Home আমার আলাদিন আমার আলাদিন পর্ব ৩৩

আমার আলাদিন পর্ব ৩৩

আমার আলাদিন পর্ব ৩৩
জাবিন ফোরকান

অতিক্রান্ত হয়েছে নির্ঝঞ্ঝাট একটি মাস।
ইরাম আর ইযানের উপর হামলার মামলায় প্রধান আসামী বখতিয়ারের লা*শ উদ্ধার হওয়ার পর মামলাটির তদন্ত স্থগিত হয়েছে। উপরন্তু বখতিয়ারের পরিবারের পক্ষ থেকে হ*ত্যামামলা দায়ের করা হয়েছে। কিন্তু সেসব আলাদিনের বিপক্ষে নয়। পুলিশের তদন্তে আপাতত রাজনৈতিক কারণে হ*ত্যাগুলো হয়েছে এমনটা উঠে এসেছে। বখতিয়ার এবং তার সাঙ্গপাঙ্গ সকলেই ক্ষমতাসীন দলের রাজনীতি করে, তাই এই নিয়ে জলঘোলা না করে ধামাচাপা দেয়া হয়েছে। যদিও সাইবানকে এর মাঝে অহেতুক টানার প্রচেষ্টা কম হয়নি, তবে পর্যাপ্ত প্রমাণের অভাবে সবকিছু কাটাতে পেরেছে সে। এতকিছু অবশ্য ইরাম অব্দি সে পৌঁছাতে দেয়নি একবারের জন্যও। সত্যি কথাটুকু জানিয়েছে। রাজনীতির মারপ্যাচের কারণে ইরাম তাকে এসব বিষয়ে আর জড়াতে নিষেধ করে দিয়েছে। তবে আজও একটা উত্তর মেলাতে পারেনা সাইবান।

সত্যিই কি বখতিয়ার আর তার ছেলেপেলেদের কোনো রাজনৈতিক কারণে খু*ন করা হয়েছে? কাকতালীয় ঘটনা নাকি পরিকল্পিত প্রতিশোধ? ইরামের পক্ষে প্রতিশোধ নেবে এমন কে আছে সে ছাড়া? সাইবান ভেবে পায়না।
এই এক মাসে জীবনযাপনে খুব বেশি পরিবর্তন আসেনি। ইরাম নিজের সমস্ত মনোযোগ স্থাপন করেছে কম্পিউটার ক্লাসে। দুপুরে ক্লাস করে এসে রাতে ল্যাপটপে কাজ করে। সঙ্গে সারাটাক্ষণ ইযানকে সামলানোর দায়িত্ব তো আছেই। ইযানের বয়স পাঁচ মাসের বেশি এখন। আজকাল ছেলেকে বসা শিখাচ্ছে ইরাম। নিয়ম করে প্র্যাকটিস করায় সে, তবে নিজে থেকে কয়েক সেকেন্ডের বেশি বসে থাকতে পারেনা ইযান, ঢলে পড়ে যায়। এটুকুতেই সন্তুষ্ট জননী।
সাইবানও শেষ কয়েকদিন ধরে নিজের কাজ নিয়ে ব্যস্ত ছিল। দুটো গানের কম্পোজিংয়ের অফার এসেছে। একটা আবার দেশের বেশ নামকরা ব্যান্ড। তাছাড়া সামনে বেশ বড় একটি শো আছে তার। পুরাতন এক ক্লাসমেটের ভাইয়ের বিয়ে। সেটার ব্যাচেলর পার্টির শো, বরিশাল সিটিতে। এর মধ্যেই সব ধরণের প্রস্তুতি শেষ সাইবানের। গানের কাজগুলো এর ফাঁকে ফাঁকে করবে ভেবে রেখেছে। খুব শীঘ্রই তাকে ঢাকা ছাড়তে হবে। কিন্তু গতবার সিলেটে চলে যাওয়ার পর যা হয়েছে, সেসবের ভয় ঢুকে গিয়েছে মনে। হ্যাঁ, বাড়িতে সবাই আছে। ইরামও আগের মতন অসচেতন নেই। তবুও মনকে মানিয়ে নিতে পারছেনা সে। মনে হচ্ছে, ইরামকে চোখের আড়াল করলেই কিছু একটা হয়ে যেতে পারে। তাছাড়া অরণ্যর বাড়িতে সে যা করে এসেছে, তাতে এক মাস পেরিয়ে যাওয়ার পরেও পাল্টা কোনো প্রতিক্রিয়া আসেনি বিষয়টা অত্যন্ত রহস্যজনক। অরণ্যকে সে রীতিমত চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে এসেছে, লোকটা কি ভাবছে বোঝা দুষ্কর। সব মিলিয়ে সাইবান এই মুহূর্তে পরিবার থেকে দূরে যেতে রাজী নয়।

