Home সাঁঝের মায়া সাঁঝের মায়া পর্ব ২০

সাঁঝের মায়া পর্ব ২০

সাঁঝের মায়া পর্ব ২০
দুর এ দিলশাদ্ দুআা

দেওয়ান বাড়ির তে এই মূহুর্তে পিনপতন নিরবতা। তিতির, ঈশানকে বসানো হয়েছে। কাজি সাহেব বিয়ে পড়ানো শুরু করবেন।তিতির কে ঘিরে সব চাচিরা, বোনেরা বসেছে।অনিমা আর নিশি তাকে ধরে দু পাশে বসে আছে।তিতির এর সাইটেই চেয়ারে বসেছেন রাসেদ দেওয়ান।মেয়েটা একপ্রকার জড়সড় হয়ে আছে।রাহেলা দেওয়ান অদূরে শাশুড়ী কে নিয়ে বসেছেন।নাইম ব্যাস্ত হাতে ডিএসএলআর নিয়ে বিয়ের ফটোসেশান এ ব্যাস্ত।রাইসুল দেওয়ান, বসেছেন ছেলের ঠিক পাশেই।রিশা,রোশনি,রাফি অবশ্য তাদের বড় ভাইয়ার দলে।তার মহা উত্তেজিত হয়ে আছে এই মূহুর্তে। ঘুরে ঘুরে বারবার বর কনে কে দেখতে ব্যাস্ত।
কাজি সাহবে ফিরে তাকালে রাইসুল দেওয়ান এর দিকে।বিয়ের কাজ শুরু করবেন,অনুমতি চাইলেন।রাইসুল সাহেব মাথা নাড়লেন।কাজি সাহেব হাতের নথিটা খুললেন।গলা পরিষ্কার করে নিলেন খানিকটা।

আজকের একটা বিশেষ দিন,পবিত্র দিন।বিয়ে দুটো মনের পবিত্র মিলন,পবিত্র বন্ধন। খোদার তরফ থেকে এটি পূর্ন নির্ধারিত। ইহকাল, পরকালের জন্য এক হওয়া।
জনাব রাইসুল দেওয়ান এবং জনাবা রাহেলা দেওয়ান এর বড় এবং একমাত্র পুত্রের সাথে মৃত জনাব হেলাল শিকদার এবং মৃত জনাবা তনয়া শিকদার এর একমাত্র কন্যা রেহনুমা আরশাদ তিতির এর ত্রিশ লক্ষ এক টানা দেনমোহর ধার্য করে শুভ বিবাহ অনুষ্ঠিত হবে।
কাজি সাহেব তিতির এর দিকে ঘুরে বসলেন।হাটু অবধি লম্বা ঘোমটা টানা।চোখ ছলছল করেছে তার।টুপ টাপ দু ফোটা পানি গড়িয়ে পরলো তার কোলের ওপর। বাড়ির সকলের দৃষ্টি তার ওপর।কাজি সাহেব পুনরায় নাম পরিচয় উল্লেখ করলেন তিতিরকে তারপর স্পষ্ট গলায় বললেন,
আপনি রেহনুমা আরশাদ তিতির ত্রিশ লক্ষ এক টাকা দেনমোহরে ঈশান আরশাদ দেওয়ান কে বৈধ স্বামী হিসেবে গ্রহন করতে রাজি?রাজি হলে কবুল করুন…

তিতির থমকে থাকে।কথারা গলার ভিতর দলা পাকিয়ে আসে।বুকের ভিতরটা চিনচিন করছে।বিয়ে প্রতিটি নারীর স্বপ্নের মতো।এই বিশেষ দিনটার অপেক্ষা সকল নারীরই করে।হাজার হাজার স্বপ্ন বোনা থাকে।তবে আর দুজন মানুষ এর বোধহয় এ দিনটা নিয়ে আরও বেশি অনূভুতি কাজ করে।তারা হলে বাবা মা…কাজি সাহেব তার বাবা মায়ের নাম উচ্চারণ এর সময় মৃত বলার সাথে বুকের ভিতর টা চিনচিন করে উঠলো তার।হুঠ করেই অনুধাবন করলো ওই বিশেষ মানুষদুটো তার এই বিশেষ দিনে তার পাশে নেই,কোথাও নেই।গোটা দুনিয়াতেই নেই।ঝরঝর করে কেদে ফেললো তিতির…অস্ফুটস্বরে দু শব্দ বেরিয়ে এলো মুখ থেকে,”বাবা,মা…”কান্নার তোরে আর কথা বলতে পারলো না সে।
ঘরময় সবাই বুঝতে পারলো তিতির এর অবস্থা।এক মূহুর্তের মধ্যে সবার চোখই ছলছল করে উঠলো।
রাহেলা দেওয়ান শাড়ির আচলে মুখ চেপে ধরলেন।বাড়ির কর্তাদের চোখের পানি জমলো।রাহেলা দেওয়ান উঠে এগিয়ে গেলেন সেদিকে। নিশি সরে গিয়ে জায়গা দিলো তাকে।আগলে নিলেন মেয়েটাকে।আলতো চুমু একে দিলো ললাটে।

“ওরা খুব খুশি হচ্ছে মা।খুব খুশি। তোর মায়ের ইচ্ছে ছিলো এটা।আজকের দিনে তাদের আক্ষেপ এ কাদলে তারা কষ্ট পাবে না বল?”
তিতির জড়িয়ে ধরলো শাশুড়ী কে।রাহেলা মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন।
“আমি তোর মা না?গোটা জীবন এই দু হাতে মানুষ করেছি।আমার মেয়ে তুই।খুব আদরের।আজকের পর থেকে সে সম্পর্ক আরও শক্তপোক্ত হলো মা।তুই আমার নাড়িছেঁড়া ধন,একমাত্র ছেলের বউ।আমি কিন্তু তোর শাশুড়ী হতে পারবো না তাই বলে কোনোকালেই।আমি তোর মা।আজীবন মা থাকবো।কাঁদছিস কেনো তাহলে।আমি তোর বড় মামা তোর বাবা মা না?এমন কাঁদলে আমাদের কষ্ট হয়না?আমাদের তো মনে হয় তোর মা বাবা হতে পারিনি তাহলে।”

