ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ৩৫
রিক্তা ইসলাম মায়া
মারিদ একা গাড়ি ড্রাইভ করে এসেছে। তার গায়ে কালো টি-শার্ট, ট্রাউজার পরা। রাস্তার একপাশে গাড়ি পার্কিং করে নামল। বাকিটা পথ পায়ে হেঁটে যাবে রাদিল ও রিফাতের লোকেশনে। গাড়ির ড্যাশবোর্ড থেকে ফোন, চাবি নিয়ে গাড়ি লক করে পেছনে ঘুরতেই মুখ থুবড়ে পড়ল গাড়ির উপর রিফাতের হঠাৎ আক্রমণে। মারিদ রিফাতকে থামানোর সুযোগ পেল না রিফাতের অনবরত কিল ঘুসির কারণে। বিগত কয়েক দিনের রাগ-ক্ষোভে রিফাত কিল-ঘুসি সবটা দিয়ে মারিদকে প্রহার করে। মুখে অকথ্য গালিগালাজ…
‘শালা মাদারবোর্ড! তোর কারণে আমার সিঙ্গেল জীবনটা শেষ। তোর জন্য আমি মানুষকে মুখ দেখাতে পারি না। শালা লুচ্চা একটা! একজনের সঙ্গে প্রেম করে আরেকজনকে বিয়ে করিস। আমারে বলিস আমি নাকি কোটি কোটি প্রেম করি। আর তুই শালা কী করিস? একসঙ্গে দুই জায়গায় লুচ্চামি করে নিজে ফেঁসে আমারেও ফাসাইলি।
রিফাতের ধুমধাম কিল-ঘুসি থেকে বাঁচতে মারিদ দুহাতে ধাক্কা মেরে রিফাতকে নিজের থেকে সরিয়ে দেয়। গায়ের বটে যাওয়া টি-শার্ট টেনে ঠিক করে। ক্ষিপ্ত মেজাজে চেতে উঠে বলে…
‘বা’ল, কী সমস্যা তোর? কথা নাই বার্তা নাই সোজা গায়ে হাত তুলছিস? বাপের সম্পত্তি পেয়েছিস আমাকে যে মনমতো ধোলাই দিবি? আর একবার গায়ে হাত লাগালে এই হাত ভেঙে তোর পাছায় ঢুকাব হারামির বাচ্চা।
রাদিল রিফাতকে টেনে ধরে রেখেছে। রাদিল বারবার রিফাতকে থামতে বলছে কিন্তু সে থামছে না। রিফাত মারিদের কথায় সুর মিলিয়ে গালি দিয়ে বলে…
‘হ তুই আমার বা’লটা করবি, আর আমি চাইয়া চাইয়া তোর রূপ দেখমু।
রাদিল মাঝে বাধা দিয়ে বিরক্ত সুরে বলে…
‘কিরে ভাই, কী শুরু করলি তোরা? থামবি এবার? কি হয়েছে এই বিষয়ে শান্তি মতোও কথা বলা যায়।
রিফাত রেগেমেগে বলে…
‘যা শুরু করার এই লুচ্চা শালা শুরু করছে আগে। এই শালার জন্য তনিমারে আমার বিয়ে করা লাগছে। শালা বেয়াদব, হারামি মাদারবোর্ড!
মারিদ তনিমা নামটার সাথে পরিচিত না। আর না জানে রিফাত কাকে বিয়ে করেছে কিংবা রিফাতের বউয়ের নাম কী। মারিদ জানে রিফাত নিজের ছাত্রীকে বিয়ে করেছে হোটেলে ধরা পড়ে। এরপর মারিদ রিফাতের ব্যাপারে খোঁজ নেয়নি। সে নিজেও ঝামেলার বিয়ে করে সারাক্ষণ মাথায় অপরিচিতার কথা ঘুরপাক খায়। সেখানে রিফাত কাকে বিয়ে করল সেই খোঁজ নেওয়ার সময় তার নেই। তাছাড়া রিফাতকে যে মারিদ কাজটা দিয়েছিল সেই কাজই রিফাত এখনো করেনি, তাহলে মারিদের কী দরকার ভাইয়ের বউয়ের সম্পর্কে জানার? মারিদ বিরক্ত সুরে বলে…
‘তনিমা আবার কে?
