Home অবাধ্য হৃৎস্পন্দন অবাধ্য হৃৎস্পন্দন শেষ পর্ব 

অবাধ্য হৃৎস্পন্দন শেষ পর্ব 

অবাধ্য হৃৎস্পন্দন শেষ পর্ব 
সোফিয়া সাফা

ঘড়ির কাঁটায় তখন সকাল দশটা। টানা পনেরো ঘণ্টা অবিশ্রান্ত পরিশ্রমের পর উদ্যানের শরীরটা ভেঙে আসার উপক্রম। ঘাড়ের রগগুলো ব্যথায় ছিঁড়ে যাওয়ার জোগাড়, অথচ সেদিকে তার বিন্দুমাত্র ভ্রূক্ষেপ নেই। প্রায় অসাড় হয়ে আসা আঙুলগুলো দিয়ে সে কনসোলটা মেরামত করার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
​ফুলের পেটে থাকা ডিভাইসটার রেঞ্জ বড্ড কম, বড়জোর পঞ্চাশ কিলোমিটার। অবশ্য পেন্ডেন্টের ডিভাইসটার রেঞ্জ অনেক বেশি ছিল, কিন্তু সেটা তো এখন ফুলের কাছে নেই! তাই এই ভাঙা কনসোলটাই উদ্যানের শেষ ভরসা। অথচ একদিন চরম ক্ষোভে এই যন্ত্রটাকে সে নিজেই প্রায় গুঁড়ো গুঁড়ো করে ফেলেছিল।
​তখন তার মনে ভয় কাজ করছিল; এই যন্ত্রটা অক্ষত থাকলে সে নিজেকে কিছুতেই সামলাতে পারবে না। না চাইতেও বারবার ফুলের ওপর নজরদারি করার চেষ্টা করবে, কিংবা হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে আবারও ছুটে যাবে তার কাছে। যা সে চায়নি। সুস্থ করার আগে সে ফুলের মুখোমুখি হতে চায়নি; বরং তাকে কিছুটা স্পেস দিতে চেয়েছিল, নিজের মতো একটু থাকতে দিতে চেয়েছিল।

​ভাঙা যন্ত্রাংশগুলো কোনোমতে জোড়াতালি দিয়ে কনসোলটা চালু করতেই এক মুহূর্তের জন্য স্ক্রিনটা জ্বলে উঠল। উদ্যান শ্বাসরুদ্ধ হয়ে চাতকের মতো তাকিয়ে রইল সেদিকে। কিন্তু স্ক্রিনে কোনো সিগন্যাল ধরা পড়ল না। শূন্য গ্রিডটা কয়েকবার টিমটিম করে জ্বলে উঠে কয়েক সেকেন্ডের মাথায় আবারও নিভে গেল; নিষ্ক্রিয় হয়ে গেল পুরো সিস্টেম।
​তীব্র হতাশা আর ব্যর্থতার গ্লানিতে উদ্যান নিজের চুল মুঠো করে টেনে ধরল। একটা তপ্ত দীর্ঘশ্বাস বুকের ভেতর দলা পাকিয়ে ঠিকরে বেরোতে চাইল। ধীরে ধীরে তার হাঁটু দুটো ভেঙে এল, আর সামলাতে পারল না নিজেকে। কনসোলটা চোখের সামনে তুলে ধরে সে গা এলিয়ে দিল ঠান্ডা ফ্লোরে। তার মস্তিষ্ক হয়তো কাজ করাই বন্ধ করে দিয়েছে, নইলে এত দীর্ঘ সময় ধরে চেষ্টা করেও কেন সে এই সামান্য মেকানিজমটা ঠিক করতে পারছে না?
​চোখের পাতা দুটো ভারী হয়ে আসছে, তার কি একটু ঘুমিয়ে নেওয়া উচিত? ভাবতে ভাবতেই উদ্যান দুচোখ বন্ধ করল। কিন্তু পরমুহূর্তেই, এক ঝটকায় আবার চোখ খুলে ফেলল সে! নাহ্, সে ঘুমাতে পারবে না। ফুলকে খুঁজে পাওয়ার আগে দুচোখের পাতা এক করা আক্ষরিক অর্থেই অসম্ভব। সময় বালির মতো হাত থেকে গলে যাচ্ছে, যত দ্রুত সম্ভব ফুলকে খুঁজে বের করতেই হবে।
​উদ্যান সমস্ত ক্লান্তি ঝেড়ে ফেলে আবার উঠে দাঁড়াল। দ্বিগুণ মরিয়া হয়ে কনসোলটা ঠিক করার কাজে মনোনিবেশ করল সে।

​এদিকে খানজাদা নিবাসের ডাইনিং টেবিলে সকালের ব্রেকফাস্ট করতে বসেছে সবাই। এস্টেট বাসিন্দারা সাধারণত সকালের নাস্তা স্কিপ করতেই অভ্যস্ত, কিন্তু গত রাতে উদ্যান আর ফুলের চিন্তায় কেউ ঠিকমতো ঘুমাতেই পারেনি।
​খাবার খেতে খেতে আবেশ লক্ষ্য করল, টেবিলে বসা অনেকেই আড়চোখে তার দিকে তাকিয়ে আছে। সেই চাউনিতে একাধারে কৌতূহল আর একরাশ প্রশ্ন। আবেশ এবার বিরক্ত হয়ে খাওয়া থামাল, তারপর কিছুটা উপহাসের সুরে বলে বসল, “কী ব্যাপার? আপনারা কি সিঙ্গার তাজের ফ্যান? অটোগ্রাফ চাই? নাকি আমাকে প্রথমবার দেখলেন?”
​রিদম একটু হাসার চেষ্টা করল, “তুমি সত্যিই বিয়ে করে নিয়েছ?”
​আবেশ খাবারে মন দেওয়ার ভান করে উত্তর দিল, “হুম, করে নিয়েছি।”

​সোহম প্রশ্ন করল, “কিন্তু তুমি তো ফুলকে পাগলের মতো ভালোবাসতে। এত তাড়াতাড়ি মুভ অন করলে কীভাবে?”
​পাশে বসে লামহা নিঃশব্দে খাচ্ছিল; সোহমের প্রশ্নে তার মুখ নাড়ানোর গতিতে স্থবিরতা এল। আবেশ কোনো রকম ভণিতা না করেই বলল, “হ্যাঁ, পাগলের মতোই ভালোবাসতাম। টুইস্টটা হলো, এখনো পাগলের মতোই ভালোবাসি। আমি মুভ অন করিনি, আর কোনোদিন করতেও চাই না।”
​লামহার মুখাবয়বে কোনো প্রতিক্রিয়ার রেখা না ফুটলেও সোহম তাজ্জব বনে গেল, “মুভ অন না করেও বিয়ে করা যায়? বাচ্চার বাবাও হওয়া যায়? জানতাম না তো!”
​আবেশ নিস্পন্দ কণ্ঠে বলল, “আমার বউ শুধুমাত্র আমার দেহটা পেয়েই খুশি। আমার ভালোবাসা সে চায়নি, দাবিও করেনি। তাই তার স্বামী কিংবা বাচ্চার বাবা হওয়ার জন্য মুভ অন করার প্রয়োজন পড়েনি।”
​উপস্থিত সবাই তার এমন অকপট, রূঢ় কথা শুনে স্তব্ধ হয়ে গেল। লামহা মাথা নিচু করে কিছুক্ষণ বসে রইল। তারপর কাঁপা হাতে চেয়ারটা পেছনের দিকে ঠেলে উঠে চলে গেল ওপরের তলায়।
​টেবিলে বসা মাহবুবা সুলতানা আর রেহানা বেগম পরস্পরের দিকে তাকালেন। ছেলেটা যেন আজকাল তাদেরকে গোনাতেই ধরছে না।

