সাঁঝের মায়া পর্ব ২৪ (২)
দুর এ দিলশাদ্ দুআা
দ্রুত হুড়মুড়িয়ে বেড়িয়ে যাওয়া তিতির কে খেয়াল করলো ঈশান।ইচ্ছে করেই আটকালো না।আটকাতে গেলে মেয়েটা উল্টো চেচামেচি করতো।দরকার কি,শান্ত থাকুক কিছুদিন। দূরে থাকুক তার কাছ থেকে।এখন অসময়ে তার কাছে আসা মানে ধ্বংস নিশ্চিত। ঈশান দীর্ঘশ্বাস ফেলে,হাতের ফ্লাক্স টার দিকে তাকায়।দরজা চাপিয়ে টেবিলে রেখে এসে বসে বিছানায়।ল্যাপটপ টা চালু করে,বেশ কিছু মেসেজ নোটিফিকেশন এসেছে।চেক করা দরকার।পরশু দিন থেকে রমজান।তারমানে তিতির এর ছুটি আর মাসখানেক।তারপর।তারপর কি করবে সে।তিতির তো তখন হোস্টেলে চলে যাওয়ার বায়না করবে,তখন সে কি করবে।একরাশ চিন্তা মাথায় হানা দিচ্ছে।নিশি,নূরির মতো তিতির কে এখানেই রাখা দরকার।এতোদিন বিষয়টার গুরুত্ব না বুঝলেও এখন হারে হারে টের পাচ্ছে সে।কিন্তু সে যা করেছে তার পর মেয়েটা তার কথা মেনে বাধ্য মেয়ের মতো এখানে থাকতে মোটেই চাইবে না।ঈশান চোখ বোজে।অশান্তি লাগছে,অস্থির লাগছে।তিতিরের সাথে এখন বোনদের নিয়েও হাজার একটা চিন্তা মাথায় ঘোরাঘুরি করছে।সে যেটা ভাবছে সেটা যদি সত্য হয় তাহলে শক্তপোক্ত মনমানসিকতার ঈশান আরশাদ দেওয়ান সয়ং অসহায় হয়ে যাবে।
হাতে ফোনের ফ্লাশ জ্বেলে নিজের বাড়ির দরজার সামনে দাড়িয়ে আছে তমা।পাশে তার মা দাড়িয়ে। অপেক্ষা করছে নয়নের জন্য। যতই পাশের বাড়ি হোক এত রাতে মেয়েটাকে একা কিভাবে যেতে দিতো।নয়ন কে সামনে বাগানের গেট খুলে এগিয়ে আসতেই একপ্রকার ছুটে গেলো তমা।তমার মা তানিয়া আড়চোখে তাকিয়ে হাসলেন। মেয়ে তার বন্ধুর মতো।নয়নের প্রতি মেয়ের ভালোবাসা মেয়ে টা তার কাছে স্বীকার করেছে বহু আগে।নয়ন ভালো ছেলে,ভদ্র ছেলে।সবথেকে বড় কথা ঘরের ছেলে।পুরো মফস্বলে ঈশান,নয়ন এর মতো আর একটা ছেলে হয়না।দেওয়ান বাড়ির ছেলেগুলোর চরিত্রই অন্য রকম।তাদের ওঠাবসাও সেরকম ছেলেপেলের সাথেই।যাদের সাথে মাঝরাতে মেয়েকে ছাড়লেও একফোঁটা চিন্তা হবে না।
তমা নয়নের পাশে গিয়ে মায়ের দিকে হাত তুলতেই তানিয়া ঘরে ঢুকে যান।
দুজন হাটছে।পাশাপাশি বাড়ি, মাঝখানে একটা বাগান মাত্র।এ বাড়ি ও বাড়ি পাঁচ মিনিটের পথ মোটে।তমা আড়চোখে দেখছে নয়নকে।নয়নের মুখ বেশ গম্ভীর। যেটা সাধারনত থাকে না।আজ হঠাৎ এমন মুডের কারণ বুঝলো না সে।ঘেষে আসলো খানিকটা।
“আস্তে হাঁটুন না নয়ন ভাই।অন্ধকার এ হাঁটা যায় এতো দ্রুত?মনে হচ্ছে ট্রেন মিস করে ফেলবেন।”
নয়ন কথা বাড়ায় না।বরং গতি কমায়।
“আপনার কি মনটন খারাপ?”
“কেনো মনে হলো?”
“কথা বলছেন না তো? “
“মাথা ব্যাথা?”
“ওষুধ খেয়েছেন?”
“হু?”
“অফিস যাবেন কাল?”
“হু.।”
“যেতেই হবে?”
“হু।”
নয়নের এমন অতি সংক্ষিপ্ত জবাব গুলোতে বিরক্ত হয় তমা।আর দু একটা শব্দ যোগ করতে কি বাংলা বর্ণমালা ক্ষয় হয়ে যায়!আচ্ছা লোক তো।দু দিন হলোই দেখছে এমন ঝিম ধরা।
“ও মাগো।”
হঠাৎ তমার চিৎকার এ চমকে পিছন ফিরলো নয়ন।তমা পা চেপে ধরে বসে পরেছে।নয়ন ব্যাস্ত হয়ে ঝুকে বসে।
“কি হলো।”
তমার মুখ কাঁদো কাঁদো। চোখ টলমল করছে।
“কতবার বললাম আস্তে হাটুন।শুনলেন না।গেলো তো অন্ধকারে পা টা মচকে।আহারে আমার পা টা..”
নয়নের চোখেমুখে চিন্তার ভাজ পরলো।দ্রুত হাত বাড়ালো পায়ের দিকে।চমকে পা সরিয়ে নিতে চাইলো তমা।
“এ কি করছেন।পায়ে হাত দেবেন না।”
নয়ন বিরক্ত হলো।ভ্রু দ্বয়ের মাঝে সরু ভাজ নিয়ে তমার হাত সরিয়ে দিলো পায়ের ওপর থেকে।আলতো হাত ছোয়ালো তমার বা পায়ের গোড়ালি তে।তমার শরীর শিরশির করে উঠলো।চোখ বুজে নিলো সাথে সাথে।
“এখান টায়?”
