Home সাঁঝের মায়া সাঁঝের মায়া পর্ব ২৪

সাঁঝের মায়া পর্ব ২৪

সাঁঝের মায়া পর্ব ২৪
দুর এ দিলশাদ্ দুআা

বেলা গড়িয়েছে অনেকক্ষণ। ঈশানের খাওয়াদাওয়া শেষ হয়নি এখনো। অফিসের কিছু ইম্পরট্যান্ট কাগজপত্র চেক করতে হচ্ছে খেতে খেতেই। রিক্তা দেওয়ান বারবার এসে খাবার সময় কাজ না করার তাগাদা দিচ্ছেন। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ মিটিং এ আছেন তার বাপ চাচারা।প্রজেক্ট টা সে হ্যান্ডেল করছিলো।আজকে অফিস না যাওয়ায় সেটার প্রেজেন্টেশনই বুঝিয়ে দিচ্ছেন হোয়াটসঅ্যাপে।
নয়নকে সিড়ি দিয়ে নেমে আসতে দেখে এগিয়ে গেলেন রিক্তা।ছেলের চোখমুখ দেখে আঁতকে উঠলো একপ্রকার। এ কি চোখমুখের অবস্থা। পুরো মুখ শুকনো, ফর্শা মুখখানা কেমন কালচে হয়ে আছে।মাথার চুলগুলো উষ্কখুষ্ক। চোখ লাল হয়ে আছে।চোখের নিচে কালি পরা।আর্তনাদ করে উঠে ছেলের হাত ধরলেন গিয়ে।

“হ্যা রে বাপ।ঘুম হয়নি রাতে?”
মায়ের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলো নয়ন।টেবিলে ঈশানকে দেখে আরেক দফা বুকটা দুমড়েমুচড়ে উঠলো তার।দীর্ঘশ্বাস ফেলে এসে বসলো খাবার টেবিলে।
“গুড মর্নিং ভাই।”
ঈশান মাথা নাড়লো,”মর্নিং।”
রিক্তা ততক্ষণে ছেলের প্লেট এনে সামনে দিয়েছে।খাবার তুলে দিচ্ছেন প্লেটে।
“এতো দিয়ো না।খেয়ে নেই এতটুকু আগে।”
“কি হয়েছে তোর বাপ বলতো।তোরও শরীর খারাপ? হ্যা?”
তোরও শব্দটি শুনে মাথা তুললো নয়ন।
”আর কার শরীর খারাপ? “
রিক্তা দেওয়ান দীর্ঘশ্বাস ফেলে।চোখমুখ মলিন করে জবাব দেয়,
“তিতির এর।এইযে দেখনা কিচ্ছু খেতে পারলো না মেয়েটা।জ্বরও এসেছে।”
নয়ন আৎকে উঠলো।পাশ ফিরে তাকালো।তিতির এর খাবার সব পরে আছে প্লেটে।দু একবার খেয়েছে কি খায়নি।

“কিচ্ছু খায়নি?জ্বর আসে কেমনে?”
নয়নের চোখমুখ কুচকে গেছে।রিক্তা মাথা নাড়লো।
“কি জানি।খেতে পারলো না।”
“বৃষ্টি হচ্ছে মা।বৃষ্টির পানি ওর গায়ে লেগেছে নিশ্চিত। ওর বৃষ্টির পানি সয়না তার ওপর সিজন চেঞ্জ… ভাই?”
কথাগুলো বলেই ঈশান এর দিকে তাকালো নয়ন।নয়নের কনসার্ন এ এরই মধ্যে কাজ থেকে ধ্যান সরে এসেছে ঈশান এর।তার থেকে ভালো তিতির কে নয়ন চেনে।বরাবরই এরকম নয়ন তিতির এর প্রতি।
“হুম?”
“ও বৃষ্টি তে ভিজেছে? “
“জানিনা। “
ভাইয়ের কাটখোট্টা উত্তরে নয়ন কথা বাড়ায় না।নিজেও চেয়ার ছেড়ে উঠে দাড়ায়।
“খাবি না?”
“তিতির কে দেখে আসি।ওষুধ খায়না মনে করিয়ে না দিলে।আর দেখি খেলো না যে,কি খেতে ইচ্ছে করছে।অন্য কিছু এনে দেবো নাকি।”
রিক্তা একনজর তাকালো ঈশান এর দিকে।ঈশান এক হাত খাবার মুখে তুলছে,অন্য হাতে ফোন।মন বোধহয় ফোনেই।ছেলের দিকে দোনোমনা করে তাকালো।

“তুই আগে খেয়ে যা বাপ।তারপর না হয়..”
“কি যে বলো মা।মেয়েটা খায়নি।আমি আগে দেখে আসি।”
নয়ন দাড়ায় না।দ্রুত পা বাড়ায় সিড়ির দিকে।রিক্তা দেওয়ান খাবার গুলো ঢেকে রাখে।ঈশানকে বারবার লক্ষ করছে। ঈশানের মধ্যে কোনো ভাবান্তর দেখা গেলো না।খানিক হাফ ছাড়লেন তিনি।নিজের ছেলেকে সে চেনে।যতই বলুক তিতির কে বোনের নজরে দেখে এটা সে মানে না।পেটে ধরেছে, সে ছেলের মনের কথা বুঝবে না।সেটা হয়?কিন্তু এখন তিতির এর প্রতি এতো যত্ন ছেলেকে সে দেখাতে দেবেনা।ভাইয়ের বউ এখন তিতির তার।তার প্রতি আগের অনূভুতি রেখে যত্ন করা মানায় না।বিষয়টা দৃষ্টি কটু।হোক সেটা কেউ না জানুক।তার ওপর ঈশান যদি কখনো টের পায়,বিষয়টা নিশ্চয়ই ভালো ব্যাপার হবে না।ওদের দাম্পত্য জীবনে অশান্তিও হতে পারে।দরকার হলে ছেলের সাথে আলাদা কথা বলবেন তিনি।
ঈশান ফোন টেবিলে রাখলো।মুখ রাগে লাল হয়ে গেছে।কোনো কারণ নেই যদিও।নয়ন আগে থেকেই তিতির এর প্রতি যত্নশীল। আজ বিয়ে হয়ে গেছে বলে সেটা এক নিমিষে পাল্টে যাবে সেটা কেনো সে আশা করছে।ঈশান নিজের ওপর বিরক্ত হয়।নয়ন ভাই হয় তার।তাকে নিয়ে নিজের বউয়ের সাথে জেলাসি ফিল করা নেহাৎ ছোটলোকি কারবার।কিন্তু তবুও হচ্ছে, না চাইতেও হচ্ছে।

