Home সাঁঝের মায়া সাঁঝের মায়া পর্ব ৬

সাঁঝের মায়া পর্ব ৬

সাঁঝের মায়া পর্ব ৬
দুর এ দিলশাদ্ দুআা

বেলা ৩ টা বাজে।
দশ ঘন্টার জার্নি করে এখন ট্রেন আটকে আছে মাঝরাস্তায়।হিসেব মতে আর চার -সাড়ে চার ঘন্টার রাস্তা।তবে ট্রেন থেমে থাকার মতিগতি দেখে মনে হচ্ছে না আগামী ছ -সাত ঘন্টাতেও পৌছুতে পারবে।
তিতির এর এখন দম বন্ধ হয়ে আসছে।এর কারনেই ঘনঘন বাড়িতে আসা হয় না তার।আসার সময় রাহাত ভাই একগাদা খাবার দিয়ে দিয়েছেন।যে কারণে ক্ষিদের কষ্ট তাকে মোটেই করতে হয়নি।গল্পের বই পরে,গান শুনে এতটুকু সময় পারি দিয়েছে।সময় আর কাটতেই চাচ্ছে না।
কেবিন এর আরেকজন যাত্রী আগের স্টেশন এ নেমেছেন।বর্তমানে সে একা একটা কামড়ায় বসে আছে।এটা আরও বড় বিরক্তির কারণ।

বাড়ি থেকে ফোন আসছে ঘন্টায় ঘন্টায়।কতদূর,কি সমাচার। জনে।জনে জানাতে জানাতে কাজ শেষ তার।নয়ন ভাই বারবার বলছিলেন অন্য গাড়িতে নিতে আসবেন কিনা।তিতির সোজাসাপটা নিষেধ করে দিয়েছে।বাড়ি আরও চার ঘন্টার রাস্তা।এখন জার্নি করে নিতে আসার কোনো মানেই হয় না।
কেবিনের দরজায় কড়া নাড়লো কেউ।লক করে দিয়ে বসেছিলো তিতির।উঠে গিয়ে খুলে দিলো।দুজন পুরুষ আর একজন মহিলা দাড়িয়ে আছে ব্যাগপত্র নিয়ে।তারা আগের স্টেশন এ উঠেছে,ভুল ক্রমে অন্য বগিতে ওঠায় কেবিন অবধি আসতে এতটুকু সময় লাগলো।তিতির মিষ্টি হেসে তার বাকি জিনিসগুলো তাদের সিট থেকে ফাঁকা করে দেয়।ছেলেদুটো তাদের জিনিসপত্র ওপরে তুলে আরাম করে এসে বসে সিটে।এবার মেয়েটাই তিতির কে আগে প্রশ্ন করে,

” কোথা থেকে আসছো আপু।নামবে কোথায়?”
তিতির জায়গার নাম জানালো।
মেয়েটার মুখে হাসি দেখা গেলো।হাসিমুখে বললো
“আরেহ্,আমরাও তো ওখানেই যাচ্ছি।কোন গ্রামে যাবে তুমি?”
“শমসেরনগর ”
এবার আরও বিস্মিত হলো সামনের তিনজন।
“বলো কি।আমরাও।”
তিতির নিজেও হাসলো।অবাক হলো না।সে নিজেই তার এলাকার মানুষ জনকে চেনেনা।নূরি,নিশা আপু যতটা সবার মধ্যে পরিচিত সে তার উল্টো। বাসায় থাকলেও বের হওয়া হয়না।

“আমি আসলে আপু তেমন বাসা থেকে বের হতাম না তো,খুব একটা চিনি না কাউকে ”
“বাই দ্যা ওয়ে আমি অণিমা। দি ইজ মাই হাসবেন্ড সাজিদ। আর ও আমাদের বন্ধু রানা।
তিতির হাসিমুখে হাত মেলালো মেয়েটার সাথে।
“তা তোমার বাবার নাম কি?”
এবার সাজিদের প্রশ্নে চোখমুখ বিষাদে ঢেকে গেলো তিতির এর।
মাথা নিচু করে নিলো।ধীর গলায় বললো।
“আমার বাবা মা বেচে নেই।আমার বড় মামা মো:রাইসুল দেওয়ান।আমি জন্ম থেকেই ওনাদের কাছেই মানুষ হয়েছি।উনিই আমার বাবার মতো মানুষ করেছেন।”
সামনের তিনজন মানুষই এবার হা হয়ে গেলো তিতির এর পরিচয় শুনে। রানা একগাল হেসে বললো,
“মাই গড,তুমি নিশির ফুপাতো বোন।বলেই থমকে গেলো।আড়চোখে তাকালো পাশের দুজনের দিকে।অনিমা আর সাজিদ দুজনেই মিটিমিটি হাসছে আড়চোখে।রানা সাথে সাথে শুধরে নিলো,