সোহম শান্ত চোখে তাকাল, “তুমি দেখছি নিজের ভালোবাসার প্রতি একদমই লয়্যাল নও, আবেশ।”
​“আমার একমাত্র ভালোবাসা যেখানে আমাকে কোনোদিন এক সেকেন্ডের জন্যও ভালোবাসেনি, সেখানে লয়্যাল থাকাটা কি আদৌ ম্যাটার করে?” আবেশের গলার স্বর এবার চড়তে শুরু করল।
“তারপরেও নিজের ভালোবাসাকে ঠকানো যায় না, আবেশ। তুমি নিজের অজান্তেই হয়তো মুভ অন করে ফেলেছ।”
​সোহমের শেষ কথাটায় আবেশ যেন খেই হারিয়ে ফেলল। আচমকা সে হাতের প্লেটটা তুলে সজোরে আছাড় মারল ফ্লোরে। ঝনঝন শব্দে প্লেটটা গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল। টেবিলে বসা বাকিরা চমকে উঠলেও কেউ কোনো মন্তব্য করল না। অনি মনে মনে ভাবল, ‘অনিলা ছেলেকে নিয়ে নিচে না নেমে ভালোই করেছে।’
​আবেশের ক্রোধ তাতেও কমল না। সে উঠে দাঁড়িয়ে টেবিল থেকে পানির গ্লাসটাও ছুড়ে মারল। তারপর উন্মত্ত গলায় চেঁচিয়ে বলল, “আমি আমার ভালোবাসাকে ঠকাইনি! ও নিজেই আমাকে বলেছিল, যে আমাকে ভালোবাসবে, আমি যেন তার হই। আমার ভালোবাসা আমাকে অনুমতি দিয়েছিল বলেই আমি অন্য কারও হয়েছি। কিন্তু আমি এখনো আমার বুনোফুলকেই ভালোবাসি। আজীবন তাকেই ভালোবেসে যাব।”

​সবটুকু রাগ উগরে দিয়ে আবেশ দ্রুত পায়ে ডাইনিং রুম তথা বাড়ি থেকেই বেরিয়ে গেল।
তাদের এই চিৎকার-চেঁচামেচি শুনে অনিলা ছেলেকে কোলে নিয়ে সিঁড়ির কাছে এসে দাঁড়িয়েছিল। ঠিক সেখানেই দাঁড়িয়ে ছিল লামহা। আবেশের প্রতিটি তিক্ত কথা তীরের মতো তার বুকে বিঁধেছে, তবুও তার মুখাবয়ব অদ্ভুত রকমের শান্ত।
​অনিলা লামহার দিকে তাকিয়ে কিছুটা সহানুভূতির সুরে বলল, “ওনার কথাগুলো শুনে তোমার খুব খারাপ লাগছে, তাই না?”
​লামহা আলতো করে নিজের স্ফীত পেটের ওপর হাত রাখল। মলিন হেসে বলল, “নতুন করে আর কীইবা খারাপ লাগবে? আমি এগুলো শুনে অভ্যস্ত! খারাপ লাগে না। সব মেয়ের কপালে কি আর স্বামীর ভালোবাসা জোটে? ওর বাচ্চার মা হচ্ছি, সেটাই তো অনেক।”
​অনিলা তিতকুটে হেসে ফুলের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করতেই যাচ্ছিল, তার আগেই লামহার নজর পড়ল অনিলার কোলে থাকা ছোট্ট অভ্রনীলের ওপর। সে খানিকটা ইতস্তত করে বলল, “একটু কোলে নেব তোমার ছেলেকে?”
​অনিলা মৃদু হেসে অভ্রনীলকে তার বাড়িয়ে দেওয়া দুই হাতের ওপর ছেড়ে দিল। লামহা অত্যন্ত দক্ষ হাতে শিশুটিকে বুকের কাছে জড়িয়ে ধরল। অনিলা কিছুটা অবাক হয়ে বলল, “বাহ্! নিজের বাচ্চা পৃথিবীতে আসার আগেই তো দেখছি বাচ্চা কোলে নেওয়া শিখে গেছ?”

​লামহা অভ্রনীলের নরম তুলতুলে গালে নিজের ঠোঁট ছুঁইয়ে দিল। ফিসফিস করে বলল, “হ্যাঁ, আমি ট্রেনিং নিয়েছি।”
​“বাচ্চা কোলে নেওয়ার ট্রেনিং?”
​“হুম।”
​উর্বী ততক্ষণে খাওয়া শেষ করে ওপরের দিকে তাকাল। ওদের দুজনকে কথা বলতে দেখে সে গুটিগুটি পায়ে ওপরে চলে এল। লামহার সামনে এসে দাঁড়াতেই তার চোখ দুটো তপ্ত হয়ে উঠল। সে কোনো ভূমিকা ছাড়াই লামহাকে প্রশ্নবিদ্ধ করল, “ফুলকে তোমরা কোথায় লুকিয়ে রেখেছ, জলদি বলে দাও আমাদের।”
​লামহা উত্তর না দিয়ে অভ্রনীলকে অনিলার কোলে ফিরিয়ে দিল। তারপর পেছন ঘুরে চলে যেতে উদ্যত হতেই উর্বী হ্যাঁচকা টানে তার বাহু চেপে ধরল। আকস্মিক চাপে লামহা ব্যথায় ককিয়ে উঠতেই উর্বী দাঁত কিড়মিড়িয়ে নিচু গলায় বলল, “দেখো, আমরা দুজন ফুলের বন্ধু। বলে দাও ফুল কোথায় আছে, আমি কথা দিচ্ছি তেহকে কিছুই জানাব না। উলটো ওকে লুকিয়ে রাখতে তোমাদেরকে সাহায্য করব।”
​লামহা ব্যথায় ছটফট করে হাতটা ছাড়ানোর চেষ্টা করতে করতে বলল, “আমি তো আগেই বলেছি, বাড়ির পূর্ব পাশে…”

​অনিলা মাঝপথেই কথা কেড়ে নিয়ে কঠোর গলায় বলল, “আমরা ফুল নামের মেয়ের কথা জিজ্ঞেস করেছি, গাছের ফুলের কথা নয়। তুমি ওকে না চেনার ভান কোরো না।”
​“উফ্! ছাড়ো আমাকে! ব্যথা পাচ্ছি!”
​উর্বী আরও শক্ত করে ধরল, “আগে বলবে ও কোথায় আছে, তারপর ছাড়ব!”
​ঠিক তখনই কোথা থেকে যেন ঝড়ো গতিতে তেড়ে এলেন মাহবুবা সুলতানা। উর্বীর হাত থেকে লামহাকে ছাড়িয়ে নিয়ে বেশ কড়া গলায় বললেন, “তোমরা কিন্তু এবার সত্যিই বাড়াবাড়ি করছ!”
​উর্বী একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজের হাত দুটো গুটিয়ে নিল, “দুঃখিত আন্টি, কিন্তু ফুলের এটা জানা প্রয়োজন যে ওর পেটে ট্র্যাকিং ডিভাইস আছে। তেহ ওকে ট্রেস করে ফেলতে পারে।”
​লামহা নিজের বাহুটা ডলতে ডলতে দাঁত চেপে হাসল, “তাহলে তো ভালোই! সেটা ট্রেস করেই খুঁজে নিতে বলো গিয়ে!”
​কথাটা ছুড়ে দিয়েই লামহা আর দাঁড়াল না, গটগট করে হেঁটে চলে গেল নিজের ঘরের দিকে। অনিলা উর্বীকে একটু দূরে টেনে নিয়ে বলল, “আরে, ফুল ধরা পড়ে গেলেই বা ওর কী? আবেশ এখনো ফুলকেই ভালোবাসে, সেই হিসেবে দেখতে গেলে ফুল তো এখন ওর চোখের বালি! ও কেন ফুলের ভালো চাইবে বলো?”
​উর্বী গালে তর্জনী ঠেকিয়ে কিছুক্ষণ ভাবল। অনিলার এই বিশ্লেষণটা একেবারে ফেলে দেওয়ার মতো নয়।

