Home হৃৎস্পন্দন হৃৎস্পন্দন শেষ পর্ব 

হৃৎস্পন্দন শেষ পর্ব 

হৃৎস্পন্দন শেষ পর্ব 
সাঞ্জেনা শাজ

ঢাকার নামীদামী এক রেস্টুরেন্টে কারো তীব্র অপেক্ষায় বসে আছে এক নারী। খুব কাছের কোন মানুষের জন্য যে এতটা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতে হবে কখনো, তা কল্পনাতীত ছিলো রমনীর নিকট। অবসাধগ্রস্থ চেহারাটা মলিনতায় ছেয়ে। দু’চোখের নিচে আঁধার।
সময় ফুরোলেও চোখ মুখে বিরক্তির লেষ মাত্র দেখা যায় না নারীর। যেন, তিনি এটারই যোগ্য! প্রাপ্য! খুব আকুতি মিনতি করে কাঙ্খিত মানুষটার সাথে দেখা করার সুযোগ পেয়েছে সে। সেই মানুষটার জন্য ঘন্টা কেন সারাদিনও অপেক্ষা করতে রাজি সে।

আরও বেশ কিছু সময় অতিবাহিত হওয়ার পর টেবিলের মুখোমুখি চেয়ারে কারো উপস্থিতি পেয়ে ঘার বাকিয়ে সামনে দৃষ্টিপাত করলো রীমা বেগম। চোখের তারায় স্বস্তি নেমে এলে যেন। নাহ, শেষ পর্যন্ত লোকটার দেখা পেলো সে! তা-ও এতো অপেক্ষার পর। নিজের উপর তাচ্ছিল্য হাসি আসলো রিমা বেগমের। একটা সময় যে মানুষটা তার কথায় দুনিয়া উলোট পালোট করতো আজ তার চোখে নিতান্তই তুচ্ছ সে। আর এটাই তার কৃতকর্মের ফল।
“আসলে তুমি! আমি ভাবলাম, আজও ফিরিয়ে দিবে বুঝি আমায়।”
শায়ান তালুকদার টেবিলের পাশের কাচ গলিয়ে বাহিরে দৃষ্টিপাত করলেন। এই মেয়ের চেহারা তার দেখতে ইচ্ছে করে না। রুচিতে বাধে। প্রশ্নের প্রতিউত্তর করার প্রয়োজন বোধ টুকু করলো না সে। চেহারায় গাম্ভীর্যতা বজায় রেখে ইগনোর করলো সামনের প্রতারক নারাইটিকে।
সে এখানে কিছুতেই আসতে চায় নি। মেহরাদ বলাতে আসতে হয়েছে। না-হয় এরকম ঠক প্রতারদের কাছ থেকে দূরে থাকাই কল্যানকর।

শায়ান তালুকদারের অবগ্যার দৃষ্টি দেখে রিমা বেগমের মনটা আরও মুষড়ে উঠলো। এতটাই জঘন্য বুঝি সে! তার দিকে তাকাতে পারছে না অব্দি! কন্ঠ ধরে আসলো তার। জানতে চাইলো,
“আমি কি এতটাই ক্ষমার অযোগ্য? একটাবার ফিরে তাকানো যায় না? ক্ষমা করা যায় না?”
“অসম্ভব। এ ছাড়া ভিন্ন কিছুর বলার থাকলে বলো। আমার হাতে সময় নেই।” কাটকাট জবাব শায়ান তালুকদারের।
“শায়ান? একটা বার তাকাও আমার দিকে? এতো ভালোবাসা কোথায় তোমার? তোমার জন্য আমি আমার পরিবার ছেড়ে ছিলাম, সেই তুমিই আমার সাথে এরকমটা করতে পারছো? একটা সুযোগ কি দেওয়া যায় না? ‘ ‘ কান্না বিজোড়িত কন্ঠে শুধালো তিনি।
শায়ন তালুমদারের মুখশ্রী আরও কাটকাট হয়ে উঠলো।শান্ত স্বরে শেষ বারের মতো জানালো,
“ভুলের ক্ষমা হয়, অন্যায়ের না। জেনে-বুঝে কাউকে ঠকানো এটা কিছুতেই ভুল হতে পারে না। তাই আমারও ক্ষমা করার কোন প্রশ্নই আসে না। খুব শিগগিরই ডিবোর্স এর লাস্ট হিয়ারিং। এ বিষয়ে দ্বিতীয় কোন কথা আমি শুনতে চাই না।ব্যাস।”

“তাহলে কেন দেখা করতে রাজি হলে? একটু কি সহানুভূতি দেখানো যায় না? আমার দিকটাও শুনো?”
“মেহরাদ বলেছিলো তাই এসেছি। নাহয় সবসমের মতোই এবারও ইগনোর করতাম।
” ওহ, এখানেও বুঝি মেহরাদের মর্জি মতো সব? ”
“ইয়্যু ক্যান সে দেট!” নির্লিপ্ত কন্ঠ ভদ্রলোকের।
“মেহরাদ যেহেতু পাঠিয়েছে নিশ্চয়ই কোন উদ্দেশ্য নিয়ে পাঠিয়েছে? কি সেটা? শুভ্রতা নয় তো?”
“সবাইকে নিজের মতো ভাবার কোন প্রয়োজন নেই। আসছি। ” বলেই উঠে চলে যেতে নিলো তিনি।
রিমা বেগম আটকালেন। তারা এতো ভালো হলে রায়হানের সাথে এরকমটা কেন করলো ওই ছেলেটা? কিছুটা তেজী স্বরেই জিজ্ঞেস করলেন,
“তোমরা তালুকদাররা এতো ভালো হলে, আমার রায়হানের সাথে এরকমটা করলো কেন মেহরাদ? ছেলেটাকে দেশ থেকে বিতারিত করে ছেরেছে। পলাতক হয়ে গা ঢাকা দিয়ে রেখেছে দেশের বাহিরে। ওর দোষটা কোথায়? বিনা অপরাধে ছেলেটাকে পুরো এক সপ্তাহ হাসপাতালে বেডে কাতরাতে হয়েছে। কি ছিলো ওর অন্যায়? ”
“যে যেমন তার সাথে আমরা তেমনই। হি ডিজার্ভ ইট। মেহরাদকে মারারা সুপারি দিয়েছিলো বেয়াদবটা। আর কন রিজন প্রয়োজন? ”

“কিন্তু ওর লোকেরা তো কিছুই করেনি। সেটা জেনেও কিভাবে পারলো ছেলেটার সাথে এরকম করতে? আমার ভাইয়া ভাবির কাছেও আমার মুখটুকু বাচাতে দিলে না। নিজেও শেষ সুযোগ দিচ্ছো না? আমার কি অবস্থা জানো?” কথা শেষে কন্ঠ ভেঙে আসে রিমা বেগমের। কি যে আকুতি!
“আগ্রহ বোধ করছি না।”
“শায়ান! প্লিজ! একটাবার সুযোগ দাও? আমি শুভ্রতার সাথে দেখা করতে চাই….”
“শাট আপ! ” বজ্র কন্ঠে ধমকে উঠলেন শায়ান তালুকদার। রিমা বেগম ভরকে উঠে সিটিয়ে গেলেন স্বামীর অদেখা রূপ দেখে। বিয়ে ভালোবাসার জীবনে এতটা কঠোর স্বামীকে কখনোই পায়নি সে। বুঝলো মানুষটা অতুলনীয় কষ্ট পেয়েছে তার কাজে। বিষন্ন দু চোখে অশ্রুরা ঢেউ তুললো।
এদিকে শায়ান তালুকদার ফুসছেন। তার কাছে এসব মেলো ড্রামা ব্যাতিত কিছুই না।সে ক্রোধান্বিত দৃষ্টিতে কঠোর হুশিয়ারি দিয়ে জানালেন,

