Home সাঁঝের মায়া সাঁঝের মায়া পর্ব ৪৬

সাঁঝের মায়া পর্ব ৪৬

সাঁঝের মায়া পর্ব ৪৬
দুর এ দিলশাদ্ দুআা

দিনের তপ্ততা কমে গিয়ে রাতের শীতলতা বইতে শুরু করেছে। মৃদু বাতাস বইছে প্রকৃতিতে। পরিস্কার আকাশে চাঁদ দেখতে পাওয়া যাচ্ছে। মেঘের আড়ালে মুখ লুকোচ্ছে বারংবার। আধো আধো অন্ধকারে ছাদের চারদিকে মাথা তুলে দাড়িয়ে থাকা আম,কাঠাল,মেহগনিসহ আরও নানা জাতের গাছ। বাতাসে সেসব গাছের ডালপাতা একাত ওকাত হয়ে হেলেদুলে যাচ্ছে।
রেলিঙে পিঠ ঠেকিয়ে দিয়ে দাড়িয়ে আছে তমা। নিচে যাওয়া দরকার। তবে কেনো যেনো পা চলতে চাইছে না। ভালোবাসার সংঙ্গা আদতে অনেক ধরনের। ভালোবাসলে মনের জোর রেখেই সামনের মানুষটাকে মনে জায়গা দিতে হয়। সেও যে একই অনূভুতি নিয়ে ভালোবাসা ফেরত দেবে সেটা আশা করা ভুল,ভীষন বড় ভুল।
সিঁড়িকোঠার দরজার ওপাশ থেকে ধীর পায়ে ছাঁদে উঠে আসলো তিতির। চাঁদের আলোয় দেখা গেলো মলিন মুখে দাড়িয়ে থাকা তমাকে।নিজে ঘরেই যাচ্ছিলো, পাশে তমা কে না পেয়ে উল্টো ফিরতেই অনাকাঙ্ক্ষিত কথাগুলো কানে এসে পরেছে তিতিরের। আড়ি পেতে শোনা অন্যায় যেনেও সরে যেতে পারেনি।

—‘পূর্নিমা কবে বলতো?’
তিতিরের কন্ঠে তমা চকিত তাকালো ডানদিকে। পাশে তিতির দাড়ানো। তারই ভঙ্গিতে রেলিঙে হেলান দিয়ে দাড়ানো। তমা শান্ত কন্ঠে বললো–
—‘সে হিসেব তুই ভালো রাখিস।’
—‘আজ মনে পরছে না।’
—‘ফোনে চেক করি দাড়া ।’
তমা ফোনে নজর দেওয়ার আগেই তার হাতে হাত রাখলো তিতির। বোনের দিকে না তাকিয়ে দৃষ্টি দূর আকাশে রেখে বললো–
—‘ভালোবাসলে এতো সহজে ভেঙে পরলে চলে? আর কার সামনে নির্বিকার হওয়ার চেষ্টা করছিস? আমার? সেটার কি খুব দরকার?’
তমা আর সামলালো না নিজেকে। চাইলোই না। এই এক তিতিরের কাছে সে ভেঙেচুড়ে সব প্রকাশ করে ফেলতে পারে। একই বিষয় তিতিরের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। তমার দিকে ফিরে জড়িয়ে নিলো মেয়েটাকে। মাথায় হাত বুলিয়ে নরম কন্ঠে বললো–

—‘আমরা যাদের ভালোবাসি সে-ও অপর দিক থেকে আমাদের একই রকম ভালোবাসবে এটা সবসময় তো না-ও হতে পারে, তমা। সবসময় কি এরকম হয়? একতরফা ভালোবাসার কাকে বলে তাহলে? ভালোবাসলে মন শক্ত করতে হয়। নিজেকে শক্ত করতে হয়। ধৈর্য, অপেক্ষা সব মিলিয়েই ভালোবাসা তৈরি হয়। আজ ভালোবাসা নেই,কে জানে কাল হয়তো তৈরি হলেও হতে পারে! অথবা এমনও হতে পারে সে তোর ভাগ্যেই নেই। মোটকথা দু’টো বিষয়ই মাথায় রেখে আমাদের সামনে এগোতে হয়।’’
তমা ফুঁপিয়ে উঠলো তিতিরের ঘাড়ে মুখ গুঁজে। এতক্ষণ শান্ত রাখছিলো নিজেকে। খানিকপরে নিজেকে সামলে নিয়ে হয়তো স্বাভাবিক ভাবে নিচেই যেতো। কিন্তু তিতিরের প্রশ্নে নিজেকে সংযত করা সম্ভবপর হলো না তার।
—’ নয়ন ভাই পাল্টে গেছে বার্বি। কি পরিমাণ রুক্ষ ভাবে বিহেভ করে জানিস না তুই।’
—’শুনেছি আমি সবটাই।’
তমা এ যাত্রায় মুখ তুললো। তিতিরের দিকে জিজ্ঞাসু গলায় বললো,

—’তোর মনে হলো এ ব্যাবহার স্বাভাবিক? ‘
মাথা নাড়লো তিতির। মোটেই স্বাভাবিক নয়। নয়ন ভাই কারোর সাথে এই টোনে কথা বলতে পারে এ তাদের কল্পনারও অতীত। একটু ধমক তাও নূরিকে টুকটাক দেয়। বাকিদের কাছে সবসময় বেস্ট নয়ন। তাছাড়া তমার পাগলামি, ছেলেমানুষীগুলোও আজীবন সায় দিয়ে এসেছে নয়ন। তমার নয়নের প্রতি অনূভুতির হদিস বহু আগে থেকেই জানে তিতির। এবং তিতিরের খুব ধারনা ছিলো সেটা নয়নও টের পায়। আজ বাদে কাল যে তমা ফট করে নয়নকে সেটা বলে দিতো এও জানতো সে। আজ বলায় ক্ষতি দেখে না সে। ভালোবাসা নিজের মধ্যে চেপে রাখার থেকে বড় ভুল হয়না।