দুপুর গড়িয়ে বিকেল নেমেছে। উদ্যান সবেমাত্র কনসোলটা ঠিক করতে সক্ষম হয়েছে। পুরো বিশটা ঘণ্টা সে এই যন্ত্রের পেছনে ব্যয় করেছে। বুকের ভেতর দুরুদুরু কাঁপন নিয়ে সে কনসোলটা অন করল; নিষ্পলক চোখে চেয়ে রইল স্ক্রিনের দিকে—যদি একটা সিগন্যাল মেলে! কিন্তু না, কোনো সিগন্যাল এল না। তার মানে ফুল পঞ্চাশ কিলোমিটার পরিধির মধ্যে কোথাও নেই। যদিও এই সীমানার মধ্যে তার থাকার কথাও ছিল না, তবুও উদ্যান কোনো এক অজানা আশঙ্কায় অস্থির হয়ে উঠল।
​সে দ্রুত ল্যাব থেকে বেরিয়ে শোবার ঘরে এসে বাইকের চাবিটা তুলে নিল। ঠিক তখনই চোখ পড়ল ড্রেসিং টেবিলের আয়নার ওপর। নিজের প্রতিবিম্ব দেখে সে নিজেই থমকে গেল। চেহারার কী ছিরি হয়েছে তার! চোখের নিচে কালশিটে দাগ, চুলগুলো উসকোখুসকো। না, এমন জরাজীর্ণ অবস্থায় সে ফুলের সামনে যেতে পারবে না। উদ্যান কনসোলটা সাবধানে টেবিলে রেখে একটা কুইক শাওয়ার নিয়ে নিল।

​শাওয়ার শেষে ক্লোজেটের কাপড়গুলো ওলটপালট করে বহু খোঁজাখুঁজির পর সে একটা গোলাপি রঙের শার্ট বের করল। রংটা বড্ড চড়া, তার পার্সোনালিটির সাথে একেবারেই সাংঘর্ষিক, একদমই বেমানান। তবুও আজ সে এই বোকা বোকা রঙের শার্টটাই গায়ে জড়াল। যত যাই হোক, এটাই তো তার বউয়ের প্রিয় রং! এই রঙের উছিলায় অভিমানী মেয়েটা যদি কয়েক সেকেন্ড বেশি তাকায় তার দিকে, সেটাই এই বোকা রংটার সার্থকতা।
​উদ্যান ফোন অন করার চেষ্টা করতেই টের পেল সেটাতে চার্জ নেই। কিছুটা বিরক্ত হয়ে সে তড়িঘড়ি করে ওটা চার্জে বসাল এবং নিচে নেমে এল। ফুলের রুমে ঢুকে আলমারি খুলে বের করল তাদের বিয়ের শাড়িটা। লাল টকটকে শাড়িটা দুহাতে জড়িয়ে ধরে, কোনো এক প্রিয় ঘ্রাণের ব্যাকুল তালাশে নাক গুঁজে একটা দীর্ঘশ্বাস নিল সে। যদিও কাপড়টা থেকে কেবলই ওয়াশিং সাবানের কৃত্রিম গন্ধ নাকে বিঁধল, তবুও উদ্যান ওটা একটা শপিং ব্যাগে পুরে নিয়ে মৃদুস্বরে বলল, “ভেবেছিলাম এমন ক্রিঞ্জ টাইপের কাণ্ডকারখানা আমার দ্বারা সম্ভব হবে না। কিন্তু এই পর্যায়ে তুই আর আমাকে ঠিক থাকতে দিলি কই? তোকে এই শাড়িটা পরিয়েই আবার তুলে আনার ভূত চেপেছে মাথায়।”

​রুমে ফিরে ফোনটা পকেটে গুঁজে, চুলগুলো হাত দিয়ে কোনোমতে গুছিয়ে নিয়ে উদ্যান বাড়ির বাইরে বেরিয়ে এল।
​বাইকটা স্টার্ট দিয়ে সে ঝড়ের গতিতে নেমে পড়ল ফুলের খোঁজে। শহরের সীমানায় পৌঁছানো মাত্রই আচমকা হাতের কনসোলটা ভাইব্রেট করে উঠল এবং স্ক্রিনে সবুজ আলোয় সিগন্যাল জ্বলে উঠল! উদ্যান সশব্দে বাইকের কড়া ব্রেক কষল। সে লোকেশনটা চেক করে দেখল, জিপিএস ইন্ডিকেটরটা খানজাদা নিবাসকেই নির্দেশ করছে!
​উদ্যানের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। সে আবার বাইক স্টার্ট দিল। ভরাট কণ্ঠে আওড়াল, “ওহ আচ্ছা, বাড়িতেই লুকিয়ে রেখেছে ওরা তোকে। একটু অপেক্ষা কর ফ্লাওয়ার, আমি আসছি তোর কাছে।”
​বাইক ছুটিয়ে উদ্যান আবারও খানজাদা নিবাসের সদর দরজায় এসে থামল। ড্রইংরুমে পা রাখতেই গর্জে উঠল সে, “কোথায় সবাই? এদিকে আয়!”

​তার গর্জনে বাড়ির যে যেখানে ছিল, একে একে সবাই এসে ড্রইংরুমে জড়ো হলো। আবেশ ভিড় ঠেলে উদ্যানের সামনে এসে দাঁড়িয়ে বলল, “আপনি এ বাড়ি থেকে ঠিক কখন বিদায় হবেন বলবেন তো? আমি তখনই বাড়িতে ফিরব। আপনার মুখটাও দেখতে ইচ্ছা করছে না আমার।”
​উদ্যান এক ঝটকায় আবেশের শার্টের কলারটা মুঠো করে চেপে ধরল। তাচ্ছিল্যের সুরে হিসহিসিয়ে বলল, “আমি তো ফ্লাওয়ারকে নিয়ে তবেই ফিরব।”
​আবেশ চরম বিরক্তিতে উদ্যানের হাতটা সরিয়ে দিল, “ফুলকে আর কোনোদিনও পাবেন না আপনি। ফুল সবার জীবনে আসে না। আপনি ভাগ্যবান ছিলেন বলেই ওকে পেয়েছিলেন, কিন্তু আপনি নিজের অহংকার আর অবহেলায় সেই ফুলকে পিষে নষ্ট করে ফেলেছেন। ও আর কোনোদিন ফিরবে না আপনার কাছে। কারণ ফুলের অভিমান বড় দুর্লভ। একবার সে অভিমান করে মুখ ফিরিয়ে নিলে দ্বিতীয়বার আর ফিরেও তাকায় না।”
​উদ্যান পকেট থেকে সেই কনসোলটা বের করে আবেশের চোখের সামনে ধরল, “পাবো! ওকে আমি এক্ষুণি পেয়ে যাব!”

​বলেই উদ্যান কনসোলের স্ক্রিনে চোখ রাখল। যন্ত্রটা এখন নিখুঁতভাবে লোকেশন ট্রেস করছে। সে আর কাউকে তোয়াক্কা না করে বাইরে বেরিয়ে গেল। বাকিরাও তৎক্ষণাৎ তার পিছু নিল।
​বিকেলের আলো ফুরিয়ে তখন চারদিকে আধো-অন্ধকার নেমে এসেছে। উদ্যান অপলক চোখে কনসোলের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে এগোচ্ছে। এদিকে তাকে বাড়ির পেছনের নিস্তব্ধ অংশটার দিকে ছুটে যেতে দেখে বাকিদের শরীর শিউরে উঠল।
​অনি নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। সে দ্রুত ছুটে গিয়ে উদ্যানের হাতটা ধরল, “তেহ! ওদিকে কোথায় যাচ্ছিস তুই?”