“এ কাজ ভুলেও করবে না। মেহরাদ কোন পরিচয়ের ধার ধারবে না তাহলে। মেয়েটাকে বহু কষ্ট দিয়েছো। আর সেই চিন্তারও দুঃসাহস দেখাবে না। আমি সঠিক বাবা হয়ে তোমার মতো নামের মা’কে আটকাতে না পারলেও মেহরাদ একজন আদর্শ স্বামী। ওর থাবা থেকে কিছুতেই বাচবে না। কোন সিমপ্যাথিও না। মাইন্ড ইট!”
” আমায় ভয় দেখিও না, শায়ান। আমি সেরকম কিচ্ছুই করবো না। আমি শুধু একটা বার ক্ষমা চাইবো মেয়েটার কাছে। ” কান্না গিলে বলে উঠলো রিমা বেগম।
শায়ান তালুকদার আর কিছু বলতে সময় দিলেন না। একিই সুরে হুশিয়ারি দিলেন,
“চেষ্টাও করো না। মেহরাদ হতে দিবে না। ”
“শায়ান প্লিজ! একটু ব্যাবস্থা করে দাও…আমার যে নিজেকে অসহায় মনে হহ! আমি এতো বোজা নিয়ে কিভাবে বাচবো বলো? একটু তো ক্ষমা পেতে দাও? ”

“তোমার এসব নাটক ছাড়া কিছুই মনে হচ্ছে না আমার। আজকের পর দ্বিতীয় বার আমাদের আর দেখা না হোক। আল্লাহ হাফেজ।” কাটকাট কন্ঠে বলেই উঠে রেস্টুরেন্ট ছেড়ে বেরিয়ে আসলেন শায়ান তালুকদার।
পুরো মুখশ্রী জুড়ে উপচে পড়া গাম্ভীর্য। ভেতরের অভিব্যক্তি বোঝা দায়। তবুও এতটুকু বুঝা যায়, তিনি তার সিদ্ধান্ত থেকে একধাপও পেছাবেন না। যাদেরকে ভালোবাসা হয় বেশি তাদের দেওয়া আঘাত গুলো ক্ষতবিক্ষত করে বেশি। সেই ঘা এতো সহজে সাড়ে না।
রিমা খান জলজ চোখে স্বামীর যাওয়ার পানে তাকিয়ে। ভেতর থেকে করুন আর্তনাদ বেরিয়ে আসতে চায় তার।জীবনের এ পর্যায়ে এসে যে এতটা বাযে অবস্থায় পড়তে হবে তার কল্পনার বাইরে ছিলো। কোথায় তার ব্যাক্তিত্ব এখন? কোথায় তার ভালোবাসার অহংকার!
এতদিন যা-ই করতো, শায়ানের ভালোবাসা তার জন্য খুটি স্বরূপ ছিলো। কিন্তু আজ যে লোকটা এভাবে ফেলে রেখে চলে যাবে সেটা সে কখনো ভাবেই না। মানুষটা যেমন ভালোবেসে ছিলো তেমন শাস্তিও দিচ্ছে। কঠোর শ্বাস্থি। যে শাস্তিতে ভালোবাসার ছিটেফোঁটা নেই। কেবল আছে রিমা নামক প্রতারক নারীর প্রতি ছিঃ, চিৎকার, ঘৃনা। আর একঢালা তাচ্ছিল্য। আজ থেকে তার কিছুই রইলো না। না ঘর, না বর। সে এখন নিঃস্ব।

“আমার আপনি ছাড়া দ্বিতীয় কোন নারী আমার জীবনে নেই, ছিলোও না। আমার মা ছিলো একজন যাকে হাড়িয়ে প্রথম নিঃশ্ব হয়েছিলাম আমি। কিন্তু আপনাকে ভালোবেসে নিজেকে কেন যেন পরিপূর্ণ মনে হতে লাগলো! আপনার গালের তিলটা আমাকে একবার, দু’বার বারবার আপনার দিকে তাকাতে বাধ্য করে। প্রেমে ফেলতে মরিয়ে হয়ে উঠে। সারাদিন বাউন্ডুলেপানা করে নীরবে আপনার কোলে মাথা রাখতে ইচ্ছে করে। আপনি সে, যার জন্য আমি আমার মা’য়ের কবরের পাশে বসেও হাউমাউ করে কান্না করছি। এগুলো শুনতে হয়তো ক্রিঞ্জি লাগতে পারে আপনার, কিন্তু বিশ্বাস করুন? আপনার অপছন্দের বেয়াদব ছেলেটাও আপনার জন্য মোনাজাতে কেদেছে । আফসোস! তবুও আমি আপনার ফার্স্ট চয়েজ হতে পারলাম না। এ ব্যার্থতা কি দিয়ে লাঘব করবো আমি? আমার ভেতরের দহন গুলো কাকে দেখাবো? বাহিরের এ যন্ত্রণা নিতান্তই তুচ্ছ সে দহন থেকে। অতিমাত্রায় মলিন।”
একনাগাড়ে কথা গুলো বলে আকাশের দিকে তাকিয়ে ব্যাথাতাতুর দীর্ঘশ্বাস ফেললো দ্বীপ। কথার ফাঁকে ফাঁকে মাঝেমধ্যে কণ্ঠনালী কেপে উঠেছে বার কয়েক। সন্ধ্যার নীঝুম নীরবতা ছাপিয়ে ও করুন দীর্ঘশ্বাস শান্তার ভেতরে অজানা এক অপরাধের প্রলয়ঙ্কারী ঝড় তুলেছে।

মেয়েটা হাতের তালুতে মুখ চেপে নীরবে অশ্রু বিসর্জন দিচ্ছে। কিছুক্ষণ আগেই দু’জোড়া অপ্রকাশিত প্রেমিক যুগোলের বিবাহ কাজ সম্পন্ন হয়েছে তালুকদার বাড়ির ড্রয়িংরুমে। ভাইয়ার উপর শান্তার অগাধ বিশ্বাস ছিলো। সে জানতো তার ভাই একটা কিছু না কিছু করবেই। তাই হুট করেই বিয়ের সংবাদ পেয়ে সে ঘাবড়াতে গিয়েও ঘাবড়ায়নি। সকলের ইচ্ছে মতোই সেজেছিলো একটু করে। সে আর সোহানা দু’জনকেই একসাথে নতুন কাপড় পরিয়ে সাজিয়ে নিয়ে আসা হয়েছিল সকলের সামনে।
ড্রয়িং রুমে তখন গুরুজন হতে সকল সদস্যদের উপস্থিতি। একে একে সকলকে ছাপিয়ে সে যখন ছেলেটার দিকে তৃষ্ণার্ত দৃষ্টি মেলে ধরলো, তখন কি যে এক হাহাকার টের পেলো বুকের মাঝে! তার দুনিয়ায় তোলপাড় হলো কয়েক সেকেন্ডের জন্য।দ্বীপের কপলে কিছুটা শুকনো ক্ষত, হাতে ব্যান্ডেজ। চেহারা যেন ক্লান্তি অসুস্থতার ভারে কাহিল।

সেই থেকে যে মেয়েটা নীরবে অশ্রু বিসর্জন দিতে শুরু করলো! তার দ্বারা এখনো অব্যাহত। দ্বীপের এক্সিডেন্ট এর কথা শুভ্রতাদে কাউকেই জানানো হয় নি। শান্তাকেও না। তার ভেতরটা দ্বীখন্ডিত হয়ে যাচ্ছে ছেলেটার হাল দেখে। বিয়ে পড়ানোর পর সকলে মাগরিবের সালাত আদায় করতে মসজিদে যেতেই দ্বীপ বের হয়ে যেতে নিয়েছিলো বাড়ি থেকে। শুভ্রতাকে বলে দ্বীপকে ছাদে পাঠাতে বলেছিলো। ছেলেটা আসেনি তখুনি। সে সময় গড়িয়ে এশার আজান পরছে চারিধারে। বাড়িতে তখনও আদনানদের বাড়ির মেহনান আর দ্বীপের বাবা উপস্থিত।
তালুকদাররা জানিয়েছেন, মেয়েদের আকদ এখন করিয়েছি ঠিক’ই কিন্তু এতো শিগগিরই শিশুড় বাড়ি পাঠাবেন না মেয়েদের। এ চিন্তা যে এখন কেউ না করে। সকলে হাসি মনেই তা মেনে নিয়ে শুভ কাজ সম্পূর্ণ করেছে।
বিস্তৃত রাতের আককশের পূর্নিমার চাদটা বিশাল ও রহস্যময় রাতের আকাশের এক চিরন্তন জাদুকর যেন। মায়াবী আলোয় বুক পেতে দেওয়া আকাশের নিচের সবটুকু কষ্ট দুঃখ যাতনা আজ যেন শান্তার কাধে ভরেছে। মেয়েটা ফুপিয়ে উঠছে ক্ষনে ক্ষনে। কান্নার তোপে প্রকম্পিত হচ্ছে ছোট্ট দেহখানা।
চাদের মায়াবী নরম আলোয় স্পষ্ট তা দ্বীপের দু’চোখের তারায়। ছেলেটা বেশিক্ষণ তাকায় না এতদিনের কাঙ্কখিত বউটার দিকে। তার ভেতরটা বিষিয়ে আছে বিষ বিরহের যাতনায়৷ সেই সাথে মেয়েটার পাল্লা দিয়ে বাড়রে থাকা কান্নার তোপ যেন আরও ছিন্নভিন্ন করে দিচ্ছে ভেতরটাকে।

