সাঁঝের মায়া পর্ব ৪০
দুর এ দিলশাদ্ দুআা
____”হাঁটতে পারবি? নাকি কোলে নেবো? কাঁপছিস কেনো এতো?”
ঠকঠক করে কাঁপছে তিতির । এতক্ষণ টের না পেলেও ভেজা শরীরে শীতল বাতাসের ঝাপটা এসে লাগতেই শিরশির করছে শরীর । বৃষ্টি থামেনি এখনো। পরিমাণ টা কমেছে এই যা । ভেজা শরীরে এখানে আর কতক্ষণ অপেক্ষা করতো ! তাছাড়া আশেপাশে প্রচুর ঝোপঝাড় । সন্ধ্যা নেমে এসেছে। আরেকটু অন্ধকার হলে পথ খুঁজে সঠিক রাস্তা পাওয়ায় ঝামেলা হয়ে যাবে । তিতিরের হাঁটার গতির সাথে তাল মিলিয়ে নিজের গতি কমিয়েছে ঈশান। তিতিরের পায়ে তার ঈশানের নিজের জুতো পরিয়ে, মেয়েটার হাই হিল নিজের হাতে নেওয়া।
ভিজেই আছে, অযথা দৌড়াদৌড়ি করে এগোনোর মানেই হয়না৷ তিতির ঈশানের কথায় মাথা নাড়লো দুদিকে। তার চোখ বারবার যাচ্ছে ঈশানের নগ্ন পায়ের দিকে। যতবার দেখছে মানুষ টা নিজে খালিপায়ে হেটে তার জুতা তিতিরকে পরিয়েছে ততবার কেনো যেনো আলাদা একটা ভালোলাগায় কান্না পাচ্ছে তিতিরের । ঈশান এর এতো যত্নশীল রুপের সাথে ইদানিং পরিচিত হচ্ছে সে। যত পরিচিত হচ্ছে তত অবাক হয়ে যাচ্ছে।
ঈশান জুতা বাম হাতে নিয়ে ডান হাতে তিতিরকে কাছে টেনে আনলো। বাহু জড়িয়ে ধরলো। নরম গলায় বললো,
____”গাড়িতে তোয়ালে আছে। গিয়ে মাথা মুছে গায়ে জড়িয়ে নিবি । ঠান্ডা আজ দুজনেরই লাগলো বলে।”
কথাটা বলেই মেয়েটার কপালে হাত ছুয়িয়ে দেখলো। তিতিরের জ্বর এসেছে কি না। বৃষ্টির পানিতে মেয়েটার জ্বর আসে সহজেই। নিশ্চিত আজও আসবে। তিতির ও খেয়াল করেছে। মাথা শরীর দুটোই ম্যাজম্যাজ করা শুরু করে দিয়েচ্ছে। ঈশানের বাহু বন্ধনে যতটা পারা যায় দ্রুতই হাঁটার চেষ্টা করছে দুজনে। মাগরিব এর আজান দিয়েছে মিনিট দশেক হলো। সময় অনুযায়ী বেশ অন্ধকার। রাতের মতো। এখন না গেলে খানিকের মধ্যে বৃষ্টি আবার জাঁকিয়ে নামবে।
ঈশান তিতির গাড়ির কাছে পৌছুতেই রেস্তোরাঁর ভিতর থেকে বেড়িয়ে এলো সকলে । বৃষ্টির জন্য সেই তখন থেকে এখানেই অপেক্ষা করছিলো। ওদের এভাবে ভিজে চুপসে যাওয়া অবস্থায় দেখে ছুটে গাড়ি থেকে তোয়ালে নিয়ে এলো নিশি। ঈশান নিজের মাথাটা মুছে এগিয়ে দিলো তিতিরের দিকে। নিশি, নূরি ওকে নিয়ে গেলো রেস্টুরেন্টের ভিতরে। ওয়াশরুমে ভালো করে একটু মাথা মুছে শাড়ির পানি ঝরিয়ে নেবে না হয়।
গুড়গুড় করে মেঘ ডাকছে এখনো। ঝিরিঝিরি বৃষ্টি হয়েই যাচ্ছে। সন্ধ্যার আকাশে কালো বাদে আর কোনো রঙের ছিটেফোঁটা চোখে পরার মতো নয়। গ্রীষ্মের এই আবহাওয়া তেও শীতে কম্পন ধরছে শরীরে। ঈশান দু হাতে চুলগুলো ঝেড়ে চোখ তুলতেই খেয়াল করলো উপস্থিত সকলেই তার দিকে কেমন একটা দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে।
নয়ন খেয়াল করেছে সবার আগে । না চাইতেও খেয়াল করেছে। তিতির এর কন্ঠনালির দাগ গুলো। মেয়েটা নিদারুণ চেষ্টা করছিলো মাথা ঝুকিয়ে রেখে, চুলে আড়াল করে দাগগুলো ঢাকতে। কিন্তু দাগের পরিমাণ এতো বেশি যে চোখের পরেই গিয়েছে। একই অনাকাঙ্ক্ষিত কিছু দাগ ঈশানের গ্রীবাজুড়ে। সফেদ পাঞ্জাবির গায়ে সেখান থেকে বের হওয়া ছিটেফোঁটা রক্তও লেগে আছে। নয়ন সরে গেলো সেখান থেকে । ফোনে কথা বলবে এই ইশারা করে অন্য দিকে গিয়ে দাড়ালো। ঈশানের বন্ধু রা যে এখন এসব নিয়ে মজাঠাট্টা করবে তা টের পেলো সে। এসবের মধ্যে থেকে অযথা নিজের যন্ত্রনা বাড়ানোর মানেই হয়না।
____”তুই কি বউ নিয়ে ঝোপঝাড়ে ঢুকেছিলি ইয়ে টিয়ে করতে…ডোন্ট টেক ইট নেগেটিভলি। আই মিন বৃষ্টি থেকে বাঁচতে? ”
নিয়াজ এর কন্ঠে মাথার চুল মোছা বাদ দিয়ে তাকালো ঈশান। বড্ড বিরক্ত চোখে। খেয়াল করলো বাকিরাও এই প্রশ্নের উত্তর শুনতে বড্ড আগ্রহী। হা করে তাকিয়ে আছে তার দিকে। ঈশান কিছু বলার আগেই বাঁকা গলায় নিয়াজ বলে উঠলো,
____”না মানে কেনো বলছিলাম বল তো! তোর কাঁধে যে পরিমাণ নখের আঁচড় দেখছি। ভাবলাম ঝোপেঝাড় থেকে শেয়াল টেয়াল টেনেটুনে ধরেছিলো কিনা। এতো আঁচড় তাছাড়া আর কিসের বল! মানুষ এর তো হাওয়ার কথা না।”
ঈশান সরু চোখে তাকিয়ে রইলো । নিয়াজ ঠোঁট টিপে হাসছে । পাশেই নাঈম, সাজিদ তো ঘুরে দাড়ালো হাসি আড়াল করতে। অনিমা, রিতু, তমা পাশাপাশি দাড়িয়ে মিটিমিটি হাসছে । শয়তানগুলো যে চোখ দিয়ে গিলে খেয়েছে তা বুঝতে বাকি রইলো না ঈশানের । ভুল অবশ্য তারই । হুশ খুয়িয়ে জায়গা না বুঝে কাজ কারবার করলে এমন ইমব্যারেসিং মোমেন্ট এ পরতেই হবে , স্বাভাবিক এটা।
