হৃৎস্পন্দন পর্ব ৫৭
সাঞ্জেনা শাজ
শুক্রবার দিন তালুকদার বাড়িতে ঘটা করে দোয়ার আয়োজনের প্রাড়াম্ভরতা শুরু হয়েছে। একের পর এক বাধা বিপত্তি পেরিয়ে সকলের পুনর্মিলনীর জন্য এ দোয়া অনুষ্ঠান।
টুকিটাকি কাছের আত্নীয় স্বজনদের আমন্ত্রণ করা হয়েছে যাদের তারাও উপস্থিত হচ্ছে সকাল হতে । মেহরাদের নানীর বাড়ির আত্নীয় স্বজন আসছে।
জাহানারা বেগম একমাত্র ছেলের বউকে শাড়ি আর অলংকারে মুড়িয়ে রেখেছে এক প্রকার। আমন্ত্রিত একেকজনের সাথে শুভ্রতার নতুন পরিচয় হচ্ছে, তাশদীদ মেহরাদ তালুকদারের বউ হিসেবে। আড়ষ্টতায় ড্রয়িং রুমে মাথা নুয়িয়ে বসে আছে মেয়েটা। কেউ কেউ খুশি হয়ে দোয়া করছে,কেউ একটু হা-হুতাশ করছে, আবার কেউ কেউ বাকা চোখে দেখছে। রিমা খানের অনপুস্থিতে সকলকে জানানো হয়েছে, রিমা আর শায়ান তালুকদারের ডিবোর্স হয়ে গিয়েছে। এতেও সকলের বাকা দৃষ্টি শুভ্রতার দিকেই পড়ছে। মেয়েটা অস্বস্তি নিয়েও গাট হয়ে বসে রইলো। প্রান প্রনে দোয়া করছে কখন শেষ হবে এ দোয়া অনুষ্ঠান। সকালের উচ্ছ্বসিত মনটা যেন কোথায় মিলিয়ে গেলো মেয়েটার!
সোহানা, শান্তা মিলে নিজেদের কাজিনদের সাথে আড্ডা দিচ্ছে। শুভ্রতাকে একটু স্বস্থি দিতেই বোধহয় ভরা মজলিস হতে ওঁকে উঠিয়ে নিয়ে গেলো ওরা। স্বস্থির নিশ্বাস টুকু ফেলে হাফ ছেড়ে বাচলো মেয়েটা। ড্রয়িং রুম ছেড়ে বাগানের দিকটায় গেলো ওঁরা। সকালের সতর্কবাণী থুরায় না মনে আছে মেয়েটার! সে সকলের সাথে আড্ডায় মশগুল হবে।
তবে,শাড়িতে বেশ হিমশিম খাচ্ছে মেয়েটা। তবুও বাড়ির বউয়ের খাতিরে এ কষ্ট টুকু সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করেছে শুভ্রতা। মেহরাদ দেখলে কখনোই দিতো না। লোকটা খুব ব্যাস্ত সকাল হতেই। সে যে গেলো আর দেখতে পেলো না। বাগানের দিকটায় মানুষ জন খাওয়ানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে, সেখানেই সকাল থেকে।
শুভ্রতা একটুও দেখেনি লোকটাকে তখনকার পর হতে। মূলত প্রণয় পুরুষের সুদর্শন চেহারার দর্শনে দু’চোখ শীতল করতেই শাড়ী উচিয়ে বাগানের দিকে যাচ্ছে মেয়েটা।
তালুকদার বাড়ির পিছনের দিকে বাগান টা বেশ বড়ো। একপাশে খাওয়া দাওয়ার আয়োজন করলেও তালুকদারদের পুকুরের পাশের আরেকপ্রান্ত সম্পূর্ণ নিরিবিলি। শুভ্রতারা একযোট হয়ে সেখানেই গিয়ে বসবে । দোলনা সহ পাকা বেঞ্চি আছে সেখানে।
শুভ্রতা যেতে যেতে বাগানের ওপাশটায় উঁকি ঝুঁকি দিচ্ছে। দূর হয়ে এতো মানুষের ভীরেও কাঙ্খিত পুরুষের আবয়বটুকু মেপে ঝুপে ফেললো শুভ্রতা। ওই তো কাদের সাথে যেন হ্যান্ড শ্যাক করছে। সফেদ শার্টের গুটানো আস্তিনের কালো রঙা একটা গড়ি রৌদ্রের আলোয় চকচক করে উঠছে। পুরুষালী আভিজাত্য ঠিকরে পড়ছে কুঞ্চিত ভ্রু’যোগলের গৌড় বর্নের চেহারায়। মধ্য দুপুরের তপ্ত তাপদায়ক রৌদ্রের জ্বালাময়ী আলোকরশ্মির খেলায় পুরুষালী সুদর্শন চেহারাটা কেমন ঝিলমিল করে উঠছে। প্রতিবেশির দু’একটা মেয়ে কেমন নির্লজ্জের মতো তাকিয়ে আছে দেখো! উফফফফ, অসহ্য!
