সাঁঝের মায়া পর্ব ২৩
দুর এ দিলশাদ্ দুআা
আজকের সকাল টা অন্যরকম বললে ভুল বলা হবে।রোদের ছিটেফোঁটা দেখতে পাওয়া যাচ্ছে না প্রকৃতিতে ।গত রাতের ঝড়ের রেশ রয়ে গেছে এখনো।ভোর রাতের দিকে ঝড় থামলেও মুষুলধারের টানা বৃষ্টি মোটেই কমেনি।এখন যদিও সাময়িক বন্ধ রয়েছে। তবে আকাশ জুড়ে ঘন কালো মেঘের ঘনঘটা,আবহাওয়া অস্বাভাবিক শীতল।এই ভরা বসন্তে এমন বর্ষার মতো আবহাওয়া অনেকটা অবাক করারই মতো।
বেলা গড়িয়েছে অনেকটা।চন্দ্রকাননের সিনিয়র মেম্বার দের সবার ঘুম বরাবরই সকাল সকালই ভাঙ্গে। ঘড়িতে সময় সকাল আটটা।বাড়ির একটা ছেলেমেয়েও এখনো ওঠেনি।বড়রাও ডাকাডাকি করেনি।তারা যে সবাই হৈ হুল্লোড় করে ঘুমিয়েছেে শেষ রাতের দিকে তা তারা বোঝেন।আর ঈশান তিতির কে ডাকাডাকির তো কোনো মানেই হয়না।
আজকে চন্দ্রা দেওয়ান বেশ খুশি মনে রয়েছে,বুকের ওপর থেকে বড় একটা পাথর সরে গেছে কি না।রাহেলা শাশুড়ী কে চা দিয়ে এসেছেন।জা দের নিয়ে আপাতত রান্নাঘরে ব্যাস্ত সময় পার করছেন। একটু পর আবার ছোট জা কে নিয়ে একটু বের হবেন।তিতিরের জন্য কিছু কেনাকাটা করবেন আরকি।তিতিরকেই সাথে নিতে চাচ্ছিলো কিন্তু সাতপাচ ভেবে তারা দুজনই যাবে বলে ঠিক করেছে।রাইসুল দেওয়ান দু ভাই সমেত ড্রয়িং রুমে বসা।আজকে কেউই বাগানে বসতে পারেননি বৃষ্টির জন্য। সংবাদপত্র এসেছে সবেই,সেটাই খুঁটিয়ে খুটিয়ে দেখেছন,সামনে টেলিভিশন এ দেশের খবর চলছে।নাস্তা করে বের হবেন তিন ভাই।গত দুদিন অফিস যেতে পারেননি বিয়ের ঝামেলায়।কাজ জমে গিয়েছে,আজ না গেলেই নয়।ঈশান,নয়নকে অবশ্য আজ যেতে বারণ করবে।বিয়ে টা যেভাবেই হোক বিয়েবাড়িই তো।বন্ধুরা সবাই আছে,ওরাও থাকুক কয়েকদিন বাড়িতেই। আনন্দ মজা করুক।তাছাড়া হুট করে বিয়ে দিয়ে দিলো দুজনকে জানা-শোনার, মানিয়ে নেওয়ার জন্য খানিকটা সময় তো দিতেই হবে।
“রুষা?রুষা…?”
এ দিয়ে বেশ কয়েকবার এই নাম ধরে ডাক পরেছে।এই নামের মানুষটি সাড়া দিলো না একবারও।।কড়া ঘুমের ওষুধের ডোজে বেঘোরে ঘুমাচ্ছে মেয়েটা।কি মায়াবিই না দেখতে লাগছে মেয়েটাকে।আলতো হাতে গায়ে চাদর দিয়ে ঢেকে দিলো ছায়ামানব টি। ঘুরে তাকালো সামনে দাড়িয়ে থাকা ডাক্তার এর দিকে।গম্ভীর গলায় জিজ্ঞেস করলো,”কতক্ষণে জ্ঞান ফিরবে?”
কাচুমাচু মুখ করে দাড়িয়ে থাকা ডাক্তার সাহেব খানিক নড়েচড়ে উঠলেন। শুকনো ঢোক গিললেন।
কাঁপা গলায় বললেন,”স্যার ডোজ টা পাওয়ারফুল।সম্ভবত আজকের দিনে ফিরবে না।মানে ৪৮ ঘন্টার…”
“কোনো সমস্যা হবে না তো?”
“জ্বী না স্যার,নরমাল ঘুমের ওষুধ। একটু ওভারডোজ দেয়া।তাই এরকম হচ্ছে। ঘুম ভাঙ্গলে তবুও এ ওষুধ গুলো খায়িয়ে দেবেন কষ্ট করে।ঝিমুনি, মাথা ঘোরা এ সব ভাব কেটে যাবে।”
ছায়ামানব এর গম্ভীর মুখ আরও গম্ভীর হলো।পাশে দাড়িয়ে থাকা পাতলা মতো কালো করে একটা ছেলে ডাক্তার এর হাত থেকে প্রেসক্রিপশন টা হাতে নিলেন।ছায়ামানব ডাক্তারের দিলে তাকালেন ভ্রু কুচকে।স্বভাবসুলভ ভাড়ি গলায় বললেন,
“আপনি এখন আসতে পারেন।”
“জ্বী স্যার।কোনো সমস্যা হলে সাথে সাথে ডাকবেন আমাকে।আসসালামু আলাইকুম। “
“আসুন আমার সাথে। “ পাতলা মতো ছেলেটা দরজার দিকে ইশারা করতেই তার পিছু পিছু বের হলো ডাক্তার। এখান থেকে পালিয়ে যেতে পারলে যেনো বাঁচে সে।ভয় চেপে রেখে নেহাৎ দৌড় লাগাতে পারছে না।না হলে সেই কখন পালাতো।জানের পরেয়া টা করতে হবে তো নাকি…
ডাক্তার বেড়িয়ে যেতেই দরজা আটকে এসে বসলো লোকটি।রুষার বিছানার পাশেই চেয়ার টেনে।অনিমেষ তাকিয়ে রইলো ঘুমন্ত মুখটার দিকে।মেয়েটার কি কষ্ট হচ্ছে! নাকি ঘুম থেকে উঠে স্বাভাবিক থাকবে!