ঈশান দেখলো নিশি, নূরি আর তিতির এদিকেই আসছে । ভেজা শাড়ির ওপর তোয়ালে জড়িয়েছে গায়ে। হাতে একটা ধোঁয়া ওঠা কফি বা কিছু একটা। দু হাতে সেটা চেপে রেখে ঠকঠক করে কাঁপতে কাঁপতে এদিকেই আসছে।
ঈশান ওদিকে ঘোরলাগা চোখে তাকিয়ে গম্ভীর কন্ঠে বললো,
____”ইট’স জাস্ট আ ক্যাট ”
নিয়াজ ঈশানের দৃষ্টি অনুসরব করে দেখলো তিতিরকে । আরও হাসি পেলো।। সাজিদের সাথে চোখাচোখি হলো । ওরাও মুখ টিপে হেসেই যাচ্ছে। নিয়াজ কপট ভাবুক হয়ে, চিন্তিত কন্ঠে বললো,
____”তা বিড়াল টা কি জংলী? আহারে কি অবস্থাই না করেছে ! কি করেছিলি ভাই বিড়ালটার সাথে? বিড়াল মারার মিশনে নেমেছিলি এই ঝোপঝাড়ে? ”
____”শাট আপ।”
ঈশানের চাপা ধমকে উল্টো শব্দ করে হেসে ফেললো উপস্থিত সবাই । তিতির রা ততক্ষণে এসে দাড়িয়েছে। আর দেরি করার মানেই হয়না।। এই আবহাওয়ার এক বিন্দু বিশ্বাস নেই। আবার যেকোনো মূহুর্তে ঝড় উঠে আসবে। ঝটপট গাড়িতে উঠে পরলো সবাই।
গাড়ি চলছে স্বাভাবিক গতিতে। বৃষ্টির কারণে গাড়ির গতি বাড়াতে পারছে না নয়ন। গাড়িতে ওঠা মাত্র আবার শুরু হয়েছে মুষলধারে বৃষ্টি। মাঝের সাড়িতে বসেছে ঈশান তিতির। এতো মানুষ এক গাড়িতে, একটু চাপাচাপি করেই বসতে হয়েছে। আসার সময় তিতির বসেছিলো নিশি, তমার মাঝখানে। তাই সেরকম আনইজি ফিল করেনি। তবে এখন ঈশান বসেছে তার পাশে। শরীরে শরীর একদম আটকে আছে। গাড়ির ঝাঁকিতে স্পর্শ গভীর হচ্ছে বারবার। তিতির সরে বসতে চাচ্ছে যতবার,ততবারই উল্টো কেমন কেমন করে যেনো কাছে চলে আসছে ঈশানের।
ঈশান বারবার দেখছে তিতিরের রক্তিম মুখটা। কপালে ভাজ ফেলে নড়াচড়া করছে বারবার। তিতির এর বায়ে তমা। সে ওপাশে নূরির সাথে কি এক আলাপে মগ্ন।
আচমকা শিরদাঁড়া সোজা হয়ে গেলো তিতিরের। পিছনে দিয়ে তার শাড়ির ভেদ করে একটা খসখসে, ঠান্ডার হাত স্পর্শ করেছে তার নগ্ন উদর। হতভম্ব তিতিরে ফট করে পাশে, পিছনে তাকিয়ে খেয়াল করলো কেউ দেখছে নাকি এদিকে। কেউ দেখছে না। এতো চাপাচাপি করে বসা যে কেউ লক্ষই করবে না,তাছাড়া গল্পগুজবে তাল দেয়নি এদিকে কেউ মূলত। তিতির ভয়ার্ত চোখে ঈশানের দিকে তাকাতেই আরেকদফা শ্বাস আটকে এলো। ঈশান ঘোলা চোখে তাকানো তার দিকেই। তিতির হাসফাস করে ঈশানের এ দৃষ্টি তে। এই দৃষ্টির মানে সে জানে। ঈশানের চাওয়া-পাওয়া বোঝে সে আজকাল । ঈশানের হাত বিচরন করলে তার তুলতুলে উদরে। আঙ্গুলের কারুকাজ করছে যেনো! ক্ষনে ক্ষন চাপ প্রয়োগ করেছে সেখান টায়। তিতিরের শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। বুকের বা পাশের তীব্র উত্তেজনায় মাথা ভনভন করছে।
নিচের ঠোঁট কামড়ে ধরলো নিজের। শাড়ির আচল আর একটু নামিয়ে ঢেকে রাখলো শরীর। টের পেলো ঈশান তাকে টেনে নিলো খানিকটা নিজের দিকে। তমা টের পায়নি। সে একটু দূরেই। সে ভিজে যায়নি, তাই বসার সময় থেকেই তিতির একটু এদিকে সরেই বসেছিলো তার ভেজা শরীর নিয়ে।
ঈশানের বেহায়া কারবারে হতাশ চোখে তাকালো তিতির। তিতিরের চোখের দৃষ্টিতে বলা কথার উত্তর ঈশান পেটের ওপর আলতো করে হাত বুলিয়ে দিলো। তিতির নিজের হাত নিয়ে চেপে ধরলো ঈশানের হাত। ফিসফিস করে বললো,
____”কি হচ্ছে টা কি। হাত সরান। কেউ দেখে ফেলবে।”
____”আমাকে এতো বোকা লাগে তোমার!”
____”প্লিইইজ।”
____”উহু।”
ঈশানের একরোখা উত্তর। তিতির বাধ্য হয়েই ঘেষে আসে ঈশানের আরেকটু কাছে। ঈশানের খসখসে হাতের কাজ থামার নামই নেই। তিতিরকে পাগল করতে ক্রমাগত হাত বুলিয়েই যাচ্ছে। তিতির এলোমেলো দৃষ্টি সরিয়ে রাখছে অন্য দিকে। সবাইকে খেয়ালে রাখছে।
ফ্লাইট থেকে যখন রাহাত নামলো তখন রাত্রির সাড়ে আটটা। এখন তিতির এর সাথে দেখা করতে যাবে কি না এটা নিয়ে দোটানায় ভুগছে রাহাত।
ঈদের একটা দিন। নিশ্চয় আত্মীয় সজনে বাড়ি পরিপূর্ণ। আনন্দ, মজায় মেতে আছে নিশ্চিত। এখন থেকে যেতে তার আরও ঘন্টাখানেক লাগবে । তখন আরও রাত হবে।
সব ভেবে আজকে তিতির এর সাথে দেখা করার পরিকল্পনা সাইটে রেখে ক্যাব বুক করলো হোটেলের দিকে যেতে। তাদের সিঙ্গাপুর যাওয়ার ফ্লাইট পেছানো হয়েছে এক সপ্তাহ, তার মায়ের জোরাজোরি তে। অসুস্থ মা কে জোর করে বোঝাতেও পারছে না তিতির এর বিষয়টা।
ঈশান তখন থেকে তার দিকে তাকিয়েই আছে তা স্পষ্ট টের পাচ্ছে সে। তিতির বিরক্ত হয়। বেহায়ার মতো কাজ কারবার। এতোগুলো মানুষ গাড়িিতে। ওভাবে তাকিয়ে থাকার মানে হয়! এরই মধ্যে পিছন থেকে নিয়াজ দের চাপা হাসির শব্দ কানে আসলো তিতিরের। তার মনে হলো তাদের নিয়েই কথা হচ্ছে। ঈশানের দিকে আড়চোখে তাকিয়ে চাপা কন্টে লো,
