অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ৭৭
সোফিয়া সাফা
ব্যস্ততা আর উথালপাথাল মানসিক দ্বন্দ্বের ভেতর দিয়ে আরও দুটো দিন কেটে গেল।
আজ ফ্লোরা, উর্বী আর রিদমকে সাথে নিয়ে শহরের সবচেয়ে বড় শপিং মলে এসেছে উদ্যান। আগামীকাল তার আর ফুলের দ্বিতীয় বিবাহবার্ষিকী। মনে মনে সে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে কাল সে ফুলকে আবারও বউ সাজিয়ে ঘরে তুলবে। অতীতে যা হওয়ার হয়েছে, এবার আয়োজনে কোনো খামতি থাকবে না; একদম জাঁকজমকপূর্ণ, রাজকীয় ব্যবস্থা করবে সে।
দুই বছর পূর্তির এই বিশেষ উপলক্ষে সে ফুলের জন্য এক-দুই পিস নয়, একেবারে দুইশো পিস শাড়ি, মানানসই রেশমি চুড়ি আর জুতো কিনেছে। শুধু তা-ই নয়, হিরের গহনা আর নামী ব্র্যান্ডের প্রসাধনীতে ভরে গেছে একের পর এক শপিং ব্যাগ।
উদ্যানকে এভাবে হন্যে হয়ে একের পর এক দোকানে ঘুরে অতিরিক্ত কেনাকাটা করতে দেখে উর্বী পুরোপুরি হতবিহ্বল হয়ে গেল। শপিং শেষে সবাই গাড়িতে ওঠার পর রিদম কিছুটা ইতস্তত করে বলল, “শপিং হয়তো একটু বেশি বেশিই হয়ে গেছে, তেহ।”
উদ্যান নির্লিপ্ত সুরে জবাব দিল, “আমরা তো ওকে নিয়েই মেক্সিকো ফিরে যাবো। ওখানে তো আর ভালো মানের শাড়ি পাওয়া যাবে না। সেই জন্যই একবারে এতগুলো কেনা।”
কথাটার পেছনের আবেগ বুঝতে পেরে রিদম হালকা হাসল। সেও উদ্যানের দেখাদেখি উর্বীকে বেশ কিছু সুন্দর শাড়ি কিনে দিয়েছে।
সোলার এস্টেট এখন আলোয় ঝলমল করছে। রাতের ঘুটঘুটে অন্ধকারে দূর থেকে মনে হচ্ছে, বিশাল অট্টালিকাটাকে যেন হরেক রঙের মরিচ বাতি দিয়ে মুড়িয়ে রাখা হয়েছে। উদ্যান নিজের রুমে এসে ফুলের জন্য আনা নতুন সব শাড়ি, গহনা আর প্রসাধন সামগ্রী যত্ন করে গুছিয়ে রাখল। তারপর ক্লান্ত শরীরটা নিয়ে খাটের ওপর বসল। বুকের ভেতরটায় কেমন যেন ঢিপঢিপ করছে; এতটা এক্সাইটেড সে জীবনে কোনোদিন হয়নি। চোখ জোড়া বারবার দেয়াল ঘড়ির কাঁটার ওপর আটকে যাচ্ছে।
আর মাত্র কয়েকটা ঘণ্টা… তারপরই সকাল হবে, আর সে-ও সমস্ত বাধা পেরিয়ে রওনা দেবে ফুলের কাছে। কত দিন, কত মাস পর সে ফুলের মুখটা দেখবে, ওকে স্পর্শ করতে পারবে! ভাবতে ভাবতেই আচমকা উদ্যান প্রচণ্ড খুশিতে আত্মহারা হয়ে উঠল।
“আমি তোকে কাল পুরো দু ঘণ্টা শক্ত করে জড়িয়ে ধরে রাখবো ফ্লাওয়ার। তো… তোকে…” বলতে বলতেই আচমকা তার গলাটা বুজে এল। বাতাসে মিলিয়ে গেল উত্তেজনার রেশ, ঠোঁটের কোণের চওড়া হাসিটুকু এক পলকে ম্লান হয়ে গেল।
হাতের কনিষ্ঠা আঙুলের আংটিটা আনমনে ঘোরাতে ঘোরাতে সে মাথা নিচু করল। ফিসফিসিয়ে বলল, “তোকে আমি খুব মিস করছি। কিন্তু এত ভয় কেন পাচ্ছি বলতো? কেন মনে হচ্ছে ছুঁতে গেলেই তুই কর্পূরের মতো হারিয়ে যাবি?”
উদ্যান একটু থামল। এক বুক বিষাদ নিয়ে বিছানার ওপর ঢলে পড়ল সে, “তোকে আমি বড্ড বেশি কষ্ট দিয়ে ফেলেছি রে। কীভাবে সেই ক্ষতগুলো ভুলিয়ে দেবো? একটা ‘সরি’ বললেই কি সব সমাধান হয়ে যাবে?”
নিজের প্রশ্নের উত্তরে উদ্যান নিজেই বলল, “সরি ইজ নাথিং বাট আ লেইম ওয়ার্ড। আর যাই হোক, তোর গায়ে হাত তোলাটা আমার চরম অন্যায় ছিল। তুই আমাকে সেই অন্যায়ের জন্য যত খুশি শাস্তি দিস ফ্লাওয়ার। সি ইউ টুমোরো মাই ফ্লাওয়ার ওয়াইফ।”
ফুলকে দেখার, তাকে বুকে টেনে নেওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষায় উদ্যান চোখের পাতা এক করতে পারল না। পুরোটা রাত সে বিছানায় ছটফট করে কাটিয়ে দিল।
পরদিন সকাল আটটা।
সোলার এস্টেটের প্রত্যেকে মার্জিত পোশাকে তৈরি হয়ে ড্রইংরুমে এসে হাজির হয়েছে। সবার চোখেমুখেই এক ধরনের চাপা উত্তেজনা। কিছুক্ষণের মধ্যেই সিঁড়ি বেয়ে উদ্যান নিচে নেমে এল। তার গায়ে কালো রঙের ফিটিং স্যুট, কবজিতে স্টাইলিশ ঘড়ি, চুলগুলো নিখুঁতভাবে সেট করা।
বাকি সবকিছু ঠিকঠাক থাকলেও তার গমরঙা চেহারাটা কেমন যেন বিবর্ণ দেখাচ্ছে। চোখের নিচের কালচে দাগ স্পষ্ট বলে দিচ্ছে—বিগত কয়েকটা দিন ধরে সে এক ফোঁটাও ঘুমাতে পারেনি।
সবাই যখন গাড়ির দিকে এগোচ্ছে, ঠিক তখন অনি একবার চারপাশটা দেখে নিয়ে শুধাল, “ফ্লোরা যাবে না আমাদের সাথে?”