দু হাতে মুখ ডলে সে।চোখের সামনে ভেসে ওটে সিনেমার খন্ডচিত্রের মতো হাজার একটা দৃশ্য। একে একে সামনে আসতে থাকে সেগুলো।ঘটনা গুলো বরাবরই তার জন্য যন্ত্রণাদায়ক।ভুলে থাকার চেষ্টাায় ডুবে থাকে সে।কিন্তু কাল রাতে যখন হোটেল রুমে রুষা কে জ্ঞানহারা অবস্থায় পায় পুরানো ক্ষত আবার নতুন করে জেগে উঠেছে যেনো।হারিয়ে ফেলার ভয়,আবার ঘরটা শূন্য হয়ে যাওয়ার ভয়।চোখে আসা টলটলে পানিটুকু হাতের উল্টোপিঠে মুছে নিলো সে।দূর্বল হলে চলবে না,আর না তো রুষা কে দূর্বল হতে দেয়া যাবে…সব কিছুর হিসেব নেবে সে।সবকিছুর…
ঘরময় আধো আধো অন্ধকার। প্রকৃতিতে আলোর ছিটেফোঁটা না থাকায় রুমের পর্দা টেনে রাখায় ঘরটা বেশ আধারেই ছেয়ে আছে এখনো।ফেইরি লাইটের আলো গুলোও নেভানো।ঘরভর্তি রঙবেরঙের মোমগুলো নিভে গেছে বেশ আগেই।তবে ফুলের গন্ধ ম ম করছে চারিদিক। সফেদ বিছানার ওপরে বেঘোরে ঘুমাচ্ছে দু দুটো মানব মানবি।গত রাতে দুজনের ওপরই একপ্রকার ঝড় গিয়েছে।মানসিক ঝড় বলা চলে।তিতির এর ঘুম বেশ পাতলা হয়ে এসেছে।তার বেলা করে ঘুমানোর অভ্যাস নেই।তবে গত রাতে জ্বরের রেশ কাটেনি মেয়েটার।জ্বর এ কাবু করে ফেলেছে একদম,ঠান্ডার কড়া ওষুধে ঘুম কাটেনি চোখ থেকে এখনো।আধে আধো ঘুমে নড়েচড়ে উঠতেই কোমড়ের দিকে কেমন একটা ভারি অনুভব করলো সে।আষ্টেপৃষ্টে চেপে ধরে আছে যেনো কেউ।চোখ বন্ধ অবস্থাতেও দু চোখের মধ্যে সরু ভাজ পরলো।নড়েচড়ে সরাতে চাইলো জিনিসটাকে।তবে সরলো না।বরং আরও গভীর ভাবে চেপে ধরলো যেনো।ঈশান দু হাতে তিতিরের কোমড় আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে পেটের ওপর মুখ গুজে উদাম শরীরে বিছানায় আড়াআড়ি ভাবে শুয়ে আছে।তিতির নড়েচড়ে ওঠায় তারও ঘুমে ব্যাঘাম ঘটলো খানিকটা।ঘুমের ঘোরে বিরক্ত প্রকাশ করলো,ভ্রু জোড়ার মাঝে সরু ভাজ পরলো।ঘুমের ঘোরেই নড়াচড়া করার জন্য ধমকাতে চাইলো।
“উমমমম্।ডোন্ট মুভ..”
হঠাৎ পুরুষমানুষ এর এমন ভারি ঘুমন্ত গলার আওয়াজে নিমিষেই ঘুম ছুটে গেলো তিতিরের।বন্ধ চোখ ফট করে খুলে গেলো।মাথা উঁচু করে দেখতেই হতভম্ব হয়ে গেলো।তার নগ্ন পেটে মুখ গুজে ঘুমাচ্ছে ঈশান।চোখ বড় বড় হয়ে গেলো তার।ঈশানের প্রশ্যস্ত জিম করা পেটানো শরীর পুরো উন্মুক্ত। উপুড় হয়ে কোমড় পেচিয়ে শোয়ায় পিঠ জুড়ে পেশিগুলো প্রজাপতির মতো হয়ে আছে।কোমড়ে কালো ট্রাউজার খানা অবহেলায় জড়িয়ে আছে মনে হচ্ছে।
দু’হাতে ঈশান কে সরিয়ে উঠে বসতে চাইলো,তবে শক্তপোক্ত বাধন থেকে নিজেকে সরাতে পারলো না,বরং ঈশানকে বিরক্ত করার অপরাধে ঈশান আরও গভীর ভাবে মুখ গুজলো তুলতুলে পেটের ওপর।নাক ঘষলো খোলা পেটে।তিতিরের শ্বাস আটকে এলো,মূহুর্তের জন্য শ্বাস নিতে বা ফেলতে ভুলে গেলো।দাঁত দিয়ে কামড়ে ধরলো নিচের ওষ্ঠ খানা খিচে চোখ বন্ধ করে ফেললো।ঈশানের গরম নিঃশ্বাস ছুঁয়ে যাচ্ছে তার পেটে,সাথে গরম হয়ে উঠেছে নিজে পুরো শরীরটা।শিরশির অনুভূতিতে ছেয়ে গেছে সর্বাঙ্গ।ঈশান থেমে গেছে,তিতিরের নড়াচড়া না পেয়ে আবার প্রশান্তিতে ঘুমের দেশে পারি দিয়েছে।তিতির নিজেকে বেশ সময় নিয়ে ধাতস্থ করলো,ধীরে সুস্থে তাকালো মানুষ টার দিকে।নিজের পরনে একটা শাড়ি,সেই শাড়ির অংশটুকু পেটে ওপর থকে সরিয়ে উন্মুক্ত পেটে একপ্রকার বালিশ বানিয়ে সেখানে মাথা রাখা ঈশানের।ঈশানের পুরুষালি খসখসে ঠান্ডা হাতের স্পর্শে শরীর আড়ষ্ট হয়ে আসছে।গতরাতের সব কিছু যেনো মাথা থেকে বেড়িয়ে গেছে,ভাবতে পারছে না কোনোকিছুই।এই প্রথম পুরুষ,যার ছোঁয়া তার শরীরে লেগেছে,বা এর আগেও লেগেছিলো।না চাইতেও…তিতির আটকে আসা শ্বাস স্বাভাবিক করতে চায়।জোরে জোরে শ্বাস ছাড়ে।বন্ধ চোখ হঠাৎ ভয়ার্ত ভাবে খুলে যায়।তার শরীরের এই শাড়ি কোথা থেকে এলো,সে তো…তিতির স্তব্ধ হয়ে যায় যেনো।
