রুপুর বিয়ে পর্ব ৩০
Bobita Ray
রুপুর চাকরি হয়েছে। জয়েনিং লেটার পেয়েছে আরও দুইদিন আগে। অয়নটা এই-তো সেদিন চলে গেল। মনের অবস্থা কারো তেমন ভালো না। রুপু নিজের চাকরির কথা বলে, নতুন করে বাড়িতে অশান্তি বাড়াতে চায়নি দেখে, কাউকে এখনো কিছু বলা হয়নি।
রুপু চাকরি পেয়েছে তৃণমূল পর্যায়ে অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নে নারী উদ্যোক্তাদের বিকাশ সাধন প্রকল্পে। এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য হলোঃ প্রান্তিক ও সুবিধাবঞ্চিত নারীদের দক্ষতা উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং তাদের স্বাবলম্বী করে মানব সম্পদে পরিণত করা। প্রকল্পের প্রধান লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য: দক্ষতা উন্নয়ন।
রুপুর পোস্টিং মফস্বলে হলেও চাকরিটা বেশ পছন্দ হয়েছে।
এই প্রকল্পের আওতায় বিভিন্ন ট্রেডে নারীদেরকে বিনামূল্যে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি ট্রেড হলো:
বিজনেজ ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড ই-কমার্স,
ফ্যাশন ডিজাইন,
ইন্টেরিয়র অ্যান্ড ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট,
ক্যাটারিং বা খাদ্য ব্যবস্থাপনা,
বিউটিফিকেশন।
রুপু ক্যাটারিং-এর ট্রেইনার হিসাবে নিয়োগ প্রাপ্ত হয়েছে। প্রথম পর্যায়ে বেতন ২৩,৫০০ টাকা।
হাতে খুব বেশি সময় নেই। এর ভেতরেই সবকিছু গুছিয়ে নিতে হবে। অবশ্য গোছানোর তেমন কিছু নেই। ভেতরে ভেতরে রুপু খুব ছটফট করছে। চিন্তা হচ্ছে প্রচুর।
অচেনা জায়গা, নতুন পরিবেশ। জায়গাটা রুপুর জন্য কতটা নিরাপদ হবে, কে জানে! চাকরিতে জয়েন করার অন্তত চার/পাঁচদিন আগে চলে যাওয়া প্রয়োজন। সেখানে গিয়ে প্রথমে থাকার ব্যবস্থা করতে হবে। নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিস কিনতে হবে।
একদিন গিয়ে ঘুরে দেখে এলে কেমন হয়? একা একজন মেয়ে মানুষকে আজকাল কেউ আর বাড়ি ভাড়া দিতে চায় না। সবার আগে প্রয়োজন নিরাপদ বাসস্থান।
সবকিছু ছাপিয়ে রুপুর একটু ভয় ভয় করছে। শাশুড়ীমা রুপুর বাড়ির বাইরে গিয়ে চাকরি করার কথা শুনলেই বাড়িতে বিশাল গ্যাঞ্জাম লাগিয়ে দেবে। বিনয়ও হয়তো নানান কৌশলে রুপুকে নিজের কাছে আটকে রাখতে চাইবে।
বিনয়কে মানানো গেলেও শাশুড়ীমাকে এত সহজে মানানো যাবে না। এই সংসারের বাইরে একবার পা রাখলে, হয়তো লোকের কাছে রুপুর নামে কুৎসিত কুৎসিত রটনাও রটিয়ে দিতে পারে শাশুড়ীমা। রুপু দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
এত ভেবে মাথা নষ্ট করে কাজ নেই। যখন যা হবে। তখন দেখা যাবে।
বীথি রানী মেইন দরজা খুলে দিতেই বিনয় একগুচ্ছ তরতাজা গোলাপফুল হাতে নিয়ে হাসিমুখে ঘরে প্রবেশ করল। এতরাতে ছেলের হাতে ফুল দেখে, বীথি রানী ভ্রু কুঁচকে তাকাল। বিরক্তি চাপতে না পেরে বলল,
“আজ কী কোন বিশেষ দিন। এতরাতে ফুল দিয়ে কী করবি?”
বিনয়ের লজ্জা লাগছে খুব৷ বিড়বিড় করে বলল,
“আসলে মা..”
“কী তখন থেকে মিনমিন করছিস। স্পষ্ট করে কথা বল। ফুল দিয়ে এতরাতে কী করবি?”