শুভ্রতার ওষ্ঠদ্বয় ফাঁকা হয়ে এলো বিরক্তিকর শ্বাস ফেলতে ফেলতে। চরম লেবেলের মেজাজ খারাপ হতে লাগলো তার। একবার নির্লজ্জ মেয়ে দুটোর দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করে , পরক্ষণেই আরেকবার মেহরাদকে দেখে নিলো, আদুরে নয়নে। তৃষ্ণার্ত দৃষ্টিতে ছুয়ে দিলো স্বামীর পুরোষ্ঠ দু’ঠোট। তার জামাইটা! কি ব্যাস্ত! তার দিকে তাকাচ্ছে না একটুও। অভিমান জমলো কি! উঁহু। অষ্টাদশীর বুঝ হয়েছে বেশ। বেচারির হুট করেই মনে পড়লো, — ওহ্, হ্যাঁ! সে যে এখানে এটা তো জানেও না! তাকাবে কেন! ‘ মনে মনে বেশ স্বস্থি পেলো। তার জামাইটা কোন দিকেই তাকাচ্ছে না, ওই শূকুনীদের দিকেও না। এটা বেশ প্রশান্তির তার জন্য। তবুও ভেতরের হিংসাত্মক সত্তাকে দমাতে পারলো না শুভ্রতা।
বেঞ্চিতে বসতে বসতে বাকি মেয়েদের আলাপ আলোচনা মধ্য দিয়েই সোহানাকে সন্ধিগ্ধ কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো,
“ওই মেয়ে দুটো কে যেনো? পাশের বাড়ির’ই তো না।”
“হু, হু। ওই যে সালমা আন্টিদের বাড়ির। আপুর সাথেই তো পড়ে, ওই যে ওই আপুটা। তাই না আপু? ” বাক্য শেষে শান্তাকে জিজ্ঞেস করলো সোহানা। শুভ্রতার মুখ বেকে আসলো অসন্তুষ্টিতে। — ইশশ! আপু লাগাচ্ছে! অসহ্য!’ মনে মনে বিড়বিড়ালো মেয়েটা।
শান্তা ‘হ্যাঁ’ বোধক মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানালো। মেয়েটার মনটা আপাতত কিছুটা ভালো। কৌতহলী স্বরে জিজ্ঞেস করলো,
” একজন কে চিনি। আরেকটা কে বলতে পারছি না।হটাৎ ওদের কথা জিজ্ঞেস করছিস যে? ওর বাবা-র সাথে তো ভালো সম্পর্ক বড়ো বাবার।সেই আগে থেকেই।”
“এঁদের এখান থেকে সড়াও আপু। খাওয়া দাওয়া হয় নি এখনো এঁদের? বাসায় পাঠানোর ব্যবস্থা করো।” ঈর্ষান্বিত কন্ঠে ফোসফাস করতে করতে অস্থির চিত্তে বলে উঠলো শুভ্রতা।
ওর কথা বিপরীতে হতবিহ্বল দৃষ্টিতে ওর দিকে তাকালো সবাই। ওর আশ্চর্যজনক কথার পাছে উপস্থিত মেয়েলি জোটের সম্পূর্ণ দৃষ্টি এবার ওর দিকে ঘুরলো। শুভ্রতা তখনো বিরক্তি মাখানো ঈর্ষান্বিত দৃষ্টিতে চেয়ে আছে মেয়ে দুটোর দিকে। কুঞ্চিত ভ্রু’দয়ের মাঝ বরাবর অসন্তুষ্টির স্পষ্ট রেখা দৃশ্যমান।
সোহানা খেয়াল করে দেখলো মেয়ে দুটো বার বার ঘুরে ফিরে তাদের মেহরাদ ভাইকে দেখছে। কেমন লাজুক লাজুক হাসছে। মূহুর্তেই শুভ্রতার কথার মর্মভেদ করে ফেললো মেয়েটা। শুভ্রতার ঈর্ষান্বিত দৃষ্টির অনুসরণে সামনে দেখে রসাত্নক হাসলো মিটমিটিয়ে। সকালে আদনানকে নিয়েও তাকে বেশ জ্বালিয়েছে! এবার তার পালা।
মেয়েটা কি জেলাস ফিল করছে! সে মিছে অবুঝ পনা সেজে আশ্চর্য কন্ঠে শুধালো,
“এভাবে কেন বলছুস শুভ্রতা? দাওয়াত দিয়ে এভাবে অপমান করে তাড়িয়ে দেওয়া যায়? মেহরাদ ভাইয়া রেগে যাবে। ব্যাপার টা দৃষ্টি কটু দেখায়।”
শুভ্রতা ফোস ফোস শ্বাস ফেলে চটে যাওয়া মেজাজ নিয়ে। বিরক্তিমাখা কন্ঠে উচ্চারণ করে,
“তোর দৃষ্টি কটু তুই ধুয়ে পানি খা। ইবলিশ গুলো চোখ দিয়ে গিলে খাচ্ছে আমার জামাইটাকে, আর তুই দৃষ্টি কটু’র ছাতার মাথা নিয়ে পরে আছিস! এঁদের বিদায় কর ভাইইইই! আমার মাথায় আগুন ধরে যাচ্ছে….” অসহ্য, ধৈর্যহীন কন্ঠ অষ্টাদশীর। তার জামাইকে আরেকজন এমন ডেবডেবিয়ে কেন দেখবে? হোয়াই? এ-ও তার সামনে! কক্ষনোই না! অসম্ভব!
মূহুর্তেই হাসির রোল পরে গেলো মেয়েদের মধ্যে। সকলে একযোগে ঠোঁট গোল করে টেনে টেনে উচ্চারণ করলো , ‘আমার জামাইইইইইই’
শান্তা ওর থুতনি চেপে দরে আদর মাখা কন্ঠে স্নেহ ঢেলে বলে উঠলো,
“পিচ্চি মেয়ে বড়ো বোনের সামনে তার ভাইকে জামাই জামাই ডাকিস লজ্জা করে না!!!”
শুভ্রতা বোনের দিকে তাকালো অভিমানী দৃষ্টিতে। তার দুঃখটা কেউ সিরিয়াসলি নিচ্ছে না। আশ্চর্য! এ আপদ দুটোকে না ভাগিয়ে তাকে নিয়ে কেন মজা করছে। সে অভিমান সিক্ত কন্ঠে বললো,
“তুমিও মজা করছো আপা? এঁদের ভাগাবে না? দাড়াও আমি-ই ভাগিয়ে আসছি….” অভিমান মিয়ে মেয়েটা উঠতে নিলেই খপ করে ওর সরু হাতটা চেপে ধরলো শান্তা। সতর্ক দৃষ্টিতে জানালো,
“ওদিকে ভুলেও যাওয়া যাবে ন। কত মানুষ দেখেছিস? হাড্ডি গুড্ডি সব ভেঙে গুড্ডি উড়াবে ভাইয়া। এরা এমনিই চলে যাবে নে। শান্ত হ তুই।”
শুভ্রতা শান্ত হতে পারলো না কিছুতেই। মুখে কুঁলুপ এটে বসে রইলেও,অস্থির, চঞ্চল দৃষ্টি যুগোল কেবল স্বামীর দিকেই তাক করে রাখলো। সতর্ক দৃষ্টিতে মেয়ে দুটোকেও পরখ করতে লাগলো। সে জানে তার মেহরাদ এঁদের দিকে ভুলেও তাকাবে ন। স্টিল তার ভেতরটা ইর্ষার দাবানলে জ্বলে পুড়ে নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে। তপ্ত রোদের তাপকেও হার মানাবে এ তপ্ততা। একটু পর মেহরাদ কোথায় যেন গেলো প্যান্ডেল ছেড়ে। শুভ্রতা যেন হাফ ছেড়ে বাচলো। এ প্রথম মেহরাদ চোখের আড়াল হতেও তার ভেতরটা স্বস্থির শীতল পরশে ভরে উঠলো। এবার অসভ্য দুটোকে মুখ ভেঙিয়ে তার বলতে ইচ্ছে করছে, — নে দেখ এবার? আরও ভালো করে দেখ আমার জামাই টাকে? শয়তান মেয়ে লোক!