শান্তা নিজেকে সামলাতে চায়। ছেলেটার এ হাল দেখে ছুটে ছেলেটাকে বুকে আগলে নিতে ইচ্ছে করছে তার। নিজ দু’হাতের সেবা শুস্রসায় সুস্থ করে দিতে মন চাইছে। চুটকিতে সব সারিয়ে দিতে মন চাচ্ছে।কিন্তু তার দ্বারা কিচ্ছু হয়না। কিছছুটি না। কেবল অশ্রুর প্লাবনে চিবুক ভিজে মেয়েটার। দ্বীপের একেকটা কথা ভেতরে তীরের মতো এসে বিধছে। ক্ষতবিক্ষত করে দিচ্ছে অন্তঃস্থল।
মেয়েটা সময় নিয়ে প্রকম্পিত গলায় দ্বীপ কে জিজ্ঞেস করে,
“আ’ম সরিহ। আ..আমার জন্য তোমার এতো কষ্ট পেতে হচ্ছে তাই না! আমি একদম ভালো না, একটুও না। কিন্তু বিশ্বাস করো? এ দুনিয়ায় নিয়ম, নিতী, সমাজকে পায়ে ঠেলে আমি কেবল তোমার মায়াতেই জড়িয়েছি। তোমার পাগলামোতে নিঃশ্ব হয়েছি। আমি কখনো ভাবিনি সকলে এতো সহজে মেনে নিবে সকলটা, ভাইয়া পাশে থাকবে!
তাহলে তোমায় একটুও কষ্ট পেতে দিতাম না। নিজেকেও এভাবে তিলে তিলে শেষ করতাম না। আ…আমার প্রতি যতো খুশি রাগ দেখাও, অভিমান করো কিন্তু কখনো আমায় ভালোবাসা বন্ধ করো না দ্বীপ! আমি ম’রে যাবো। একদম ম’রে যাবো। তোমার ভালোবাসাকে ভালোবেসেছে আমি, সেই ভালোবাসা না থাকলে আমি কি করে বাচবো বলো? ” কান্না বিজড়িত আকুতি ভরা কন্ঠ মেয়েটার।

দ্বীপ একদৃষ্টিতে তাকিয়ে তখনো। তার সিনিয়রের ভালোবাসার কথা সে জানে। হাসপাতালে মেহরাদ ভাইয়ের কথা থেকে কিছুটা আন্দাজ পেয়েছিলো। এখন বউ নামক ভালোবাসাটার সরল স্বীকারোক্তিতে অভিমানী অস্থির মনটা ক্রমান্বয়ে পুলকিত হচ্ছে তার। ভোরের শিশির মিশ্রিত প্রস্ফুটিত ফুলের মতোই মনটা শীতল সতেজতায় ভরে উঠছে।
ছাদের কার্নিশ সমেত রেলিং এ হেলান দিয়ে ছিলো ছেলেটা। প্রেয়সীর কান্না থামানোর প্রয়াসে ক্রন্দনরত রমনীর দিকে কদম বাড়ালো সে। দ্বীপের উপস্থিতি সন্নিকটে অনুভব করে দৃষ্টি উচিয়ে চাইলো মেয়েটা। সিক্ত দৃষ্টিজোড়া মেলে ধরে সদ্যে স্বামী নামক পুরুষটার দিকে। আবারও অপরাধবোধে দু ঠোঁটে ভেঙে আসতে চায় মেয়েটার। সহসাই দ্বীপের গম্ভীর কন্ঠের আদেশ ভেসে আসে,
“চোখ মুছুন? এক্ষুনি মুছবেন। আপনায় ভালো না বেসে আমি খুব বাচতে পারবো মনে হচ্ছে! বাচতে পারলে কি এভাবে হাত গলায় ঝুলিয়ে ঘুরতে হতো এখন! শালার, বাসর রাত পেরিয়ে যাচ্ছে, না পেলাম রুম এখনো আর না পেলাম বউয়ের আদর। ছেহ….”

দ্বীপের বিরক্তিমাখা শেষাংক্ত বাক্যে কান্না ভুলে ড্যাবড্যাব করে দ্বীপের দিকে তাকিয়ে রইলো শান্তা। ছেলেটা কি বললো এই মাত্র!! একটু আগে না কতো ইমোশনাল কথা বললো! শান্তাকে বার বার অপরাধীর কাঠ গড়ায় দাড় করিয়ে আগুনে পুড়ালো! এখন! পুরোই কন্ঠ চেঞ্জ! কি ধড়িবাজ ছেলে! যে-ই সে ভালোবাসার স্বীকারোক্তি দিলো অমনি সব সেট!
শান্তার আশ্চর্যের গোলগাল চাহনি দেখে দ্বীপ আবারও আগের ফর্মে ফিরে আসলো। তার বরাবরই লজ্জাসজ্জা কম। না হলে এভাবে সিনিয়রকে পটাতে পারতো! এক হাতে কাধে ঝুলিয়েই গা ঝাড়া দিয়ে কন্ঠে বিরক্তি ঢেলে বলল,
“আপনার এতটুকু স্বীকারোক্তির জন্য ম’রতে ম’রতে বেচে এসেছি আমি। একবারে কবরে চলে গেলে বলতেন!? এমন প্রেম আমি কোথাও দেখি নাই। একটু বিশ্বাস করা যেতো না আমায়? ভালোবাসি কথাটা একবার মুখ ফুটে বলা যেতো না? আমি কি এতটাই অযোগ্য? না-কি আপনাদের পরিবারটাকে জল্লাদ মনে হয় আপনার?”
“আমার পরিবার টানছো কেন, আশ্চর্য! তুমি অযোগ্য সেটাই বা কখন বললাম? তবুও সমাজ কি এটা মেনে নিবে? সকলে সামনা-সামনি ভালো সাজলেও পিছনে ঠিকিই সমালোচনা করবে। আমি ওটারই ভয় পেয়েছিলাম।” মেয়েটার মিইয়ে আসা কন্ঠস্বর । কুটিল মানুষদের নিয়ে তার বরাবরই আতংক বেশি কাজ করে।
দ্বীপ বুজে আসার কন্ঠের পাছে গাঢ় স্বরে শুধায়,