​অনির ভয়ার্ত কণ্ঠস্বরকে পাত্তাই দিল না উদ্যান। সে কনসোলের দিকে অবলীল দৃষ্টি রেখে ঠোঁটের কোণে অদ্ভুত হাসি ফুটিয়ে বলল, “আরে, আর একটুখানি দূরেই তো ফ্লাওয়ার আছে। এই তো, এক্ষুণি পেয়ে যাব আমি ওকে!”
​অনিকে আর কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়েই উদ্যান দ্রুতপায়ে এগিয়ে যেতে লাগল।
হঠাৎ তার সামনে পড়ল একটা বাঁশের তৈরি দরজা। সে দরজাটা খুলে ভেতরে ঢুকতেই পেছনে থাকা সবাই বাকরুদ্ধ হয়ে গেল। সোহম নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে না পেরে কয়েক পা পিছিয়ে গেল।
​উদ্যান ভেতরে ঢুকে চারদিকে তাকাল না। একটা ঈষৎ উঁচু মাটির ঢিবির সামনে গিয়ে ধপ করে বসে পড়ল। তার মস্তিষ্ক তখনও বাস্তবতা আঁচ করতে পারেনি। নিজের বুকের বাঁ-পাশে হাত রেখে কাতর গলায় বলল, “ইটস বিটিং ফ্লাওয়ার… ইটস রিয়েলি বিটিং সো ফাস্ট! আমার হৃৎস্পন্দন তোর স্পর্শ ছাড়াই তাল হারিয়েছে। জলদি আমার বুকে আয়, হার্টবিট… শুনে দেখ তোর প্রিয় শব্দটা।”
​উদ্যান চারপাশে হাতড়াতে লাগল, “তুই কোথায় ফ্লাওয়ার? তাড়াতাড়ি আয় না। ওদের এত বড় সাহস, ওরা তোকে এত শীতের মধ্যে বাইরে রেখেছে! তোর খুব শীত করছে, তাই না? এদিকে আমার বুকে আগুন জ্বলছে, আর ওদিকে তুই শীতে কষ্ট পাচ্ছিস?”

​বলতে বলতে উদ্যান হঠাৎ সামনের উঁচু মাটির ঢিবি থেকে দুই হাতে মাটি সরাতে লাগল। তার নখ ফেটে রক্ত বেরোনোর উপক্রম, কিন্তু সেদিকে কোনো হুঁশ নেই। ভেঙে পড়া গলায় সে বিলাপ করল, “এটা কোন ধরনের ইয়ার্কি, ফ্লাওয়ার? ওরা তোকে মাটির নিচে রেখেছে কেন? ওরা কি ভুলে গেছে, এই বাড়িটার অর্ধেক আমি তোর নামে লিখে দিয়েছি? তবুও তোর জন্য এত বড় বাড়িটায় একটুখানি জায়গা হলো না?”
​লুহান উদ্যানকে থামাতে এক পা বাড়াতেই রিদম বাধা দিয়ে বলল, “ওকে নিজে থেকেই রিয়েলাইজ করতে দে।”
​লুহানের কণ্ঠস্বর বুজে এল। গলাটা যেন কেউ শক্ত হাতে চেপে ধরেছে, “ও মেয়েটাকে টেনে বের করবে, রিদম! ও পাগল হয়ে গেছে! ওকে আটকানো দরকার!”

​“না, রিয়েলাইজ করাটাই এই মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি দরকার।” রিদমের নিজের গলাও কেঁপে উঠল।
​উদ্যান অনবরত মাটি সরিয়েই যাচ্ছে। প্রায় আধা ঘণ্টা ধরে মাটি খামচানোর পর সে আঙুলের ডগায় নরম কিছু অনুভব করল। সে আরও কিছুটা মাটি সরাতেই বেরিয়ে এল কর্দমাক্ত এক টুকরো কাপড়ের অংশ।
​উদ্যানের তৎপরতা আচমকা কমে গেল। সে স্থির হয়ে তাকিয়ে রইল শুধু। তার হাত কাঁপল, তবুও পুনরায় মাটি সরাতে লাগল। এবার আর আগের মতো তাড়াহুড়ো নেই।
মাটি একটু একটু করে সরে যেতেই ধীরে ধীরে দৃশ্যমান হলো একটা হাত। উদ্যান হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে হাতটা আঁকড়ে ধরল, “ফু…ল! ফুল, এই দেখ আমি তোর নাম ধরে ডেকেছি তো। তুই শুনতে পাচ্ছিস? একবার… শুধু একবার আমাকে ‘উদ্যান’ বলে ডাক। আমি আর কোনোদিন তোকে শাস্তি দেব না রে। এই উদ্যান তোর হাত ধরে তোকে কথা দিচ্ছে, আর কোনোদিন তোকে কাঁদাবে না।”
​উদ্যান হাতটা নিজের গালে রাখতে চাইল, কিন্তু সেটা অস্বাভাবিক শক্ত হওয়ার কারণে সে নিজেই নুয়ে পড়ে গালটা লেপ্টে দিল কর্দমাক্ত হাতটার ওপর, “এই পরাণ… কথা বলছিস না কেন? তুই আমাকে বকাঝকা কর, আমাকে পানিশ কর। আমি তোকে কিচ্ছু বলবো না। তুই আমাকে যা বলবি আমি তাই করবো। তোর দেওয়া অন্য যেকোনো শাস্তি মাথা পেতে নেবো। শুধু এতোটা দূরে চলে যাস না… যতটা দূরে গেলে… তোকে ধরাছোঁয়ার সাধ্য আমার থাকবে না।”

​উদ্যান আবারও দ্রুতবেগে মাটি সরাতে লাগল। মাটি পুরো সরে যেতেই ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে উঠল কাপড়ে মোড়ানো, আংশিক পচে-গলে যাওয়া একটা মানবদেহ।
উদ্যান কয়েক সেকেন্ডের জন্য থমকে গেল। তারপর খুব সাবধানে সে মুখের দিকটা পরিষ্কার করতে লাগল। সবশেষে বিকৃত হয়ে যাওয়া মুখটার দিকে ভালো করে তাকাতেই উদ্যানের বুক চিরে গগনবিদারী আর্তনাদ ঠিকরে বেরোল, “নাহহহ… ফুল! কী হয়েছে তোর? তোকে এমন দেখাচ্ছে কেন, ফ্লাওয়ার?”
উদ্যান গলিত লাশটাকে নিজের কোলে টেনে নিল। পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা অনিলা এই বীভৎস দৃশ্য দেখে আর নিজের ভারসাম্য ধরে রাখতে পারল না; চোখ দুটো উল্টে সে যখন মাথা ঘুরে পড়ে যেতে নিচ্ছিল, ঠিক তখনই অনি তাকে সামলে নিল।