—’কাঁদা বন্ধ কর আগে। শোন আগে। ‘
—’নয়ন ভাই অন্য কাউকে ভালোবাসে তিতির। সে কে? কার জন্য এত পরিবর্তন হুট করে?’
সেটা তিতিরের অজানা। তবে নয়নের পরিবর্তন চোখে পরে সবার। মা চাচিরাও আলাপ করে নিজেদের মধ্যে। হুট করেই কেমন যেনো অতিরিক্ত ম্যাচুয়র হয়ে গেছে মানুষটা । অফিস, বাড়ির দায়িত্ব এসবেই বেশি পাওয়া যায় তাকে। আগের মতো ভাইবোনদের সাথে আড্ডা,ফূর্তি এসবে নেই সে।
—’সেটা তো আমার জানা নেই বোন। কিন্তু আগেই এতো হতাশ হচ্ছিস কেনো? হয়তো কোনো কারণে নয়ন ভাই ডিসটার্ব আছে। সে কারণে…একটু না হয় অপেক্ষা কর, দেখ।’
—’তারপরও যদি জানতে পারি নয়ন ভাই ওই মেয়েটাকেই…’
—’তাহলে নিঃশব্দে সেখান থেকে সরে আসা কি বুদ্ধিমান এর কাজ নয়? ভালোবাসায় জোরজবরদস্তি চলে? উচিত? ‘
তমার কান্নার গতি বাড়ে। তার জানা নেই নয়ন ভাই সত্যিই কাউকে ভালোবাসে, নাকি কোনো কিছুতে বিরক্ত হয়ে এমন বলছে। তবে সে অপেক্ষা করবে। ভালোবেসে অপেক্ষাই যদি করতে না পারলো তবে সেটা আবার কিসের ভালোবাসা!

—’ হ্যা রে মা, এই গরমে শাড়ি পাল্টাসনি কেনো এখনো?’
তিতির সবেই খাওয়া শেষ করে উঠেছে। হাতের এঁটো থালাটা রান্নাঘরে রেখে হাত ধুতে ধুতে বললো,
—’সময় পাইনি। ছাদ থেকে নেমেই খেতে ডাকলে।’
তিতিরের কথায় নিশি আড়চোখে একবার মা চাচিদের দিকে তাকালো। বড়মেয়ের মুখের দুষ্টু হাসিতে দিব্যি টের পেলো তিতিরের শাড়ি এখনো না খোলার কারণ। অবশ্য নিশি, নূরি ওরা কেউ-ই শাড়ি এখনো খোলেনি। সত্যিই সময় পায়নি। ঘরে এসে সারা বিকেল ধরে তোলা ছবি দেখতে মগ্ন হয়ে গিয়েছিলো। তারপর তো রাতের ডিনারের ডাক পরতেই ছুটে আসতে হলো। বাড়ির কর্তারা থাকলে সবাই এক টেবিলে বসে খাবার খাবে এটাই নিয়ম।
ওদিকে মুক্তা নিজের ছেলে-মেয়েদের খাওয়াচ্ছে। রাত হয়েছে প্রায় দশটার মতো। সবাই আদতে ঈশানের জন্য অপেক্ষা করছিলো। রিশা রা তিনজন তো খেতেই চাচ্ছিলো না ঈশান না ফেরা অবধি। তিতিরও তাই। কিন্তু ঈশান খানিক আগে জানিয়েছে জ্যামে আটকে আছে ফিরতে দেরি হবে।
—’তমা কোথায়! ওকে না খেতে ডাকলাম?’
রাহেলা মেয়েদের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসু দৃষ্টি দিলো। জবাব টা দিলো তিতিরই।
—’ওর শরীরটা খারাপ লাগছিলো মামনী। তাই চলে গেলো।’
রাহেলার ভ্রু কুচকালো। সারা বিকেল,সন্ধ্যা হৈ হৈ তো ওর কারণেই হলো। রাহেলার কাছে বায়না করলো বিরিয়ানি খাবে। রান্নাও হলো তাই। আর সেই নাকি আগেভাগে চলে গিয়েছে! তাও না জানিয়েই।

—’একা গেলো?’
—’আমি এগিয়ে দিয়েছি মামনী। ‘
—’মানা করবি না? খাবার খেয়ে যেতো।’
তিতির জবাব দেয় না। এক সেকেন্ডের দৃষ্টি ফেলে নয়নের ওপর। সে নির্বিকার খেয়ে যাচ্ছে ডাইনিংয়ের এক কোণায় বসে। এদিকে কোনো কথায় যেনো মন নেই। তিতিরের আজ কেনো যেনো এই প্রথম নয়ন ভাইয়ের ওপর রাগ হলো। তবে মুখে রাহেলা কে উদ্দেশ্য করে বললো,
—’খাবার টা প্যাক করে দাও। আমি গিয়ে দিয়ে আসি।’
রিক্তা দ্রুত হাতে গেলো সেটা করতে। এসে এগিয়ে দিলো নয়নের দিকে। ছেলেকে উদ্দেশ্য করে বললো,
—’দিয়ে আয় তুই। এতো রাতে বাড়ির মেয়েরা বের হবে?’
নয়ন দীর্ঘশ্বাস ফেললো। এমনিতেও এতো রাতে তিতির কে একা থোরাই যেতে দিতো সে। অবশ্য নিজেরও যাওয়ার ইচ্ছে ছিলো না। টিফিন বাটি টা রাখতে বললো পাশেই। নিজের খাওয়া শেষ করলো ধীরেসুস্থে। বড্ড অনিহার সাথে সেটা নিয়ে মিনিট পাঁচেক এর মধ্যে দাড়ালো তমার বাড়ির গেটে। দুবার কলিংবেল বাজানোর মাথায় দরজা খুললো তমাই।
নয়নকে দেখে মোচড় দিলো বুকের ভিতর। তবে নয়নের মুখের ভাব পাল্টালো না। হাতের বক্সটা এগিয়ে দিতে দিতে বললো,
—’মামনী পাঠিয়ে দিলো। খেয়ে নিও।’
তমা কাঁপা হাতে নেয়। ততক্ষণে পিছনে এসে দাড়িয়েছে তমার মা। নয়ন কে দেখে একগাল হাসলেন। উচ্ছসিত কন্ঠে ডাকলেন। ভিতরে বসতে কত সাধাসাধি করলেন। তমা চুপচাপ দেখে গেলো সেসব। আগের নয়ন হলে নিজেই আগ বাড়িয়ে আড্ডা দিতো ঘন্টাখানেক। তমার মা কি আচার বানিয়েছে ,রাতে কি রান্না হয়েছে। সেসব একদফা খেয়ে কি খেতে ইচ্ছে হয় সেই বায়না দিয়ে যেতো। কিন্তু আজ তার ব্যাতিক্রমের দিন। না তো নয়ন কিছুতেই বাড়ির ভিতরে আসলো, আর না তো তমার চোখেমুখে উচ্ছাস দেখা গেলো।