তিতির এর অন্তর জুড়িয়ে গেলো তার বড় মামনীর কথায়।সত্যি তো।এই মানুষ গুলো কখনো ওকে বাবা মার অভাব বুঝতে দেয়নি।বিশেষ করে বড় মামা,বর মামনী।আজ তারাই ওর শশুর, শাশুড়ী… এ জীবনে তার কোনো কিছু কমতি নেই,রাখেনি তারা।না আদর,না যত্ন আর না তো ভালোবাসা…।যাদের চলে যাওয়ার তারা চলে গিয়েছে,খোদার বান্দা খোদা নিয়ে গিয়েছে,এটাই ভবিতব্য ছিলো।খোদার মর্জিতে কিসের আক্ষেপ, কিসের আফসোস।যেখানে খোদা এরকম পরিবার দিয়েছে তাকে।
তিতির রাহেলার দিকে তাকিয়ে আদুরে ভঙ্গিতে মৃদু হাসতে চাইলো।রাহেলা আলতো হাতে শাড়ির আচলে চোখ মুছিয়ে দিয়ে অনিমাদের ইশারা করলো তাকে সামলাতে..।নিজে চোখ মুছতে মুছতে উঠে গেলেন সেখান থেকে।
কাজি সাহেব আবারও জিজ্ঞেস করলো তিতির কে।এবার খানিকটা দম নিয়ে,জোরে শ্বাস টেনে নিলো তিতির।কান্নার জন্য এখনো ফোপাচ্ছে।
তারপর সময় নিয়ে ধীরে ধীরে উচ্চারণ করলো

“আলহামদুলিলাহ কবুল করলাম।”
কাজি সাহেব দ্বিতীয়বার বলতে বললেন…
“আলহামদুলিল্লাহ কবুল করলাম।”
এবং সব শেষে তৃতীয়বারের মতো,
“আলহামদুলিল্লাহ কবুল করলাম।”
ঘরময় সকলের চোখেমুখে খুশির ঝলক ফুটে উঠলো।নাইম সব অ্যাম্গেলে ভিডিও,ছবি নিতে ব্যাস্ত।কাজি সাহেব এবার ঘুরলেন ইশানের দিকে।ইশান স্থির হয়ে বসে আছে।এসময় টাতে পুরুষমানুষ এর মনের মধ্যে ঠিক কি চলে সেটা কি নারীর মতো প্রকাশ পায়?পায়না বোধহয়। ক্ষেত্র বিশেষে হাতে গোনা কিছু পুরুষের প্রাপ্তির খুশিতে আবেগের প্রকাশ ঘটতে দেখা যায়।তবে ঈশানের মতো কঠিন মনের পুরুষের হৃদয়ে তার ভাষায় নেহাৎই অপছন্দের নারীকে গোটা জীবনের মতো নিজের সাথে হালাল করে বাধার অনূভুতি কি হতে পারে তা হয়তো অপ্রকাশিতই শ্রেয়।
বলাবাহুল্য ইশান এর মধ্যে আর একবারের জন্য তাকায় নি তিতির এর দিকে।সেটা কেনো তার হিসেব আমাদের কাছে থোরাই থাকবে।হতে পারে বউ নামক ওই হালাল নারীটির চোখের পানি তার কঠিন হৃদয় কে ক্ষতবিক্ষত করছে অথবা অপছন্দের পরিমাণ বেশি হওয়ায় সে চোখের পানি সহ্য সীমার উর্ধ্বে। কে জানে।হবে হয়তো কিছু একটা।
বাড়ির সবার দৃষ্টি এবার সব দৃষ্টি এবার ইশানের দিকে।
কাজি সাহেব আবার স্পষ্ট গলায় উচ্চারন করলেন,

“ইশান আরশাদ দেওয়ান,আপনি কি জনাব মৃত হেলাল শিকদার এবং জনাবা মৃত তনয়া দেওয়ান এর একমাত্র কন্যা রেহনুমা হেলাল তিতিরকে ত্রিশ লক্ষ এক টাকা টাকা দেনমোহরে আপনার বৈধ স্ত্রী হিসেবে কবুল করলেন?”
ইশান সময় নিলো না। তবে দম নিলো খানিকটা।মাথা নাড়লো সে।দৃঢ় গলায় উচ্চারণ করলো,
“আলহামদুলিল্লাহ কবুল করলাম।”
“জ্বী আবার বলুন।”
“আলহামদুলিল্লাহ কবুল করলাম”।
“আর একবার।”
এবার ঈশান আড়চোখে একবার নজর ফেললো তিতির এর দিকে।তিতির মাথা নিচু করে শাড়ির অংশ ধরে বসে আছে।কাঁদছে, ছোট্ট শরীরখানা কেঁপে কেঁপে উঠছে বারবার।লাল দোপা্ট্টা খানা একদম অনেকটা সমানে অবধি টেনে দেয়া,বাড়ি বেনারসি তে, গা ভর্তি গহনা নিয়ে আড়ষ্ট হয়ে বসে আছে।
“জি, আলহামদুলিল্লাহ কবুল করলাম।”

ঘরময় সবাই আলহামদুলিল্লাহ আলহামদুলিল্লাহ বলে উঠলো।কাজি সাহেব দোয়ার জন্য হাত তুললেন।
তিতির হঠাৎ তাকালো ঈশান এর দিকে।ঈশান তার দিকে তাকিয়ে কি?তাই তো মনে হলো।তীরের সুক্ষ্ম ফলা এসে বুকে লাগলো তার।ঈশান বুঝতে দিলো না।ভাবলেশহীন ভাবে অন্য দিকে দেখলো।
সবাই প্রায় নিঃশব্দে চোখ মুছলো।রিশা,রোশনি,রাফি তিনজন একপ্রকার চিৎকার শুরু করে দিলো খুশিতে।ঘরময় ছোটাছুটি তে ব্যাস্ত।
“ইয়ে বার্বি এখন বড় ভাইয়ার বউ,বার্বি এখন বড় ভইয়া বউ।”
ছোটদের কথা শুনে হাসির রোল পরে গেলো সবার মধ্যে। বউ শব্দ টা যত বার কানে আসছে বুকের বা পাশ টা কেমন মোচড় দিয়ো উঠছে তিতির এর।একই অনূভুতি বোধহয় ঈশানের ও হচ্ছে। ঈশান অবাক হয়।এ কেমন অনূভুতি।