গতরাতে ঈশানের কথাগুলো থেকে শুরু করে বৃষ্টি তে ভেজা,জ্ঞান হারানোর আগ মূহুর্ত অবধি সবটা মনে পরতেই চোখের পানি গড়িয়ে পরে।কিন্তু সেতো বেলকনিতে ছিলো,গায়ে বেনারসি..তাহলে ঘরে আনলো কে!ঈশান?তা না হয় ঠিক আছে কিন্তু তার কাপড় পাল্টেছে কে!দু হাতে মুখ চাপা দিলো তিতির।হাত নড়াতেই কেমন ম্যাজম্যাজ করে উঠলো।ব্যাথায় আড়ষ্ট হাতদুটো।মাথা ভনভন করছে তার এখন,তার ওপর একই বিছানায় দুজন এভাবে।তিতিরের মস্তিষ্ক শূন্য হয়ে আসছে।গতরাতের বিষাক্ত স্মৃতি গুলো হানা দিলো একেএকে সেই মস্তিষ্কে।ঈশানের দিকে তাকালো।মুখের ভাবভঙ্গি পাল্টে গেলো সাথে সাথে। দু হাতে সরিয়ে দিতে চাইলো ঈশানকে।
“সরুন।উঠতে দিন আমাকে।”
ঈশানের মধ্যে কেনো ভাবান্তর দেখতে পাওয়া গেলো না।বেচারার কান অবধি গেলেই না কথাগুলো ঘুমের তোড়ে।একেএকে ঈশানের সব সব তিক্ত স্বীকারোক্তি গুলো মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে যেনো।মুখের ভিতরটা কেমন তেতো অনূভব করলো,মুখটা কঠিন থেকে কঠিন তম হলো।গত রাতের যন্ত্রণা, আর এখন নিজের এই অবস্থা, ঈশানকে এতো ঘনিষ্ঠ অবস্থায় দেখে গা রি রি করে উঠলো তার।গত রাতে জ্ঞান হারানোর পর কি ঘটেছিলো কিচ্ছু মনে করতে পারছে না সে।হঠাৎ তলপেটে তীব্র ব্যাথায় গুঙিয়ে উঠলো মেয়েটা…ঈশানের উপস্থিতিতে পিরিয়ড এর বিষয়টা ধরতে পারলো না।বরং আরও অন্য ভয় মাথাচাড়া দিয়ে উঠলো।বাসর ঘরে বসিয়ে গতরাতে অনিমার বলা কথাগুলো।স্বামীর সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক হওয়ার পর…আর ভাবতে পারলো না তিতির।এবার জোরে চিৎকার করে উঠলো।
“সরতে বলছি তো।এটা কি ধরনের অসভ্যতা।উঠুন।”
আচমকা চিৎকারে ঈশানের ঘুম ছুটে গেলো বেশখানিকটা।পিটপিট করে তাকালো।সকাল সকাল ঘুম থেকে ডাকাডাকি তার একদম পছন্দ নয়।রাতে ঘুম হয়নি। সারা শরীর জ্বালা করেছে গোটা রাত,নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছিলো না।ঘুম ধরেছেই হয়তো ঘন্টাখানেক আগে।এখনই সেটায় ব্যাঘাত হওয়ায় মাথা চিনচিন করে উঠলো।
“উহ্ সমস্যা কি।ঘুমাতে দিচ্ছিস না কেনো।আবার কি সমস্যা। “
তিতির বিরক্ত মুখে তাকিয়ে রইলে।তার আবার কি সমস্যা। সমস্যা তো সয়ং জড়িয়ে ধরে আছে তাকে।
“ঈশান ভাই সরুন আমার ওপর থেকে।”
ঈশান মুখ তুলে একবার পরখ করলো তিতিরের মুখটা,আবার থপ করে মুখ গুজলো পেটে।তিতিরের বুকের উথাল-পাতাল থামছে না।খামচে ধরে আছে বিছানার চাদর।নারীসত্ত্বার আন্দোলন হচ্ছে সারা অঙ্গে।বুকটা জ্বলছে,শরীর, মন অন্য কিছু চাইছে।খুব করে চাইছে।তিতির দু হাতে মাথা ঠেললো ঈশানের।ঈশান এবার হুড়মুড়িয়ে উঠে বসলো।উদ্দেশ্য তাকে অসময়ে ঘুম ভাঙানোর জন্য একটা রামধমক দেয়া।বিছানায় উঠে বসতেই নজর পরলো তিতিরের ফোলা ফোলা মুখটার দিকে।চোখ খিচে বন্ধ করে রাখা,ঠোঁট কামড়ে ধরে আছে।পরখ করলো শুয়ে থাকা আবেদনময়ী নারীটির দিকে।বুকের ওপরে শাড়ির আচল একপাশে অনেকটাই নেই,আর মেদ হীন ফর্শা ধবধবে ধনুকের মতো বাকানো কোমড় টা তো এতক্ষণ তার বালিশ হিসেবেই ছিলো তার মাথার নিচে।পায়ের অংশেও শাড়িটা অনেক ওপরে উঠে যাওয়া।মোটামুটি সকাল সকাল তাকে পাগল করার জন্য যথেষ্ট এতটুকুই।ঘাড় পিছনে হেলিয়ে দু হাতে মাথার চুল গুলো পেছনে ঠেলে জোরে জোরে শ্বাস নিলো।তিতির ততক্ষণে পিটপিট করে তাকিয়েছে। সামনে বিছানায় বসা নগ্ন দেহের স্বামী নামক সুদর্শন পুরুষ।আকর্ষণীয় পুরুষালি দেহ,লোমহীন বুকটা..চোখ সরিয়ে নিলো তিতির।উঠে বসতে চাইলো।পুরো শরীর ব্যাথায় চিনচিন করে উঠলো।চোখমুখ খিঁচে গুঙিয়ে উঠলো।
“আহ্।”
তিতিরের এমন শব্দে হতাশ ভ্রু কচুকে তাকালো ঈশান।তিতির কনুই এ ভর করে উঠে বসতে চাইছে তবে জ্বরে শরীর ব্যাথা হয়ে থাকায় খুব সম্ভবত পারছে না।ঈশান এগিয়ে কোমড়ে দিকে হাত বাড়াতেই দু হাত সমানে দিয়ে ছিটকে সরে আসতে চাইলো তিতির।ব্যাথা উপেক্ষা করে হুড়মুড়িয়ে উঠে বসলো।শাড়ি আচল নামিয়ে দিয়ে ঢেকে ফেললো শরীরের উন্মুক্ত অংশটুকু।
“ছোবেন না আমাকে। সরুন।”
তিতিরের মুখের দিকে বিরক্ত নজরে তাকালো ঈশান।রাগ,লজ্জা মিশে রক্তিম হয়ে গেছে একদম।
হাটু ভাজ করে ততক্ষণে শরীর সুন্দর মতো ঢেকে ফেলেছে।গোটা শরীর ব্যাথা,তলপেটের ব্যাথায় তো বসে থাকা দায়।চোখ থেকে টুপটুপ করে কয়েকফোটা পানি কোলের ওপর পরলো।তিতির হাতে উল্টো পিঠে চোখ মুছলো,কঠিন দৃষ্টিতে তাকালো ঈশানের দিকে।
“আমার জামাকাপড়! আমার জামাকাপড় কে পালটেছে?”
