সায়রে গর্জন পর্ব ১১
নীতি জাহিদ
সকলের রাতের খাবার শেষ। মেয়েরা দোতলায় থাকবে বলে বায়না ধরেছে। রুমের খাট গুলো মোগল ধাঁচের। দিয়া হাত দিয়ে ধরে খাটের কারুকার্য দেখছে।দিয়ার কাছে এগুলো পুরোনো ব্যাপার।তার দাদাবাড়ির খাট গুলো এমন। রুমের মাটিতে মাদুর বিছিয়েছে মেয়েরা। শেফালী আবিরকে শাহীনের কাছে দিয়ে এসেছে।
– শাহাদ ভাই অনেক ড্যাশিং কিন্তু।
বিদিপ্তার কথা শুনে রুমের প্রতিটা প্রানী ওর দিকে ফিরলো। নিশি চাচাতো বোনের দিকে তাকিয়ে বলে,
– বিদি আপু তুমি কি পাগল হলে,ভাবীজান বসে আছে সামনে আর এসব বলছো!
– আরেহ বাবা এমনি বললাম উনি সামনে থাকলে কি সমস্যা। ব্যাপার গুলোকে নরমালাইজ করা শিখ। অস্ট্রেলিয়াতে তো মেয়েরা উনাকে পাওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে উঠতো।
– এটা বাংলাদেশ অস্ট্রেলিয়া নয় বিদি।
মনির কড়া জবাবে বিদিপ্তা চুপ হলোনা বরঞ্চ আরো জোর গলায় বললো,
– সেটাই আমি বুঝাতে চাইলাম,বাংলাদেশে এসব অপশন নেই বলেই রেপের সংখ্যা বাড়ছে।
শাহাদের সাবিনা খালার মেয়ে তাহি। বড্ড বিরক্ত নিয়ে বলে,
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
– কি অদ্ভুত সব যুক্তি।হাতে পায়ে ধরছি বোন।আমরা তোমার মত অত স্মার্ট না তাও দয়া করে বড় ভাইজানকে নিয়ে এসব বলোনা। শুনতে কেমন লাগে। কই ভাইজান আর কই অস্ট্রেলিয়ান মেয়ে। ছিঃ।
– ওকে স্যরি আর বলবোনা। এভাবে রিয়েক্ট করোনা তোমরা। তবে আমার এইজড পারসোনে বড্ড এলার্জি কিন্তু এই প্রথম উনাকে দেখে ক্রাশ খেয়ে খেলাম। ভাবী প্লিজ রাগ করবেন না আমি আগেই স্যরি বলে নিচ্ছি।এই বাড়িতে সব ছেলেই অনেক স্মার্ট কিন্তু উনাকে দেখেই আমার হার্টবিট বেড়ে গেলো। ফিল করেছি উনাকে আমি।
– চলো ভাইজানের দ্বিতীয় বউ তোমাকে বানিয়ে দিই।
মনি,তাহি একসাথে ধমকে উঠলো শেফালীকে।
– পাগলের মত বকিস কেনো। বেয়াদপ।
– আমি তো মজা করলাম
শিফা বলে উঠলো,
– আপা মজার ও তো সীমা থাকে।
– দুদিন পর ভাইজান এমনিতেই দ্বিতীয় বিয়ে করবে। দেখেছিস দু বছরে একবারো এই মেয়ের সাথে শুতে! আমি আগে বললে দোষ কি! পাত্রী তৈরি থাকলো।
তাহি উত্তেজিত হয়ে চেঁচিয়ে দাঁতে দাঁত খিচে বললো,
– ভাইজান গুনে গুনে তোর থেকে তেরো বছরের বড় শেফালী।তোর কি এতটুকুও লজ্জা লাগেনা ভাইজানকে নিয়ে এসব বলতে। এত নিচে নামলি যে কার সাথে কখন ভাইজান শুবে ওটা নিয়েও তুই আলোচনা সমালোচনা বসাবি।ছিঃ।আমার দুঃখে চোখে পানি আসছে। বাবার আসনে বসাই তাকে আমরা। অন্য সময় হলে চটকানা মা রতাম তোকে।