“মণি? “
ঈশানের রুমের সামনে এসে বেশ কয়েকবার ডাক দিলো নয়ন।তিতিরের কেনো সাড়া শব্দ পাওয়া গেলো না।জ্বরে বেশি কাবু হলো নাকি মেয়েটা?করিডর থেকে নিচে তাকিয়ে একবার পরখ করলো ভাইকে। নির্বিকার ভাবে বসে আছে।অফিসের কাজ করার সময় এটা!সে জানেনা তিতিরটার শরীর খারাপ!নাকি ঝামেলা হয়েছে কোনো!নয়ন আবার ডাকলো।দরজা ঠেলে ভিতরে ঢোকা উচিত হবে কি না বুঝতে পারছে না।দরজায় নক করে দাড়িয়ে রইলো বেশ সময় ধরে।
“ভিতরে যা।”
হঠাৎ পিছনে ঈশানের গলা পেয়ে ঘুরে তাকালো নয়ন।
“না ভাই।তুমি গিয়ে দেখো একটু “
ঈশানের মুখে কেমন একট হাসি দেখা গেলো।
“আগে তো পারমিশন নিতিস না “
নয়ন অপ্রস্তুত দৃষ্টি সরালো এদিক সেদিক।
“তোমার ঘরে আমি সবসময় পারমিশন নিয়েই ঢুকতাম কিন্তু। “
ঈশান ঘাড়ে হাত রাখলো নয়নের।গম্ভীর গলায় বললো,
” আমার নয়,তিতির এর কথা বলছি।”
নয়ন হাসলো খানিকটা।মৃদু গলায় বললো,”তখন আলাদা বিষয় ছিলো। এখন তোমরা ম্যারেড।বিবাহিত দম্পতির ঘরে পারমিশন না নিয়ে ঢোকা টা বেয়াদবি। “
“তা ঠিক।আয় ভিতরে আয়।”

ঈশান নয়নের কাধে হাত রেখে ঢুকলো ঘরে।ঘরে কেউ নেই।ঈশান কপাল কুচকায়।মেয়েটা তো ওপরেই আসলো।বাথরুম এর দিকে এগিয়ে গেলো,নেই।বেলকনিতেও নেই।গেলো কোথায়..নয়ন ঠায় দাড়িয়ে আছে দরজার কাছে।পুরো ঘর ফুলে ফুলে ভরা।এখনো কিছুই সরানো হয়নি।যেমন সাজানো হয়েছিলো তেমনই আছে।বুকটা জ্বালা করছে কেমন একটা।দীর্ঘশ্বাস ফেলে দৃষ্টি সরালো সাজানো বিছানা থেকে।বাথরুম এর সামনে একগাদা কাপড়চোপড়ে চোখ পরলো তার।বিছানার চাদর থেকে শুরু করে ঈশানের জামাকাপড়। সফেদ চাদরের এক অংশে রক্তের দাগ।ছ্যাত করে উঠলো নয়নের বুকের বা পাশে।ধারনা করে নিলো যা করার।এক মূহুর্তে মেয়েটার জ্বর হওয়ার কারণ দাড় করিয়ে ফেললো সে।হাহাকারে ভরে উঠলো বুকটা।তার মণি হারিয়ে গেছে তার থেকে,একদম।সারাজীবনের মতো অন্য পুরুষের ছোঁয়া গভীর ভাবে লেগেছে তার শরীরে।স্বামী নাম বৈধ পুরুষে পরিপূর্ণ তার না-হওয়া ভালোবাসা।
দাড়িয়ে থাকতে কষ্ট হচ্ছে তার।ঈশান বলেকনি থেকে ফিরে এলো।নয়ন মাথা নিচু করে দাড়িয়ে।

“ও রুমে নেই।সম্ভবত ওর রুমে গিয়েছে।”
“জ্বী ভাই।আমি যাই তাহলে।”
“,আচ্ছা শোন খালা আসলে রুমে পাঠিয়ে দিস,কিছু জামাকাপড় ধুতেে হবে।”
নয়ন কেনোমতে মাথা নাড়লো।কম্পিত পায়ে বেড়িয়ে এলো ঘর থেকে।অসহ্য যন্ত্রণা হচ্ছে তার।চোখের সামনে এতো বছরের সাধনার নারীর অন্য কারোর হয়ে যাওয়ার জলন্ত প্রমান সে সহ্য করতে পারছে না।দু হাতে মুখ ডললো।জোরে জোরে শ্বাস ফেললো।স্থির করতে চাইলো নিজেকে।এটা হওয়ারই ছিলো,ইনফ্যাক্ট এটাই চিরসত্য এখন।তার মণি আর তার নেই,হবে না। এ জনম, পর জনম সব জনমের জন্য অন্য কারোর।ধীরেসুস্থে এগিয়ে গেলো তিতির এর রুমের দিকে।দরজায় কড়া নাড়তেই ভিতর থেকে মেয়েলি গলা শুনতে পাওয়া গেলো।

“কে?”
“মণি?”
“নয়ন ভাই?আসুন ভিতরে।”
নয়ন ভিতরে ঢোকে।বিছানার হেডবোর্ডে হেলান দেওয়া তিতির।চোখমুখ অস্বাভাবিক লাল।নয়ন দ্রুত পায়ে এগিয়ে যায়।উদ্বিগ্নতা চোখেমুখে।
“কি হয়েছে তোর।মা বলছিলো জ্বর।খেতে পারিস নি।”
“তেমন কিছু না ভাইয়া।সামান্য জ্বর।ওই..”
“আমি জানি।বলতে হবে না।”
তিতির কে থামিয়ে দিলো।বোকা মেয়েটা জ্বরের কারণ ব্যাখ্যা করে লজ্জায় ফেলে দেবে।
“ওষুধ খেয়েছিস?”
তিতির মাথা নাড়ে।
“কি খেতে ইচ্ছে হচ্ছে। নিয়ে আসি।”
তিতির না করতে চায়।পরমুহূর্তেই একগাল হাসে।আবদারের গলায় বলে,”মোগলাই। “
নয়ন হাসে।মাথায় হাত রাখে।”আমি নিয়ে আসবো।রেস্ট কর।কেমন?”