ব্যাস্ত শহর ঢাকা ছেড়ে যত এদিকসেদিক শান্ত শহরগুলোর দিকে যাওয়া হয়, আবহাওয়ার পরিবর্তন তত চোখের পরার মতো হয়। বৈশাখ- জৈষ্ঠ্য মানেই যে শুধু তীব্র দাবদাহ সেটা ভুল প্রমান করে –বৃষ্টির ছোঁয়া পাওয়া যায়।
ঈশান যখন বাড়ি ফিরলো তখন রাত সাড়ে এগারোটা পার হয়ে গিয়েছে। ছেলে ফিরবে বলে রাহেলা জেগেই ছিলেন। মেজো জা’য়ের সাথে মিলে টিভিতে সিরিয়াল দেখতে ব্যাস্ত। কর্তারাও ঘুমায়নি যথাসম্ভব। তবে যার যার রুমে সকলে। তিতিররা সকলে নিশির রুমে। ল্যাপটপে ছবিগুলো দেখছে একে একে। তিতির অবশ্য মনে মনে ঈশানের অপেক্ষাতেই জেগে।
ঈশান বসার ঘরে মা চাচির সাথে কথা বলে তাদের শুয়ে পরতে বলে নিজের রুমে আসলো । জানালো, রাতে খাবে না। জ্যামে আটকে ছিলো, রাস্তায় খেয়ে এসেছে।
দ্রুত পায়ে নিজের রুমের দিকে হাঁটা ধরলো ঈশান। তিতিরটা কি আজ ঘুমিয়ে পরেছে? হৃদ স্পন্দন কতটা যে দ্রুত চলছে মেয়েটাকে এতোদিন পর দেখতে পাবে সেই তাড়নায়। একমাত্র সে-ই জানে। তবে নিজের ঘরে ঢুকে অন্ধকার ঘরে আলো জ্বালতেই চোখ কুচকে ফেললো। ঘর ফাঁকা। বাথরুম বা বারান্দা কোথাও নেই তিতির । কাঁধের ব্যাগটা সোফায় ছুঁড়ে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো কিছুক্ষণ। নিশি নয়তো নূরির রুমে শুতে গিয়েছে কি মেয়েটা? কপালে আঙুল চেপে ধরলো। তা হলে সেখান থেকে নিয়ে আসা কেমন ইমব্যারেসিং ব্যাপার হয়ে যায়! বোনেরা ভাববে কি। এতোটা লম্বা পথ জার্নি করে এসে এমন পরিস্থিতি মোটেই সহ্যকর হলোনা ঈশানের কাছে। রাগ হচ্ছে তার ভীষন। বিবাহিত মেয়ে, সে ঘুমাবে নিজের রুমে। সময় অসময়ে স্বামী চলে আসতে পারে। নয়তো রাত বিরেতে ফোন দিয়ে প্রেমালাপ করতে পারে। সেই চিন্তাই নেই বেয়াদব টার।
খানিকক্ষণ পায়চারি করেও হৃদয়টাকে শান্ত করা গেলো না। অস্থির হয়ে উঠলো এইটুকু সময়ের মধ্যেই। হাপিত্যেশ করে মরছিলো ওই চাঁদবদন মুখটা এতদিন পর দেখবে বলে। অথচ সে মহারানীর নাচানাচিই শেষ হয়না। গরম লাগছে, অস্থির লাগছে। শার্টের ওপরের বোতাম দুটো আলগা করতে করতে ঈশান এসে থামলো নিশির ঘরের সামনে। কথাবার্তা এ ঘর থেকেই আসছে। দরজায় নক করতেই খুলে গেলো দরজা।
ভাইকে দেখে নিশি লাফিয়ে এসে দাড়ালো। একগাল হেসে বললো,

—’কখন এলে ভাইয়া?’
—’মাত্রই।’
— ‘শরীর ঠিক আছে তোমার? ‘
—”উমম হুম। তোরা?’
— ‘আমরাও ঠিকঠাক সবাই।’
ঈশানের দৃষ্টি ঘরের ভিতরে। বিছানায় নূরি বসা। তিতির কে দেখতে পাওয়া গেলো না। তার চোখের দৃষ্টি অনুসরণ করে নিশি চাপা কন্ঠে বললো,
—’বার্বিকে খুজছো? ও ছাঁদে গেলো মাত্র। আমরাও যাচ্ছিলাম ওখানেই।’
—’এতো রাতে ছাদে কি?’
ভ্রু জোড়ার মাঝে সরু ভাজ ফেলো তাকিয়ে রয় ঈশান। হাতঘড়িতে সময় দেখে। সাড়ে এগারোটার বেশি বাজে। এখন ছাদে যাওয়ার সময়! ঈশানের মুখের ভাবভঙ্গি দেখে, পাছে আবার ভাইয়া তার রেগে যায়। তার আগেই নিশি বললো,