উদ্যান শান্ত গলায় জবাব দিল, “না, ওকে দেখলে ফ্লাওয়ার রেগে যাবে।”
পিচঢালা পথ ধরে সারি সারি ছুটে চলেছে চার-চারটে কালো গাড়ি। একদম সামনের গাড়িটার স্টিয়ারিং সোহমের হাতে, তার পাশের সিটে উদ্যান। উদ্যান চুপচাপ বসে একমনে হাতের আংটিটায় হাত বোলাচ্ছে। সোহমের চোখের কোণেও লালচে আভা; স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, কোনো এক চরম উৎকণ্ঠায় তার রাতটাও কেটেছে নির্ঘুম।
সামনের দিকে চোখ রেখেই সোহম নীরবতা ভাঙল, “তুই লোকেশন ট্রেস করছিস না কেন?”
উদ্যান নিস্পৃহ গলায় উত্তর দিল, “কনসোলটা ভেঙে ফেলেছিলাম।”
“তুই নিশ্চিত তো ফুল সেই তিনতলা ফ্ল্যাটেই আছে?”
“আমি নিশ্চিত নই। ও অন্য কোথাও শিফট হয়ে যেতেও পারে।”
“যদি হয়ে যায়, কীভাবে খুঁজে পাবি?”
“ওখানে গিয়ে আগে খোঁজ নিয়ে দেখি।”
উদ্যানের নির্দেশিত পথ ধরে গাড়িগুলো এসে থামল সেই তিনতলা ভবনটির সামনে। সোহম গাড়ি থামিয়ে তড়িৎ গতিতে নেমে গেল, কিন্তু উদ্যান নামল মন্থর পায়ে। তার শরীরটা যেন কোনো এক অজানা আশঙ্কায় ভেতরে ভেতরে কুঁকড়ে যাচ্ছে। সে ভবনের প্রবেশপথের দিকে তাকিয়ে বাকিদের উদ্দেশ্যে বলল, “তোরা গিয়ে খোঁজ নিয়ে দেখ।”
লুহান পকেট থেকে ফোন বের করতে করতে এগিয়ে এল, “ফুলের একটা ছবি সেন্ড করে দে তো। ছবি দেখিয়ে খুঁজতে সুবিধা হবে।”
উদ্যান পকেটে হাত দিয়ে ফোনটা বের করতে যাবে, ঠিক তখনই সোহম একেবারে অবচেতন মনে বলে উঠল, “আমি সেন্ড করে দিচ্ছি দাঁ…”
কথাটা অর্ধেক বলেই সোহমের পুরো শরীর শক্ত হয়ে এল। সে জিভ কামড়ে ধরল; মুহূর্তে বুঝতে পারল, এই কথাটা বলা তার চরম ভুল হয়েছে।
পাশ থেকে রিদম অবাক হয়ে শুধাল, “তুই সেন্ড করবি কীভাবে? ফুলের ছবি তোর কাছে কোত্থেকে এল?”
সোহম মাথা নিচু করে ফেলল। উদ্যান নির্বিকার ভঙ্গিতে তার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। পরিস্থিতি আরও জটিল হওয়ার আগেই অনি তড়িঘড়ি করে সোহমের হাত ধরে টেনে ভবনের ভেতরে নিয়ে গেল, “আয়, দেরি হয়ে যাচ্ছে।”
উর্বী, রিদম আর লুহানও তাদের পেছন পেছন ভেতরে ঢুকে গেল। মেলো আর অনিলা উদ্যানের সাথে বাইরেই দাঁড়িয়ে রইল।
উদ্যান গাড়ির বডিতে হেলান দিয়ে শূন্য চোখে চেয়ে রইল সামনের কালচে রঙের ভবনটির দিকে। অভ্রনীল এখন মেলোর কোলে। মেলো একবার আড়চোখে উদ্যানকে দেখে নিল। দানবটার চোখেমুখের নির্লিপ্ত অভিব্যক্তি দেখে ভেতরে কী চলছে তা বোঝার উপায় নেই।
কয়েক মিনিট পরেই তারা ভবন থেকে বেরিয়ে এল। উদ্যানের দিকে এগিয়ে গিয়ে লুহান বলল, “ফুলের কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি রে।”
কথাটা শুনে উদ্যান একপলক তাকিয়ে বলল, “কোনো তথ্যই পাসনি?”
রিদম দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “না। ওদের ভাষ্যমতে, মেয়েটাকে তার স্বামী এসে নিয়ে গিয়েছিল। সেই ঘটনার পর এখানে আর ফেরেনি।”
উদ্যান আর এক সেকেন্ডও দাঁড়াল না। ঝড়ের গতিতে গাড়িতে উঠে নিজেই ড্রাইভিং সিটে বসে পড়ল। ইঞ্জিন স্টার্ট দিয়ে গাড়ি রিভার্স করল সে। অনি দ্রুত সোহমকে টেনে নিজেদের গাড়িতে তুলল। তারপর উদ্যানের ক্ষ্যাপাটে গতিতে ছুটে চলা গাড়িটাকে সবাই অনুসরণ করতে লাগল।
তারা যখন সানরাইজ টাওয়ারের সামনে এসে পৌঁছাল, ততক্ষণে তপ্ত দুপুর গড়িয়ে বিকালের আভাস দিচ্ছে। তনয়া সবেমাত্র ক্যাফে বন্ধ করে লাঞ্চের উদ্দেশ্যে এলিভেটরে উঠেছিল। ঠিক তখনই হুড়মুড়িয়ে ভেতরে ঢুকে পড়ল সোলার সার্কেলের সবাই।
হুট করে এতগুলো চেনা-অচেনা মানুষকে একসাথে ভেতরে ঢুকতে দেখে তনয়ার চোখ কপালে উঠল। এই লোকগুলোর কয়েকজনকে সে আগেও এখানে দেখেছিল, যদিও কারও সাথে সামনাসামনি কথা হয়নি। এতদিন পর ওরা আবার কেন এসেছে এখানে? সে বড় বড় চোখে অনিলা আর উর্বীর দিকে তাকাল।
বিপরীতে তারা দুজনও বেশ অস্বস্তি বোধ করল। তনয়া এর আগে রিদম, উর্বী, অনি ও অনিলাকে দেখেনি; তখন কেবল মেলো, লুহান, সোহম আর উদ্যান এসেছিল। তিন-তিনটে ছেলের সাথে মেলোকে দেখে সে না জানি কত কী ভেবে বসেছিল! অথচ আজ তাদের সাথে আরও দুটো মেয়ে এবং একটা বাচ্চাও আছে। যাকে বলে একেবারে পারফেক্ট জয়েন্ট ফ্যামিলি মেটেরিয়াল।
ভাবতে ভাবতেই এলিভেটর মৃদু ঝাঁকুনি দিয়ে ১৫ তলায় এসে থেমে গেল। তনয়া তখনও নিজের ভাবনার গোলকধাঁধায় হাবুডুবু খাচ্ছে।
তার বের হওয়ার কোনো লক্ষণ না দেখে উর্বী শুধাল, “আপনি নিশ্চয়ই এখানেই নামবেন?”