ভর দুপুরবেলা চন্দ্রকাননে হৈ হুল্লোড়। কারণ বাড়ির সকল বিচ্ছুগুলোর ঘুম ভেঙেছে। সারা সকাল ঘুমিয়ে সবাই উঠে একেবারে দুপুরের লাঞ্চ করে এখন এসেছে তিতির এর কাছে।তিতির কে ঈশানের ঘরে না দেখে চোখ কপালে সকলের।তিতির বিছানায় হেলান দেওয়া,চোখ বন্ধ করে আছে।মাথায় যন্ত্রণা করছে,সাথে পেটেও।একে একে ঘরে ঢুকলে সকলে।
নিশি,নূরি এসে আগলে বসলো বোনকে।নিচ থেকে শুনে এসেছে বোনের শরীর খারাপ এর খবর।
নিশি কপালে হাত দিলো।বেশ গরম।
“হ্যা রে হঠাৎ জ্বর বাঁধিয়ে নিলি কিভাবে। “
তমা বাঁকা হাসলো।গড়িয়ে এলো তিতির এর পায়ের কাছে।
“বাচ্চা মেয়েটা।আহারে…সিনিয়র বর সামলানো কি এতই সোজা।আমাদের বড় ভাইয়াটা এতো রাফ বুঝিনি আগে।একেবারে জ্বর আনিয়ে ছাড়লো।”
শব্দ করে হেসে ফেললো সকলে।তিতির মুখ কুচকে ফেললো। মেয়েটার সবসময় বাজে কথা।গম্ভীর গলায় বললো,”বাজে বকিস না।বড় আপুদের সমানে..”
“কি আশ্চর্য, বড় আপু তাই কি?ওদের বিয়ে হয়নি? নাকি কখনো করবে না!বললে সমস্যা কি?”
তিতির ঠোঁট উল্টায়।কাত হয়ে মাথা এলিয়ে দেয় নিশির বুকে।
“কিচ্ছু হয়নি যা ভাবছিস।”

তমা হো হো করে হেস ওঠে।হাত বাড়িয়ে তিতির গলার ওড়নাটা টান মেরে সরিয়ে ফেলে।একে একে ভেসে পঠে কন্ঠদেশ,বুকের ওপরের অংশ এদিকসেদিক ফর্শা বুকে লাল-কালচে বিশেষ দাগ গুলো।
“এগুলো কি তাহলে?বিড়ালের খামচি?বিড়াল টা বড্ড দুষ্টু বল?কি কষ্টই না দিয়েছে।”
তিতির লজ্জা পায়।চোখ রাঙায় তমা কে।তমা হেসেই যাচ্ছে শব্দ করে।অনিমা বাহুতে হালকা চড় মারে তমার।বিছানার কোনায় বসতে বসতে বলে,”উহু।কষ্ট তো বিড়াল টাই পেয়েছে।মাছে মুখ দিয়েছিলো।তবে খেতে পারেনি।”
সবাই বড় বড় চোখ করে তাকায় অনিমার দিকে।নূরি ফট করে বলে বসে,”তুমি কি করে জানলে অনি আপু?”
অনিমা নিঃশব্দ হাসে তিতির এর দিকে তাকিয়ে।

“তিতির ইজ অন হার পিরিয়ড।”
“কিইইিহ্।”
তমা,নিশি,নূরি একসাথে চিৎকার করে উঠেছে। তিতিরকে কানে হাত দিতে হলো।এত চেঁচানোর কি আছে।
নিশি দু হাতে ঝাকালো তিতিরকে।
“সত্যি? “
তিতির কিছু বললো না।
“আমার ভাই টাকে তুই..।আগে বলিস নি কেনো মেয়ে।এতো সুন্দর রাতটা।আহারে।আমার ভাইটা…”
তিনজনের আহাজারি তে অসহায় তাকালো তিতির।সবাই কত আক্ষেপই না করছে বিষয়টা নিয়ে। অথচ তারা তো জানেই না তাদের ভাই বাসর রাতে উপহার হিসেবে তাকে নয় বরং তার থেকে মুক্তি চেয়েছে।তিতির সোজা হয়ে বসে।বিদ্রুপ এর হাসি হাসে খানিকটা।
“বাই দ্যা ওয়ে তুই এই রুমে কেনো?”
নিশির কথায় তিতির মাথা উচোয়..”এ্খন কি নিজের রুমেও থাকতে পারবনা?”
সকলে দুদিকে মাথা নাড়ে।নূরি গাল টানে।
“উহু।এখন আর এটা তোর ঘর নেই।বড় ভাইয়ার রুমই তোর রুম।এই রুম নিষিদ্ধ তোর জন্য। “
“তাহলে তোমাদের বড় ভাইয়া যখন আমাকে মুক্তি দেবে তখন আমি কোথায় যাবো?এ বাড়ি থেকেও মুক্তি বুঝি?”
তিতিরের এহেন কথায় চমকে উঠলো ঘরময় সকলে।তমা সোজা হয়ে উঠে বসলো।অনিমার, নিশি সকলের মুখে ভাজ পরেছে।রাতে নিয়াজ কথা টা কানে বাজলো অনিমার।তখন তো গুরত্ব দেয় নি।এ ধরনেরই কি যেনো বলছিলো নিয়াজ।

“ঈশান কি…”.
“মুক্তি চায় আমার থেকে।ডিভোর্স চায়।”
বাজ পরলো সকলে মাথায় এবার।ভূত দেখার মতো চমকে গেলো সবাই।নিশি আর্তনাদ করে উঠলো,”কি বলছিস কি।”
তিতির হাসলো।হেলান দিলো হেডবোর্ডে।চোখ বুজে শ্বাস টানলো।ছোট করে জানালো রাতে ঈশানের বলা প্রতিটা কথা।চোখমুখ রাগে লাল হয়ে গেছে অনিমার।
“হি ইজ ম্যাড।টোটালি ম্যাড।এসব বাজে বকতে নিষেধ করেছিলাম ওকে আমরা।”
নিশি দুহাতে মুখ ডললো।কাঁদো কাঁদো গলায় বললো,”রুষার কথা তো ভাইয়া এর পর আর বলেইনি।সেই নিষেধ করে দিয়েছিলো ওই মেয়ের কথা না তুলতে।”
তিতির একেএকে সবার মুখের দিকে তাকায়।গলা নামিয়ে বলে,”তোমরা জানতে রুষার কথা?”
মুখ কাচুমাচু করে ওঠে সকলের।সবাই জানতো কমবেশি। তিতির এবার বেশ দৃঢ় গলায় জিজ্ঞেস করে,”জানতে তোমরা?”

