Home আমার আলাদিন আমার আলাদিন পর্ব ৫৪

আমার আলাদিন পর্ব ৫৪

আমার আলাদিন পর্ব ৫৪
জাবিন ফোরকান

ইরামের সমস্ত শরীর কেঁপে উঠল। ক্ষণিকের জন্য মনে হলো ফুসফুস থেকে সমস্ত বাতাস বেরিয়ে গিয়েছে। জোরে জোরে শ্বাস নেয়ার চেষ্টা করেও লাভ হলনা। পিছনে ফিরে তাকানোর সাহস মিললনা। চোখের সামনে ভাসতে লাগল দমবন্ধকর স্মৃতিগুলো। ঠিক তখনি তার কাঁধ ছুঁয়ে দিল কেউ,
“ইরাম?”
লাফিয়ে উঠল ইরাম। কাঁধে ধাক্কা খেল শক্তিশালী পুরুষালী বুকে। মাথা কাত করে তাকাতেই দেখা মিলল সাইবানের উদ্বিগ্ন চেহারার। ওই নির্মল মুখখানি দেখেই ইরামের মনের উত্তাল জোয়ারে শান্তির ভাটা পড়ল। এলিয়ে দিল সে মাথা, সাইবানের কাঁধে। তার কোমরে হাত জড়িয়ে চিন্তিত সাইবান ফিসফিস করল,

“হোয়াট হ্যাপেন্ড মাই প্রেশিয়াস?”
জবাব এলোনা। সাইবানের একটি বাহু শক্তভাবে ধরে রেখে ঝট করে পিছনে ফিরে তাকাল ইরাম। আশেপাশে তাকিয়ে দেখল। পর্যটকেরা সৈকতজুড়ে হেঁটে বেড়াচ্ছে নিজেদের মতন। কেউই তার দিকে চেয়ে নেই। তবুও ইরাম হন্যে হয়ে চারপাশে খুঁজল। সেই অশুভ ছায়া নজরে পড়লনা। তবে কি সবটাই ভ্রম ছিল? জোরে জোরে মাথা নাড়ল ইরাম। লোকটা তার মস্তিষ্ককেও রেহাই দেয়না!
“না…কি…কিছুনা।”
সাইবান ইরামের দিকে সন্দিগ্ধ দৃষ্টিতে তাকাল বটে, কিন্তু অতিরিক্ত কিছু আর জানতে চাইলনা। অর্ধাঙ্গিনীর আঙুলে আঙুল পেঁচিয়ে ঝুঁকে তার কপালে ঠোঁট ছুঁয়ে বিড়বিড় করল,
“আ’ম হেয়ার, রাইট হেয়ার।”

—আমি আছি। বেশ সামান্য কিছু ভরসার শব্দ। অথচ ইরামের ছটফটে হৃদয়ে প্রশান্তির প্রলেপ দিতে তা যথেষ্ট। হালকা একটু হাসল রমণী, পাল্টা সাইবানের হাত চেপে মাথা দোলাল। অতঃপর হাঁটতে শুরু করল উভয়ে, যেখানে দাঁড়িয়ে ডাব খাচ্ছে সুগন্ধা আর অনুরাগ। তাদের আসতে দেখে আরও দুটো ডাবের অর্ডার দিল অনুরাগ। ইরাম ছেলেকে কোলে নিয়ে দাঁড়াল। সূর্যাস্তের দৃশ্যের সঙ্গে মিলেছে শীতল বাতাসের প্রবাহ। মুহূর্তটা জাদুকরী। সাইবান ডাব দুটো নিজের হাতে নিয়ে একটা ইরামের মুখের সামনে ধরল। স্ট্র দিয়ে একটুখানি খেল ইরাম। ঠিক তখনি হুট করে পিছন থেকে একটি কন্ঠস্বর ভেসে এলো,
“সাইবান!”
হতচকিত হয়ে পড়ল সকলে। মাথা ঘুরিয়ে তাকাল। সৈকতের বালুচর ধরে হেঁটে আসছে এক মেয়ে। লাস্যময়ী কাঠামো, গায়ে জড়ানো শর্ট কামিজ আর প্লাজো জিন্স। সিল্কি চুলগুলো খুলে রাখা, বাতাসে দুলছে এদিক সেদিক। টকটকে খয়েরী লিপস্টিক মাখা ঠোঁটে লাজুক হাসি। সবার সামনে এসে থমকাল মেয়েটি।
“ওহ মাই গড, আই ক্যান নট বিলিভ দিস! সাইবান, সত্যিই তুমি? কতদিন বাদে দেখলাম তোমাকে! কেমন আছো?”

