love or hate part 48
ইভেলিনা তূর্জ
ইতালির রোমে তখন পরন্ত গোধূলি।যাকে “Golden hour”বললেও ভুল হবে না বৈকি।টাইবার নদীর জলরাশির ধারে অবস্থিত আন্ডারগ্রাউন্ড দ্য ভাইপার ক্লাবের ভিআইপি লাউঞ্জের ভেলভেট সোফায় বসে হাত পাঁ ছড়িয়ে আয়েশি ভঙ্গিমায় বসে আছে মার্বেল ব্রিস্ট।রাতে যেই নাইট স্যুট পড়ে ঘুমিয়ে পড়েছিলো তা পড়েই প্যালেস থেকে ক্লাবে চলে এসেছে।পাশে দাঁড়িয়ে আছে মার্বেল পালোয়ান যোতশু।আঁড়চোখে বসের নাইট স্যুটের নিম্নাংশে চোখ যেতেই থতমত খেয়ে গেলো মার্বেল পালোয়ান যোতশু।গণ্ডস্থলে শুষ্ক কাঁশি টানলো।
–” বস কি আজ টমি হিলফিগার ব্রান্ডেরটা পড়েছেন??”
মার্বেল কড়াক চাহনিতে ঘাড়ঘোরাতেই যোতশু ভয়ে তটস্থ হয়ে কিঞ্চিৎ পিছিয়ে গেলো।পেট ফেঁটে হাসি পাচ্ছে তার।তবে হাসা বারণ।গর্দান যাবে।মার্বেল ততক্ষণাৎ যোতশুর পশ্চাৎ এ ধড়াম করে এক দানবাকৃতির লাথি মারলো।
–“কুত্তার জাত! তুই কি ব্যাটাছেলে নাকি কোনো মহিলার জাত রে?আস্ত একটা পুরুষ হয়ে আমার জাঙ্গিয়া ফাঙ্গিয়াতে নজর দিচ্ছিস।লুচ্চামি মারাস ব্লাডি ব্রিস্টের সাথে??পেলে পুষে শুয়োর বানিয়েছি।হুয়াট দ্য হেল ইজ দ্যিস ম্যান!এরা কারা। কোত্থেকে এলো এরা??চো*ট্টামি করার জায়গা পাস না??বসের জাঙ্গিয়াতে নজর দিস।”
এক গ্লাস গরম দুধের সাথে আনারস মিশিয়ে আনা হলো মার্বেল ব্রিস্টের জন্যে।দু’চুমুক দিয়ে ইতালিয়ান কুখ্যাত জুয়ারি লাইটার ক্রমকে অফার করলো।লাইটার নিলো না প্রত্যাখান করলো।এমন উগ্র উদ্ভট ড্রিংক’স খাওয়ার প্রয়োজনবোধ করলো না লালচুলা লাইটার।আজ জুয়ার বড়সর আসড় বসেছে ভাইপার ক্লাবে।মার্বেলের সাথে তালে তাল মিলিয়ে বিট উঠাচ্ছে লাইটার।মার্বেলের নিজের ক্ষমতার উপর অহংকারী মনোভাবকে কথার জালে ক্ষুঃন্ন করতে লাইটার নিজের চুরুটে টান দিলো। ইতালির ক্ষমতাশালী মাফিয়া মার্বেল ব্রিস্টকে উদ্দেশ্যে তাচ্ছিল্যের সুরে বলে উঠলো।
—”এত ক্ষমতাশালী হয়েও কী লাভ মার্বেল?মনস্টার বি’চের সাম্রাজ্য অ্যাটাক করা তো দূর সে সামান্য কয়েকটা নারী পাঠিয়ে মুখ বন্ধ করে দিলো আপনার। মার্বেল কি শুধু নারীলোভী??তার রাজত্ব তো পুরো ইতালি জুড়ে। দু’বার ক্যালিফোর্নিয়াতে অট্যাক করতে গিয়ে আপনার ব্ল্যাক স্কোয়াড ব্যর্থ হয়ে ফিরলো। আজ পর্যন্ত ওই ‘আলফা’র একটা রুটও তো আপনি দখল করতে পারলেন না!উল্টো আবার আড়ালে তার সাথে গলায় গলায় ভাব জমিয়ে বেড়ান… নাইস, ভেরি নাইস!”
লাইটারের চরম ধৃষ্টতাপূর্ণ মন্তব্যে মার্বেলের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। —“ইউভান আলফা…যাকে দমাতে হবে সূক্ষ্ম মস্তিষ্কে, গায়ের জোরে নয়।অ্যাম ড্যাম সিউর রিকের কাছেই অবসেডিয়ান আসল হিরেগুলো আছে।”
লাইটার বিরোধিতা করে ভ্রু কুঁচকে পালটা প্রশ্ন করলো,—“He is an alpha man am i right?”
মার্বেলেরপৈশাচিক উৎফুল্লতায় হাসলো। যোতশুকে দিয়ে একটা পৃথিবীর মানচিত্র আনালো।যোতশু মানচিত্র নিয়ে তড়িৎগতিতে হাজির হলো।মার্বেল পৃথিবীর মানচিত্র টেনে মেলে ধরলো টেবিলের উপর।একটা লাল কালির মার্কার পেন নিয়ে মানচিত্রের জলরাশি স্থানগুলো বাদ দিয়ে স্থলভাগে একে একে দাগ টানতে টানলো।
—” আমেরিকার ক্যালিফোর্নিয়ার থেকে যদি রেখা সোজা নিয়ে আসি ডেনমার্কে, ডেনমার্ক থেকে যদি রেখাটাকে আরও ওপরে তুলে রাশিয়ার ভলচর দ্বীপে নিয়ে যাওয়া হয়। তাহলে লাইনগুলো মিলে কি চিহ্ন হয়??”
লাইটার টেবিলের ওপর মেলে ধরা মানচিত্রটার দিকে অত্যন্ত খুঁটিয়ে তাকিয়ে ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করলো।
–”গ্রীক অক্ষর আলফা!! অ্যাম আই রাইট মার্বেল??তবে গ্রীক শব্দ আলফা তো সম্পূর্ণ হয়নি! এই রেখাটা তো এখনো কোথাও গিয়ে মেলেনি, মাঝপথেই আটকে আছে। তার মানে পুরো আলফা চিহ্নটা তৈরি হতে আরও একটা রেখা টানা বাকি! আরও একটা ব্ল্যাকহোল…!রিক আলবার্টের কি আরও একটা গোপন ব্ল্যাকহোল আছে??”