তমা মাথা নাড়লো ধীরেসুস্থে। নয়ন পা খানা নড়াচড়া করলো খানিকটা।আসলে যতটা চিৎকার করে ব্যাথার অভিনয় করেছে তমা ততটা মোটেই ব্যাথা পায়নি।খাটি বাংলায় বলতে গেলে ব্যাথাই পায়নি।নয়নের সাথে খোলা আকাশের নিচে খানিকটা সময় কাটানোর ধান্দা সবই।আনমনে হাসলো।নয়ন ব্যাস্ত হাতে পা টা নাড়াচাড়া করে দিচ্ছে।
“ব্যাথা আছে এখনো?”
“তো থাকবে না?চিনচিন করছে।নাড়ালেই অসহ্য ব্যাথা।দেখি সরুন উঠতে দিন।”
নয়নকে ঠেলে একা ওঠার ভান করতেই দু হাতে বাহু চেপে ধরলো নয়ন।
“,আস্তে ওঠো।দাড়াতে পারছো?”
নয়নের নরম গলায় আরও খানিকটা গলে গেলো মনখানা।এবার কেঁদেই ফেললো।বেঁকে গেলো পা নিয়ে।
“দাড়াতে পারছি না তো।ও মা গো।”
“দেখি ধরো আমাকে।শক্ত করে।”
বলেই নিজের হাত গলিয়ে দিলো তমার কোমড়ে।তমা অভিনয়ের চোটে সত্যি সত্যিই পরে যাওয়ার দশা করে দাড়িয়েছে।অগত্য উপায় না পেয়ে খানিক ইতস্তত করে হলেও ধরলো তমাকে।তমা কাধ জড়িয়ে ধরলো নয়নের।দুজন লেপটে আছে একজন আরেকজন এর সাথে। তমার দারুণ লাগছে।কেমন একটা শরীরে শীতল স্রেত বইছে।এর আগে কখনো নয়ন ভাই তাকে স্পর্শ করেনি।এভাবে স্পর্শ তো দূর।হাত টাও ধরেনি।
তিতির নিজের ঘরে পায়চারি করছে এপাশ-ওপাশ। রাহাত ভাইয়ের চিন্তায় মাথা ফেটে যাচ্ছে।রাহাত ভাইকে আবার ফোনে পাচ্ছে না।কতবার যে কল করলে কল বন্ধ। মহা সমস্যা। কাল যদি হুট করে বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে হাজির হয় কি ঘটবে ভাবতেই দম আটকে আসছে।
সিড়ি বেয়ে ধীরস্থির পায়ের আওয়াজে দ্রুত এগিয়ে গেলো তিতির।চোখ ছানাবড়া হয়ে গেলো।নয়ন আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে নিয়ে আসছে তমাকে।বেচারি তমার মুখটা দেখার মতো।ব্যাথায় নীল হয়ে গেছে,বেশ খোড়াচ্ছে।তিতির বড় বড় চোখ করে তাকিয়ে আছে।তমা,নয়ন দুজনেই তাকালো।দেখলো তিতির কে।দরজার সমানে আসতেই দরজা ছেড়ে জায়গা করে দিলো ভিতরে আসার।নয়ন সুন্দর মতো বসিয়ে দিয়ে গেলো বিছানায়।তিতির উদ্বিগ্ন গলায় জিজ্ঞেস করলে,”কি হয়েছে.?”
জবাব টা নয়নই দিলো।”পা মচকেচে সম্ভবত। তেমন কিছু নয়।ঠিক হয়ে যাবে।”
নয়ন দেরি করে না।ঘুমিয়ে পরতে বলে বের হয়ে যায় ঘর থেকে।তিতির কেনো ঈশান এর থাকবে না প্রশ্ন টা মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে তখন থেকে।জিজ্ঞেস করাটা উচিত কি না বুঝতে পারলো না,কেমন দেখাবে বিষয়টা এই ভেবে আর তুললো না বিষয়টা।তিতির দরজা আটকে ঘুরতেই আরেক দফা হতভম্ব হলো।তমা সুন্দর মতো লাফিয়ে বিছানায় উঠে বসছে।তিতির কোমড়ে হাত দিয়ে ছুটে এলো বিছানসর দিকে।
“,তোর পা?”
“কিসের পা?এইযে পা।”
তমা দু পা উচু করে ধরে তিতির এর দিকে।তিতির কপাল কোচকায়।
“পা ব্যাথা?”
“ওটা পিরীতের ব্যাথা।বুঝবি না তুই।আয় শুয়ে পর।আর বল কি বলবি।শুয়ে শুয়ে গল্প করি।”
তিতির কপাল চাপড়ায়।তারই বোঝা উচিত ছিলো।যে মেয়ে সময় অসময়ে গাছে উঠে আম জাম পারে,সে মেয়প সামান্য অন্ধকারে পা মচকাবে! নয়ন নামক অসুখের ব্যাথা ওটা।দুদিকে হতাশায় মাথা ঝাকায়।এগিয়ে গিয়ে হেলান দেয় বিছানায়।খুলে বলে রাহাত ভাই এর কল দেওয়া থেকে শেষ অবধি সবকিছু।তমা ততক্ষণে সোজা হয়ে বসেছে।মুখ এখন দারুণ সিরিয়াস।
চিন্তিত গলায় বললো,”যতটা না আমাদের বাড়ির মানুষ নিয়ে টেনশন তার থেকে বেশি টেনশন হচ্ছে রাহাত ভাইকে নিয়ে।লোকটা পাগল না হয়ে যায়।”
তিতির কথা বলতে পারে না।তমার কথা একদম ঠিক।
“আমি কি করবো এখন?ওনাকে কিভাবে বলবো সব? “
তমা ভাবে কিছুক্ষণ। তিতির এর দিকে তাকায়।
“ঈশান ভাই খুব রেগে যাবে। “
তিতির ঠোঁট উল্টায়।বাকা হাসি ফুটে ওঠে।
“ওনার সমস্যা হবে কেনো।আমি কে ওনার!”
“বউ।”
“মানে না তো।”
“মুখের কথা ওটা।”
“তোকে বলেছে.”