উর্বীর শরীরটা যেন পাথরে পরিণত হয়েছে। এর আগে কাজের সূত্রে সে অনেকবার লাশ দেখেছে, কিন্তু এমন অনুভূতি তার কখনো হয়নি। সে ধপ করে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল।
​তার মানসপটে ভেসে উঠল অতীতের কোনো একদিন; তারা সেদিন সোলার এস্টেটের গার্ডেনে বসে ছিল। ফুল নামের মেয়েটা বায়না ধরেছিল, ‘আমরা বন্ধু হব। চলো পিংকি প্রমিজ করি।’
​তারা তিনজন আঙুলে আঙুল মিলিয়ে একসাথে বলেছিল, ‘আমরা তিন বন্ধু, সুখ-দুঃখ যাই হোক পরস্পরের সাথে ভাগাভাগি করে নেব; একদিন শুধু বন্ধু থেকে খুব ভালো বন্ধু হব।’
​সেই স্মৃতি মনে পড়তেই উর্বী দুই হাতে মুখ চেপে হু হু করে কান্নায় ভেঙে পড়ল। রিদম নিজেকে সামলাবে, নাকি উর্বীকে সান্ত্বনা দেবে? ভেবে পেল না। তবুও সে উর্বীর মাথাটা নিজের বুকে টেনে নিল।
​লুহানের পা দুটো যেন অবশ হয়ে গেল; দাঁড়িয়ে থাকার শক্তিটুকু হারিয়ে সে হাঁটু ভেঙে মাটিতে বসে পড়েছে। আর সোহম? সে চরম ভয়ে, আতঙ্কে পিছাতে পিছাতে বাগানের এক কোণে গিয়ে জড়োসড়ো হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
​অনি তো আগে থেকেই ভীষণ আবেগপ্রবণ। মাঝখানে যে একটা শক্ত খোলস ধরে রেখেছিল, আজ সেটাও খসে পড়ল। তার চোখের সামনে বারবার ভেসে উঠতে লাগল ফুলের নিষ্পাপ মুখটা, মেয়েটা কত আদুরে ছিল, কতটা ভালোবাসার কাঙাল ছিল!

​অনতিদূরেই দাঁড়িয়ে ছিল আবেশ, লামহা, মাহবুবা সুলতানা আর রেহানা বেগম। মেয়ের জন্য আগেই চোখের জল বিসর্জন দিয়ে ফেলেছেন রেহানা বেগম, তবুও আজ তিনি কান্না থামাতে পারলেন না। মাহবুবা সুলতানাও আঁচলে মুখ ঢেকে নিঃশব্দে কাঁদছেন। লামহা চোখের কোণে জল নিয়ে আবেশের দিকে তাকাল। আবেশ একটা গাছের সাথে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল; তার চোখে পানি নেই। সে কাঁদতে ভুলেছে আরও আগেই।
​হঠাৎ সোহম ছুটে এসে আবেশের শার্টের হাতা ধরে হ্যাঁচকা টান মেরে তাকে সবার সামনে নিয়ে এল। সে মাথা ঝাঁকিয়ে বলতে লাগল, “এসব মিথ্যা, তাই না আবেশ? বলো এসব… এই সবকিছু মিথ্যা! ওটা আমাদের ফুল নয়, হতেই পারে না!”

​আবেশ নির্লিপ্ত চোখে তাকাল, “ওটাই ফুল, এত অবাক হচ্ছেন কেন? আপনাদের তেহ আমার বুনোফুলকে কেড়ে নিয়ে মেরে ফেলেছে। আপনারা সবাই সবটাই জানেন; তাই এই মুহূর্তে না জানার ভানটা অন্তত আমার সামনে করবেন না। অনেকক্ষণ ধরে আপনাদের নাটক সহ্য করছি আমি।”
​সোহমের বুকের ভেতরটা ধড়ফড়িয়ে উঠল, “কিন্তু তেহ তো বলেছিল ও ফুলকে বাড়িতে রেখে গেছে!”
​“হ্যাঁ, ওনার কাছে হয়তো ওকে মাটি দেওয়ার জায়গা ছিল না। সেই জন্যই বাড়ির সামনে ওর লাশটা ওভাবে ফেলে রেখে গিয়েছিল। আমার শুধু একটাই প্রশ্ন—কেন তিন-তিনটে গুলি করা হয়েছিল আমার বুনোফুলের পেটে? একটা গুলিই কি যথেষ্ট ছিল না ওকে মেরে ফেলার জন্য?”
​“গুলি? তেহ ওকে গুলি করেছিল?”
​“ওহ আচ্ছা, আপনারা জানেনই না? ভালো নাটক করছেন, চালিয়ে যান।”
​“বিশ্বাস করো, আমরা কিছুই জানি না।”
​“বিশ্বাস? বিশ্বাস করলেই কি আমার বুনোফুল ফিরে আসবে? আসবে না তো। আপনাদের বিরুদ্ধে আমার কাছে কোনো প্রমাণ নেই বিধায় আমি আপনাদেরকে পুলিশে দিতে পারছি না। কিন্তু আমি নিশ্চিত যে আপনারা সবাই ফুলের খুনের সাথে জড়িত।”

​আবেশ এবার আঙুল উঁচিয়ে লাশের বুকে মুখ থুবড়ে পড়ে থাকা উদ্যানকে দেখাল। তার চোখ দুটো তীব্র ঘৃণায় জ্বলে উঠল, “ওই ডেভিলটা! ফুলকে মেরে ফেলে এখন নাটক করতে এসেছে। মরার পরেও ওকে শান্তি দিচ্ছে না, টেনে বের করেছে কবর থেকে। কী প্রমাণ করতে চাইছে টা কী?”
​আবেশ এবার বাকিদের দিকে তাকিয়ে কড়া গলায় বলল, “দশ মিনিটের মধ্যে যদি ফুলকে আগের জায়গায় দাফন না করা হয়, তবে আমি পুলিশ ডাকব, বলে দিলাম।”
উদ্যান সোজা হয়ে বসে ফুলের মাথাটা নিজের বুকের সাথে আঁকড়ে ধরল। ভয়ে তার পুরো শরীর থরথর করে কাঁপছে; একই সাথে হৃৎপিণ্ডটা যেন বুকের পাঁজর চিরে বেরিয়ে আসার উপক্রম। ফুলের দিকে তাকানোর সাহস তার নেই, তবুও নিজের ওপর জোর খাটাল সে। এত বেশি জোর খাটাল যে আজ তার চোখের বাঁধ ভেঙে গেল। সে নিচের ঠোঁট কামড়ে ধরে ফুলের অর্ধগলিত মুখটা সামনে তুলে ধরল। ঠিক তখনই টুপ করে এক ফোঁটা লাল রক্ত ঝরে পড়ল ফুলের গালে।
​উদ্যান খুব আলতো করে তার গালে হাত রাখল।

“এই দেখ আমি কাঁদছি। তুই আমাকে কাঁদতেও শিখিয়ে দিয়েছিস, প্রিমরোজ।”
​উদ্যান হয়তো টেরও পেল না যে তার চোখ বেয়ে পানির পরিবর্তে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে। তীব্র মানসিক চাপে তার চোখের সূক্ষ্ম রক্তকোষগুলো ফেটে অশ্রু রূপে ধাবিত হচ্ছে।
​উদ্যান আলগোছে আবারও ফুলকে জড়িয়ে ধরল। ঠোঁট দুটো লাশের কানের কাছে নিয়ে বিড়বিড় করল, “আমি মেরে ফেলেছি তোকে? আমি… আমি তোকে বাঁচতে দিলাম না, ফুল? আমি তোকে মেরেই ফেললাম? আমার কপালে সইল না তোর ভালোবাসা? এভাবে কেউ নিজের পরাণকে নিজের হাতেই শেষ করে ফেলে? আমি কেন ফেললাম? আমার প্রিমরোজ আর নেই? কোথাও নেই? ও এই বাতাসে আর শ্বাস নিচ্ছে না? তবে… তবে আমি কেন নিচ্ছি?”
​উদ্যান হঠাৎই বাঁ হাত দিয়ে কোমরে গুঁজে রাখা বন্দুকটা বের করে নিজের ডান হাতে গুলি চালিয়ে দিল! অকস্মাৎ এমন বিকট শব্দে বাকিদের হুঁশ উড়ে গেল।
রিদম উর্বীকে ছেড়ে দিয়ে চটজলদি নিজের আবেগ নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নিল। সে লুহানের কাঁধে হাত রেখে বলল, “লোবো, টেইক দ্য গান আউট অফ হিজ হ্যান্ড। নাউ। দেন গেট হিম ব্যাক কুইক। হারি আপ, বিফোর এভরিথিং গেটস আউট অফ হ্যান্ড।”