—“রাইট। আরও একটা রেখা বাকি, আরও একটা ব্ল্যাকহোল…যা আন্ডারওয়ার্ল্ডের মাফিয়াদের চক্ষুআড়ালে
কিন্তু সেই শেষ ঘাঁটিটা ঠিক কোথায়? পৃথিবীর কোন গোপন কোণে ?এই মার্বেল শেষ বিন্দুর হদিসটুকু জানার অপেক্ষায় আছে।”
লাইটার পুরো চমকে উঠে অবর্ণনীয় বিস্ময় নিয়ে বললো– “তার মানে…আলফা মনস্টারের আরও একটা গোপন ব্ল্যাকহোল আছে? ক্যালিফোর্নিয়া, সবচেয়ে শক্তিশালী ব্ল্যাকহোলটা এমন এক জায়গায় লুকিয়ে রেখেছে যার খবর আন্ডারওয়ার্ল্ডের কেউ জানে না? কোথায় হতে পারে সেটা?
–” এমন কোনো স্থানে হবে যা চোখে পড়ার মতো না।ইতালি রাশিয়া তো নয়।ডেনমার্ক হওয়ার পসিবলিটি শূন্য পার্সেন্ট। এমন কোনো ভৌগোলিক স্থান যা মাফিয়াদের চেনা ওয়ার্ল্ড এর বাহিরে।
–” শেষ ঘাঁটির সন্ধান পাওয়ার পরেই কি তবে আপনি একেবারে মনস্টারের উপর অ্যাটাকের প্ল্যান করছেন?”
মার্বেল দুষ্টু ভঙ্গিমায় শব্দ করে হাসল। উত্তে*জনায় আর আক্রোশে সর্বাঙ্গের তাপমাত্রা যেনো মুহূর্তে একশো ডিগ্রি স্পর্শ করেছে।নিজের গায়ের নাইট স্যুটের ওপরের কটিটা এক ঝটকায় খুলে ছুঁড়ে ফেলে দিলো বিস্ট। পশমি বক্ষের ছয় তাকের সুগঠিত ভাঁজে হাত বুলাতে বুলাতে প্রথমে গলা খাঁকারি দিতেই অট্টহাসিটা নারকীয় পৈ*শাচিকতায় রূপ নিলো।
–“অ্যাটাক??রিক আমার আপন শালা লাগে।শালার ক্ষতি কেউ করে??মনস্টার সিস্টার আমার বউ লাগে বুঝলি।মালটা হেব্বি।একেবারে রেখে দেয়ার মতো কড়াক রূপসী।শুধু নাগাল পাই না এই যা!মুখে শুধু চ্যাটাং চ্যাটাং বুলি।”
[পাকিস্তান, ইসলামাবাদ]
ফায়জা জানো নিশ্চয়ই তোমার পিতা জালাল সাহেব বলেছেন অনাথ আশ্রমটার জায়গায় এক সময় আমার পৈতৃনিবাস ছিলো??
পৃথিবীর স্বর্গ রাজ্যে কাশ্মীর ভূখণ্ডের পঁয়তাল্লিশ ভাগ আছে ভারত, আর পঁয়ত্রিশ ভাগ রয়েছে পাকিস্তানের কব্জায় তাই না?? সামান্য মাটির টুকরো নিয়ে ভারত-পাকিস্তানের মধ্যকার যে দ্বন্দ্ব—তা বহু বছর ধরে পুরো বিশ্বই জানে।যখন দু’টো দেশের মধ্যে লড়াই হয়।সেই লড়াইয়ে প্রাণ হারায় সাধারণ মানুষ।উচ্চ বিত্তশালীরা তো বেঁচেই যায়।
১৯৯৯ সালের কার্গিল যুদ্ধের সময় আমি তখন অনেক ছুটো বুঝলে??আমার বাবা ছিলেন পাকিস্তান বর্ডার আর্মির এক দুর্ধর্ষ কমান্ডো অফিসার তাজ্জিদ তাইওয়ান।বর্ডারে সেদিন তুমুল যুদ্ধ চলছে। তার আগদিন রাতে আমার মা বাবাকে বারবার নিষেধ করেছিলেন, দুই হাত জড়িয়ে ধরে অনুনয় করেছিলেন যেনো তিনি না যান মায়ের শরীরটাও খারাপ ছিলো। কিন্তু বাবা শোনেননি, দেশের ডাক তার কাছে বড় ছিলো। মা-ও জেদ ধরলেন, একা ছাড়বেন না স্বামীকে। বাবার সাথে মা-ও সেই জ্বলন্ত ফ্রন্টলাইনের দিকে রওনা হয়েছিলেন।আমি ঘুমিয়ে ছিলাম বুঝতে পারিনি।যখন জানতে পারলাম।ছোট্ট শরীরটা নিয়ে দৌড়ে ছুটলাম সেই স্থানের দিকে।
তবে আমি পেয়েছিলাম তাদের হ্যাঁ আমার মা-বাবার অর্ধগলিত, বিকৃ*ত লাশ। বোমার আঘাতে তাদের চেনার উপায় ছিলো না। মা-বাবার মাং*সের দলা হয়ে যাওয়া লাশের ওপর আছড়ে পড়ে সেদিন আমি খুব কেঁদেছিলাম, ফায়জা। চিৎকার করে আকাশ-বাতাস কাঁপিয়ে কেঁদেছিলাম।মাংসের টুকরোগুলো গুবলিয়ে ধরে রেখেছিলাম!হাত গলে পড়ে যাচ্ছিলো।বাবা তো ঘটনাস্থলেই মারা গিয়েছিলেন, কিন্তু আমার দুর্ভাগা মায়ের বক্ষে তখনো শেষ নিঃশ্বাসের ধুকপুকানিটুকু অবশিষ্ট ছিলো। মা বাঁচতে চেয়েছিলেন, আমার দিকে চুলে হাত বুলিয়ে বলেছিলেন, “চলে যা আমার সোনা বাচ্চাটা।এখানে থেকে অনেক দূর।কখনো ফিরে আসিস না!’চারদিকে তখন বোমাবর্ষণ আর সেনাদলের তাণ্ডব।আমার ক্ষমতা ছিলো না সেদিন যে মায়ের রক্তাক্ত মাকে কাঁধে তুলে কোনো হাসপাতালে নিয়ে যাবো।নিজেকে অসহায় মনে হয়েছিলো। চোখের সামনে ছটফট করতে করতে মা আমার কোলেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন।আমার আর মায়ের কোলে মাথা রাখা হলো না। মায়ের নিথর দেহটা ওখানেই ফেলে রেখে, ভেবেছিলাম অন্তত বাড়িটা সুরক্ষিত আছে। কিন্তু…”
গায়ের লোম খাড়া হয়ে উঠলো আমার।