বেপরোয়া ভাবের মাঝেই গুরুত্বপূর্ণ এসব চিন্তা মাথায় নিয়েই বাড়িতে ফিরল সাইবান। আজ শো এর শেষ প্র্যাকটিস করে আগেভাগে টিমের কাছে ইন্সট্রুমেন্ট সব পাঠিয়ে দিয়েছে। সে আগামীকাল বা পরশু রওনা দেবে। কিন্তু একা নয়। সকালে অনুরাগের সঙ্গে এক দফা কথা হয়েছে তার। একই ক্লাসমেট হওয়ায় অনুরাগ নিমন্ত্রণ পেয়েছে। তাই বন্ধুর সঙ্গে একটা বোঝাপড়া সেরেছে সাইবান। এখন শুধু ইরামকে জানাতে হবে।
আজকাল বড্ড গরম পড়েছে। গাড়ির এসি থেকে বাইরে পা রেখেই কেমন ঘেমে যাচ্ছে আবার। পরনের হাফ হাতা শার্টটা টান দিয়ে খুলে ফেলল সাইবান। সেটা কাঁধে ফেলে বেডরুমে ঢুকল সে। রুমটা ফাঁকা। ইরামকে দেখা যাচ্ছেনা। বাথরুম থেকে পানির আওয়াজ ভেসে আসছে। হয়ত গোসল সারছে রমণী। অপরদিকে বিছানার উপর ইযান। সদ্য ঘুম থেকে উঠেছে চেহারা দেখে বোঝা যাচ্ছে। বড় বড় চোখ মেলে মাকে খুঁজছে এদিক সেদিক তাকিয়ে। না পেয়ে তার চেহারা টকটকে হয়ে উঠল। কান্নার পূর্ব লক্ষণ। সাইবান দেখতে দেখতে নাজুক শিশুটিকে বুঝতে শিখে গেছে। তার আশঙ্কাই সত্যি হলো। গলা ফাটিয়ে চিৎকার দিয়ে হাত পা ছুঁড়ে কাঁদতে লাগল ইযান।

“উয়া…আআ!”
সাইবান জানে, তার ইযানকে ধরা উচিত। কিন্তু সে সবেমাত্র বাইরে থেকে এসেছে, এমন অবস্থায় বাচ্চাকে ধরলে ভালো হবে? তাড়াহুড়ো করে সে নিজের তোয়ালে বের করে নিল। ড্রেসিং টেবিলের উপর স্যানিটাইজার আছে। সেটা যখন নিজের হাতের উপর ভরে ভরে সে স্প্রে করছে তখনি বাথরুমের দরজাটা হালকা একটুখানি খুলল। সেই ফাঁক গলে মুখ বাড়াল ইরাম। সাইবান ঝট করে তাকাতেই ক্ষণিকের জন্য তার মনে হলো পৃথিবীটা বুঝি নিজের অক্ষের উপর ঘূর্ণন বন্ধ করে স্থির হয়ে গিয়েছে!

ইরামের চুলগুলো ভেজা। কপালের উপর এলোমেলো হয়ে লেপ্টে আছে। তাতে সাবানের ফেনা চিকচিক করছে। মুখটা সিক্ত। পানির ফোঁটা গড়াচ্ছে ভ্রু বেয়ে গালে, গাল বেয়ে আরও নিচে। শুধু মুখটাই দেখা যাচ্ছে রমণীর, বাকিটা দরজার পিছনে। ইরামের গলা বেয়ে গড়িয়ে নামা পানির ফোঁটা কেমন যেন মাদকীয় লাগছে সাইবানের চোখে। দরজার ওপাশে কি লুকিয়ে আছে তার এক ঝলক অত্যন্ত কুটিলভাবে খেলে গেল তার মস্তিষ্কজুড়ে। শক্ত একটি ঢোক গিলল সাইবান, পুনরায় ঘামতে শুরু করল। এসব কি ভাবছে সে? তার অর্ধাঙ্গিনীর অবশ্য এতকিছু মাথায় নেই। ইযানের কান্না বেড়ে গিয়েছে, ছোট শরীরটা বিছানার উপর গড়াগড়ি করছে রীতিমত। ইরাম কিছুক্ষণ আগেই ইযানকে ঘুম পাড়িয়ে গোসল করতে ঢুকেছে, ভাবেনি এত তাড়াতাড়ি উঠে যাবে। চেষ্টা করেও ঘুমানোর আগে খাওয়াতে পারেনি, তাই ক্ষুধায় উঠে গেছে হয়তবা। কিন্তু ইরাম চুলে শ্যাম্পু করছে, হুট করে বেরিয়ে ধরতেও পারছেনা। সমস্ত শরীর ভেজা তার। দরজা খুলতেই সে সাইবানকে দেখল। কেমন আহাম্মকের মতন দাঁড়িয়ে ড্যাবড্যাব করে তার দিকেই তাকিয়ে আছে। ইরাম নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করার আগেই তার মুখ ফস্কে আপনা থেকেই বেরিয়ে গেল,