অসময়ে আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নেমেছে বাইরে।ফাল্গুন এর নাতিশীতোষ্ণ আবহওয়ায় হঠাৎ করে প্রকৃতি রুষ্ট হলো নাকি নবদম্পতি কে শুভকামনা জানাতে এই পথ বেছে নিলো তা বলা মুশকিল।ঘন ঘন বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে।অন্যান্য বিয়েশাদির থেকে এ বিয়ে ভিন্ন।না আছে কনে বিদায়ের ঝক্কি না তো মেয়ে পরের ঘরে চলে যাওয়ায় কান্নাকাটি। বাড়ি জুড়ে খুশির আমেজ সবার মধ্যে, ঘরের মেয়ে আজ থেকে ঘরের বড় বউ।নয়ন,নিয়াজ,সাজিদ,নাইম মিলে অতিথি আপ্যায়নে ব্যাস্ত ছিলো এতক্ষণ।খাওয়াদাওয়ার পর্ব মিটে গেছে এরই মধ্যে। তমার পারিবার ইতিমধ্যেই চলে গেছেন।তমা রয়ে গেছে অবশ্য।আজকে সে এখানেই থাকবে।নিয়াজ,সাজিদ ওদের কাউকেও যেতে দেয়া হয়নি।যেতোও না ওরা।কি করে যেতো।বন্ধুর বাসর বলে কথা,কত দায়িত্ব তাদের।
সবাই এরই মধ্যে সুন্দর করে ঈশানের ঘরের ওর বাসরের জন্য সব সাজিয়ে ফেলেছে।ঈশান,তিতির কে পাশাপাশি বসিয়ে খাবার খায়িয়ে তিতির কে নিয়ে যাওয়া হলো সে ঘরে।ছেলেমেয়েরা নানা দুষ্টুমি করবে এখন।যথেষ্ট রাত হয়েছে।বড় রা কেউই আর তাদের আনন্দে বাধা হতে চাইলো না।সবাই কাজ মিটিয়ে চলে গেলো নিজেদের ঘরে।

“যা যা বলে দিলাম মনে আছে তো।”
অনিমার কথায় তিতির মোটেই মাথা তুললো না।লজ্জায় আড়ষ্ট হলো।নত মস্তিষ্ক আরও নত হলো।কিসব উলটোপালটা বলা হচ্ছে তাকে।তিতির এর লাজে রাঙা মুখ দেখে হেসে উঠলো সবাই।
তিতির বসে আছে ফুলের রাজ্যে যেনে।পুরো ঘরময় লাল,সাদা নানা ধরনের ফুলে সজানো।দেয়ালের কিনারা ঘেষে ক্যান্ডেলের বহর।ফুলের মধ্যে দিয়ে জড়ানো ফেইরি লাইটের সোনালি আলোয় ঘরটা আরও ঝলমল করছে।
সফেদ বিছানার ওপর লাল টুকটুকে বউ বসে আছে।হাটু অবধি ঘোমটা টেনে দেওয়া তার।তিতির এর শরীর টা অবশ লাগছে অনূভুতির জোয়াড়ে।নিজেকে হাতড়ে বেরাচ্ছে সে।ঈশান এর রুমে এভাবে তাকে বসিয়ো রাখা হয়েছে,আজ থেকে তারা স্বামী স্ত্রী নামক পবিত্র বন্ধনে আবদ্ধ বারবার তাকে এ কথাটা মনে করিয়ে দেয়া হচ্ছে।
“শোন ফিল্মের ন্যাকা নায়িকা গুলোর মতো একদম করবি না বুঝলি।ওইযে নাটক করে না?দারা দেখাচ্ছি। “
তমা একলাফে সরে গিয়ে দূরে দাড়ালো।নিজের ওড়না টা মাথায় দিয়ে কনে সাজার নাটক করলো।
ওরনা টা কামড়ে ধরলো দাতে।কাদো কাদো মুখ করে করে দু হাত সামনে দিয়ে নিষেধ করার ভঙ্গি করলো

“তুমি দিয়ো না গো বাসর ঘরের বাত্তি নিভায়া
আমি অন্ধকারে বন্ধ ঘরে যাবো মরিয়া.।.
হো হো করে হেসে উঠলো ঘরের সবাই।সাথে সাথেই আবার এগিয়ে গিয়ে চিত হয়ে শুলো তিতির পায়ের সামনে।হাতের গোলাপ খানা নাটকীয় ভঙ্গিতে বাড়িয়ে ধরলো তার দিকে।আপাতত সে ঈশান সেজেছে।
কন্ঠ মোটা করে গোমটার কোনা তুললো খানিকটা।
“সুখের পরশ দেবো তোমায় থেকো না দূরে
শান্তি খুজে পাবে আমার প্রেমের আদরে…”
ঘরের মধ্যে একেকজন হাসতে হাসতে লুটোপুটে খাচ্ছে।তমার অভিনয়ে গানের লাইনের মানে না বুঝলেও মেঝের হুমড়ি খেয়ে হাসছে রিয়া,রোশনি আর রাফি।নিশি,নূরি গড়িয়ে পরছে একে অপরের ওপর।অনিমা,রিতু হাসতে হাসতে চোখে আসা পানি মুচছে।
তিতির এর রক্তিম মুখ এখন অস্বাভাবিক রক্তিম হয়ে উঠেছে আরও।একটু আগে অনিমার শিখিয়ে দেওয়া সেসব, আর এখন তমার এহেন পাগলামি। লজ্জায় মরে যাচ্ছে সে।
অনিমা এগিয়ে এসে বসলো পাশে।
“এখনই এমন লজ্জা পেলে চলবে?আমার বন্ধু টা তো এখনো ঘোমটা তোলেইনি।”
তিতির কিচ্ছু বলতে পারছে না।নারী সত্ত্বা জেগে উঠছে বারবার।ভেসে উঠছে স্বামী নামক ওই মানুষ টার মুখচ্ছবি।