ঈশানের মুখের ভাব এখন ভাবলেশহীন। উদাসীন গলায় বললো,”ঘরে আর কে আছে! কে পাল্টাবে!”
তিতিরের ফাঁকা মস্তিষ্ক জ্বলে উঠলো।অনাকাঙ্ক্ষিত চিন্তাভাবনা মাথায় ভিড় জমাচ্ছে।রাগে মুখটা অস্বাভাবিক লাল দেখাচ্ছে।নাকের পাটা ফুলাচ্ছে,কান্না আটকাতে চাওয়ার প্রচেষ্টা আরকি।
“আ..আ..আপনি! মানে টা কি।আপনার সাহস হয় কিভাবে আমার গায়ে হাত দেওয়ার।সেন্স নেই কোনো।খোদা আমার সব শেষ।”
ঈশানের মুখে রাজ্যের বিরক্তি। তিতিরের আক্ষেপে মেজাজ খারাপ হলো তার।এখন তাকে দোষ দেয়া হচ্ছে! জামাকাপড় না পালটে দিলে ওকে আজ পাওয়া যেতো?জ্বরে তো তখনই..
চিবিয়ে চিবিয়ে বললো,
“সাহস!সেন্স!রাতে জ্বরের ঘোরে জামাকাপড় খুলে যখন কোলে উঠে আদর চাচ্ছিলি, তখন তোর সেন্স কোথায় ছিলো? “
তিতির আকাশ থেকে পরলো যেনো।মনে করার চেষ্টা করলো। কিচ্ছু মনে পরলো না।রাগে দুঃখে চোখের পানিও বাধ মানছে না।ফুপিয়ে উঠলো।কান্না সামলে কঠিন গলায় বললো,”হ্যা?আ..আমি!আদর!মানে!”
ঈশানের কোনো ভাবাবেগ চোখে পরলো না।সে তার মতো করে বসে আছে।তিতিরের মেজাজ খারাপ হচ্ছে। তেতে উঠলো একপ্রকারে”মিথ্যা কথা বলার জায়গা পাননা?সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখলামই তো কে কার ওপর!”
ঈশান হাত বাড়িয়ে বালিশ কোলের ওপর নিলো।সেথায় ভর দিয়ে স্থির দৃষ্টি রাখলো তিতির এর ওপর।তিতির হাশফাশ করছে।হাস্কিস্বরে বললো,
“রাতের কথা একটুও মনে নেই?”
তিতির চমকে উঠলো।বুকের ভিতর ধকধক করছে।রাতের কথা কি মনে থাকবে।ওই তিক্ত কথাগুলো ছাড়া তারপর আর মনে রাখার মতো কি ঘটেছিলো যেটা ঈশান বারবার বলছে।তিতির জবাব দিলো না।ঈশানের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি এড়াতে চোখ এদিক সেদিক ঘোরাচ্ছে।
ঈশান এবার খানিকটা কাত হলো।গম্ভীর গলা শোনা গেলো তার।,”দেখতো আমার পিঠে নখের আচর এগুলো তোর নাকি?”
তিতির নিজের এলেমেলো দৃষ্টি রাখলো ঈশানের পিঠে।বেশ কয়েকটা নখের আচর।শুকনো ঢোক গিললো।নিজের ধাতস্থ করতে চাইলো,শান্তনা দিলো নিজেকে।হঠাৎ মাথা নিচু করতেই ব্লাউজ এর ওপরে উন্মুক্ত অংশের ওপর বেশ কয়েক জায়গায় দাগ..ছ্যাত করে উঠলো আবার বুকে।এমধরনের দাগ তো..তিতির এর হাউমাউ করে কাদতে ইচ্ছে হচ্ছে। ছলছল দৃষ্টি রাখলো ঈশানের দিকে।
“সত্যি করে বলুন তো কি করেছেন আমার সাথে। আমার শরীরে এতো ব্যাথা,দাগ..”
বলেই দৃষ্টি সরিয়ে ফেললো।লজ্জায় শরীর কেঁপে কেঁপে উঠছে। ঈশান নিঃশব্দ হাসলো।মুখ ঝুঁকিয়ে এগিয়ে আসলো তিতির এর দিকে।
হাস্কিস্বরে বললো,”যা ভাবছিস তাই।”
তিতিরের দু হাতে মাথার চুল খামছে ধরলো।যা ভাবছে তাই মানে!এটা সম্ভব নয়।একদম নয়।দু হাতে মুখ ঢেকে ফুপিয়ে উঠলো।
“আ..আ..আপনি একটা অসভ্য,চরিত্রহীন। অন্য মেয়ের সাথে কাল সারাদিন কাটিয়ে এসে রাতে আমার সর্বনাশ করলেন!”
ঈশান দেখলো চোখের সামনে কান্নায় কেঁপে কেঁপে ওঠা ছোট্ট নারী শরীরটাকে।নববধূর মতোই লাগছে।এলোমেলো খোলা চুলগুলো বিছানা ছড়িয়ে আছে।গায়ের শাড়ী আধখোলা ভাব.. ইশশশ বুকটা জ্বলছে তার,খুব করে।রাতে নিজেদের মধ্যে ঘটা অনাকাঙ্ক্ষিত কিছু মূহুর্ত মনে পরতেই বেহায়া শরীরটা আন্দোলন করছে আবার।তিতিরকে এই মূহুর্তে বিরক্ত করতে খুব ইচ্ছে করছে।আদরে আদরে বিরক্ত। মেয়েটা অযথা কিছু না বুঝে কাদছে।একা একা সাতপাঁচ বুঝে ভুল বুঝেছে।অবশ্য বোঝা টা অস্বাভাবিক নয়।একে তো সদ্য ঘুম থেকে উঠেছে তার ওপর এতো কাঁদছে চোখটোখ ফুলে গেছে।তার অবশ্য মেয়েটাকে থামাতে ইচ্ছে হচ্ছে না।বরং আরও কাঁদাতে ইচ্ছে হচ্ছে। অন্য ভাবে কাদানোর ইচ্ছে মনের মধ্যে জাগ্রত হচ্ছে। যে কান্নায় স্বর্গসুখ থাকবে দুজনের।
ঈশান গলার স্বর নামিয়ে ফেললো সে।ধীর গলায় হাস্কিস্বরে বললো,”কাল কিন্তু বলেছিলাম যা চাইছিস নিজ ইচ্ছায়।সকালে আমাকে ব্লেম দিতে পারবি না।দিলে কি শর্ত ছিলো জানিস?”