“অনি আপু বলেছে।”
“সে তো তার বন্ধু কে ডিফেন্স করেছে।”
“উহু মোটেই না।আমরা সবাই তোকে খুব ভালোবাসি।বড় ভাইয়া তোর জন্য সঠিক না হলে আমরা কেউ তোকে বারবার বোঝাতে আসতাম না।অনি আপুও না।আমার মনে হচ্ছে অন্য ঘটনা।অনি আপু কি একটা বলতে গিয়েও বললো না।”
তিতির কোলের ওপর বালিয় নিয়ে বসে।
“হোক যা ইচ্ছা। কারোর কথায় আমি গলছি না।আমাকে ঠকানো হয়েছে।মিথ্যা বলে।বিয়ের আগে ওনার অন্য মেয়ের সাথে সম্পর্কের কথা ঘুনাক্ষরের কেউ আমাকে টের পেতে দেয়নি।অথচ এ বাড়ির সকলে জানতো।বড় মামনী,বড় মামা।এমনকি দিদাও।জানতাম না শুধু আমি।এটা কি আমাকে ঠকানো নয়?আমি বোঝা এ বাড়ির।”
তমা আগলে ধরে তিতিরকে।গালে গাল ঠেকায়।
“বোকা মেয়ে।বোঝা হলে অন্য কেথাও বিয়ে দিয়ে বিদায় করতো।ঘরের ছেলের সাথে বিয়ে দিয়ে ঘরে রাখতো না।”.
তিতির ছলছল চোখ নিয়ে চুপ করে থকাে।
“ কিন্তু উনি নিজে বলেছে রুষার সাথে বিয়ের দিন…”
“ওটাও মিথ্যা।”
“তোকে এসব কানপরা কে দিয়েছে বলতো?যেখানে উনি নিজে স্বীকার করছে।”
“করুক স্বীকার।নিয়াজ ভাইয়ারা সবাই বলছে বড় ভাইয়া মিথ্যা বলেছে তোকে।”
“কারণ কি সেটা বলার?”
“সেটা তো জানিনা।তবে আছে তো অবশ্যই।যতদূর বুঝলাম বড়সড় কারন।”
তিতির ভাবুক হয়।যা ইচ্ছে কারণ থাকুক। এতো সহজে মাথা নোয়াবার পাত্রী সে নয়।আত্মসম্মান এর কাছে একচুল ছার দেবে না সে।যা হওয়ার হয়েছে।আপাতত রাহাত ভাইকে আটাকনো দরকার,সব কথা বুঝিয়ে বলা দরকার।
“রাহাত ভাইকে আবার ফোনে পাচ্ছি না কি করি বল তো।”
“সকালে চেষ্টা করি। ভোর,ভোর..হতে পারে তখন পাবো।”
তিতির একমত হয়।মনটা অশান্ত হয়ে আছে।
গভীর রাত।ঘড়ির কাটায় সময় দাড়াচ্ছে আড়াই টা।ঈশান ঘর ছেড়ে বেড়িয়ে এসে দাড়ালো তিতিরের ঘরের সামনে।মেয়েটা দরজা খুলে ঘুমায়।আজকেও কি খুলে ঘুমিয়েছে?ভিতরে যেতে ইচ্ছে হচ্ছে। কারণ ছাড়া ইচ্ছে, তবুও মন চাইছে।বেশ খানিকক্ষণ দরজার সামনে পায়তারা করছে।ঘরে শুধু তিতির নেই,তমাও আছে বিধায় এতো ইতস্ততা কাজ করছে।সাতপাঁচ ভেবে বেয়াদব এর মতো ঘরে ঢোকার পরিকল্পনা বাতিল করে এসে ফিরলো নিজের রুমে।মেয়েটা মাত্র একদিন ছিলো তার রুমে। অথচ ঘরটা আজ কেমন ফাঁকা ফাঁকা লাগছে।বিছানার দিকে তাকিয়ে রইলো।গতরাতে দুজনের বিশেষ মূহুর্ত চোখের সমানে ভেসে উঠলো।মৃদু হাসলো ঈশান।চেয়েছিলো মেয়েটাকে শাস্তি দিতে,ভালোতো বাসেইনি কখনো।তার সামনে অন্য পুরুষের কথার বলার শাস্তি,তার সাথে বেয়াদবি করার শাস্তি।সব ছাপিয়ে এখন অন্য অনূভুতি কাজ করছে একদিনের ব্যবধানে।এ আবার কেমন অনূভুতি। বুকটা কেমন জোরেশোড়ে শব্দ করছে।বাড়ির সবাই বার্বি ডাকে,পুতুল ডাকে।ভুল ডাকে না।সাক্ষাৎ পুতুল একটা।মুখজোড়া রাজ্যের মায়া কাজ করে।দীর্ঘশ্বাস ফেলে ঈশান।সম্পর্ক টা না স্বাভাবিক ভাবে শুরু করতে পারলো আর না তো সামনে পারবে কি না তার নিশ্চয়তা দিতে পারছে এখনি।তিতির এখন তার বিবাহিত বউ।কিন্তু বোনদের কথাও আলাদা করে ভাবতে হবে তার।
ফোনে নাম্বার ডায়াল করলো কারোর একটা।সাথে সাথে রিসিভ হলো।
“ছবিগুলো ডিলেট হয়েছে?”
“কোনো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নেই।তবে কারোর ল্যাপটপ ফোল্ডারে এখনো আছে।ওটা সহজে ডিলেট হবে না।”
“ট্রাই হার্ড।অ্যাজ সুন অ্যাজ পসিবল।”
“ওকে।”
ফোন রেখে আঙুলে কপাল ঘষে।ঘটনা কি থেকে কিসে এসে আটকেছে ভাবতেই সব গুলিয়ে যাচ্ছে।
কাকডাকা ভোরে ঘুম ভেঙেছে তিতিরের।আবহাওয়া মোটামুটি স্বাভাবিক আজকে।মেঘলা পরিবেশ যদিও।তবে বৃষ্টির সম্ভাবনা আপাতত বোঝা যাচ্ছে না।তমা বেঘোরে ঘুমাচ্ছে।ফোন হাতে নিতেই চোখ ছানাবড়া। রাহাত ভাইয়ের বেশ কয়েকটা কল,মেসেজ।দু হাতে চোখমুখ ডলে তমা কে ডেকে তুললো তিতির।ঘুম জড়ানো চোখমুখ তমার।রাতে দুজনেই বেশ রাত অবধি জেগেছিলো।এতো সকাল সকাল ডাকায় ঝিমুনি ছাড়ছে না।
“কল করবো?”