“রুপু গোলাপফুল খুব পছন্দ করে।”
“তোর বউ ফুল পছন্দ করে দেখেই রাত-বিরেতে একগাদা ফুল আনতে হবে নাকি।”
বিনয়ের মনটা খারাপ হয়ে গেল। সামান্য কয়টা ফুলের জন্য মা এমন করছে কেন। বিনয় বুঝতে পারল না।
“ফুলগুলো একজায়গায় নামিয়ে রাখ। তারপর হাত-মুখ ধুয়ে শিগগিরই খেতে আয়৷”
বিনয় বাধ্য ছেলের মতো বলল,
“আচ্ছা মা।”
বীথি রানী আপেক্ষ নিয়ে বলল,
“তোদের কাউকে কোনদিন দেখলাম না আমার জন্য একটা ফুল আনতে। অথচ…”
খেতে বসে বিনয় মাকে বলল,
“তুমি রোজ রোজ আমার জন্য না খেয়ে থেকো না-তো মা।”
“তো কে বসে থাকবে তোর বউ? হাসালি আমাকে। নবাবের বেটি সেই যে সন্ধ্যারাতে ভরপেট ভাত খেয়ে ঘরে ঢুকেছে। এতক্ষণে বোধহয় গভীর ঘুমে মগ্ন। তাছাড়া আমার অভ্যাস হয়ে গেছে। তুই বাইরে থেকে না আসা পর্যন্ত আমি ভাত খেতে পারি না।”
“শুধু ভাতটাই খান না। তাছাড়া বাকি সবকিছুই তো খান।”
রুপুর কথাশুনে বিনয় বীথি রানী দুজনেই চমকে উঠল। ডাইনিটা এখানে কখন এসেছে। কে জানে! ছেলের কাছে দুটো সুখ-দুঃখের কথা বলেও শান্তি নেই। ডাইনিটা ওঁৎ পেতে থাকে। রুপু চেয়ারে বসে একগ্লাস জল খেল। তারপর বিনয়ের দিকে তাকিয়ে বলল,
“খাওয়াটা শেষ করে দশ মিনিটের ভেতরে ঘরে চলে আসবে। তোমার সাথে আমার খুব দরকারি কিছু কথা আছে। আবার মায়ের ঘরে গিয়ে গল্প করতে করতে ঘণ্টা পার করে দিও না।”
রাগে বীথি রানীর শরীর জ্বলে গেল। চাপা কণ্ঠে গর্জে উঠে বলল,
“এক হাজার কোটিবার আমার ছেলে আমার সাথে গল্প করতে করতে ঘণ্টা পার করবে। তুমি কে মানা করার?”
“একহাজার কোটিবার কেন একশো হাজার কোটিবার আপনার ছেলে আপনার সাথে বসে গল্প করলেও আমার কিছু যায় আসে না। মুশকিল হলো ; আমি আপনার ছেলেকে কথাগুলো বলে শান্তির একটা ঘুম দেব। এইমুহূর্তে ঘুমটা আমার জন্য খুব জরুরি।”
রুপু আর বীথি রানীকে কোন কথা বলার সুযোগ না দিয়ে ঘরে চলে গেল।
বিনয় বেশ বেকায়দায় পড়ল। মায়ের ভাবসাব দেখে তো মনে হচ্ছে না। বিনয়কে সহজে ঘরে যেতে দেবে। রুপুর সাথে জেদ করে একঘণ্টার জায়গায় আজ নিশ্চিত দু-ঘন্টা নিজের কাছে বসিয়ে রাখবে মা। তারপর জুড়ে দেবে সেই ছোটোবেলার বিরক্তকর গল্প৷ একই গল্প বার বার ঘুরে-ফিরে শুনতে শুনতে বিনয় এখন সত্যিই অতিষ্ঠ হয়ে গেছে। তবুও উপায় নেই। এই গল্পগুলো মায়ের মুখে মনোযোগী শ্রোতা হয়ে সারাজীবন শুনে যেতে হবে। মাকে কোনভাবেই কষ্ট দিতে পারবে না বিনয়।
মা রুপুর সাথে জেদ করে একঘণ্টার জায়গায় পাক্কা তিনঘণ্টা বিনয়কে নিজের ঘরে বসিয়ে রেখে নানান রকম গল্প ফেঁদে বসল৷ বিনয়ের মন পড়ে আছে রুপুর কাছে৷ বিনয়ের খুব হতাশ লাগছে। ইচ্ছে করছে রুপুর কাছে ছুটে যেতে। বাবাকেও আশেপাশে দেখা যাচ্ছে না। নিশ্চিত ছাদে বসে সিগারেট খাচ্ছে।
বিনয় রাত বারোটা এগারো মিনিটে ভয়ে ভয়ে ঘরে এলো। ঘরের লাইট অফ করা। বিনয় লাইট জ্বালানোর সাহস পাচ্ছে না। রুপু কী ঘুমিয়ে গেছে? আবছায়া অন্ধকারে দেখে বোঝা যাচ্ছে না। বিনয় খাটের সামনে দাঁড়িয়ে মৃদু স্বরে ডাকল।
“রুপু রুপু এই রুপু?”