​উদ্যান ফুলের ঘাড়ে নিজের মুখ গুঁজে দিল। সেখান থেকে আর ভেসে এল না সেই মনমাতানো চেনা সুবাস; কেবল নাকে বিঁধল পচা মাংসের উটকো গন্ধ। উদ্যানের কান্নার মাত্রা আরও বেড়ে গেল। সে লাশের গায়ে নিজের নাক ঘষতে ঘষতে রুদ্ধশ্বাসে বলল, “আমি ভালোবাসি না তোকে, প্রিমরোজ… একটুও ভালোবাসি না! তবুও তোকে ছাড়া আমার পুরো দুনিয়াটা অন্ধকার। আমি যেদিকে তাকাই সেদিকেই শুধু তোকে দেখতে চাই। আমার দুনিয়া তোকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয়। সেই তোকেই আমি শেষ করে ফেললাম? এভাবে? আচ্ছা… যেই উদ্যানে প্রিমরোজ ছাড়া কখনো কোনো আগাছাও জন্মেনি, সেই প্রিমরোজকে ছাড়া কি সেই উদ্যানকে কল্পনা করা যায়? যায় না তো, একেবারেই যায় না। আমি তেমনি তোকে ছাড়া নিজেকে কল্পনাও করতে পারছি না রে জান।”
​বন্দুকের নলটা উদ্যান নিজের মাথায় ঠেকাল। তার আঙুল ট্রিগার টানার জন্য তৈরি, ঠিক তখনই লুহান ঝড়ের বেগে এসে বন্দুকটা অতর্কিতে কেড়ে নিল।
​তাকে কোনো রকম প্রতিক্রিয়া দেখানোর সুযোগটুকুই দিল না অনি, লুহান আর রিদম। তারা তিনজন পেছন থেকে এসে উদ্যানের হাত দুটো শক্ত করে চেপে ধরল।
উদ্যান গর্জে উঠল, “লিভ মাই হ্যান্ডস!”
​কেউ উদ্যানের কোনো কথাই শুনল না, বরং তাকে টেনেহিঁচড়ে পেছনের দিকে নিয়ে যেতে শুরু করল।

​“আই সেড লিভ মাই হ্যান্ডস!”
​উদ্যানের শরীরে প্রতিরোধ করার মতো শক্তি অবশিষ্ট ছিল না, তবুও সে চেষ্টা চালাল, “লোবো, ইটস অ্যান অর্ডার। লিভ মাই হ্যান্ডস!”
​লুহান তার কথায় কর্ণপাত করল না। উদ্যান ক্ষোভে ফেটে পড়ে এক ঝটকায় সরিয়ে দিল তাদেরকে। তারপর হামাগুড়ি দিয়ে আবারও যেতে চাইল সেই মৃতদেহটার দিকে। কিন্তু পৌঁছানোর আগেই তাকে আবারও আটকে ফেলল লুহান, অনি আর রিদম।
উদ্যানের দানবীয় শক্তির সাথে না পেরে তারা তিনজন তাকে সেভাবেই মাটির সাথে চেপে ধরল।
​উদ্যান মাটির সাথে পিষ্ট হয়ে, রক্তাক্ত চোখে অপলক তাকিয়ে রইল সামনে পড়ে থাকা মৃতদেহটার দিকে। তার চোখ দিয়ে তখনও টপটপ করে ঝরছিল রক্তাশ্রু।
​শীতের মাঝেও উদ্যানের চুল বেয়ে ঘাম গড়িয়ে পড়ছে। তার ঘন ঘন নেওয়া দীর্ঘশ্বাসের তাপে ধুলোর মতো উড়ছে বাতাসে মিশে থাকা আর্দ্রতা। যেন সে চোখের পলক ফেলতেও ভুলে গেছে; অসাড় হয়ে কেমন মাটির সাথে লেপ্টে আছে।
অনি মনে মনে ভাবল, উদ্যান হয়তো ব্ল্যাক আউট হয়ে গেছে। অবচেতনেই তার হাতের বাঁধন কিছুটা ঢিলে হয়ে আসতেই উদ্যান আচমকা হাতটা ছাড়িয়ে নিয়ে কয়েক মিটার দূরে পড়ে থাকা অবশিষ্টাংশের দিকে বাড়িয়ে দিল। উদ্যানের ঠোঁট নড়ল না, কিন্তু তার ভাঙাচোরা চেতনাজুড়ে যেন কেউ গেয়ে চলল:

​“দূরে….. দূরে কোথাও যেও না
দূরে গেলে যে মন সহে না।
জানপাখি গো আমার, প্রাণসখী গো
জানেরই জান, পরাণের আধখান।
দূরে…… দূরে কোথাও যেও না
দূরে গেলে যে মন সহে না।”
​সুরটা কোথা থেকে আসছে উদ্যান জানে না। স্মৃতি থেকে, নাকি শোকের অতল গহ্বর থেকে সেটাও বুঝতে পারল না। শুধু মনে হলো, ফুল তাকে ছেড়ে অনেক দূরে চলে যাচ্ছে।
​উদ্যান আবারও মুক্ত হওয়ার জন্য ছটফট করতে শুরু করল। লুহান সোহমকে খোঁজার চেষ্টায় আশেপাশে নজর বুলিয়ে দেখল সে এক কোণে জড়োসড়ো হয়ে বসে আছে। উর্বী অনিলাকে সামলাতে ব্যস্ত, বাকি রইল মেলো।
লুহান এবার মেলোকে বলল, “ফুলকে আড়াল করে দাঁড়া। কিছুক্ষণের মধ্যেই আমাদের স্পেশাল ফোর্স চলে আসবে, কুইক।”

​মেলো এতক্ষণ ধরে পাথর হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল; লুহানের ডাকে তার ঘোর কাটল। সে ভারী পদক্ষেপে ফুলের সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই উদ্যান হুংকার ছাড়ল, “সরে যা! সরে যা সামনে থেকে!”
​উদ্যানকে এই অবস্থায় দেখতে হবে তা কখনো ভাবেনি মেলো। পেছনে থাকার কারণে সে এতক্ষণ উদ্যানের মুখটা দেখতে পায়নি। দানবটাকে এমন অসহায় হয়ে পড়তে দেখে তার চোখদুটোও ভিজে উঠল। সে আর উদ্যানের দিকে তাকাতে পারল না।
​উদ্যান প্রলাপ শুরু করল, “তোদেরকে আমি ভাই বানিয়েছিলাম… আর তোরাই আজ আমার হৃৎস্পন্দন থামিয়ে দিতে চাইছিস?”
​এহেন অভিযোগে রিদম চকিত নয়নে তাকাল, “তুই নিজের হাতে নিজেকে শ্যুট করেছিস, তেহ! এমনকি মাথায়ও শ্যুট করার ট্রাই করেছিলি। আমরা তোকে মরে যেতে দিতে পারি না। তোর হৃৎস্পন্দন থামিয়ে দিতে নয়, বরং ওটাকে সচল রাখতেই তোকে আটকে রেখেছি।”

​“আমাকে… শেষবারের মতো ওর কাছে যেতে দে।”
​রিদম মাথা নেড়ে বাকিদের ইশারায় নিষেধ করল।
​কিছুক্ষণের মধ্যেই তাদের স্পেশাল ফোর্স এসে পৌঁছাল। তাদের মাঝখানে দেখা গেল কয়েকজন সাদা পোশাক পরিহিত মহিলাকে। তাদেরকে মৃতদেহটার দিকে এগিয়ে যেতে দেখে উদ্যানের চাউনি তীক্ষ্ণ হয়ে উঠল।
​“ওদের বারণ কর, রুড! ওরা যদি ফুলকে টাচ করে, আমি ওদেরকে জ্যান্ত পুড়িয়ে মারব!”
​রিদমের গলাটা শুকিয়ে এলেও সে উদ্যানের হুমকি উপেক্ষা করল। উদ্যান ঝাপসা চোখে দেখল, একজন মহিলার হাতে সাদা কাফনের কাপড়। সে অবচেতনেই বুঝতে পারল, ফুলকে আবারও সাদা কাফনের কাপড়ে মুড়িয়ে দাফন করে দেওয়ার তোড়জোড় চলছে।
​উদ্যান এবার অনুনয় করতে লাগল, “আমাকে শেষবারের মতোও ওর কাছে যেতে দিবি না তোরা? এতটা নিষ্ঠুর আচরণ করবি আমার সাথে? দে না রে, একবার যেতে দে। আমি ওকে আর একবার শুধু জড়িয়ে ধরব, একটুও কষ্ট দেব না, বিশ্বাস কর। আরে, আমি কি ওকে মারতে চাইছি? একবার জড়িয়েই তো ধরতে চাইছি। তাও কেন দিচ্ছিস না?”