বাড়ির দরজায় পা দিতেই আমার পুরো পৃথিবীটা স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলো। আমার বড় আপা, তিন্নাহ্… তখন পূর্ণ আট মাসের অন্তঃসত্ত্বা। পেটে নতুন প্রাণের স্পন্দন। আপার স্বামী ছিলো আরেক নরপ*শু, মদ আর গাঁজার নেশায় চুর হয়ে প্রতিদিন আপাকে পশুর মতো মারধর করতো।আপা কখনো স্বামীকে রেখে আসেনি।সেদিন এসেছিলো।অসুস্থ শরীর নিয়ে অভাগী আপা বাপের বাড়িতে আশ্রয় নিতে এসেছিলেন। কিন্তু সেদিন অভাগীর কপালে লেখা ছিলো অন্য এক অধ্যায়। যুদ্ধের বিশৃঙ্খলার সুযোগ নিয়ে ভারতের তিন তিনজন সশস্ত্র গুপ্তচর হানা দিয়েছিলো আমাদের বাড়িতে।
আমি যখন ভেতরে ঢুকলাম, দু’জন জা*নোয়ারের বাচ্চা আমার দুটো হাত পেছন থেকে লোহার শিকল দিয়ে টানার মতো করে শক্ত করে চেপে ধরলো। আমি ছটফট করছিলাম, অনুনয় করছিলাম। আর আমার চোখের সামনে… আমার নিজের চোখের সামনে সেই তিন জানো*য়ার আমার অন্তঃসত্ত্বা বড় আপার ওপর পৈশাচিক উল্লাসে ঝাঁপিয়ে পড়লো। একজন গর্ভবতী নারীর আর্তনাদে সেদিন কাশ্মীরের আকাশও হয়তো কেঁদেছিলো,ঝুম বৃষ্টি শুরু হয়।কিন্তু জল্লা*দদের দয়া হয়নি। গণধ/র্ষণের বীভ*ৎস তাণ্ডব চালানোর পর, তারা ক্ষান্ত হয়নি। এক জল্লাদ বুটের লাথি আর ধারালো অস্ত্র দিয়ে আমার আপাইয়ের পেট ছিঁড়ে অবুজ, পৃথিবীর আলো না দেখা বাচ্চাটাকে র*ক্তাক্ত অবস্থায় খুবলে বের করে আনলো! জ্যান্ত মায়ের পেট থেকে সন্তানকে টেনে বের করে কুচি কুচি করে কেটে হত্যা করলো তারা! নিজের বড় বোনের নারকীয় সম্ভ্রমহানি আর ভাগ্নের রক্তমাখা মাংসপিণ্ড স্বচক্ষে দেখার চেয়ে বড় যন্ত্রণাদায়ক মৃত্যু একটা ভাইয়ের জন্য আর কী হতে পারে?? ফায়জা? ওই অবুঝ শিশুটাকেও তারা রেহাই দেয়নি… একটুও রেহাই দেয়নি!এই তাইওয়ান বোধয় শেষবারের মতোই কেঁদেছিলো সেদিন।খুব কেঁদেছিলাম।নিজের উপর ভীষণ ঘৃণা হয় যার বাবা দেশরক্ষার শহীদ হয়েছে তার ছেলে এক নরপশু হওয়ার প্রতিঙ্গাবদ্ধ হয়েছিলো সেদিন।চোখের জল তো সেদিনিই শুকিয়ে গিয়েছিলো আমার।ভালো মানুষ হয়ে কি লাভ হয়েছিলো তাজ্জিদ তাইওয়ানের??নিজের সন্তান স্ত্রীকে পেরেছিলো রক্ষা করতে??পারে নি!
“নায়করা শুধু পৃথিবীর জন্যে ভালোবাসা ত্যাগ করতে জানে।এমন নায়ক হওয়ার প্রয়োজনবোধ করিনি বলে আমি তাইওয়ান আজ এই স্থানে।”
তুষার আর একটা শব্দও উচ্চারণ করতে পারলো না। কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে এসেছে। ভেতরের সেই পঁচিশ বছরের পুরনো দগদগে ক্ষতটা যেনো আজ আবার নতুন করে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ ঘটাচ্ছে।তুষার পাকিস্তান এসেছে আজ তিনদিন।সেদিনের পর বোধয় কাশ্মীরে রাত্রিযাপন করা হচ্ছে। টয়োটা করোলা গাড়িটার ইসলামাবাদ মহাসড়কের মাঝ পথেই থামিয়ে রাখলো তুষার।বোধয় চালানোর শক্তি ক্ষণিকের জন্যে নিভে এসেছে।পাশের সিটে বসা কাশ্মীরি কন্যা সেই কখন থেকে কেদে চলেছে।আজ উপলব্ধি করতে পারছে তুষার এতোবছর ধরে প্রতিবছর কার কবর জিয়ারত করে যায়।কার নামে আশ্রমের খাবারের আয়োজন করে।ফুঁপিয়ে ফুপিয়ে কেঁদে চলেছে রমণী।অঙ্গে জড়ানো চুরিদারের গলার অংশটা ভিজে উঠেছে। ভারক্রান্ত নয়নে একদৃষ্টিতে তাকালো তুষারের পানে।এতো বদ মেজাজী গম্ভীর পুরুষটার অতীত যে তার ভাবনার চেয়েও ভয়ানক।বাকরুদ্ধ সে।এদিকে তুষার ফায়জার উপর বেশ ক্ষিপ্ত হলো।মেয়েটা এভাবে কাঁদছে কেনো??
“হলি ড্যাম শিলি গার্ল আর ইউ্য ফায়জা।তোমাকে এই কারণে নিয়ে আসতে চাইনি।জালাল সাহেবের রিকুয়েষ্টে আনতে হলো।”
তুষারের ধমকে অশ্রু গিলে নিলো রমণী।–“আমার কষ্ট হচ্ছে ভাইজান।রাগ করবেন না।একটু কাঁদতে দিন না।প্লিজ!”
তুষার একটা পানির বোতল এগিয়ে দিলো রমণীর অবয়বের দিকে।–“কষ্ট গিলে ফেলো।”
“আপনি কি বিয়ে করতে এসেছেন পাকিস্তান?? কখনো তো এতোদিন থাকেন না!”
“যাস্ট একটা মাথা ব্যথা!”
“মাথা ব্যথা করছে??খুব বেশি??দিন না মালিশ করে দি।”
তুষার রুদ্রচক্ষে তাকালো রমণীর পানে।ভয়ে তটস্থ হয়ে গেলো রমণী।সেই কঠিন চাহনিতেও একরাশ মায়া অনুভব করলো ফায়জা।একটু অভিমানও হলো।তবে বক্ষস্থলে প্রফুল্লতার জোয়ার। তুষারকে এই প্রথম পাকিস্তানে থাকতে দেখে।তার পিতা জালালকে বলতে শুনেছে সে যে তুষার আরও বেশ কিছুদিন থাকবে সেখানে।একটা কটেজও কিনেছে।কারা নাকি আসবে তাদের কাশ্মীরে!