” আই মিন তোমাদের বাড়ির সবাইকে চিনি আমরা আরকি।আমরা তিনজনই তোমার ভাই ইশান এর বেস্ট ফ্রেন্ড। ইশান তোমার ভাই তো নাকি?”
তিতির মিষ্টি হাসলো।
“জ্বী।”
“বাই এনি চান্স তুমি বার্বি নও তো?”
তিতির থতমত হয়ে গেলো সাথে সাথে। এ নামে তাকে নিশি আর নূরি আর ছোট ভাইবোনেরা ডাকে।আদরের ডাক যাকে বলে আরকি।ছোটবেলা থেকে সবার মুখে মুখে শুনে এসেছে সে দেখতে বার্বিডল এর মতো।তিতির এর দারুণ লজ্জা লাগলো এই মূহুর্তে। সলজ্জ বললো,
“জ্বী।কিন্তু আমার নাম বার্বি না।আমার নাম তিতির। তিতির আরশাদ।বাসায় কাজিন রা সবাই আদর করে বার্বি ডাকে আরকি।”
অনিমা সিট বদল করে তিতির কে জড়িয়ে ধরে বসলো।কাছে টেনে গাল আলতো হাতে চেপে বললো,
“একদম মিথ্যে বলে না কিন্তু। আস্ত একটা বার্বিডল তুমি।তোমার কথা আমরা সবাই টুকটাক শুনেছি।আমি আর সাজিদ যদিও হালকা।কিন্তু ওইযে তোমার ওই ভাইয়া।সে অবশ্য একটু বেশিই বোধহয় শুনেছে।ছেলে বন্ধুর আর মেয়ে বন্ধুর করা গল্পে পার্থক্য আছে কিনা”।
শেষের কথাটা রানার দিকে বাঁকা হেসে বললো অনিমা।তিতির বুঝতে পারলো না বিষয়টা।অবুঝ এর মতোই তাকিয়ে রইলো।
অনিমা বুঝলো তিতির এর মনের প্রশ্ন। মুখ এগিয়ে নিয়ে এলো তিতির এর কানের দিকে।
গলা নামিয়ে বললো

” বুঝলে না তো?বলছি।আমরা তিনজনই ঈশান এর ফ্রেন্ড। ছেলে মানুষ বাড়ি সম্পর্কে যতটুকু গল্প করে আরকি।সে কারণে তোমাদের কাজিন দের সম্পর্কে আমি আর সাজিদ খুব হালকাই জানি।শুধু নাম আরকি।তবে…উহুম উহুম”
অনিমা আবার এক পলক তাকালো রানার দিকে।রাণা চোখ পাকিয়ে তাকিয়ে আছে অনিমার দিকে।সাজিদ হেসেই যাচ্ছে।অনিমা রানার চোখ পাকানো গ্রাহ্য করলো না মোটেই।আবার ঘুরে বসলো তিতির এর দিকে।ফিসফিস করে বলার ভঙ্গি করলো।
“তবে কি বলোতো।মেয়ে মানুষ কিন্তু খুব গল্প করে।তুমি করো না?তোমার প্রিয় কোনো মানুষ এর সাথে পরিবার এর গল্প। ”
তিতির মাথা নাড়ায়।
“ওইতো।আমাদের মধ্যে এগিয়ে আছে রানা।মানে তার কাছে যে গল্প করেছে সে মেয়ে আরকি।তাই সে একটু বেশিি জানে তোমাদের পরিবার সম্পর্কে ”
তিতির হতবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো অনিমার পরের কথা শোনার আশায়।
অনিমা আবার হাসলো।এবার শব্দ করেই।