“এখন নেই?” দৃষ্টি স্থীর শান্তার দিকেই।
প্রাগাঢ় সে চাহনির পাছে শান্তার চোখ আরও খানিকটা নমিত হয়ে আসে। ধীর স্বরে স্বীকারোক্তি দেয়,
“আছে, তবে তোমাকে হাড়ানোর চেয়ে বেশি না।”
দ্বীপের চোখে প্রাপ্তির হাসি। অধর বেকে যায় পূর্নতার ঢেউয়ে।এতো আদুরে মেয়ে হয়! কি সুন্দর, বারবার স্বীকারোক্তি দিচ্ছে! তার তো দুটো গাল ধরে ঠেসে চুমু খেতে ইচ্ছে করছে। লাজুক মুখশ্রীটা দু হাতের আজলায় ভরে আদরে ভরিয়ে দিতে মন চাচ্ছে। কিন্তু তার তো হাত ভালো না। ইশশ,আবারও নিজের অপারগতা মাথায় আসতেই মস্তিষ্ক চিড়বিড়িয়ে উঠলো তার। গলায় ঝুলানো আর্ম স্লিং খুলে ফেলতেই যাবে, শান্তা আতংকিত চেচিয়ে শুধালো,
“একি করছো? এটা খুলছো কেন? ব্যাথা পাবে না? পাগল হলে?”
“কোন ব্যাথা ট্যাথা পাবো না। ছাতার মাথাটার জন্য আপনায় একটু আদর করতে পারছি না। এই যে এতো সুন্দর ভালোবাসার স্বীকারোক্তি দিচ্ছে পুরুষ্কার না পেলে দ্বিতীয় বার আর আগ্রহ দেখাবেন? উঁহু, দেখাবেন না তো। আমাকে পুরুষ্কৃত করতে দিন আপনায়। ”
মেয়েটা ওর পাগলামোতে হকচকিয়ে পিছিয়ে গেলো দু’কদম। কি পাগলামু কথাবার্তা এসব! আদরও পুরষ্কার হয় কখনো!

আর্ম স্লিং খুলেই ফেললো অধৈর্ ছেলেটা। চোখ মুখ খিচালো একটু ব্যাথায়। তবুও গমগমে পায়ে মেয়েটার দিকে এগিয়ে যেতেই শান্তার বিস্মিত ভাব কাটলো। কিন্তু কিছু বুঝে ওঠার আগেই নিজেকে আবিষ্কার করলো দ্বীপের বুক্ষস্থলে। ভাঙা হাতের পাজরে আর হাত দিয়ে ঠেসে আকিড়ে ধরে রেখেছে মেয়েটাকে।
শান্তার হৃৎপিণ্ডটা বোধহয় ফেটে বেড়িয়ে আসার যোগার। দুটো চঞ্চল হৃৎস্পন্দনের সংস্পর্শে দু’দেহের মন আকাশে যেন আতশবাজির ঝলকানি বয়ে বেড়াচ্ছে। তীব্র রক্তস্রোতের প্রবাহ মস্তিষ্ক জমাট বাধিয়ে দিয়েছে বোধহয়! কোন ক্রিয়া প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারছে না মেয়েটা।কেবল অনুভব করলো দ্বীপের অস্থির ব্যাকুল কন্ঠের বাক্যাংশ,
“আপনায় খুব ভালোবাসি সিনিয়র । এতটাই যে এর পরিমাপের যন্ত্র এ দুনিয়া আবিষ্কার করতে অক্ষম। যে সমাজ, সমাজের মানুষ আমার স্ত্রীকে, আমার সিনিয়রকে কষ্ট দিবে, ভয় পাওয়াবে সে সমাজকে ভেঙে নতুম করে গড়বো আমি, যেন আমাদের মতো শত শত শান্তা দ্বীপের ভালোবাসার পূর্নতা পায়। ধুকে ধুকে বাচতে না হয়। আপনার প্রতি ভালোবাসা ফুরানোর আগে আমার নিশ্বাস ফুরিয়ে যাক। মৃত্যু হোক এই অদমের। আপনাকে ভালোবেসে না থাকতে পাড়াটা মৃত্যু সমতূল্যই আমার জন্য। আমার এক জীবনে আপনার জন্য ভালোবাসা কখনো ফুরাবার নয়। কখনোই না। ”

“কি ব্যাপার? এখনো কাদছো কেন? যখন শুনেছো অন্য কাউকে বিয়ে করবো তখনো কেদেছে, এখন তোমাকে বিয়ে করলাম এখনো কাদো! এ কোন মসিবত খোদা! শেষমেষ সেই ঝগড়ুটে মেয়েটা কি-না স্বামীর কাছে এহেন ছিচকাদুনি? ”
আদনান বলে উঠলো ব্যাঙ্গাত্নক স্বরে। দৃষ্টি বরাবর বিছানায় বসে থাকা নব স্ত্রীর দিকে। বিয়ের আগে দু’জনার কথা না হলেও, কিছুক্ষণ আগেই সন্ধ্যার আয়োজিত নাস্তা সেড়ে রুমে পাঠিয়েছে বাড়ির সদস্যরা ওদের। বলেছে আদনানকে বিশ্রামের ব্যাবস্থা করে দিতে।
সোহানা তা-ই করেছিলো। রুমে রেখে চকে যেতে নিচ্ছিলো সে। কিন্তু দূস্য লোকটা তাকে রেখে দরজা আটকেছে। আদুরে কথা বলতে চাইছে। কিন্তু সে-সবে তো সোহানার মন গলছে না। এতো দিন কষ্ট গুলো অএয়ে এসেছে তা কি এতো সহজেই চলে যাওয়ার!

তা-ই সেই কখন থেকে মেয়েটা কেদে যাচ্ছে। আদনাবের কোন কথাই শুনছে না। তাই মেয়েটাকে একটু রাগিয়ে দিতেই এহেন বাক্যগুলো উচ্চারণ করলো ছেলেটা। রাগ করেও যেন অন্তত কান্না থামে!
কাজ হলো।আদনানের টেকনিকের। মেয়েটা নাক টেনে কান্না সংবরন করছে। ক্রন্দিত কন্ঠে জানায়,
“হ্যাঁ, আমিই তো ছিচকাদুনি। সেধে সেধে মানুষকে ভালোবাসরে যাই। তারপর কষ্ট পাই।”
আদনান ওর দিকে এগিয়ে গেলো। সোহানা তৎক্ষনাৎ নিজেকে ঘুরিয়ে বসলো ওপাশ হয়ে। আদনান মোটেও রাগলো না। বউয়ের পাশ ঘেঁষে বসলো বিছানায়। মাথাটা নিচের দিকে নমিত করে ব্যার্থ সুরে আওড়াল,
“আমি সত্যিই জানতাম না বাড়িতে এসব নিয়ে আলোচনা হয়েছে। জানলে সব কুছু কখনোই এতটুকু এগোতো না। তোমায় এতটা কষ্ট কখনোই পেতে হতো না। আমি নিজেও কি ভালো ছিলাম বলো?”
“কেন? আপনি ভালো থাকিবেন না কেন? আপনার তো ভালো থাকারই কথা।”
“তুমি আমায় এড়িয়ে চলেছো এটা আমায় খুব পুড়িয়েছে সোহা। অবশ্য এটারও একটা লাভ হয়েছে, নিজের অনুভূতি গুলোতে আরও খানিকটা স্ট্রেন্থ পেয়েছি আমি। তোমাকে ঠিক কতটা ভালোবাসি উপলব্ধি করেছি। আমি ভাবতাম তুমি বোধহয় আমায় সহ্য করতে পারো না তাই-ই ইগনোর করছো। আমি বুঝতে পাড়ি নি তোমার ফিলিংস। আ’ম সরিহ। ”