তনয়া থতমত খেয়ে বাস্তবে ফিরে এল। সে অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে বলল, “আহ, হ্যাঁ… দুঃখিত।” বলেই সে তড়িঘড়ি করে লিফট থেকে বেরিয়ে গেল।
১৭ তলায় এসে এলিভেটরের দরজা খুলতেই উদ্যান ত্রস্ত পায়ে ফ্ল্যাটের দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। সোহম অবশ্য আসছিল ধীরপায়ে।
দরজাটা বাইরে থেকে লক দেখে উদ্যান চটজলদি পিনকোড চাপল। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার, পিন এন্টার করার পরও লক খুলল না, বিচিত্র এক যান্ত্রিক লাল আলো জ্বলে উঠল। উদ্যান ধরে নিল, ফুল হয়তো পিন চেঞ্জ করে ফেলেছে। উদ্যানের মাথায় যেন রক্ত চড়ে গেল; সে প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হয়ে শক্ত দরজাটার ওপরেই এক প্রচণ্ড ঘুষি বসিয়ে দিল। ‘ধড়াম’ শব্দে প্রত্যেকে একবার কেঁপে উঠল। উদ্যান হিংস্র চোখে তাকাতেই সোহম মাথা নিচু করে নিল।
পরিস্থিতি আরও ভয়ানক হওয়ার আগেই অনি সোহমকে প্রায় টেনে নিয়ে গেল দরজার সামনে। তারপর ফিঙ্গারপ্রিন্ট সেন্সরের ওপর সোহমের বুড়ো আঙুলটা চেপে ধরল। সাথে সাথে মৃদু যান্ত্রিক শব্দ তুলে লকটা খুলে গেল। তার মানে, আগের পিনকোডটা ফুল নয়, আসলে সোহম নিজেই পরিবর্তন করে রেখে গিয়েছিল!
সোহম একপাশে সরে দাঁড়াতেই উদ্যান দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকে গেল। বাকিরা ভেতরে ঢোকার সাহস পেল না, দরজার মুখেই থমকে দাঁড়িয়ে রইল।
ঘরের ভেতর পা রাখতেই উদ্যানের বুকটা ধক করে উঠল। সে দ্রুত চলে গেল বেডরুমে। চারপাশের সবকিছু ওলটপালট, বিছানার চাদরটা অর্ধেক ঝুলে আছে মেঝেতে। পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে, মেয়েটা এখান থেকে চলে যাওয়ার আগে জিনিসপত্র গুছিয়ে রাখার মতো ন্যূনতম সময়টুকুও পায়নি।
উদ্যান হন্যে হয়ে খুঁজতে খুঁজতে হঠাৎ স্তব্ধ হয়ে গেল। খাটের ঠিক মাঝখানে পড়ে আছে সেই সবুজ রঙের টেপ রেকর্ডারটা। উদ্যান এগিয়ে গিয়ে কাঁপাকাঁপা আঙুলে সেটার প্লে বাটনটাতে চাপ দিল।
কয়েক সেকেন্ডের যান্ত্রিক হিসহিস শব্দের পর স্পিকার ফুঁড়ে ভেসে এল ফুলের কান্নাভেজা কণ্ঠস্বর, “তেহজিব, প্লিজ আপনি আমাকে ক্ষমা করে দিন।”
ফুলের কণ্ঠ জড়িয়ে যাচ্ছিল, যেন সে ভয়ে কাঁপছে, “মামা মারা যাওয়াতে আমারও খুব খারাপ লাগছে, বিশ্বাস করুন। কিন্তু আ… আমি কী করব? ওনাকে ফিরিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা যে আমার নেই। আমি আপনার কাছে নিজের প্রাণটুকু ভিক্ষা চাইছি, দয়া করে আমাকে রেহাই দিন। কথা দিচ্ছি, আমি কখনো আমার এই পোড়া কপাল নিয়ে আপনার দ্বারস্থ হব না। আপনি ধরেই নিন না আমি মরে গেছি। ফুল নামে কোনো ভুল আপনার জীবনে সংঘটিত হয়নি।”
ফুল একটু থামল। স্পিকারে তার ফোঁপানির আওয়াজ স্পষ্ট হতে লাগল, যা শুনে উদ্যানের চোখ দুটো তীব্র যন্ত্রণায় লাল হয়ে উঠল।
“আমার সবকিছুই তো আপনি কেড়ে নিয়েছেন। দোহাই আপনার, আমার নিঃশ্বাসটুকু কেড়ে নিয়েন না। আমার… আমার বেঁচে থাকাটা খুবই প্রয়োজন!”
উদ্যানের হাত স্বতঃস্ফূর্তভাবে মুষ্টিবদ্ধ হলো। রেকর্ডারের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করল, “আমি তোকে মারব না, ফ্লাওয়ার। কসম, আর কোনোদিনও তোর গায়ে আমি হাত তুলব না। তুই কোথায় আছিস, বল না আমাকে!”
ঠিক তখনই ফুল পাগলের মতো চেঁচিয়ে উঠল, “আমাকে খোঁজার চেষ্টা করবেন না, তেহজিব। একদম করবেন না।”
ফুল হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে এক কথাই বারবার বলতে লাগল। উদ্যান চোয়াল শক্ত করে, দাঁতে দাঁত চেপে পুরোটা শুনল। অডিওটা শেষ হতেই ঘরের ভেতর নীরবতা নেমে এল। উদ্যান বুঝতে পারছে না, এখন সে ফুলকে কোথায় খুঁজবে? সেদিন সোলার এস্টেট থেকে মুক্তি পাওয়ার পর যে মেয়েটা এখানেও আসেনি, সেটা তো পরিষ্কার।
তাহলে কোথায় গেল মেয়েটা? হারিয়ে গেল কোন অতলে?