—’ওর নোসপিন টা ছাদে নাকি পরে গিয়েছে। সেটাই আনতে গেলো। ‘
—’একা পাঠিয়েছিস কেনো! ভয় পাবে তো। অন্ধকার ভয় পায় তো ও। গিয়ে দেখ। পেলো কি-না। ‘
ভাইয়ের কথায় নিশি, নূরি দুজনেই এগিয়ে গেলো ছাদের দিকে। ঈশান করিডর জুড়ে পায়চারি করে। বাড়ির বড়রা ঘুমিয়ে পরেছে সকলে। আজ রাতে বাবা চাচার সাথে কথা হবে না। চন্দ্রা দেওয়ান তো বাড়িতেই নেই। ঘরে গিয়ে এর মধ্যে ফ্রেশ হয়ে নেবে কি-না ভাবছে। মিনিট দশেক পরেও যখন একজনও ফিরলো না তখন ঈশানের মেজাজ বিরক্তির শিখরে। তিতির ফিরছে না, সাথে নিশি আর নূরিও গেড়ে বসেছে ওখানে গিয়ে। বাধ্য হয়ে নিজেও ছুটলো ছাঁদের দিকে।
লাস্ট মোমেন্টেও নোসপিন টা ছিলো। হুট করে কখন পরে গিয়েছে খেয়ালই করেনি তিতির। হঠাৎ খেয়াল হতেই ছুটে এসেছে ছাদে। তবে ওইটুকু জিনিস এই অন্ধকারে পাওয়া যায়! এদিকে ভয়ও করছে। আকাশে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে খানিক পরপর। নিচে নিশি নূরি সাথে আসতে চাচ্ছিলো। তাদের তো বেশ সাহস দেখিয়ে নাচতে নাচতে বললো সে একাই পারবে খুঁজতে, ভয় পায়না সে। অথচ এখানে আসার পর থেকে মনে হচ্ছে আশেপাশে গাছপালায় কেউ লুকিয়ে লুকিয়ে তাকে দেখছে। সবই মনের ভুল, তারপরও ভয় এড়িয়ে নোসপিন টা খোঁজায় মন দেওয়াই অসুবিধা হয়ে গিয়েছে। তবে নিশি, নূরি এসে হাত লাগাতেই একটু ভরসা পেলো যেনো।
ঈশান বুকে আড়াআড়ি হাত ভাজ করে এসে দাড়িয়েছে। ওপাশে সিড়ি – ঘরের ওখানটায় আলো পড়েনা বললেই চলে। রাতবিরেতে একজন মানুষ অনায়াসে দাঁড়িয়ে থাকবে, কিন্তু তাকে চোখে পরবে না। তিন গাধা হুমড়ি খেয়ে ফোনের ফ্লাশ জ্বেলে খুজে চলছে কিছু একটা। অন্য সময় হলে কেমন অনূভুতি হতো বুঝতে পারছে না ঈশান। তবে এই মূহুর্তে মেজাজ খরাপ হচ্ছে তার। অতি মাত্রায় খারাপ যাকে বলে।

—’নিশি, তোরা নাম সবকটা।’
ভূত দেখার মতো চমকে উঠলো তিতির। ঈশানের কন্ঠস্বর! বসা ছেড়ে উঠে দাড়িয়ে ব্যাস্ত ভাবে খুঁজলো কন্ঠের মালিককে। ঈশান ততক্ষণে এগিয়ে এসেছে।
—’দিনে খুঁজিস। এখন পাওয়া যাবে না ওইটুকুন জিনিস। নিচে যা তোরা।’
গমগমে কন্ঠে কথাগুলো বলে ঈশান এগিয়ে এলো হা করে তাকিয়ে থাকা তিতিরের দিকে। ঈশান এর চোখ সর্বপ্রথম গিয়েছে তিতিরের শরীরের পোষাকের দিকে। শাড়ি পরেছে মেয়েটা৷ সে বাড়িতে নেই। কার জন্য শাড়ি পরেছে ও! তার ওপর মুখজুড়ে প্রসাধনীর চিহ্ন। গাঢ় লিপস্টিকে ঠোঁট রাঙানো। কাজল চোখে ছড়িয়ে গিয়েছে খানিকটা। তাতে খারাপ লাগছে না মোটেই। বরং চোখজোড়া আরও সম্মোহনী ভঙ্গিতে আটকে রেখেছে ঈশানকে। ধুকপুক শব্দ জোরালো হয়েছে ঈশানের। এক পা দু’পা করে একদম মুখোমুখি হলো তিতিরের। নিশি হাত ধরে টানলো নূরির। নেমে গেলো দ্রুত দু বোন।