“হ্যাঁ, সেটাই তো! সহযে পেয়ে গেলে প্রথম প্রথম কারোই চোখে লাগে না। কদর থাকে না সে জিনিসের। আমার ভালোবাসাও তেমন মূল্যহীনই।”
আদিনানের রাগ হলো এবার। কড়া রকমের রাগ। এক ঝটকায় মেয়েটার বাহু টেনে নিজের দিকে ঘুরালো সে। শানিত দৃষ্টিতে দেখলো বউটাকে। গমগমে গলায় উচ্চারণ করলো,
“এভাবে খোচা দিবে না একদম। তোমার ভালোবাসা আমার জন্য কি সেটা তুমি নিজেও জানো না। এসব বলে বার বার আমাদের পবিত্র ভালোবাসাটাকে অবগ্যা করবে না। রিকোয়েস্ট তোমার কাছে আমার। ”
সোহানা মুখ ঘুরিয়ে নিতে চায়। হুহ! আসছে রিকোয়েস্ট নিয়ে। তোকে ভালোবেসে যে কষ্ট পেয়েছি এতো তাড়াতাড়ি ভুলে যাবো না-কি আমি! উঁহু, কক্ষনো না। একশোবার বলবো। কি করবি কর!
আদনান মেয়েটাকে আবার নিজের দিকে ফেরালো। ধৈর্য চুত্য হচ্ছে তার। কন্ঠে আকুলতা নিয়ে শুধালো,
“আমার ভালোবাসা নিয়ে কোন প্রশ্ন আছে তোমার?”
সোহানা চুপ রইলো। তার লোকটার ভালোবাসা নিয়ে কোন প্রশ্ন নেই। ভাইয়ার সামনে এর পাগলামো শুনার পর থেকে তো এ পর্যন্ত হাজারটা প্রমান পেলো দিওয়ানা প্রেমিক পুরুষের। প্রশ্ন উঠতেই পারে না। তবুও সে চুপ করে রইলো, লোকটাকে পুড়াতে।

“আন্স্যার মি সোহা? ” ব্যাকুল কন্ঠ ছেলেটার।
সোহানা মুখ আনত করে জানালো,
“নেই কোন প্রশ্ন। ”
“আমরা দু’জন দু’জনকে ভালোবাসি। এটা ধ্রুব সত্য। এবার তুমি বলো, তোমার রাগ অভিমান কি নিয়ে? আমার সাথে কথা বলছো না কেন?”
সে মেয়েটার সাথে কতবার যোগাযোগ করলতে চাইলো কিন্তু মেয়েটা তাকে কোন রেসপন্সই করছে না। ঠিক কি কারণে তার জন্য শাস্তি বরাদ্দ করেছে মেয়েটা! সে জানতে চায়। এক্ষুনি জানতে চায়।
সোহানাও মুখের উপর জবাব ছুড়ে দিলো তৎক্ষনাৎ,

“আমি আমার সেই কষ্ট গুলো ভুলতে পারছি না। নির্ঘুম রাত আমি কাটিয়েছি আপনি না। নিজের ভালোবাসাটাকে হারানোর অভিলাষে, অনুভূতি শূন্য হয়েছিলাম এক প্রকার। আমি, সেই মেয়েটা যার একটু আচ লাগলেও পুরো তালুকদার বাড়ি মাথায় থাকতো। সে তার পুড়া পা নিয়ে বিনা অভিযোগে পুরো একটা রাত কাটিয়ে দিয়েছিলাম। আমার বাহ্যিক এ দহন আমার ভেতরের কষ্টটাকে ছুতে পারেনি। আমি ক্ষতের কষ্ট অনুভবই করিনি। বুঝতে পারছেন, ঠিক কতটা গাঢ় ছিলো সেই ক্লেশানুভূতি গুলো? এগুলো এতো সহজে কিভাবে ভুলে যাই বলুন? সম্ভব আদোও?”
আদনান চুপ করে রইলো কিয়ৎক্ষন। ভেতরে ভেতরে যুদ্ধ চলছে ছেলেটার। নিজেকে নিজে ভর্ৎসনা করছে। সে কেন আগেই বললো না নিজের ভালোবাসার কথাটা? কেন এতো কষ্ট পেতে দিলো মেয়েটাকে। ভেতরটা দ্বীখন্ডিত হয়ে যেতে চায় ছেলেটার। কিছু বলতে গেলেও কন্ঠ কেপে উঠে। তবুও বারবার ঢোক গিলে নিজেকে স্বাভাবিক করক্তে চেয়ে কম্পিত কন্ঠে জানায়,

“অতীত আমি কিছুতেই বদলাতে পারবো না, সোহা। ওটা আমার হাতে নেই। কিন্তু তুমি চাইলে আমার ভালোবাসা দিয়ে তোমার কষ্টনুভাবের স্মৃতি গুলো খুব যত্নে মুছিয়ে দিতে পারি। একটু স্বাভাবিক হও? ভালোবাসতে দাও আমায়? ” ছেলেটার কন্ঠে স্পষ্ট ভঙ্গুরতার আভাস। অবিলম্বে এক হাত উঠে উসে মেয়েটার মাথায়। যেন স্নেহের পরশে ভুলিয়ে দিতে চায় প্রেয়সীর সবটুকু বিরহ স্মৃতি।
আদনানের স্নেহের মাধুর্যতা মিশ্রিত কন্ঠে সোহানার আবারও দু ঠোঁট ভেঙে আসতে চায়। তীব্র অনুভূতির জোয়ারে মেয়েটা নিজেই আছড়ে পরে প্রণয় পুরুষের বক্ষস্থলে। কেদে উঠে হাউমাউ করে। আদনান মেয়েটাকে বুকে আগলে নেয় বটবৃক্ষের ন্যায়। কাদতে দেয় মেয়েটাকে। একটু দুঃখ বিলাস করুক না-হয়! এতে যদি স্মৃতি গুলোর কিছুটা কমে যায়!
সময় নিয়ে ধাতস্থ হয় মেয়েটা। আদনানের পাঞ্জাবীর একপাশ তখন সম্পূর্ণ ভিজে প্রেয়সীর অশ্রুজলে। তবুও বুক থেকে সরতে দেয় না। বলিষ্ঠ হাতটা নিদারুণ ভাবে ভুলিয়ে যাচ্ছে প্রেয়সীর মাথায়।
সময় নিয়ে সোহানা নিজের কন্ঠে স্বর ফিরে পেলো। মাথা উচাতে চাইলে বাধাপ্রাপ্ত হলো বক্ষস্থলের মালিকের দ্বারা। মেয়েটাকে এভাবেই বুকে আগলে রেখে জানতে চাইলো,

“ভালো লাগছে এবার? ”
“হু।” আলতো স্বরে জানালো মেয়েটা।
“কখনো কষ্ট হলে, অভিমান জমলে, অভিযোগ থাকলে নির্দ্বিধায় আমার বুকে চলে আসবে, হু? আমায় জানাবে। কখনো সখনো দুঃখ বিলাস করিবে এ বুকটায়। দেখবে খুব স্বস্তি মিলছে। রাগ ঝারো, দুঃখ বিলাস করো, যা-ই করো দিনশেষে আমার বুকটাই বেছে নিবে, হু? এ বুকের মালিকটা যে তোমায় বড্ড ভালোবাসে সোহা পাখি। সে তার স্ব জ্ঞানে তার সোহা পাখিকে কখনোই কষ্ট দিবে না ইনশাআল্লাহ। যদিও হয়ে যায়, তবুও যেন এহেন দুঃখ বিলাসের জন্য এ বুকটাই বেছে নেওয়া হয়। ইটস এন অর্ডার মিসেস।”
সোহানা রক্তিম অধরে আলতো হেসে শব্দে হেসে ফেললো। সেই শব্দের ধ্বনি শ্রবণেন্দ্রিয় পৌছাতেই স্বস্থির নিশ্বাস ফেললো ছেলেটা। মেয়েটার মন টা তাহলে ভালো হয়েছে কিছুটা আশা করা যায়!
“চন্দ্রবিলাস হয়, বৃষ্টি বিলাস হয় জানতাম। দুঃখ, রাগ, অভিমান এগুলো ও বিলাস হয়? ” মেয়েটার হাস্যরস কন্ঠস্বর।
আদনান আড়মোড়া ভাঙার ভঙ্গিমায় এক হাত নাড়িয়ে সোহানার বাকানো কোমরের খাজে রাখলো সন্তপর্ণে। কপট স্বরে টিপ্পনী কেটে জানালো,