রেকর্ডারটা হাতের মুঠোয় শক্ত করে চেপে ধরে উদ্যান অন্য হাতে ফোন বের করল। তারপর দ্রুত ফ্লোরাকে কল লাগাল। কারণ, সেদিন ফ্লোরাকেই সে নির্দেশ দিয়েছিল ফুলকে বাড়িতে রেখে আসতে। রোবটটা কোন বাড়িতে রেখে এসেছে ফুলকে
উদ্যানের মাথাটা যেন অচল হয়ে যাচ্ছে। তীব্র নেশার ঘোরে সেদিন ফুলকে তুলে নিয়ে গিয়ে ঠিক কী কী করেছিল, তার কোনো কিছুই স্পষ্ট মনে নেই। শুধু এটুকু মনে আছে, সে ফ্লোরাকে বলেছিল ফুলকে যেন বাড়িতে রেখে আসে। এক মিনিট! উদ্যান কি ফ্লোরাকে নির্দিষ্ট কোনো লোকেশন দিয়েছিল?
উদ্যান চুলে আঙুল চালিয়ে তীব্র অস্থিরতায় পায়চারি করতে লাগল, কিন্তু কোনোভাবেই সেদিনের স্মৃতির জট ছাড়াতে পারল না। ওপাশে ফ্লোরার সাথে সংযোগ স্থাপন হতেই সে কোনো ভূমিকা ছাড়াই সরাসরি প্রশ্ন ছুড়ল, “তুই ফ্লাওয়ারকে কোথায় রেখে এসেছিলি সেদিন?”
ওপাশ থেকে ফ্লোরার আবেগহীন যান্ত্রিক কণ্ঠস্বর ভেসে এল, “কোনদিনের কথা জানতে চাইছেন, তেহজিব? অনুগ্রহ করে তারিখটা বলুন।”
উদ্যানের চোয়াল শক্ত হয়ে এল, তারিখটা মনে করে বলল, “২রা এপ্রিল।”
ফ্লোরা কয়েক সেকেন্ড সময় নিয়ে নিজের মেমোরি চিপ স্ক্যান করে বলল, “আমি সেদিন ফ্লাওয়ার অর্থাৎ ফুলকে বাড়িতে রেখে এসেছিলাম, তেহজিব।”
“কোন বাড়িতে রেখে এসেছিস? আমি তোকে কোথাকার লোকেশন দিয়েছিলাম?”
“আপনি আমাকে নির্দিষ্ট কোনো লোকেশন দেননি, তেহজিব।”
“হোয়াট!” উদ্যান প্রায় চিৎকার করে উঠল, “লোকেশন না দিলে তুই আমার কমান্ড ফলো করলি কীভাবে?”
“আমার সিস্টেমে ‘বাড়ি’ নামে ডিফল্ট হিসেবে যে লোকেশনটি সেট করা ছিল, আমি সেই লোকেশনেই তাকে ড্রপ করে এসেছি। লোকেশনটির নাম খানজাদা নিবাস। আমি আপনার ফোনে জিপিএস কোঅর্ডিনেটস পাঠিয়ে দিচ্ছি।”
নামটা শোনামাত্রই উদ্যান যেন বজ্রাহত হলো। খানজাদা নিবাস! গলার ভেতরের তীব্র বিরক্তি চেপে রেখে সে বলল, “লোকেশন পাঠাতে হবে না। তোকে আমি পরে দেখে নেব।”
উদ্যান তড়িঘড়ি করে উঠে দাঁড়িয়ে দরজার দিকে হাঁটা ধরল। এত বড় একটা ভুল সে কীভাবে করল! আরও আগেই এই ব্যাপারটা খতিয়ে দেখা উচিত ছিল। আসলে তার মানসিক অবস্থা এতটাই বিপর্যস্ত ছিল যে, এই চিন্তাটা মাথাতেই আসেনি। সে ভেবেই নিয়েছিল, ফ্লোরাকে লোকেশন না দিলে ফ্লোরা তো কোথাও যেতে পারে না—তার মানে উদ্যান অবশ্যই লোকেশন বুঝিয়ে দিয়েছিল তাকে। কিন্তু তার সেই ভাবনাটা আজ ভুল প্রমাণিত হলো।
বিকেলবেলা।
সূর্যের সোনালী আলো ম্লান হয়ে চারপাশ ধূসর আবছা অন্ধকারে ছেয়ে গেছে। চারটে গাড়ি হাইওয়ে ধরে ছুটে চলেছে খানজাদা নিবাসের উদ্দেশ্যে। যথারীতি বাকিরা উদ্যানের গাড়িটাকেই অনুসরণ করছে।
খানজাদা নিবাসের সুবিশাল, রাজকীয় ফটকের সামনে এসে একে একে গাড়িগুলো ব্রেক কষল। উদ্যানকে দেখামাত্রই বৃদ্ধ দ্বারোয়ান তড়িঘড়ি করে ভারী গেটটা খুলে দিলেন।
বাকিরা যখন বুঝতে পারল উদ্যান নিজের বাড়িতে এসেছে, তখন তারা কিছুটা দোটানায় পড়ে গেল। অনি উদ্যানের পাশাপাশি এসে দাঁড়িয়ে বলল, “তুই ভেতরে যা, আমরা এখানেই অপেক্ষা করছি।”
উদ্যান বিনাবাক্যে দু-পা এগিয়ে গেল। তারপর হঠাৎই কী ভেবে আবার পিছু ফিরল। বাকিদের দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল, “তোরাও চল। সকাল থেকে অনেক ধকল গেছে। আজকের রাতটা এখানেই কাটিয়ে গেলে মন্দ হবে না। ফ্লাওয়ারকে নিয়ে মেক্সিকো ফিরলে আর কখনো আসা হয় কি না, তারও তো ঠিক নেই।”
উদ্যানের আমন্ত্রণে সায় জানিয়ে বাকিরাও একে একে খানজাদা নিবাসের সীমানায় প্রবেশ করল। বাড়িটা আলিশান, স্থাপত্যশৈলীতে আভিজাত্যের ছাপ স্পষ্ট; কিন্তু কেমন যেন দমবন্ধকর শূন্যতায় চারিধার থমথম করছে। উদ্যান চেনা পথ ধরে আগে আগে ভেতরে ঢুকল। ড্রইংরুমে তখন কেউ ছিল না, একজন গৃহকর্মী এসে সদর দরজাটা খুলে দিলেন।
উদ্যান কাউকে ডাকার প্রয়োজনীয়তা বোধ করল না। সে সেই গৃহকর্মীকে উদ্দেশ্য করে বলল, “ওদের সবাইকে গেস্ট রুমগুলো দেখিয়ে দিন। তারপর নাস্তা রেডি করুন।”
তিনি মাথা নেড়ে সবাইকে নিয়ে ওপরে যাওয়ার জন্য পা বাড়ালেন। উদ্যানও তাদের পেছনে পেছনে ওপরে ওঠার উদ্দেশ্যে সিঁড়ির প্রথম ধাপে পা রাখল। ঠিক তখনই তার দৃষ্টি গিয়ে আটকালো সিঁড়ির ওপরের ল্যান্ডিংয়ে দাঁড়িয়ে থাকা একটা মেয়ের ওপর।
মেয়েটা প্রশ্নবিদ্ধ চোখে ওপর থেকে তাদের দিকেই তাকিয়ে আছে। একে একে প্রত্যেককে নিখুঁতভাবে দেখে নিয়েও সে কাউকেই চিনতে পারল না। তবুও ভাবল, এনারা হয়তো দূর সম্পর্কের কোনো আত্মীয়-স্বজন। তাই সে সাবলীল কণ্ঠে প্রশ্ন করল, “আপনারা কারা? ঠিক চিনতে পারলাম না তো!”