ভেজা চোখজোড়া আড়াল করে বাড়ির ছেলের দায়িত্ব পালন করছে নয়ন।ভাইয়ের বিয়ের দায়িত্ব বলে কথা!কিন্তু বুকটা যে জ্বলছে।ভীষন জ্বলছে।চোখের সামনে এতোগুলো বছরের আগলে রাখা।তার নয়নের মণিটা আজ অন্য একজনের নামে কবুল পরলো।বুকের বা পাশ টা আর বেচে থাকতেই সায় দিচ্ছে না।পরিবার, বড় ভাই,বাবা মা, দিদা সবার খুশির কথা ভাবতে গিয়ে নিজের সুখটা গলা চেপে মেরে ফেললো সে।একটা বার মুখ ফুটে বলতে অবধি পারলো না সে কথা।এ জীবনে আর পারবে না।কখনো না।সে অধিকার তার আর নেই।তার ওপর হারাম তকমা জাড়ি করা হলো আজ থেকে।আজ থেকে তার মণি টা তার বড় ভাইয়ের বউ।পুরুষ মানুষ কাঁদতে পারে না।না হলে সে বোধহয় দুনিয়াদারী এক করে কাঁদতো আজকে।কিন্তু ভাগ্যের কি পরিহাস, সে অধিকারটাও তার আর নেই।
ঈশান বসে আছে নিচতলায়।বন্ধু দের সাথে। নয়ন সেখানে থাকতে পারলো না।আর কিছুক্ষণ পরেই ঈশান কে বাসর ঘরে নিয়ে যাওয়া হবে।সবাই সেই প্ল্যান করছে,হাসিঠাট্টা করছে।তার বুকটা আরও ঝাঝড়া হয়ে আসছে।নয়ন মাথা ব্যাথার দোহাই দিয়ে উঠে এলো দোতলায়।এখানেও সমস্যা। ঈশানের ঘর থেকে শোনা যাচ্ছে নারীস্বরের হৈ হল্লা।বাড়ির সব মেয়েরা এখন ওখানে কি না।তিতির এর কাছে সবাই।ঠায় দাড়িয়ে রইলো সিঁড়ির মাথায়।ঘুরে নিজের ঘরে যেতে উদ্যত হতেই পিছন থেকে মেয়ে কন্ঠের ডাক ভেসে এলো।

“নয়ন ভাই।”
তমার গলা।ভেজা চোখজোড়া দ্রুত হাতে মুছে পিছন ফিরলো নয়ন।হাসিমুখে তাকিয়ে রইলো।ঈশানের ঘরটা বেশ ওদিকে হওয়ায় ছুটে এলো তমা।দাড়ালো নয়নের সামনে।হাপাচ্ছে মেয়েটা।
“কিছু দরকার? “
তমা দুদিকে মাথা নাড়লো। “নাহ তো।আপনাকে কি আমি শুধু দরকারেই খুজি।”
“নাহ তা নয়।এত দৌড়ে আসলে। ভাবলাম ওদিকে কিছু লাগবে কি না।”
“নাহ লাগবে না।আপনাকেই খুজছিলাম তখন থেকে। কোথায় ছিলেন।”
“নিচেই তো ছিলাম।”
“সব কাজ শেষ?”
নয়ন মাথা ঝাকায়।
“ওদিকে কোথায় যাচ্ছেন।”
“আমার রুমে।”
তমার মুখে ভাজ পরলো।”এ মা এখন রুমে কেনো।”
“ঘুম দরকার একটু।”

তমা আকাশ থেকে পরলো।”বলেন কি।এখন তো বড় ভাইয়া বাসর ঘরে ঢুকবে।গেট ধরবো না আমরা ভাইবোনেরা?এমনি এমনি বউ দিয়ে দেবো?”
বারবার ঈশানের বউ, ঈশানের বউ শব্দ টা বিরক্ত করছে নয়নকে।ভয়ানক কষ্ট হচ্ছে। এই যেমন এখন হলো।মলিন হাসলো।
“তোমরা করো।আমার প্রচন্ড মাথা যন্ত্রণা করছে।”
তমা সাথে সাথে চকিত হলো।দু পা এগিয়ে ব্যাস্ত ভাবে হাত ছোয়ালো নয়নের কপালে।নয়নও চমকে গেছে তমার এহেন কার্যে।পিছিয়ে এলো খানিকটা।
“এ মা। আপনার শরীর তে গরম।অষুধ খেয়েছেন?”
“তেমন কিছু না।যাও তোমরা আনন্দ করো।”
নয়ন চলে যাওয়ার জন্য ঘুরলো। তমা সামনে এসে দাড়ালো।”খেয়েছেন কিছু?আপনাকে খেতে তো দেখলাম না।খাবার আর ওষুধ নিয়ে আসি কেমন?”

“কোনো দরকার নেই।খেয়েছি।”
“সত্যি তো?”
“হ্যা।এখন যাও ওদিক টায়।আমাকে নিয়ে ভাবতে হবে না।”
তমা আস্বস্ত হলো কি না বোঝা গেলো না।তবে নরম গলায় ডেকে উঠলো,”নয়ন ভাই।”
নয়ন চলে গেছিলো বেশ খানিকটা।আবার ডাকে তাকালো।
“আমাকে কেমন লাগছে বললেন না তো।”
“খুব সুন্দর। “
নয়ন আর দাড়ালো না।নিজের ঘরে ঢুকে আটকে দিলো দরজা।তমা কিন্তু খুশি হতে পারলনা।নয়ন ভই যতই বলুক খুব সুন্দর। সে বেশ খেয়াল করেছে নয়ন ভাই তাকে দেখেই নি আদতে।

বসার ঘরের দেয়াল জুড়ে রাজত্য করা পুরানো আমলের বিশাল দেয়ালঘড়ির কাটাটা টিকটিক করছে।অন্য দিনের থেকে আজ শব্দটা ঈশানের কানে এসে বেশ জোরে শোড়ে লাগছে।কই অন্য দিন তো এই শব্দ কখনো খেয়াল করে না সে।শোনাও যায়না।বাইরে তুমুল বৃষ্টি, দরজা জানালা আটকানো থাকা সত্ত্বেও সামান্য ভেন্টিলেটর এর ছিদ্র দিয়েই সেই শব্দ ভেসে আসছে ঘরের ভেতরে।বসার ঘরের সোফায় গা এলিয়ে ফোনের স্ক্রিনে চোখ রাখা ঈশানের।পাশের সোফাগুলোতে বসে আছে নিয়াজ,নাইম,সাজিদ। তারা বিয়ের ছবিগুলো দেখছে।তবে বারবার আড়চোখে তাকাচ্ছে ঈশানের দিকে।ঈশানের মধ্যে ঘরে যাওয়ার কোনো তাড়া দেখতে পাওয়া যাচ্ছে না।নাইম খোঁচা দিলো নিয়াজ এর ঘাড়ে।