মারিদের দায়সারা জবাবে রিফাতের গরম মেজাজে যেন ঘি পড়ে। রিফাত চেতে উঠে রাদিলকে হৈ হৈ করে বলে…
‘রাদিল দেখলি? তুই দেখলি? বেঈমান, মুনাফিকের বাচ্চা কেমনে মুহূর্তের মাঝে পল্টি নিল! মারিদ বলে তনিমাকে চিনে না। আল্লাহ গো তুমি কই? এক্ষুনি একটা দড়ি ফালাও, আমি এই বেঈমানটারে বাইন্ধা দিয়া দেই, তুমি তারে এক্ষুনি নিয়ে যাও আল্লাহ।
রিফাত ভীষণ রেগে আছে। কিন্তু অতি রাগের মাঝেও রিফাতের কথার ধরনের কারণে মানুষের হাসি পেয়ে যায়। রাদিলের ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। রিফাতের কথায় রাদিল হেসে ফেলে রিফাতকে ছেড়ে দেয়। মারিদ বিরক্ত হয়ে বলে…
‘বালের নাটক কম কর। কাহিনি কী হইছে তাই বল। এমনি মেজাজ খারাপ হয়ে আছে, বাড়াবাড়ি করলে মাথা ফাটিয়ে হাসপাতালে পাঠাব কিন্তু।
রিফাত কিছু বলবে, এর মাঝে রাদিল বাধা দিয়ে বলে…
‘তুই থাম রিফাত। আমি কথা বলছি মারিদের সাথে।
মারিদ কপাল কুঁচকে তাকায়। রিফাত রাগে ফুসফুস করছে। রাদিল রিফাতের হয়ে বলতে লাগল…
‘সেদিন রাতে তুই যে মেয়েটার কন্টাক্ট নাম্বার দিয়ে রিফাতকে বলেছিলি দেখা করতে, সেই চিঠির মেয়েটার সাথেই রিফাতের বিয়ে হয়েছে।
মারিদের কুঁচকানো কপাল আরও কুঁচকে যায় রাদিলের কথা শুনে। অবাক চোখে তাকিয়ে শুধালো…
‘আমাকে ফোনে অপরিচিতা পরিচয় দেওয়া মেয়েটা সঙ্গে রিফাতের বিয়ে হয়েছিল?
‘হ্যাঁ।
‘তোকে বলেছিলাম মেয়েটার খোঁজ নিতে। বিয়ে করতে গেলি কেন?
রিফাত রাগেফুসফুস করে উঠে বলে…
‘ তোর জন্য আমাকে বিয়ে করতে হয়েছে। তুই দায়ী এসবের জন্য।
মারিদ বিরক্ত হয়ে বলে…
‘ আমি তোকে বলেছিলাম বিয়ে করতে?
‘তুই আমাকে না পাঠালে আজ আমার জীবন ধ্বংস হতো না।
মারিদ রিফাতকে খোঁচা মেরে বলে…
‘এমনভাবে বলছিস যেন তোর ইজ্জত লুটে নিয়েছে মেয়েটা।
রিফাত কিছু বলবে, রাদিল ফের বাধা দিয়ে বলে…
‘রিফাত থাম। মারিদ, তুই কেন রিফাতকে বারবার রাগাচ্ছিস? ও এমনিতেই বিয়ের ব্যাপারটা নিয়ে টেনশনে আছে। সলিউশন দে টেনশন না দিয়ে।
মারিদ হাতের চাবিটা পকেটে গুঁজে বলে…
‘কাহিনি কী আগে খুলে বল শুনি।
রাদিল শুরু থেকে শেষ সবটা মারিদকে খুলে বলে কীভাবে রিফাতের বিয়ে হয়েছে। সবটা শুনে মারিদ বেশ বিরক্ত চোখে রিফাতের দিকে তাকিয়ে বলে…
‘একটা মেয়ে তোকে হোটেলে যেতে বলেছে আর তুই কথা নেই বার্তা নেই চলে গেলি? মানে তোর কমনসেন্স নেই? একটা পাগলও তো বুঝবে এত রাতে ঐসব হোটেলে কোন ধরনের মেয়েরা যায়।
মারিদের কথায় রিফাত মনের অজান্তে তনিমার হয়ে সাফাই দিয়ে বলে…
‘মেয়েটা ভালো ভদ্র। ওহ ঐসব খারাপ মেয়েদের মতো না।
‘ভালো হলে সংসার কর তাহলে।