“ক..ক..কি?”
বুক ফাটানো হাসি সযত্নে চেপে রেখে মুখটা কানের কাছে নিলো।ঈশানের তপ্ত নিঃশ্বাস ছুঁয়ে গেলো তিতিরকে।শরীর কেমন একটা করছে।
“দ্বিতীয় দফা তোর সর্বনাশ করে একটা বাচ্চা ধরিয়ে দেওয়ার কথা ছিলো।”
কি সব নির্লজ্জ কথাবার্তা।অন্য মেয়েকে ভালোবেসে,তাকে এসব বলা হচ্ছে! বাচ্চা!তাও এই অসভ্য,চরিত্রহীন লোকের!সে পেটে ধরবে।এ জীবনে না।মুখে বললো,
“ছিহ্”
“ছিহ্ বলছিস কেনো!আয় শর্তটা রাখ এখন।”
“চুপ করুউউউন।”
তিতিরের চিৎকারে মোটেই চুপ করলো না ঈশান।
“আমাকে দোষ দিচ্ছিস এখন?রাতে নিজে পাগলের মতো আদর চাইছিলি আমার কাছে। চাইছিলি আমাকে। পাগল তো তুই আমাকে করেছিলি।”
তিতির ব্যাথা শরীরে বিছানা ছেড়ে নামতে চাইলো।লজ্জায় শরীর অবশ হয়ে আসছে।শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। সে কি সত্যিই জ্বরের ঘোরে এসব করেছে।সত্যিই কি তাদের মধ্যে কিছু..ঈশান হাত টেনে হেচকা টানে কাছে টেনে আনলো।তাল সামলাতে না পেরে দূর্বল শরীর নিয়ে হুমড়ি খেয়ে পরলো ঈশানের উন্মুক্ত বুকে।নরম গালের ছোয়া নিজের বুকে পেতেই শরীর ঝাঁকি দিয়ে উঠলো ঈশানের।
তিতির হতবিহ্বলতা কাটিয়ে নড়াচড়া করছে সরে যাওয়ার।
“আপনার সমস্যা কোথায়।ছাড়ুন আমাকে। যা সর্বনাশ করার করেছেন।এখন দূরে সরুন।”
ঈশান এক টানে ঘুরিয়ে ফেললো তিতিরকে।তিতিরের পিঠ ঠেকলো ঈশানের বুকে।পিঠের ওপর ছড়িয়ে থাকা কেশরাশী হাত দিয়ে ঠেলে সামনে দিলো।ঈশান নিজের খসখসে হাত টা গলিয়ে দিলো শাড়ি ভেদ করে তিতিরের নরম পেটে।খামচে ধরলো।আবেশে মাথা এলিয়ে দিলো তিতির।মাথা এসে ঠেকলো ঈশানের বুকে।দুজনেই চোখ বুজে আছে।তিতির রীতিমতো নিজের ওপর বিরক্ত। আগে কখনো কোনো পুরুষের ছোয়া এভাবে লাগেনি বলে আজ নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না?লোকটার ওপর একরাশ রাগ নিয়েও কেনো তার স্পর্শে দূর্বল হয়ে যাচ্ছে শরীর।
“হুশশশ্ চুপ।রাতে অনেক জ্বালিয়েছিস।অনেক।আমার একজীবনে এতো ধৈর্যের পরীক্ষা আমি কখনো দেইনি।মদ ছাড়াই মাতাল করে ফেলেছিলি আমাকে।এতো কন্টোললেস কখনো অনূভব করিনি নিজেকে…”
তিতির ঈশানের এমন নরম কথায় স্থির হলো।ঘাড়জুড়ে ঈশানের তপ্ত নিঃশ্বাসের রাজত্ব। দুহাতে খামচে ধরা বিছানার চাদর।কন্ঠ দূর্বল হয়ে আসছে।গলা দিয়ে শব্দ বেরোতে চাচ্ছে না।ঈশান তাকে মিশিয়ে রেখেছে নিজের উদাম শরীরের সাথে। আর হাতের বিচরন তো আছেই পেট জুড়ে।তিতির কাঁপা কাঁপা গলায় কান্না আটকে বললো,
“কি করেছেন আমার সাথে কাল রাতে।”
“আমি একা করিনি তো।তুইও করেছিস আমার সাথে। “আমার জামাকাপড় কেনো পাল্টেছেন।”
“জ্বর ছিলো তোর।”
“তো?”
“মরে যেতি ভেজা কাপড়ে থাকলে।”
“যেতাম।আপনার কি।”
পেটের মধ্যে হাতের আরও শক্ত চাপ অনূভব করলো সে।শরীর ঘেমে উঠছে দুজনের।হয়তো দুটো শরীরই একে অপরকে কাছে পাওয়ার জন্য প্রস্তুত হয়ে আছে।
“বিয়ের প্রথম রাতে বউ মরলে কি জবাব দিতাম সবার কাছে।”
“ঝামেলা চলে যেতো। “
“তোর মতো বউ নামক ঝামেলা জীবনে দু একটা থাকা দরকার।”
“দু একটা?”
“হু।”
“ছাড়ুন আমাকে।”
“ছাড়িয়ে নিচ্ছিস না কেনো নিজেকে।রাতে অবশ্য আমি কিন্তু ধরতে চাইনি। নিজে থেকে এসেছিলি একটু খানি ছোঁয়া নিতে..উহু একটু নয়।গভীর ছোঁয়া চাচ্ছিলি।”
ঈশানের নরম ঠোটের হালকা ছোয়া অনূভব করছে এখন পিঠে, ঘাড়ে।নিজের চোখজোড়াও আবেশে বোজা।
“জ্বরের ঘোরে করেছি…থামাননি কেনো?”