“এই পোটলার আব্বু, পোটলাকে একটু ধরো তো।”
বাক্যটা বুঝি সাইবানের মাথায় গোত্তা খেয়ে ফিরে গেল। চোখজোড়া বড় বড় হয়ে গেল তার। ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইল সে ইরামের দিকে।
“আআআ! ইয়া…উয়া!”
ইযানের কান্না আরও জোরে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। অথচ সাইবানের খেয়াল নেই। তার জগৎ ওখানেই থমকে গিয়েছে। কানে শুধু বেজে চলেছে দুটো শব্দ,
—পোটলার আব্বু।
“ক…ক্ব…কি…ব..বল…বললেন?”
জীবনে বোধ হয় প্রথমবারের মতন তোতলালো সাইবান। রুদ্ধশ্বাস হয়ে দেখে যাচ্ছে সে অর্ধাঙ্গিনীকে। ইরাম সাইবানের চেহারার অভিব্যক্তি লক্ষ্য করে খানিকটা ঘাবড়ে গেল। অজান্তেই ভেজা গালে লালিমা ফুটল তার।
“ও কান্না করছে, একটু ধরো আমি পাঁচ মিনিটে আসছে।”
এটুকু বলেই ঠাস করে বাথরুমের দরজা আটকে দিল ইরাম। সাইবান গর্ধবের মতন ওখানেই দাঁড়িয়ে রইল কয়েক সেকেন্ড। নিঃশ্বাস অব্দি নিলনা। হাতে লেগে থাকা স্যানিটাইজার হাওয়ায় শুকিয়ে গেল, অথচ হেলদোল হলনা তার। আনমনে বিড়বিড় করল সে,

“পো…পোটলার…আ…আব্বু?”
“আআ!”
হাত পা ছুঁড়ে বিছানায় লাফিয়ে উঠল ইযান। নিজের ঘোর থেকে বেরোল সাইবান। পা দুটো টলে উঠল তার, হুট করে কার্পেটের উপর ফস্কে গিয়ে ধপাস করে একটা আছাড় খেল সে। তবে এবার চিৎপটাং হয়ে পড়েনি। বিছানার পাশ চেপে ধরায় শুধু হাঁটুর উপর বসে পড়ল, পরক্ষণেই হাঁচড়ে পাঁচড়ে উঠে পড়ল। বিছানায় ছটফট করতে থাকা ইযানকে অবশেষে সাবধানে কোলে তুলে নিল সে, নিজের খোলা বুকে চেপে ধরে নার্সারি গ্লাইডারে হেলান দিয়ে বসল। উষ্ণ ত্বকের সংস্পর্শে আসতেই ইযানের কান্না কিছুটা কমে এলো। ফোঁপাতে ফোঁপাতে সাইবানকে দেখল সে। ড্রয়ার থেকে নরম কাপড় তুলে ছেলের মুখ মুছতে মুছতে সাইবান বলল,
“তোর আম্মুর আমার উপর একটুও দয়া নেই। সিগারেট আমাকে শেষ করার আগেই তোর আম্মু আমায় শেষ করে দেবে রে পোটলা।”

ইযান কি বুঝল সেই জানে, দন্তহীন মাড়ির মাঝখানে সাইবানের তর্জনী আঙুলটা চেপে ধরল অযথাই। তীর্যক হাসল সাইবান, ছোট্ট শরীরটাকে বুকের উপর তুলে দুহাতে ধরে গালে গাল ঘষল,
“দাঁত নেই তাতেই কামড়ে কুল পাচ্ছিস না, দাঁত উঠলে আর কথা হবেনা, শুধু কোদালের মতন কোপাবি।”
“আই!”
কান্না পুরোপুরি থেমে গিয়েছে ইযানের। তবে ছটফটানি কমেনি। সাইবানের বুকের উপর লেপ্টে গিয়ে মুখ এদিক সেদিক করে সে কি যেন খুঁজতে লাগল। প্রথমটায় বুঝতে পারলনা সাইবান, মাথা নিচু করে চেয়ে পোটলার কান্ড দেখে গেল। তার বুকে মুখ ঘষছে ইযান, আর সমানে শব্দ করে যাচ্ছে,
“উই…আ…বা..!”