____”ওভাবে তাকিয়ে থাকবেন না তো! সবাই এমনিতেও হাসাহাসি করছে আমাদের নিয়ে। “
ঈশান নির্বিকার গলায় বললো,
____” কি আশ্চর্য! ওরা হাসাহাসি করছে বলে আমি এদিকওদিক তাকাতেও পারবনা?”
তিতির দাঁতে দাতে চেপে ঈশানের দিকে তাকিয়ে নিজের কন্ঠদেশ ইশারা করে বললো,
____”দেখুন কি করেছেন। দাগ হয়ে আছে জায়গাটায়। কি দিয়ে ঢাকবো! সবাই দেখে মজা নিচ্ছে।”
ঈশান তাকালো তিতিরের বিউটি বোন, কাধ, কন্ঠদেশের ওপর পারপেল দাগ গুলোর ওপর। তার করা আদরের চিহ্ন সব ওগুলে। কালসিটে পরে গেছে একটু পরপরই। তিতিরের মুখের দিকে তাকিয়ে ঠোঁট টিপে হাসলো। নিজের ঘাড়ে তিতিরের নখের আচড়গুলো দেখিয়ে বাঁকা কন্ঠে বললো,
____”নিয়াজ যে আমাকে জিজ্ঞেস করলো ঝোপঝাড় এ শেয়াল খামচেছে কি না। কই আমি তো লজ্জা পেলাম না।
তিতির লজ্জায় মুখ ফিরিয়ে নিলো। সবাই টের পেয়েছে তা কি সে জানে না! নিশি, নূরি তো তখন মুখের ওপর সোজাসাপটা জিজ্ঞেস করে ফেলেছিলো। কি লজ্জায়ই না পরে গেছে। বাড়িতে হলে এ এক কথা। এরকম বাইরে অসভ্যতামি করলে মানুষ লজ্জা তো দেবেই।
____”আপনি যে অসভ্য।”
কথাটা বলেই খেয়াল হলো নিয়াজ ভাইদের প্রশ্নে অসভ্য লোকের অসভ্য উত্তর হওয়া খুবই স্বাভাবিক। চাপা গলায় বললো,
____”কিন্তু আপনি কি উত্তর দিলেন?”
ঈশান ঠোঁট টিপে হাসি সংবরন করে তিতিরের কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিসিয়ে বললো,
____” মাই পার্সোনাল ক্যাট হ্যাজ স্ক্র্যাচড্ মি।”
তিতির হতবিহ্বল হলো ঈশানের কথায়। লোকটা এটা বলেছে সবাই! কি লজ্জার কথা। ঈশানের দিকে তাকিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বললো,
____”ছিহ্ বাজে, অসভ্য লোক। আমি বিড়াল।”
গম্ভীর করে ফেললো ঈশান নিজের মুখ। দুদিকে মাথা নেড়ে বললো,
____”উহু, নট ওনলি ক্যাট। ওয়াইল্ড ক্যাট।”
তিতিরের হাত কিল বসালো ঈশানের উরুর ওপর। লজ্জায় কান দিয়ে গরম ধোয়া কুন্ডলি পাকিয়ে বের হচ্ছে। কপালে হাত ঠেকিয়ে চোখ খিচে বন্ধ করে রইলো। কথা বলাই ভুল এ লোকের সমানে।
হোটেলের সামনে নেমে ভাড়া মিটিয়ে নিজের বুক করা রুমের উদ্দেশ্যে হাটা ধরলো রাহাত। লিফটে উঠতেই আরেকজন নারী এসে প্রবেশ করলো সঙ্গে সঙ্গে। রাহাত থমকালো। তবে মেয়েটা মোটেই চমকালো না। রাহাত খেয়াল করলো একই ফ্লোরে যাবে দুজনেই। মেয়েটা এবারে তাকালো রাহাতের দিকে। মুচকি হাসলো।
____”এক মেয়ের জন্য আর কতজন লাইন ধরবেন বলুন তো? “
রাহাত সরু চোখে তাকালো। মেয়েটার প্রথম কথাই এটা হবে বুঝতে পারেনি রাহাত। খানিকটা অপ্রস্তুত হয়ে বললো,
____”পার্ডন?”
মেয়েটা নিজের খোলা চুলগুলো কাঁধের ওপর থেকে সরিয়ে দিলো। চোখের চশমা টা মাথার ওপর তুলতে তুলতে বললো,
____”তিতির পাখির কথা বলছিলাম।”
মেয়েটার মুখে তিতির এর নাম শুনে ভ্রু কুচকে ফেললো রাহাত। তাদের ফ্লোর চলে এসেছে। পাশাপাশিই দুটো রুম। পাশাপাশিই হাটছে মেয়েটা। রাহাত কিচ্ছু বলার প্রয়োজন বোধ করলো না।
____”বাচ্চা একটা মেয়ে। অবশ্য বিশ বছর মোটেই কম না। তবে ওর জন্য যারাই বশ হয় তারাই ওর থেকে কম হলেও আট দশ বছরের বড়। কেউ প্রফেসর,সাইকোপ্যাথ,বিজনেসম্যন! মেয়েটার ক্ষমতা আছে বলতে হবে। বিবাহিত হয়েও আশিকদের লাইন লাগিয়ে দিয়েছে নিজের পিছনে।”
খিলখিল করে হেসে ফেললো কথাটা বলেই। রাহাত নিজের রুমের লক খুলতে খুলতে বললো,
____”আপনার আশিকও বিবাহিত। মাইন্ড ইট।”
মূহুর্তে মুখের হাসি মিলিয়ে গেলো মেয়েটার। শক্ত চোখে তাকালো। কিন্তু ততক্ষণে রাহাত শব্দ করে নিজের রুম লক করে ফেলেছে।
রাহাত দরজা আটকে জোরে জোরে শ্বাস নিলো। আর কে তিতির এর পিছনে পরে আছে! ঈশান না হয় বিয়ে করছে। কিন্তু আর কার কথা বললো মেয়েটা। প্রফেসর, সাইকোপ্যাথ এরা আবার কারা! মেজাজ খারাপ হয়ে আসলো। তিতির তার ছাড়া আর কারোর হতেও পারে না। দশটা বাচ্চা হলেও তিতির তার। হতেই হবে।
চন্দ্রকাননে রাইসুল দেওয়ান এর বেশ কিছু বন্ধু বান্ধব এসেছে । তাছাড়া চন্দ্রা দেওয়ান এর গ্রামের আত্মীয় সজন রা তো আছেই । বাড়ি মানুষ জনে ভরপুর। ছেলেমেয়ে গুলো ফিরতে সাতকলা পূর্ন হবে একেবারে। ডিনার টেবিলে বসে বন্ধু দের সাথে আড্ডা দিতে দিতে খাবার খাচ্ছেন বাড়ির কর্তারা। ঈশান রা যখন ফিরলো তখন ঘড়ির কাটা ঠিকঠিক নয়টা। বাইরে আবার ঝুম বৃষ্টি। ছেলেমেয়ে গুলোকে এভাবে ভেজা কাক হয়ে আসতে দেখে রাহেলা ছুটলেন সেদিকে।