—’কি খুজছিলি?’
—’নোসপিন।’
সাতদিনে কেমন অন্যরকম লাগছে মেয়েটাকে। মনে হচ্ছে কতযুগ পর দেখেছ। শাড়িতে আরও পূর্ণযৌবনা নারী লাগছে। বিলেত ফেরত স্বামী দেশে ফিরলে বউরা যেমন লজ্জা রাঙা হয় তিতিরের এই মূহুর্তে অকারনে এই অবস্থা। মেয়েটার নাক ফুঁড়ানো ছিলো না। সে যাওয়ার ওর ফুরিয়েছে!
ধীরে ধীরে পরিবর্তন হচ্ছে আবহাওয়া। রাতের সব চাঁদ, তাঁরা ঢাকা পরে গিয়েছে মেঘের আড়ালে। তিতিরের আচমকা একটা অবাস্তব কথা মাথায় আসলো। ঈশান যাওয়ার পর এ কয়দিন টানা রোদ ছিলো। গরমে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিলো সব জেনো। আজ হুট করেই কোথা থেকে বৃষ্টি বৃষ্টি ভাব এসে হাজির!
এই এতো রাতে এরকম অকারণে দুজন ছাঁদের অন্ধকারে বিনাবাক্য ব্যায়ে কেনো দাড়িয়ে আছে বুঝে আসলো না দুজনের কারোরই। ঈশানের অবশ্য কারণ একটা আছে। সে তৃষ্ণা মেটাচ্ছে। তিতিরের ওপর থেকে দৃষ্টি সরাতেও মন সায় দিচ্ছে না যেনো। এই সাতদিনের চোখের খুদা মিটিয়ে নিতে মরিয়া সে।
তিতির শাড়ির আঁচল হাতে চেপে ধীর গলায় বললো,
—’ওটা কাল এসে খুঁজবো। নিচে চলুন। বৃষ্টি নামবে।
কথাটা শেষও করতে পারে না। কোথা থেকে দমকা শীতল হাওয়া ছুঁয়ে গেলো তাদের। আর প্রায় সাথে সাথেই ফোঁটা ফোঁটা পানির অস্তিত্ব টের পেলো দু’জনেই। বৃষ্টি নেমে পরেছে। ঈশানের শরীরের পাতলা শার্ট এরইমধ্যে শরীরে লেপটে যাচ্ছে। তিতির ব্যাস্ত কন্ঠে বললো,

—’নিচে চলুন। বৃষ্টিতে ঠান্ডা লাগবে। সবাই খুজতেও আসবে। চলুন।’
তিতির, হাত মাথার ওপর দিয়ে বৃষ্টি আড়াল করে অন্য হাতে শাড়ির কুচি উঁচু করে ধরে ছুটতে গেলো ছাঁদ থেকে নামতে। আচমকা কোমড়ে শক্ত, ঠান্ডা হাতের হেচকা টানে ঘুরে গিয়ে পরলো ঈশানের উন্মুক্ত বুকের ওপর। ঈশানের এমন ঘোরলাগা দৃষ্টিতে শরীর কাঁপলো তার। ঈশান হাতের বাধন দৃঢ় করলো। আষ্টেপৃষ্টে পেঁচিয়ে নিলো নিজের হাতের বাঁধনে। তিতিরের শাড়িও ভিজে যাচ্ছে। খোলা চুলগুলো আধভেজা হয়ে গেলো মূহুর্তেই। চোখের কাজল লেপটে গেলো আরও খানিটা। তিতির পিটপিট করে তাকানোর চেষ্টা করছে। তবে হাওয়ার তীব্রতা সাথে বৃষ্টির ফোঁটায় মাথা উঁচিয়ে ঈশানের দিকে তাকাতেও পারছে না। আরেকটা কারণে বোধহয় পারছে না। লজ্জায়! ঈশানের খসখসে হাতের তালু খামচে ধরে আছে তার কোমড়ের বাঁকানো অংশ। ধীরেসুস্থে আদুরে নড়াচড়া করছে সে হাতটা। তিতির নিচের ঠোঁট কামড়ে ধরলো। ঘনঘন চোখের পলক ফেলছে। লজ্জায় রাঙিয়ে উঠেছে সামান্য এতটুকুতেই।
ঈশান আরশাদের হৃদয় থমকানোর জন্য এতটুকু যথেষ্ট নয়কি? তিতির ঠোঁট কামড়ে – মাথা নিচু করে অস্ফুটে বললো,

—’ বৃষ্টিতে ভিজে গেলাম তো। চলুন। ‘
বলে আসলে লাভ হওয়ার নেই কিছুই। দু’জনেই বেশ ভিজে গিয়েছে। যদিও মুষলধারে বৃষ্টি নয় এটা। ঈশান তিতিরের মুখের ওপর থেকে দৃষ্টি সরায় না। কতযুগ পরে এই নিষ্পাপ মুখটা দেখলো! নরম সুরে শুধালো,
—’তোর না বৃষ্টি ভালো লাগে।’
তিতির মাথা নুয়িয়ে মিনমিন করে জবাব দেয়–
—’লাগে,কিন্তু। ‘
—’কিন্তু?’
তিতির ঈশানের হাতে হাত রেখে সেটা সরিয়ে দিতে চায়। পিছিয়ে দাড়াতে চায়। কিন্তু ঈশান সেটা হতে দিলে তবে তো! অগত্যা ঈশানের শক্তিতে না পেরে হার মানে তিতির। নড়চড় বন্ধ করে শান্ত গলায় বলে–

—’সবাই খুঁজতে এলে লজ্জায় পরে যাবো। চলুন।’
—’দরজা লক করে আসি?’
—’ছিহ্ কি ভাববে সবাই? আমাকে যেতে দিন।’
ঈশান নিজের অন্য হাতও গলিয়ে দেয় তিতিরের শাড়ি ভেদ করে নগ্ন কোমড়ে। মিশে থাকে দুজনের দেহ। ভাজে ভাজে ঘর্ষণ হয় সেসবের। তিতিরের বক্ষোজোড়ার নরম সত্ত্বার ছোঁয়া পাওয়া মাত্র মস্তিষ্কে জ্বলন শুরু হয় যেনো ঈশানের। চোখ বুঝে শ্বাস নেয় জোরে জোরে। কোমড়ে শক্ত করে চাপ দিয়ে হিসহিসিয়ে বলে,
—’ উমম ডোন্ট মুভ। স্টে…লেট মি ফিল ইউ। বেশিক্ষন না। পাঁচ মিনিট। ’
বৃষ্টির পরিমাণ আরেকটু বাড়তেই জড়তা বাড়তে থাকে তিতিরের। উশখুশ করে ওঠে।
—’আমার সমস্যা আছে। আমি ভিজতে পারবোনা।’
কাতর শোনালো তিতিরের কন্ঠস্বর। ঈশান বন্ধ নয়নজোড়া খোলে। তিতিরের হাতদুটো উঠে এসেছে তার বুকের সামনে। দু হাত মুঠো করে কাচুমাচু হয়ে দাড়িয়ে। ঈশানের থেকো দুরত্ব বাড়াতে চাইছে যেনো। ঈশান ডান ভ্রু তুলে প্রশ্নাত্মক ভঙ্গি করে বললো,