“বল না ওকে।বাসর রাতে ত্যাড়া টা কি সারারাত এখানে শুধো মুখে বসে থাকবে নাকি।”
নিয়াজ হতাশ দৃষ্টি রাখলো ঈশানের দিকে।ছেলেটা গাধা না কি।ওইরকম মোমের মতো একটা বউ বাসর ঘরে রেখে ঠায় বসে ফোন চালাচ্ছে।কনট্রোল এ দাঁত দিতে হয় শালার।ত্যাড়ামিতে এক নম্বর প্রাইজ ওরই পাওয়া উচিত।
নিয়াজ উঠে এসে বসলো ঈশানকে ঘেষে।সাজিদ,নাইম অধির আগ্রহে তাকিয়ে আছে সেদিকে।নিয়াজ বেশ গলা নামিয়ে আনলো,”দেওয়ান সাহেব কি উপোস ভাঙবেন না?”
ঈশান বিরক্তি চোখে তাকালো।নিয়াজ সরে বসলো খানিকটা।
“নাহ মানে বলছিলাম।উপোশ এর তো একটা সময়সীমা আছে।তাই বলছিলাম।জন্ম থেকে,পুরুষ হওয়ার পরও এতদিন ছিলেন।ভালো কথা।পূন্যের কথা…তবে ওইযে তিন কবুলের পর উপোস ভাঙ্গাটাও কিন্তু পূন্যের মধ্যেই পরে।”

ঈশানের তপ্ত দৃষ্টিতে গলার স্বর আরও নামিয়ে ফেললো নিয়াজ।শুকনো ঢোক গিললো।উঠে দাড়িয়ে সরে দাড়ালো।সাজিদ দের কাছে।এবার গলা উঁচুলো।আঙুল নাচিয়ে কড়া গলায় বললো,”তাহলে সত্যি ভাববো উপোস আজকে সত্যিই রুষার কাছে ভেঙেছিস তুই।”
“হোয়াট ননসেন্স নিয়াজ।”
ঈশান এর ধমকে নড়েচড়ে উঠলো নিয়াজ।জায়গা মতো তীর মেরেছে।দেওয়ান সাহেবের চরিত্রে আঙুল তোলা।আজ নিয়াজ বাচলে হয়।
“আমি কেমন জানিস না তোরা?আমি ওরকম মেয়েদের সাথে… আর ইউ কিডিং মি।”
নিয়াজ দু হাত তুলে থামানোর ভঙ্গি করলো।
”তাহলে বউয়ের কাছে যাচ্ছিস না কেনো।ওটাই তো দ্বারায়।এখন এনার্জি নেই।”
“আর একটা বাজে কথা বললে কথা বলার জন্য গলার আওয়াজ খুঁজে পাবি না বলে রাখলাম।”
এবার সাজিদ উঠে দাড়ালো।
“তোকে সেই লেংটা কাল থেকে চিনি।নাটক করবি না।যাচ্ছিস না কেনো ঘরে।তিতির এর প্রতি উইক হয়ে যাবি তাই?ওকে দেখলে আর তোর সো কলড ইগো জাহির করে তোর জ্বালাময়ী কথাগুলো বলতে পারবি না তাই?”
“আমি ওর প্রতি কখনো উইক হবো না।আই ডোন্ট ইভেন লাইক হার।”
“কাকে বোঝাচ্ছিস সেটা?নিজেকে?নাকি আমাদের? আমাদের হলে বলবো দরকার নেই।আমরা তোর থেকেও ভালো তোর মনের কথা বুঝতে পারছি।আর যদি বলিস নিজেকে বুঝ দিচ্ছিস।তাহলে বলবো দিসনা।অযথা নিজেকে কষ্ট দেয়ার মানে হয়না।তবে..
খানিকটা থামলো সাজিদ,ঈশান নির্বিকার অন্য দিকে দৃষ্টি দিয়ে বসে আছে।

“তবে যদি কারণটা রুষা হয়।আমি বলবো আমি সামলে নেবো সবটা।এর জন্য তোর বা তিতিরকে আমি সাফার করতে দেবো না।”
ঈশান ফট করে মুখ তুললো।চোখমুখের তপ্ততা মিলিয়ে গেছে।কেমন একটা অসহায় লাগলো সে দৃষ্টি। বন্ধুর এমন রুপ তারা কেউ দেখে অভ্যস্ত নয়।তবে ঈশান সমালে নিলো সাথে সাথেই।গম্ভীর গলায় বললো,”সময় মতো সব হবে।সময়ের আগে আবেগের প্রকাশ বড় বড় মিশন ঘেটে দেয়।এটা নিশ্চয় তোকে বোঝাতে হবে না আমার।”
সাজিদ বন্ধুর কথার জবাব দিতে পারলোনা।বুঝতে পারলো ঈশান কি বোঝাতে চায়।তার মানে তিতিরকে সে অ্যাকসেপ্ট করবে না।কষ্ট দেবেই।তবে এই কথার পর তার দেওয়া কোনো যুক্তিই টেকে না।কারণ ঈশানের কথাটা শতভাগ সত্য। তার থেকেও বড় কথা আবেগ চাপা দেওয়ার কারণ টা নেহাৎ ছোট নয়।যে কারণের শুরুটাই এতো ভয়ংকর সে কারণের গোটা টা তে না জানি আরও কত কি জড়িয়ে আছে।তিতির এখনো ছোট।তার থেকেও বড় কথা বয়স আন্দাজে ওই ধরনের দুনিয়া,সেই দুনিয়ার ভয়ংকর কার্যকলাপের সাথে সে মোটেও পরিচিত নয়।আবেগে ভাসিয়ে তার বিপদ ডেকে আনার থেকে ঢের ভালো সুখ যত দেরিতে আসে আর শেষ অবধি সে সুখ তাকে জড়িয়ে রাখে।আর রইলো কথা ঈশান!হাসি পেলো সাজিদের।
সাজিদ ঈশানের ঘাড়ে হাত রাখে।ঈশান চুপ করে থাকে।
“যা ঘরে যা।যা বোঝাপরা কর গিয়ে।তোর বউ তুই কিভাবে সামলাবি তোর ব্যাপার।”
ঈশান উঠে দাড়ায়।ফোনখানা পাঞ্জাবিতে রাখে।ঘড়ির দিকে তাকায়।রাত পোনে বারোটা।ঘরে যাওয়ার সত্যি তার বিন্দুমাত্র ইচ্ছে নেই।কিন্তু শরীর ক্লান্ত।অসম্ভব ক্লান্ত।আজকে সারাদিন যে ধকল গেছে,লম্বা ঘুম না দিলে চলবে না।