কিছুটা ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে চুপ হয়ে গেলো শেফালী। দিয়া কেমন থম মে রে বসে আছে। শাহাদ দ্বিতীয় বিয়ে করবে মানে! এটা কখন সিদ্ধান্ত নেয়া হলো। মেয়ে,জীবিত বউ রেখে কেনো দ্বিতীয় বিয়ে করবে? বুকের ভেতরটা জ্বলছে। ছিলো দূরত্বে তবুও তো তার স্ত্রী ছিলো।শেহজা থাকলে নাহয় মেয়ের বাহানায় উঠে যেত।মেয়েটা বাবার কাছে। বুকের ভেতরটা যন্ত্রণা বাড়ছে। নিজের অজান্তেই গড়িয়ে পড়লো অশ্রু। সাথে সাথে উঠে দাঁড়ায়। সামনে পা ফেলে রুম থেকে বেরিয়ে যেতে চাইলে তাহি আটকে দেয়।
– ভাবীজান বসো। সব মন খারাপ আজকে বাদ। আমার চেয়ে বেশি কষ্ট তো তুমি পাওনা তাই না। শুনো একটু গেম খেলি।কি বলো সবাই! আর শেফালী মুখ বন্ধ রাখবি।
সকলে সজোরে মাথা নাড়ালো। দিয়া চুপটি করে বাধ্য মেয়ের মত বসে পড়লো। আজ কথা আগাতে মন চাইছেনা। একা থাকলে মন খারাপ আরো ঝেঁকে বসবে। শিফা একটা বোতল এনে ঘোরালো। খেলা হবে ট্রুথ এন্ড ডেয়ার। বোতল প্রথমেই ঘুরলো প্রতীক্ষার দিকে। প্রতীক্ষা ট্রুথ নিয়েছে। প্রতীক্ষাকে প্রশ্ন করলো নিশি,
– এই নিয়ে কয়টা বয়ফ্রেন্ড মা র খেয়েছে চাচ্চুর কাছে?
প্রতীক্ষা হেসে বলে,
– ছয় নাম্বারটা আম্মু ভাগিয়েছে। আব্বু জানেই না।
সকলে হাসছে। মাত্র অষ্টম শ্রেণিতে পড়ে তাতেই এই অবস্থা। এরপর পুনরায় বোতল ঘুরালে মনিকার দিকে ঘুরে।মনিকা ও ট্রুথ নিলো।প্রশ্ন করলো তাহি,
– আমি জানি মনি তুই কাউকে খুব ভালোবাসিস, কিন্তু এখনো জানাসনি। মানুষ টা কে?
মনিকা ঘা-ব-ড়ে গেলো।এই প্রশ্নটা করবে ভাবেনি। কিছুটা ভেবে বলে,
– জানাবো খুব দ্রুত সবাইকে।কিন্তু সাহস হয়না বুঝলি। যদি তাকে হারিয়ে ফেলি এই ভয়ে বলিনা। তবে তাকে আমি প্রচন্ড ভালোবাসি। তার যত্ন আমাকে মুগ্ধ করে,তার কথা আমাকে টানে। তার হাসি আমাকে ভাবায়। সুযোগ পেলে তোদের জানাবো আগে।জোর করিস না।
তাহি হেসে সম্মতি জানায়। এরপর বোতল ঘুরাতেই শিফার দিকে ঘুরে।শিফা ভয়ে নিলো ডেয়ার। এরা যেভাবে পছন্দ নিয়ে প্রশ্ন করছে শিফাকে করতে কতক্ষন।সে কিছুতেই বলবেনা পছন্দের মানুষের কথা। ডেয়ার দিলো মনিকা।
– যাকে ভালোবাসিস তাকে ফোন দিয়ে আই লাভ ইউ বল।সবার সামনে।
তেঁতে উঠলো শিফা। যা চায়নি তাই হলো। এভাবে না হলেও অন্যভাবে ঘটতে চললো অঘটনটা।
– অসম্ভব, কাউকে ভালোবাসিনা।ফোন কিভাবে দিব। ফোন নাই আমার কাছে।
– ওকে আমাদের মধ্যে যাকে বিশ্বাস করিস তার ফোনটা নে।
– বাসিনা ভালো কাউকে।
– ডায়েরীটা দেখাবো শাহাদ ভাইকে?