সাইবান নিজের বিশাল দুই হাতের বাঁধনেও ইযানের নরম টুকটুকে শরীরটা স্থির রাখতে পারলনা। ঘষতে ঘষতে সে সাইবানের বুকের একপাশে গিয়ে পৌঁছাল। মাথায় সতর্ক ঘণ্টা বেজে উঠল সাইবানের। ইযান মুখ বসানোর আগেই লাফ দিয়ে উঠল, হাত ঠেলে একেবারে দূরে সরিয়ে হাওয়ার মাঝে ঝুলিয়ে ধরল ছোট্ট শরীরটাকে।
“ওরে পাকনা! বাপের সম্পত্তিতে নজর, ছিঃ!”
“উই!”
ইযান দুহাত বাড়িয়ে পা ছুঁড়তে লাগল। সাইবানের বুকে যাবেই সে। জিভ বের করে বারবার তাকাল বুকে, তারপর পিতার মুখের দিকে। এক মুহূর্তের জন্য সত্যিই লজ্জা লাগল সাইবানের, পরক্ষণে খিলখিল করে হেসে ফেলল সে। মধুর হাসি। ইযানকে উপরে তুলে নিজের কপালের সঙ্গে কপাল ঠেকিয়ে সে প্রফুল্ল কন্ঠে জানাল,
“তুই যে সোনার খনি খুঁজছিস, সেটা আমার কাছে নেই রে বাপ। তোর কাছেও নেই। আমরা ফকিন্নি ব্যাটা জাত।”
“আই উই?”

“আমার খনি আছে ঠিকই কিন্তু সোনা নেই। এই দিক দিয়ে শুধু তোর আম্মুই সোনায় সোহাগা।”
কথা বলতে বলতে হেঁটে বাথরুমের কাছে গিয়ে দাঁড়াল সাইবান। দরজা নক করল,
“আপনার হলো? ছেলে তো একেবারে লোল ফেলে বুক ভাসিয়ে ফেলেছে।”
“এইতো, এক মিনিট!”
ভেতর থেকে ইরামের দ্রুত জবাব ভেসে এলো। সাইবান বিছানায় গিয়ে বসল। তবে এবার ইযানকে বুকে না রেখে কাঁধের উপর উল্টো ঝুলিয়ে পিঠ চাপড়াতে লাগল। বুকে রাখলেই জিভ বের করে এদিক সেদিক চলে যাচ্ছে ছেলেটা। ইযানের পিছনে আলতো একটা চাপড় মেরে সে বলল,
“পোটলা তোর নজর এখনি এত খারাপ, বড় হয়ে বাপের মুখে যে চুনকালি মাখবি তাতে কোনো সন্দেহ নেই। শুধু সাথে কিছু ফেসমাস্কও মেখে দিস, তাহলেই হবে। জেল্লাটা যেন না হারায়, নাহলে তোর আম্মুকে থোবরা দেখিয়ে আকর্ষণ করা যাবেনা। বুঝেছিস?”

“গুই!”
বাথরুমের দরজা এমন সময়েই খুলে গেল। ভেতর থেকে বেরিয়ে এলো ইরাম। একটা পা অব্দি লম্বা ফ্রক আর প্লাজো পায়জামা পরনে। চুলগুলো এখনো আধভেজা, পিঠ ভাসিয়ে টপটপ করে পানি গড়াচ্ছে। ঠিকমতো মোছার সময় ব্যয় করেনি বোঝা যাচ্ছে।
“কই, দেখি দেখি আমার কুচুপু সোনা!”
আদুরে গলায় বলে সাইবানের কাছ থেকে নিজের বুকে ছেলেকে টেনে নিল ইরাম। অসংখ্য ছোট ছোট চুমু একে দিল মুখজুড়ে,
“আমার আব্বুটার ক্ষুধা লেগেছে তাইনা? হুম? এখন আমরা খাব, পেট ভরে খাব, অনেক শক্তিশালী হব, একেবারে সুপারহিরো।”