রিফাত থমথমে খেয়ে যায়। তনিমাকে সে দুই বছর ধরে নিজের ছাত্রী হিসেবে চিনে। মেয়েটা পড়াশোনায় ও চরিত্রে দুটো দিকেই ভালো দেখেছে। কারও সাথে খারাপ ব্যবহারও করতে দেখা যায়নি কখনো। প্রেম-সম্পর্কেও তেমন দেখা যায়নি। এবার মারিদের সঙ্গে তনিমার কীভাবে চিঠিতে প্রেম হলো সেটাই রিফাত বোঝে না। তনিমা মারিদকে পছন্দ করে না, এটা তনিমার মুখে কালও শুনেছে রিফাত। মারিদ একবার তনিমা ও তার ভাইকে রাস্তায় পিটিয়েছিল, সেই থেকে তনিমা মারিদকে পছন্দ করে না। রিফাতের কথা হচ্ছে—তনিমা মারিদকে পছন্দ না করলে দুজন প্রেম করল কীভাবে? আবার রাদিল বলল মারিদ থানচিতে অপরিচিতাকে বিয়ে করেছে। রিফাত রাগ করে ছিল বলে সে এখনো জানতে পারেনি মারিদ আসলে কাকে বিয়ে করেছে। মারিদের অপরিচিতা কে? রিফাত এতটুকু জানে মারিদের সঙ্গে তনিমার কোনো একটা কানেকশন অবশ্যই ছিল যার জন্য তনিমা রিফাতকে মারিদ ভেবে নিয়েছে এখন। কলেজে গেলে রিফাতের সঙ্গে কথা বলতে বেশ আগ্রহ দেখায় তনিমা। কিন্তু রিফাত পাত্তা দেয় না। দিবে কীভাবে, রিফাত সে না যাকে তনিমা ভাবছে। রিফাত রেগে উত্তর করে বলে…
‘আমি সংসার করব না। তুই তোর গার্লফ্রেন্ড নিয়ে যা।
‘ঐটা আমার গার্লফ্রেন্ড না তোর বউ হয়।
‘আমি এই বিয়ে মানি না।
‘না মানলে ঐটা তোর সমস্যা, আমার না।
রিফাত ফের রাগে তিলমিলিয়ে উঠে বলে…
‘হারামি, বেঈমান, মুনাফিক! তুই না বললি ফোনের মেয়েটা তোর অপরিচিতা হয়, তাহলে তুই—
রিফাতকে কথা শেষ করতে না দিয়ে মারিদ বেশ গম্ভীর গলায় বলে…
‘আমার অপরিচিতার সঙ্গেই বিয়ে হয়েছে। তুই যাকে বিয়ে করেছিস সে আমার অপরিচিতা না অন্য কেউ হবে।
‘তাহলে কে সে?
‘আমি কী জানি তুই কাকে বিয়ে করেছিস? তোর জানার কথা তোর বউ কে?
মারিদের দায়সারা জবাবে রিফাত মাথায় হাত দিয়ে বলে…
‘তনিমা যদি অপরিচিতা না হয়, তাহলে অপরিচিতা কে? তুই কাকে বিয়ে করেছিস মারিদ?
মারিদ ও রাদিল দুজনই একত্রে জবাব দিয়ে বলে…
‘নূরজাহানকে।
নূরজাহান নামটা শুনে রিফাত হৈ হৈ করে উঠে বলে…
‘কীহ? লা-হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ! মারিদ, তুই আমার নূরজাহানরে বিয়ে করেছিস!
মারিদ ঠাস করে রিফাতের মুখ বরাবর একটা ঘুসি মেরে বলে…
‘হারামি, নূরজাহান আমার বউ!
রিফাত বামে ঝুঁকে যায়। গালের মাড়ি ঘষে জবাব দেয়…
‘নূরজাহানকে আমি তোর আগে পছন্দ করছিলাম।
মারিদ রেগে যায়। নূরজাহানকে নিয়ে কেউ কিছু বললে মারিদ অটোমেটিক রেগে যায়। মারিদকে রেগে যেতে দেখে রিফাত শান্তি পেল। এবার মারিদকে সহজে রাগানোর পথ খুঁজে পেল সে। এর মাঝে রাদিল খানিকটা চিন্তিত গলায় মারিদকে প্রশ্ন করে…
‘ মারিদ, তাহলে সেদিনের ফোনের মেয়েটা কে ছিল যাকে রিফাত বিয়ে করল? মেয়েটা তোর আর অপরিচিতার চিঠির সম্পর্কে এতো কথা কিভাবে জানল? সে কিন্তু নিজেকে অপরিচিতা বলে দাবিও করেছিল। তাহলে কি তুই ফোনে একজনের সঙ্গে আর চিঠিতে আরেক জনের সঙ্গে কথা বলতি মারিদ?