সাইবানের চোখমুখ থেকে সবটুকু রং উধাও হলো নিমিষেই। অনুরাগ হালকা কেশে মাথা কাত করে অন্যদিকে তাকাল। দুই বন্ধুর মাঝে অদ্ভুতুড়ে চোখাচুখি হলো। মেয়েটির অবশ্য সেদিকে খেয়াল নেই বিশেষ। হাত বাড়িয়ে সাইবানের বাহু আঁকড়ে ধরল সে,
“গড ড্যাম! কত বদলে গিয়েছ তুমি! হোয়াট আ বডি!”
ইরাম পাশে দাঁড়িয়ে সরু দৃষ্টিতে সবটাই খেয়াল করল। সাইবান ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি ভঙ্গি করে মাথা হেলিয়ে অর্ধাঙ্গিনীর দিকে চেয়ে শক্ত একটি ঢোক গিলল।
“ভ…ভালো। তোম…তোমার কি অবস্থা রুবিনা?”
বাহ, নাম পর্যন্ত জানে! ইরাম এক পায়ে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে স্ট্রতে চুমুক দিয়ে নাটক উপভোগ করে গেল। অপরদিকে তার চোখের অতি শান্ত দৃষ্টিতে সাইবান দরদর করে ঘামতে লাগল। কপালে জমা ঘামের ফোঁটা পরনের শার্টের হাতায় মুছতে বাধ্য হলো। রুবিনার অবশ্য সেদিকে বিশেষ খেয়াল নেই, সে অনুরাগকেও পাকড়াও করেছে ততক্ষণে। হ্যান্ডশেক করে বলল,
“আরে অনুরাগ! তোমরা মানিকজোড় এখনো একসাথে? আই অ্যাম ইমপ্রেসড।”
“হেহেহে, লাইকওয়াইজ।”

দাঁত কেলিয়ে হাসতে বাধ্য হলো অনুরাগ। হ্যান্ডশেক করল। পাশ থেকে সুগন্ধা যে শকুনি দৃষ্টি নিক্ষেপ করে রেখেছে সেটা তার বোধগম্য হলোনা। রুবিনা অনুরাগের সঙ্গে কথা বলতে বলতে ইরামের দিকে কৈফিয়তের নজরে তাকাল সাইবান। ঠান্ডা একটা প্রশ্ন করল অর্ধাঙ্গিনী তার,
“মেয়েটা কে?”
ওই চোখের সামনে নিজেকে লোকাতে পারলনা সাইবান। গলা খাঁকারি দিয়ে জানাল,
“আ…আম..আমার এক্স।”
চোখ কপালে উঠে গেল ইরামের।
“কিঃ! কোন এক্স?”
লাল টকটকে গাল নিয়ে ঘাড়ে হাত ঘষতে ঘষতে সাইবান জানাল,
“দুই নাম্বারটা, ক্লাস নাইনের এক্স গার্লফ্রেন্ড।”
“সাইবান! তোমাকে এভাবে এখানে পেয়ে যাব ভাবিনি।”