ছেলেকে নিয়ে নার্সারি গ্লাইডারে বসল ইরাম। ইযান তার বুক আঁকড়ে ধরে ইতোমধ্যে শশব্যস্ত হয়ে পড়েছে। রুমে সাইবানও উপস্থিত আছে দেখে ইরামের খানিক দ্বিধা হলো। তবে স্বামী তার এদিকে বিশেষ নজরপাত করে নেই, ক্লোজেটের কাছে গিয়ে নিজের পোশাক বের করে নিচ্ছে। তাকে কি বেরিয়ে যেতে বলবে? সেটা কি সমীচীন হবে? এর মধ্যে একবার দুইবার ইরাম ফিডিং করানোর সময় সাইবান এসে পড়েছিল ঠিকই, কিন্তু কখনোই স্ত্রীর অস্বস্তি হয় এমন কোনো দৃষ্টি ফেলেনি, চুপ করে নিজে থেকেই বেরিয়ে গিয়েছে। ইরাম শেষমেষ কি যেন ভেবে তাকে কিছু বললনা আর। পাশ থেকে নিজের ওড়নাটা তুলে গায়ে জড়িয়ে ইযানকে ঢেকে ফেলে নিঃশব্দে খাওয়াতে শুরু করল, ধীরে ধীরে সোফাটা দুলতে লাগল।

সাইবান নীরবে গোসল সেরে পড়ার জন্য নিজের টি শার্ট, ট্রাউজার বের করে ঘুরে দাঁড়াল। আনমনেই তার চোখজোড়া অদূরে ইরামের উপর গিয়ে পড়ল। তালে তালে দুলতে দুলতে ছেলেকে খাওয়াচ্ছে সে, ওড়নার বাইরে ইযানের ছোট্ট একটা হাত বেরিয়ে আছে, মুঠ করে রেখেছে বাচ্চাটা। ইরাম চোখ বুঁজে ছেলেকে অতি যত্নে ধরে রেখেছে। বাইরে থেকে সূর্যের সোনালী আলো এসে উভয়ের অবয়বে প্রতিফলিত হচ্ছে দারুণভাবে। দৃশ্যটা এতটা মনোমুগ্ধকর যে সাইবান নিজের দৃষ্টি ফেরাতে পারলনা। নিষ্পলক চেয়ে থাকল সে। ইরামের কপালে লেপ্টে থাকা আধভেজা চুল, সেই চুলের গোড়া বেয়ে গড়িয়ে নামা ফোঁটায় ফোঁটায় পানি সাইবানের বুকে অদ্ভুতুড়ে এক ঝড় তুলল। মস্তিষ্ক বুঝে ওঠার আগেই পায়ে পায়ে এগিয়ে গেল সে। দুলতে থাকা সোফাটার পিছনে গিয়ে দাঁড়াল।
“ভেজা চুলে বেশিক্ষণ থাকলে ঠান্ডা লাগবে।”
সাইবানের কন্ঠস্বর এতটা নরম শোনালো যে সে নিজেই খানিক অবাক হয়ে গেল। ইরামের চোখ খুলে গেল, মাথা তুলে সে খানিক বিস্মিত হয়ে তাকাল স্বামীর মুখপানে। সূর্যের আলোর খেলায় ওই মুখটা কেমন যেন স্নিগ্ধ লাগছে। তাতে সবসময় খেলা করা দুষ্টুমির ভাবটা নেই, আছে শুধু একরাশ মুগ্ধতা। ইরাম বুকের মাঝে কেমন একটা উষ্ণতা বোধ করল।

“তাড়াহুড়ো করে গোসল সেরেছি, ঠিকমত মোছার সময় পাইনি আজ।”
“হুম। বোধ হয় ভাগ্য চেয়েছিল আজ দায়িত্বটা আপনার হাসবেন্ডের কাঁধে পড়ুক।”
নিজের তোয়ালেটা তুলে আলতোভাবে ইরামের মাথায় ছুঁয়ে দিল সাইবান। পিছন থেকে ঝুঁকে এসে কানে ফিসফিস করে বলল,
“রিল্যাক্স অ্যান্ড লেট মি, মাই প্রেশিয়াস।”
ইরাম সোফায় হেলান দিল সম্পূর্ণ। ইযানকে সাবধানে যত্নে ধরে রাখল আড়ালে। সাইবান স্ত্রীর বাধ্যতায় তৃপ্ত হয়ে ধীরে ধীরে ভেজা চুলগুলো মুছে নিতে লাগল। তোয়ালের আলতো চাপে শুষে নিল পানির ফোঁটা। সোফার হালকা দুলুনি, ইরামের আয়েশি সমর্পণ, স্বর্ণাভ আলোর খেলা আর অত্যন্ত মৃদু শব্দ তুলে নিজের খাবারের দুনিয়ায় ব্যাস্ত থাকা ইযান; সাইবান জানেনা এর বেশি কোনোকিছু তার আর চাই কিনা। তবে কি এটাই জীবন? এটাই সংসার? এটাই কি নাড়ির টান? মমতার বন্ধন?