“বুঝলো না তো?শোনো একটা সিক্রেট বলি।তোমার এই রানা ভাইয়া খুব শিগ্রই তোমাদের বাড়ির পারমানেন্ট মেম্বার হয়ে ঢুকবে। তোমার বড় আপু, নিশির প্রেমে দিওয়ানা উনি।”
রানা চোখমুখ কুচকে আছে।সে বোধহয় আশা করেছিলো অনিমা শেষ পর্যন্ত বলবে না।কিন্তু বলে দেওয়ায় সে দারুণ অসস্তি তে পরে গেছে।
তিতির শব্দ করে হেসে ফেললো। দারুণ অবাক হয়েছে সে।রানার দিকে ফিরলো।
দারুন উচ্ছাস নিয়ে বললো,
“আল্লাহ আপনি আমার সেইনা দেখা জিজু।বিশ্বাস করেন কত চেষ্টা করেছি খোঁজ করার কিছুতেই পাই নি।আপু বলতো বড় হলে বলবে।দেখুন ২০ বছর হয়ে গেলো তাও বলে বড় হলে বলবে।এবার আমি সারপ্রাইজ দিবো আপুকে।”
তিতির এর উচ্ছাসে রানা নিজেও হেসে ফেললো।তিনজনের দারুণ আড্ডা জমে গেলো মূহুর্তের মধ্যে।
তিতির এর দারুণ শান্তি লাগছে এবার।এতক্ষণ না বললেও ভয় লাগছিলো।একা একা।তার মধ্যে পৌছুতে বেশ রাত হয়ে যাবে এটা স্পষ্ট বুঝতে পারছিলো সে।এখন তো বলতে গেলে ঘরের মানুষ জুটে গেছে।বাকিটা সময় দারুণ কাটবে…

ইশান ল্যাপটপ নিয়ে গার্ডেনে বসে কাজ করছে।পাশেই রোশনি,রিশা,রাফি দৌড়াদৌড়ি করছে।এ বাড়ির প্রত্যেকটা মানুষের অত্যন্ত প্রিয় জায়গা তাদের বাগান টা।দারুন গোছানো,সুন্দর। ইশানের বাইরে বের হওয়ার কথা ছিলো বন্ধুদের সাথে দেখা করার জন্য। কিন্তু তার বন্ধুদের মধ্যে তিনজন এখনো এসে পৌছায়নি।প্ল্যান হয়েছে আজ বাকিরা এসে পরলে কাল পরশু দেখা করবে সবাই মিলে।তাছাড়া তার নিজেরও অফিসের গুরুত্বপূর্ণ একটা কাজ করতে হচ্ছে বসে বসে।
ছোট মা এই মাত্র কফি দিয়ে গেলো।গরম কফিতে চুমুক দিতে দিতে ভাইবোন গুলোর দৌড়াদৌড়ির দিকে উদাস হয়ে তাকিয়ে আছে।চিন্তা করছে কিছু একটা,চিন্তা না ঠিক হয়তো।দ্বিধা বলা যায় বোধহয়।এর কারণ আছে বইকি।
বাড়ি আসার পর থেকে রুষার পরিবর্তন তার নজর এড়ায়নি। এতবছরের পরিচয়ে এমনটা কখনো হয়নি।এমন নয় যে তার তাতে খুব এসে যায়,কিন্তু সমস্যা টা বোধহয় এখানেই।কেনো এসে যাচ্ছে না।যাওয়া তো উচিত। যে মেয়েকে বিয়ে করবে বলে ঠিক করেছে,হুট করে সে মেয়ের এহেন পরিবর্তন, ইগনোর বলা চলে এতে তো তার খারাপ লাগার কথা,বলা বাহুল্য বুকের ভিতর টা দুমড়েমুচড়ে যাওয়ার কথা।
কারন সে আগ্রহ না দিলেও রুষার সাথে বিগত ৪-৫বছরের কথা হয়নি,রুষা কল দিয়ে গল্প জোড়েনি এমন একদিনও হয়নি।তার তো মেয়েটা রীতিমতো অভ্যাসে পরিণত হওয়ার কথা,হুট করে সে অভ্যাসে বাধা আসলে তার অত্যন্ত কষ্ট পাওয়ার কথা।সে অন্তত এতোদিন সেটাই ভেবে এসেছে,সেটা ভেবেই বিয়েতে দ্বিমত করেনি।কিন্তু আশ্চর্য। সেরকম কিচ্ছু হচ্ছে না।