ডেনমার্কে এখন সূর্যোদয়ের সূচনাময় অলস প্রহর। ভোরের আলোয় কাটেগাট সাগরের জলরাশির দানবীয় গর্জন।বালুকাময় বীচ। আরহুস সমুদ্রবন্দরের এক প্রান্তে, সান লাউঞ্জারে অত্যন্ত আয়েশি ও উদ্ধত ভঙ্গিমায় বসে আছে ইউভান। গত রাতে আরহুস বিচের পাঁচতারা হোটেল ‘দ্য রয়্যাল মেরিনা’র লাক্সারি সুইটে রাতে থেকেছে। গতকাল রাতে ক্লান্ত শরীরে চলন্ত গাড়িতেই ঘুমিয়ে পড়েছিলো রমনী, এখনো ঘুম ভাঙেনি।
ইউভানের ঠিক সামনে দাঁড়িয়ে আছে তার ডেনিশ গ্যাংস্টার জেব্রাইল। মুখাবয়বে কোনো অভিব্যক্তির পরিবর্তন না ঘটিয়ে, অত্যন্ত নিচুস্বরে বলল।
–”ইতালিতে ‘দ্য ভাইপার ক্লাবে’ এক বিরাট জুয়ার আসর বসেছে বস। আপনার সেখানে গেলে ভালো হতো বস।… আফটার অল, ইউ আর দ্য লিডার অফ স্পাইডার !”
জিব্রাইলের কথা শুনে ইউভানের ঠোঁটের কোণে হাসির রেখা স্ফুরিত হলো। পরক্ষণেই নিজের ধারালো শ্বেতশুভ্র দন্তরাশি দিয়ে নিচের অধর কামড়ে ধরে এক দানবীয় হুঙ্কার ছাড়লো।
–”সস্তা মানুষের ভিড়ে জুয়ার আসরে বসে টাকা তোলা স্পাইডার লিডারের কাজ নয়! আন্ডারওয়ার্ল্ডের তুচ্ছ খেলাগুলো খেলার জন্য মার্বেল ব্রিস্টের মতো ছ্যাঁচড়া মাফিয়াই যথেষ্ট। তুমি আমাকে এখন সমুদ্রবন্দরের আসল আপডেট দাও। আমাদের নতুন অবৈধ অস্ত্রের ক্রুজ আর ড্রাগসের কন্টেইনারগুলো যাতে অতি দ্রুত রাশিয়ার ‘ভলচর দ্বীপে’ পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়, সেই দিকে নজর দাও!”
–“মাস্টার বলেছেন আপনি নিজে ক্রুজশীপ করে যাওয়ার জন্যে। ”
ইউভান কিছুক্ষণ চুপ থেকে ভেতরের অস্থিরতা দমন করে ধীর লয়ে বললো।
–”তোমাদের ম্যামকে কোনো ফিমেল স্টাফ পাঠিয়ে ঘুম থেকে জাগিয়ে জলদি রেডি করে আমার সামনে নিয়ে আসার ব্যবস্থা করো। অ্যাম ওয়েটিং”
– “এত সকালে বস? ম্যাম মেইবি ঘুমোচ্ছে! ”
পরক্ষণেই ইউভানের চাহনিতে ভয়ে তটস্থ হয়ে জেব্রাইল মেরিনার দিকে হাঁটা দিলো।আধঘণ্টা কেটে গিয়েছে। ইউভান সান লাউঞ্জার ছেড়ে নেমে এসে সরাসরি সমুদ্রের ভেজা বালুর ওপর দাঁড়িয়েছে। দুপাশেদাঁড়িয়ে দুজন সশস্ত্র পার্সোনাল গার্ড। দূর থেকে একটা চেনা অবয়বকে হেঁটে আসতে দেখে ইউভান হাতের আঙুল নেড়ে ইশারা করতেই গার্ড দুজন নিঃশব্দে সেখান থেকে চলে গেলো।দূর থেকে হেঁটে আসছে রোজ। সাগরের নোনা হাওয়া আর ভোরের প্রথম আলো এসে পড়েছে রমণীর স্নিগ্ধ মুখস্রীতে। আদিগন্ত বিস্তৃত জলরাশি আর মায়াবী সূর্যোদয় দেখে মেয়েটার ওষ্ঠাধরে এক চিলতে স্নিগ্ধ হাসির রেখা ফুটে উঠেছে। হবেই বা না কেনো তার তো পছন্দ সমুদ্র।সমুদ্রের পার ঘেঁষে দাঁড়িয়ে রোজ খালি পায়ের পাতা দুটো সাগরের নোনা পানিতে ভেজালো।রমণী অঙ্গে শরৎ আঁকাশের মতো আকাশী রঙের সিল্কের শাড়ি!বাতাসে শাড়ির আঁচলখানা উড়ছে। রমণীর ছিপছিপে লতানো কোমর শক্তিশালী চুম্বকের মতো ইউভানের তীব্রভাবে টানছে। নিজের ওপর কারোর তীব্র চাউনি অনুভব করে রোজ ঘুরে দাঁড়িয়ে ইউভানের দিকে তাকালো।এক অদ্ভুত হৃদয়ানূভূতি।
ইউভানকে এভাবে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকতে দেখে রোজের ঠোঁটের কোণে খানিকটা তাচ্ছিল্যের স্নিগ্ধ হাসি ফুটে উঠলো। সাগরের দিকে হাত প্রসারিত করে মিষ্টি স্বরে বলল।
–সমুদ্র আমার ভীষণ পছন্দ… ভালো লাগছে।”
পরের মুহূর্তেই দুজনের মাঝখানের দূরত্বটুকু এক নিমেষে চুকিয়ে দিয়ে ইউভান এসে দাঁড়ালো রমণীর একদম সন্নিকটে। রোজ কিছু বুঝে ওঠার আগেই,মাফিয়া বসের শক্ত হাতের থাবাটা বাঘের মতো খপ করে চেপে ধরলো রমণীর সরু কোমরে।পুরুষালীর বক্ষদেশর স্পর্শ পেতেই হাঁপিয়ে ওঠলো রমণী।—“ইউ…ভান…!”
ইউভান রোজের উদরে আঙুল স্লাইড করে বললো।
–“শাড়ি চেঞ্জ করে এসেছো? শাড়ির মারাত্মক সৌন্দর্য… তোমাকে না দেখলে এই মাফিয়া বস কোনোদিন উপলব্ধি করতে পারতো না।
এক তীব্র ধুকপুক তরঙ্গের ধ্বনি বয়ে গেলো রোজের সর্বাঙ্গ বেয়ে।হাতের স্পর্শ কনকনে ঠান্ডা।বায়ুর ঝাপটায় উড়ন্ত চুলগুলো কানে গুঁজে বললো।
–“এত ভালো লাগা কবে থেকে সৃষ্টি হলো ইউভান?”
–যার উত্তর আমার নিজের কাছেই নেই, সেই প্রশ্ন কেন করো ওয়াইফি?”
রোজ অপ্রস্তুত হয়ে অক্ষীজোড়া নামিয়ে নিলো। নিজের শুষ্ক হয়ে কাঠকাঠ হওয়া গলাটা কোনোমতে ভিজিয়ে নিয়ে আলতো করে হাত রাখল ইউভানের চওড়া কাঁধের ওপর। একটু আহ্লাদী সুরে ডেকে উঠলো।
–“শুনুন না…!”
–এই বন্দি! আমার সাথে এভাবে নরম গলায় কথা বলবি না!