কেউই উত্তর দিতে আগ্রহ দেখাল না। সবাই চলে গেল গৃহকর্মীর পেছন পেছন। উদ্যানও একই ভঙ্গিতে উপরে উঠে গেল। সে যখন মেয়েটার কাছাকাছি পৌঁছাল, মেয়েটা চমকে উঠে অবচেতনেই বলে ফেলল, “আপনিই কি সেই তেহজিব খানজাদা?”
উদ্যানের পা থেমে গেল। সে ঘাড় ঘুরিয়ে অচেনা মেয়েটাকে একবার আপাদমস্তক দেখে নিল। তার শীতল চোখে কোনো আগ্রহ ছিল না, তবুও দৃষ্টি আটকে গেল মেয়েটার স্ফীত উদরের ওপর। মেয়েটা তার দৃষ্টি অনুসরণ করে নিজের পেটের দিকে তাকাল। তারপর কিছুটা খোঁচা মেরেই বলল, “জীবনে কখনো প্রেগন্যান্ট মহিলা দেখেননি বুঝি?”
উদ্যান তৎক্ষণাৎ দৃষ্টি সরিয়ে নিল। মেয়েটার কথা পুরোপুরি অগ্রাহ্য করে সে চলে গেল ফুলের রুমের দিকে। ওদিকে মেয়েটা সিঁড়ির রেলিংয়ে হেলান দিল। ঠোঁট উল্টে হাতে থাকা ফোনটায় দ্রুত একটা নম্বর ডায়াল করল সে। ওপাশ থেকে রিং হয়ে কেটে গেল, কেউ রিসিভ করল না। মেয়েটা বিরক্ত না হয়ে বারবার কল দিতে লাগল। টানা ছয়বার রিং হওয়ার পর অবশেষে কলটা রিসিভ হলো। মেয়েটা আহ্লাদী স্বরে বলে উঠল, “তাজ বেবি, তুমি কি এমন কাজে ব্যস্ত আছো গো যে কলটা রিসিভ করতে এত সময় লাগালে? ভাবছি ভাবিকে বলে তোমার সব কাজ আমি নিজ দায়িত্বে চুকিয়ে দেবো।”
ওপাশ থেকে আবেশ অত্যন্ত নিরাবেগ কণ্ঠে বলল, “তুমি জানো যে আমি স্টুডিওতে আছি, তবুও কেন ননস্টপ বিরক্ত করে যাচ্ছো? ঘণ্টাখানেক আগেই তো পুরো এগারোটা মিনিট অহেতুক বকবক করে কল রাখলে। এখন কাজের সময় অন্তত একটু শান্তি দাও।”
“আমি তোমাকে অশান্তি দিই, তাজরিদ? তুমি তোমার অনাগত সন্তানের মাকে এভাবে বলতে পারলে?”
“দেখো লামহা, সবসময় বাচ্চাকে টানবে না। তোমার একটা বাজে স্বভাব হয়ে গেছে, কথায় কথায় আমাকে মনে করিয়ে দিতে চাও যে তোমার অনাগত সন্তানের বাবা আমি।”
“কেন মনে করিয়ে দিতে হয়, তাজরিদ? তোমার কি সেটা এমনিতেই মনে রাখা উচিত নয়?”
ফোনের ওপাশ থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ার শব্দ পাওয়া গেল। আবেশের কণ্ঠস্বর এবার আরও রূঢ় শোনাল, “আমার মনে থাকে, লামহা। তোমাকে বারবার মনে করিয়ে দিতে হবে না।”
“মনে থাকলে আমার সাথে এভাবে তেজ দেখিয়ে কথা বলতে পারতে না, তাজ। তুমি যে দায়িত্ব সম্পর্কে এতটা উদাসীন হবে, সেটা আমি দুঃস্বপ্নেও ভাবিনি।” লামহার চোখ দুটো কানায় কানায় ভরে উঠল।
“এখন তো বুঝেই গেছ, চিনেও ফেলেছ আমাকে। তারপরেও কেন আমার মাথায় কাঁঠাল ভেঙে খাওয়া বন্ধ করছ না?”
“তুমি আমার সাথে খারাপ আচরণ করছ, তাজ।”
“আমি কি সবসময়ই এমন আচরণ করি না?”