অযাচিত মন যখন বলছে কিছু একটা ঠিক নেই সে ভাবার চেষ্টা করছে রুষার কোনো সমস্যা হয়তো,কিন্তু সেই মনই আবার বলছে সমস্যা টা তার একান্ত নিজেরই,মেয়েটার নয়।
কি সমস্যা! সে কি সত্যি একবিন্দুও ভালোবাসতে পারেনি রুষাকে,এটা হলে সারাজীবন সম্ভব থাকা একসাথে?
ইশান গা এলিয়ে বসে চেয়ারে।চোখ বন্ধ করে ভাবতে থাকে রুষার সাথে কাটানো মূহুর্ত গুলো।নাহ্ তেমন কোনো কিছু মনে আসছে না যেটা মনে আসার কারণে তার ভালো লাগছে,বা মন ভালো হবে।অথচ এমন স্মৃতি কিন্তু গুনে শেষ করা যাবে না।কিন্তু এগুলো তার ভালোলাগার লিস্টে জায়গা করতে পারেনি কেনো তাহলে!
মনে আছে এর আগে শুরু দু বছরের অনেক বার রুষা তার সাথে গভীর সম্পর্কে যেতে চেয়েছে।খোলামেলা বলতে গেলে ইশান এর গভীর স্পর্শ চেয়েছে,নিজের সব সতীত্ব উজার করতে চেয়েছে।
ইশান যতটা রেসপেক্ট থেকে বিষয়টায় বাধা দিয়েছে,এখন তো অন্য কিছু মনে হচ্ছে। সে মেয়েটার প্রতি সেই ফিলিংস টা কখনো আনতেই পারেনি,চায়ও নি হয়তোবা। পুরুষ মানুষ এর নিয়ন্ত্রণ অনেকক্ষেত্রে নারীর সান্নিধ্যে ভেঙে পরে,তার এমনটা কখনো হয়নি রুষার সাথে। সে যথেষ্ট নিয়ন্ত্রণ এ রেখেছে সেটা।

এতকথা কেনো মনে হচ্ছে তার।মানে নেই কোনো।ইশান চোখ খুললো।কিন্তু মাথা সোজা করলো না।হেলিয়েই রাখলো পিছন দিকে।তাকিয়ে রইলো খোলা আকাশের দিকে।
আজও বোধহয় এতো কিছুর হিসেব নিকেশ করার কথা মাথায়ই আসতো না।চায় কি চায়না সেটাও ভাবতে হতো না নতুন করে,যদি না রুষা এই দুরত্ব টা না বাড়াতো।হয়তো পারিবারিক ঝামেলায় আছে,থাকতেই পারে,দু দিন পর হয়তো আবার আগের মতো শুরু করবে মেয়েটা।
কিন্তু ইশান এর মন স্পষ্ট জানান দিচ্ছে এ মেয়ে সেই মেয়ে নয়,যার সান্নিধ্য পেলে গোটা একটা জীবন অনায়াসে তার হাত ধরে কাটিয়ে দেওয়া যায়..
ইশান এর মাথাটা টনটন করছে,আর চিন্তা করতে ইচ্ছে করছে না।মেয়েটাকে বিয়ে না করলে নয়,বরং বিয়ে করলেই ঠকানো হবে হয়তো।সে অবশ্য খুব ভালো করেই জানে তা স্বত্তেও রুষা তাকেই চাইবে…
“ভাইয়া”
নয়নের গলা শুনে সোজা হয়ে বসলো ইশান।হাসিমুখে তাকালো ভাইয়ের দিকে।
“আয়,বোস।আসার পর থেকে তো তোর দেখাই পাচ্ছি না।”
নয়ন নিজেও একগাল হাসলো।এগিয়ে এলো ভাইয়ের দিকে।নিচু হয়ে কোলাকুলি করলো দুজন বাসলো পাশের চেয়ারে।

“তেমন কিছু ভাইয়া।একটু ব্যাস্ত ছিলাম আরকি।ফাইনাল ইয়ারের এক্সাম শুরু হয়েছে।বুঝতেই পারছো।একটু চাপে আরকি”
“ব্যাপার না।আমি বুঝতে পেরেছিলাম সেটা।”
নয়ন ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালো ভাইবোন গুলোর দিকে।গলা উঁচিয়ে ডাক দিলো রাফিকে।
“চ্যাম্প,এদিকে আয়।”
রাফি দৌড়ে এলো।
“বাড়িতে যে মা কে পাবি তাকেই বলবি এক কাপ কফি পাঠাতে।ভাইয়া তুমি আরেক কাপ নেবে?”
ইশান মাথা নাড়ে।নেবে না।
রাফি ছুটে গেলো বাড়ির ভিতর।নয়ন আবার ঘুরলো ভাইয়ের দিকে।
“ভাইয়া তোমার গল্প বলো।ট্রাস্ট মি,খুব মিস করেছি।”
“অল গুড।তবে মিস করেছিস কিভাবে বুঝবো,আমি না হয় একটুকুনও ছুটি পাইনি, তুই তো অন্তত দু একবার যেতে পারতি আমার সাথে দেখা করতে।”