—’কি সমস্যা? আমার স্পর্শ? ‘
সজোরে ডানে বায়ে মাথা নাড়লো তিতির। লজ্জায় কাতর তিতির মিনমিন করে বললো,
—’পিরিয়ড।’
ভুলেই গিয়েছিলো ঈশান। এতদিন পর কাছে পেয়ে বেমালুম ভুলে বসে আছে এই বিষয়টা। দাঁতে দাঁত পিষলো ঈশান।
—’মাসের প্রতিটা দিনই তোর পিরিয়ড থাকে। যখনই আমি রোমান্স করতে কাছে টানি, তোর পিরিয়ড হয়ে বসে থাকে? পিরিয়ড যখন হয়েছে তখন পেট বের করে শাড়ি পরে আমার মাথা খেলি কেনো? ধরতে পারাবো না, ছুঁতে পারবো না। অসহ্যকর জিনিস।’
কথাটা বলেই ঈশান আর অপেক্ষা করে না। তিতিরের হাত ধরে দৌড়ে এসে দাড়ায় সিঁড়ি ঘরের সামনে। দরজা খুলে তিতিরকে ইশারা করেঘরে ঢুকতে। ঘরটা ফাঁকা পরে থাকে। কিন্তু নিয়মকরে পরিষ্কার করানো হয়।
তিতির ভেবে পায়না নিচে না গিয়ে এখানে এসে দাড়ানোর মানে কি!

—’ ন-নিচে যাবেন না?’
আধভেজা চুলগুলো দু হাত গলিয়ে পানি ঝড়ানোর চেষ্টা করলো ঈশান। নির্বিকার কন্ঠে শুধালো,
—’এখানে আমার সাথে সমস্যা হচ্ছে? ‘
—’তা কখন বললাম?’
এতক্ষণে আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নেমে গিয়েছে। ঈশান দু কদম এগোতেই দু পা পিছিয়ে তিতির ঠেকলো সিঁড়িঘরের দরজায়। ঈশান একহাত ঠেকালো দরজায়। তিতিরের মাথার খানিকটা ওপরেই। ঝুকলো ওর দিকে।
— ‘ আমি এসেছি সেই কখন! নোসপিন খুজতে এখানে এসে বসে আছিস। এটা তোর কাছে বেশি ইম্পরট্যান্ট ছিলো? এখানে দাড়িয়ে ছিলিস! আমি এসেছি টের পাসনি? খবর পাসনি?’
তিতির বুঝে উঠলো না অনেকক্ষণ ধরে এসেছে ঈশান, এটা কি করে হয়। সে তো ছাঁদে এসেছে কিছুক্ষণ আগেই। নিজেদের ঘর তখনও চেক করে এসেছে। তবে নিশি, নূরি এসে বলেছিলো তাকে। সে ভেবেছিলো খুঁজে নিয়েই নামবে না হয়।
ঠোঁট উল্টে তাকালো আশেপাশে। সবাই নেমে গিয়েছে এরই মধ্যে। তিতির মিহি কন্ঠে বললো,

—’পেয়েছি।’
—’তাহলে সাথে সাথে রুমে না গিয়ে। রাত দুপুরে ছাঁদে কি! এটা এখনই লাগতো? ‘
এতো রেগে কথা বলার কি আছে! এতদিন পর এসেছে একটু নরম কন্ঠে কথা বললেই হয়। একে তো অন্যের কাছ থেকে শুনতে হয়েছে সে আসছে। তার ওপর এসে উল্টো তার ওপরই রাগ দেখাচ্ছে!
তিতির হালকা কঠিন কন্ঠে বিরবির করে বললো,
— ‘তাতে আপনার কি? আজকে ফিরবেন জানিয়েছেন একবারও?’
— “জানলে কি করতি? ম্যাজিক করে নিজের শরীর ঠিক করে ফেলতি?”
তিতির লাজুক দৃষ্টি সরিয়ে ফেললো। মিহি কন্ঠে বলে,
—” তা কি করে পারতাম?”
—’খুব যন্ত্রণা দিলি। বুঝতে পারবি না কতটা। আজ কতটা এক্সপেকটেশানস নিয়ে বসে ছিলাম বললে বুঝবি? হুম?’
তিতির বুঝে পায়না এখানে তার দোষটা ঠিক কোথায়। লোকটা বার-বার এক কথা তুলছে। আর তাকে লজ্জায় মেরে ফেলছে। বৃষ্টির মধ্যে কোথায় ঘরে যাবে৷ তা না সিনেমার মতো একা ছাদের সিঁড়িঘরে আটকে রোমান্সের ধান্দা। ঠোঁট কামড়ে মিহি গলায় বললো,