অজান্তেই ঝুঁকে ইরামের অত্যন্ত কাছে এসে পড়ল সাইবান। তোয়ালেতে চুল মুছতে মুছতে অপর হাতে অর্ধাঙ্গিনীর কপালের পাশে লেপ্টে থাকা চুলের গোছা গুছিয়ে আনল সে। আঙুল কাঁপল তার, সঙ্গে ইরামের শরীরও। একটা সুঘ্রাণ নাকে ঠেকল সাইবানের। কোনো একটা ফুলের সুবাস, মিষ্টি, স্নিগ্ধ, মায়াবী। অর্ধাঙ্গিনীর শরীরের সেই সুবাস তাকে মাতোয়ারা করে তুলল। ভেজা চুলের মোহনীয় সুঘ্রাণ সাইবানের সমস্ত সত্তাকে কেমন পাগল পাগল করে তুলল। হাত স্থির হয়ে গেল তার। অজান্তেই আঙুল চেপে বসল ইরামের কানের নিচের নরম ত্বকে। হৃদস্পন্দন বেড়ে গেল সাইবানের। ইরামের অবয়বে লেপ্টে থাকা ঘ্রাণ, তার গলার ধার ঘেঁষে মুক্তোর দানার মতন গড়িয়ে নামা এক ফোঁটা পানির প্রবাহ, আঁধভেজা চুলের ভাঁজে ভাঁজে লুকিয়ে থাকা সুগন্ধ সাইবানের শান্ত বুকে অশান্তির ঝড় তুলল। শক্ত একটি ঢোক গিলল সে, আরও কাছে ঝুঁকে ইরামের চুলের মাঝে মুখ ডুবিয়ে ফেলল।
“পোটলার আব্বু ডেকেছেন আমায়।”

ফিসফিস করল সে। ইরাম প্রথমটায় জমে গেল। সাইবানের তপ্ত শ্বাস ছুঁয়ে গেছে তার ঘাড়ে। শরীরজুড়ে শিহরণ খেলে গেল তার। অজান্তেই মাথা কাত করে ফেলল সে, আলতো আঁচে জবাব দিল,
“বার্থ সার্টিফিকেটে ছেলের বাবার নাম আলাদিন তো তুমিই লিখিয়েছ।”
মৃদু হাসল সাইবান, আবেশে জড়ানো এক মধুর হাসি।
“সো রাইট। আলাদিনের চেরাগ বলে কথা।”
কেন যেন নিজেকে রোখা সম্ভব হলোনা। ঝুঁকে সাইবান হঠাৎ করেই ইরামের কানের নিচে নিজের ঠোঁট বসিয়ে দিল। গাঢ় এক চুমু খেল সেখানে। ইরাম কেঁপে উঠল।
“আলা…”
বাকিটুকু উচ্চারণ করতে পারলনা সে। সাইবান তোয়ালে ফেলে তার ঘাড়ে হাত জড়িয়ে উন্মুক্ত কাঁধজুড়ে ছোট ছোট চুমু বসাতে লাগল সারি বেঁধে। ত্বকে নাক ছুঁয়ে ইরামের গায়ের সুবাস গ্রহণ করে সে আবেশমাখা গলায় বলল,
“এই স্মেল সো গুড মাই প্রেশিয়াস, লাইক…”
“লাইক হোয়াট?”
“লাইক মাইন।”