“করো তাজ, তুমি সবসময়ই এমন করে কথা বলো।” লামহার চোখের কোণ বেয়ে এক ফোঁটা জল গালে নেমে এল। সে অশ্রুটুকু দ্রুত মুছে নিয়ে ধরা গলায় যোগ করল, “শুধু তুমি আমার সন্তানের বাবা আর আমি তোমাকে ভালোবাসি বলেই এমন আচরণ করেও পার পেয়ে যাও।”
আবেশ কোনো প্রত্যুত্তর করল না। লামহা বুক ভরে একটা শ্বাস নিয়ে নিজেকে কিছুটা ধাতস্থ করল। তারপর গলার স্বর স্বাভাবিক করার চেষ্টা করে বলল, “তোমার স্টেপ ব্রাদার বর্তমানে খানজাদা নিবাসে আছে। দেখা করতে চাইলে তাড়াতাড়ি চলে এসো।”
কথাটা শুনে আবেশ প্রচণ্ড ক্ষোভে চেঁচিয়ে উঠল, “ও কেন এসেছে?”
“আমাকে দেখতে আসেনি, সেটা সিওর।” লামহা ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল, “তবে তোমাকে দেখতে এসেছে কি না, তা জানি না।”
আবেশ বুঝতে পারল লামহা এখন আবার পুরনো কাসুন্দি ঘাটবে আর উল্টোপাল্টা বকবে। এই মুহূর্তে তার মাথায় শুধু উদ্যানের আসার খবরটা ঘুরপাক খাচ্ছে। সে তাড়াহুড়ো করে বলল, “কল রাখো, আমি আসছি।”
“হ্যাঁ, তা তো আসবেই!” লামহার গলার ভেতর জমে থাকা সবটুকু অভিমান এবার ঠিকরে বেরোল, “এখন যদি বলতাম—তাজরিদ সোনা, জলদি এসো, আমার তোমাকে ভীষণ দেখতে ইচ্ছে করছে; তাহলে নির্ঘাত পুরো রাত নেটওয়ার্কের বাইরে কাটিয়ে সকালবেলা আসতে! আর এখন যখন শুনলে তোমার জানের দুশমন এসেছে, তখন একেবারে ডানা গজিয়েছে তোমার? পারছ না খালি উড়ে চলে আসতে! তুমি আমাকে তোমার শত্রুর চেয়েও বেশি তুচ্ছ মনে করো, তাই না তাজ?”
আবেশ নিজের মাথাটা এক হাত দিয়ে চেপে ধরল। কপালের রগগুলো দপদপ করছে তার। সে দাঁতে দাঁত চেপে বলল, “তুমি নিজে থেকে কলটা রাখবে? নাকি আমাকেই কেটে দিতে বাধ্য করবে?”
“কেটেই দেখো না, আমি তোমার কী হাল করি!”
আবেশ সঙ্গে সঙ্গেই ফোনটা হোল্ডে রেখে লাইনটা কেটে দিল। লামহা ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। হাতের উল্টো পিঠে চোখের জল মুছে নিয়ে সে নিজেই কলটা এন্ড করল।
“কী হয়েছে বউমা, আবারও আবেশের সাথে ঝগড়া করছ?” পাশ থেকে আচমকা মাহবুবা সুলতানার কণ্ঠ ভেসে আসতেই লামহা চমকে উঠল। পরক্ষণেই ঠোঁটের কোণে হাসি ঝুলিয়ে বলল, “না না মম, আপনার ছেলে ঝগড়া করতে জানে নাকি? ওই একটু মজা করছিলাম আরকি।”
মাহবুবা সুলতানা ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করলেন, “নিচে মনে হলো কেউ এসেছে। তুমি দেখেছ কাউকে?”
লামহা মাথা চুলকে বলল, “হ্যাঁ মম, আপনার স্টেপ সন তেহজিব খানজাদা এসেছে; তাও আবার দলবল নিয়ে।”
কথাটা শোনামাত্রই মাহবুবা সুলতানা চিবুক শক্ত করে প্রশ্ন করলেন, “কোনদিকে গেছে ও?”
এদিকে উদ্যান একটা সুনির্দিষ্ট দরজার সামনে এসে থমকে দাঁড়াল। বুকটা তার দপ করে উঠল। কাঁপাকাঁপা হাতে সে দরজার হাতলটা ঘোরাতেই মসৃণভাবে দরজাটা খুলে গেল। সে দরজা ঠেলে ভেতরে তাকাতেই দেখতে পেল—তার আরাধ্য নারীটি, তার ফ্লাওয়ার, খাটের ওপর অলসভাবে আধশোয়া হয়ে বসে আছে।
দরজা খোলার মৃদু শব্দে ফুল ঘাড় বাঁকিয়ে তাকাল। উদ্যানের জ্বলজ্বলে চোখের সাথে তার চোখাচোখি হলো। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, ফুলের মধ্যে কোনো প্রতিক্রিয়ার লেশমাত্র দেখা গেল না। সে উদ্যানকে দেখে না তো অবাক হলো, না তো ক্ষোভে ফেটে পড়ল। বরং তাকে দেখে মনে হলো, উদ্যানের আগমনের আশাতেই সে প্রহর গুনছিল। ফুলকে নিষ্পলক তাকিয়ে থাকতে দেখে উদ্যান যেন কোনো এক অদৃশ্য জাদুমন্ত্রে মুগ্ধ হয়ে ঘরের ভেতরে পা বাড়াল।
ফুল এখনো ঠিক আগের মতোই মোহনীয় ভঙ্গিতে বসে আছে। উদ্যান খাটের পাশে এসে হাঁটু গেড়ে বসল, তারপর ফুলের মুখ বরাবর আলতো করে ঝুঁকে গেল। ভয়ে ভয়ে সে ফুলের নরম গালে নিজের হাতটা রাখল। কাঙ্ক্ষিত নারীটির সান্নিধ্য পেয়ে উদ্যানের ঠোঁট দুটো স্বতঃস্ফূর্তভাবে কেঁপে কেঁপে নড়ে উঠল; ফিসফিসিয়ে গেয়ে উঠল তার অবাধ্য মন:
“দেখলে তোকে…বদলায় দিন…
বদলায় রাত, বদলায় ঘুম, সঙ্গে সময়..
সন্ধ্যে হলে…বন্ধ ঘরে…
মনে পড়ে তোরই কথা এমনই হয়
কেন যে তোকে পাহারা পাহারা দিল মন
কেন রে এতো সাহারা সাহারা সারাদিন?
কেন যে তোকে…
পাইনা পাইনা মনে হয় সারাটা দিন।”
উদ্যানের চোখ দুটো বুজে এল অপার্থিব সুখে। সে দুই হাত বাড়িয়ে ফুলকে নিজের বুকের সাথে লেপ্টে নিতে যাবে, ঠিক তখনই দূর থেকে এক চড়া কণ্ঠস্বর তিরের মতো বাতাস চিরে ধেয়ে এল, “উদ্যান!”