ইউভান জোরে জোরে হাঁসফাঁস করতে লাগলো। বুনো উত্তেজনা ভর করে পুরুষালি দেহের শিরায় শিরায় মরণকামড়ের মতো বিঁধেছে যেনো। রোজের গ্রিবাদেশ এক হাত দিয়ে চেপে ধরে, বৃদ্ধা আঙুল দিয়ে গাল স্লাইড করতে করতে লাগলো মাফিয়া বিস্ট।
–“চুপ আছিস কেন, বল?”
রোজ আর কথা না বাড়িয়ে একটু দূরে রাখা সান লাউঞ্জারের দিকে হাত ইশারা করে দেখালো। ওখানের ডেক চেয়ারের ওপর রাখা আছে একটা ফিনফিনে পাতলা আকাশী রঙের শিফন শার্ট
–“ওখানে একটা শার্ট রাখা আছে… ওটা পড়বেন আপনি এখুনি।”
–আমি এসব রঙচটা, জামাকাপড় পরি না বেবি!ইউ্য নো ড্যাময়েইট আই লাইক ডার্ক লাইক দ্যাট ফা’কিং ইউ্য!”
–“আজ একটু পরবেন? একটা ছোট্ট আবদার হিসেবেও কি রাখা যায় না?”
এক মুহূর্ত! পরক্ষণেই ইউভান ক্ষিপ্র গতিতে রোজের গলা চেপে ধরলো। যদিও হাতের বাঁধনটা শ্বাসরোধ করার মতো শক্ত ছিলো না, দাঁত কিড়মিড় করে উঠলো মাফিয়া বসের।
–এত সরল সাজ্জিস কেনো?তোর মায়াবী রূপ সহ্য হয় না আমার!আমাকে বশ করে মেরে ফেলার চেষ্টায় আছিস তাই না??”
ইউভান এক ঝটকায় হাত ছাড়তেই রোজ দু-কদম পিছিয়ে গেলো। মেজাজটা এবার রোজেরও চড়ে গেলো। ক্ষোভ উগরে দাঁতে দাঁত পিষলো রমণী।
–“থাক, কোনো প্রয়োজন নেই!আমাকে ম্যানশনে দিয়ে আসুন এখনি! বালের জায়গায় আমি এক মুহূর্তও থাকবো না…!”
রোজ যেই মুখ ঘুরিয়ে চলে যেতে নিলো, অমনি ইউভান বাজপাখির মতো ঝাঁপিয়ে পড়ে রোজের কনুইটা শক্ত করে চেপে ধরে নিজের দিকে ঘুরিয়ে নিলো। অন্য হাত দিয়ে সান লাউঞ্জারে রাখা আকাশী শার্টটা হ্যাঁচকা টানে তুলে এনে রোজকে দিলো।
–ওপেন মাই শার্ট বটম’স সুইটহার্ট!
ইউভানের এহন রূপ দেখে রোজের মনে মনে ভারী মজা লাগলো।এক চিলতে বিজয়ের হাসির রেখা দেখা গেলো তার ঠোঁটে। অনেক হয়েছে এই মাফিয়ার গুটগুটে কালো রঙের থিম এর পীড়ন!আজ এই মনস্টার স্বামী, দানবটাকে রঙচটা শার্ট পরিয়েই ছাড়বে। রোজ নিজের নরম আঙুল দিয়ে শার্টের বোতামগুলো একে একে খুলে ধরতেই, ইউভান শার্টটা নিজের গায়ে জড়িয়ে নিলো। তবে সামনের একটা বোতামও লাগাল না।বক্ষের অ্যাবসগুলো শার্টের ফাঁক দিয়ে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে।
ইউভান দূরে থাকা গার্ডদের দিকে হাত উঁচিয়ে ইশারা দিলো। মুহূর্তে সংকেত পেয়ে পুরো আরহুস বিচ খালি করার প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গেলো। আপাদত এই ‘মনস্টার বিচ’ তার ব্যক্তিগত নারীর সাথে সম্পূর্ণ একান্তে সময় কাটাবে।
ইউভানের অগ্নিধূসর অক্ষীদ্বয়ে একরাশ নেশা আর হিংস্রতার ছায়া। রোজ বুঝতে পেরে এক পাঁ পিছিয়ে সরে যেতে চাইলো, অমনি ইউভান এক ঝটকায় রোজের দুটি হাত টেনে নিয়ে তার পিঠের পেছনে বন্দি করে ফেললো। ইউভান নিজের তপ্ত ওষ্ঠাধর রোজের নরম, তুলতুলে, গোলাপের মতো মোলায়েম অধরের কাছে নিয়ে আসতেই রোজ ছটফটিয়ে উঠলো।
“ব্যথা পাচ্ছি..উফফ!”
কিন্তু কে শোনে কার কথা! মুহূর্তের মধ্যে রোজ ঘাড়ে নরম ঠোঁটের তীব্র কামুক স্পর্শ অনুভব করলো। স্পর্শ ক্রমান্বয়ে নেমে এসে রোজের কানের লতি ছুঁয়ে গেলো।মাফিয়া বস কামনার চরম শিখরে। বন্য নেশাতুর হাস্কি স্বরে বললো।
–”অনেক কথা শুনেছি তোর… ঢের হয়েছে! নাও, কল মি ইয়োর ড্যাডি অ্যান্ড লেটস গিফট মি আ মর্নিং ফ্রেঞ্চ কিস! কাম অন, সুইটহার্ট…!”
ইউভান ওষ্ঠাধর ছুঁয়ালো রমণীর ঠোঁটে।শরীরজুড়ে শিহরণের মেলা।রমণীর অবচেতন হাত অনিচ্ছাকৃত আঁকড়ে ধরলো ইউভানের কাঁধ। জোরালো হয়ে তিব্রাকার ধারণ করতেই গোঙিয়ে উঠলো রমণীর।ওষ্ঠাধরে তিব্র ব্যথা অনুভব হচ্ছে। আধঘন্টা পর ছাড়া পেলো রোজ ইউভানের কাছ থেকে।রোজকে ছেড়ে ইউভান একটা সিগারেট ধরালো।তবে নিকোটিনের ধোঁয়া ভেতরে প্রবেশ করাতে পারলো না মাফিয়া বস তার আগেই রোজ ধড়াম করে ইউভানের হাত থেকে সিগারেটটা নিয়ে নিলো।
–“আপনার খাওয়ার বারোটা বাজাবো আমি।”
–“রোজ!স্টপ”
–“বারণ করেছি না খেতে!”
–“এসব কেমন পাগলামি রোজমেরি! আই সে স্টপ ড্যাময়েইট!”
রমণী দুষ্টু প্রানৌজ্জল হাসি হেসে সিগারেট হাতে নিয়েই সমুদ্রের জলরাশির মাঝে পাঁ ভিজিয়ে সরলরেখা বরাবর দৌড় দিলো।পিছুটানে বন্দি হয়ে রোজকে ধরার জন্য স্বয়ং স্পাইডার লিডার ইউভানও তার পেছনে পেছনে বালুচর কাঁপিয়ে ছুটলো।রোজ চিল্লিয়ে উঠলো।
–“আমি টেস্ট করে দেখবো??”