মাথা নাড়ে ওরা তিনজন।তমা অবশ্য জানতো না।তিতির দীর্ঘশ্বাস ফেলে।হতাশার প্রকাশ ঘটে বুক চিড়ে।সবাই জানতো ওই মেয়ে সম্পর্কে। তাকে কেনো জানানো হলো না।রাহাত কে সে ভালোবাসতো না।তার পরও তার মনে হয়েছিলো ঈশান কে জানানো দরকার।সে জানিয়েছিলো।অথচ রুষা নামে ওই মেয়েটার সাথে ঈশানের এতো গভীর সম্পর্ক সবাই জানা স্বত্তের তাকে কেনে জানানো হলো না এটা।
“কাল সারাদিন তোমাদের ভাই ওই মেয়ের সাথে একঘরে সময় কাটিয়ে এসেছে এটাও জানতে?”
আবার আরেকদফা বাজ পরলো রুমে।জানতো না।অনিমা এবার তরিঘরি করে বলে উঠলো,”ঈশান এই বাজে কথাটাও বলেছে তোমাকে?এটা সত্য নয় তিতির।”.
তিতির শব্দ করে হেসে ফেলে।স্থির চোখে তাকায় অণিমার দিকে।
“সত্য নয়?”
অনিমা সজোরে মাথা ঝাকায়।”ওটার পিছনে কারণ আছে।তুমি ওকে ভুল বুঝোনা তিতির।ও একদম ওরকম নয়।রুষার সাথে ওর সেরকম কোনো সম্পর্ক নেই।”

“আপু তোমরা আমাকে একা থাকতে দাও একটু।আমার পেটে,মাথায় অসহ্য যন্ত্রণা হচ্ছে। একটু রেস্ট নেই।কথা বলতে ভালো লাগছে না।আর যা বললাম এসব বাড়ির বড়দের জানিয়ো না।কষ্ট পাবে।যা হওয়ার হতে থাক।আমি তো আছিই সব সহ্য করার জন্য, বলির পাঠা বানানোর জন্য তিতির আছে তো।”
তিতির এর কথায় তীব্র অভিমান। ততক্ষণে সে চাদরে মুখ ঢেকে শুয়ে পরেছে।নিশি,নূরি অসহায় কন্ঠে বোনকে ডাকলো বেশ কয়েকবার।তিতির সাড়া দিলো না।চোখ বেয়ে নোনা জল গড়িয়ে পরলো বালিশে।অনিমা চোখের ইশারা করলো সবাইকে বেড়িয়ে আসতে।মেয়েটাকে একা থাকতে দেয়া উচিত কিছুক্ষণ। কতটা মানসিক ট্রমা গেছে গতরাত থেকে ঈশানের ওসব বাজে কথা শোনার পর খুব ভালো করে বুঝতে পারছে সে।

“তোর সমস্যা কি ঈশান?পাগল হয়ে গেছিস তুই?”
ঈশান কোনো প্রতুত্তর করলো না।সে ছাদে ওয়ার্ক আউট করছে।বৃষ্টি নেই এই মূহুর্তে। অনিমার মুখে সবটা শুনে সাজিদ,নিয়াজ,নাইম সবাই এসেছে ঈশানের কাছে।সবাই একেকজন রনচন্ডী রুপে আছে।ঈশানের কাছে তারা সঠিক এক্সপ্লেইনেশান চায়।
“কথা বলছিস না কেনো?”নিয়াজ এগিয়ে গিয়ে ধাক্কা দিলো ঈশান কে। ঈশান বিরক্ত হলো।চ সূচক শব্দ করলো।
“কি সমস্যা তোদের।”
“সমস্যা আমাদের?নাকি তোর?”
“আমার কি সমস্যা হবে.”
ঈশানের ভাবলেশহীন জবাবে সবাই বিরক্ত। সাজিদ,নাইম,অনিমা আপাতত বলছে না কিছু।তবে নিয়াজ বেশ ক্ষেেপে গেছে।

“তোকে কাল কতবার বললাম?আমরা সব সামলে নেবো?সাজিদ সব সামলে নেবে।তার পরও তুই তিতিরকে রুষার কথা বলেছিস?সে অবধি না হয় মানলাম।ডিভোর্স চেয়েছিস?আর ইউ ইনসেন?”
“ভালোবাসি না ওকে আমি।মুক্তি চাইলে সমস্যা কি?”
নিয়াজ ধৈর্য হারায়।দু হাতে নিজের চুল খামচে ধরে।
“উল্টাপাল্টা বকবি না।বাসিস না,পরে বাসবি।অ্যারেন্জ ম্যারেজ হয় না মানুষের?রুষা নামক ভাইরাসকে জড়াতে হবে কেনো এখানে?ওটাকে আমরা সামলে নিতাম না?”
ঈশান জবাব দেয় না।গম্ভীর হয়ে যায়।বন্ধুরা নিজেদের মধ্যে মুখ চাওয়াচাওয়ি করে।
“কাল রাতে বলেছিলি আমি ভেবেছি মজা করছিস।অনি কে বলেছিলামও আমি।ও গুরুত্ব দেয় নাই।এখন দেখছি সত্যিই করেছিস ওই ব্ল্যান্ডার টা তুই।”
“আই হ্যাভ মাই ওউন রিজন।”

ঈশানের গম্ভীর জবাবে দূরে সরে দাড়ায় নিয়াজ।মেজাজ খারাপ হচ্ছে তার।সাজিদ এগিয়ে আসে এবার।হাত রাখে বন্ধুর কাধে।ঈশান মাথা ঘোরায় না।দৃষ্টি সামনে অদূরে সারি সারি ধান খেতের দিকে।
“ নাম্বার টা দে।ট্রেস করতে সময় লাগবে।”
ঈশান চমকে তাকায় বন্ধুর দিক।সাজিদ মাথা নাড়ে।
“আমরা বোকা না।রেগে গেছি তার মানে এই না যে তোকে ভুল বুঝবো।অবশ্যই তোর রিজন আছে।কিন্তু তিতির টা বাচ্চা মেয়ে।ওকে তো অন্য কিছু বলেও দূরের রাখা যেতো তাইনা?”
“আমার কিছু করার ছিলো না।”
“বেশ।নাম্বার টা সেন্ট কর।আমি দেখছি।”
অনিমা এগিয়ে এসে পা ঝুলিয়ে বসলো রেলিং এ।
“মেয়েটা খুব আপসেট ঈশান।ওটা বলা খুব দরকার ছিলো?”
ঈশান দীর্ঘশ্বাস ফেলে,”সি হ্যাভ টু বি স্ট্রং”
“স্ট্রং বানানোর অনেক পদ্ধতি আছে।তুই যেটা করেছিস সেটায় মেয়েটা শেষ অবধি সত্যি আবার তোকে মুক্তি দিয়ে চলে না যায়।”

ঈশান মুখ তুলে চায় অনিমার দিকে।চোখদুটো রক্তিম হয়ে উঠেছে।অনিমা মাথা ঝাকায়।
“মেয়ে মানুষ তো আমি।বিষয়টা বুঝি।তুই বলছিস ওকে ভালোবাসিস না।তারপরও যদি তিতির অন্য কারোর কাছে চলে যায় তোর ভালো লাগবে না। ওকে কেউ ছুয়েছে সেটা ইমাজিনেশন তো দূরে থাক।এটা লিখে নে তুই।সেখানে তুই অন্য মেয়ের সাথে… এটা একটা মেয়ে হয়ে বাসর রাতে ও কিভাবে সহ্য করবে??”
“আমার কিচ্ছু করার ছিলো না।আমি…. ”
“দেখিস।বেশি স্ট্রং করতে গিয়ে পাষান না হয়ে যায় মেয়েটা।প্রথম রাতেই যেটা করেছিস…”
নিয়াজ রাগে গজগজ করছে।ঈশান টা বড্ড একরোখা।সামান্য ভয় পেয়ে পাগলামি করার ছেলে ও না।নিশ্চয়ই বড় কিছু আছে।তারপরও রাগ হচ্ছে। ডিভোর্স এর কথাটা প্রথম রাতেই তুলতে হতো?মেয়েটাকে রীতিমতো টর্চার।