ঈশান নিজের ঘরের সামনে এসে দাড়াতেই ঘরের ভিতর থেকে সবার গলা শুনলে পেলো।
“যা ভিতরে।লজ্জা পাচ্ছিস নাকি।”
ঈশান ঘুরে তাকায়।নিয়াজ রা তিনজনই এসে দাড়িয়েছে তার পিছনে।বাঁকা হাসছে তিনজনই।
“ধরে ভিতরে নিবো?”
“আমাকে এতো দূর্বল লাগছে?”
“উহু,তবে ভিতরে যে আছে তাকে দেখলে হবি।”
“শাট আপ।”
“অমনি?অনি, রিতু কে জিজ্ঞেস কর।ওর মেয়ে হয়ে আজকের দিনে তোর বউয়কে দেখে প্রশংসায় মুখে ফ্যানা তুলে ফেলেছে।খোদা কেনো তাদের ছেলে করে পাঠালো না।রিতু তো বলছে আগে জানলে ভাই একটা দত্তক দিতে বলতো তার বাপ মাকে এ বুড়ো বয়সেও। তাও তোর বউকে নিয়ে যেতো।”
“তোরা থামবি।অসহ্য লাগছে।”
তিনজনই শব্দ করে হেসে ফেললো।ভালোবাসিনা,পছন্দ করি না বলতে বলতে হেদিয়ে মরা তাদের বন্ধুর তিতির কে দেখার পর রিঅ্যাকশন কি হবে দেখার জন্য তর সইছে না কারোর।তবে বেশি আশা তারা মোটেই রাখেনি।এই ছেলে তো ভাঙবে তবু মচকাবে না।
ঈশানের সাড়া পেতেই ঘরের ভিতর থেকে হুড়মুড়িয়ে বের হয়ে দরজা আটকালো সবাই।এ আবার কি সমস্যা
ঈশান ভ্রু জোড়া কুচকে ফেললো।কপালে ভাজ পরলো।অনিমার দিকে প্রশ্ন চোখে তাকালো।

“আমার ঘরে আমি এখন যেতে পারবনা?”
“পারবি। টাকা দে আগে।”
“কিসের টাকা!”
“কিসের টাকা মানে!হুরপরী বিয়ে করেছো।এমনি এমনি তার কাছে যেতে দেবো?খরচা করতে হবে।”
ঈশানের এতসব বিরক্ত লাগছে।এমনিতে মন মেজাজ ভালো নেই।তার ওপর শরীর ক্লান্ত।এখন এসব কাহিনি করার মানে হয়।
“অ্যাম সো টায়ার্ড অনি।শরীর খারাপ লাগছে।বোঝ একটু।যা বলার সকালে বলিস।”
সবাই জোরাজোরি করতে পারতো। তবে ঈশানের অ্যাক্সিডেন্ট এর কথা মনে হতেই নিমিষেই থেমে গেলো সকলে।
“সকালে দিবি তো?”
ঈশান মাথা নাড়ে।বাকিরা কথা বাড়ায় না।দুজনেই ক্লান্ত।তাদের মতো ছেড়ে দেওয়া উচিত। অনিচ্ছা স্বত্তেও দরজা ছেড়ে সরে আসে সবাই।
“বি জেন্টল ওকে?বাচ্চা মেয়ে।”
কথাটা বলেই নিয়াজ দৌড়ে করিডর পার হয়ে যায়।সবাই অট্টহাসিতে ফেটে পরে।ঈশান তপ্ত চোখে দেখে সবাইকে।সবাই এরই মধ্যে হাসতে হাসতে যার যার রুমের দিকে যাচ্ছে।

ইশান ধীর পায়ে ঢোকে ঘরের মধ্যে
আলো নেভানো গোটা ঘরের।তবে সারি সারি ক্যান্ডেল পুরো ঘর জুড়ে।হাত বাড়িয়ে লাইটের সুইচ চাপতেই ফেইরি লাইট গুলো জ্বলে ওঠে।বিছানাটা তার ফুলের রাজ্য।থরে থরে সাজানো ফুল দিয়ে।সেখানে গুটিসুটি মেরে বসে আছে তিতির।বা পায়ের আঙ্গুলে অন্য পায়ের আঙ্গুল চেপে ধরে আছে।হাত কাঁপছে মেয়েটার।ঈশান দরজা আটকে ভিতরে আসে।ঘরের বড় বাল্ব খুলে নেয়া হয়েছে।অগত্যা এ অবস্থাতেই থাকতে হবে।শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে তার,কেমন একটা অস্থির অস্থির লাগছে।ঘামছে রীতিমতো। এসির রিমট চেপে পাওয়ার কমিয়ে দিলো।ঈশানের কোনো সারা শব্দ না পেয়ে তিতির ততক্ষণে ধীরে সুস্থে বিছানা ছেড়ে নেমে এসেছে।ঈশান তাকায় এদিক ওদিক।এ মেয়েকে তার দিকে এভাবে আসার কথা কে শিখিয়ে দিয়েছে। তিতির নিচু হয়ে পায়ে হাত দিয়ে সলাম করলো ঈশানের।ঈশান চমকে উঠেছে। দু কদম পিছিয়ে গেলো।গলা যথাসম্ভব ভারি করলো নিজের।
“কি হচ্ছে এসব?”
তিতির উঠলো।মাথা নুয়িয়ে রাখা।ঘোমটা টা এখনো বড় করে টানা।তবে পাতলা জরজেট এর হওয়ায় সিন্ধ মুঘখানা দেখা যাচ্ছে।ঠোঁটে লাল টকটকে লিপস্টিক। নাকে নথ বোধহয় ওটা।ঈশান নিজের দৃষ্টি সরিয়ে নেয়।শরীরটা কেমন একটা করছে।
আগুন আর ঘি পাশাপাশি রাখার ফলাফল এটা।রাগ হচ্ছে তার।আসতে চাচ্ছিলো না এ কারণেই।