পুকুরের পাড়ের দিকটায় একা বসে আছে শুভ্রতা। মেয়ে গুলো সব কোথায় যেন গেলো! বললো ক্যামেরা নিয়ে আসছে। ক্যামেরা আনতে এতক্ষণ লাগে! বুঝলো না মেয়েটা। নীরবতা বজিয়ে রেখে মুগ্ধ দৃষ্টি পুকুরের টলটলে পানির দিকে চেয়ে রইলো। আগে এদিকটায় আসা হলেও এখন খুব কম হয়। কয়েক মাসের অদেখায় বেশ কিছু পদ্মের জন্ম হয়েছে পুকুরের পাড় ঘেঁষে। কি মনরোম এ দৃশ্য!
মুগ্ধতায় বিমোহিত শুভ্রতার মাথা গলিয়ে কাপড় পরে, ফুরফুরে বাতাস ছুয়ে দিচ্ছে ঘার কাধের উন্মুক্ত পেলব অংশ। খোপায় আটকানো চুলের গুটানোতে সফেদ পিঠ বেশ খানিকটা উন্মুক্ত। একজোড়া মেয়ে লোভী দৃষ্টিতে আটকেছে তা। যে চোখে জমা লালসা নিয়ে সকলের অগোচরে এগিয়ে যাচ্ছে পুকুরের পাড়ে অবস্থিত রমনীর পানে।
রাজিব। মেহরাদের নানু বাড়ির অতিথি। ছেলেটার বয়স কেমন হবে? বড়ো জোর তেইশ/ চব্বিশ ! দু চোখের তারায় কি বিশ্রি নারীর নেশা! মন্ত্র মুগ্ধের ন্যায় মেয়েলি অবয়বের দিকে যাচ্ছে। কমনীয় ওই অংশটুকু আলাপ পরিচিতির বাহানায় হলেও ছুয়ে দিবে সে। চোখের লালসা হাতের ছোয়ায় তৃপ্তি মেটাবে। এ অনিন্দ্য সুন্দর্যৌ কে ছুয়ে না দিলেই যেন জীবন বৃথা।
এক লালসার শিকারী দৃষ্টিতে আটকিয়েছে তার নারীদেহ, এতে সম্পূর্ণ বেখবর মেয়েটা। পিঠ ঘুরিয়ে বসে আছে পুকুরের দিকটায়। একটা লোভনীয় লালসা মাখা হাতের ছোয়া অনুভব করার আগ মূহুর্তেই পিছন হতে বিকট আর্তচিৎকার কর্নকুহোর হলো মেয়েটার। অনাকাঙ্ক্ষিত শব্দদয়ের পাল্লায় বিহ্বলিত দৃষ্টিতে ধরফরিয়ে উঠে দাঁড়ালো মেয়েটা। পিছু ঘুরতে নিলেও পা’য়ের গতি বেসামাল হয়ে পরে যেতে নিলে এক শক্ত পোক্ত হাতের মুষ্ঠাবদ্ধ হলো শাড়ির আঁচল সংলগ্ন সরু বাহু।
পিছু ঘুরে মেহরাদের অগ্নিমূর্তি দেখে মূহুর্তেই হকচকিয়ে উঠলো মেয়েটা। রাজিব নামক ছেলেটার এক হাত শক্ত থাবায় মুচড়ে ধরে আছে এক হাতে। যার ব্যাথায় কন্ঠানালী ফেড়ে চিৎকারে ফেটে পরছে ছেলেটা। আরেক হাতের ব্যাগ্র থাবায় তার বিহ্বলিত অস্তিত্ব আটকে।
শুভ্রতা কিছুই বুঝতে পারলো না। এ ছেলে এতটা কাছে কখন আসলো! মেহরাদ কখন আসলো! এভাবে হাত মুচড়ে ধরে রেখেছে কেন তা-ও বুঝলো না সে। শংকিত দৃষ্টিতে দু’চোখ উল্টিয়ে তাকিয়ে রইলো মেয়েটা।
শুভ্রতাকে টেনে নিজের পিছু নিয়ে নিলো মেহরাদ। রাজিবের আর্তচিৎকারে গুটি কয়েক মানুষ জড়ো হচ্ছে সেখান টায়। মেহরাদের পা হতে মাথা অব্দি রক্তের স্রুত ঝলসে উঠছে জ্বলন্ত স্ফুলিঙ্গের ন্যায়। ধমনীর শিড়া-উপশীরা বেয়ে প্রবাহিত হচ্ছে আগুনের ফুলকি। গৌড় বর্নের চোয়ালটা তীক্ষ্ণতায় ক্ষুরধার তলোয়ারের ন্যায় ধারালো হয়ে আছে। দাতে দাত চেপে, ইস্পাত কঠিন চোয়াল সমেত মুচড়ে ধরা হাতের দৃঢ়তা বাড়ালো সে। যেন ভেঙে চুড়মার করে ফেলবে তার প্রেয়সীর দিকে বাড়ানো কুলসীত নোংরা হাত’টা।
আদনান ছুটে এসেছে প্যান্ডেল ছেড়ে। আজ দ্বীপ নেই। ছেলেটার কোন খবর পায়নি এখনো তারা। আদনান এসেছে কিছুক্ষণ আগে । শুভ্রতা মাথায় কাপড় টেনেছে সে কখনো । শান্তা তারা সহ বাড়ির গিন্নিরা ছুটে এসেছে ঘটনা স্থলে। আদনানের দু’চোখে আতংক। সেদিন চট্টগ্রামে যে রূপ দেখেছিলো আজ ঠিক তারই প্রতিমূর্তি দন্ডায়মান যেন তার সামনে। আতংকিত কন্ঠে মেহরাদের দিকে এগোতে এগোতে বলল,
“কি হয়েছে? কি করেছে ও? ভেঙে যাবে তো হাতটা! ছাড়…..”