ধরনীর বুকে আধার নেমেছে।সন্ধ্যার রেশ কেটে গিয়ে রাতের ছায়া নেমেছে বেশ খানিক্ষন।দীর্ঘ কয়েক ঘণ্টার আকাশযাত্রার শেষে যখন বিশাল বিমানটা ধীরে ধীরে মেঘের স্তর ভেদ করে নিচে নামতে শুরু করল, তখন জানালার বাইরের প্রকৃতি ধীরে ধীরে দৃশ্যমান হচ্ছে আরকি। দূরে কোথাও নিচে ছড়িয়ে থাকা শহরের আলো ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে উঠছে। নদীর আঁকাবাঁকা রেখা, ছোট ছোট ঘরবাড়ি, রাস্তার সরু আলোর মালা,সব মিলিয়ে একটা পরিচিত ভূখণ্ড ধীরে ধীরে ফিরে আসছিল তার চোখের সামনে।
কতগুলো দিন পর নিজের দেশে ফেরা। তবুও এই ফিরে আসার মধ্যে সেই স্বস্তি নেই, যেটা সাধারণত থাকে। বুকের ভেতর অদ্ভুত একটা ভার জমে আছে।
তার কারণ অবশ্য আছে।পাশেই বসে আছেন তার মা।হুইলচেয়ারের বিশেষ সিটে বসানো হয়েছে তাকে। শরীরের ডান পাশ প্রায় নিস্তেজ, হাতটা শালের উপর স্থির হয়ে পড়ে আছে। মাসখানেক আগে হঠাৎ স্ট্রোকের পর থেকেই জীবনটা যেন অন্য রকম হয়ে গেছে।যে নারী একসময় পুরো সংসারটাকে নিজের হাতে আগলে রাখতেন,সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ব্যস্ত থাকতেন ছেলেমেয়েদের জন্য, সেই মানুষটাই আজ চুপচাপ বসে আছেন। চোখেমুখে একরাশ ক্লান্তির ছাপ।রাহাত একটু ঝুঁকে নরম গলায় বলল,

“মা… আমরা প্রায় পৌঁছে গেছি।”
রাহাতের মা রাণি বেগম ধীরে ধীরে চোখ ঘুরিয়ে তার দিকে তাকালেন। কথা বলতে কষ্ট হয় এখন, শব্দগুলো স্পষ্ট হয় না। মাথা নাড়ালেন হালকা।
বিমানের ভেতর তখন ছোটখাটো ব্যস্ততা শুরু হয়েছে।
এয়ারহোস্টেসের মৃদু কণ্ঠ ভেসে এল,
“প্রিয় যাত্রীরা, আমরা কিছুক্ষণের মধ্যেই অবতরণ করতে যাচ্ছি। অনুগ্রহ করে আপনারা সিটবেল্ট বেঁধে নিন…”
মানুষজন নিজেদের ব্যাগ গোছাতে শুরু করেছে। কেউ ফোন চালু করছে, কেউ জানালা দিয়ে ছবি তুলছে। দীর্ঘ ভ্রমণের শেষে সবার মাঝেই যেন ঘরে ফেরার উচ্ছ্বাস।
কিন্তু রাহাতের মন যেন অন্য কোথাও আটকে আছে।

তার সমস্ত মনোযোগ এখন মায়ের দিকে।তার ওপর তিতিরের সাথে যোগাযোগ করতে পারেনি আজ এতগুলো দিন।বুকের ভিতরটায় দলা পাকিয়ে আছে।ওই মুখটা দেখে না আজ কতগুলো দিন।
বিমানটা ধীরে ধীরে রানওয়েতে ছুঁয়ে নামল। চাকার সঙ্গে মাটির ঘর্ষণে একটা ভারী শব্দ হলো, তারপর ধীরে ধীরে গতি কমে এল। জানালার বাইরে বিশাল এয়ারপোর্টের রানওয়ে, সারি সারি আলো, দূরে দাঁড়িয়ে থাকা অন্য বিমানগুলো,সব যেন চোখের সামনে স্পষ্ট হয়ে উঠল।কিছুক্ষণ পর দরজা খোলা হলো।প্রথমে সাধারণ যাত্রীরা নামতে লাগল। তারপর বিমানকর্মীরা বিশেষভাবে এসে রাহাতের মাকে হুইলচেয়ারে বসিয়ে নামানোর ব্যবস্থা করল।
রাহাত খুব সতর্কভাবে মায়ের পাশে দাঁড়িয়ে রইল। যেন সামান্য অসাবধানতাতেও তাকে কষ্ট না হয়।
বিমানের সরু দরজা পেরিয়ে বাইরে বেরোতেই হালকা গরম আর আর্দ্র বাতাস মুখে এসে লাগল। বিদেশের ঠাণ্ডা, শুষ্ক আবহাওয়ার পর এই উষ্ণ বাতাসটা অদ্ভুতভাবে পরিচিত মনে হলো।টার্মিনালের ভেতরে ঢুকতেই চারপাশের ব্যস্ততা যেন আরও স্পষ্ট হয়ে উঠল।বড় বড় কাঁচের দেয়াল দিয়ে আলো ঢুকছে, মেঝেতে ঝকঝকে প্রতিফলন তৈরি করছে। ট্রলি ঠেলার শব্দ, মানুষের কথাবার্তা, সব মিলিয়ে একটা জীবন্ত পরিবেশ চারিপাশে।
ঘোষণার মাইকে মাঝেমাঝে ভেসে আসছে বিভিন্ন ফ্লাইটের নাম।