রুবিনা এসে খপ করে তার হাত পাকড়াও করে ফেলায় সাইবানের আত্মারাম খাঁচাছাড়া হওয়ার জোগাড় হলো। না পারছে ফেলতে, না পারছে গিলতে। ইরামের দিকে করুণ চোখে তাকাল সে। কিন্তু তার স্ত্রী যেন চোখ দিয়েই তার দিকে বরফ নিক্ষেপ করছে। যেন বলতে চাইছে, —করো করো! আরও কত প্রেম পিরিতি করতে পারো তুমি আমিও দেখি!
“বজ্জাত ব্যাটা জাত। শিরায় শিরায় শয়তানি! আরেক নির্লজ্জ মাইয়ারে দেখো, ঢং! হাত ধরার দরকার কি? গলা ধইরা ঝুইলা পর এক্কেবারে, শাকচুন্নি!”
ইরামের পাশে দাঁড়িয়ে মুখ বাঁকিয়ে বিকটভাবে ভেংচাল সুগন্ধা। ইরাম না তাকিয়ে পারলনা। সে নাহয় স্বামীর তথাকথিত এক্সের মুখোমুখি হয়ে পেরেশানিতে আছে, তবে সুগন্ধা এত রেগে যাচ্ছে কেন?
“তো…তুমি একা এসেছ কুয়াকাটায়?”
সাইবান কি বলবে বুঝতে না পেরে জিজ্ঞেস করল। কিছুতেই রুবিনার হাতের ফাঁক গলে সে বেরোতে পারছেনা। চুলে ঝটকা দিয়ে খিলখিল করে হাসল রুবিনা,
“আরে না, আমি তো এখন বরিশালেই সেটেল্ড। হাসবেন্ডের সাথে এসেছি। ঐযে।”
হাত তুলে অদূরে একটা গ্রুপের সাথে দাঁড়িয়ে থাকা এক পুরুষকে দেখিয়ে দিল রুবিনা। তাতে হাপ ছেড়ে বাঁচল সাইবান। স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে কায়দা করে নিজের হাত ছাড়িয়ে নিয়ে বলে ফেলল,
“আলহামদুলিল্লাহ।”

তার দিকে অবাক হয়ে তাকাল রুবিনা। দ্রুত নিজেকে সামলে হুট করে ইরামের কাঁধে হাত রেখে নিজের কাছে টেনে নিল সাইবান। বিরাট হেসে পরিচয় করিয়ে দিল,
“মিট ইরাম কিবরিয়া, মাই ওয়াইফ।”
রুবিনা হাসি নিয়েই ইরামকে দেখল।
“ওয়াও। তুমি বিয়ে করেছ শুনেছিলাম, তবে তোমার বউকে দেখার সৌভাগ্য হবে ভাবিনি। বাহ্, ভাবী আপনি তো বেশ সুন্দর!”
“তুমিও রুবিনা, হোয়াট আ বডি! আই অ্যাম ইমপ্রেসড!”
ইরামের বেখাপ্পা জবাবে রীতিমত চোয়াল ঝুলে পড়ল সাইবানের। অপরদিকে অনুরাগ মুখে হাত চেপে হাসল। রুবিনা ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইল। তার কথাই কি তাকে ফিরিয়ে দেয়া হলো? নাকি সে বেশি বেশি ভাবছে? বুঝে ওঠার আগেই ইরামের কোলে গুইগাই করতে থাকা ছোট্ট ইযানের উপর নজর পড়ল তার। হাত বাড়িয়ে ছুঁয়ে দিল সে বাচ্চাটার মাথার চুল। ইযান নাক ফুলিয়ে তৎক্ষণাৎ মাথা ঘুরিয়ে সটান কামড়ে দিল রুবিনার আঙুল।

“আউচ!”
ইযানের নতুন দাঁতের খোঁচা খেয়ে লাফিয়ে উঠল রুবিনা। দ্রুত হাত সরিয়ে কামিজে নিজের আঙুল ঘষতে লাগল।
“গু! উই…গু!”
ইযান খেঁকিয়ে উঠল। তাতে আড়ালে ছেলের পিঠ চাপড়ে সাবাশি দিল ইরাম। মায়ের সৈনিক ছেলে হয়েছে একেবারে তার। সাইবানের খোলা মুখে ততক্ষণে সৈকতের বালি উড়ে এসে ঢুকে গিয়েছে। থু করে সে ফালাল সেসব। শার্টের কাপড়ে জিভ ঘষতে ঘষতে ফিরে তাকাল।
“ওটা কথা বলে না, ডিরেক্ট কোপায়।”
সাইবান বলে উঠতেই রুবিনা ফিক করে হেসে ফেলল।
“নাম কি ওর?”
“সাহরান আলাদিন ইযান।”
ধাতস্থ হয়ে বিনা দ্বিধায় উত্তর করল সাইবান। তাতে রুবিনাকে খানিকটা অবাক দেখাল। মাথা দুলিয়ে সে পুনরায় জিজ্ঞেস করল,
“তোমার ছেলে?”