বাক্য শেষ করার ফুরসত টুকু দিলো না মেহরাদ। হিংস্র বাঘের ন্যায় ক্ষ্যাপাটে দৃষ্টি ছুড়ে দিলো আদনানের দিকে। গর্জে উঠে বলল,
“দিস বাস্টার্ড। হাউ ড্যায়ার হি? ওর নোংরা হাত দুটো কেটে টুকরো টুকরো করবো আমি।”
আতংক ছড়ালো সমগ্র ঘটনাস্থল জুড়ে। শুভ্রতা আঁৎকে উঠলো। হৃদযন্ত্র খামচে উঠলো নিষ্ঠুর হুংকারে। কি হলো! কখন হলো, কিছুই বুঝছে না মেয়েটা। হৃৎপিণ্ডের অস্বাভাবিক ছোটাছুটিতে পা ভারী হয়ে আসতে চায় মেয়েটার।
আদনান যেন বন্ধুর সম্পূর্ণ মনভাব ধরে ফেলেছে। অতংকতা ছড়িয়ে পরলো সমগ্র অস্তিত্বে জুড়ে । মেহরাদকে থামানোর সুরে অনুযোগ করলো,
“এটা নিয়ে পরেও দেখা যাবে মেহরাদ। এখন থাম। প্লিজ ভাই। সিনক্রিয়েট করিস না…. তোর ই রিলেটিভ। ”
“নো ওয়ে! রিলেটিভস মাই ফুট! মাই হাউস, মাই রুলস। কোন সিনক্রিয়েট না…..”
“কি হয়েছে বাবা? ও কি করেছে? ছেলেটার হাতটা ভেঙে যাচ্ছে তো! ছেড়ে দে বাবা….” অস্থির চিত্তে ছেলের দিকে এগিয়ে গিয়ে বললো জাহানারা বেগম। তার বাড়ির লোকজন হায় হায় করছে সকলে। কারো কোন অনুরোধ অনুযোগ কর্নগোচর হলো না ক্রোধান্বিত মানবের।
বেখেয়ালিতে দু হাতের মুঠোয় দৃঢ়তা ঢালতে ব্যাথায় কোকিয়ে উঠলো শুভ্রতা। ছটফটিয়ে উঠলো বলিষ্ঠ থাবা হতে মুক্তি পেতে। মেহরাদ ঘার বাকিয়ে জ্বলন্ত দৃষ্টিতে তাকালো ওর দিকে। মূহুর্তেই আতংকে হৃৎপিণ্ড স্থীর হয়ে, সর্বাঙ্গ জমে গেলো মেয়েটার। ধারালো দৃষ্টির কবলে প্রান কুন্ঠাগত রমনীর।
রমনীর লালিত্য রুপে আজ একদম’ই মোহিত হলো না উন্মাদ পুরুষ। তার শুভ্র ফুলটাকে কেউ নোংরা হাতে ছুতে চেয়েছে সেটা মগজ কাপিয়ে তুলতেই , চাপা হুংকার ছুড়ে শুভ্রতার দিকে ঝুকে দাতে দাত পিষে হিসহিসিয়ে উঠলো মেহরাদ,
“শাড়ি পড়েছিস কেন? কার অনুমতিতে? কার অনুমতিতেএএ? এক্ষুনি রুমে যাবি। রাইট নাওওও! তোকে রুমে গিয়ে দেখছি আমি…..শান্তা….. ” চেচিয়ে ডেকে উঠলো শান্তাকে।
ধরফরিয়ে ত্রস পায়ে এগিয়ে এসে শুভ্রতাকে নিয়ে দূরে সরে গেলো শান্তা। ব্যাথায় ছটফটিয়ে আকুতি মিনতি করে ছাড়া পেতে চাইছে ছেলেটা। কিন্তু মেহরাদ তো তার প্রেয়সীর ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ হার্টলেস! উপস্থিত কারো অনুনয় বিনুনয় কিছুই কাজে আসলো না। শক্ত হাতে ছেলেটার বাহু টেনে নিয়ে গেলো বাগানের পাশবর্তি স্থানে,। যে স্খানে অসংখ্য চ্যালাকাঠ, লাঠির স্তুপ। প্যান্ডেলের জন্য আনা কিছু।
বলিষ্ঠ হাতের আস্তিন আরও কিছুটা গুটিয়ে একটা মোটা চ্যালাকাঠ হাতে তুলে নিলো মেহরাদ। সকলের চোখ বিস্ফোরিত। জাহানারা বেগম ছেলেকে এতো ডাকলেন! কোন কাজ হলো না। নিজের মানুষদের ক্ষেত্রে মেহরাদ বরাবরই অবাধ্য, বর্বর। চ্যলাকাঠের একেকটা কঠোর আঘাত হাতে ছেলেটার বাড়ানো সেই নোংরা হাতে। গজড়াতে গজড়াতে হুংকার ছুড়ে,
“জা’নোয়ার! কোন সাহসে হাত বাড়য়েছিলি? কার বাড়িতে এসেছিস ভুলে গিয়েছিলি? বাস্টার্ড! তালুকদার বাড়িতে এসে নোংরামি করিস? এ বাড়ির মেয়ের দিকে কু’নজর! এই তাশদীদ মেহরাদ তালুকদারের বউ এর দিকে লালসার চোখে তাকাস? কুত্তার/বাচ্চা তোর হাত আমি কেটে কুত্তাকে খাওয়াবো।”
সকলের স্তম্ভিত দৃষ্টি মেহরাদের আনা একেকটা আঘাতের উপর। রাজিব লুটিয়ে পড়েছে মাটিতে। মেহরাদ তবুও থেমে নেই। নোংরা হাতটায় পা’য়ে পিষে দাড়িয়ে আছে স’দাপটে। আজমল নামের একটা দিকে তাকিয়ে আদেশ ছুড়লো,
“আজমল ??? গাড়ির ঢেকিতে কাটারি আছে। নিয়ে আসো, ফাস্ট!”