____”বৃষ্টিতে ভিজেছিস কেনো সবাই!”
তিতির হাচি দিচ্ছে ক্রমাগত । ঈশানের নাকের পাটা লাল হয়ে এসেছে। বাকিরা সেরকম ভিজে না গেলেও এদের অবস্থা তো বেহালই। সাজিদ রা যার যার বাড়ির সামনে নেমে গিয়েছে। তমা কেও বাড়িতে নামিয়ে দিয়ে এসেছে। নয়ন গাড়ি পার্কিং করে ভিতরে আসবে। রাহেলা রিশা, রোশনি, রাফিকে আগলে ডাকলো মুক্তা কে। ভেজা কাপড় গুলো পাল্টে দিতে। আর বড়গুলোকে তাড়া দিলো দ্রুত ওপরে গিয়ে কাপড় ছেড়ে নিতে।
রাইসুল দেওয়ান এর বন্ধু দের বিনয়ের সাথে সালাম দিয়ে ওপরে গেলো সকলে।
____”তোর মেয়েরা তো একেকজন মাশাল্লাহ, রাসু। মাশাল্লাহ মাশাল্লাহ। একেকজন পরী।”
রাইসুল দেওয়ান বন্ধু হাফিজ এর কথা শুনে মৃদু হাসলো। নরম কন্ঠে বললো,
____”আলহামদুলিল্লাহ। আল্লাহ দিয়েছেন মেয়েদের। সবাই একেকটা রত্ন আমার।”
____”তোর মেয়ে টা তো বড় হয়ে গেছে। বিয়ে শাদির কথা ভাবছিস না। আমার ভাতিজা অ্যামেরিকার একটা সফটওয়্যার কোম্পানির ওনার। বিশাল কারবার ওদের ওখানে। পাত্রী খুজছে। তোর মেয়েটা তো মাশাল্লাহ। “
রাইসুল দেওয়ান স্ত্রীর দিকে তাকালেও। রাহেলা তার দিকেই তাকিয়েছে। রাইসুল সাহেব গলা খাকারি দিয়ে বললেন,
____”পড়ছে এখনো । আমিও চাপটাপ দেই না। তাছাড়া জানিসই তো। আমার মা বেচে আছেন এখনো। নাতিনাতনি দের বিয়ের ক্ষেত্রে সে খুব সচেতন। “
____”তা তো অবশ্যই। খালাম্মার সাথে কথা বলে দেখিস। ছেলেটা খুবই ভালো। নিশি মায়ের জন্য একদমই পারফেক্ট। “
মাথা নাড়লেন বন্ধুর কথায়। মেয়েরা বড় হচ্ছে। নিশি এবার মাস্টার্স এ। বিয়ের বয়স হয়ে গিয়েছে। আজ বাদে কাল পরের ঘরে দিতেই হবে। মেয়েদের কতকাল মায়া করে আটকে রাখা যায়! তিতির টা সবার ছোট। তার বিয়ে দিতে হয়েছে। হোক সেটা নিজের ঘরেই,তবুও। আর নিশি,নূরি দুজনেই যথেষ্ট বড় ওর থেকে। তাদের কথা এখন ভাবা শুরু করতেই হবে। নয়ন, নিশি, নূরি একেএকে সবারই বিয়ে দিতে হবে সামনের বছরকয়েক এর মধ্যে।
তাছাড়া চাইলেই তো আর যোগ্য পাত্র চোখের পলকে মেলেনা। খোজাখুজির ওপরেই থাকতে হয়। তিতির কে না হয় নিজের ছেলে দিয়ে বউ করেছেন। বাকি মেয়েদের তো আর তা নয়। সময় নিয়ে ভালো ছেলের খোঁজ করে যেতেই হবে।
____”আমি আগে ওয়াশরুম এ যাবো। “
তিতির নিজের হাতে জামাকাপড় নিয়ে ঈশানের পিছন পিছন এসে দাড়িয়েছে। ঈশান সবেই বাথরুম এ ঢুকতে যাচ্ছিলো। তিতিরের কন্ঠে থমকে দাড়ালো।
লাইট দিতে দিতে বললো,
____”সাথে আয়।”
তিতির দু কদম ছিটকে পিছিয়ে গেলো। চোখমুখে ইতস্তত ভাব এসে গেছে। মিনমিন করে বললো,
____”আপনিই যান আগে।”
তিতিরের কন্ঠে ঈশান এবার ঘুরে দাড়ালো। মেয়েটা শরীরে শাড়ি আষ্টেপৃষ্টে পেচিয়ে দাড়িয়ে আছে। ভেজা শাড়ি মেদহীন দেহের সাথে চিপকে আছে। ঈশান দু কদম এগিয়ে সামান্য ঝুকে বললো,
____”কি যেনো কথা ছিলো তখন?”
তিতিরের মুখ চুপসে এলো। তখন ঝোকের বশে বলে তো দিয়েছিলো। কথাটা মনেই ছিলো না ঈশানের কথায় মনে পরতেই হাড় হীম হয়ে আসলো। লজ্জায় আড়ষ্ট হলো। মাথা নুয়িয়ে বললো,
____”ঠান্ডা লেগে যাবে। আপনিই আগে যান। আমার সময় লাগবে। “
ঈশান ঠোঁট টিপে হাসলো । গম্ভীর কন্ঠে বললো,
____”আমার সাথে শাওয়ার নিলে সমস্যা কি!”
তিতির এর পায়ের তলা শিরশির করে ওঠে। একসাথে শাওয়ার নেবে মানে টা কি! লজ্জা শরম নেই নাকি। ঘটা করে সে এখন বলবে “ঈশান ভাই আমি আপনার সাথে শাওয়ার নিবো!” আজব মানুষ একটা।
____”কথা বাড়াবেন না। ঠান্ডা লাগ..
তিতিরের কথা শেষ হয়না। নিজেকে আবিষ্কার করে ঈশানের দু হাতে। আতংকে চেঁচিয়ে ওঠে তিতির,
____”আরেহ করছেন কি। নামান আমাকে। আপনি শাওয়ার নিয়ে আসুন।”
ঈশান নামালো না। তিতিরকে ঈশারা করলো হাতের জামাকাপড় গুলো পাশের ক্যাবিনেট এর ওপরে রাখতে। তিতির কাঁপা হাতে রাখতেই ওয়াশরুম এ ঢুকে ছিটকিনি আটকালো। তিতির ভয়ে জড়সড় হয়ে গেছে। তখন দুজনের মধ্যে হওয়া সমস্ত কথাগুলো মাথায় এসে বারি খেতেই লজ্জায় কুঁকড়ে যাচ্ছে।
ঈশান বাথটাবের কিনারায় বসালো তিতিরকে। হাটু ভেঙে বসে পরলো ওর সামনে।
____”কথা দিয়ে কথা রাখতে হয় এটা শিখিসনি?”
তিতিরের শরীর সত্যিই কাপছে। হুটহাট চাইলেই সব হয় নাকি! একটু প্রস্তুতি আছে না। বাড়ি এসে সারতে পারলো না। বাথরুমে টেনে এনে উল্টাপাল্টা কথা মনে করিয়ে দিলে ভয় হবে না!