—’অধৈর্য কেনো এতো?’
ঈশানের মুখ ঝুকলো আরও খানিকটা। ফিসফিস করে উঠলো কন্ঠস্বর।
—’ বিয়ের দু মাস চলে তিতির। এখনো বউ কি জিনিস সেটা ফিল করতে পারলাম না। ছুঁতে দিস না। তারপরও কোন সেন্সে বলিস অধৈর্য। একটু তো মায়া দয়া কর আমাকে! ‘
শ্বাসপ্রশ্বাস দ্রুত হয় তিতিরের। অস্বাভাবিক মায়া হয় মানুষটার প্রতি। তার এলোমেলো লাজুক দৃষ্টি ঈশানের বুকের দিকে। বিরবির করে জানায়,
—”আর দু’দিন এরই তো ব্যাপার। এতদিন যখন ধৈর্য ধরেছেন, আর দু’টো দিন না হয় ধরলেন।’
ঈশানের বুক দ্রিমদ্রিম শব্দ করছে। তার দ্বিতীয় দুনিয়ার কর্মকান্ডে কত কাজই করতে হয়। উল্টোপাল্টা সবকিছু। এই যেমন গতকালই নিজ হাতে স্যুট করলো কাউকে। একফোঁটাও হাত কাঁপেনি। আর না তো একটুও বুক কেঁপেছে। কত কঠিন কঠিন মূহুর্তে এসেছে জীবনে! কিন্তু যতবার ঈশান আরশাদ দেওয়ান বুঝেছে সে উইক হয়ে গিয়েছে ততবার খেয়াল করেছে তার এই দূর্বল হওয়ার কারণ সামনের এই মেয়েটা। যাকে কি-না আজ থেকে দু-আড়াইমাস আগে বউ করার চিন্তা তো দূর। যার অস্তিত্বের কথাই মনে থাকতো না। আজ সে নারীটি তার হৃদয় নিয়ে খেলে রীতিমতো। কঠিন ভাবে এই নারীর মায়ায় ফেঁসে গিয়েছে সে। বদ্ধ উন্মাদের মতো লাগে নিজেকে।

ঈশান সরে দাড়ায়। বৃষ্টি তার খুব একটা পছন্দ নয়। তিতিরের খুব পছন্দ। ঘরের এক কোনা থেকে দুটো খাটো চেয়ার এনে বসতে বসে তিতিরকে। দু’জনেই বসে দরজার সামনে। ছাদ জুড়ে বিভিন্ন ফুল গাছের সমাহার। বাড়ির মেয়েরা লাগিয়েছে এসব। এলোমেলো বৃষ্টির ফোটা আছড়ে পরছে ছাদে। শব্দ করে কেমন মাতাল সুর তুলছে। তিতির মগ্ন সেই বারিকণাগুলো দেখতে। আর ঈশন মগ্ন তিতিরে।
চাইলেই নিচে যাওয়া যেতে পারে, কিন্তু এই পরিবেশে ছাদে বসে বৃষ্টি দেখতে বেশ লাগছে দু’জনেরই।
আচমকা তিতিরই প্রশ্ন করে বসলো,
—’ এত দেরি হলো কেনো আসতে? বড় মামা যে বললো অফিসের কাজে যাননি?”
ঈশান স্থির চোখে তাকিয়ে সামনের দিকে। গম্ভীর কন্ঠে বললো,
—’ কাজ ছিলো। বাবা কতটা জানে! অফিসের কতদিন সামলাতে হয় আমাকে। জানে সে? দায়িত্ব গছিয়ে খালাস।’
—’ ঈদে মজাই করতে পারলাম না। না আপনি জলদি ফিরলেন, আর না তো আমাদের কোথাও বের হওয়ার অনুমতি দিলেন।”
—’ অভিযোগ করবি না কথায় কথায়। কত কাজ ছিলো জানিস? সব ফেলে ছুটে এসেছি। কার জন্য? “
তিতির আগ্রহকন্ঠে জিজ্ঞেস করে বসে,

—’কার জন্য? ‘
‘তোর জন্য ‘ শব্দটুকু বলতে গিয়েও বলে না ঈশান। ভ্রু কুচকে বৃষ্টি দেখতে থাকে। এখন এতো সিন তৈরি করার সময় না। অযথা কনট্রোল হারিয়ে দু’জনেরই মন ভাঙার মানেই হয়না।
—’ বললেন না কার জন্য?’
—’ কার জন্য মানে কি! আমার বাড়ি আমার কার জন্য ফিরতে হবে আবার? নিজের জন্যই ফিরেছি।”
তিতিরের মুখ চুপসে আসে। এতগুলো দিন পর এসেছে। একটু সুইটলিও তো কথাটা বলা যায়।
—’ মিস করেননি কাউকে?’
—’কাকে!’
—’কাউকে করেননি?’
ঈশান মনে মনে একচোট হাসে। তিতির কি শুনতে চাচ্ছে সামনাসামনি তা সে বেশ টের পাচ্ছে। তবে মুখে বলে,
—’ এরকম বাড়ি ছেড়ে বছরের পর বছর দূরে থাকার রেকর্ড আমার আছে। না পারলে এমনিই থাকতাম?”
—’ তখন তো আর ম্যারেড ছিলেন না।’
ঈশান ভ্রু জোড়া উঁচিয়ে ব্যাঙ্গ করে বললো,
—’ এখন ম্যারেড বুঝি? বউ কে? তুই? ‘
—’সন্দেহ?’
—’ কবুল বলে সাজিয়ে রেখেছি তোকে। আর কি? কিছুই না। পুতুল এ বাড়ির। পুতুল করেই রেখেছি। খালি দূর থেকে দেখার জন্য। সেটা ধরা ছেোয়া যায়না। কিভাবে মনে থাকবে তোর সাথে আমার আসল সম্পর্কটা কি! কে তুই! বউ নাকি আমার ঘরের সোপিজ!’
তিতিরের ফর্শা মুখটা আচমকা রক্তিম হলো। রাগ,অভিমান, লজ্জা সব মিলিয়ে একাকার। ঠোঁট উল্টে বললো,