“করবি মানে।করে ফেল।”
কাঁপা হাতে ডায়াল করলো তিতির।কয়েকবার রিং হওয়ার পরেই কল তুললো রাহাত।স্পষ্ট কন্ঠ।সেও হয়তো ঘুম থেকে উঠেছে বেশ আগে।
“রাহাত ভাই?”
“পরী?রাতে এতোবার কল করেছিলে।আমি খেয়াল করিনি একদম।এসেই ক্লান্ত হয়ে শুয়ে পরেছিলাম।ঘুম ভাঙার সাথে সাথে তোমাকে ব্যাক করেছি।তুমি হয়তো ঘুমাচ্ছিলে।সব ঠিক আছে?”
তিতির তমার দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তে তাকিয়ে থাকে।তমা মাথা নাড়ে।বলতে বলে।
“আপনি আজকে আসবেন না দয়া করে।”
ওপাশ থেকে রাহাত চমকালো হয়তো।তবে কন্ঠ স্বাভাবিক রাখলো।
“কেনো?কোনো সমস্যা। “
“ফোনে এত কথা বলা সম্ভব নয় রাহাত ভাই।তবে দিদার শরীর ভালো না।গত সপ্তাহে হার্টের অপারেশন ছিলো।এখন কোনো কিছু নিয়ে আলোচনা মানে…বুঝতেই পারছেন।”
“আমি তো..”
“রাহাত ভাই।আপনি একবার দেখা করতে পারবেন?”
“আজকে আসলে তো দেখাই…।”
“প্লিজ রাহাত ভাই।”
“বেশ আসবো না আজকে।কোথায় দেখা করতে হবে বলো?কোথায় আসবো।”
“অতদূর থেকে আসবেন।এতগুলো ঘন্টার ব্যাপার।ফোনেই বলতে পারতাম।কিন্তু… “
“এতো ভাবছো কেনো।তোমার জন্য আমি কি কি করতে পারি তার আন্দাজও নেই তোমার।কয়েক ঘন্টার জার্নি তো মামুলি মাত্র।এতো হেজিটেট করছো কেনো আমার কাছে হুম?”
“নাহ মানে বাসায় আসতে নিষেধ করছি। কিন্তু সেই দেখা করতে বলছি।”
“ওটা কিছু না।ভেবোনা এতো।দেখা করলে বরং ভালোই হবে,তোমার পরিবার এর সবার সম্পর্কে আগে জেনে নেই। তারপর দু এক এর মধ্যে তোমার বাড়িতে প্রস্তাব নিয়ে যাবো।এতেই বরঞ্চ ভালো হবে।পরিবার সম্পর্কে না জেনে শুনে আগেই গেলে দু পক্ষই অপ্রস্তুত হবো।আমি রওনা দিবো তাহলে একটু পর।পৌছুতে সম্ভবত তাহলে রাত হবে।বাসে আসবো। তাহলে দ্রুত পৌছুবো।”
“আমি লোকশন পাঠিয়ে দেবো,কোথায় মিট করবো।”
“ঠিক আছে।”
“সরি রাহাত ভাই।”
“পরী..।বারবার সরি বলে কেনো আমাকে ছোট করছো বলোতো।তোমার জন্য আমি মরতেও পারি।এসব নিয়ে একদম কিছু মনে করবে না।রাখি এখ কেমন?”
রাহাত ফোন রাখে।তিতির স্থির হয়ে বসে রয়।রাহাত ভাই সবটা শোনার পর কি পাগলামি টাই না করবে ভাবতেই ভয় হচ্ছে তার।
ঈশান কফি হাতে গার্ডেনে বসেছে।রাইসুল সাহেব তাকে আজকেও অফিস যেতে বারণ করে গেছেন।চন্দ্রা দেওয়ানও পইপই করে নিষেধ করেছে।অগত্য নয়ন অফিসে গেলেও সে বাড়িতেই বসে আছে।যদিও যে কারণে তাকে বাড়িতে থাকতে বলা হয়েছে সে বউ নামক নারীটির মুখদর্শন এখন অবধি করতে পারেনি।হাত বাড়িয়ে সময় দেখলো।আট টা বেজে সাইত্রিশ। ব্রেকফাস্ট করে এসে বসেছে এখানে।রাতে ঘুম হয়নি একদম। বিয়েশাদির চক্করে ঘুম টুম চলে গেছে।একবারের জন্যও তিতিরকে দেখতে পাচ্ছে না।তমা এসেছে,তার মানে নিশ্চিত রাত জেগেছে মেয়েদুটো।এরই মধ্যে কয়েকবার আড়চোখে তাকিয়েছে দোতলার তিতিরের বারান্দার দিকে।সবুজে ঘেরা গাছপালা ভর্তি।হরেক রকমের ফুল,পাতাবাহারের গাছ।তার মাঝারে একটা খাঁচা ঝুলছে।সেটায় একজোড়া টিয়া পাখি।খাঁচা টা এসময় বারান্দায় দেখে কপালে কয়েকটি ভাজ পরলো।তার মানে মেয়েটা উঠেছে।তাহলে সকালে নিচে নামলো না কেনো!নাকি সে নামার আগেই ব্রেকফাস্ট করে আবার রুমে গেছে!
ঈশান হাত বাড়িয়ে ইংরেজি সংবাদপত্র হাতে নেয়।মনোযোগ দেওয়ার চেষ্টা করে।হচ্ছে না।সদর দরজার দিকে চোখ পরতেই সরু হয়ে আসে চোখ।নূরি বের হচ্ছে। এতো সকালে আজ একা যাচ্ছে,,এমনিতে নিশি নূরি একই ভার্সিটির হওয়ায় একসাথে যাতাযাত করে।গলা উঁচিয়ে ডাকলো।নূরি চমকে বাগানের দিকে তাকালো,ঈশান কে দেখে মুখখানা আরও শুকিয়ে এলো মেয়েটার।বোধহয় এই ভয় টাই পাচ্ছিলো।দ্রুত বেড়িয়ে যেতে পারলে বাচতো।গুটি গুটি পায় এসে দাড়ালো ঈশানের সমানে।ঈশানের মুখ বেশ গম্ভীর। ভারি গলায় বললো,”এতো সকালে।কোথায় যাচ্ছিস?”