ভাইয়ের কপট রাগ বুঝলো নয়ন।একহাতে নিজের এক কান ধরলো।নিজেও অসহায় গলায় বললো
“বিশ্বাস করো ভাইয়া,কতবার যে প্ল্যান করেছি যাবো।নিশি,নূরি দের নিয়ে,কখনো বড় মাকে নিয়ে,কখনো বন্ধুদের নিয়ে।কোনোবারই বড় বাবা পারমিশন দিতো না,যখন দিতো তখন আমার সময় হতো না।মণির কাছেই যেতে পারতাম না,দু বার মাত্র গিয়েছিলাম। ”
“বুঝলাম।তা এখন প্ল্যান কি!মাস্টার্স তো কমপ্লিট প্রায়।
চাকরিবাকরি করতে চাস?নাকি বাড়ির বিজনেস এ জয়েন করতে চাস”
নয়ন মাথা চুলকায়।ধরা গলায় বলে,
“বুঝতে পারছি না ভাইয়া,বাড়ির সবাই চায় বিজনেস টা সামলাই,আসলে তুমি চাকরির সিদ্ধান্ত নিলে।বাবা রা একটু ডিজএপোয়েনটেট।আমি সত্যি বলতে তাই দ্বিধা দন্বে আছি হালকা।তাছাড়া বিজনেস এ একটু ডাউন যাচ্ছে ইদানীং। বড় বাবা এটা নিয়ে দারুণ আপসেট।তুমি বিজনেস এ আগ্রহী ছিলে না বলে অনেকটা মন খারাপ করেই বোধহয় বলেনি তোমাকে কিছু,আসলে ভাইয়া…অনেকটাই ডাউন চলছে।এখন আমিও যদি হাল ধরতে না চাই,সমস্যাই হয়ে যাবে আরকি।”

আরও অনেক কথাই জানলো সে নয়ন এর থেকে।এসবের কিছুই তাকে জানানো হয়নি।তার কারণ ও অবশ্যই আছে।তার বাবার খুব ইচ্ছে ছিলো সে এই বিজনেস এর হাল ধরবে,দায়িত্ব নেবে।সে তা নেয়নি,অনেকটা রাগারাগি করেই বাড়ি ছেড়ে ছিলো। এ কয়বছর বাড়ি না আসার কারণও অনেকটা এটাই।ইশান কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে।বাড়ি আসার পর বাবার সাথে তার সত্যিই কথা হয়নি তেমন একটা।কেমন আছো,কতদিন বাড়ি আছো এই অবধিই।এর বেশি বাবা তাকে জিজ্ঞেস করেননি।আর না তার চাকরি নিয়ে কিছু।সে নিজেও ব্যবসা নিয়ে আগ্রহী নয়,বিধায় বাড়ির ব্যবসার হালচাল ও জিজ্ঞেস করার প্রয়োজন বোধ করেনি।তবে রাইসুল দেওয়ান এর চোখমুখে ঘোর চিন্তার ছাপ স্পষ্ট, তার মনে হয়েছিলো অনেকটা বয়সের ছাপ,অনেকটা তার ওপর রেগে থাকার ছাপ…
ইশান এর নিজের খারাপ লাগছে পরিবার এর কথা শুনে।বাবা চাচাদের যথেষ্ট বয়স হয়েছে। রাগারাগি করে বাড়ি ছেড়ে গেছিলো, বাবা হয়তো তার জন্যই তাকে আর রাগাতে চায়নি,চাপ দিতে চায়নি।অথচ এই বয়সেও কতো চাপ নিজেরা সামলাচ্ছে।ইশান ঠিক করলো বাবার সাথে বসে কথা বলবে বিষয়টা নিয়ে।ঘড়িতে সময় দেখলো মাগরিব এর সময় হয়ে এসেছে।