“এটা নিয়ম।স্বামীর পা ছুঁয়ে সালাম করতে হয়।।”
স্বামী শব্দ টা কানে বাজতে লাগলো ঈশানের।সরে গেলো তিতির এর সমানে থেকে।টেনে দিলো জানালার পর্দা।বাইরের বৃষ্টি এক ফোটাও কমেনি।বরং উল্টো।এখন আরও ঝড়ো বাতাস বইছে।ধীরেসুস্থে নিজের পাঞ্জাবির ওপরের কটির বোতাম খুলতে লাগলো ঈশান।তিতির ঠায় দাড়িয়ে আছে সেখানে।ঈশান কেনো কিচ্ছু বলছে না,বা তার এখন কি করা উচিত বুঝতে পারছে না সে।এই ভাড়ি বেনারসি তে সারাটাদিন। খুব অস্বস্তি হচ্ছে তার।ঈশান কটি খানা খুলে রাখলো আলনার ওপর।ধীরে ধীরে এগিয়ে এলো তিতির এর সমানে।বুকের দুরুদুরু টা আরও বেরেছে তিতির এর।এই ঘরের পরিবেশ টাই কেমন নেশা জড়ানো,তার ওপর বাইরে আজ বৃষ্টি।
বুকের ওপর দু হাত ভাজ করে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখলো তিতির এর ওপর।তিতির সে দৃষ্টির আচ পেয়ে লজ্জায় আড়ষ্ট হলো।

“,এতো লজ্জা পেতে হবে না।এগুলো খুলে ফ্রেশ হ।সারাদিন কিভাবে ক্যারি করছিস এসব!”
লোকটা একেবারে নিরামিষ। নতুন বউকে এভাবে ধমকায় কেউ।ঘোমটা তুলে একবার দেখবে না মুখ!আগেই পাল্টাতে বলছে।তিতির এর নড়চড় না দেখে কপালে ভাজ পরলো ঈশানের।এমনিতেই জলন্ত আগুন এর সমানে থাকা যায়না।তার ওপর আগুন নিজ ইচ্ছায় ঠায় দাড়িয়ে আছে।তাকে পোড়াতে।উহু এতো সহজে সে তো পুরবে না।তার সামনে অন্য পুরুষের কথা বলার শাস্তি তোলা আছে তো।ঈশান হঠাৎ তিতির এর ঘোমটা টা তুলে ফেললো।লাল দোপাট্টা খানা গড়িয়ে পরলো মেঝেতে।তিতির এর শরীর কেমন শিরশির করে উঠলো।ঈশানেরও একই দশা।শরীরের সব শিরা উপশিরা কেমন জেগে উঠতে চাইছে।চোখের সমানে অপ্সরী দাড়িয়ে আছে।গলা শুকিয়ে কাট হয়ে এলো তার হুট করেই।খানিকটা এগিয়ে গেলো তিতির এর দিকে।তিতির বুকের ভেতরটায় ঝড় উঠেছে।বাইরে আজ কি ঝড়,তার দ্বিগুণ তো তার বুকের ভেতর।অণিমার বলা কথাগুলো মনে পরতেই মাথা ঝিমঝিম করে উঠলো।
ঈশানের হাত ততক্ষণে গাল স্পর্শ করেছে তার।

খসখসে পুরুষালি হাতের ঠান্ডা স্পর্শে ছোট্ট শরীরটা ঝাঁকি দিয়ে উঠলো।শিহরন বয়ে গেলো গোটা শরীরে।চোখ বুজে এলো,মাথা এলিয়ে দিলো সে হাতের মধ্যে। দু হাতে খামচে ধরলো নিজের শাড়ি।ঈশান অনিমেষ তাকিয়ে আছে লজ্জায় তিরতির করে কাঁপতে থাকা তার বউ নামক নারীটির দিকে।সবাই ভুল বলেনি।সত্যি একটা পবিত্র ফুল মেয়েটা।নিষ্পাপ মুখখানা।রক্তিম হয়ে উঠেছে দু গাল,নাকের ডগা।
ঈশানের এই মেয়ের ওপর সব অভিমান সেই কখন ধুয়ে মুছে গেছে বাইরের ওই বৃষ্টি তে।এখন তো প্ল্যান করে আসা কোনো কঠিন কথাই শোনাতে ইচ্ছে হচ্ছে না।বরং এই আগুন ঝলছে যেতে ইচ্ছে হচ্ছে। নিয়াজ এর ভাষায় এবার উপোস টা ভাঙ্গতে ইচ্ছে হচ্ছে। ঈশান এখনো হাত সরায় নি।তিতির এর এতটুকু তেই শরীর ছেড়ে দিতে চাইছে।আজকের অনূভুতি তাই কেমন একটা অন্যরকম।প্রশান্তির…সরে যেতে পারছে না।চাইছেও না।সবাই বারবার বলে দিয়েছে আজ স্বামী যা চায় সেটা দিতে,নিষেধ না করতে।এমনিতেই কত ঝক্কি করে বিয়েটা হচ্ছে, ঈশান রাজি হয়েছে,তার মতো করে চলতে আজ রাত।যাই করুক সে।বাঁধা না দিতে।