রাদিল ব্যাপারটা ঠিক ধরেছে। কিন্তু মারিদ বিশ্বাস করতে চাই না। রাদিলের কথায় মারিদ বেশ সিরিয়াস আর গম্ভীর হয়ে ভাবে এমনটা হওয়া সম্ভব না। যে মারিদ ফোনে একজনের সঙ্গে আর চিঠিতে অন্যজনের সঙ্গে কথা বলবে। অপরিচিতা নিজে বলেছিল সে মারিদকে চিঠি পাঠাবে, তার মানে মারিদের কাছে অপরিচিতার চিঠিই আসত অন্য কারোটা না। হতে পারে রিফাতের সঙ্গে বিয়ে হওয়া মেয়েটা মিথ্যা বলেছে। মারিদ খানিক ভেবে জবাব দেয়…
‘এই বিষয়টা আমিও বুঝতে পারছি না রাদিল। মেয়েটা কীভাবে আমার আর অপরিচিতার চিঠির সম্পর্কের কথা জানে? এমনও তো হতে পারে সে অপরিচিতার কোনো ফ্রেন্ড ছিল, সে আমার আর অপরিচিতার চিঠি আদান-প্রদান করার বিষয়টা দেখেছে কিংবা শুনেছে। সেই থেকে এখন নিজেকে অপরিচিতা বলে দাবি করছে? হু নোস? রিফাত, তুই মেয়েটার সঙ্গে একবার এই বিষয়ে কথা বলিস তো।
রিফাত বিরক্তিতে বলে…
‘আমাকে তো কেউ কথা বলার সুযোগই দিচ্ছে না! এর আগেই সবাই ছেলের বউ ঘরে তোলার আয়োজন শুরু করে দিয়েছে। এই দুঃখেই বাড়িতে ফিরি না। বা’ল, এত কাহিনি সহ্য করা যায় না।
রাদিল রিফাতের কাঁধ চেপে সান্ত্বনা দিয়ে বলে…
‘এখন এত চাপ নিস না ভাই। আপাতত কয়েকটা দিন যাক, তারপর আমরা সবাই বাসায় কথা বলে তোর বিয়ের বিষয়টা সর্টআউট করব। বিয়ে একটা সারাজীবনের ব্যাপার, তোর মত না থাকলে তোকে কেউ ফোর্স করবে না এজন্য। রিলাক্স থাক। তবে আমার মনে হয় তোর একবার তনিমা মেয়েটার সঙ্গে কথা বলা উচিত। তোরা দুজন নিজেদের মাঝে কথা বলে নিলে বিষয়টা আরও সহজ হতো।
রাদিলের কথার সম্মতি দিয়ে রিফাত বলে…
‘আচ্ছা দেখি কাল মেয়েটার সঙ্গে কথা বলা যায় কিনা।
রাদিল চা অফার দিয়ে বলে…
‘আচ্ছা চল সবাই চা খাই।
‘ তাহলে সব বিল মারিদ দিবে।
রাদিল সম্মতি দিয়ে বলে…
‘তাহলে চায়ের সাথে আমাদের আরও কিছু খাওয়া উচিত। কি বলিস?
রিফাত বলে…
‘পোড়া মুরগি আর নান রুটি?
‘ডান। চল।
এতক্ষণ মারিদের সঙ্গে মারপিট করে রিফাত এখন মারিদের কাঁধ জড়িয়ে ধরে এমন ভাব করল যেন কিছুই হয়নি। মারিদ বিরক্তিতে রিফাতের হাতটা কাঁধ থেকে সরিয়ে দেয়। বলে…
‘ ছাড়, গরম লাগে।
মারিদকে ছাড়ার বদলে আরও ঝাপটে ধরে রিফাত ও রাদিল। মারিদকে মধ্যস্থতায় রেখে দুপাশ হতে দুজন কাঁধ জড়িয়ে গলাগলি করে হাঁটছে। রিফাত আফসোস সুরে বলে…
‘ইশ! আমার কত পছন্দ ছিল নূরজাহানকে। একটু জন্য আমার বউ হতে গিয়ে ভাইয়ের বউ হয়ে গেল। এই আফসোস আমার সারাজীবনেও শেষ হবে না।
মারিদ ফের রেগে যায়। রিফাতের পেটে কনুই মেরে বলে…
‘হারামি বাচ্চা, তোরে জানে মেরে ফেলব আমি।
রিফাত হাসে। রাদিলও হাসে। মাঝে বারবার রেগে যাচ্ছে মারিদ।