তিতির আমতা আমতা করে বললো,
____”আমার একটু সময়…”
কথা শেষ হতে দিলো না ঈশান। খোলা চুলের নিচে হাত গলিয়ে ঘাড় চেপে নিজের দিকে টেনে ঠোঁটে ঠোঁট ডুবালো। অতর্কিত আক্রমনের জন্য প্রস্তুত ছিলো না মেয়েটা। দু হাত গিয়ে ঠেকলো ঈশানের বুকে। খামচে ধরলো ভেজা পান্জাবির কলার। ঈশানের চুমুর তীব্রতা ভয়াবহ। বিকেলে ঈশানের আদরে আদরে ওষ্ঠের ক্ষতগুলোর ওপর আবার এখন এমন অত্যাচারে ব্যাথায় চোখে পানি চলে এলো তিতিরের। ঈশান ঠোঁট ছেড়ে হাপাতে হাপাতে বললো,
____” কাদছিস কেনো? ইউ ডোন্ট লাইক ইট?”
তিতিরের উত্তরের আশায় সে থোরাই ছিলো। সেকেন্ড এর ব্যবধানে আবার হামলে পরলো নরম ওষ্ঠজোড়ার ওপরে। গভীর আশ্লেষে টেনে নিচ্ছে তিতরের অধরসুধা। এতো মনোযোগ এর ধরন দেখে মনে হবে এই মূহুর্তে এর থেকে গুরুত্বপূর্ণ আর কিছু হয়না। ঈশানের বুঝি তিতিরের ঠোঁট এর ক্ষতর কথা মাথায় এসেছে। দংশন এর থেকে আদরই বেশি টের পাচ্ছে তিতির। ক্রমাগত তিতিরের নিচের অধর টেনে নিচ্ছে, আলতো কামড়ে আবেশে অতিষ্ঠ করে তুলছে তিতিরকে। ঈশান ঠোঁট ঠোঁট রেখেই পাঞ্জাবির বোতাম খুলে ফেললো। কয়েক সেকেন্ড এর জন্য ঠোঁট জোড়া ছেড়ে একটানে খুলে ফেললো পাঞ্জাবি টা। তিতির বুক ভরে শ্বাস টানার আগেই আবার ঈশান ওষ্ঠাগত করে নিলো৷
তিতির এর শরীর কাপছে। ঈশানের উন্মাদনায় ভয় পাচ্ছে সে। কি হতে চাচ্ছে ধারনা করতেই পায়ের নিচের মাটি সরে যাচ্ছে তার। একটু তো সময় দেওয় উচিত নাকি! মেয়েদের একটু হলেও প্রিপারেশন থাকে। অন্তত সেটুকুর সময় টাও কি লোকটা দেবে না!
ঈশানের দক্ষ হাত তিতিরের বুকের ওপর থেকে সরিয়ে ফেলেছে আঁচল। ব্লাউজের বোতামে হাত রাখতেই তিতির চেপে ধরলো ঈশানের হাত। তিতিরের হাতের বাধা পেয়ে ঠোঁট ছেড়ে বিরক্ত চোখে তাকিয়ে বললো,
____”থামাচ্ছিস কেনো? আই ওয়ান্ট দিস নাইট।”
তিতির হা করে শ্বাস নিলো। ঈশান শক্ত চাপে ধরে আছে তার ঘাড়ের দিকটা৷ কামুক চোখে তাকিয়ে তার দিকে৷ আবার হিসহিসিয়ে বললো,
____”ডোন্ট সে ইউ ডোন্ট ওয়ান্ট ইট?”
তিতিরের বুকের ওঠানামায় মাতাল মাতাল লাগছে ঈশানের। সুডৌল বক্ষজোড়ারর ভাজে মুখ ডুবাতে মরিয়া সে। আবার ব্লাউজ এর বোতাম অবধি হাত যেতেই তিতিরের বাদা পেলো। ঈশান থমকে তাকালো তিতিরের দিকে। গম্ভীর কন্ঠে বললো,
____”চাস কি তুই আমাকে? জাস্ট ইয়েস অর নো?”
তিতির হতাশ চোখে তাকায়। এসব মুখে জিজ্ঞেস করার জিনিস। সবে বাইরে থেকে এলো। তার কিছু তো প্রিপারেশন আছে।। তিতির কোনোমতে বললো,
____”আ..আ..আমি “
____”আমি কি কন্টিনিউ করবো ? হ্যা নাকি না?”
____” একটু সময়…”
ঈশান আচমকা ছেড়ে দিলো তিতিরকে। উঠে এলো বসা থেকে। ভেজা পান্জাবি টা তুলে রেখে যেতে যেতে বললো,
____”দ্রুত বের হোস। আমি শাওয়ার নেবো।”
তিতিরকে হতভম্ব করে দিয়ে ঈশান বেড়িয়ে গেলো বাথরুম থেকে। তিতির থ মেরে গেলো। ঈশান রাগ করেছে বুঝতে সময় লাগলো না তার। তিতির নিজের দিকে তাকালো। আঙ্গুল ছোয়ালো নিজের ঠোঁটে। ঈশান রাগ করেছে মনে হতেই বুকটা দুমড়েমুচড়ে গেলো। ঈশানের কাছে নিজেকে সমর্পণ করবে কথা তো দিয়েইছিলো। লোকটার আর একটু ধৈর্য হলো না!
রাইসুল দেওয়ান রা সকলেই এসে বসেছে চন্দ্রা দেওয়ান এর কামড়ায়। ঈদের একটা দিন। আত্মীয় সজন আপ্যায়ন করতে করতে নিজেদের মধ্যে বসে দু দন্ড কথা বলাই হলো না। তাছাড়া রাইসুল দেওয়ান এর ব্যাক্তিগত ভাবেও কিছু বলার আছে মা কে।
বৃদ্ধা পান চিবুচ্ছে। মুক্তা শাশুড়ীর পায়ে গরম তেল মালিশ করে দিচ্ছেন। রাহেলা, রিক্তা দুজনেই বিছানার এক পাশে বসা। চন্দ্রা দেওয়ান এর ননদ, জায়েরা সারা সন্ধ্যা এখানেই ছিলো। সব বৃদ্ধা রা একসাথে গল্পগুজবে মেতেছিলো। তারা শুতে চলে যেতেই ছেলে,ছেলের বউরা সবাই এসেছে। রাইসুল সাহেব মায়ের দিকে তাকিয়ে বললেন,
____”মা, তোমার সাথে কিছু কথা ছিলো জরুরি। “
মাথা নাড়লেন বৃদ্ধা। ছেলের দিকে ইশারা করলেন কি বলবে সেটার বলার।
____”ঈশান আর তিতির এর বিয়ের বিষয়টা নিয়ে। ঘনিষ্ঠ কয়েকজন কে নিয়ে ছোটখাটো ভাবে বিয়েটা সারা হয়েছে। হাতেগোনা কয়েকজন জানে৷ তবে এরকম একটা বিষয় কি অতো চাপিয়ে রাখা যায়! কানাঘুষা হয় এলাকায়। আমাদের ছেলেমেয়ে তাই কেউ সামনাসামনি বলে সাহস করে না।”
রাশেদ দেওয়ান, রহিয়ান দেওয়ান তারাও ভাইয়ের পাশেই বসা৷ তারা জানে বড় ভাই কি নিয়ে কথা টা বলতে চান। ঈশান তিতির এর বিয়ের কথা কাউকে না জানালেও মানুষ এ নিয়ে কথা বলছে। ওদের যে বিয়ে হয়েছে এটা শুরুর মতো এর গোপন নেই। এলাকার মধ্যে এসব বাতাসের আগে আগে ঘোরে। নেহাৎ তাদের পরিবার কে এলাকার সবাই সামীহ করে তাই সেভাবে বলছে না কেউই। বৃদ্ধা ছেলের দিকে তাকিয়ে বললেন,
____”বুঝলাম না ভালো করে। বুঝিয়ে বলো।
____”আমি চাচ্ছিলাম ওদের বিয়েটা ঘটা করে দিয়ে সবাইকে জানাতে। আত্মীয় সজন, তিতিরের বাবার বাড়ির লোকজন সবাই যখন আরও পরে জানবে বিষয়টা খারাপ দেখায় না? ওর বড় চাচা জানেন। বাকিরা? তাদেরও জানানো দরকার। বাড়ির ছেলেমেয়ের বিয়ে দিয়েছি। এটা লুকিয়ে রেখেছি জানলে এলাকাতেও নানা জন নানা কথা বলবে। এরই মধ্যে অনেকেই আন্দাজ করছে আরকি। সবাই জলঘোলা করার আগে আমরাই অনুষ্ঠান করে ফেললে আর কথা বারবে না।”
চন্দ্রা দেওয়ান চুপচাপ শুনলেন ছেলের কথা। ঘরময় নিরব। সবাই চুপ করে আছেন। বৃদ্ধা খানিক সময় নিয়ে বললো,
____”আমার তো সমস্যা নেই। কিন্তু তোমার ছেলে তো রাজি হচ্ছে না সবাইকে জানাতে। না জানাতে চাওয়ার কারণ টাও বলছে না। বিয়ের প্রায় দেড় -দু মাস হতে চললো। এখন জানিয়ে বিয়ের আয়োজন টা করলে সত্যিই ঝামেলা মুক্ত হওয়া যায়।”
মাথা নাড়লেন সকলে। সবাই কমবেশি এটাই ভাবে। চন্দ্রা দেওয়ান তো আরও আগে থেকে চান ধুমধাম করে একটা আয়োজন করতে। কিন্তু ঈশানের বারণে এগোতে পারছেন না তারা।।