​লুহান শক্ত গলায় বলে উঠল, “মে`রেই তো ফেলেছিস! ম`রা ফুলকে আর কী মা`রবি?”
​লুহানের এই বাক্যবাণে বিদ্ধ হলো উদ্যানের হৃৎপিণ্ড। রিদম এবার ক্ষিপ্ত হয়ে লুহানকে ধমকে উঠল, “লুহান! তোর কি মনে হচ্ছে ওরও এই অপরাধবোধে ম`রে যাওয়া উচিত? বল! যদি তেমনটাই মনে করিস, তবে ছেড়ে দে ওকে। যা ইচ্ছা করুক গে!”
​লুহান প্রত্যুত্তর করল না, শুধু আরেকটু শক্ত করে পিঠের সাথে চেপে ধরল উদ্যানের হাতটা।
​তন্মধ্যেই স্পেশাল ফোর্সের একজন ডাক্তার দ্রুত এগিয়ে এসে উদ্যানের ডান হাতটার প্রাথমিক চিকিৎসা করতে লাগলেন। গুলিটা তার হাতের তালু এফোঁড়-ওফোঁড় করে বেরিয়ে গেছে, সেখান থেকে অবিরাম রক্ত ঝরছে।
উদ্যান দিকবিদিকশূন্য হয়ে বলল, “আমি তোদের পায়ে পড়ি… দোহাই তোদের, ওর কাছে যেতে দে আমাকে। আর সইতে পারছি না। এভাবে তোরা আমাকে বাঁচিয়ে রাখতে পারবি না… আমি ম`রে যাব…”
​তার কথা শুনে ভড়কে গেল তিনজনই।

রিদম চোখের ইশারায় দুজন সশস্ত্র গার্ড ডেকে তাদেরকে উদ্যানের পা দুটো শক্ত করে চেপে ধরতে বলল। তারপর সে এগিয়ে এসে হাঁটু গেড়ে বসল উদ্যানের ঠিক সামনে। মাথায় হাত রাখতেই উদ্যান বহু কষ্টে মুখ তুলে তাকাল।
​রিদম তার দিকে তাকিয়ে কঠিন গলায় বলল, “তুই তো ভালো-টালো বাসিস না মেয়েটাকে! তবে কেন এমন পাগলামি করছিস? মে`রে ফেলেছিস, ফেলেছিস! এখন কেন নিজেকেও মে`রে ফেলতে চাইছিস?”
​উদ্যান অবরুদ্ধ কণ্ঠে বলল, “কারণ… কারণ ওকে ছাড়া আমার সব শান্তি অশান্তিতে পরিণত হয়েছে। তীব্র অশান্তির আগুন জ্বলছে বুকের ভেতর। ওকে জড়িয়ে না ধরা পর্যন্ত এই আগুন নিভবে না।”
​রিদম আবেগপ্রবণ হয়ে পড়ল। সে গার্ডদের দিকে তাকিয়ে চোখের ইশারায় প্রস্তুত থাকতে বলল, তারপর পাশে থাকা লুহানকে আদেশ করল, “লোবো, লিভ হিম।”
লুহান বলল, “ওকে ছেড়ে দিলে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ হাতের বাইরে চলে যাবে!”
​অনি পাশ থেকে বলে উঠল, “পরিস্থিতি বিগড়ে যাওয়ার ভয়ে আমরা ওকে এভাবে কষ্ট দিতে পারি না, লুহান। ও তো জাস্ট একবার… শেষবারের মতো মেয়েটাকে জড়িয়ে ধরতে চাইছে, তাই না?”
​লুহানেরও উদ্যানকে এভাবে আটকে রাখতে ভালো লাগছিল না। তারা তিনজন ধীরে ধীরে উদ্যানের ওপর থেকে নিজেদের বাঁধন আলগা করে দিল। মুক্ত হতেই উদ্যান নিজের বাম হাতটা মাটিতে ঠেকিয়ে পুরো শরীরটাকে ওপরে তুলল।

সন্ধ্যার শেষ আলোটুকুও নিভে গিয়ে চারদিকে তখন ঘুটঘুটে অন্ধকার নেমে এসেছে। ফ্ল্যাশের কৃত্রিম আলোয় সবকিছু ভূতুড়ে দেখাচ্ছে। প্রত্যেকটা পদক্ষেপে উদ্যানের বুক হাপরের মতো ওঠানামা করছে।
​রিদম ডাক্তারকে ডেকে বলল, “ওর জন্য একটা হাই-ডোজের ঘুমের ইনজেকশন রেডি রাখুন।”
​উদ্যান এগিয়ে যেতেই মহিলাগুলো একপাশে সরে দাঁড়াল। উদ্যান ঝাপসা চোখে চারপাশে নজর বুলাল। একটু দূরেই ঘাসের ওপর পড়ে ছিল লাল শাড়ির শপিং ব্যাগটা। সে শপিং ব্যাগটা তুলে নিয়ে শাড়িটা বের করল। শাড়িটা মেলে ধরে ফুলের অর্ধগলিত শরীরের ওপর জড়িয়ে দিল সে। তারপর তাকে পাঁজাকোলা করে তুলে নিজের বুকের সাথে মিশিয়ে নিল।

​ফুলের কপালে নিজের ঠোঁট ঠেকিয়ে, চুলে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে উদ্যান বলল, “তোকে খুব সুন্দর লাগছে, ফুল। এই শাড়িটায় তোকে সুন্দর লাগে। এটাই তো শুনতে চেয়েছিলি, তাই না? এভাবেই তো বউয়ের প্রশংসা করতে হয়! আমি কখনো সেটুকুও করিনি। তুই কেন এলি আমার মতো একটা অমানুষের জীবনে? কেন ফুলেরা আসে অমানুষদের জীবনে? কেন তারা সেই অমানুষটাকেই নিজের জান-প্রাণ দিয়ে ভালোবেসে ফেলে? তুই আমাকে ভালোবেসে কী পেলি? অবহেলা, অনাদর, অশান্তি ছাড়া যে কিছুই দিতে পারলাম না তোকে। অথচ বিনিময়ে তুই আমাকে নিজের সবটুকু উজাড় করে দিলি; সমাপ্তিতে নিজের প্রাণটাও! আমি কীভাবে তোকে মেরে ফেললাম রে? কীভাবে? আমার একটুও হাত কাঁপল না?”
​উদ্যান ফুলকে নিয়ে উঠে দাঁড়াতেই গার্ডরা সতর্ক হয়ে গেল। উদ্যান একপলক রক্তাভ চোখে চারপাশের সবাইকে দেখে নিল। তারপর সবাইকে স্তম্ভিত করে দিয়ে, ফুলকে কোলে নিয়েই দৌড় লাগাল! গার্ডরা তাকে আটকাতে গেল ঠিকই, কিন্তু তাকে আটকাতে সফল হলো না। উদ্যানের মতো ফাইটারের সাথে না পারাটাও অস্বাভাবিক নয়, উপরন্তু এ মুহূর্তে যেন তার শরীরে দানব ভর করেছে।
​কয়েক মিনিটের ব্যবধানেই উদ্যান খানজাদা নিবাসের মূল ফটক পেরিয়ে বাইকে উঠে বসল। ডান হাতটা গুলিতে ঝাঁঝরা হয়ে যাওয়ায় সে বাম হাত দিয়েই অত্যন্ত নিখুঁতভাবে বাইকটা স্টার্ট দিল। বাকিরাও তাকে তৎক্ষণাৎ অনুসরণ করতে লাগল।