মুহূর্তের মধ্যে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গেল সবটুকু মায়া। কেটে গেল উদ্যানের আচ্ছন্নতা। চোখের পলকে উধাও হয়ে গেল খাটের ওপর বসে থাকা ফুল! উদ্যানের চোখের সামনে আবারও ভেসে উঠল কাঠের বন্ধ দরজাটা। হাতল ঘোরানোর সঙ্গেই সে বুঝে গিয়েছিল দরজাটা লক করা, আর এই তিক্ত বাস্তবতা মানতে না পেরেই তার মস্তিষ্ক নিজের ইচ্ছেমতো একটা গভীর বিভ্রম তৈরি করে ফেলেছিল।
উদ্যানের বুকটা ধড়ফড় করে উঠল। সে ভারী নিঃশ্বাস ফেলে পেছনে ঘুরে তাকাল। দেখল মাহবুবা সুলতানা, রেহানা বেগম আর লামহা দাঁড়িয়ে আছে। যদিও সে লামহাকে চেনে না, আর এই মুহূর্তে পরিচিত হওয়ার কোনো আগ্রহও তার নেই। তার পুরো অস্তিত্ব জুড়ে এখন কেবল ফুলের জন্য একটা দমবন্ধকর অস্থিরতা ছুটে বেড়াচ্ছে।
“তুমি হঠাৎ এখানে কেন?” মাহবুবা সুলতানা প্রশ্ন ছুড়লেন।
উদ্যান জবাব দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা বোধ করল না। তার চোখ দুটো লালচে হয়ে উঠেছে। সে পাল্টা প্রশ্ন করল, “ফ্লাওয়ার কোথায়?”
মাহবুবা সুলতানা কিছু বলার আগেই লামহা যেচে পড়ে উত্তর দিল, “আপনি ভুল জায়গায় ফুল খুঁজতে চলে এসেছেন, মিস্টার খানজাদা। এটা কোনো ফ্লাওয়ার শপ নয়। এখানে ফ্লাওয়ার পাওয়া যায় না।”
উদ্যান চোয়াল শক্ত করে হিংস্র চোখে তাকাতেই লামহা হালকা চালে বলল, “আরে আপনি দেখছি রেগে যাচ্ছেন! আমি আপনাকে বেরিয়ে যেতে বলিনি, সেটা বলার রাইটসও নেই আমার। আপনি তো এই বাড়ির মালিক; স্থায়ীভাবে থাকতে চাইলেও কারও কিছুই বলার থাকবে না। শুধু ভুল জায়গায় ফুল খুঁজবেন না।”
উদ্যান তার কথায় ভ্রূক্ষেপ করল না। সে লামহাকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে রেহানা বেগমের সামনে এসে দাঁড়াল। শক্ত গলায় শুধাল, “প্রিমরোজকে কোথায় লুকিয়ে রেখেছেন?”
লামহা আবারও ফোঁড়ন কেটে বলল, “ওহ আচ্ছা! আপনি প্রিমরোজ ফুলের খোঁজে এসেছেন? মেক্সিকোতে কি প্রিমরোজ ফুলের আকাল পড়েছে বুঝি? যাক, তাহলে বলতে হয় আপনি একেবারেই ভুল জায়গায় আসেননি।”
উদ্যানের ধৈর্যের বাঁধ এবার ছিঁড়ে যাওয়ার উপক্রম হলো। অগ্নিঝরা চোখে সে তাকাল লামহার দিকে। হিসহিসিয়ে প্রশ্ন করল, “কোথায় আছে ও?”
লামহা নির্বিকার ভঙ্গিতে হাত দিয়ে পূর্ব দিকে ইশারা করল। তারপর অত্যন্ত ঠান্ডা গলায় বলল, “বাড়ির পূর্ব পাশে একটা কবরস্থান আছে। সেখানে…”
বাকি কথাটুকু আর শেষ করতে পারল না লামহা। তার মুখের শেষ শব্দটা বাতাসে মিলিয়ে যাওয়ার আগেই উদ্যানের ডান হাতটা ঝড়ের বেগে লামহার গাল লক্ষ্য করে ধেয়ে গেল। ঠিক তখনই কেউ একজন এসে উদ্যানের সেই উদ্যত হাতটাকে মাঝপথেই খপ করে চেপে ধরল।
“কন্ট্রোল ইওরসেলফ, মিস্টার খানজাদা! আপনি ওর গায়ে হাত তুলতে পারেন না। কারণ, বাড়িটা আপনার হলেও… বউ কিন্তু আমার।”
কর্কশ, ধারালো কণ্ঠস্বরটা আবেশের। উদ্যান এক ঝটকায় নিজের হাতটা ঝাড়া মেরে ছাড়িয়ে নিয়ে আবেশের দিকে তাকাল। কয়েক সেকেন্ডের জন্য থমকে গেল সে; স্পষ্ট বুঝতে পারল, ছেলেটার মধ্যে আমূল পরিবর্তন এসেছে। আগের সেই রোগা-পাতলা, দুর্বল গড়নটা এখন আর নেই; শরীরটা বেশ শক্তপোক্ত হয়েছে তার।
উদ্যান নিজের শার্টের হাতাটা সামান্য টেনে, চোয়াল শক্ত করে বলল, “তোমার বউকে ভেবেচিন্তে কথা বলতে বলে দাও, আবেশ। নইলে…”
আবেশ এক পা এগিয়ে এল, “বলবে না ও ভেবেচিন্তে কথা। কী করবেন আপনি? গায়ে হাত তুলবেন? তুলুন দেখি!”
উদ্যানের চোখ-মুখে চরম অবজ্ঞা ফুটে উঠল। আবেশ থামল না, ঠোঁটের কোণে বিষাক্ত হাসি ফুটিয়ে যোগ করল, “নিজের বউকে মেরে মেরে এতটাই অভ্যস্ত হয়ে পড়েছেন যে, অন্যের বউয়ের ওপরেও খুব সহজেই হাত উঠে যায় দেখছি। আপনার কি মনে হয় না আপনার এই হাতের চিকিৎসা করানো দরকার?”