সকাল ১১:২৩। রিফাত তনিমাদের বায়োকেমিস্ট্রি ক্লাস করাচ্ছে। শিক্ষক হিসেবে রিফাত বেশ সহনশীল আর দক্ষতার সাথে স্টুডেন্টদের টিচিং দেয়। পুরো ক্লাস নীরব। ক্লাসে তনিমাও উপস্থিত। এই নিয়ে বেশ কয়েকবার তনিমা রিফাতের দিকে ঘুরে তাকিয়েছে। এর মধ্যে রিফাত একবারও তাকায়নি। বিয়ের পর থেকে আজ পর্যন্ত রিফাত চোখের দেখাও দেখতে চায়নি, কথা বলা তো দূর। তনিমা অবশ্য বেশ কয়েকবার চেষ্টা করেছিল রিফাতের সঙ্গে কথা বলার, কিন্তু রিফাতের অতি ইগনোরের জন্য তনিমা আর চেষ্টা করেনি। রিফাত যখন তনিমাকে অস্বীকার করছে, তখন তনিমা আত্মসম্মান মাড়িয়ে রিফাতের কাছে যাবে না। বেহায়া মন তারপরও বারবার রিফাতকে দেখে যখন রিফাত কলেজে আসে। আগে ছিল প্রেমিক পুরুষ আর এখন হয়েছে স্বামী; রিফাতকে ঘিরে মনে অদ্ভুত ভালো লাগা কাজ করে তনিমার। তনিমা নিজেকে দমিয়ে ক্লাসে মনোযোগ দেয়। রিফাত হোয়াইটবোর্ডে কালো কালিতে বায়োকেমিস্ট্রির ল্যাবরেটরি টেস্টের মান নির্ণয়ের বেশ কিছু সূত্র লিখে বোঝায়। তারপর আবার সেগুলো মুছে ছাত্র-ছাত্রীদের বলে নিজ থেকে করে রিফাতকে দেখাতে। ছাত্র-ছাত্রীদের সবাই খাতায় মনোযোগ সহকারে লিখছে। রিফাত বোর্ড ছেড়ে স্টুডেন্টের সারিতে হাঁটে। তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে ছাত্র-ছাত্রীদের পর্যবেক্ষণ করছে সবাই ঠিকঠাক লিখছে কিনা।
হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ রিফাত এসে তনিমার টেবিলের পাশে দাঁড়ায়। তনিমা মাথা নুইয়ে লিখছে। মাহি তনিমার পাশের সিটে বসা। রিফাত ভেবেছিল তনিমাকে বলবে যাওয়ার সময় তার সঙ্গে দেখা করে যেতে। কিন্তু তনিমা খাতায় ভুল সূত্র লেখায়, রিফাত তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তনিমার খাতার দিকে তাকিয়ে থেকে হঠাৎই তনিমাকে হাতের কালো মার্কার দিয়ে বাড়ি মেরে রিফাত বলে…
‘এটা কী লিখছেন আপনি? ভুল যে লেখছেন দেখছেন না?
তনিমা মাথা তুলে রিফাতের দিকে তাকায়। বাম হাতে রিফাতের ভারি দেওয়া স্থানটা ঘষছে। বেশ জোরে তনিমাকে ভারিটা দিয়েছে রিফাত। তনিমাকে অস্বস্তিতে ফেলে রিফাত তৎক্ষণাৎ তনিমার হাতের কলমটা টেনে খাতার উপর ঝুঁকে পড়ে বলে…
‘আমি এখন সূত্রটা বোঝাতে বোঝাতে আপনি সূত্রটা ভুলে গেছেন? এই মনোযোগ নিয়ে আপনি ডাক্তারি পড়বেন কীভাবে? খাতার দিকে তাকান, আমি আবার বুঝিয়ে দিচ্ছি আপনাকে।
রিফাত এসেছিল কথা বলতে, অথচ স্যার হয়ে সূত্র বোঝাতে লাগল। রিফাতের গায়ের কর্ড়া পারফিউমের গন্ধে তনিমাকে ব্যাকুল করে তুলছে। মন ছটফট করছে হাত-পা ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে। অথচ রিফাত তনিমার খাতায় সূত্র বোঝাচ্ছে, তনিমার চঞ্চল দৃষ্টি বারবার রিফাতের গাল বেয়ে গলা, কান, চুল এসবে ঘুরে যাচ্ছে। অস্বস্তিতে তনিমার হাত-পা ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে। অন্য সময় হলে তনিমা এত অস্বস্তি বোধ করত না যদি না রিফাত ওর স্বামী হতো। রিফাত একা একা বকবক করে তনিমাকে সূত্র বুঝিয়ে লেখা শেষ করে, ঝুঁকে থাকা অবস্থাতেই তনিমার দিকে তাকিয়ে বলে…
‘ আপনি বুঝেছেন আমি কীভাবে করেছি?