“ভার্সিটি। “
“নিশি?”
“বড়পুর আজ ক্লাস নেই।”
“গাড়ি নিয়ে যাচ্ছিস না কেনো।”
শুকনো ঢোক গিললো নূরি।”রিকশা করে ভালো লাগে।”
ঈশান কিছু বলে না।তীক্ষ্ণ চোখে পরখ করে বোনকে।
“বোস এখানে।”
হঠাৎ এই কথায় বুঝতে পারে না নূরি।অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে,”হু? “
“বসতে বললাম।”
“,বড় ভা..ভাইয়া আমার দেরি..।”
“বসতে বলেছি।”.
নূরি শুকনো মুখে বসে।এ বাড়ির কোনো ভাইবোনই ঈশানের ওপর কথা বলার সাহস করে না।সে তো আরও বেশি ভয় পায়।ঈশান ফোন বের করলো।মেসেজ করলো কাউকে।নূরি নিঃশব্দ বসে আছে।জিজ্ঞেস করার ও সাহস পাচ্ছে না এই মূহুর্তে তাকে বসিয়ে রাখার কারণ।ঈশান বোধহয় নিজ থেকেই বুঝলো নূরির মনের ভাব।কফিতে চুমুক দিলো।হাতের সংবাদপত্রের ভিতরের পাতা বের করতে করতে গম্ভীর গলা বললো, “নাইম আসছে।তোকে নিয়ে যাবে।”
নূরির মুখখানা চুপসে গেলো।”আমি যেতে পারতাম তো বড় ভাইয়া।নাইম ভাই কে আবার…
কথা শেষ হওয়ার আগেই ঈশানের তপ্ত চোখ দেখে চুপ করে গেলো নূরি।
“নাইম অফিসেই যাবে।তোর ভার্সিটির সামনে দিয়ে।তোকে ড্রপ করে দেবে।আর কয়েকদিন একা একা বের হবি না।কাউকে সাথে রাখবি।”
অনিচ্ছায় মাথা নাড়ে নূরি।উশখুশ করতে থাকে একপ্রকার।।
“তুই কাউকে ভালোবাসিস?”
আচমকা ঈশানের এমন প্রশ্ন মোটেই আশা করেনি নূরি।কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে গেলো।বড় বড় চোখ করে তাকালো।চোয়াল ঝুলে গেছে।ঈশান মুখ না তুলেই প্রশ্ন টা করেছিলো।বিধায় নূরির অস্বাভাবিক মুখের ভাবভঙ্গি তার নজরে পরলো না।
তবে উত্তর না পেয়ে আড়চোখে তাকালো।নূরি ততক্ষণে স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টায়।
“ভালোবাসিস?”
“নাহ তো।তেমন কেউ নেই।”
“নিশি কে জিজ্ঞেস করলে ওউ নিশ্চয়ই তোর মতো জবাবই দেবে?”
নূরি আরেকদফা চমকায়।তা সে কিভাবে জানবে।অবশ্য ঠিকই।নিশিও এটাই বলবে।নিয়াজ ভাইয়ের সাথে প্রেমের কথা বললে ঈশান নিশ্চয় খুন করবে তাদের।ঢোক গিলে মিনমিনে গলায় বলে।
“সেটা আমি কিভাবে বলবো ভাইয়া।”
“ঘোরাঘুরি তো সারাক্ষণ একসাথেই করিস।ওর কেউ নেই?”
“আমি জানিনা ভাইয়া।”
“তার মানে জানিস।”
মহা সমস্যায় পরা গেলো।নূরি কি বলবে ভেবে পেলো না।চুপ করে রইলো।
“পছন্দ করা অন্যায় না।আবেগে পরে ভুল মানুষ জীবনে আনা অন্যায়।ঘোরতর অন্যায়।মেয়েমানুষ হয়ে জন্মেছিস।এই ভুলটা জীবন এলোমেলো করে দিতে যথেষ্ট। “
নূরি ভেবে পায় না হুট করে তাকে এতসব বলার মানে কি।মনে মনে শত গালি দেয় ভাইকে।তাদের বার্বিটাকে বিয়ে করে ঠিকই তো কষ্ট দিচ্ছে,আবার বোনদের জ্ঞান দেওয়া হচ্ছে। মুখে বলে না কিছু।
“আশেপাশের অবস্থা ভালো না।তোদের পাশের ভার্সিটির তিনটা মেয়ে এ মাসে অসম্মানিত হয়েছে। স্যোশাল মিডিয়া এই নিয়ে হৈ চৈ।”
“জানি ভাইয়া।চিনি আপুগুলোকে।একজন তো বড়পুর ব্যাচমেট।”
ঈশান কফির কাপ রেখে হাটুতে হাত রেখে ঝুকে বসে।
“দোষ কিন্তু আমি আগে মেয়েগুলোকে দেবো।ওরা আবেগ কে প্রশ্রয় দিয়েছে।এটা হওয়া যাবে না।মেয়ে দের হতে হবে স্ট্রং।সহজে গলে যাওয়া,মিশে যাওয়া এমন হলে মেয়ে জাতী বর্তমান সমাজে টিকতে পারবেনা।বড় হয়েছিস।আশা করবো বুঝবি সবটা।মেনেও চলবি।”
নূরি সজোরে ওপর নিচ মাথা ঝাকায়।গেটের কাছে গাড়ির হর্ন পাওয়া যাচ্ছে।ঈশানের ফোনে এরইমধ্যে নাইমের মেসেজ এসে পরেছে।
“যা নাইম এসেছে।ও ড্রপ করে দেবে।রাস্তায় কোথাও নামবি না “
নূরি গেটের দিকে এগোয়। গাড়িতে উঠে বসে।তাকে দেখে একগাল হাসে নাইম।নূরি কাচুমাচু হয়ে বসে আছে।ঈশানের কথাগুলো কানে বাজছে তার।
“সিট বেল্ট বেধে নাও “
“হ্যা?”