“বউ সাথে আরও কতো বিলাসই হয়। এই যেমন তুমি চাইলে আমরা এখন বাসর বিলাস করতে পারি। কি বলো?”
সোহানা তিরতিরিযে কেপে উঠলো আদনানের প্রথম অনাকাঙ্ক্ষিত ছোয়ায়। শিরশিরয়ে উঠলো দু’ বাহুর লোমকূপগুলো। লোকটার বেফাঁস কথায় রক্তিম হয়ে উঠলো কোপল সহ দু’কান। চুপটি করে রইলো বুকের মাঝে।
আদনান বুঝে বউয়ের লাজুকতা। হাতের ছোয়া স্থীর রেখে জানতে চাইলো, ,
” ফিলিং আনইজি? ”
সোহানা বুঝেছে কোন পরিপেক্ষিতে জিজ্ঞেস করছে আদনা। মৃদু মাথা নাড়িয়ে ‘না’ জানালো মেয়েটা।
প্রেয়সীর নিরব সম্মতির পাছে বলিষ্ঠ হাত কোমর গলিয়ে বেয়ে উঠে আসলো সরু কাধে। তীব্র অনুভূতির তাড়নায় দু’চোখ খিচে আসে মেয়েটার। আদনান নিবিষ্ট নয়নে প্রেয়সীকে পরখ করে দু’টোট গোল করে ‘ফু’ ছুড়ে দিলো রাজ্যের মায়া লেপ্টে থাকা মায়াবী মুখশ্রীটাকে।
মূহুর্তেই তিরতিরিয়ে কেপে উঠলো মেয়েটার আবদ্ধ পাপড়িযুগোল। কাপলো রক্তিম অধরজোড়া। আদনান যেন কোন ঘোরে। মন্ত্রমুগ্ধের ন্যায় এগিয়ে গেলো সেই রক্তিম অধর কোলের কাছে। আলতো স্পর্শে মিলন ঘটালো দু’জোড়া তৃষ্ণিত ওষ্ঠযুগোলের। সঙ্গে সঙ্গে দুরত্বও বাড়ালো ছেলেটা। সোহানা হাপাচ্ছে। কানের কাছে লোকটার উষ্ণ শ্বাস প্রশ্বাস অনুভব করতেই মেয়েটার কণ্ঠনালী শুকালো আরেকধাপ। শ্রবণেন্দ্রিয়ে পৌছালো ফিসফিসে হাস্কিস্বর,
“নাও…? আনইজি?”

সোহানার নিশ্বাস আটকে আসছে যেন। তার কাছে এসব কিছু নতুন। বাট কেমন যেন তৃপ্তিদায়ক। সে বুঝাতে পারবে না বোধহয়! নিজেও তো বুঝছে ভালো করে। কি বলবে মেয়েটা? এই অনুভূতির সঙ্গা যে তার জানা নেই!
ভালোবাসার মানুষের ছোয়ায় লাজ ছড়িয়ে যেতে পারে সারা অঙ্গে, কিন্তু অস্বস্তি না। দেহের প্রতিটি লোমকূপে শিহরণ। তলপেটে অসংখ্য প্রজাপতির ডানা জাপটানো। রোলারকোস্টারের মতো হার্টবিট উঠানামা। ওয়াওও! ইটস এন আমেজিং ফিলিংস।
সোহানারও ঠিক তেমনটাই অনুভূত হচ্ছে। সে এর গভীরে পৌছাতে চায়। এই অনুভূতির সম্পূর্ণ সঙ্গা সে জানতে চায়। কিন্তু সে তো অল্পতেই নেতিয়ে আসলো। শব্দ তুলে শ্বাস ছেড়ে মেয়েটা সেই কাঙ্খিত বক্ষমাজে লুটিয়ে লুটিয়ে পরতে পরতে জানালো,
“ফিলিংস থ্রিলিং….. ”

রুমের দরজার সামনে পর্দায় ধরে বাদরের মতো করে একটু ঝুলে থাকলো শুভ্রতা। অভিমানী, অবুঝ দৃষ্টি দুটো রুমে অবস্থিত মানবের দিকেই নিবদ্ধ। মেয়েটা আরও কিয়ৎক্ষন পর্দায় ঝুলে ঘুরপাক খেলো, আইঢাই শব্দ তুলে নাকে কাদলো একটু। তবুও ওপাশের মানবের কোন ভাবান্তর না দেখে মেয়েটা বিরক্তমাখা মুখশ্রী নিয়ে রুমে প্রবেশ করলো।।

ভোর পাচটার দিকে বাসা থেকে বের হবে তারা। এখন রাত এগারোটা প্রায়। বেচারির মনটা একটু না অনেকটাই খারাপ৷ দু’ঠোট ফুলিয়ে রাখলো কপাল গুটিয়ে। তার মূলত এখন একদম যেতে মন চাচ্ছে না কোথাও। বাড়িতে দু’দুটো বিয়ে হলো, একটু আনিন্দ ফুর্তি করবে তা না, সকলকে ফেলে সে কোন বৃন্দাবন চলে যাচ্ছে। ধূর!
রুমে মেহরাদ লাগেজে টুকিটাকি জিনিসপত্র গুচাচ্ছে। শুভ্রতা গিয়ে ওর পিছু পিছু ঘুরপাক খেতে খেতে নাকে কেদে বলল,
“মেহরাদ ভাই? এখন না, পরে যাই না? আমি এখন যেতে চাই না। পরে যাই না? সবাইকে ছেড়ে যেতে ভালো লাগছে না। ”
মেহরাদ ওর কথায় পাত্তা না দিয়ে নিজের কাজ জাড়ি রেখেছে। শুভ্রতা নামক মানবির অস্তিত্বই যেন তার সামনে অদৃশ্য। অদেখার মতোই নিজের কাজ করে চলছে সে।
শুভ্রতার গাল দ্বিগুণ ফুলে ঢোল হলো। নাছোড়বান্দা হয়ে জানালো,
“আমার কথা শুনছে না কেন? এইইইই? শুনুন? আমি যেতে চাই না এখন। শুনুন???”
হাতের টি শার্ট টা লাগেজে রেখে মেহরাদ তাকালো এবার ওর দিকে। দু’চোখের চাহনিতে হুশিয়ারি। বুঝাচ্ছে, সকাল থেকে সহ্য করছি, আর মাথা খাবি তো মা’র খাবি।
শুভ্রতা নাছোড়বান্দা। একগুঁয়ে হয়ে সে তাকিয়ে থাকলো নাক, মুখ কুচকে। পরক্ষণেই নিচের ঠোঁট উলটে আহ্লাদী সাজলো একটু,

“এভাবে তাকান কেন? আমার কথাটা একটু শুনুন না? রাতে আপনার কথা শুনিনি আমি? এখনো ব্যাথা….আচ্ছা সেটা বাদ। আমার ইচ্ছের অনিচ্ছের দাম নেই? আমি আরও পরে যেতে চাই। সকলকে ছেড়ে এখনই যেতে ভাল্লাগছে না আমার। টিকেট ক্যানসেল করে দিন না?”
“হ্যাঁ, ডাক্টর তো তোর চৌদ্দ গোষ্ঠীর আত্নীয় হয়, আমি যখন বলবো তখনই এপোয়েনমেন্ট লেটার নিয়ে বসে থাকবে। গর্ধব!” গমগমে গলায় আওয়াজ তুলে বলেই লাগেজের চেইন লাগালো সে। মেজাজ খারাপ হচ্ছে তার। সকাল থেকে এক বায়না ধরে বসে আছে মেয়েটা।
শুভ্রতা ঘুরে লাগেজের সামনে এসে দাঁড়ালো। এই লাগেজ ফাগেজ সে নিতে দিবে না। দু হাত ছড়িয়ে লাগেজ আড়াল করে বললো,