উদ্যান সত্যি সত্যিই নিজের হাতের তালুর দিকে বিশ্লেষণাত্মক দৃষ্টিতে তাকাল—যেন আবেশের বলা কথাটা সে আসলেই ভেবে দেখছে।
উদ্যানের এই নীরবতার মাঝেই আবেশ আবার চড়া গলায় বলল, “তো, হঠাৎ কী মনে করে চলে এলেন মিস্টার খানজাদা? ব্যাপার কী? এখানে থাকার মনস্থ করেছেন নাকি? যদি তেমনটা হয় তবে সরাসরি বলে দিতে পারেন, আমরা এখন, এই মুহূর্তেই এ বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাব।”
উদ্যান হাতটা প্যান্টের পকেটে ঢুকিয়ে নিল। তার কণ্ঠস্বর এবার শান্ত, “তার কোনো প্রয়োজন নেই। আমি এখানে থাকতে আসিনি। শুধু বলো, ফ্লাওয়ার কোথায়? ওকে নিয়েই আমি চলে যাব।”
লামহা কিছুক্ষণ তটস্থ হয়ে থাকলেও আবারও মুখ খুলতে চাইল। কিন্তু তার আগেই আবেশ নিজের তর্জনী উঁচিয়ে কড়া গলায় বলল, “মজা কোরো না, লামহা। আমাকে কথা বলতে দাও।”
লামহা মুহূর্তের মধ্যে চুপ হয়ে গেল। বাইরের কেউ দেখলে ভাববে সে আবেশের কথা ভীষণ মান্য করে, যদিও বাস্তব চিত্রটা একেবারেই উল্টো। আসলে এই মুহূর্তে সে উদ্যানের সামনে আবেশকে ছোট করতে রাজি নয়; কোনোভাবেই না।
আবেশ আবার উদ্যানের দিকে ফিরল, “ফুলকে নিয়ে যেতে এসেছেন? তাও আবার আমার কাছ থেকে? কেন, মিস্টার খানজাদা? আপনি কি ফুলকে আমার কাছে কোনো আমানত হিসেবে গচ্ছিত রেখে গিয়েছিলেন?”
উদ্যানের সহ্যশক্তি লোপ পাচ্ছে। তার কপালের রগগুলো জেগে উঠছে। সে দাঁতে দাঁত চেপে বলল, “দেখো আবেশ, হেয়ালি কোরো না। ফ্লোরা ওকে এই বাড়ির সামনেই রেখে গিয়েছিল।”
আবেশ অত্যন্ত উদাসীন ভঙ্গিতে কাঁধ ঝাঁকাল, “তাহলে যেখানে রেখে গিয়েছিলেন, সেখানে গিয়েই খুঁজুন। শুধু শুধু আমার সামনে দাঁড়িয়ে সময় নষ্ট করার কোনো মানেই হয় না।”
আবেশের এমন খামখেয়ালি আচরণে উদ্যান অবাক হলো। সে গলার স্বর একদম খাদে নামিয়ে ফিসফিসিয়ে বলল, “তুমি অবশ্যই জানো আবেশ ও কোথায় আছে। নইলে ও নিখোঁজ শুনে একটু হলেও চমকে যেতে।”
আবেশ মলিন হাসল, “ভুল ধারণা আপনার। ও মরে গেলেও আমি চমকাবো না, কারণ ও আপনাকে চুজ করেছিল।”
উদ্যানের মাথার ভেতর যেন আগুন জ্বলে উঠল। সে আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। আবেশের শার্টের কলারটা দুই হাতে শক্ত করে পেঁচিয়ে ধরে দেয়ালের সাথে চেপে ধরল। গর্জে উঠে বলল, “খবদার! মুখ সামলে কথা বলো। ভালোয় ভালোয় বলে দাও, প্রিমরোজ কোথায়!”
লামহা আঁতকে উঠে দ্রুত এগিয়ে এল আবেশকে ছাড়ানোর জন্য, “ছাড়ুন বলছি! ছাড়ুন ওকে!” কিন্তু উদ্যানের বাঁধন আলগা হলো না। আবেশ অবশ্য মুক্ত হওয়ার কোনো প্রয়াসই চালাল না।
উদ্যান আবারও হুংকার ছাড়ল, “শেষবারের মতো জিজ্ঞেস করছি তোমায়, বলে দাও প্রিমরোজকে কোথায় লুকিয়ে রেখেছ?”
ঠিক তখনই পাশ থেকে রেহানা বেগম ডুকরে কেঁদে উঠলেন, “ফুল কোথায় সেটা আবেশকে কেন জিজ্ঞেস করছ? ও কোথায় আছে… সেটা তো তোমারই সবার চেয়ে ভালো জানার কথা!”
উদ্যান ক্ষিপ্রগতিতে আবেশকে ছেড়ে তার দিকে এগিয়ে গেল। নিজের ভেতরের অস্থিরতাকে সে আর কোনোভাবেই দমিয়ে রাখতে পারছে না। সে চিৎকার করে বলল, “আমি জানলে নিশ্চয়ই আপনাদের কাছে জানতে চাইতাম না!”
কেউ আর কোনো উত্তর দিল না। উদ্যান বুঝতে পারল এভাবে সে ফুলের হদিস পাবে না, এরা কেউ মুখ খুলবে না।
উদ্যান এবার বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার উদ্দেশ্যে পা বাড়াল। কয়েক কদম এগোতেই সোলার এস্টেটের বাকিরা নজরে এল। উদ্যান তাদের পাশ কাটিয়ে যাওয়ার সময় রিদম প্রশ্ন করল, “কোথায় যাচ্ছিস?”
উদ্যান কপালের ঘাম মুছে লম্বা শ্বাস নিয়ে বলল, “তোরা থাক, আমি একটা জরুরি কাজে যাচ্ছি। ওদের ওপর নজর রাখবি। কোনোভাবেই যেন পালিয়ে যেতে না পারে।”
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ৭৬
লুহান উদ্বিগ্ন হয়ে বলল, “তুই একা কোথায় যাবি? আমিও যাচ্ছি তোর সাথে।”
উদ্যান হাত তুলে তাকে থামিয়ে দিল, “নো নিড। অনেক দৌড়াদৌড়ি করেছিস আমার জন্য, আর করতে হবে না। ফ্লাওয়ারকে খুঁজে পেয়ে যাই, তারপর একেবারে মেক্সিকোতে ব্যাক করব।”
আর কথা না বাড়িয়ে, উদ্যান ধুপধাপ পা ফেলে খানজাদা নিবাসের সদর দরজা পেরিয়ে বাইরের ঘুটঘুটে অন্ধকারে মিলিয়ে গেল।

নাইস
Plz next part ta taratari dew