“বল্ট টা বেধে নাও।”
নূরি সিট বেল্ট বেধে আরাম করে বসে।নাইমের দিকে তাকাচ্ছে না।দৃষ্টি সামনে।ধানখেতের মাঝখান দিয়ে পাকা রাস্তার ওপর দিয়ে চলছে গাড়ি।নাইম এরই মধ্যে বেশ কয়েকবার গ্লাসে খেয়াল করেছে নূরিকে।মেয়েটা মায়াবী। বাকিদের থেকে গায়ের রঙ একটু শ্যামলা।তবে মুখে অসম্ভব মায়া।এ মায়ায় সে আটকেছে বহু আগে।তবে নিয়াজ এর মতোই ঈশান কে ভয় পেয়ে প্রকাশ করা হয়নি সে প্রেম অনূভুতি। তাছাড়া নিশি যেমন স্বইচ্ছায় ভালোবেসেছে নিয়াজকে,নিজে আগ বাড়িয়ে এসেছিলো নূরির ভিতর তার প্রতি সেরকম কিছু সে কখনো দেখেনি।সেও যদিও প্রকাশ করেনি।আড়ালে আবডালে দেখে গেছে বন্ধুর বোনকে।
দুপুর গড়িয়ে বিকেলের শেষ ভাগ।সূর্যমামা যদিও দিব্যি আলো দিচ্ছে।সারা সকাল মেঘের ঘনঘটা কাটিয়ে রোদের দেখা মিলেছে দুপুরের দিকে।আবহাওয়া একদম ঠান্ডা যদিও।তিতির ব্যাস্ত বাইরে যাওয়ার জন্য তৈরি হতে।অবশ্যই তমা কে সাথে নিয়েই যাবে।একে তো তাকে একা যেতে দেওয়া হবে না,তার ওপর সে নিজেও চায়না একা যেতে।তমা বাড়ি থেকে তৈরি হয়ে রাস্তাতে অপেক্ষা করবে।রাহাত ভাই এরইমধ্যে মেসেজ করে জানিয়েছে সে প্রায় কাছাকাছি। ঘন্টা দেড়েক লাগবে আর।তারমানে এখানে পৌছুতে আনুমানিক সন্ধ্যা সাড়ে সাতটা বাজবে।কাছেরই একটা ক্যাফেতে দেখা করতে বলেছে।তাদের বাড়ি থেকে অবশ্য বেশ দূরে।মফস্বল ছেড়ে শহরের দিকে।এখান থেকে তার যেতেও ঘন্টা খানেক লাগবেই।
ঈশান সিড়ি বেয়ে ওপরে উঠতে গেলেই ডাক পরলো রাহেলা দেওয়ান এর।হন্তদন্ত হয়ে শাশুড়ীর ঘর থেকে বেড়িয়ে এলেন।ছেলেকে দেখে মুখ গোমরা করে বললপন,”কোথায় ছিলি সারাদিন? “
“কাজে।”
“তোকে বারবার বললাম তিতিরকে নিয়ে একটু ঘুরে আয়।ভালো ালগবে দুজনেরই।”
“কাজ ছিলো মা।সবাই কোথায়? “
রাহেলা দেওয়ান শাড়ির আচলে ছেলের ঘামে ভেজা মলিন মুখটা মুছে দেয়।
“নিশি,নূরিরা ছাদে।কিসব গাছ এনেছে নূরি ফেরার সময়।রিশা,রোশনি,রাফিও ওখানেই।”
“আর বাকিরা?”
রেহালা মুখটিপে হাসে।ঘুরেফিরে ছেলেযে নিজের বউয়ের সন্ধান চাইছে সেটা মুখ ফুটে বললেই হয়।
“তোর চাচিরা তোর দিদার রুমে।বাবা রা অফিসে।”
ঈশান হতাশ হয়।উশখুশ করে।মা টা তার সবার কথা বলছে অথচ যার কথা শুনতে চাচ্ছে তার কথা বাদে।ছোটকরে বললো,”ওহ্।”
রাহেলা এবার হেসে ফেললেন ছেলের মুখ দেখে।গলার আওয়াজ নামিয়ে বললো,”তোর বউ অবশ্য ঘরে।যদিও বের হবে একটু।”
ঈশান চমকে তাকালো মায়ের দিকে।গম্ভীর গলায় বললো,”বের হবে মানে।সন্ধ্যা বেলা বের হবে?”
“তমা আছে সাথে। বাড়ির গাড়ি নিয়ে যাবে।”
ঈশান কথা বাড়ায় না।দ্রুত পায়ে উঠে আসে ওপরে।সে যা আন্দাজ করেছিলো বিষয়টা সম্পূর্ণ ভুল নয় তাহলে।খোজ নিয়ে জেনেছে রাহাত নামের ছেলেটা আজকে আসছে।তার মানে ধারনা ভুল নয় তার।তিতির সম্ভবত তার সাথেই দেখা করতে যাচ্ছে।হাতের মুঠো শক্ত হয়ে এলো,রক্তিম আকার ধারন করেছে চোখজোড়া। দাঁতে দাঁত চেপে নিজের ঘরে এলো।ঠিকই ধরেছিলো মেয়েটা তার রুমে নেই।পাশে হাঁটা ধরলো তিতিরের রুমের দিকে।রাগে মাথা টনটন করছে।দরজা নক করার প্রয়োজন বোধ করলো না।জোরেশোরে ধাক্কায় দরজা খুললো।
তিতির তৈরি হচ্ছিলো।নেভি ব্লু আনারকলি খানার পিছনের চেন আটকানোর জন্য চেষ্টা করছিলো বেশখানিকক্ষন।সম্ভবত কিছুতে আটকে গেছে।টানটানি করতে গিয়ে ঘেমেনেয়ে গেছে।আচমকা দরজা খুলে ঈশানের প্রবেশে হতভম্ব হয়ে গেলো তিতির।সামনের খোলা চুলগুলো দ্রুত পিছনে ঠেলে দিলো।একরাশ কালো কেশরাজি আড়াল করলো উন্মুক্ত পিঠখানা।ওড়না খুজলো এদিকসেদিক। ওড়না সম্ভবত বাথরুমে।কি এক লজ্জার অবস্থা। এখন ছুটে গিয়ে ওড়না আনতে চাওয়াই বরং আরও ইমব্যারেসিং।
ঈশান স্থির দৃষ্টিতে দেখছে মেয়েটার ইতস্ততা।যা দেখার সে এরইমধ্যে দেখে ফেলেছে।ফর্শা পিঠ জুড়ে হালকা গোলাপি রঙের কাপড়ের টুকরো খানা চোখ এড়ায় নি তার।কোমড় অবধি জামার চেইন খোলা।সে নিজেও অপ্রস্তুত হয়ে পরেছে খানিকটা।তবে তিতিরের চোখের কাজলে বাকি অনূভুতি মিলিয়ে গেলো।কমতে থাকা রাগ তড়তড় করে বেড়ে মাথায় চড়লো এক নিমিষে।সাজগোছ করেছে মানে!