মাত্র চার আঙুলের দূরত্বে রিফাত থেকে তনিমার মুখের অবস্থান। ভুলবশত হলেও দুজনের নিশ্বাস একে অপরের মুখে ভারী হয়ে আছড়ে পড়ছে। তনিমা আটকে আটকে নিশ্বাস ফেলছে। রিফাত এতক্ষণ লক্ষ না করলেও এখন বুঝতে পারছে সে ভুল করেছে। মেয়েটি তার ছাত্রী হলেও এখন তার বউ হয়। রিফাতের হয়তো ঠিক হয়নি এভাবে চোখে চোখ পড়া। রিফাত কয়েক সেকেন্ডের জন্য জমে গিয়ে তনিমার চোখে চোখ রাখল। মেয়েটা সুন্দর। সুন্দর গোল মুখ, দুধে-আলতা গায়ের রং, ঠোঁটের নিচে কালো তিল। কালো চুলে কালার করে রেখেছে। গলায় আইডি কার্ডের সঙ্গে স্কার্ফ বাঁধা। গলার বাম পাশে ছোট একটা তিল আছে। সবমিলিয়ে মেয়েটা সুন্দর। রিফাতের চোখে সুন্দর লাগছে। আজকের আগে কখনো মেয়েটাকে এভাবে দেখা হয়নি। আজই প্রথম। মেয়েটাকে কি আজ বেশি সুন্দর লাগছে? নাকি মেয়েটা সবসময়ই সুন্দর ছিল শুধু রিফাত চোখে আজ ধরা পড়েছে কোনটা?
ব্যাপারটা কী হচ্ছে বুঝতে পেরে রিফাত কলম রেখে চট করে উঠে দাঁড়াল। তনিমাকে পিঠ দিয়ে সামনে ঘুরে যেতেই চোখ-মুখ খিঁচিয়ে বিড়বিড় করে আওড়ায়…
‘ শিট! ইউ আর স্টুপিড, রিফাত
আশেপাশের স্টুডেন্টরা রিফাত তনিমাকে খাতায় লিখে সূত্র বোঝানোর ব্যাপারটা স্বাভাবিকভাবেই নিয়েছে। কারণ স্যাররা স্টুডেন্টদের পড়া বোঝানোর সুবিধার্থে স্টুডেন্টদের খাতায় লিখে বোঝাতেই পারেন, অস্বাভাবিক কিছু না। ব্যাপারটা তনিমার ফ্রেন্ড মাহিও স্বাভাবিকভাবে নিয়েছে। সে তনিমার খাতা টেনে নিয়েছে সূত্রটা দেখে নিজের খাতায় তুলতে। তনিমা তখনো পাথরের ন্যায় বসে রইল। রিফাত বড় বড় পায়ে নিজের ডেস্কে যায়। একবারের জন্যও আর তনিমার দিকে তাকায়নি। নিজের খাতা-কলম নিয়ে সোজা বেরিয়ে যায়। স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, দুজনেই তখনকার ব্যাপারটা নিয়ে অস্বস্তিতে পড়ে গেছে।
আজ সুখের শেষ পরীক্ষা ছিল—এসএসসির। আজ বুধবার। বাড়ির সবাই শপিংয়ে গেছে রিফাত আর মারিদের বউয়ের জন্য কেনাকাটা করতে। সুখের পরীক্ষা ছিল বলে সে যেতে পারেনি। সালমা সৈয়দ বলেছেন, পরীক্ষা শেষ করে কেন্দ্র থেকে ড্রাইভারকে নিয়ে বসুন্ধরা চলে যেতে। কাল রিফাতের বউকে দেখতে যাবে আর পরশুদিন মারিদের বউকে। অবশ্য মারিদের শ্বশুরবাড়িতে দুদিন থাকার প্ল্যানিং করেছে সবাই, সেজন্য আজ বিগত দুই-তিন দিন ধরেই সৈয়দ বাড়ির মেয়েরা শপিং করছে। আজ সবার শপিংয়ের শেষ দিন। আজ সুখের জন্যও কেনাকাটা করবে, সেজন্য সুখকে সেখানে উপস্থিত থাকতে বলেছেন সালমা সৈয়দ। সুখ পরীক্ষার হল থেকে বেরিয়ে নিজেদের গাড়ির সন্ধান করে। কিন্তু গাড়ি আর ড্রাইভার কাউকে না দেখে একপাশে দাঁড়ায়। ড্রাইভার সকালে সুখকে নিয়ে আসলে আর কোথাও যায় না, একেবারে সুখ পরীক্ষা দিয়ে বের হলে তখন নিয়ে যায়। আবার প্রতিদিন ড্রাইভারের সঙ্গে মাহবুব, রিফাত, মকবুল কেউ না কেউ থাকে সুখকে নিতে, অথচ আজ কেউ নেই। সুখ ভাবে—হয়তো ড্রাইভার কাকা ওদের বাড়ির সবাইকে শপিংমলে নিয়ে গেছে, সেজন্য আজ সুখের জন্য অপেক্ষা করতে পারেনি। হয়তো ওদের সবাইকে নামিয়ে দিয়ে আসবে সুখকে নিতে। সুখ গাড়ীর জন্য অপেক্ষা করার সিদ্ধান্ত নিল।
পরীক্ষা হলের বাইরে ছাত্র-ছাত্রী আর গার্জিয়ানদের ভিড় জমে। কেউ রিকশা, সিএনজি কিংবা নিজেদের গাড়িতে উঠে চলে যাচ্ছে। সুখকে একা দেখে একজন ছাত্র এগিয়ে আসে। সুখের সহপাঠী; ছেলেটির নাম তিতাস। সে বলে…
‘তুমি পাস করে কোন কলেজে ভর্তি হবে সুখ?