পিছিয়ে পড়ল অনি। উর্বী অভ্রনীলকে নিয়ে গেলেও অনিলা এখনও অচেতন। অনি আর কালক্ষেপণ না করে অনিলাকে কোলে তুলে নিয়ে গাড়ির দিকে এগিয়ে গেল। তাকে গাড়ির পেছনের সিটে শুইয়ে দেওয়ার পরেই অনির হঠাৎ মনে পড়ে গেল সোহমের কথা।
​সে হন্তদন্ত হয়ে ফিরে গিয়ে দেখল, সোহম এক কোণায় জবুথবু হয়ে বসে আছে। অনি তাকে টেনে তুলল, “নিজেকে সামলা, সোহম! তুই এভাবে ভেঙে পড়লে আমরা তেহকে কীভাবে হ্যান্ডেল করব বল তো?”
​সোহম চোখ মুছে মলিন কণ্ঠে বলল, “ওর কথা বাদ দে অনি। ফুলকে মে`রে ফেলেও ও এমন ভান করেছিল যেন কিছুই জানে না।”
​অনি সোহমের কাঁধে হাত রেখে বলল, “ও বলেছিল তো, তখন ও নেশাগ্রস্ত ছিল। অতিরিক্ত ড্রাগস কনজিউম করার কারণে ওর স্মৃতিভ্রম হয়েছিল। মনে হয় ও অজান্তেই শ্যুট করে দিয়েছিল ওকে।”
​সোহম কিছুই বলল না। অনি উদ্দেশ্যহীনভাবে কবরস্থানের দিকে তাকিয়ে দেখল একটা কিছু পড়ে আছে মাটিতে। জিনিসটা কী হতে পারে অনুমান করেই দ্রুত পায়ে এগিয়ে গেল সে। হ্যাঁ, সে যা ভেবেছিল তাই; এটা সেই কনসোলটা। এবার উদ্যানের নাগাল পাওয়া সহজ হয়ে যাবে তাদের জন্য। অনি কনসোলটা পকেটে পুরে সোহমকে টেনে নিয়ে গাড়ির দিকে দৌড় দিল।

রাত ঘন হয়েছে। নিশ্ছিদ্র অন্ধকারের মাঝে বসে আছে উদ্যান। পাশেই আছে সেই মৃতদেহটা; এটাই সেই জঙ্গল যেখানে সে ফুলকে কোনো একদিন বেঁধে রেখে চলে গিয়েছিল। দেহটা থেকে তীব্র উটকো গন্ধ ভেসে বেড়াচ্ছে বাতাসে, তবুও উদ্যান ভ্রূক্ষেপহীন। সে ফুলের সাথে একটানা কথা বলে যাচ্ছে। কত কথা যে সে আজ উগরে দিল তার কোনো হিসেব নেই।
অথচ এই সেই উদ্যান, যে একসময় বলেছিল অপ্রয়োজনীয় কথাবার্তা সে একদমই পছন্দ করে না!
​“আমাদের আর কখনো এক হওয়া হবে না, ফুল। তুই আর কোনোদিন আমার নাম ধরে ডাকবি না, আমার দিকে তাকাবি না, আমায় ভালোবাসবি না৷ এগুলো আমি কীভাবে মেনে নিই বল তো? তুই যেই হাতটা সবচেয়ে বিশ্বাসযোগ্য ভেবে আঁকড়ে ধরেছিলি, সেই হাতটাই তোর প্রাণ কেড়ে নিল। কেন এমন হলো? ভুল, পাপ, অন্যায় সব তো আমি করেছিলাম। তুই তো নিষ্পাপ ছিলি, আমার কর্মফল তোকে কেন ভোগ করতে হলো? অন্য কোনোভাবেই কি আমাকে শাস্তিটা দেওয়া যেত না?”

​উদ্যান একটু থামল। তার চোখের রক্তাশ্রু ততক্ষণে শুকিয়ে গালে কালচে দাগ ফেলেছে। সে ফুলের মাথাটা নিজের বুকের সাথে আরেকটু চেপে ধরল।
কুয়াশা আর অন্ধকারের চাদর ভেদ করে আচমকা তার চোখের সামনে ভেসে উঠল ফুলের অবয়ব। সেই আলোকময় কায়া থেকে যেন আলোর বিচ্ছুরণ ঘটছে। তার পরনে ধবধবে সাদা শাড়ি, হাঁটু সমান কুচকুচে কালো ঝরঝরে চুলগুলো বাঁধনমুক্ত হয়ে বাতাসে উড়ছে। চোখে তার গাঢ় কাজল, আর ঠোঁট জোড়া রক্তিম। উদ্যান অপলক চোখে চেয়ে রইল সেদিকে।
​অভিমানী রমণী আজ কোনো কথা বলল না, কোনো অভিযোগও করল না। অথচ উদ্যান যেন এই নিস্তব্ধতার মাঝেই তার অর্ধাঙ্গিনীর সমস্ত অব্যক্ত কথা স্পষ্ট বুঝতে পারছে।

উদ্যানের ঠোঁট কাঁপল, “আমি বড্ড দেরি করে ফেলেছি। আমি সবসময়ই দেরি করে ফেলি। তুই আমার জীবনে কী ছিলি সেটা আমি সময়মতো বুঝতে পারিনি। আর যখন বুঝলাম, তখন তুই নেই… কোথাও নেই!”
​ফুলের অবয়ব ধীরে ধীরে হাওয়ায় মিলিয়ে যেতেই উদ্যান শেষবারের মতো লাশটার চুলের ভাঁজে একটা গাঢ় চুমু এঁকে দিল। তারপর উঠে দাঁড়িয়ে নিজের শার্টটা খুলে ফেলল। খুব সাবধানে লাশের শরীর থেকে শাড়িটা খুলে নিয়ে নিজের শার্ট দিয়ে দেহটা ঢেকে দিল।
অতঃপর ​শাড়িটা নিজের হাতে প্যাঁচাতে প্যাঁচাতে উদ্যান সামনে থাকা বিশাল গাছটার দিকে তাকাল। গাছটার কাণ্ডের খাঁজে পা রেখে খুব সহজেই ওপরে উঠে পড়া যাবে। সে কোনো এক অচেনা ক্ষিপ্রতায় গাছটায় উঠে পড়ল।
একটি শক্তপোক্ত, মজবুত ডাল বাছাই করে সেটায় শাড়িটার এক প্রান্ত খুব শক্ত করে বেঁধে নিল সে। আর অন্য প্রান্তটি পেঁচিয়ে বাঁধল নিজের গলায়।
​“আমি তোর কাছে আসছি, ফুল।”
​উদ্যান তার পা দুটো ডাল থেকে নিচের শূন্যে ঝুলিয়ে দিল। আর ঠিক পরমুহূর্তেই, এক ঝটকায় নিজের পুরো শরীরটাকে ভাসিয়ে দিল বাতাসে।

অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ৭৭

➤ প্রথম খণ্ডের সমাপ্তি।
দ্বিতীয় খণ্ড শীঘ্রই প্রকাশিত হবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here