রক্ত শূন্য ফ্যাকাসে হয়ে উঠলো সকলের মুখশ্রী। আদনান চেচিয়ে উঠলো,
“চারদিকের মানুষ দেখছে মেহরাদ! থাম প্লিজ…”
“হু ক্যায়ারস? হু ফা’কিং ক্যায়ারাস…..” দাতে দাত পিষে প্রবল আক্রোশ ঢেলে বলতে বলতে আঘাত করতে থাকে মেহরাদ। প্রতিটি আঘাতে ছেলেটির গগনবিদারী চিৎকার কাপিয়ে তুলছে চারিপাশ। একেকটা আর্তচিৎকারে শরীরের লোমকূপ কেঁপে উঠছে ভয়ে।
সন্ধ্যার সময় সকলে একত্রিত হয়ে ড্রয়িং রুমে বসে। কারো মুখে রা’মাত নেই। একটু আগেই রাজিব নামের ছেলেটাকে হাসপাতাল ভর্তি করে এসেছেন তারা। সকল ফর্মালেটিস পূরণ করে আসতে আসতে দেরি হয়েছে।
মেহরাদ দক্ষযজ্ঞ বাধিয়ে কোথাও যেনো ভ্যানিশ হয়ে গিয়েছে সেই বিকেল থেকে। সকলের যোগাযোগের নাগালের বাইরে। আলতাফ তালুকদার ছেলের উপর, বেজায় চটেছে আজ। কি হয়েছে, কোথা থেকে হয়েছে, কেন এমন করলো কিছুই জানালো না বর্বর ছেলেটা। শুধু আরেকটা ছেলেকে মেরে আধমরা করে বসে আছে।
একেক জনের দীর্ঘ নিশ্বাসের ভারে থম থমে, নিঃশব্দে নীরবতা বয়ে যাচ্ছে ড্রয়িং রুম জুড়ে। শুধু রোজার ছোট্ট মেয়েটার শুভ্রতার কোল হতে একটু পর পর মৃদু’ আ, উ’ শব্দ ভেসে আসছে। কম্পিত, দুরুদুরু বুক নিয় মেয়েটা সেই দুপুর থেকে ড্রয়িং রুমেই ঘুর ঘুর করছে। শাড়ী চেঞ্জ করার পর থেকে ভুলেও মেহরাদের সামনে পড়ে নি। ভয়, আতংকের মিশলে মেয়েটার নাজুক তনু এইটুকুনি হয়ে আছে একদম। বেচারি!
রোজারা খুব শিগগিরই কানাডা ব্যাক করবে। স্ত্রী কন্যাকে নিয়ে চলে যাওয়ার সকল ব্যাবস্থাই করে ফেল্বছে জাবির। অনেক আগেই চলে যেতো, শুধু হুট করেই রোজার দেওয়া সুসংবাদে আটকে যেতে হয়েছে।
“ছেলেটা দিন দিন এতো বদমেজাজি, উগ্র হচ্ছে! মাথা কাজ করছে না আমার। ছেলেটা আরেকটু হলে মা’রাই যেতো!” নীরবতা ভেঙে, তেতোবিরক্ত শ্বাস ফেলে বললো আলতাফ তালুকদার।
“তুমি আমার ছেলেটাকে বকছো কেন? ওই ছেলেটা নিশ্চয়ই কিছু করেছে! এমনি এমনি কি করেছে নাকি? তুমি শুধু দেখো আমার ছেলেটার যেন কোন ক্ষয় ক্ষিতি না হয়।” কান্না বিজোড়িত কন্ঠে বললেন জাহানারা বেগম।
সমানে আশ্রু বিসর্জন দিচ্ছেন তিনি ছেলের দুশ্চিন্তায় । আহাজারি করছেন ছেলের জন্য। ভদ্রমহিলার ছেলে কাউকে মা’রতে মা’রতে বাচিয়ে রেখেছে এর চেয়েও শোক বেশি এতে, তার ছেলের তো শত্রু হয়ে যাচ্ছে! কখন কি বিপদ চলে আসে! যদি পুলিশ কেস টেস হয়! ‘ এ-তো ‘ও অন্ধ মা আছে কোথাও বলুন? আছে। এই যে মেহরাদের মা জননী!
তার বাড়ির সকল লোকজন চলে গিয়েছে গজরাতে গজরাতে। এতেও কোন ধ্যায়ান খেল ছিলো না তার। তিনি তার ছেলেকে দুশ্চিন্তায় বেশ চিন্তিত হয়ে আছেন। দুনিয়া উলটে যাক, সবার আগে উনার ছেলে।
“আরেহ, ওই যেন উনি? হাসপাতে ভর্তি যে? এই লোক ত ভালো না! শুভ্রতা আপুর দিকে বাজে নজর দিয়েছিলো বোধহয়। দ্বীপ ভাইদের থেকে ত তা-ই শুনলাম। এতো প্যারা নিও না তো। ভাইয়া একিদম ঠিক কাজ করেছে। চিল….” সাফি জানালো গা’ছাড়া ভঙ্গিতে। উপস্থিত সকলের চোখ কপালে উঠে যাওয়ার যোগার। কিন্তু সাফি বেপাত্তা সেদিকে। তার মনটা বেশ ফুরফুরে। সে তার ভাইয়ের মতোই হিরো হতে চায়। তার ভাই যা করেছে একদম হান্ড্রেড পার্সেন্ট, না, না, হান্ড্রেড না, টু হান্ড্রেড পার্সেন্ট রাইট করেছে তার মতে। একদম পিউর আলফা ক্যারক্টর!
সে খুব ফলো করে তার ভাইকে। এটা আরও বেশি করবে।যে তার প্রেমিকার দিকে তাকাবে? একদম মেরে তক্তা বানিয়ে দেবে। বুঝাতে হবে না সে কার ভাই! এই তালুকদারের রক্ত তো!
“তুমি চুপ থাকো দুষ্ট ছেলে। মশকরা হচ্ছে এদিকে? হেয়ালি করছো কেন? হবে তো ভাইয়ের মতোই।শিখছো না এসব? বাদর কোথাকার! ” চোখ পাকিয়ে ভাতিজাকে শাসিয়ে বললেন আলতাফ তালুকদার।
সাফি একদম পাত্তা দিলো না বড়ো বাবার কথায়। বয়স্ক মানুষ! এতকিছু পাত্তা দিয়ে লাভ আছে! কেউ বললেও সে তার ভাইয়ের মতো হবে, না বললেও হবে।হুহ!