“Attention please… Flight arrival…”
মানুষের ভিড়ের মাঝখান দিয়ে ধীরে ধীরে এগোতে লাগল রাহাত। এক হাতে হুইলচেয়ারের হাতল শক্ত করে ধরে আছে, অন্য হাতে নিজের ছোট ব্যাগটা।
তার চোখ বারবার মায়ের মুখের দিকে চলে যাচ্ছে।
মায়ের চুলে সাদা রং আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। চোখের নিচে ক্লান্তির ছাপ।
হঠাৎ করেই তার মনে পড়ল ছোটবেলার একটা দৃশ্য।
স্কুলে যাওয়ার সময় মা প্রতিদিন দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকতেন। ব্যাগটা ঠিক করে দিতেন, কখনো চুলে হাত বুলিয়ে দিতেন।আজ যেন সময় উল্টো হয়ে গেছে।আজ সে-ই মায়ের পাশে দাঁড়িয়ে আছে,রক্ষকের মতো।হঠাৎ খেয়াল করলো চোখ জ্বালা করছে তার।বাবা মারা গেছে সে যখন খুব ছোট। তারা ভাইবোনেরা বাবা কে তেমন একটা পায়নি বলতে গেলে।মা ই তাদের আগলে মানুষ করেছে,তার মামা রা কত জোর করেছে মাকে অন্য জায়গায় বিয়ে দিতে।কত বলেছে গোটা জীবন পরে রয়েছে বাচ্চাদের তারা মানুষ করবে।কিন্তু তার মা রাজি হয়নি।ছেলেমেয়ে গুলো কে আকড়ে।গোটা একটা জীবন পাড়ি দিলো।

ইমিগ্রেশনের লাইনে তাদের আলাদা ব্যবস্থা করা হয়েছে।একজন কর্মী তাদের এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য আসতেই রাহাত মাথা নেড়ে ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল।মাঝে মাঝে মানুষজন একটু থেমে তাকাচ্ছে,হয়তো হুইলচেয়ারে বসা ক্লান্ত নারীটাকে দেখে, অথবা ছেলেটার নীরব যত্ন দেখে।
সব প্রক্রিয়া শেষ হতে বেশ কিছুটা সময় লাগল।
তারপর তারা পৌঁছাল আগমনী লাউঞ্জের সামনে।
সামনের বিশাল কাঁচের দেয়ালের ওপাশে দেখা গেল অপেক্ষমাণ মানুষের ঢল।কেউ ফুল হাতে দাঁড়িয়ে আছে, কেউ অধীর হয়ে ফোনে কথা বলছে, কেউ আবার উত্তেজনায় বারবার ভিড়ের দিকে তাকাচ্ছে।
কেউ হয়তো প্রিয় মানুষকে অনেকদিন পর দেখতে যাচ্ছে।কেউ হয়তো নতুন কোনো জীবনের শুরু করতে এসেছে।এই কোলাহলের মাঝেও রাহাতের চারপাশটা যেন অদ্ভুতভাবে নীরব লাগলো,তাদের জন্য কেউ দাড়িয়ে নেই।কে থাকবে!কে আছে তাদের।দীর্ঘশ্বাস ফেলেএকটু নিচু হয়ে মায়ের কানে বলল,

“মা… আমরা দেশে ফিরে এসেছি।”
মায়ের চোখজোড়া কেমন চিকচিক করছে।খুশিতে ঝলমলে হয়ে গেছে।ঠোঁটের কোণে খুব সামান্য একটা হাসি ফুটতে সেই হাসিটা দেখেই রাহাতের বুকের ভেতর হঠাৎ একটা শক্ত অনুভূতি জেগে উঠল।বিদেশের বড় বড় হাসপাতাল, নামী ডাক্তার,সব জায়গায় ঘুরেছে তারা। ডাক্তাররা বলেছে সময় লাগবে। ধৈর্য লাগবে।
হয়তো পুরোপুরি সুস্থ হতে অনেক সময় লাগবে।
সে অবশ্য ভাবতেই পারেনি তার মাকে জীবিত ফেরত আনতে পারবে।ডাক্তার রা অবধি আশা ছেড়ে দিয়েছিলো।সৃষ্টিকর্তার অশেষ রহমতে..
সে হুইলচেয়ারের হাতলে হাতটা একটু শক্ত করে ধরল।তারপর ধীরে ধীরে কাঁচের বিশাল দরজার দিকে এগোল।
একপাশে সাইট করলো হুইলচেয়ার।এগিয়ে এলো মায়ের সামনে।রাহাতের মা রানি বেগম খানিক জিজ্ঞাসু চোখে তাকালেন ছেলের দিকে।এখানে থামার কারণ জানতে চাইলো হয়তো।রাহাত হাটু ভেঙে বসলো মায়ের সামনে।মৃদু হেসে বললো,”তোমার বউমাকে খবর দেই আমরা ফিরেছি।তোমার চক্করে তাকে তো ভাসিয়ে দিয়েছিলাম।সে বোধহয় চিন্তায় অস্থির।”

রাণি বেগম হাসে।ছেলের অস্থিরতা দেখেছে সে।মেয়েটাকে যে বড্ড ভালোবাসে।
দূরে গাড়ির হর্ন শোনা যাচ্ছে।ট্যাক্সির সারি দাঁড়িয়ে আছে।মানুষজন ব্যস্ত পায়ে ছুটে যাচ্ছে।
রাহাত একবার আকাশের দিকে তাকাল।আকাশ দারুণ মেঘলা।বৃষ্টি নামলো বলে।পকেট থেকে ফোন বের করে কাঙ্ক্ষিত নাম্বার টাতে ডায়াল করলো।
দু বার রিং হয়ে কেটে গেলো ফোন।রাহাত চোখমুখ কুচকে তৃতীয় বার কল করলো।এবার অবশ্য ফোন রিসিভ হলো।তিতির ঘুমাচ্ছিলো।জ্বর এখন খানিকটা বেরেছে।পিরিয়ড এর সময় এমনিতেও সে ব্যাথায় বিছানা ছেড়ে উঠতে পারে না,ব্যাথায় জ্বর এসে যায়,তার ওপর বৃষ্টি তে সারারাত ভিজেছে,এতো মানসিক চাপ।শরীরটা একদম দূর্বল হয়ে আছে।আধো অন্ধকার রুম।একটি মাত্র নীল ড্রিম লাইট জ্বেলে রাখা।কোম্বলে নাখ অবধি ঢেকে রাখা মেয়েটার।
বালিশের পাশ থেকে হাতড়ে ফোনটা হাতে নিলে।সরু চোখে তাকালো।আননোন নাম্বার।ফেন টা কানে ঠেকালো।
“হ্যালো,কে বলছেন?”
কতদিন পর সেই কণ্ঠস্বর শুনলো সে।রাহাত এর মুখে প্রশান্তি ছেয়ে গেলো।আবেশে চোখ বুজে ফেললো।ধীর গলায় ডাকলো,”পরী?”
চিরচেনা সেই কণ্ঠস্বর। এই নামে তাকে কে ডাকে সে খুব ভালো করে জানে।বুকের ভিতর টা ছ্যাত করে উঠলো।চমকে ফোনের স্ক্রিনে তাকালো।ফেন কানে ঠেকিয়ে বিষ্ময়গলায় বললে,”রাহাত ভাই?রাহাত ভাই…আপনি?কোথায় ছিলেন এতদিন?”