—”ঠিকই তো। কে আমি? কেউ তো না। আমার টানে কেনোই বা ঘরে ফিরবে কেউ? কাছে না পেলেই সে আর বউ থাকেনা। শোপিজ হয়ে যায়।’
তিতিরের অভিমান বুঝতে ঈশানের কিঞ্চিৎ সময়ও লাগলো না। ঠোঁট টিপে নিজের হাসি সংবরন করলো। রাগানোর জন্যই তো বলছে সে কথাগুলো। এতগুলো দিন এটাও বেশ মিস করেছে। ওই মুখের প্রতিটা ভাবভঙ্গি কে মিস করেছে সে। ঈশান খানিকটা ঘেষে আসলো তিতিরের। শরীরে শরীর ঘেষে বসলো। ভেজা শরীর উত্তাপ ছরাচ্ছে। আলগোছে হাত দিয়ে কোমড় পেচিয়ে ধরলো। তিতিরকে সামান্য টেনে নিজের দিকে আনলো।
কন্ঠ নিচু করেফিচেল গলায় বললো,
—’ কে তুই আমার? হুম? এই প্রশ্নের উত্তর আমি মুখে দেবো না। তোকে ফিল করাবো। আগেও বলেছি। মুখের কথার থেকে প্র্যাকটিকালি দেখাতে পছন্দ করি আমি বেশি৷ তার জন্য যে একটু কষ্ট করতে হবে, ওয়াইফি। একটু যদি কষ্ট করে বেড অবধি যেতেন, বাকিটা না-হয় আমিই!’
ঈশানের হাতের বাধন ছেড়ে সরতে মরিয়া হলো তিতির। স্বামীর তপ্ত ঘন নিঃশ্বাস আছড়ে পরছে তার উন্মুক্ত কাঁধের চারপাশে। শিউরে উঠছে নারীসত্ত্বা। মিনমিন করে বলে,

—’মিথ্যা আহ্লাদ করবেন না। ভালোবাসেন কি-না সেটা বলতে পারবেন না। আমি আপনার কে– সেটা বলতে পারবেন না। দূরে থাকতে কষ্ট হয় কি-না সেটার জবাব দেবেন না। শুধু কাছে এসে অসভ্যতামি করার ধান্দা।’
শব্দ করে হেসে ফেললো ঈশান। তিতিরের কন্ঠদেশে নাক ঘষে । উন্মাদের মতো নারীদেহের ঘ্রান টেনে নিলো। কতদিন পর! বৃষ্টির পানিতে ভিজে থাকা নারীদেহ থেকে পরম যত্নে শুষে নিলো বারিকনা। সেখানে টুকরো টুকরো চুমু একে নেশাক্ত কন্ঠে গেয়ে উঠলো,
—” Daudte hain khwaab jinpe; rasta woh tu lage…
Neend se jo aankh ka ;hai waasta woh tu lage..
Tu badalta waqt koi, khushnuma sa pal mera..
Tu woh lamha jo na thehre, aane waala kal mera…
[ যেখানে স্বপ্নরা আশ্রয় খোজে, সেই পথটাই যেন তুই।
ঘুম থেকে চোখের যে গভীর সম্পর্ক, সেই আকাঙ্খাও তুই।
তুই যেন বদলে যাওয়া সময়ের কোনো সুখময় মুহূর্ত আমার।
তুই সেই ক্ষণ, যে কখনো থেমে থাকে না—
আমার আগত আগামীকালের এক টুকরো অনুভূতি।]

ঈশান যতবার গান গায় ততবার স্তব্ধ হয়ে যায় তিতির। শ্বাস ফেলতে যেমন ভুলে যায়, সে না চাইতেও হার্টবিট মিস হয় তার। আর তার ঠিক কয়েক সেকেন্ড মাথায় সেটা ঘোড়ার বেগে ছোটাছুটি শুরু করে দেয়। ঈশানের ভেজা চুলে খামচে ধরা তিতিরের হাত। আর সে অসভ্য পুরুষ! সে তো তিতিরের শরীরে নিজের আদর খোদাই করে দিতে ব্যাস্ত। যতবার লোকটা স্পর্শ করে আদরের মিষ্টি যন্ত্রণা দিয়ে ক্ষতবিক্ষত করে ফেলে সে জায়গাগুলো। এই যেমন কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই জ্বলছে কন্ঠদেশ, কাঁধের অংশ।
ঈশান মৃদু কামড় তিতিরের বুকের ভাজের খানিক ওপরে। মাতাল গলায় বললো,
—’ বুঝলি কে তুই, আমার জন্য ঠিক ‘কি’ তুই? ”
তিতির শ্বাস আটকে মিহি কন্ঠে অস্ফুটে বলে,
—‘হুমম।’

—‘তাহলে বোকার মতো অভিযোগ করিস কেন সবসময়? কতবার বলেছি ফাঁকা বুলি আমি দিতে পারিনা। আর দশটা স্বামী বা প্রেমিকের মতো সারাক্ষণ ভালোবাসার প্রকাশ করে জানিনা। কিন্তু আমি যেটা পারি,তোর জন্য আমি যেটা-যেভাবে ফিল করি সেটা আর কেউ পারবে না। সম্ভবই নয় কখনো। তুই আমার কে–এটা আমাকে লোককে জানিয়ে বোঝাতে হবে? তুই আমার কি জানিস না? কিভাবে বোঝালে বুঝবি! কি করলে বুঝবি?’
তিতির ঠোঁট কামড়ে বসে থাকে। নুয়িয়ে থাকা শরীর নিজের সাথে মিশিয়ে নেয় ঈশান। ভেজা চুমু আঁকে তিতিরের শীতল ললাটে।

সাঁঝের মায়া পর্ব ৪৫

—‘আমি নেই, শাড়ি পরেছিলি কার জন্য? ‘
শ্বাসঘন হয়ে এসেছে তিতিরে। ঈশানকে ঠেলে সরাতে চায়।
—’ নিচে চলুন। শীত লাগছে। ‘
—’জবাব দে আগে।’
—’তমা জোর করছিলো।’
ঈশান মুখ তোলে। তিতির শাড়ির আচল ঠিক করে বুকের ওপর। ভেজা শরীরে বেশ অস্বস্তি হচ্ছে। তিতিরের মুখের ভাব দেখেই ধরে ফেললো সেটা। এখন বৃষ্টিও কমে এসেছে।

সাঁঝের মায়া পর্ব ৪৭