অজান্তেই ঠিক গলার পাশে স্পন্দিত হতে থাকা ত্বকের উপর কামড় বসিয়ে দিল সাইবান। তার ধারাল দাঁত গেঁথে গেল, লালচে দাগে রাঙিয়ে তুলল ইরামের উজ্জ্বল শ্যামলা ত্বকে। ঠোঁট কামড়ে ধরল রমণী নিজেকে নিয়ন্ত্রণে। বিপরীতে সাইবান নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে। শুধু কামড়ে থেমে নেই সে, ঠোঁট বুলিয়ে পৌঁছে গেল ইরামের চিবুকে, ঠোঁটের কোণায় এবং অতঃপর….
“আইআ!”
ওড়নার আড়ালে ঢেঁকুর তুলে শব্দ করে উঠল ইযান। স্বামী স্ত্রী উভয়েই জমে গেল। একে অপরের দিকে চেয়ে চোখ পিটপিট করল। ওড়নার ভেতর থেকে হাত পা বের করে ফেলেছে ইযান, জননীর বাহু খামচে ধরল সে এবার। সঙ্গে সঙ্গে সোজা হয়ে বসল ইরাম। হৃদস্পন্দন সীমাহারা হলো তার। এইমাত্র কি হচ্ছিল? সাইবানও এক লাফে পিছিয়ে গেল, যেন ছ্যাঁকা লেগেছে তার। স্বর্গীয় অনুভূতির ঘোরটুকু দূর হয়ে গিয়েছে। কেন যেন রুমের ভেতর আর দাঁড়াতেই পারলনা সে। লম্বা পা ফেলে হেঁটে সে বাইরে চলে গেল। প্রথমটায় লজ্জা এবং পরবর্তীতে বিস্ময় নিয়ে তার চলার পথের দিকে তাকিয়ে রইল ইরাম। ছেলেটার হঠাৎ করে হলো কি?

রুমের বাইরে এসেই দরজা লাগিয়ে সেই দরজায় পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়াল সাইবান। এক হাতে বুকের বাম পাশটা খামচে ধরল। যেন হৃদপিন্ডকে শাসালো এত জোরে স্পন্দিত হওয়ার জন্য। ভ্রু কুঁচকে গেল তার, ভারী নিঃশ্বাস প্রশ্বাসে বুক ওঠানামা করল, ঘাড় বেয়ে ঘামের ফোঁটা গড়িয়ে নামল টপটপ করে। দরজায় পিঠ ঠেকিয়ে স্লিপ কেটে ধপাস করে মেঝেতে বসে পড়ল সাইবান। দুই হাতে নিজের মাথা চেপে ধরল। নিয়ন্ত্রণহারা হয়ে পড়েছিল সে সম্পূর্ণ। যদি মুহূর্তটি শুধুমাত্র আর কয়েক সেকেন্ড দীর্ঘ হত, তবে সাইবান নিজের সকল ধৈর্য্যের সীমানা পেরিয়ে যেত, ফিরে আসা সম্ভব হতনা। গুঙিয়ে উঠল সে, মাথার চুল টেনে আপনমনে নিজেকে ধমকাল,
“ড্যাম ইট সাইবান!”

পরদিন।
সুগন্ধা আজ বেশ সকালেই উঠে গিয়েছে। আজকে নাস্তার বিশেষ ঝামেলা নেই, কারণ গতকাল বাড়িতে বিরিয়ানী রান্না হয়েছিল। অনেকটা রয়ে গিয়েছে। সেগুলোই সামিয়া সকালে গরম করে সবাইকে দিতে বলেছেন, নাহলে আর খাওয়া হবেনা। নিজের জন্য এক কাপ গরম চা বানিয়ে সোফায় বসে গতকালের সিরিয়ালের মিস যাওয়া একটা এপিসোড দেখে নেবে চিন্তা করতে করতে হলে এলো সুগন্ধা। আপন চিন্তায় একটু বেশিই মগ্ন ছিল সে, তাই মেঝের উপর পড়ে থাকা ইযানের ছোট্ট একটা খেলনা গাড়ি তার চোখেই পড়লনা। কখন পড়েছে এখানে কারো হয়ত খেয়ালেই নেই। কিন্তু সুগন্ধার পা পড়তেই চাকা ঘুরল, সঙ্গে সঙ্গে একটা আছাড় খেয়ে উল্টে পড়তে নিল সে। চায়ের কাপটা কোনদিকে যে উড়ে গেল কে জানে! চোখ বুঁজে দাঁতে দাঁত চেপে ফেলল বেচারী, সাইবানের মতন তাকেও অবশেষে যেখানে সেখানে চিৎপটাং হয়ে পড়ার রোগটা ধরেই ফেলল! কিন্তু শক্ত মেঝের বদলে নিজের কোমরজুড়ে একজোড়া বাহুর উপস্থিতি টের পেল সুগন্ধা। হ্যাঁচকা একটা টান খেল, তারপরই সোজা করে দাঁড় করিয়ে দেয়া হলো তাকে। বুক ধড়ফড় করল মেয়ের, ঝট করে চোখ মেলে তাকাল। দৃশ্যটা চোখে পড়ল অবশেষে।
দন্ডায়মান এক পুরুষ। চেহারা উজ্জ্বল নয় আবার শ্যামলাও নয়, মাঝামাঝি কিছু একটা। ধারালো চিবুকে সূক্ষ্ম খোঁচা খোঁচা দাড়ির রেখা। চোখে রিমলেস চশমা, এলোমেলো হয়ে থাকা উষ্কখুষ্ক চুল কপালে নুইয়ে আছে। শরীর পাতলা, তাতে অফহোয়াইট বর্ণের স্যুট জড়ানো। সুগন্ধার হাতের চায়ের কাপ ভাঙচুর হয়েছে মেঝেতে, তরল চা টুকু ছিটকে পড়েছে পুরুষটির স্যুটে, কেমন একটা জঘণ্য কালচে দাগ হয়ে গিয়েছে। অথচ পুরুষটির দৃষ্টি যথেষ্ট নরম। একে চেনে সুগন্ধা। এই বাড়িতে আসার পর থেকে বহুবার দেখেছে, কিন্তু কোনোদিন এমন সামনা সামনি আসা হয়নি।
দন্ডায়মান, অনুরাগ সিনহা।