“ভূতের মতো এখানে দাঁড়িয়ে না থেকে ঘরের লাইট জ্বেলে দাও।”
বিনয় ঘরের লাইট জ্বেলে দিল। বলল,
“তুমি এখনো ঘুমাওনি?”
রুপু খাটে পা দুলিয়ে বসল। বলল,
“দেখতেই যখন পাচ্ছ৷ শুধু শুধু প্রশ্ন করা কেন? যাইহোক আমার খুব দরকারি কিছু কথা আছে। আশা করছি, কোনরকম চিল্লাফাল্লা না করে কথাগুলো খুব ঠাণ্ডা মাথায় মনোযোগ দিয়ে শুনবে। শোনার পর তোমার মতামত আমাকে জানাবে। এখন অবশ্য না জানালেও চলবে।”
বিনয় ভয়ে ভয়ে বলল,
“কী কথা বলো?”
“আমি সেপারেশনে যেতে চাচ্ছি।”
বিনয়ের বুকের ভেতরে মোচড় দিয়ে উঠল। মুখটা রক্তশূণ্য হয়ে গেল। মাথা ভো ভো করছে। কোনকথা বলতেই পারল না। রুপু বলল,
“তোমার কী কোন প্রশ্ন আছে?”
বিনয় হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়ল।
“চুপ করে বসে না থেকে বলে ফেলো।”
বিনয়ের বুকের ভেতরে প্রবল ঘূর্ণিঝড় শুরু হয়েছে। চোখ দিয়ে টপটপ করে নোনাজল গড়িয়ে পড়ছে। ইচ্ছে করছে চিৎকার করে কাঁদতে। কান্না চেপে রাখতে কী যে কষ্ট হচ্ছে বিনয়ের তা শুধু বিধাতা জানেন। বিনয় বহুকষ্টে ভেঙে ভেঙে কয়েকটা শব্দ উচ্চারণ করল।
“হঠাৎ করে এই সিদ্ধান্ত কেন?”
“এই সিদ্ধান্ত আমি অনেকদিন আগেই নিয়েছি। শুধু তোমাকে এখন জানালাম।”
“আমার অপরাধ কী?”
“সত্যিই কোন অপরাধ নেই তোমার?”
বিনয় চোখের জল মুছে বলল,
“আমার জানামতে না।”
রুপু দীর্ঘশ্বাস ফেলল। বলল,
“তুমি যদি অবুঝ হতে তোমার চোখে আঙুল দিয়ে তোমার ক্রটিগুলো দেখিয়ে দিতাম৷ তোমার মতো বুঝমানকে কী করে বোঝাই বলতো? যাইহোক শুধু আজরাতের ঘটনাটাই যদি বলি, তুমি আমার জন্য এত আশা করে গোলাপফুল কিনে আনলে। সেই ফুলগুলো তুমি আমার হাতে দেওয়ার আগেই তোমার মা নষ্ট করে ফেলল। তুমি দেখেও কিছু বললে না। তুমি যখন ভাত খেতে বসলে, তোমাকে আমি বলে এলাম, তোমার সাথে আমার খুব দরকারি কিছু কথা আছে। তুমি আমার কথা শুনলে কিন্তু পাত্তা দিলে না। প্রতিদিনের মতো মায়ের আবদার মিটাতে আজও মায়ের ঘরে বসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা পুরোনো দিনের গল্প শুনলে। খুব কী ক্ষতি হতো। আজ মায়ের গল্প না শুনে একটু আগে আগে ঘরে এলে আসলে।
এটা তো মাত্র একটা-দুটো অভিযোগ। এইরকম অজস্র অভিযোগ তোমার বিরুদ্ধে বলতে পারব আমি৷ আজ তোমাকে একটা সত্যি কথা বলতে খুব ইচ্ছে করছে। হয়তো বিশ্বাস করবে না। হাজার হলেও মায়ের অন্ধভক্ত ছেলে তো। বিয়ের প্রথমদিকে আমিও তোমার জন্য না খেয়ে অপেক্ষা করতাম। তুমি আসার পরে একসাথে খাব বলে। তোমার মা কী করতো জানো? তুমি যখন ঘরের কাছাকাছি চলে আসতে তোমার মা ইচ্ছে করে আমাকে কাজের কথা বলে রান্নাঘরে পাঠাতো। তারপর তোমাকে নিয়ে তাড়াহুড়ো করে খেতে বসতো। তোমাকে ঘটা করে বলতো, তোর বউ-তো একদম খিদে সহ্য করতে পারে না। আমিই বললাম, বিনয়ের জন্য শুধু শুধু অপেক্ষা না করে খেয়ে নাও। অমনি তোর বউ খেতে বসতো।”