রাহাত এর বুক জ্বালা করছে।কতগুলো দিন এই কন্ঠ। শোনার জন্য অস্থির হয়ে ছিলো সে।পাগলের মতো সময় গুনেছে।মেয়েটার উদ্বিগ্ন কন্ঠস্বরে বুকটা ছটফট করছে একনজর চোখের দেখা দেখতে।মেয়েটার কন্ঠে চিন্তার ছাপ স্পষ্ট। রাহাত নরম গলায় বললে,
“সরি পরী।খুব সরি।আমাকে অনেক খুঁজেছো না?চিন্তা করেেছো?”
“আপনাকে আমি অসংখ্য বার কল করেছি।কতবার তার হিসেব নেই।সকাল,বিকেল..আপনাকে পাইনি।”
“আমি এখানে এসে ফোন টা হারিয়ে ফেলি।ওইসময় মায়ের অবস্থাও খুব খারাপ ছিলো।মা কে নিয়ে এতো বাজে অবস্থায় ছিলাম যে তোমার সাথে যোগাযোগ করতে পারছিলাম না।একা সবদিক সামলাতে হতো।দেশে ফেরা মাত্র তোমাকে কল করেছি।এখনো এয়ারপোর্টেই দাড়িয়ে আমি।”
রাহাতের উত্তেজিত কণ্ঠস্বর স্থির হয়ে শুনলো তিতির।লোকটার গলা দিয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ পাচ্ছে।এতদিন পর তার সাথে কথা বলতে পারার উচ্ছ্বাস। তাকে কৈফিয়ত দিতে পারার উচ্ছ্বাস। বুকে চিড়ে দীর্ঘশ্বাস বেড়িয়ে এলো তার।ধীর গলায় বললো,”আন্টি কেমন আছে এখন?”

রাহাত স্থির রইলো।এক নজর দেখলো মায়ের দিকে।মলিন হলো চেহারা।“মা প্যারালাইজড্।”
খানিক দম নিলো।তিতির শান্তনা সূচক কিছু বলার আগেই আবার উত্তেজিত কন্ঠ শুনতে পাওয়া গেলো রাহাতের।
“মা তোমাকো আমার বউ করে আনার জন্য ছটফট করছে।বারবার বলছে মৃত্যুর আগে একবার তোমাকে…
তিতিরের বুকের ভিতর কেউ হয়তো ছুড়ি দিয়ে আঘাত করলো।থামিয়ে দিতে গেলো রাহাত কে
,”রাহাত ভাই আমার আপনার সাথে… “
রাহাত বোধহয় খেয়ালই করলো না তিতির কি বলতে চাইলো।
“কালই আমরা যাবো তোমার বাড়িতে তোমার হাত চাইতে।মা তো অস্থির হয়ে গেছে। শরীরটা খুব খারাপ।শেষ ইচ্ছেটা দ্রুত পূরন করে দিতে চাই আমি মায়ের।তোমাকে বউ করে এনে মা কে একবার শেষ দেখা দেখিয়ে দিতে চাই।না হলে মা মরে গেলেও শান্তি পাবে না।তার খুব শখ তোমাকে বউ করে আনার।”
তিতির এর অস্থিরতা বাড়ছে।রাহাতকে সত্যি টা না জানালে বড্ড দেরি হয়ে যাবে।কাল যদি রাহাত ভাই বাড়িতে আসে একটা কেলেঙ্কারি ঘটবে।চন্দ্রা দেওয়ান নিশ্চয়ই অপরাধবোধে ভুগবেন।তাছাড়া রাহাত ভাইও কেমন রিঅ্যাক্ট করবে।তিতির অধৈর্য গলায় বলে,”আমার কথাটা শুনুন..”
ফোনে বেশ শব্দ হচ্ছে এখন।এয়ারপোর্টের এদিকটায় আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নেমে পরেছে।সম্ভবত নেটওয়ার্ক ও পাচ্ছে না।রাহাত অসহ্য শব্দে কান থেকে ফোন বেশ খানিকটা সরিয়ে ফেললো। তিতিরের কথা কিচ্ছু শোনা যাচ্ছে না।চেচিয়ে বললো,”

নেটওয়ার্ক সমস্যা করছে তিতির।শুনতে পাচ্ছি না।হ্যালো?পরী?শুনছো?”
তিতির অবশ্য শুনতে পাচ্ছে।রাহাত আরও কিছু বলার আগে সে তার কথা দ্রুত শেষ করতে চাইলো।
“আমি কথা রাখতে পারিনি রাহাত ভাই।আমার বিয়ে হয়ে গেছে।আমাকে ক্ষমা…
একটা কথাও শুনতে পেলো না রাহাত।বৃষ্টির শব্দে কিচ্ছু শোনা যাচ্ছে না।তার ওপর নেট প্রবলেম তো আছেই।এক হাতে হুইলচেয়ার পিছিয়ে নিলো খানিকটা।বৃষ্টির ঝাপটা আসছে।
ফোন জোরে কানে চেপে ধরলো।উচ্চগলায় বললো,”পরী কিচ্ছু শুনতে পাচ্ছি না।বৃষ্টি নামছে আবার।অনেক রাত হয়েছে।ঘুমাও কেমন?আর একদম কাল তোমার বাসায় দেখা হচ্ছে। রাখি কেমন?ভালোবাসি পরী…
তিতির কিচ্ছু বলতে পারলো না গুছিয়ে। যা বলেছে রাহাত তার এক বর্ণও যে শুনতে পায়নি তা সে খুব ভলো করে বুঝতে পারলো।কি করবে এখন সে!রাহাত কাল বাড়িতে যদি আসে!অস্থির হাতে ফোন লাগালো তমার নাম্বারে।ঘড়ি দেখলো।রাত হয়েছে বেশ।পোনে এগারো টা।এখন তমা কে আসতে বলাও কেমন দেখায়।তমা ফোন ধরলো সাথে সাথেই।তিতির কখনো তাকে কল করে না,যা কথা হয় মেসেজেই।হঠাৎ ফোনে সেও ভড়কে গিয়েছে।

“ঠিক আছিস?জ্বর কমেছে?”
“আসতে পারবি একবার?”
“এখন?”
“হুম আরজেন্ট।”
“তুই এগিয়ে মেইন দরজায় দারা।ভয় লাগে আমার।আসছি।”
“দারা নয়ন ভাইকে পাঠাই।অপেক্ষা কর।”
“এটাই চাচ্ছিলাম। “
তিতির হেসে ফেলে।সে জানতো তমা এটাই চাচ্ছে।পাশাপাশি বাড়ি।এই গেট পার হয়ে আসতে তমা মোটেই ভয় পায় না।এর আগেও বহুবার এসেছে।বিছানা ছেড়ে উঠে দাড়ালো তিতির।ঘর থেকে বেড়িয়ে সোজা এগিয়ে গেলো নয়নের রুমের দিকে।