ঝটপট দরজা আটকালো শব্দ করে।তিতির চমকে গেলো এহেন শব্দে।দরজা আটকাতে দেখে বুকের ভিতরের দ্রিমদ্রিম শব্দ টা স্পষ্ট থেকে স্পষ্টতর হলো।যতই সাহস দেখাক এই লোকটা কে দেখলে তার সব কেমন এলোমেলো লাগে।
ঈশান ততক্ষণে সামনে এসে দাড়িয়েছে তার।চোখমুখ দিয়ে আগুন ঝড়ছে।তিতিরের ভিতরটা কেঁপে উঠলো। ঈশানের এমন দৃষ্টি ঝড় তোলে তার মনের ভিতর।তবে নিজেকে সামলে নিলো।দ্রুত পায়ে পাশ কাটিয়ে সরে যেতে গেলো বাথরুম এর দিকে।চুলে টান পরলো।চুলের গোরা চেপে আর্তনাদ করে উঠলো মেয়েটা।
“আহ্ কি করছেন ছাড়ুন। লাগছে তো।”
“লাগার জন্যই টেনেছি।দেখলি দাড়িয়ে আছি।পাশ ফিরে কোথায় যাচ্ছিস “
তিতির তেতে উঠলো।,”একে তো একটা মেয়ের ঘরে নক না করে ঢুকেছেন।তারওপর দেখলেন সে কি অবস্থায় আছে,একটু তো নজর সংযত করে ঘুরে থাকতে পারতেন।”
ঈশান ফিচলে হাসে।তবে দৃশ্যমান নয় সে হাসি।
“দরজা লক করিস নি কেনো?”
“আমার ঘরে বেয়াদব এর মতো নক না করে কেউ ঢোকে না।”.
ঈশানের মুখচোখ দেখার মতো হলো।রাগে লাল হয়ে গেছে মুখ।পেঁচিয়ে ধরলো চুল।
“ আমি বেয়াদব?”
ব্যাথায় চোখজোড়া ভিজে উঠেছে।ঘাড় পিছন দিকে হেলে গেছে।টেনে ছাড়াতে চাইলো ঈশানের হাত।পারলো না।
“তা নয় তো কি?নক না করে ঢোকা বেয়াদবি নয়?”
ঈশান এক ঝটকায় নিজের সাথে মেশালো।তিতিরের উন্মুক্ত পিঠ ঠেকলো ঈশানের সাথে।
“দেখাবো বেয়াদবি কি?হুম?”
পিঠের চুলগুলো সরিয়ে ফেললো পিঠ থেকে।চোখ আটকালো সেখানে।চোখের সমানে ভাসলো বিয়ের রাতের সেই নারীদেহের ছবি।আচমকা ঠোঁট ছোয়ালো তিতিরের পিঠে।শিওরে উঠলো মেয়েটা।টপটপ করে পরলো দু ফোঁটা পানি।সরে যেতে পারলো না ঈশানের শক্ত বাধনের জোরে।দাঁতে দাত চাপলো।
“ছাড়ছেন না কেনো।কি ধরনের অসভ্যতা এসব।”
ঈশান ঠোঁট সরালো সেখান থেকে।মেয়েটার শরীরের ঘ্রান টা কেমন নেশা নেশা।টানছে তাকে।
“অসভ্য যে আমি।তাই অসভ্যতা করছি।”
“আ..আ..আপনি..ছাড়ুন।”
ঈশান মাথা নোয়ালো আরও একবার ঠোঁট ছোয়াতে।তবে দরজার জোরেসোরে কড়াঘাতে চমকে ছেড়ে দিলো।দরজা লক করা।কিন্তু ঈশানের হাতের বাধন ঢিল হতেই ছিটকে সরে গেলো তিতির।চুলগুলো দিয়ে আবার আড়াল করলো পিঠ।তপ্ত দৃষ্টি নিক্ষেপ করতে চাইলো ঈশানকে।তবে গলার আওয়াজ পাওয়া গেলো দরজায়।তমা এসেছে।তিতিরের দেরি হচ্ছে জন্যই বোধহয় চলে এসেছে।
“তুই নিচে অপেক্ষা কর।নামছি আমি পাঁচ মিনিটে।”
তিতির ঈশানের দিকে ফিরে ছুটে গিয়ে ঢুকলো বাথরুমে। শরীর কাপছে তার।এক আকাশ সমান রাগ,অভিমান,ঘৃনা করতে চায় এ লোকটাকে সে।বুক চিড়ে বের হয় দীর্ঘশ্বাস। ওপরে ওপরে এক রুপ রেখে ভিতরে অন্য অনূভুতি লালন করার কষ্ট এখন বুঝতে পারছে না।তিন কবুলে বাধা পরা স্বামী কে ভালোবেসে ফেলেছে সে।কিন্তু কিছুতেই সে তা প্রকাশ করবে না,কিছুতেই না।যে স্বামী বিয়ের প্রথম রাতে অন্য নারী সঙ্গের গল্প করতে পারে সে স্বামীকে আর যাই হোক তার দূর্বলতা সে দেখাবে না।কখনো না।
বাথরুম থেকে সময় নিয়ে তৈরি হয়ে বের হয় তিতির।তার আশা ছিলো ঈশান এতক্ষণে চলে গেছে। দরজা খুলে বিছানার পাশে বুকে আড়াআড়ি হাত ভাজ করে ঈশানকে কঠিন ভাবমূর্তি তে দাড়িয়ে থাকতে দেখতে চিত্ত কাঁপলো তার।এই দৃষ্টি হৃদয় অবধি যায় তার।সরিয়ে নিলো নিজের বেহায়া দৃষ্টি। টেবিল থেকে ফোন আর পার্স নিয়ে দ্রুত বেড়িয়ে যেতে চায়।ঈশান বাধ সাজে এবারেও।দরজার সমানে এসে সটানে দাড়ায়।তিতির চোখমুখ কুচকে ফেলে।ঈশানের মতিগতি বোঝার চেষ্টা করছে সে।গলা কঠিন করলো।চোখে চোখ রাখলো।
“কি সমস্যা পথ আটকাচ্ছেন কেনো?”