“কতক্ষণ পারতাম।চেষ্টা করিনি বলছিস?একা চেঞ্জ করতে বললাম, পারলি না,জামাকাপড় খুলে বসে রইলি।ঘরে নিয়ে আসলাম কোনোমতে কাপড় পরিয়ে, ঘুমােতে বললাম টেনে আমাকেই বিছানায় নিলি।সরে যেতে যতবার চেয়েছি ততবার পাগলের মতো আদর চেয়েছিস।কোলে উঠে উন্মাদ এর মতো স্পর্শ চাইছিলি।আমি কি করতাম।কতক্ষন সম্ভব তুই বল।”
“এখন তো বেশ গায়ের জোর দেখাচ্ছেন।তখন দেখাননি কেনো?সুযোগের সদ্ব্যবহার? “
“পুরুষ মানুষ ভয়াবহ শক্তিহীনতায় ভোগে,দূর্বল হয়।কখন জানিস?নারীদেহের টানে,আর সেটা যদি হয় নিজের কাগজে কলমে দলিল করে নেওয়া নারী।আমি পুরুষ মানুষ। দাঁতে দাঁত চেপে ধৈর্য ধরেছি তুই দিস নি কনট্রোল এ থাকতে।”
“নিজের মনে একজন কে রেখে কবুল পড়লেন আরেকজন এর নামে।দিনে নিজের খুশিতে, ভালোবেসে অন্য নারীতে মজলেন,আর রাতে দেহের চাহিদায় দলিল করা বউয়েে?আমি না হয় সেন্স এ ছিলাম না।ঘরে একা ফেলে কেনো চলে গেলেন না।আমার সর্বনাশ কেনো করলেন?”
এবার বোধহয় ইগো তে লাগলো ঈশানের।পিছন থেকেই চোয়াল চেপে ধরলো মেয়েটার।ব্যাথায় গুঙিয়ে উঠলো তিতির।
“দেহের চাহিদা মানে!একটা মেয়ে কতটা বোকা হতে পারে তোকে দেখে শেখা উচিত। বলতে বলতে কি বলছিস খেয়াল করতে পারছিস না?”
তিতির কথাই বলতে পারছে না হাতের চাপে।ঈশান ছেড়ে দিলো।বিছানা ছেড়ে নামলো।ঘুরে এসে দাড়ালো তিতিরের মুখোমুখি। হেচকা টানে বিছানা থেকে দাড় করালো।দাড়ানের সাথে সাথে কিছু একটা টের পেলো।
“নিজের শরীরে কি হচ্ছে সেটা টের পাস না?কোনটা কিসের ব্যাথা,অনূভুতি বোধ নেই?”
তিতির এর চোয়াল ঝুলে পরেছে।তলপেটের চিনচিন ব্যাথা এখন আরও ছড়িয়ে পরেছে।দাড়িয়ে থাকা কষ্টকর।অজান্তেই নিজের হাত চলে গেলো পেটে।
ঈশান তপ্ত চোখে তাকিয়ে আছে।চোখ দিয়ে আগুন ঝড়ছে।তিতির ঢোক গিললো।আমতা আমতা গলায় বললো,
“পিরিয়ড…
“টের পাচ্ছিস না এখনো?”
হু হু করে কেঁদে উঠলো তিতির।লজ্জায় মরে যেতে ইচ্ছে হচ্ছে। গত রাতে যাই হয়েছে একটাও তার জন্য সুখকর নয়।বরং লজ্জায় মেরে ফেলার মতো ঘটনা সব।
“আপনি আমার…”
কথা শেষ করতে দিলো না ঈশান।মেজাজ খারাপ হচ্ছে তার।দাঁত দাঁত পিষলো।
“প্রথমে পাগলামি করে মাথা নষ্ট করে দিচ্ছিলি।খেয়াল ছিলো না তোর কাল পিরিয়ড এর ডেট??বিছানায় তাকা,আমার জামাকাপড় দেখ গিয়ে বাথরুমে।সব নোংরা করে ফেলেছিলি।পাগলের মতো কাছে চাচ্ছিলি আমাকে,আমিও পারছিলাম না আটকাতে আর।কিন্তু যখন খেয়াল করলাম ইউ আর ইন ইওর পিরিয়ড।তারপরও তোর শরীরের ওই অবস্থায় আমি তোর সুযোগ নিতাম?তোর ডাকে সাড়া দিতাম?আমাকে নরখাদক মনে হয় তোর?”
তিতির এর চোখ বেয়ে অঝোরে পানি পরছে।রাগে নাকি দুঃখে নাকি লজ্জায় বুঝে উঠতে পারছে না। মাথা নিচু করে রয়েছে।হঠাৎ চোখ পরলো ঈশানের পেটের দিকে।শিল্পীর কারুকার্যের মতো ছয় খন্ড ভাজ নিচের অর্ধেক অংশই ঢেকে আছে সাদা ব্যান্ডেজের আস্তরনে।সেখানটায় আবার ঝিরিঝিরি রক্ত ভেসেও আছে।চোখমুখ কুচকে ফেললো সে।এটা তো এতক্ষণ খেয়াল করেনি।
“আপনার পেটে কি হয়েছে। “
“কিছুনা।”
ঈশানের কাটকাট জবাবে আহত হলো মেয়েটা।বুকের ভিতর সংশয় জাগছে।জিজ্ঞেস করবে কি সেটা।কাঁপা কাঁপা গলায় শুধালো,”আ.আমি কি ব্যাথা দিয়েছি?”