“আমি এসব গুছাতে দিবো না। আমি যেতে চাই না। যাবো না…..”
মেহরাদের এবার মেজাজ খারাপ হলো। কপালে বিরক্তির রেখা ফুটিয়ে এক লহমায় লাগেজের উপর বসিয়ে দিলো মেয়েটাকে। শুভ্রতা প্রথমেই হকচকিয়ে উঠলো এহেন কান্ডে। পরমূহুর্তে আঁকড়ে ধরলো স্বামীর চওড়া কাধ। ধাতস্থ হয়ে ভালোভাবে নড়েচড়ে ঠিক হয়ে বসলো মেয়েটা। শুনলো মেহরাদের রাশভারী স্বরের মেজাজি কন্ঠটা,
“বুঝালেও যখন বুঝিস না তখন মাইর দিতে মন চায়। ডক্টরের এপোয়েনমেন্ট পাওয়া যায় না সহজে, এখন পেয়েও ক্যানসেল করলে কিভাবে হবে? ট্রিটমেন্ট নিয়ে আবার ভার্সিটিতে ভর্তি হওয়ার প্রিপারেশন নিতে হবে না? হাতে সময় আছে? টালবাহানা কিরলেই হলো শিশুদের মতো? বুঝতে হবে না? সকাল থেকে বিরক্তি করছিস কেন?”
শুভ্রতা মুখ ঝামটা মেরে মুখ ঘুরিয়ে নিলো। সে শুনবে না এসব কথা। সে যেতে চায় না ব্যাস!
মেহরাদ চিবুক চেপে নিজের দিকে ঘুরালো মেয়েটাকে। বিছানার লাগেজের উপর বসেও মেয়েটা মেহরাদের বুক বরাবর। মেহরাদ ঝুকে আছে ওর দিকে। গম্ভীর মুখশ্রীতে নমনীয়তা টানলো কিছুটা অবুঝ বালিকাকে বুঝানোর জন্য। বুঝানোর সুরে আওড়াল,

“সেই কবে সমস্যা হয়েছে পা টাতে। আর বেশি দেরি কিছুতেই করা যাবে না। পরিক্ষা শেষ হওয়ার অপেক্ষায় ছিলাম শুধু। এখন কোন টালবাহানাই মানিবো না আমি। তুই তো ছোট না বল…..?”
“না, একদম ছোট না। আপনার বাচ্চার মা হওয়ার মতো বড়ো। সেটাও তো শুনেন না….আমার এটা ওটা কিছুই শুনেন না। নিজের সার্থ মতো ছোট বড়ো বানিয়ে দিন। স্বার্থপর লোক কোথাকার। ” আড়চোখে চেয়ে মিনমিনে বললো মেয়েটা।
“আমি স্বার্থপর? ” মেহরাদের সরু দু’চোখের দৃষ্টি মেয়েটার দিকে।
শুভ্রতা সময় নেয় না। তৎক্ষনাৎ বলে উঠলো,
“নয়তো কি? একটা বাবুর কথা বলছিলাম সেদিন, কি বললেন? আমি নিজেই নাকি বাচ্চা। যাকে পালতে পুষতে আপনি শেষ! এখন আবার বলেন আমি ছোট না, বুঝের মানুষ। যেন আপনার কথা বুঝি। তো? হলেন না স্বার্থপর? নিজের বেলায় ষোল আনা। ধড়িবাজ!” আবার মুখ বাকায় মেয়েটা।
মেহিরাদ টানটান হয়ে দাঁড়ালো। বা হাতের তালুতে সম্মুখের চুলগুলো পিছনে ঠেলে দিতে দিতে বললো,
“আমার আদর নেওয়ার মতোও বড়ো হোস নি, আবার আমার বাচ্চার জন্য পাগল হয়েছিস। কোন আক্কেলে ভাবিস এসব তুই? সামনে ভার্সিটি ভর্তি হবি, এগুলো মাথায় আসে কোন সাহসে? কোন এইম নেই?””
শুভ্রতা বিরক্ত হলো বেশ! সে মোটেও পড়ালেখায় এতো সিরিয়াস না। চোখ মুখে নাখোশি টেনে বিরক্তির শব্দ তুলে বললো,

“আপনার পড়ালেখার গুল্লি করি। কোন বিসিএস ক্যাডেট হতে চাই না। আপনার সন্তানের মা হতে চাই, এটাই আমার এইম আপাতত।আর কিচ্ছু না… ”
গড! সে কাকে কি বুঝাবে! বড়ো একটা দীর্ঘশ্বাস টেনে ভেতরের রাগটুকু ঝেড়ে ফেললো সে। গ্রীবা বাকিয়ে আবারও ঝুকে, কন্ঠে কোমলভাব টেনে এনে শুভ্রতাকে বুঝানোর সুরে আওড়াল,
“আমার লিক্ষি, জেদ করে না। এটা অনেক রিক্স হয়ে যাবে না এখন? তুই এখন খুব ছোট প্লাস আনফিট। আগে পা’টা ঠিক হতে দে? পুরো পুরি সুস্থ হ? আমার জান, অবাধ্য হয় না হু? একটু বুঝো?”
বেলুনের মতো ফুউউউস করে ভেতরের একগুঁয়ে ভাবটা কোথায় যেন মিলিয়ে গেলো! মেহরাদের আদুরে কথায় মেয়েটা বরাবরই দুর্বল। ভেতরে জেদ বাদ দিয়ে মেয়েটা আনত মুখ করে মাথা নত করে নোখ ঝুটতে রইলো।
মেহরাদ বউকে আরেকটু আহ্লাদ দিলো। নত মস্তকটা বুকের বা পাশে চেপে ধরে মাথার মধ্যভাগে চুমু খেলো, নরম চুমু। স্নেহের পরশ একে দিলো খুব যতনে।
ব্যাস, ভেতরের ফাকফোকরে অবষ্টিট জেদের ক্ষুদ্র কনা গুলোও পশমি তুলোয় ন্যায় মিলিয়ে গেলো ধোয়াশায়। নিস্তেজ হয়ে নিজেকে সপে দিলো ভালোবাসার কাঙ্খিত স্থানটায়। মেহরাদ স্বস্থির শ্বাস ফেলে কন্ঠ খাদে নামিয়ে আদর ঢেলে বলল,

“খুব শিগগিরই চলে আসবো, হু? আমার লক্ষি সোনা। আর জেদ করে না হু? দোয়া করো রব যেন সব ঠিক করে দেয়।”
“হু।’ ‘শুভ্রতা ওভাবে পরে রয়েই শব্দ তুললো। পরপরই আহ্লাদী সরে জানালো,
” আমি এসব ব্যাগ ট্যগা গোছাতে পারবো না কিছু। এগুলো আপনি করেন সব। আমি আপুদের সাথে কথা বলি গিয়ে হু? সারারাত সকলের সাথে আড্ডা দিবো।গাড়িতে যেতে যেতে আপনার কাছে ঘুমাবো। বকতে পারবেন না কিন্তু? চলেই তো যাবো বলুন…… ”
মেয়েটার অদেখাই মেহরাদ মৃদু হাসলো একটু। মেয়েটার এ বাচ্চামোতেই সে বরাবর ঘায়েল হয়। পাথুরে মনের আনাচে কানাচে ফুল ফুটে উঠে। সে মেয়েটার কপালে আলতো পরশ একে দিলো। ঠিক পরপরই স্ব’গোক্তিতে ধ্বনিত হলো তার আভিজাত্য মুড়ানো পুরুষালী কন্ঠস্বর,
“হুশশশ। রিকোয়েস্ট না, হুকুম করুন মা’ কুইন। আ’ম অলওয়েজ এট ইয়্যুর সার্ভিস, মেরে দিলরুবা।”

ফজরের আজান হয়েছে ঘন্টা খানেক পূর্বেই। তালুকদার বাড়ির সকলের দৃষ্টি টলমল। একত্রিত সকলে সদর দরজায় উপস্থিত। ঘড়ের প্রান যেন বাড়ি ছেড়ে চলে যাচ্ছে। এমন ভাবে তড়পাচ্ছে প্রত্যেকটা প্রান। শুভ্রতা তো কেদেকেটে বুক ভাসাচ্ছে তার বড়ো মা আর মেজো মা’র। যেন সবসময়ের জন্য কোথাও চলে যাচ্ছে।
শান্তা, সোহানা বোনের সাথেই নির্ঘুম কাটিয়েছে রাত। দু’চোখ অশ্রুসিক্ত। বোনকে কতক্ষণ জড়িয়ে রাখলো বোকে। খুব শিগগিরই ফিরে আসতেও বললো।
আদনান দ্বীপ যেতে চেয়েছিলো সাথে এয়ারপোর্ট পর্যন্ত। মেহরাদ না করে দিয়েছে। বাড়িতে সকলকে সামলাবে কে তাহলে? সে সকলকেই সব কিছু বুঝিয়ে দিয়ে গিয়েছে। খুব দ্রুত ফিরে আসবে তা বলেও আস্বস্ত করেছে।
“সাবধানে যাবে। সময় নিয়ে শান্ত মাথায় সব কিছু হ্যান্ডেল করবে। সেখানে গিয়েও হুট হাট রাগ ঝেড়ো না কারো উপর। একটা মেয়েকে নিয়ে যাচ্ছো সাথে করে, মাথায় রেখো। ওঁকেও আগলে রেখো।” ছেলের উদ্দেশ্যে বললেন আলতাফ তালুকদার।