____”ঈশান এর সাথে কথা বলা দরকার। তিতিরেরও মত জানা দরকার। বিয়ে টা যখন হয়েই গেছে। জানাতে সমস্যা কোথায়।”
____”বলে দেখো তোমার ছেলেকে। তার আর কত সময় লাগবে সেই জানে!”
যতটা সম্ভব দ্রুত শাওয়ার নিয়ে বেরিয়ে এলো তিতির। ঈশান বারান্দায়। বৃষ্টির মধ্যে দাড়িয়ে আছে নাকি লোকটা! তিতির মাথায় তোয়ালে টা পেচিয়ে হুড়মুড়িয়ে এগিয়ে এলো বারান্দায়। বাইরে বেশ বৃষ্টি এখনো। ঈশান উদাম শরীরে দাড়িয়ে আছে। বৃষ্টির ঝাপটায় পেশল শরীর টা চিকচিক করছে। তিতির খুক খুক কাশলো। ধীরে ডাকলো।
____”ঈশান ভাই, আমার হয়ে গেছে। শাওয়ার নিয়ে নিন।”
মেজাজ খরাপ হলো ঈশানের। বিরক্তি তে চোখ বুজে ফেললো। মুডের বারোটা বাজাতে এই মেয়ে সেরাহ্। আবার ভাই! আজীবন এমন থাকলে ভোগাবে তাকে খুব।
নড়াচনা না পেয়ে তিতির আবার ডাকলো।
____”ঈশান ভাই…?”
ঈশান ঘুরে চলে আসে রুমে। তিতির সাথে সাথেই আসলো ভিতরে। বেলকনির থাই গ্লাস আটকে ঘুরতেই ধাক্কা খেলো ঈশানের পিঠের সাথে। ঈশান তোয়ালে নিতে দাড়িয়েছিলো। ঈশান একটাবারও ফিরে তাকালো না। বাথরুম এর দিকে যাবে তখন টান পরলো হাতে। তিতিরের ছোট্ট হাতটা আকড়ে ধরেছে তার হাতের কবজি। পাশ কাটিয়ে সামনে এলো। লজ্জা মিশ্রিত কন্ঠে বললো,
____”আপনি কি আমার ওপর রেগে আছেন?”
ঈশান জবাব দিলো না। মাথা এমনিতেই গরম। বাথরুমের দিকে পা ফেলতেই আবার পথ আটকালো তিতির
____”আমার কথাটা শুনুন একবার।”
____”শাওয়ার নিতো দিবি না ! ঠান্ডা,জ্বরে মারতে চাস?”
দাতে জিব কেটে দুদিকে মাথা নাড়লো তিতির। ব্যাস্ত কন্ঠে বললো,
____”তা কখন বললাম। রেগে আছেন আপনি আমার ওপর। আমি তখন একটু সময় চেয়েছিলাম। আর আপনি অধৈর্যের মতো…”
ঈশান ব্যাঙ্গাত্মক হাসলো এ যাত্রায়। গম্ভীর কন্ঠে বললো,
____”সময় চেয়েছিস,দিয়েছি। এতো কৈফিয়ত দিচ্ছিস কেনো! বিয়ের প্রায় দু মাস হতে চললো। সব ঝামেলার অবসান ঘটলো। তার পরও তোকে নিজের করে চাওয়ায় আমি অধৈর্য? বিয়ে করা বউ তুই আমার। প্রথম রাতেই জোর করতে পারতাম না? দিনের পর দিন কেটেছে। নিজের ধৈর্যর অন্ত ঘটিয়ে তোকে কাছে টানতে পারতাম না? সময় নিয়েছি, তোকেও সময় দিয়েছি। এতকিছুর পর আজও যদি শুনতে হয় আমি অধৈর্য্য তাহলে তুই-ই ঠিক। টেক ইও্যর টাইম। আমি কাছে টানবো না কখনো। নিজের যদি এ জীবনে কাছে আসতে মন চায়, আসতে পারিস। না হলে কিচ্ছু হবে না আমাদের। কথাটা আগেও দিয়েছিলাম। আবার দিলাম। ঈশান আরশাদ কিন্তু কথা রাখতে জানে।”
তিতির মাথা নুয়িয়ে ফেললো খানিকটা। সে কি চাইলো আর কি হলো। তার দু হাত এখনো চেপে ধরে রাখা ঈশানের হাতের কবজি। ধুকপুক করছে বুকটা। খানিক্ষন ইতস্তত করে লজ্জারুন মিনমিনে কন্ঠে বললো,
____”আমি… আমি জাস্ট তখন ফ্রেশ হওয়ার জন্য সময় চাচ্ছিলাম। আজ… আজ রাতে..।”
তিতির কথা শেষ না করে থেমে রইলো। ঈশান ভ্রু কুচকে তাকালো তিতিরের দিকে। তবে মন গললো না। তখন বাধা দেওয়ায় হুট করেই রাগ মাথায় চরেছে।তিতিরের হাত ছাড়িয়ে দিয়ে গম্ভীর স্বরে বললো,
____”আমাকে ভয় পেতে হবে না। বাঘ ভাল্লুক না আমি। এতোদিন জোর করিনি। আজও করবো না। তোর ইচ্ছে না থাকলে কাছে টানার মানেই হয়না। তোর সিদ্ধান্ত এটা। “
ঈশান আবার পা বাড়াতেই তিতির দু হাতে জড়িয়ে ধরলো ঈশানকে। ঈশানের নগ্ন ভেজা বুকে এসে ঠেকলো তার নরম গাল।
____”হুট করে ওভাবে কাছে টানেন, আমি শারীরিক মানসিক ভাবে ফিট ছিলাম না তখন।”
ঈশান ঠোঁট কামড়ে দাঁড়িয়ে রইলো। তিতিরকে ধরলো না। তার কেনো যেনো মনে হচ্ছে সত্যিই বুঝি সে উতলা হচ্ছে বেশি। মেয়েটাকে আর একটু সময় বোধহয় দেওয়া উচিত। তাদের মধ্যে সব ঠিক হলইও চার পাঁচদিন। তিতির সম্ভবত এখনি চাচ্ছে না। বা মেয়েদের আলাদা একটা মানসিক প্রিপারেশন এর দরকার হয়। সে বারবার জোর করে,খপই হারিয়ে মেয়েটাকে আরও অপ্রস্তুত করে দিচ্ছে।ঈশান দু হাতে তিতিরকে সরালো। তিতির আহত চোখে তাকালো।ঈশান গমগমে কন্ঠে বললো,
____” টেক ইও্যার টাইম। ঘুরেফিরে ওই কথাই না হয় থাকুক। তুই যেদিন মুখে বলবি আমাকে এখন তোর লাগবে। আমি তখন তোকে নিজের করবো। ছাড় এখন। মাথা যন্ত্রণা করছে।শাওয়ার নিতে আর দেরি হলে জ্বরে পরে যাবো।”
তিতিরকে পাশে সরিয়ে ঈশান দাড়ায় না। তিতির আহত চোখে তাকালো। লোকটা এত অবুঝ কেনো! সে কি বাধা দিতো আজ রাতে? এটা একবারও বলেছে! এতো একরোখা হলে চলে?