“ভাইয়া আমরা কিন্তু যাবো। প্লিজ ভাইয়া”
নয়ন, ইশান দুজনেই শব্দ পেয়ে পেছনে তাকালো।নিশি,নূরি দ্রুত পায়ে এগিয়ে আসছে। নয়নের দু পাশে বসলো দুজন।আহ্লাদি গলায় আবদার জুড়লো।
“বড় মা বলেছে তুমি আনতে যাচ্ছো বার্বি কে।আমরা যাবো তোমার সাথে। ওর সাথে কথা বলে আসলাম।এখনো ওর আসতে ঘন্টা চারেক লাগবে।এখন বাজে সাত টা।ওর স্টেশন এ পৌছুতে এগারো,সাড়ে এগারো তো বাজবেই।আমরা একটা সারপ্রাইজ দেবোই ওকে অন্যরকম করে প্লিজ.”
নয়ন ভাবনায় পরে গেলো।মেয়েটাকে সারপ্রাইজ দেওয়ার ইচ্ছা তার নিজেরও আছে। কিন্তু বাড়ি থেকে এতো রাতে ভাইবোন গুলোকে স্টেশন এ নিয়ে যাওয়ার ছেলেমানুষী তে পারমিশন বড় বাবা দেবে কি না যথেষ্ট সন্দেহ আছে তার।
বোনদের নরম গলায় বোঝানোর স্বরে বললো

“দেখ আমি নিজেও চাই,গত দু বছর মেয়েটা জন্মদিনএ থাকতে পারেনি,এ বছর বড় করে সেলিব্রেট করতে চাই।কিন্তু অতো রাতে আমি একা কিভাবে..মানে স্টেশন এ এসব,ও নিজেও ক্লান্ত থাকবে।বলি কি।ও বাড়ি ফিরুক।বাড়িতে কিছু কর,বা কাল সারাদিন পরে আছে।”
দু বোন সজোরে মাথা নাড়লো। তার তাদের সিদ্ধান্তে অনড়।নয়ন দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে।এদের মানাতে পারবে না বুঝে গেছে।নিয়েও যেতে হবে এটা স্পষ্ট টের পাচ্ছে।এখন তাকেই কাঠখড় পোড়াতে হবে বড় বাবা কে রাজি করার।
ইশান বুকে হাত গুঁজে দেখছে ভাইবোন গুলোর ছেলেমানুষী।তাকে কেনো বলা হচ্ছে না বুঝতে পারছে না বিষয়টা।নিশি বোধহয় খেয়াল করলো সেটা।ভাইয়ের দিকে অযুহাত দেওয়ার মতো করে বললো,
“বড় মা বললো ছোট ভাইয়া নিয়ে আসুক বার্বি কে। তুমি হয়তো ব্যাস্ত থাকবে,যেতে চাইবে না।”
ইশান কোঁচকানো কপাল স্বাভাবিক করলো।
বললো “একবারও বলিনি যেতে পারবনা।তাছাড়া নয়ন একা তোদেরকে সামলাতে পারবেনা।সব বিচ্ছুগুলোকে নিয়ে মাঝরাত্তিরে ও পরে যাবে বিপদে।”

নিশি, নূরি খুশিতে লাফিয়ে উঠলো।এটাই চাইছিলো তারা।
ইশান হালকা হাসলো বোন দুটোর খুশিতে। তার নিজেরও ইচ্ছে হচ্ছে মেয়েটাকে আনতে যেতে।অনেক বড় হয়ে গেছে বোধহয়!শেষ কবে দেখেছিলো মনে পরছে না।তবে শেষ দেখার দিন যে সে কোনো একটা কারণে মেয়েটাকে খুব বকেছিলো,সাথে কষিয়ে একটা থাপ্পড় দিয়েছিলো সেটা হুট করে মনে পরে গেলো।ফোলা ফোলা ধবধবে গাল টা লাল টমেটোর মতো হয়ে গিয়েছিলো। রক্ত জমে গেছিলো গালে।জ্বরে কাহিল হয়ে গিয়েছিলো ব্যাথায়।মোমের মতো শরীর ছিলো কীনা!এ অপরাধে বাবা তার গায়েও হাত তুলেছিলো প্রথমবারের মতো।ইশান আবার হেলান দেয় চেয়ারে।

সাঁঝের মায়া পর্ব ৫

মেয়েটার বয়স কতো হবে আজকে।বিশ হবে বোধহয়।ভাবা যায়!এরা যে হারে বার্বি,পুতুল পুতুল করছে মেয়েটাকে এতবছর পর হুট করেই দেখার আগ্রহ দ্বিগুণ হয়ে গেছে।

সাঁঝের মায়া পর্ব ৭