মেহরাফ গম্ভীর মুখে বাবার আদেশ শুনে মাথা নাড়লো কেবল। একে একে সকলের হুশিয়ারি বানী মাথায় নিয়ে রক্তিম সূর্যের প্রভাত কিরণ ছড়াতে ছড়াতেই তালুকদার বাড়ি ত্যাগ করলো তারা। শুভ্রতা হেচকি তুলে কাঁদছে সেই কখন থেকে । থামার কোন নাম নিশানাও নেই।
মেহরাদ খুব জ্যান্টলি হেন্ডেল করলো ওঁকে। মন ডায়ভার্ড করে দিতে, ক্রন্দনরত রমনীর মাথাটা কাধে টেনে নিতে নিতে আলতো স্বরে জিজ্ঞেস করলো,
“আমি পাশে থেকেও এতো কষ্ট হচ্ছে? আমার উপর ভরসা নেই? আমার সাথে এক দেশ পার করা যায় না?”
শুভ্রতার কান্নার গতি কমে আসে। মেয়েটা বারবার পলক ঝাপটিয়ে কান্না মুদিত করে তৎক্ষনাত সিক্ত কন্ঠে জবাব ছুড়ে,

“ভরসা? সেটা আবার কি? আমি এক মেহরাদ তালুকদার অর্থাৎ আমার স্বামী ছাড়া আর কিছুই বুঝি না। আমার পৃথিবী বলতেই সে। তার সাথে এক দেশ কেন? পুরো বিশ্ব ভ্রমান্ড্য পার করা যায় নির্দ্বিধায়। ”
“তাহলে এবার কান্না বন্ধ কর। ”
“করবো। আগে বলুন, এটা জিজ্ঞেস করলেন কেন? আপনি জানেন না আপনি আমার কি?”
মেহরাদ গাড়ির জানালার কাচ গলিয়ে প্রাভাতের নরম আলো ছড়ানো সূর্যটার দিকে তাকালো একবার। সূর্যটা যেন তাদের সাথেই পাল তোলা নৌকার মতো সঙ্গে করে ছুটছে। চোখেমুখে নরম কিরণ লেপ্টে খুব অনুচ্চস্বরে ফিসফিসিয়ে শুধালো,
“আমি কি তোর?”

শুভ্রতা সময় নেয় না। অকপটে নিজের মনোভাব তুলে ধরে প্রণয় পুরুষের নিকট। খুব আদুরে স্বরে আওড়ায়,
“আমার জান, প্রান, নিশ্বাস। আমার হৃৎস্পন্দন। যাকে কিশোরী বয়সে আড়ালে অবডালে মন দিয়েছি। বিপদে পড়লে সবার প্রথমে যাকে খুঁজেছি, আপনি সে। অসুস্থ হলে যার অস্তিত্বটা বিছানার বা পাশে দন্ডায়মান দেখে আমি বারবার প্রেমে পড়েছি, আপনি সে। যাকে ভালো না বেসে বেচে থাকতে হবে ভেবে বারবার আত্নহত্যা করতে চেয়েছি, আপনি সে। যার জন্য নিজেকে বাচাতে পারি আবার ম’রতেও পারি, আপনি সে। যার দূরত্বে নিশ্বাস কণ্ঠনালীতে আটকে আসে, আপনি সে। যার মুখে একটু হাসি দেখার জন্য সারাদিন মুখিয়ে থাকি, আপনি সে। যে চোখে চোখ রাখলেও সারা দেহে শিহরণ বয়ে চলে, আপনি সে।যার জন্য পুরো পৃথিবীকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে বলতে পারি, আমি এতিম নই। আমার একজন আছে। আমার স্বামী আছে। যে আমার কিশোরী মনে ভালোবাসার বিজ বপন করেছিলো, ভালোবাসিতে শিখিয়েছিলো। নিজেকে ভুলিয়ে শুধু তাকে ধ্যানে, জ্ঞানে, হৃদয়ে রাখতে বাধ্য করেছিলো, আপনি সে। যার এক চাহনিতে হাজার প্রজাপতির বাসা গড়ে আমার মনে। আমার ভালোবাসা। আমার হৃৎস্পন্দন। যাকে ছাড়া আমি মৃত। জীবন্ত লাশ। ”

চারদিকে বুঝি অনুভূতিরা দোলা খাচ্ছে! প্রভাতের নরম আলোর ঝলকানিতে রঙ বেরঙের প্রজাতিরা বুঝি উড়ছে! পবনের শীতল বাতাস বইছে বুঝি বক্ষস্থলে!
এটাই তো সুখ! এই তো জীবন! যার জন্য মেহরাদ দুনিয়া তোলপাড় করে! যার মাথা কাধে নিয়ে সে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করতে চায়! যার ভাসা দু’চোখের হাসিতে বারবার নিজেকে হারাতএ চায়।
হৃদয়ের প্রশান্তিতে মেহরাদের দু’চোখ বুদে আসে। প্রাপ্তির ঢেউয়ে দু’চোখের কার্নিশ বেয়ে সুখের পবিত্র শিশির বিন্দু ঝড়তে চায়, কিন্তু কট্টর মানবের আঙ্গিনায় তা সম্ভব নয়। সন্তপর্ণে আড়াল হয়ে যায় তা।
সারাদিন সারারাত জেগে থেকে কান্নার পরেই তন্দ্রাঘোরে ডুবেছে মেয়েটা। আদুরে স্বর মিয়িয়ে এসেছে সেই কখন। বুকের কাছটায় ভারী উষ্ণ নিশ্বাসের অস্তিত্ব।
মেহরাদ মেয়েটাকে আরেকটু টেনে একদম বুকের পাশে জড়িয়ে ধরলো। ঘুমন্ত মুখশ্রী গিয়ে ঠেকলো ঘারের কাছটায়।

হৃৎস্পন্দন পর্ব ৫৮

মেয়েটার দিকে প্রেমময় দৃষ্টি ঢেলে আলতো পরশে ওষ্ঠ চেপে ধরলো সরু নাসিকায়। প্রশান্তির ঢেউয়ে কন্ঠস্বর অতিমাত্রায় শান্ত, স্থীর, মধুরতায় ডুবে গিয়ে গুঞ্জন তুললো,
“আমার এক জীবনে তোর ভালোবাসা চাওয়া ছাড়া আর কোন চাওয়াই ছিলো না আমার। এখনো নেই। আমি আমিটাকে শুধু মাত্র তোর তোর জন্যই উৎসর্গ করেছি আমি। এই যে বা পাশটায় লেপ্টে আছিস? এখানের মূল্যবান যন্ত্র –হার্টটা আমার হলেও, এটা শুধু মাত্র তোর নামে লেখা শুভ্রা। তা না হলে, তোর বিয়গো এটা বারবার থমকে যাবে কেন? তোর কষ্ট দেখলে নিশ্বাস আটকে আসবে কেন? আমার হৃৎস্পন্দনের অধিকারী আমি হলেও এর রাজত্ব জুড়ে শুধু তোর অস্তিত্ব, শুভ্রা। আমার হৃৎস্পন্দন তুই। আমার অস্তিত্বের সবচেয়ে মূল্যবান অঙ্গ। যার বিয়োগে আমি মেহরাদের বিনাশ অনিবার্য। আমার বেঁচে থাকতে হলেও তোকে আমার চাই, আমার হৃৎস্পন্দন………. ”

সমাপ্ত