সুখ ঘুরে তিতাসকে দেখে জবাব দেয়…
‘আমি জানি না। আমার বড় ভাই যেখানে বলবে সেখানে ভর্তি হব।
‘তোমার বড় ভাই কী পড়াশোনা করে?
‘না, আমার ভাইয়ার গ্র্যাজুয়েশন শেষ। উনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিল, এখন বিজনেস করে।
‘এখানে কী করছিস তুই?
সুখ ও তিতাস দুজনই ঘুরে তাকাল রাদিলের কণ্ঠে। রাদিল সাদা ব্যাগি প্যান্টের সঙ্গে কালো শার্ট পরে দাঁড়িয়ে, একদম ফর্মাল গেটআপে। শার্টের হাতা দুটো কনুই অবধি গোটানো। রোদের জন্য মাথায় সাদা ক্যাপ পরে। রাদিলকে দেখে সুখ অবাক হয়। রাদিল কখনো সুখকে পরীক্ষা কেন্দ্রে দিতে কিংবা নিতে আসেনি, আজ প্রথম এসেছে। তিতাস রাদিলকে দেখে সুখকে বলে…
‘উনি কে, তোমার বড় ভাই?
সুখ তিতাসের কথায় শুধু মাথা নাড়িয়ে সম্মতি দেয়, মুখে কিছু বলে না। রাদিল কপাল কুঁচকায়। তিতাস নিজের পরিচয় দিয়ে বলে…
‘আসসালামু আলাইকুম ভাইয়া। আমি তিতাস, সুখের ক্লাসমেট।
রাদিল কথা বাড়াতে চায় না বলে সালামের উত্তর দিয়ে তিতাসকে বলে…
‘সবাই চলে যাচ্ছে, তুমি যাবে না?
‘জি যাব ভাইয়া। আসলে আম্মুর জন্য অপেক্ষা করছিলাম। উনি এখনো পরীক্ষার হল থেকে বের হননি।
‘তোমার আম্মু পরীক্ষা হলে কীভাবে প্রবেশ করল?
গার্ডিয়ানের তো পারমিশন নেই হলে প্রবেশ করার।
তিতাস জবাবে বলে…
‘আমার আম্মু একজন টিচার। আমাদের স্কুলের গণিত সাবজেক্ট পড়ান তিনি। সেই সুবাধে উনার ডিউটি আমাদের কেন্দ্রে পড়েছে। তাই আমি আম্মুর জন্য অপেক্ষা করছিলাম।
রাদিল চট করে সুখের দিকে তাকায়। সুখ এতদিন রাদিলকে ‘আমাদের স্কুলের হ্যান্ডসাম গণিত টিচার, হ্যান্ডসাম গণিত টিচার’ বলে বলে মাথা খেয়েছে, অথচ আজ শুনতে পেল সুখের হ্যান্ডসাম গণিত টিচার নাকি একজন নারী! মেয়েটা কী পরিমাণ মিথ্যুক! রিফাত এজন্যই সুখকে ‘ভন্ড সুখ’ ডাকে। আসলেই সুখ ভন্ড। কোথায় কার সাথে ভণ্ডামি করে বোঝা মুশকিল। এই মেয়ে মিথ্যা কথাও সিরিয়াস মুডে বলে। অথচ এখন রাদিলের কাছে ধরা পড়েও স্বাভাবিক ভাব দেখাচ্ছে, মনে হচ্ছে কিছুই হয়নি। সুখ জীবনে কখনো রাদিলকেও একটা মিথ্যাও বলেনি? সুখের কনফিডেন্স দেখে রাদিল অবাক হতে হয়। তিতাস থেকে বিদায় নিয়ে সুখ রাদিলের গাড়িতে উঠে বসে। রাদিল ড্রাইভিং সিটে উঠে বসতেই সুখ অর্ডার দিয়ে বলে…
‘রাদিল ভাই, এসি চালাও তো। আমার গরম লাগছে।
রাদিল এসি চালু না করে সুখের মুখের দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে…
‘আমার সাথেই তুই সবসময় এমন অদ্ভুত আচরণগুলো কেন করিস সুখ? আর কারও সাথে করিস না কেন?
সুখ ঝুঁকে নিজেই এসি চালু করে রাদিলকে জবাব দিয়ে বলে…
‘তুমি কালো বলে তাই এমন করি।
‘আমি কালো হলে তোর কী সমস্যা?