দরজার শব্দ হতেই এগিয়ে দরজা খুললো তিতির। বাইরে নিশি এসে দাড়িয়েছে। তাদের নিচে ডাকা হচ্ছে। চন্দ্রা দেওয়ান ডেকেছেন সবাইকে। বোনকে বলে দিলো ঈশান বের হলে একসাথে আসবে দুজন।
নিশি চলে যেতেই আবার সেলফোন বাজার শব্দে ভ্রু কোচকালো। ব্যাগ থেকে বেরই করা হয়নি ফোনটা।
সকালে মিনুর সাথে কথা হয়েছিলো। কথা শেষ করতে পারেনি। সম্ভবত সেই।
তবে ফোনের দিকে তাকাতেই অচেনা নাম্বার। ট্রু কলারেও কোনো নাম দেখাচ্ছে না। অচেনা নাম্বার থেকে কল আসলেই আজকাল রাহাতের কথা মাথায় আসে তার। তখন ভয় হয়। দ্বিতীয় বার ফোন বাজতেই জানালার কাছে গিয়ে ফোনটা তুললো। ওপাশ থেকে ভীষন সফট পুরুষালি একটা কন্ঠ শোনা গেলো,
____”তিতির? “
____”জ্বী।”
____”কেমন আছো।”
____”আলহামদুলিল্লাহ। কে বলছেন?”
____”পথেঘাটে ফুল কেনার অভ্যেস আর নেই?”
____”জ্বী? মানে বুঝলাম না।”
____”তোমাকে বাঁচাতে গিয়ে একটা গাড়ি এক ফুলওয়ালীর ওপর তুলে দেওয়া হয়েছিলো। মনে আছে?”
তিতির থমকালো। থরথরিয়ে কেঁপে উঠলো শরীর। চোখের সামনে ভেসে উঠলো কয়েক বছর আগের একটা চিত্র! একটা দূর্ঘটনা। কিন্তু লোকটা কি বললো? তাকে বাঁচাতে গিয়ে মানে!
____”আপনি কে?”
____”গাড়ির মালিক।”
____”কি সব বলছেন। কেনো ফোন করেছেন?”
____”এ বাবা তুমি জানতে না? গাড়িটা তোমার ওপরে উঠতো। পরমুহূর্তে তোমার রুপে মুগ্ধ হয়ে পরিকল্পনা পরিবর্তন করতে হয়। জেনে হোক বা না জেনে। একটা মানুষ এর মৃত্যুর জন্য দায়ি তুমি! ছিহ্”
তিতির ফোন কেটে দিলো। কাঁপা হাতে ফোনটা ছুড়ে দিলো বিছানায়। ঈশান বের হয়নি এখনো। ওই ঘটনার পর দীর্ঘদিন সাইকিয়াট্রিস্ট দেখাতে হয়েছে তার। চোখের সামনে থেতলে যাওয়া মৃতদেহ দেখে সয্যাশায়ী ছিলো বহুদিন। একে বয়স কম ছিলো তার ওপর গাড়িটা সম্ভবত তাকেই ধাক্কা দিতো। ভাগ্য গুনে বেচে গেছে। সময়ের সাথে সাথে ভুলে গিয়েছিলো সেসব। আজ হঠাৎ এরকম একটা ফোনকলে চোখের সমানে ভেসে উঠছে সব। সে দায়ি! সে কি করে দায়ি হয়? দু’জনেই পথচারি ছিলো।
ঈশান বেরিয়েই ওভাবে তিতিরকে এক দৃষ্টিতে পাথর হয়ে দাড়িয়ে থাকতে দেখলো। মাথা মুছে তেয়ালে মেলে দিতেই তিতির খেয়াল করলো ঈশান কে।
ধীর গলায় বললো,
____”নানুআপু ডেকেছে।”
ঈশান কথা বললো না। টি গায়ে জড়িয়ে বেরিয়ে গেলো ঘর থেকে। তিতির দীর্ঘশ্বাস ফেলে। মানুষটার ওপর মাঝেমধ্যে অস্বাভাবিক রাগ হয় তার। কখন,কি কারনে রাগ করে তা সম্ভবত নিজেও বলতে পারবে না। সে রাগের কারণ থাকুক বা না থাকুক। খালি ত্যাড়ামি।
____” নয়ন কোথায় মেজো বউ। ওকেও আসতে বলো।”
রিক্তা ছেলেকে ডাকতে যাবে তার আগেই নয়ন আর নূরি দুজনেই আসলো। ঈশান তিতির সবেই এসে বসেছে। রিশা, রোশনি রা ঘুমিয়ে পরেছে। আজকে সারাদিন এর ঘোরাঘুরি তে বড্ড ক্লান্ত সকলে। বৃষ্টির পানি মাথায় পরায় দরুন সবারই মাথা টনটন করছে বলা যায়।
____”বড় দাদুভাই, বৃষ্টি তে ভিজে তো ঈদের দিন অসুখে পরবো বলে মনে হচ্ছে সকলে।”
ঈশান মৃদু হাসলো। দিদার পাশে বসেছে। চন্দ্রা দেওয়ান এর হাত ধরো বসে আছে।
____”কি বলবে বলে ডেকেছো?”
বৃদ্ধা কোনো ধরনের ভনিতা ছাড়াই বললেন,
____” আর কত সময় লাগবে তোমাদের? “
দিদার কথা ধরতে না পারার কারণ নেই। কয়েকদিন হলেই বাড়ির সকলেরই একই কথা। বাবা মা থেকে শুরু করে সবার। তিতির কে দেখলো। রাহেলাকে ঘেষে বসে আছে।গম্ভীর কন্ঠে বললো,
____”এতো তাড়াহুড়ো কেনো?”
____”দু মাস হতে চললো দাদুভাই। এলাকায় একটা সম্মান আছে আমাদের। একটা সময় তোমাদের সম্পর্ক একরকম ছিলো। এখন অন্যরকম। এলাকার মানুষ আগের সম্পর্ক টা জানে। এটা কানাঘুষায় জানবে। এটা কি ভালো দেখায়? দেওয়ান বাড়ির একটা মানসম্মান আছে তো।”.
ঈশান এর মুখ বেশ গম্ভীর। দিদার হাতে মুঠো শক্ত করে ধরে বললো,
____”আমরা পালিয়ে বিয়ে করিনি দিদা। পরিবার এ সম্মতি তে আইন,ধর্ম মেনে বিয়ে হয়েছে। তোমরা দিয়েছো। এলাকার মানুষ জানলো না জানলো, কে কি বললো তা দিয়ে কি এসে যায়!”