–“থাপ্পড় খেলে টেস্ট করার ভূত মাথা থেকে দৌড়ে পালাবে বান্দী!”
ভোরের উধীয়মান সূর্যের রঙিন কিরণ তাদের দু’জনের আর জলরাশিতে সমানতালে প্রতিফলিত হচ্ছে। আরহুস সমুদ্র সৈকতের আকাশে তখন ডানা মেলে উড়ে বেড়াচ্ছে শ্বেতশুভ্র গাঙচিল আর পরিযায়ী সিল্কি টার্ন পাখির দল। সাগরের দানবীয় গর্জনের সাথে তাল মিলিয়ে সেই পাখিদের কলকাকলি যেনো এক অদ্ভুত সুরের জন্ম দিলো।ভেসে বেড়ালো গানের মধুময় সূর।
হলো শুরু সাতদিনে,
এই খেলাদুলো রাত-দিনে,
জানি বারণ করার সাধ্যি নেই,
আর আমার!
তোমার নামে মন্দিরে,
আর তোমার নামে মসজিদে।
আমি কথা দিয়ে এসেছি,
বারেবার।
বিন্দু থেকে সিন্ধু হয়ে যাক।
তুমি ইচ্ছে মতো আমাকে সাজাও।
যদি সত্যি জানতে চাও।
~তোমাকে চাই~
টানা কয়েক ঘন্টার জার্নির সময় অপচয় না করে ইউভান রোজকে নিয়ে কোপেনহেগেন চলে এলো।আলবার্ট ম্যানশনের বিশাল গেইটের সামনে দাঁড়াতে দু’জন দেহরক্ষী এসে গাড়ির ডোর খোলে দিলো।উত্তপ্ত সূর্যের রশ্মীবলয়ের থেকে রক্ষার্থে ছাতা ধরলো রমণীর মাথার উপরে।ম্যানশের ধারপ্রান্তে আসতেই রোজ ভাবলো হায়ার সাথে একটি কথা বলা প্রয়োজন।নিজের চক্ষুশেও বিশ্বাসস্থাপন করতে পারছে না রমণী।ইউভান রোজকে নিজের আইপ্যাডটা দিয়ে গেলো।রোজ পিছন ফিরতেই দেখলো ইউভান গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়েছে।
রাশিয়ার সাথে ডেনমার্কের সময়ের ব্যবধান পুরো রাত-দিনের।যদিও রাশিয়ার মধ্যেই এগারোটি টাইম জোন রয়েছে যেখানে এক শহর থেকে অন্যে শহরের সময়ের ব্যবধান দু-তিন ঘন্টার।ইউভান প্রভাতেই ক্রুজশীপ করে ভোলচরের দ্বীপকুলে এসে পৌঁছেছে।রাশিয়ার ভলচর দ্বীপে তখনও রাতের আঁধার নেমেছে।এই দ্বীপের জলের রঙ মিশ্রিত।কখনো সবুজ তো কখনো সচ্ছ নীল।উত্তরদিকের বালুরাশির উপরে আবার নারকেল গাছও আছে কিছু।কিন্তু কখনো নারকেল ধরে না।নারকেল গাছগুলো এমন ভাবে সারিবদ্ধ যে আকাশযান থেকে দ্বীপে তাকালে দেখা যাবে নারকেল গাছগুলো “V “আকৃতির। অরণ্যের মধ্যে থাকা প্যালেস অফ ব্রিস্টে ইউভান এলো।নিজের থাম্বেল নামক ঘোরার পিঠে চড়ে।
প্যালেস অফ ব্রিস্ট’ এর ভেতরে গুলজার বসেছে। বিশাল বড় হল রুমে বসেছে আন্তর্জাতিক জুয়ার এক রাজকীয় আসর। চারদিকের ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন আলো-আঁধারিতে বসে আছে বড় বড় সব এরাবিয়ান ডিলাররা। মধ্যপ্রাচ্যের ধনী মুসলিম দেশগুলো থেকে আসা কোটিপতি ডিলারদের টেবিলের ওপর স্তূপীকৃত ডলার-ইউরোর বান্ডিল।ইউভান সেদিকে ভ্রুক্ষেপও করলো না।হল রুমের তীব্র শোরগোল আর মিউজিকে কান না দিয়ে, কোল্ট রিভলভারের চেম্বারে এক একটা করে বুলেট লোড করতে করতে প্রাসাদের দীর্ঘ সিঁড়ি বেয়ে এক্কেবারে প্যালেসের ছাদের দিকে চলে গেলো।ধীরলয়ে এলো।ক্লান্ত লাহছে শরীর।ছাদের এক প্রান্তে একটা ওপেন-এয়ার লাউঞ্জ এরিয়া রয়েছে, যেখানে নরম গদিতে শুয়ে থাকার মতো বিলাসবহুল ব্যবস্থা করা আছে। ইউভানের ধারণা ছিলো মাস্টারকে এই মূহূর্তে ছাদেই পাওয়া যাবে, কিন্তু চারপাশটা ভালো করে খুঁজেও মাস্টারকে সেখানে দেখতে পেল না ইউভান।তাই আয়েশ করে শুয়ে পড়লো সেখানে।মস্তিষ্ক থেকে রোজের মুখাবয়ব সরানো আজকাল কঠিন হয়ে পড়েছে।যেনো রাহা ঠিকি বলে মেয়েটা নির্ঘাত জাদুই করেছে তার ভাইকে।
ধ্যান জ্ঞানে সর্বদা স্পাইডার বিচরণ করা ইউভান আজকাল ততোধিক মনোযোগ প্রদান করছে না নিজের সাম্রাজ্যের উপর।শুয়ে থেকেই ইউভান মাথাটা ঝুঁলিয়ে দিলো মাফিয়া বস।সুদূর আঁকাশে পানে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো।কপালে পাঁচ ভাজ পড়েছে। নিজ পিতার উদ্দেশ্য তাচ্ছিল্য করে হাসলো।আঙুল উঁচিয়ে আকাশের পানে হুঙ্কার দিলো।ফর্সা মুখাবয়ব কালচে হয়ে আছে।
–“আপনি বলেছিলেন আমি যোগ্য না!রিক আলবার্ট কোনো এক কালে গড প্রমিস করে বলেছিলো সে আপনার সাম্রাজ্য আপনার থেকে বিশালাকৃতির করে দেখাবে।স্পাইডার কখনোই আপনার ছিলো না।স্পাইডার আমার।আমি আমার মতোন করে গড়েছি।এখানে আমার রাজত্ব চলে।পুরো পৃথিবীকে দেখিয়েছি আমার ক্ষমতা।আই অলসো হেইট ইউ্য!”