ঈশানের চোখ পরে শাড়ির আচলের নিচে উন্মুক্ত ফর্শা ধবধবে লতানো কোমড় টা।কটিদেশের ওপর শাড়ির অংশটুকু এখন দেখতে ইচ্ছে হচ্ছে না।সেটুকুও সরিয়ে ফেলতে মন চাচ্ছে… ঈশান তাকায় চোখবুজে থাকা তিতির এর দিকে।ঘোর লাগা চোখ ফেরায় বাকানো কোমড়ের দিকে।হাত বাড়ায় সেদিকে…
হঠাৎই কর্কশ স্বরে বেজে ওঠে পকেটে থাকা তার ফোনটা।তার ফোনের সাউন্ড মোটেই কর্কশ নয়।তবে এই মূহুর্তে বড্ড অসহ্য লাগলো। এটা কল করার সময়!তিতির ততক্ষণে চমকে কয়েকপা পিছিয়ে গেছে।ধপ করে বসে পরলো বিছানার কিনারায়।লজ্জায় চোখ তুলতে পারছে না মেয়েটা।
ঈশান দেখলো লাজে রাঙা সেই বউ টাকে। ঠোঁটের কোনে বাকা হাসি এসে মিলিয়ে গেলো।”সবে তো শুরু।এ লজ্জা ভাঙাবো অনেক লজ্জা দিয়ে।অপেক্ষা কর।”

মনে মনে কথাগুলো আউরিয়ে পকেট থেকে ফোনটা বের করে এগিয়ে এসে দাড়ালো জানালার কাছে।নাম্বার টা অচেনা।কোনো ল্যান্ড লাইন থেকে আসা কল।কপালে চিন্তার ভাজ পরলো,রিসিভ করলো ফোনটা।ওপাশে এক মূহুর্তের নিরবতার পর শোনা গেলো কন্ঠ…ইশান দৃষ্টি রাখলো তিতির এর দিকে।বুকের ভিতরটা দুমড়েমুচড়ে উঠলো। ঈশানের স্বাভাবিক মুখ অসম্ভব কঠিন হয়ে এলো।হাতের মুঠো শক্ত করে ফেললো।দাত কিড়মিড়িয়ে উঠলো।
“ডোন্ট… আই সে ডোন্ট ট্রাই টু ডু এনিথিং রং উইথ হার।”
ওপাশের ভয়ংকর হাসি শোনা গেলো।সে পাশের মানুষ টা বোধহয় আরও কিছু বললো।ঈশান আরশাদ দেওয়ান কি ভয় পেলো সে কথায়!বুক কাঁপলো হয়তো।অসহায় দৃষ্টি ফেরালো তিতির এর দিকে।তিতির উল্টো হয়ে আছে।মাথা নোয়ানো।নতুন বউ,একটু আগে শুরু হওয়া স্বামী সোহাগে লজ্জায় আড়ষ্ট… একটু পর সে স্বামী নামক ব্যাক্তি তাকে হয়তো আরও সোহাগে ভাসাবে সে ভয়ও খানিক আছে মনে।ঈশানের নিজেকে অসহায় লাগলো এবার।ফোনের লোকটা জবাবের অপেক্ষা করছে।
ঈশান গলার আওয়াজ খাদে নামালো।তিতির এর কান পর্যন্ত যাতে না যায় কথাগুলো।

“এই মূহুর্তে তোর সময় ভালো,খেলা তোর ফেবারে তাই আমি খানিকটা স্যাক্রিফাইজ করলাম।তবে ভাবিস না ভয় পেলাম।ঈশান আরশাদ দেওয়ান তোদের মতো নরকিট কে ভয় পায়না।নিজের জীবনের পরোয়া তো আরও নেই।তবে তোরা তো আবার সামনে থেকে খেলতে ভয় পাস।ছুরি মারিস পেছন থেকে…ওকে।আই অ্যাগ্রিড।তবে আমিও সময় মতো সব বুঝে নেবো।ঈশান আরশাদ এর থেকে কিছু কেড়ে নেওয়া এতো সহজ লাগে?তাও আবার সে যদি হয় তার বি……”
বাকি কথা বললো না ঈশান।”ফোন রাখ।আর কাউন্ট ডাউন শুরু কর নিজের।তোর নামে বলি চড়াবো,সেদিনই না হয় আমার উপোস ভাঙ্গবো তোর সামনে।এখন দিলাম সে পবিত্র ফুলটাকে কষ্ট। যাহ্”
ফোন কাটলো ঈশান।ফোনটা টেবিলে রাখলো।দু হাতে ডললো চোখমুখ। মাথার চুল খামচে ধরলো।তাকালো তিতির এর দিকে।মেয়েটা এখনো ওভাবেই বসে আছে।চোখ বুজলো,দীর্ঘশ্বাস ফেললো। কি বলা যায় ভেবে চট করে গুছিয়ে ফেললো।এগিয়ে এলো তিতির এর সামনে।তিতির ঈশানের উপস্থিতি টের পেলো।চোখ বুজে ফেললো সাথে সাথে।

“তোর সাথে আমার কিছু কথা আছে।”
তিতির মাথা নাড়লো,মিনমিন করে বললো।”বলুন।”
“কথাটা তোকে আমার অনেক আগে বলা উচিত ছিলে।আই গেস যখন তুই তোর প্রেমিক এর কথা বলেছিলিস আমাকে।”
তিতির চমকে তাকালো ঈশানের দিকে।প্রেমিক!কি বলছে এটা!রাহাত ভাই ওর প্রেমিক ছিলোম এটা সে কখনো বলেছে।আর আজ এটা নিয়ে আলোচনা করার সময়!ব্যাস্ত হয়ে বলার জন্য উদ্যত হতেই থামিয়ে দিলো ঈশান।
“আমাকে শেষ করতে দে।তোর লাইফে যেই থাকুক আমার মাথাব্যাথা নেই সেটা নিয়ে।কিন্তু আমার দিকটা তোর জানা দরকার…”

সাঁঝের মায়া পর্ব ১৯

তিতির আগ্রহ নিয়ে তাকিয়ে আছে।ঈশান পিছনে রাখা নিজের হাতে মুঠে শক্ত করে ফেললো।বুকটা চিনচিন করছে।মুখটা যথাযথ কঠিন করে ফেললো।
“আমি তোকে ভালোবাসিনা তিতির।আমার জীবনে অন্য কেউ আছে।”
একমুহূর্তের জন্য মাথা শূন্য হয়ে গেলো তিতিরের।ভালোবাসি না শব্দটা তার কাছে স্বাভাবিক লেগেছে।কারণ জানতো এটা সে।তার দিক থেকে ও তো হুট করেই সব।সময় তো লাগবেই।তবে পরের কথাটা?অন্য কেউ আছে মানে! হতবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো সে।

সাঁঝের মায়া পর্ব ২১