শুভ্রতা ভয় যেন আরও বাড়লো। তার দিকে বাজে নজর দিয়েছিলো? কখন? এই কারণে এভাবে রেগেছে। সকলে একবার একবার করে দৃষ্টি ভোলাচ্ছে ওর দিকে। শুভ্রতা আরও হকচকিয়ে যাচ্ছে। রোজা না পেরে জিজ্ঞেসই করে ফেললো,
“ছেলেটা কিছু বলেছিলো তোকে? কোন বাজে ইঙ্গিত? ভাইয়াকে জানিয়েছিলি?”
জড়োসড়ো হয়ে দুপাশে মাথা নাড়ালো শুভ্রতা। কোলের ছোট্ট নাজুক অস্তিত্বটা আরেকটু বুকে চেপে বুজে আসা ক্ষীনকন্ঠে জানালো,
“আমি কিছু জানি না আপু। ছেলেটাকে তো ভালো করে দেখিও নি আমি। শুধু একবার ড্রয়িং রুমে দেখেছিলাম, ব্যাস। ওনাকে কি বলবো আমি!”
“ডোন্ট ট্যাল মি, ভাইয়া ছেলেটার বাজে দৃষ্টি তোর দিকে পরতে দেখেই এমন করেছে! হয়তো তুই নিজেও বুঝিস নি? এমন টাই কি!” শান্তা জিজ্ঞেস করলো চমকিত স্বরে।
সোহানা ফট করেই বিজ্ঞের ন্যায় বলে উঠলো,
“এটাই হবে আপু। নির্ঘাত এটাই হবে। সিরিয়ালি? তোরা কি পাগল ভাই? তুই তখন একজনকে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ভস্ম করে দিচ্ছিলি জেলাসিতে। ভাইয়া তো মেরেই হাসপাতালে পাঠিয়ে দিলো। মারাত্মক ভাই! সাচ এ ডেডলি কমবো! ব্রাবো! তালিয়ায়ায়ায়া….”
বাড়ির বড়ো রা না থাকলে সোহানা সত্যি সত্যিই তালি বাজাতো। তিন তালুকদার বসে বসে বিরক্তিকর শ্বাস ফেলছেন মেহরাদের অপেক্ষায়। তাদের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে মেহরাদ বাড়ি ফিরলো আরও আধা ঘন্টা খানেক পর। কপালের মধ্যকার ভ্রু দয় তখনো দ্বিখণ্ডিত।
মেজাজ যে এখনো ভালো হয় নি তা গম্ভীর মুখশ্রী জুড়ে ভাসমান । আলতাফ তালুকদার ছেলেকে দেখেই ব্যাঙ্গাত্নক স্বরে বললো,
“আসেন। বসেন, বাবা। আমার গুনধর ছেলে। কোথা থেকে আবার রাজ্য উধ্যার করে আসলেন? একবার দক্ষযজ্ঞ বাধিয়ে শান্তি হয় নি?”
মেহরাদ মুখ তখনও পাথরের মূর্তির শক্ত কঠিন হয়ে আছে। গম্ভীর মুখশ্রী জুড়ে উপচে পড়া ক্ষোভের লেলিহান শিখা। কথার প্রতুত্তর না করলেও, দাম্ভিক কদমে বাবা চাচাদের বরাবর সোফায় আসন গেড়ে বসলো নির্বিকারে ।
শুভ্রতা আড়ে আড়ে দেখে নিষ্ঠুর, দোর্ভদ্য মানবকে। দৃষ্টিতে দৃষ্টি মিলে যায় অতর্কিতে। বাজপাখির মতো ধারালো দৃষ্টিতে হৃৎপিণ্ডটা ঝংকার তুলে কম্পিত হতে থাকে মেয়েটার। ছোট্ট নাজুক তনু জমে আসে নাশকারী চাউনিতে। সে বেচারি বুঝলো না, তার দোষ কোথায়! করলো টা কি!
এ কঠোর দৃষ্টি কিছুতেই হজম সম্ভবপর নয় তার দ্বারা। কাচুমাচু চেহেরায় মেয়েটা আলগোছে কম্পমান পদুযোগল ফেলে সরে গেলো সেখান থেকে। আড়াল হয়ে দাড়ালো বাজ পাখির দৃষ্টির কবল থেকে। রোজা মেয়েকে নিলো শুভ্রতার কোল থেকে। মেয়েকে ফিডিং করানো প্রয়োজন। সেই কখন খেয়েছে।
হুট করেই শুভ্রতার খালি খালি লাগতে লাগলো নিজেকে। ছোট্ট পরিটার মতো তার-ও যদি একটা…..! আৎকে উঠলো মেয়েটা নিজের চিন্তা ভাবনায়। কি ভাবছিলো সে! এটা হবে এখন? কখনোই ত না! যে সতর্ক ওই লোক! সেদিন সকালে জোর করে দুই পিল গিলিয়েছে। সে জিজ্ঞেস করাতে বলেছে, — পেইন কিলার। সে নাকি কোন রিক্স নিতে চায় না। ব্যাস। ‘
হুহ! মুখ মোচড়াল মেয়েটা মনে মনে। আবার, মন খারাপও হলো একটু মেয়েটার। আবার নিজেকে শাসালো, এরকম একটা সিরিয়াস মোমেন্টে এসব হাবিজাবি কল্পনায় ভাসার মানে কি! আশ্চর্য! ।
“কিছু বলছো না কেন? এরকম উগ্রতার মানে কি? ছেলেটার হাত দুটো একদম নিঃশেষ করে দিয়েছো। কোন মানুষের কাজ এগুলো? কোন ভদ্র ফ্যামিলির ছেলে এসব করে না।” ছেলেকে দু চোখে শাসিয়ে বললেন আলতাফ তালুকদার।
“আমি ভদ্র কে বললো তোমায়? হোয়েন ইটস এভাউট মা’ লাভ এন ওয়াইফ আ’ম দ্যা মোস্ট অভদ্র, উগ্র, ড্যাঞ্জারেস ওয়ান। হাত দুটো কেটে ফেলতে পারলে ভালো হতো। ” নির্লিপ্ত কন্ঠে জানালো মেহরাদ। শীতল কন্ঠের বাক্যদয় পুরো ড্রয়িং রুমে চাপা অস্থিরতা ছড়িয়ে দিলো।
শায়ান তালুকদার অধৈর্য গলায় জানতে চাইলেন,
“হয়েছে টা কি বলবে তো? কেন করলে এসব?”