আমি যখন কাজ শেষ করে এসে দেখতাম, তোমাদের খাওয়া প্রায় শেষের দিকে। আমার খুব খারাপ লাগত। সৌজন্যেতা করে হলেও তো আমাকে একবার বলা উচিত ছিল। রুপু তুমি কী ভাত খেয়েছ? না খেলে শিগগিরই আমাদের সাথে খেতে বসে যাও। অথচ তুমি বলতে উল্টো কথা। হাসিমুখে বলতে,
“রুপু তুমি ঘরে যাও। আমার আসতে দেরি হবে।”
প্রথমদিন তোমার মায়ের চালাকি ধরতে পারলাম না। দ্বিতীয়দিন যখন ধরতে পারলাম। তখন থেকেই তোমার জন্য আর না খেয়ে অপেক্ষা করা বাদ দিয়ে দিলাম।”
রুপুর কথা বিনয়ের পুরোপুরি বিশ্বাস হলো না। আবার অবিশ্বাসও করতে পারল না। বিনয় মলিন কণ্ঠে বলল,
“তুমি কতদিনের জন্য আলাদা থাকতে চাচ্ছ?”
“সঠিক বলতে পারছি না।”
“তুমি কী তোমার বাবার বাড়িতে যাবে?”
“না।”
“তাহলে কোথায় যাবে তুমি?”
“আমার একটা চাকরি হয়েছে। পোস্টিং হয়েছে মফস্বলে। আপাতত সেখানেই চলে যেতে চাচ্ছি।”
বিনয় আশ্চর্য হয়ে গেল। অস্ফুট স্বরে বলল,
“কবে, কখন, কিসের চাকরি হয়েছে তোমার?”
“একটা প্রকল্পে চাকরি হয়েছে।”
“তোমার চাকরি করার দরকার নেই।”
রুপু হেসে ফেলল। বলল,
“যে বর ইনকাম করা সত্বেও নিজের বউয়ের ছোট ছোট আবদার পূরণ করতে পারে না। মায়ের সাথে যুক্তি করে যে আমাকে হাতখরচা বাবদ কোন টাকা দেয় না। টিউশনি করিয়ে আমাকে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে হয়। সে আজ বলছে, তোমার চাকরি করার দরকার নেই। কোন মুখে বললে তুমি কথাটা।”
বিনয় খুব অসহায় বোধ করছে। রুপুর প্রত্যেকটা কথা ছুরির ফলার মতো বুকে বিঁধছে। রুপু বলল,
“আমি পরশুদিন চলে যাব।”
বিনয়ের মুখটা শুকিয়ে গেল। কোন যাদুবলে রুপুকে নিজের কাছে আটকে রাখা যাবে। ইশ, বিনয় যদি জানতে পারতো। বিনয় বলল,
রুপুর বিয়ে পর্ব ২৯
“তোমার বাবা-মা কী তোমার সিদ্ধান্তের কথা জানে?”
“এখনো জানে না। আশা করছি আগামীকালকের ভেতরেই জেনে যাবে।”
“আমি কী তোমার কাছে যেতে পারব।”
“অবশ্যই যেতে পারবে। কিন্তু আমার মনে হয় না। তোমার মা এত সহজে আমার কাছে যেতে দেবে।”
“কিসের শাস্তি দিচ্ছ তুমি আমাকে? আমি তোমার সব চাহিদা পূরণ করব। আমাকে শেষ একবার সুযোগ দাও। প্লিজ রুপু।”
“তোমাকে সুযোগ দিতে গিয়ে চাকরিটা শুরু করার আগেই ছাড়তে পারব না আমি। দুঃখিত।”