ঈশান স্থির দৃষ্টি রাখলো তিতির এর ওপর।মেয়েটার মুখ কেমন নীল হয়ে আসছে।ধরতে পারলো না কারণ।
“দিয়েছিস!আঘাতে আঘাত বুঝিস?সেটা করেছিস…”
“আমি তো।”
“শাট আপ।চোখের সমানে থেকে যা এখন।অনেক জ্বালিয়েছিস রাত ভর।”
“চলেই তো যাবো আজ বাদে কাল।”
ঈশান নিজেকে যতই নিয়ন্ত্রণ করতে চাচ্ছে,তিতিরের কথায় সেগুলো বারবার ভেস্তে যাচ্ছে।এতক্ষণ ধরে ধাতস্থ করা নিজের রাগটা তিতিরের একটা কথা তরতর করে বেড়ে গেলো।তুঙ্গে উঠে যাওয়া রাগে একপ্রকার হিতাহিত খেই হারালো সে।আবার শক্ত করে চেপে ধরলে মেয়েটার চোয়াল।ঠেলে নিয়ে দেয়ালে মেশালে।পিঠে ধাক্কা লাগায় ব্যাথায় বেঁকে এলো মেয়েটা।
“নাটক কম করবি।যাবি,যেখানে ইচ্ছে যাবি।আমাকে বলে সিমপ্যাথি আদায় করতে আসবি না।কোনো ফিলিংস নেই আমার তোর প্রতি,আর না কখনো হবে।গত রাতে যে অবধি যা ভুল হয়েছিলো সেটা আজীবনের ভুল হিসেবেই থাকবে,শান্তি নয়।বুঝলি।আর ঈশান আরশাদ মেয়েদের সুযোগ নেয়না।ভালোবাসা ছাড়া সে নারী স্পর্শ সজ্ঞানে করবে না।কাল যা হয়েছে নেহাৎই অ্যাক্সিডেন্ট।”
বুকের ভিতর টা সুচের ফলা দিয়ে কেউ হয়তো ক্ষতবিক্ষত করে ফেললো।নিজেকে মানিয়ে নিয়েছিলো, এই কথাগুলো শোনার জন্য প্রস্তুত করেছিলো গতরাত থেকে সে,তার পরেও ঈশান মুখ ফুটে বলায় যন্ত্রণায় ছেয়ে গেলো বুকের বা পাশ টা।দু হাতে হেচকা টানে সরিয়ে দিলো ঈশানের হাতটা।শাড়ির আচলে চোখের পানি মুছে ফেললো।প্রশ্যস্ত বুকে সজোরে ধাক্কা দিয়ে নিজের থেকে দূরে করলো ঈশানকে।
“সীমার মধ্যে থাকুন আপনিও ।বিয়ে করে যা সর্বনাশ করার করেছেন।আমাকে নর্দমার কিট মনে হয়?যা বলবেন মুখ বুজে শুনে যাবো?সেল্ফ রেসপেক্ট নেই আমার?ভুলে যাবেন না মিস্টার ঈশান আরশাদ দেওয়ান। আমার গায়েও এই বাড়ির রক্ত আছে,সাথে আমার বাপের বাড়ির জৌলুশ ও কিন্তু নেহাৎ কম নয়।আমাকে আগের জামানার অসহায় বউ ভাবার ভুল করবেন না কিন্তু। যে স্বামী পরনারীরে মজে, বাড়ি ফিরে বউয়ের ওপর নিজের অধিকার ফলাবে,আর সব জেনেশুনে আমি স্বামীর ঘর করতে চাইবো?একদম নয়…সেটার ভাবার মতো বোকামি করবেন না।আমি রেহনুমা হেলাল তিতির এ জীবনে আর কখনো দেওয়ান পরিচয় গায়ে লাগাবো না।কখনো না।আর রাতে যা বলেছিলেন সজ্ঞানে আমি সবটা শুনেছিলাম আর খুব ভালো করে মাথায় ও ঢুকিয়ে নিয়েছিলাম।আপনি যতটা সঠিক সময়ের অপেক্ষায় আছেন এ সম্পর্ক থেকে মুক্তির জন্য। আমিও তাই..সময় মতো ঠিক মুক্তি দিয়ে দেবো।এ জীবনে আমার ভালোবাসার কমতি হবে না আর না তো আমাকে ভালোবাসার মানুষের। তাই জোর করে কারোর ভালোবাসা আদায় করতে চাওয়া আমার ধাচে নেই।”
তিতির পাশ কাটিয়ে চোখের পলকে বেড়িয়ে গেলো রুম থেকে।পাশে নিজের রুমের দরজা আটকানোর শব্দ কানে আসলো ঈশানের।ঈশান থ মেরে দাড়িয়ে আছে।তিতির এর বলা কঠিন কথাগুলো বুকের কোথায় গিয়ে যেনো আঘাত করেছে।প্রত্যেক টা শব্দ কানে বাজছে,রাগে শরীর কাঁপছে তার।কত্তো সাহস এই বোকা মেয়েটার…
নিজের রুম থেকে সময় নিয়ে ফ্রেশ হলো তিতির।নিজের ঘরটার দিকে চোখ বোলালো।কাল অবধি এই ঘরটা তার ছিলো।আজকে কেমন যেনো পর পর লাগছে।না তো ঈশানের ঘরকে নিজের লাগছে আর না তো তার নিজের ঘরকে।ঘর ছাড়া পাখির মতো লাগছে নিজেকে।বারান্দায় গ্লাস টেনে দিলো।তার টিয়া পাখির খাঁচা খানা ঝোলালো বারান্দায়। দানাপানি দিলেো।তিতিরকে দেখেই পাখি জোড়া বেশ খুশি হয়ে যায়।নিজেদের মধ্যে ঠোকরা ঠুকরি থামিয়ে ডানা ঝাপটাতে থাকে।তিতির ভাবুক চোখে তাকিয়ে থাকে সেদিকে।হাত দিয়ে খাঁচা টা ঝাকায় আলতো করে।পাখি দুটো ছটফট করে ওঠে।আচমকা তিতিরের চোখ ভেঙে পানি গড়িয়ে পরে।
“আচ্ছা তোদের ও কি আমি জোর করে একসাথে রাখি?হুম?”
পাখি দুটোর একটি স্পষ্ট করে৷৷ আওড়ালো,পুত্তুল,পুত্তুল..”
“জোর করে একসাথে রাখি বলে এতো ঝগড়া করিস দুজন?একসাথে থাকতে চাসনা?এতোদিন এও ভালোবাসা হয়নি বুঝি?”
অবুঝ পাখিদুটো ডানা ঝাপটাতে ঝাপটাতে শেখানো একই কথা বারবার আউরাচ্ছে।তিতির দীর্ঘশ্বাস ফেলে,সযত্নে চোখের পানিটুকু মুছে ফেলে।রোজকার একটা সালোয়ার সেট গায়ে জড়িয়ে নিচে নেমে আসে।বেশ বেলা হয়েছে।বসার ঘরে বেশ নিরব।কাউকেই দেখতে পাওয়া যাচ্ছে না।ভাইবোন গুলো হয়তো কেউ এখনো ঘুম থেকেই ওঠেনি। গতরাতে তাদের বিয়ে নিয়ে সবাই হৈ হুল্লোড় করেছে কী না..তিতিরের হাসি পেলো। রিশা, রোশনি,রাফি কত খুশিই না হয়েছিলো তার সাথে ঈশানের বিয়ের কারণে।মামাদের কাউকে দেখছে না।সম্ভবত অফিসে গেছে।মামিরা কোথায়! চন্দ্রা দেওয়ান এর ঘর টা নিচ তলায় সিড়ির লাগোয়া।দরজা হাট করে চাপানো।
বেলা দশটা বাজে,ডায়নিং এর দিকে এগোতেই রান্নাঘর থেকে অবাক হয়ে বেড়িয়ে আসতে দেখা গেলো মেজো মামি রিক্তা দেওয়ান কে।তিতির কে সবার আগে উঠতে দেখে হয়তো অবাকই হয়েছেন।বাকা হেসে জড়িয়ে নিলেন মেয়েকে।
“হ্য রে মা।কেউ ওঠেনি,অথচ নতুন বউয়ের আগে ঘুম ভাঙলো!আমার ছেলেটা ঘুমাচ্ছে এই সুযোগ এ পালিয়ে এসেছিস!? “
অন্য সময় হলে মামির কথায় খুব করে লজ্জা পেতো বোধহয়। এই মূহুর্তে সেসব কিছু অনূভব হলো না।বরং নতুন বউ শব্দটা শুনে খারাপ মন আরও খারাপ হলো।এক বেলার মধ্যে সম্পর্ক পাল্টে গেছে তাইনা!মেয়ে থেকে বউ,মামি থেকে মামি শাশুড়ী.. সব সম্পর্ক!শুধু যার মাধমে পালটালো তার সাথে কোনো সম্পর্কই তৈরি হলো না,আর না তো হবে।
তিতির কিছু বললো না।মৃদু হাসতে চেষ্টা করলো।চেয়ার টেনে বসে পরলো।
“খিদে পেয়েছে মেজো মামনী।খেতে দেবে?নাকি সেটাও এখন তোমাদের ছেলের অনুমতি পেলে দেবে?”