____”তা হয়না দাদুভাই। বিয়ে একটা সামাজিক রীতিও। তার তুমিই তো বললে। পালিয়ে তো আর বিয়ে টা হয়নি। সম্মতিতেই হয়েছে। তাহলে জানাতে সমস্যা কোথায়? এই দেখো। বাড়িতে তেমার দাদুর বোনেরা, আমার জা, ননদ রা এসেছে। ওদেরও জানাতে পারছি না। পরে যখন জানবে কতটা দৃষ্টি কটু দেখাবে? নাকি বিয়েটা এখনো তুমি মানতে পারোনি?”
ঈশান চুপ করে রইলো। সবার কথা যুক্তিযোগ্য। কিন্তু তার অবচেতন মন কিছু একটায় বাধা দিচ্ছে। ইয়াজ নামের ওই ছেলেটার ঝামেলা ক্লোজ না করা পর্যন্ত সে তিতিরকে টাইমলাইন এ আনতেই চায়না। হতে পারে তবুও তিতিরের খোঁজ লোকটার কাছে আছে বা থাকবে। তবুও। সে স্পষ্টত বলেছে ঈশানের রাগ সে তিতিরের ওপর খাটাবে। ঈশান আরশাদ নিজের জীবনের পরোয়া করেনা। না আগে করেছে আর না তো ভবিষ্যতে করবে। কিন্তু এই কাছের মানুষ গুলোর প্রশ্ন যদি ওঠে তাহলো সে অপরাগ। ইয়াজ আদতে কে,কি শত্রুতা তার ঈশানের সাথে। কেনোই বা তার বোন, বউয়ের পিছনে লেগে আছে সেটা না জানা অবধি তার সামনের পরিকল্পনা সাজাতেই পারবে না।
দিদার দিকে তাকিয়ে বললো,
____”এলাকার পরিস্থিতি ভালো নয় দিদা। দু দুটো খুন হয়ে গেলো। দুটো মেয়ে এরকম মার্ডার হলো,পুলিশ এখনো কিচ্ছু খুঁজে বের করতে পারেনি। কাল পরশু থেকে এলাকায় রেড এলার্ট জারি করে দেওয়া হবে। পুরো দমে তদন্ত চলবে। সাজিদ এর ব্যাস্ততা তো জানোই। আর আমাদের পরিবার এই এলাকার মাথা। ওই ঝামেলা গুলোর শেষ অবধি সমাধান না করেই বিয়ের আয়োজন শুরু করা যুক্তিযোগ্য কি? “
খানিক দম নিলো ঈশান। বাবা, চাচা, দের দিকে তাকালো। সবাইকে লক্ষ করে বললো,
____”তোমাদের আমি জানাতে চাই তিতির আর আমি বিয়েটা মন থেকে মেনে নিয়েছি। আমরা আমাদের মতো গুছিয়ে নিচ্ছি সবটা। আমাদের নিজেদের জন্য সময় নয়,পারিপার্শ্বিক বিষয় গুলো মিলিয়ে আরেকটু সময় নেওয়া উচিত। বাবা, ভুল বললাম কি আমি?”
রাইসুল দেওয়ান মনোযোগ দিয়ে ছেলের কথা শুনলেন। ছেলের কথাগুলো একদম দায়িত্বশীলের মতো কথা। সত্যিই তো তাই। তার মাথায় এমন একটা বিষয় এলো কি করে! তারা এলাকার বিশেষ গন্যমান্য লোকজন। পুরো এলাকা তাদের কথা মানে, মেনে চলে। এর মধ্যে এতো বড় দুটো ঝামেলা ঘটে গেলো। সুবর্ণা তাদের নিজের মেয়েরই মতো।
ছেলের কথায় মাথা নেড়ে সায় দিলেন।
____”তোমরা দুজন দুজনকে মেনে নিয়েছো এটা শুনে আমরা খুশি। খুবই খুশি। আর তোমার বাকি কথাও সঠিক। বেশ, তাই হোক। আর কটা দিন আমরা সানন্দে অপেক্ষা করতে পারবো। কালপ্রিট ধরা পড়ুক। শাস্তি পাক। তারপর সব হবে।”
চন্দ্রা দেওয়ান হাসলেন। নাতির মাথায় হাত বুলালেন। তিতিরের দিকে তাকালেন একবার। তিতির স্বাভাবিক ভাবে নিশিদের পাশে বসা। ঈশান কে নরম গলায় বললেন,
____”আমাকে একটা প্রশ্নের জবাব দাও দাদুভাই। সত্যি বলবে তো?”
____”আমি তোমাকে মিথ্যা বলি?”
____”তা বলো না। তবুও। কথাটা আমার পুত্তুল এর আগে তোমাকে জিজ্ঞেস করতে চাই। কারণ তোমাদের বিয়ের সময় অমত টা তোমারই ছিলো বেশি।”
ঈশান সহ সকলেই বুঝলো বৃদ্ধা এখন কি কথা বলতে চাচ্ছেন। হলোও তাই। চন্দ্রা দেওয়ান নাতির হাত নিজের বুকের টেনে শুধালেন,
____”আমি কি তোমাদের বিয়ে দিয়ে ভুল করেছিলাম?”
ঈশান তাকালো তিতিরের দিকে। তিতির এক নজর ঈশানের দিকে তাকিয়ে চোখ সরিয়ে নিলো। ঘর ভর্তি বড়রা সকলে। লাজুক মুখ নামিয়ে নিলো। ঈশান দুদিকে মাথা নাড়লো।
____”একদম না। কোনো ভুল করোনি। আমরা ভালো আছি দিদা। মানিয়ে নিচ্ছি নিজেদের। সামনে ইনশাআল্লাহ ভালো থাকবো। তোমার পুতুল কে ভালো রাখবো। ভরসা করে যখন আমার হাতে তুলে দিয়েছিলে। আশা রাখি ভরসা রাখবে শেষ অবধি। হাত যখন ধরিয়েই দিয়েছো, তখন যে পরিস্থিতি তেই হোক ধরেছি হাতটা। ওকে আগলে সামনে হাত ধরেই জীবন পারি দিয়ে দিবো।”
সাঁঝের মায়া পর্ব ৩৯
উপস্থিত সকলেই এতোটা মুগ্ধ হলো ঈশানের কথায় বলার বাহিরে। রাহেলা তো কেঁদেই ফেললেন এ যাত্রায়। বাকিরাও তাই। তিতির অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো ঈশানের দিকে। আগের সাথে আজকের ঈশানের আকাশ পাতাল তফাত। আজকের ঈশান ওকে আগলে রাখে,ভবিষ্যতের ভরসা দেয়। আর কি লাগে! ভালোবাসার মানুষ এর হাতে হাত রেখে গোটা জীবন পারি দিতে ভাগ্য লাগে। আর সেই ভাগ্য যে তারও আছে ঈশান আজকাল প্রতিমুহূর্তে তাকে বোঝায় যত্নে,ভালোবাসায়। ভালেবাসি সত্যিই মুখে প্রকাশ করতে হয়না। নারীদের বিশেষ গুনের একটি, তারা ভালো মন্দ চট করে ধরতে পেরে যায়। ঈশান এ জীবনে তাকে ভালেবাসি না বললেও চলবে। শুধু মানুষ টা কখনো না বদলাক।