সাইবানের চেহারায় শীতলতা নেমে এলো। ইরামের গা ঘেঁষে দাঁড়াল সে। একটি হাত তুলে রাখল ইযানের পিঠে। সরাসরি রুবিনার চোখের দিকে চেয়ে দৃঢ় গলায় বলল,
“আমাদের ছেলে। আমার আর ইরামের।”
ইরামের ভেতর থেকে দুষ্টুমির মনোভাবটা কিছুক্ষণের জন্য বিদায় নিল। মাথা তুলে স্বামীর মুখটা দেখল সে। সেখানে কোনো সন্দেহ নেই, দ্বিধা নেই। আছে শুধু নিরেট বাস্তবতা এবং ভরসা। রুবিনা পর্যন্ত মৃদু হাসি এবং একরাশ মুগ্ধতা নিয়ে ছোট্ট পরিবারটিকে দেখে গেল।
“বুঝতে পারছি। একদম তোমার মতোই হয়েছে।”
রুবিনার মন্তব্যে অবশেষে উষ্ণতা অনুভব না করে পারলনা ইরাম। মাথা ঘুরিয়ে ইযানকে দেখল সে। সত্যিই কি? ইযানের মাঝে কি তার আলাদিনের ছাপটা অতীব স্পষ্ট? ছেলের ফোকলা দাঁতের হাসি মাতৃহৃদয়কে আন্দোলিত করল মুহূর্তেই।
শুরুটা বেখাপ্পা হলেও রুবিনার সঙ্গে পরবর্তী আধ ঘণ্টা বেশ ভালোই কাটল। মেয়েটার স্বামী এলো, তার সঙ্গেও টুকটাক পরিচয় হলো। সব মিলিয়ে একটা সুন্দর সময় অতিবাহিত করল সকলে। সূর্য প্রায় ঢলে পড়ার মুহূর্তে তারা সবাই একটা ডাবের খোসা বলের মতন ব্যবহার করে সৈকতে খেলায় মেতে উঠল। হাসি, ঠাট্টা আর আনন্দের মাঝে ইরাম সকল আশঙ্কাই প্রায় ভুলে গেল। খেলার মাঝে হঠাৎ তার নজরে এলো আশেপাশে কোথাও সাইবান আর ইযানকে দেখা যাচ্ছে। এই মাত্র মিনিট পাঁচেক আগেই ছেলেকে স্বামীর কোলে দিয়েছিল ইরাম। খানিকটা অবাক হয়ে সে অনুরাগকে ধরল,
“অনুরাগ? আলাদিন কোথায়?”
কাঁধ তুলে ঠোঁট ওল্টাল অনুরাগ।
“এইতো, আশেপাশেই কোথাও হবে। হয়ত ডায়পার লিক হয়েছে তাই চেঞ্জ করতে গিয়েছে?”
ইরাম মাথা দোলালো। ঠিক। এমনটা হওয়া অসম্ভব নয়। সে দ্বিতীয় কিছু চিন্তা করার আগেই রুবিনা আর সুগন্ধা একসাথে টেনে তাকে খেলায় ঢুকিয়ে ফেলল বিধায় বেশি ভাবা সম্ভব হলোনা আর।

চারিদিকে ক্রমশ আঁধার নেমে আসছে। সূর্য অস্ত গিয়েছে। শুধু তার গাঢ় কমলাভ আভা এখনো ছেয়ে আছে আকাশে। সৈকতের একদম এক কোণায় দাঁড়িয়ে নিচের সমুদ্রের পানিতে নিজের প্রতিফলনের দিকে চেয়ে আছে অরণ্য। সকালে শেভ করায় চোয়াল একেবারে চকচক করছে তার। চুলগুলো হালকা শুষ্ক, এলোমেলো হয়ে কপালে লুটিয়ে পড়েছে। ঘন কালো ভ্রু আর পুরু লালচে ঠোঁটে নিজের গঠনকে ভাস্কর্যের চেয়ে কম কিছু মনে হলোনা তার নিকট। কালো শার্ট এবং শর্টসে শারীরিক কাঠামো দারুণভাবে ফুটে উঠেছে তার। শার্টের উপরের কয়েকটা বোতাম খোলা। এই নিয়ে বিশতম রমণীর পক্ষ থেকে আকর্ষণের দৃষ্টি লাভ করেছে সে। তীর্যক হাসল অরণ্য। লাভ কি? যার দৃষ্টি গায়ে মাখতে চেয়েছিল, তার দৃষ্টি পাওয়া গেলনা। এখনো সময় হয়নি।
“উন…আগু!”
“ওয়ান…টু…থ্রি..”