‘আমার কালো মানুষ পছন্দ না।
রাদিল গাড়ি চালু করে। গাড়ির স্টিয়ারিং ঘুরাতে ঘুরাতে তাচ্ছিল্যের স্বরে বলে…
‘এমনভাবে বলছিস যেন আমি তোকে বিয়ে করার জন্য পাগল হয়ে বসে আছি আর তুই রিজেক্ট করছিস!
‘আমি তোমাকে কক্ষনও বিয়ে করব না।
‘আমি তোকে বিয়ে করার আশাতেও নাই। আই হ্যাভ এ গার্লফ্রেন্ড। আমার পাঁচ বছরের একটা রিলেশনশিপ আছে। খুব শীঘ্রই আমরা বিয়ে করব। তাই তোর পছন্দ-অপছন্দে আমার কিছু যায় আসে না।
রাদিলের শেষ কথাগুলোয় সুখের ছোট মন কয়েক হাজার টুকরোয় খণ্ডিত হলো। রাদিলের কারও সাথে রিলেশন থাকতে পারে, সেটা সুখের ধারণাতেই ছিল না। সুখ অকারণে রাদিলকে পছন্দ করে ফেলে। কৈশোরী মনে প্রথম ভালো লাগা বা পছন্দের ব্যাপারটা শুরুই হয়েছিল রাদিলকে দিয়ে। সুখ কখনো এটা ভাবেনি রাদিলের নিজস্ব পছন্দ থাকতে পারে। হঠাৎ সুখের বুক ফেটে কান্না আসছে। হাউমাউ করে চিৎকার করতে মন চাচ্ছে। বলতে ইচ্ছা করছে—’আমিও তো তোমাকে পছন্দ করি রাদিল ভাই, তাহলে আমার পছন্দের কী হবে?
রাদিলের কথায় সুখ নিস্তব্ধ হয়ে ঘোলাটে চোখে বেশ কিছুক্ষণ পলকহীনভাবে রাদিলের দিকে তাকিয়ে থাকে। রাদিল ড্রাইভ করতে করতে সুখের দিকে তাকাতেই সুখের টলমল দৃষ্টি দেখে কপাল কুঁচকে প্রশ্ন করে জানতে চায়…
‘কী হয়েছে? কাঁদছিস মনে হয় তুই?
‘সরি ফর এভরিথিং ভাইয়া।
সুখের হঠাৎ সরি বলার কারণ না বুঝে রাদিল বলে…
‘সরি ফর হোয়াট?
‘গাড়িটা থামান ভাইয়া।
‘কী জন্য? কোনো দরকার আছে?
‘প্লিজ ভাইয়া গাড়িটা থামান। আমার অস্বস্তি লাগছে। দমবন্ধ হয়ে আসছে। প্লিজ গাড়ি থামান।
রাদিল মনে করেছে হঠাৎ করে সুখ অসুস্থ হয়ে পড়েছে, সেজন্য সে দ্রুত গাড়ি থামাল। অথচ গাড়ি থামতেই সুখ নিজের পরীক্ষার ফাইল নিয়ে গাড়ির দরজা খুলে বেরিয়ে যায়। রাদিল ভাবে সুখ খোলা বাতাসের জন্য গাড়ি থেকে বেরিয়েছে। রাদিল সুখকে বেরিয়ে যেতে দেখে পানির বোতলটা এগিয়ে দিয়ে পেছন থেকে ডাকে…
‘সুখ, পানিটা নিয়ে যা। পানি চোখে-মুখে ছিটালে তোর ভালো লাগবে।
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ৩৪
সুখ পেছন ঘুরে তাকাল না। সামনে হাঁটল। সুখ ভীষণ অভিমানী ও জেদি মেয়ে। অপমানিত স্থানে দ্বিতীয়বার ফিরেও তাকায় না। রাদিলের গার্লফ্রেন্ড আছে, পাঁচ বছরের রিলেশন আছে—এটা সুখের জন্য অপমান। সুখ না জেনে দিনের পর দিন নিজের মূল্যবান ফিলিংস নষ্ট করেছে একজন ভুল মানুষের জন্য। সুখ হাতের ইশারায় সিএনজি দাঁড় করিয়ে সিএনজিতে উঠে চলে যায়। রাদিল পানি হাতে সুখকে সিএনজিতে উঠে চলে যেতে দেখে অবাক হয়। তাড়াহুড়ো করে সুখকে ডাকতে লাগল অনবরত। কিন্তু সুখ চলে যায় রাদিল গাড়ি থেকে নামতে নামতেই। রাদিল হতবাক ও বাকরুদ্ধ হয়ে গেল হঠাৎ সুখের কাণ্ডে। মূলত রাদিলের মাথায় আসছে না কেন সুখ এমন করল। কী কারণে?