সুগন্ধাকে ভালোমত দাঁড় করিয়ে এক পা দূরে সরে দাঁড়াল অনুরাগ। মোলায়েম গলায় জিজ্ঞেস করল,
“ঠিক আছো? ব্যথা পেয়েছ কোথাও?”
জোরে জোরে মাথা নাড়ল সুগন্ধা। বুকের ভেতর এখনো দৌড়াচ্ছে তার হৃদপিন্ড। খানিকটা আতঙ্ক এবং অনেকখানি লজ্জা নিয়ে সে তাকাল অনুরাগের দিকে,
“আপনার জামায় চা পইড়া গেসে! আমি সরি!”
“ইটস ওকে।”
অনুরাগ ভ্রু কুঁচকে নিজের স্যুটের দিকে তাকাল। সে এখান থেকে ভার্সিটিতে যাবে বলে ঠিক করে বেরিয়েছিল, এখন পুনরায় বাসায় গিয়ে পোশাক বদলে ফের যেতে হবে। দেরী হওয়াটা ঝক্কির। কিন্তু সেসব বিষয় সুগন্ধাকে খুলে বললনা সে। তবুও মেয়েটা কেমন যেন বিচলিত হয়ে উঠল,
“চায়ের দাগ এত সহজে যায় না, একেবারে দাগ বইসা যাবে। আপনি এইখানেই দাঁড়ান, আমি আসতেসি!”
উল্টো ঘুরে কিচেনে ছুটে গেল সুগন্ধা। অনুরাগ থ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। কি করবে বুঝতে পারলনা। কয়েক সেকেন্ডের মাথায় সুগন্ধা ফিরে এলো। হাতে একটা ভেজা কাপড়,
“দেখি, এখনি মুইছা দেই। পরে লেবু আর ডিটারজেন্ট দিয়া ভালোমত দুইটা ঘষা দিলেই উইঠা যাবে।”
“না না লাগবেনা, আ’ম ফাইন, জাস্ট…”

কে শোনে কার কথা? শশব্যস্ত হাতে অনুরাগের স্যুটের বুকের দিকে লেগে থাকা চায়ের দাগের উপর ভেজা কাপড়টা ঘষতে লাগল সুগন্ধা, সত্যিই দাগটা ওই মুহূর্তেই অনেকখানি হালকা হয়ে এলো। অবাক হয়ে দেখল অনুরাগ, অপরদিকে হাসি ফুটল সুগন্ধার ঠোঁটে।
“সুগন্ধা, আমাকে এক কাপ আদা লেবু দিয়ে চা দে তো। মাথাটা ভীষণ ব্যথা করছে।”

আমার আলাদিন পর্ব ৩২

এই সময়েই একটি মেয়েলী কন্ঠস্বর ভেসে এলো। জমে গেল সুগন্ধা এবং অনুরাগ উভয়ে। পাশ ফিরে তাকাতেই দেখা মিলল সারিকার। নিজের রুম থেকে মাত্রই বেরিয়েছে সে। ঘুমের পোশাক পরনে, চুলগুলো অগোছালো, একটি হাত মাথায়। ওই অবস্থায়ই রমণী সুচারু চোখে সামনে তাকাল। প্রথমবার অনুরাগ, পরেরবার সুগন্ধা এবং সবশেষে অনুরাগের বুকের উপর আলতোভাবে ছুঁয়ে রাখা সুগন্ধার হাতটার উপর দৃষ্টি গেল সারিকার। ঠোঁটে ফুটল অতি মলিন এক হাসি।

আমার আলাদিন পর্ব ৩৪

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here