কথোপকথনের আওয়াজ অরণ্যর সমুদ্রবিলাসে বিঘ্ন ঘটাল। পাশ ফিরে তাকাতেই চমকাল সে। প্রথমে নজরে এলো ভেজা বালুকায় ছোট্ট ছোট্ট পদচিহ্ন। অতঃপর ছোট্ট ছোট্ট নাজুক পা। হেলেদুলে, ভারসাম্যহীন এগিয়ে আসছে। হাঁটতে শেখেনি, না শিখেছে দাঁড়াতে। তবে তাকে ধরে একটু একটু করে এগিয়ে নিয়ে আসা হচ্ছে। তুচ্ছপ্রায় শরীরটা তালে তালে দুলে উঠছে, হেলে পড়ছে, কিন্তু কখনো মুখ থুবড়ে পড়ছেনা। কারণ দুটি অতীব শক্তিশালী হাত তাকে ধরে রেখেছে শক্তভাবে, খুঁটির মতন, আশ্রয়স্বরূপ। ঠিক তার মুখোমুখি এসে থামল তাদের যাত্রা। মুখ তুলে তাকাল অতিকায় দেহের অধিকারী পুরুষটি, যে ধরে রেখেছে ছোট্ট অস্তিত্বটিকে। তীর্যক হাসি ফুটল তার ঠোঁটজুড়ে। আঙুল তুলে সে ধরে রাখা বাচ্চাটিকে দেখাল সামনে, ঠিক যেখানে অরণ্য দাঁড়িয়ে আছে।
“ওই দেখ পোটলা। গ্লোবাল ওয়ার্মিংয়ের চমৎকার নিদর্শন! সৈকতের ভেতরে জঙ্গল!”
অরণ্যর ভ্রু কুঁচকে গেল, দাঁতে দাঁত চেপে ফেলল সে। এই ছেলেটা! বহু কষ্টে ভেতরের রাগটাকে দমন করল সে। বাঁকা হেসে ঘুরে দাঁড়াল। তুমির ধার ধারলনা আর, সোজা তুইয়ে চলে গেল।
“তোর চোখ নাকি সিসি ক্যামেরা?”

“যার কাছে জাদুর চেরাগ আছে, তার আবার ক্যামেরার কি দরকার?”
বালুচরে হেলতে দুলতে দাঁড়িয়ে থাকা ইযানকে এবার নিজের কোলে তুলে নিল সাইবান। পরনের থ্রি কোয়ার্টার প্যান্টের পকেট থেকে টিস্যু বের করে ছোট্ট ছোট্ট পা দুখানা সযত্নে মুছে দিতে লাগল। বালি আর পানিতে ভিজে গেছে। অরণ্য দাঁতে নিজের ঠোঁটের ভেতরকার অংশ কামড়ে ধরল। দৃশ্যটা তার মধ্যে কেমন যেন একটা অনুভূতি খেলিয়ে দিল। সেটাকে বিশ্লেষণ করতে পারবেনা সে।
“ভূত সাজার শখ থাকলে আমার নাটকদলে যোগ দিতে পারেন। তবুও সং হয়ে ভং ধরে আমার বউয়ের আশেপাশে ঘুরঘুর করবেন না। দশটা না, পাঁচটা না, একটামাত্র বউ আমার! কিডনি লক হয়ে গেলে তো সমস্যা!”
সাইবানের দ্বিধাহীন কথাগুলোয় অরণ্যর ঠোঁটের অশুভ হাসিটি ক্রমে বিস্তৃত হলো। মাথা কাত করে চেয়ে জিভে ঠোঁট ভিজিয়ে নিল সে। অতঃপর বলল,
“তোর বউ?”
সাইবান পাল্টা হাসল,