ইউভান কপাল স্লাইড করে হাসলো।দুঃখ অনূভব করতে পারছে না।কখনো পারবে কি-না জানা নেই।
–“আপনার ছেলের বউ বলেছে আমি স্বামী হিসেবেও অযোগ্য। কিভাবে আগলে রাখতে হয় আমি জানি না।আপনি কখনো আগলে রেখেছেন আপনার বউকে??আমি তো কখনো দেখি নি শিখি নি।শালার আমিই শুধু নিজের মধ্যে পরিবর্তন এনে গেলাম।আমাকে কেউ আমার মতো করে কেন? চায় না??”
–“কার জন্যে নিজের মধ্যে পরিবর্তন আনতে চাইছো?? একটা দূর্বল প্রকৃতির নারীর জন্যে?? যে কি-না তোমার যোগ্যই না!সুন্দর মেয়ের অভাব পড়বে তোমার জন্যে?? কয়টা মেয়ে চাও বলো।”
ছাঁদে উদোয়মান হলো মাস্টার।কাঁধে একটা কালো চাদর জড়িয়ে রেখেছেন তিনি।চুলগুলো পাকেনি তেমন।বয়সের ছাপের কোনো চিহ্ন অব্দি নেই।মাস্টারের তেজস্ক্রিয় কন্ঠধ্বনিতে ঘোর কাটলো মাফিয়া মনস্টারের। দু’জনের মাঝে দূরত্ব রয়েছে খানিক বটে।ইউভান গাঁ ঝাড়া দিলো।মুহূর্তেই ক্রোধের তাড়নায় হাত মুষ্টিবদ্ধ করলো।পৃথিবী রোজ ব্যতীত এমব কোনো নারীর জন্ম হয়েছে যে রিক আলবার্টের যোগ্য?? ওয়াইনের বোতল টা তোলে সর্ব শক্তি দিয়ে চাপ প্রয়োগ করতে ভেঙ্গে ফেললো।ক্রোধ যেন সপ্তম আকাশ ছুঁয়েছে।ইউভান নির্লিপ্ততা মিশিয়ে কটাক্ষ করলো মাস্টারকে।মৃদু হুঙ্কার দিলো।
–“আমি তাকে ভাঙতে চেয়েছি, ধ্বংসের খেলায় মেতে চেয়েছি ধূলিসাৎ করতে, কিন্তু পরিশেষে আমি ব্যর্থ, তার একটুকরো কোমল চাহনিই আমায় পেরেছে হারাতে! সকল টর্চার সয়েও যে নারী তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে ঘায়েল করে এই মাফিয়া মনস্টার ব্রিস্টকে, সে তো পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী নারী, অস্ত্রের ক্ষমতা ম্লান তার জেদের কাছে।”
রিক আলবার্টের হৃদয়স্থলে বাস করা নারী কখনো দুর্বল হতে পারে না। তাকে কখনো আপনি অযোগ্য বলতে পারেন না ফাদার! নেভার! সি ইজ মাই উইমেন, নট আ ফা*কিং অর্ডিনারি গার্ল!
মাস্টার কিয়ৎক্ষণ বাকরুদ্ধ হয়ে রইলেন। ইউভানের প্রতিটি বাক্যউক্তি বরাবরই ভীষণ ধারালো ধাঁচের হয়, তবে আজ তার মুখ থেকে বেরিয়ে আসা শব্দগুলোর তেজ যেন সপ্তম আকাশ ছুঁয়েছে। তাতে মিশে রয়েছে অসীম আকাশ পরিমাণ তীব্র অনুভূতি! যে কঠিন পাথরকে তিনি নিজের হাতে কেটেকুটে সৃষ্টি করেছিলেন, আজ সেই পাথরে পুষ্পের সুবাস বইছে। পাথরেও তবে ফুল ফোটে! কী আশ্চর্য, ভারী অদ্ভুত!
মাস্টার ছাঁদের কার্নিশে দাঁড়িয়ে রইলেন। তার শূন্য চক্ষুদ্বয় নিবদ্ধ সুদূর আকাশের পানে, যেখানে একটুকরো রুপোলি চাঁদের চারিধারে অজস্র তারকাদের মেলা বসেছে। বোধহয় তিনি সেই শূন্য মহাকাশের মাঝে হারিয়ে যাওয়া কাউকে খুঁজে চলেছেন। অতিপরিচিত কাল্পনিক উক্তিটি টা সবাই জানেন নিশ্চয়ই? কাছের মানুষ মরে গেলে নাকি তারা আকাশের তারা হয়ে যায়! হয়তো আজ তিনিও তেমন কারো খোঁজে ব্যাকুল।
ইউভান দু-কদম এগিয়ে এলো। তার হাত বেয়ে তখন তাজা রক্ত গড়িয়ে পড়ছে গলগল করে। সমস্ত শরীর স্বখানিক ক্ষতচিহ্ন। নিজের শরীরের দিকে কখনোই খেয়াল রাখেনি পুরুষটা, আজ এই সামান্য রক্তধারায় কীইবা আসে যায় এই লৌহপুরুষের! তার প্রাণেশ্বরী যখন দেখবে, তখন হয়তো ব্যাকুল হয়ে শুধাবে—“কী হলো আপনার? কীভাবে হলো? আপনার কি বিন্দুমাত্র যন্ত্রণা হয় না?” ব্যাস, রমণীর কণ্ঠের এই সামান্য আকুলতাটুকুই ইউভানের সমস্ত যন্ত্রণার অবসান ঘটানোর জন্য পরম প্রশান্তি।
নিজের ঘাড়ে হাত রেখে মাথাটা খানিক এপাশ-ওপাশ ঘোরালো মাফিয়া বস। তারপর এক কর্কশ ও গম্ভীর গলায় বললো।
–”ধৃষ্টতার কথা বলেছিলেন না ফাদার? আমার জীবনের প্রথম ধৃষ্টতা তো ছিল নিজের জন্মধাত্রীর প্রেমিক পুরুষকে পিতৃ-আসনে বসানো। আর দ্বিতীয়টা—সেই জন্মধাত্রীর বংশের শেষ উত্তরসূরীকে নিজের হৃদয়ে স্থান দেওয়া। পার্থক্য কেবল একটাই,প্রথমটা হয়েছিল স্বয়ং আমার নিজের ইচ্ছেতে, আর দ্বিতীয়টা সম্পূর্ণ আমার ইচ্ছাবিরুদ্ধে… যার কোনো হদিস আজ অব্দি জানা নেই আমার!”