ঈশান সবেই বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিয়ে ঘরে এসে ফ্রেশ হয়ে বেড়িয়েছে।রাতে হট শাওয়ার না নিলে তার ঘুম হয়না।দরজা টা খোলা।রুমটা তার পরিষ্কার করা হয়েছে। তিতির রুমে আসেনি।ঈশান দীর্ঘশ্বাস ফেলে।হাত বাড়িয়ে টি শার্ট নিতেই চোখ খুড়িয়ে খুড়িয়ে চলা তিতির এর দিকে।কপাল কুচকে ফেলে।ওদিক নয়নের রুম।দ্রুত টি শার্ট টা গায়ে জড়িয়ে, ট্রাউজার খানা পরে নেয়।দরজার কাছে যেতেই শব্দ পায় তিতির আর নয়নের কথোপকথনের।
“একটু এগিয়ে নিয়ে আসবেন তমাকে?”
“এতো রাতে?”
“আমার একা থাকতে ভয় করছে।ওকে আসতে বলেছি তাই।”
“নিশি,নূরিকে ডেকে দেই?”
“নাহ আপুরা ঘুমিয়েছে।তমাকেই দরকার।”
“ঘরে যা।আমি নিয়ে আসি গিয়ে।”

তিতির মাথা নাড়ে।নয়ন দ্রুত পায়ে নেমে যায় নিচে।তিতির ঘুরতেই সামনে পরে ঈশানের।গায়ে কালো টিশার্ট, সাদা ট্রাউজার। বুকে আড়াআড়ি হাত ভাজ করে দরজায় ঠেস দিয়ে দাড়ানো।চুলগুলো ভেজা।টপটপ করে পানি পরছে।শাওয়ার নিয়েছে নিশ্চয়। স্থির,তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তারই দিকে।তিতির নিজের বুকের ভিতর কম্পন অনূভব করলো।কাঁপা কাঁপা পায়ে পাশ কাটিয়ে চলে যেতে গিয়ে গম্ভীর কন্ঠের ডাকে থামতে হলো তাকে।
,”ঘরে আয়।”
“ঘরেই তো যাচ্ছি।”
“পরিবার ধরেবেধে বিয়ে করিয়েছে আলাদা ঘরে থাকতে?”
তিতির পিছন ফিরলো না।ঠায় দাড়িয়ে রইলো।
“জানছে কে?সবাই ঘুমাচ্ছে।কেউ না জানলেই তো হলো।”
“পাকনামি করবি না।সকালে দেখে ফেললে কি করবি?”

“আমি সকালে জলদি উঠি।তাছাড়া অতো সকালে কেউ ওপরে আসে না।দেখার চান্স নেই।”
তিতির দ্রুত পায়ে এগিয়ে যায় নিজের কামড়ার দিকে।ঈশান বিরক্ত হয় তিতিরের একের পর এক যুক্তিতে।রাগ উঠে যাচ্ছে।ঝটপট শক্ত করে চেপে ধরে হাতে।হেচকা টানে নিজের দিকে আনে।
“সমস্যা কি আপনার।যখন তখন গায়ের জোর দেখান।সীমায় থাকতে বলেছি আপনাকে আমি।”
সরু চোখে মাথা নিচু করে তিতির এর মুখপানে তাকিয়ে রয় ঈশান।শরীরটা বেশ গরম এখনো।একদিনের জ্বরেই মুখের দিকে তাকানো যাচ্ছে না।ফর্শা মুখটা রক্তিম হয়ে আছে।
“ফালতু কথা না বলে ঘরে আয়।”
তিতির রীতিমতো হাত ছাড়ানোর জন্য ছটফট করছে।ঈশান উল্টো শক্ত করে চেপে আছে।
“তমা আসছে।আমার রুমেই শোবো আমি।আমি দায়িত্ব নিলাম কেউ জানবে না আমরা আলাদা ঘুমাই।ছাড়ুন এবার।”
সিড়িতে হঠাৎ পায়ের আওয়াজে তিতিরকে টেনে হুড়মুড়িয়ে নিজের ঘরে ঢুকলো ঈশান।রিক্তা দেওয়ান নয়নের খাবার নিয়ে ওপরে আসছেন।

এদিকে দুজন লেপটে দাড়িয়ে আছে দেয়ালের সাথে। ঈশানের দু হাতে তিতির এর মাথার দুপাশে। তিতির কাচুমাচু করে দাড়ানো।বুকটা ধুকপুক করছে।চোখ রাঙালো ঈশানকে।
“সরুন বলছি।”
ঈশান সরলো না।”তমা কে আসতে বলেছিস কেনো?”
“দরকার আছে।”
“কে কল করেছিলো তখন?”
তিতির বড় বড় চোখে চায়।অবাক হয়।
“আপনাকে কে বললো।”
“কে করেছিলো সেটা বল।”
“,বলবো না।”
“থাপ্পড় খাবি।”

দু হাতে সরিয়ে দিতে চাইলো ঈশানকে।কঠিন গলায় বললো,”বলেছিলাম আমাকে দুর্বল না ভাবতে।যা বলবেন,যা করবেন মুখ বুজে মেনে নেওয়ার মতে দূর্বল আমি নই।সরুন।”
“তিতির..।”
“চেঁচাবেন না।আমাকে আমার মতো চলতে দেবেন বলেছিলেন।এক বেলায় ভুলে বসে আছেন।শুনেছিলাম ভদ্র লোকের এককথা।দেওয়ান সাহেবের ক্ষেত্রে সেই কথাটা তো বেশি ফলা উচিত। অথচ আপনি তো দেখছি বেলায় বেলায় রঙ বদলান।”
ঈশানের চোখমুখ রক্তলাল হয়ে গেছে রাগে।মেয়েটার মুখে লাগাম নেই।যা খুশি বলতে থাকে।এক হাতে শক্ত করে চেপে ধরলো গাল।
“তোকে আমি…”
“ঈশান?”

সাঁঝের মায়া পর্ব ২৩

দরজায় রিক্তা দেওয়ান এর গলা পেয়ে ঝট করে ছেড়ে দিলো তিতির কে।ছলছল চোখ ঘুরে দ্রুত হাতে মুছলো মেয়েটা।ঈশান গলা উচুলো,মেজো মা?এসো।”
হাতে কফির ফ্লাক্স নিয়ে দরজার সমানে এসে দাড়ালো সে।বাড়িয়ে ধরলো ঈশানের দিকে।
“এটা রাখ।তিতির কে দিস।মেয়েটার প্রচন্ড গলা ব্যাথা।এটা খেলে আরাম লাগবে। “
ঈশান মৃদু হেসে হাত বাড়িয়ে হাতে নেয়।রিক্তা চলে যেতেই দ্রুত পায়ে পাশ কাটিয়ে বেড়িয়ে যায় তিতির।

সাঁঝের মায়া পর্ব ২৪ (২)