তিতির এর এহেন কথায় চমকালো রিক্তা।তবে অন্য কিছু ধারনা করলো না।গতকাল বারবার বলা হয়েছে এখন থেকে সব নতুন সম্পর্ক।তাই মেয়েটা এ কথা বলছে এটা ধারনা করে দ্রুত মেয়ের খাবার আনতে ছুটলেন।প্লেটে গরম গরম খিচুড়ি আর গতকালের বিয়ের বাড়ির গরুর মাংস,কাবাব,রোস্ট নিয়ে হাজির হলেন।
“তোর প্রিয় খাবার সব।পোলাও এর থেকে তুই খিচুরি বেশি পছন্দ করিস কি না..তোর শাশুড়ী তোর জন্য নিজ হাতে রান্না করেছে। আর এগুলো তোর বিয়ের খাবার।কাল তো খেতেই পারলি না।সব তোর জন্য তুলে রেখেছিলাম আলাদা করে।খেয়ে নে মা।আমি সালাদ আনি।”
এসব তিতিরের খুব প্রিয়।কিন্তু আজ কেনো জানি খেতে ইচ্ছে হচ্ছে না এসব।তার বিয়ের খাবার!নাকি তার অস্তিত্ব বিসর্জন আয়োজনের খাবার মাথায় ঢুকলো না।
“মেজো মামনী ডিম ভেজে দাও একটা।এসব খেতে ইচ্ছে হচ্ছে না।”
রিক্তা অবাক হয়ে সালাদের বাটি টেবিল এ রাখলেন।
কপালে হাত দিলেন।কপাল টা বেশ গরম।
“মা কপাল গরম তো।জ্বর?”
“সেরকম কিছুনা মেজো মামনী।”
“তাহলে খাবি না কেনো। এসব তো সবচেয়ে পছন্দ এ বাড়িতে তোরই।”
“আজ খেতে ইচ্ছে হচ্ছে না।ডিম দিলে খাবো না হলে থাক এমনি খেয়ে নিচ্ছি। “
“না না শুকনো খিচুরি খেতে হবে না।আমি আনছি দারা।বোস একটু।”
রিক্তা ছুটলো রান্নাঘরে। তিতির এদিক ওদিক খুজলো বাকি দুই মামিকে।কাউকে দেখলো না।একপ্রকার গলা উচিয়ে জিজ্ঞেস করলো রিক্তাকে।
“বড় মামনী, ছোট মামনী কে দেখছি না।”
“তোর শাশুড়ী তোর জন্য কিসব কেনাকাটা করতে গেছে।”
বারবার এই শাশুড়ী, স্বামী, নতুন বউ শব্দগুলো অসহ্য লাগছে তার।সম্পর্কগুলোও তাই।কথা বাড়ালো না।
ঈশান ফিটফাট হয়ে নেমে আসছে নিচে।সিড়ির মাথা থেকে ডায়নিং এ বসা তিতিরের ওপর চোখ পরলো।পাশে একগাদা খাবার নিয়েও ঠায় বসে আছে মেয়েটা। খাচ্ছে না।ঈশান নিচে আসতে আসতে ততক্ষণে ডিম ভাজা নিয়ে এসেছেন রিক্তা।
তিতির আড়চোখে একবার দেখলো ঈশানকে।ঈশানকে দেখেই একগাল হাসলো রিক্তা।ছেলেমেয়েদের সাথে তাদের জা দের সকলেরই বন্ধুর মতো সম্পর্ক!
“সবার পরে ওঠার কথা ছিলো তোদের। তোরাই সবার আগে হাজির!আদৌও ঘুমিয়েছিলি নাকি খেয়েদেয়ে ঘুমাতে যাবি।”
দুজনেই কিছু বললো না।রিক্তা মুখটিপে হাসলেন।ছেলেমেয়ে দুটো কে আর লজ্জা দিতে চাইলেন না।ঈশান সকাল এ এসব হেভি ফুড মোটেই খাবেনা।সেদ্ধ ডিম,দুটো ব্রেড আর একগাদা স্যালাড নিয়ে চিবাচ্ছে। তবে তিতিরের সামনে তার প্রিয় খবার রেখে ডিম দিয়ে খাওয়ার রহস্য বুঝলো না।তিতির কয়েকবার হাতে গোনা খাবার মুখে তুললো।জ্বরে মুখের স্বাদ একদম নষ্ট হয়ে গেছে।মুখে ধরলো না খাবার।খাবার ছেড়ে উঠে গেলো।
“কি হলো মা।খাবিনা।”
“খেতে ইচ্ছে করছে না মেজো মামনী।”
“সে কি। আমি বললাম জ্বর হয়েছে তোর।নাহলে.. “
“কিচ্ছু হয়নি।আমি রুমে গেলাম।”
তিতির দাড়ায় না।ঈশান আড়চোখে খেয়াল করলো সবটা।
“কিরে বাপ।কিছু হয়েছে?মেয়েটা..”
সাঁঝের মায়া পর্ব ২২
“,কি হবে!কিচ্ছু না।খেতে ইচ্ছে হয়নি খায়নি।এতো আদিখ্যেতার কিছু নেই।খিদে পেলে একাই আসবে।”
সিড়ির মাঝা থেকে সবটাই কানে গেলো তার।আদিখ্যেতাই!সত্যিই তাই।বুক চিড়ে দীর্ঘশ্বাস বেড়িয়ে এলো। দ্রুত পায়ে গেলো নিজের ঘরের দিকে।