ইউভানের চরমপন্থী ও বিস্ফোরক কথায় ঘোর কাটলো মাস্টারের। আকাশের প্রলয়ঙ্কারী বিদ্যুৎরাশি যেনো এই মুহূর্তে তাঁর নিজের শরীর বেয়েই নেমে এলো। এই যে নিক আলবার্ট, তিনি হয়তো এই জীবনেও আশা করেননি যে ইউভান খোদ এই বিষয়ে নিজের জবান টানবে। এক ভয়ানক রুদ্রচাহনিতে ভস্ম করে দেওয়ার মতো করে নয়, বরং অত্যন্ত জটিল ও অদ্ভুত এক দৃষ্টি নিয়ে তিনি ইউভানের পানে ঘাড় ঘোরালেন। ক্ষিপ্র স্বরে নিজের জবান ছুঁড়লেন।
–”রিক!.. আমার সামনে দাঁড়িয়ে পুরনো ক্ষত টেনে আনাটা তোমার জীবনের তৃতীয় ধৃষ্টতা হয়ে গেলো!”
ইউভান নিজের চিবুক সামান্য উঁচিয়ে সমান তেজে পালটা প্রশ্ন করলো।
–”তাহলে আপনি কেনো আমার ক্ষতটাকেই বারবার খুঁচিয়ে জোরালো করার খেলায় মেতেছেন ফাদার??”
–“তোমার ক্ষতটা রোজ-ই”
–“ইয়েস ড্যাম সি ইজ।সো হুয়াট??ক্ষত হলে ক্ষতই।এই ক্ষতটাই আমার অমৃত লাগে।”
–“অমৃত?? ”
–“ইয়াহহ্ ফাক!বাদ দিন আপনি বুঝবেন না।কারণ আপনার ঘরে সুন্দরী বউ নেই।”
মাস্টারের নাকের ডগা কুঁচকিয়ে উঠলো–“মুখ সামলাও রিক!জবানে লাগাম টানো।”
–“ঘরে বউ থাকলে মুখ হাত কোনো কিছুই নিয়ন্ত্রণে থাকে না।আউট অফ কন্ট্রোল হয়ে যায়! বাদ দিন বাদ দিন কারণ আপনার বউ নেই।কারণ আপনি গরিব’স”
–“হুয়াট দ্যা হেল আর ইউ্য টকিং এব্যাউট?? ”
–“শিট!শিট!শিট!বেশি বোল্ড হয়ে গেলো নাকি ফাদার??মনে হয় নেশায় ধরেছে।রাগ করলেন?? I think Nashay se chad gayi oyeee”
ইউভান হাতে থাকা কাঁচের সিগেরেট সমেত ড্রিংক’স গ্লাসটা জেল দেয়া পরিপাটি চুলের উপর ঢেলে দিলো।গলগল করে অ্যালকোহল বহমান জলধারার মতো গড়িয়ে পড়লো পুরুষালী গলদেশ বেয়ে বক্ষস্থলে।বাকিটুকু ঢকঢক করে গিলে গণ্ডস্থল ভিজালো।ঠোঁট দিয়ে জিভ ভিজিয়ে নাক কুঁচকালো। বোধয় তৃপ্তি পেলো না।দুষ্টু হেঁসে বললো।
–“শালার ইদানীং সবকিছুর টেস্ট এতো বাজে লাগে ক্যান??”
ইউভান আঙুলে রিভলবার ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে ছাঁদে দক্ষিণা চক্রবর্তী কোণে সুইমিং পুলে গাঁ ভেজানোর উদ্দেশ্য হাঁটা দিলো।রিফ্রেশমেন্টের দরকার আছে।এতো ঠান্ডা বাতাসে ঝাপটা এই পুরুষটার কেনো ঠান্ডা লাগে না।বডির তাপমাত্রা কি বেড়ে থাকে সব সময়??বোধয় তাই।পুলের জলে নামার আগে মাস্টারের দেহরক্ষীকে আদেশ ছুঁড়লো ইউভান।
–“তাকিয়ে আছিস কেন??এই যৌবনের ভার শুধু ডার্ক সামলাবে।তোরা তাকিয়ে আছিস কেনো।নজর লেগে যাবে।কোল্ড শাওয়ার নিবো।পানিটা ঠান্ডা কর।গরম লাগে।”
–“ওকে বস।”
–“ল্যাপটপ টাও নিয়ে আয়।ফাস্ট।শাওয়ার নিচ্ছি সুইটহার্টকে একটু দেখাতে হবে না তার স্বামীর হট ফিগারের কামাল।শালী সিডিউস হয় না-কি না তাও বুঝতে পারি না।ভ্যাবলি একটা।”
ইউভান সুইমিং পুলের কার্নিশে গাঁ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে নিস্পৃহ স্বরে আওড়ালো।–“ইমু নামিয়ে বলবো নাকি সুইটহার্ট তোর স্বামী বিদ্দেশে!”
অপরদিকে, মাস্টার নিক আলবার্ট ইউভানের এসব লাগামহীন কর্মকাণ্ড আর চরম ঔদ্ধত্যে দিন দিন চরম অসন্তুষ্ট হচ্ছেন। ইউভান পুলে নেমে গেলেও তিনি এখনো আগের জায়গাতেই মূর্তির মতো স্থির দাঁড়িয়ে আছেন। শূন্য আকাশের পানে তাকিয়ে রইলেন, যেখানে মেঘের বুকে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। এক গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে নামধ্বনি উচ্চারণ করলেন।
—”রোজ!”
পুলের জল থেকে ইউভান রুক্ষ চাহনিতে নিজের অঁধর বাঁকিয়ে মাস্টারের দিকে তাকালো।মাস্টার আকাশের দিক থেকে অক্ষীদ্বয় না নামিয়েই ক্রোর হাসলেন
— “সেদিন একবার লুকিয়ে দেখেছিলাম মেয়েটাকে… এক্কেবারে তোমার ভাইয়ের মেয়ে তোমার মতোই হয়েছে ইভেলিনা…”
যে পুরুষের দম্ভ, কখনো মাটিতে মেশেনি, সেই মহাশক্তিধর নিক আলবার্ট আজ বহু বছর পর নিজের ভেতরে তীব্র ক্ষত উপলব্ধি করলেন। একটা অজানা আশঙ্কায় তাঁর পুরো শরীরটা যেনো অবশ হয়ে আসতে লাগলো। ইউভান আজ তাঁকে এক ফুৎকারে মনে করিয়ে দিয়ে গেলো অতীতের কিছু দগদগে, পুরনো তাজা ক্ষত!
মাস্টার নিজের মনেই ঠুংকো হেসে আওড়ালেন,
love or hate part 47
–“তোমার ছেলের জন্মদাতা আমি নই, তবে দেখলে ইভি? তাকে বড় করার ক্ষমতা আমায় দিয়েছিলেন সৃষ্টিকর্তা। এতোবছরের মধ্যে এখন তোমার ছেলে আমাকে ‘ফাদার’ বলে সম্বোধন করে! তুমি কি শুনতে পাচ্ছো আমার কথা? রিক আজ নিজের মুখে স্বীকার করেছে… সেই শুরু থেকেই সে আমাকে নিজের পিতৃ স্থানে বসিয়েছে!”
পৃথিবীতে কিছু কিছু শক্ত ধারালো সম্পর্কের কাছে বোধয় সত্যিই সকল ক্ষমতা নিতান্তই ঠুংকো।