“হ্যাঁ। আমার বউ। অনেক আদরের তো। আশেপাশে দামড়া ষাঁড় শিং দেখিয়ে ঘুরে বেড়ালে ভয় তো পাবেই।”
অরণ্যর হাতের মুঠো শক্ত হয়ে গেল। পরক্ষণে মাথা ঝাঁকিয়ে কয়েক পা এগিয়ে দূরত্ব মিটিয়ে ফেলল সে। ঝুঁকে এসে কন্ঠ খাদে নামিয়ে জানাল,
“তবে তোর বউকে বলে দিস, ওর শরীরে লেপ্টে থাকা ঘ্রাণের সুবাসে মৌমাছি তো আসবেই। আর মৌমাছি যদি আসে তবে তার হুলের ফোঁটাও সইতে হবে।”
“আসুক না মৌমাছি। ওই হুল ছিঁড়ে রেখে দেবে না, তার স্বামী?”
চোখ টিপ দিল সাইবান। অরণ্যর মুখ কঠোর হয়ে উঠল। নিরেট পাথরের মতন দেখাল তা। এমন সময়ে সাইবানের বুকে লেপ্টে থাকা ইযান নড়ে উঠল।
“গুই!”

মাথা হেলিয়ে হুট করে পিছনে তাকাল ইযান। তৎক্ষণাৎ সেখানেই জমে গেল অরণ্য। মৃদু কমলাভ রশ্মির প্রতিফলনে দৃশ্যটা কোনো শিল্পীর আঁকা চিত্রের মতন দেখাল। ইযান চোখ পিটপিট করে তাকাল অরণ্যর দিকে। জ্বলজ্বলে গভীর চোখের মাঝে কোনোপ্রকার অনুভূতি দেখা গেলনা। না আনন্দ, না দুঃখ, না রাগ, না ক্লেশ, না কৌতূহল। শুধু অনুভূতিহীনতা। যেন সে বুঝতে পারছে না, সামনের মানুষটার প্রতি তার ঠিক কেমন অনুভব করা উচিৎ। অরণ্যর বুকে হালকা একটুখানি যন্ত্রণা হলো বুঝি। নাকি হয়নি? বলতে পারবে না সে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই ডান হাতটা তুলল, এগিয়ে দিল ইযানের দিকে। অথচ ছুঁয়ে দেয়ার আগেই ইযান চট করে মাথা ঘুরিয়ে ফেলল। সাইবানের কাঁধে মুখ গুঁজে হঠাৎ করে উৎফুল্ল কন্ঠে চেঁচিয়ে উঠল,
“বা…!”
প্রথম কয়েক সেকেন্ডের জন্য সাইবানও অবাক হয়ে গেল। পরক্ষণেই অবশ্য ছেলেকে বুকে চেপে পরিতৃপ্তির হাসি হাসল সে। কপালে চুমু দিয়ে অস্ফুট স্বরে বলল,

“হুম। বাবা এইখানে, আব্বু।”
বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়েছে এমন এক ঝটকা খেয়ে হাত সরিয়ে নিল অরণ্য। পিছিয়ে গেল বেশ কয়েক পা। সাইবান ইযানকে বুকে চেপে রেখে চোখ তুলে তাকাল। তার দৃষ্টি থেকে সমস্ত দুষ্টুমি, বেখেয়ালি মনোভাব আর দ্বিধাহীনতা গায়েব হলো মুহূর্তেই। দেখা মিলল তীব্র আক্রোশের, সঙ্গে সতর্কবানী। কন্ঠস্বর গভীরতম হয়ে উঠল তার,

আমার আলাদিন পর্ব ৫৩

“ওই কলুষিত ছায়াও যদি আমার পরিবারের আশেপাশে আর চোখে পড়ে, শুধু হুল ছিঁড়ে বসে থাকবনা। একেবারে জিন্দেগি ছিঁড়ে ফেলব!”
একটু থামল সে, বাঁকা হেসে যোগ করল,
“একজন বাপের কলিজা মাপতে আসবেন না, পৃথিবীতে এর জন্য কোনো স্কেল খুঁজে পাবেন না।”
দাঁড়ালনা সাইবান। উল্টো ঘুরে হনহন করে হেঁটে চলে গেল। বালুকার ধারে দাঁড়িয়ে অরণ্য নিষ্পলক চেয়ে রইল সেই পথপানে। নিগূঢ় নয়নে সাইবানের কাঁধে ঝুলতে থাকা ছোট্ট হাত দুখানা দেখে গেল।

আমার আলাদিন পর্ব ৫৪ (২)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here