরিন? আসলে পাপ তো আর বাপকেও ছাড়ে না, আর আপনার ক্ষেত্রে সেটা তো দাদু হয়ে ঘরে ঢুকেছে! অন্যের সুখের সংসারে নজর দিতে এসে নিজের এই জরাজীর্ণ কপালটা আর সবার সামনে এক্সপোজ করবেন না। নিজের ওই বুড়ো দাদুর গহনা আর টাকা দিয়ে অন্তত একটা ভালো আয়না কিনুন, যেখানে নিজের আসল চেহারাটা দেখতে পাবেন। গুড লাক উইথ ইয়োর ওল্ড ম্যান!
কথাগুলো শেষ করেই তৃষা আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়াল না। মাহেরিনকে নিজের ভেতরের চরম আক্রোশে একাকী পুড়তে দিয়ে ও দ্রুত পায়ে এগিয়ে গেল আর্য আর টুইংকেলের দিকে ।