মূহুর্তেই বিদুৎ স্পৃষ্টের ন্যায় ঝনঝন শব্দে মেতে উঠলো ড্রয়িং রুম। সোফার সাথে লাগোয়া ফুলদানিটা ঝনঝন শব্দ তুলে খন্ডিত হয়ে আছে বলিষ্ঠ হাতের মুষ্ঠাঘাতে। ঘটনার আকস্মিকতায় উপস্থিত প্রান সকল চমকে উঠলো। শিউরে উঠলো ছেলের বেপরোয়া পারদের উত্তাপ দেখে।
জলন্ত স্ফুলিঙ্গের ন্যায় জ্বলসে যাচ্ছে মস্তিষ্কের প্রত্যেকটা স্নায়ুতন্ত্র। নোংরা ওই হাতটা শুভ্রা কে ছুঁতে যাচ্ছিলো, তার ভালোবাসাকে বাজে ভাবে ছুঁতে যাচ্ছিলো। কুলষিত করতে চাচ্ছিলো তার পবিত্র ফুলটাকে, এটা মান্সপ্টে ভেসে উঠেতেই আবারও ধ্বংসযজ্ঞ চালাতে ইচ্ছে করছে মেহরাদের। রক্তলাল দু’চোখের তীর্যক দৃষ্টি ছুড়ে হুংকার ছুড়লো,
“নোংরা হাত বাড়াচ্ছিলো ও আমার ওয়াইফের দিকে। মা’ ওয়াইফ! ক্যান ইউ্য ইমেজিন? আমি বেচে থাকতে কেউ আমার বাড়িতে, আমার ওয়াইফের দিকে বাজে নজর দেয়? ক্যান ইয়্যু? মা’ লাভ, মা’ওয়াইফ, মা’ প্রাইড। ওঁকে ছুতে চাওয়া ওই নোংরা হাত দুটো আস্ত রাখবো আমি? কি মনে হয় তোমাদের? গড সোয়্যার, যদি সফল হতো আজকের দোয়া আনুষ্ঠান জানাযায় পরিনত করতাম। ”
পুরো লিভিং রুম জুড়ে নৈঃশব্দিক নীরবতা। মেহরাদের মুখ থেকে নিঃসৃত একেকটা শব্দ মহাবিশ্বের সকল ভালোবাসার দৃষ্টান্ত যেন। যে তার ভালোবাসার জন্য দুনিয়া গড়তে পারবে আবার তাকে রক্ষার্থে দুনিয়া দু হাতে গুড়িয়ে দিবে।
সকলের অবাক বিস্মিত দৃষ্টির ভীরে একমাত্র শুভ্রতার দু’চোখ অশ্রুসিক্ত। সে জানে এ মানুষটা তাকে উন্মাদের মতো ভালোবাসে। কিন্তু ভালোবাসার দৃষ্টান্ত যে এতটা প্রগাঢ়! মেয়েটার অন্তরাত্না কেপে উঠে সুখময় শীতল স্রোতে। খুশির জোয়ারে আশ্রু’রা ঢেউ তুলছে দু’চোখে।
মনে মনে বার কয়েক ঘোষিত হয়, —আ’ম ইয়্যুর। ইয়্যুর লাভ, ইয়্যুর ওয়াইফ, ইয়্যুর এভ্রিথিং, মাই লাভ।
ঘটিনা বুঝতে পেরে ছেলের অগ্নিমূর্তির পাছে আর কিছু বলার হিন্মত করলেন না আলতাফ তালুকদার। বাড়ির মেয়ে কিংবা সমগ্র নারী জাতির উপরেই পুরুষের লুলোপ দৃষ্টির প্রতি কঠোর নিন্দা তাদের।শায়ান তালুকদারের বুক ফুলে উঠলো ভাতিজা কম মেয়ের জামাইয়ের বেপরোয়া ভালোবাসা দেখে। ছেলের বলিষ্ঠ কাধ চাপড়ে স্থান ত্যাগ করলেন। তেমনি একে একে সকলেই চলে গেলো।
শান্তা, সোহানা দু বোন’ই ব্যাথা মিশ্রিত দু চোখে শুভ্রতা নামক সবচেয়ে অভাগী আবার সবচেয়ে ভাগ্যবতী মেয়েটা কে দেখে গেলো। বোনের কাধে কাধ ঘেঁষে মৃদু ফিসফিসিয়ে আওড়াল,
‘আওয়ার লাকি গার্ল! তোর কিছু না থাকলেও প্রাপ্তির খাতাটা সবিচেয়ে ভার’ই তোর’ই হবে। কারণ তোর মেহরাদ নামক একজন ভালোবাসার মানুষ আছে। আল্লাহর দেওয়া সবচেয়ে বড়ো, ভারী নেয়ামত আমাদের ভাইয়া। তুই খুব লাকি শুভ্রতা। কখনো অভিযোগ করবি না, এই বলে যে,তোর কিছু নেই। যার ভাইয়ার মতো ভালোবাসার মানুষ আছে, তার সব আছে। তুই সম্পূর্ণ পরিপূর্ণ। একদম স্বয়ংসম্পূর্ণ। ”
মেয়ে দুটোর বুক চিড়ে বেরিয়ে আসে ব্যাথা ক্লিষ্ট দীর্ঘনিশ্বাস। মনে মনে আওড়ায়, — আমাদের জীবনটাও এমন হতে পারতো! আমাদের ভালোবাসায় এতো বাধা কেন? নেই কেন কোন গন্তব্য? কেন….’
বাড়ির দু গিন্নি তখন রান্না ঘরের দেয়ালের আড়ালে, সাথে স্বপ্না খালাও আছে। ভদ্রমহিলা মুখ মোচড়াচ্ছেন আড়ে আড়ে, দৃষ্টির অগোচরে। এ এক ছেলের কল্যাণে কিছুদিন যাবৎ তার শুধু ভাঙা জিনিসপত্র পরিষ্কার করতেই দিব কাবার হয়ে যায়। নওয়াব জাদা। হুহ!