“কোথায় যাচ্ছিস?”
তিতির একই রকম ভঙ্গিতে বলে ওঠে,”বাইরে যাচ্ছি দেখতেই পাচ্ছেন।পথ থেকে সরে দাড়ান।দেরি হচ্ছে আমার।”
ঈশান নির্বিকার ভাবে তাকিয়ে থাকে।তবে রাগের ছাপ স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে।গমগমে গলায় বলে,”বাইরে যাচ্ছিস সেটা তো দেখতেই পাচ্ছি।এত সেজেগুজে একা কেথায় যাচ্ছিস এই ভর সন্ধ্যা বেলা?সেটা বল।”
তিতিরের মেজাজ খারাপ হলো।কোথায় সেজেছে সে!লোকটা চোখেও কম দেখে।একপ্রকার উচ্চ গলায় বলে,”আমি আপনাকে কৈফিয়ত দিতে বাধ্য নই।”
ঈশানের মুখ কঠিন হয়। হাতে চেপে ধরে তিতিরের বাহু।ব্যাথায় মেয়েটা কেঁপে ওঠে।
“বাধ্য তুই।অ্যাম ইও্যর হাসবেন্ড। “
অন্য সময় হলে কথাটায় কি খুশি হতো তিতির!কে জানে।আজ হাসি পেলো।বিদ্রুপের হাসি।মুখে ফুটেও উঠলো সে হাসি।
“What a joke দেওয়ান সাহেব!বিয়ের দিন অন্য নারীর সাথে কোয়ালিটি টাইম কাটিয়ে এসে বিয়ের প্রথম রাতে ডিভোর্স চান।আবার স্বামীর অধিকার ফলান।মানে?Isn’t it so lame?”
ঈশানের বুকে আঘাত টা লাগে।তিতিরের কথার আঘাতে ক্ষতবিক্ষত হয় বুকের বা পাশটা।তবে সে কথার জবাব দিতে পারে না সে।উপায় নেই দেওয়ার। বাহু ছেড়ে দেয়।তবে মুখ স্বাভাবিক হয়না।বজ্র কঠিন গলায় বলে,”এ বাড়ির বউ হওয়ার আগে এ বাড়ির মেয়ে ছিলি।সেই হিসেবে কৈফিয়ত চাচ্ছি ধরে নে।”
তিতির শব্দ করে হেসে ফেলে।সব কথাতেই তার হাসি পায় আজকাল।বাঁকা গলায় বললো,”এখন আর মেয়ের সম্পর্ক নেই।যে মূহুর্তে কবুল পরেছি আপনার নামে তখন থেকে আমি এ বাড়ির বউ।আর যে বউকে আপনি মানেন না।তার থেকে কথায় কথায় কৈফিয়ত চাওয়া টা বন্ধ করুন।একটু তো হেজিটেট করুন।যেতে দিন আমাকে।”
তিতির পা বাড়াতে উদ্ধত হলে আবার বাহু চেপে ধরে।চিৎকার করে ওঠে,”ওই রাহাত নামের ছেলেটার সাথে দেখা করতে যাচ্ছিস?”
তিতির অবাক হয়।ঈশানের জানার কথা না।সে আর তমা ছাড়া কথাটা কেউ জানেনা।তমা নিশ্চয় বলেনি।তবে মুখে বলে,”এরই মধ্যে গোয়েন্দাগিরি করা শেষ?হ্যা যাচ্ছি তো?পরকীয়ার বদনাম লাগাবেন?As your wish.I don’t mind at all by the way.যাচ্ছি রাহাত ভাইয়ের সাথে দেখা করতে।তো?”
তিতিরের নির্বিকার গলায় রাগ বাড়ে ঈশানের।মাথা কাজ করছে না।নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না নিজেকে।বাহু চেপে অন্য হাতে চেপে ধরে তিতিরের নরম গাল।নিজের মুখ এগোয়।নিঃশ্বাস ছুযে যাচ্ছে একে অপরের।চোখ বন্ধ করে নেয় তিতির।
“করবি না দেখা।ভুলে যা ওকে।না হলে খুন হবে দু দুটো।একটা তুই আর একটা তোর ওই পাতি প্রেমিক।”
সাঁঝের মায়া পর্ব ২৪
ধাক্কায় পিছিয়ে যায় তিতির।ঈশান জোরে জোরে শ্বাস ফেলছে।অস্বাভাবিক রেগে।তিতির চোখের পানিটুকু হাতের উল্টো পিঠে মোছে।নিজের জেদও দ্বিগুণ হয়।কেনো মানবে সে এই লোকটার কথা।মানবে না।অধিকার ফলানো হচ্ছে এত কষ্ট দিয়ে।এখনো ভুল বুঝে যাচ্ছে।রাহাত ভাই কে তার প্রেমিক বলছে।অথচ বারবার সে বলেছে রাহাত তার প্রেমিক নয়।তবুও একই কথা হাজার বার।সেও মাথা নোয়াবে না।একটা কথাও শুনবে না সে।দু হাতে ধাক্কা মারে ঈশানকে।চিৎকার করে ওঠে,”আপনার স্বপ্নে ঘটবে এসব।যেতে দিন।”