এদিকে খাবারের আয়োজনে হাত চালাতে চালাতে শুভ্রতাকে দেখছে কিছুটা এগোতে এগোতে দেখে কিছুটা ভীতসন্ত্রস্ত হলো জাহানারা বেগমেরা। ছেলেটা যে রেগে আছে! চোটপাট না করে আবার! উন্মোখ দৃষ্টি ড্রয়িং রুমে। শান্তা সোহানাও যেতে যেতে এদিকেই দেখছে, যেন বিশেষ কোন নৈঃশর্গিক মূহুর্তের স্বাক্ষী হতে চায় তারা।
শুভ্রতা পলক ঝাপটিয়ে দু’চোখের অশ্রু বাধনহারা করে । বুক ভরে শীতল শ্বাস টেনে ধীর কদমে এগোচ্ছে তার হৃদয়স্পর্শী প্রণয় পুরুষের কাছে। ভাঙা ফুলদানির পা এড়িয়ে পৌছোয় নিজের সম্পূর্ণ অস্তিত্বের মুখোমুখি।
অস্থির ভারী নিশ্বাসের প্রবাহে বেগতিক উঠানামা করছে
মেহরাদের সুগঠিত চওড়া বুক। শুভ্রতার নাজুক তনুশ্রী দৃষ্টিগোচর হতেই ক্রোধ সংবরণে দু চোখ খিচে বুজে ফেললো মানব। মেয়েটার উপর রাগ দেখাতে চায় না সে। কিন্তু ভেতরটা ঝলসে উঠে মেয়েটার শাড়ি পড়ার দৃশ্য টুকু মনে পরলে। কেন পড়েছিলো এতো মানুষের সামনে? কেন? কেন উন্মুক্ত থাকবে পৃষ্টদেশ? কেন?
তার প্রতি মেহরাদের ক্রোধান্বিত দৃষ্টির অন্তর্নিহিত অর্থহ অনুধাবন করেছে শুভ্রতা। বুঝেছে, তখনকার হুশিয়ারি বাক্যের তাৎপর্য। নিজেকে সম্পূর্ণ মেহরাদের সংস্পর্শে এনে, পরম অধিকারবোধে মুখ ডোবায় ঢেউ খেলানো চওড়া বক্ষপটে। সরু দু’হাতে আকড়ে ধরে বলিষ্ঠ পৃষ্ঠদেশ। তীব্র অনুভূতির জোয়ারে মুষ্ঠিবদ্ধ হয়ে আসে সফেদ শার্টখানা। সিক্ত কন্ঠে আদুরে বালিকার ন্যায় আওড়ায়,
“আপনার জন্য ছাড়া আর কখনো শাড়ি পড়বো না, হু! এতো মানুষের সামনে তো ভুলেও না। বেখেয়ালি তো একদম থাকবো না। আপনার ভালোবাসার কাছে নিজেকে খুব তুচ্ছ মনে হয় মাঝেমধ্যে, মেহরাদ ভাই….. এক পৃথিবী সমান আপনায় ভালোবাসলেও আপনি বিশ্ব ভ্রম্যান্ডের ভালোবাসা সপে দেন আমায়। আপনার সাথে পাল্লা দিয়ে একদম পেড়ে উঠি না আমি। এতো ভালোবাসা…….উমমম, ভালোবাসি ভালোবাসি….. ”
ফিসফিসে সরল স্বীকারোক্তির ফাকে ফাকে দু ঠোঁট ছুয়ে যায় উত্তাল বক্ষমাজে। জগৎ কাল ভুলে আদুরে স্পর্শে মাখিয়ে দেয় স্বামীর বক্ষতল।
পাচ জোড়া দৃষ্টি তৎক্ষনাৎ সরে যায় প্রেমিক যুগোলের মধ্য হতে। স্বস্থির নিশ্বাস ফেলে আওড়ায়, ‘তালুকদার বাড়ির বড়ো ছেলের সকল উন্মাদনার মহৌষধ শুভ্রতা তালুকদার। এইটকুনি মেয়ের কাছে এর স্বস্তি। আগুন হলে পানি হয়ে যায়, বরফ হলে গলে যায়। সব ওর সান্যিধ্যেই সম্ভব। ‘
মেহরাদের দু’হাতের মুঠো শক্ত হয়ে আসে। রুক্ষ চোয়ালের কঠোরতা কমে ধীরে ধীরে মসৃনতা সঞ্চালিত হচ্ছে। উত্তেজনার পারদটা নেমে গিয়ে ভেতরটা গভীর শীতলতায় জুড়িয়ে আসছে একটু একটু।
অস্তিত্বে মিশে থাকা শুভ্রতার দু’হাতের বাধনে আরও দৃঢ়তা আসতেই তপ্তশ্বাস ফেলে ব্যাগ্র হাতের মৃদু ধাক্কায় নাজুক প্রেয়সীকে আরেকটু মিশিয়ে নেয় নিজের অস্তিত্বে। একদম পিষে ফেলে বক্ষমাজে। যেন দেহে প্রানে পরম শান্তি বর্ষিত হচ্ছে। প্রশান্তিময় স্বরে স্বগতোক্তি আওড়ায়,
“এই সরলতা দিয়েই ঘায়েল করে রেখেছিস। এই যে আদুরে ছানার মতো আমার সঙ্গ চাষ? তখন তোকে মহাবিশ্বের সবটুকু ভালোবাসায় মুড়িয়ে রাখতে মন চায়। সবটুকু সুখ পা’য়ে ঢেলে দিতে মন চায়। এভাবেই তো সেই প্রথম থেকে দিল খুয়িয়েছি। আমায় একটু স্বস্থি দিবি তো?”
তৎক্ষনাৎ মাথা উচিয়ে স্বামীর দু চোখে সরল দৃষ্টিপাত করে শুভ্রতা দু’চোখের ভারী পল্লব ঝাপটিয়ে । দু ঠোঁট নাড়িয়ে মৃদুস্বরে ফিসফিসিয়ে বলে,
হৃৎস্পন্দন পর্ব ৫৬ (২)
” দেই না বলছেন? ” শুভ্রতার মিটেমিটে রসাত্নক কণ্ঠ। দু’ ঠোটের গতি এত কম! মেহরাদ তবুও বুঝেছে ওর কথা। প্রেয়সীর ভাসা দু’চোখের ইশারা। অবিলম্বে অধর কোন বেকে আসে মেহরাদের। এতক্ষণের রণমুর্তি যে প্রসন্ন, শান্তরূপে ফিরে এসেছে তা দেখে স্বস্থি পায় শুভ্রতা। ভেতরে ভেতরে স্বস্থির ভারী নিশ্বাস ত্যাগ করে মেয়েটা।