– এই একদম না বলছি।
সকলে নড়ে চড়ে বসলো দেখার জন্য। শেষে দিয়ার ফোনটা নিলো। কল করলো সেই কাঙ্ক্ষিত ব্যক্তির নাম্বারে। রিং হচ্ছে শিফার বুকের ধকধক বাড়ছে।ফোনটা যেন না ধরে মনে মনে তাই ভাবছে।দূর্ভাগ্যক্রমে ফোন রিসিভ হলো।তাহি কড়া আদেশ করলো,
– তোর নাম বলবি।নাহয় ভাববে ভাবীজানের কাজ, যেহেতু ফোনটা ভাবীজানের। মনে থাকে যেন।
শিফা মাথা নাড়লো। ও পাশ থেকে আওয়াজ এলো,
– হ্যালো আসসালামু আলাইকুম।
শিফা চুপ থাকাতে সকলে মৃদু ধমকে কথা বলতে বললো।
– জ্বি ওয়ালাইকুম আসসালাম। আমি শিফা।
ওপাশ থেকে নিরব। স্তব্ধ। প্রতিউত্তর আসলো,
– হ্যাঁ বলো।কোনো প্রয়োজন!
– ভা ই য়া। না….মানে.. আমি
– হুম
– না প্রয়োজন নেই।
– তাহলে
– আমি আপনাকে ভালোবাসি। আই লাভ ইউ।
সাথে সাথে ফোন কেটে দিলো। ও পাশে থাকা মানুষটা যে কতটা অবাক হয়েছে সেকথা হয়তো কিশোরী বুঝতেই পারেনি। এ যেন মেঘ না চাইতেই বৃষ্টি ঝরে এলো। দিঘির পাড়ে বসে পদ্ম ফুলগুলো দেখছিলো এতক্ষন। গ্রামে এসেছে অনেকদিন হলো।এই গ্রামে কখনো আসা হয়নি। দিঘির শান্ত পানির দিকে তাকিয়ে মনে মনে বলে উঠলো,
– মেয়ে না জেনে কত বড় ভুল করছো, তোমার ভাইজান জানতে পারলে আমার লা*শও দেখার নসিব হবে না।
দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো অন্তরের অন্তস্থল থেকে। দুরুদুরু করে কাঁপছে বুকটা। দিঘীর পাড় ধরে হেঁটে মেঠো পথ ধরেছে। গ্রামটা ঘুরে দেখলে হয়তো মনের উপর ভারটা কিছুটা কমবে।
– ভাইজান আসতে পারি?
– এসো।
রুমে ঢুকেই ভাস্তিকে কোলে নিলো। ভাইয়ের এবং মেয়ের দুষ্টুমি দেখে ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি ফুটেছে। শাহীন শেহজাকে চাচা ডাকা শেখাচ্ছে। মেয়েটা বাবা ই ডাকছে।
– শাহীন… লিমনকে ডেকে নিয়ে এসো।
শাহীন অসহায় দৃষ্টিতে ভাইয়ের দিকে তাকালো। শাহাদ সেদিকে না তাকিয়েই কাজ করছে। শাহীন অনুরোধ স্বরে বললো,
– ভাইজান মাফ করে দিন,ছোট মানুষ। আর করবেনা বলেছে।
– যা বলেছি তাই করো।
শাহীন ফোন দিয়ে জানাতেই রুমে হাজির হয়েছে লিমন সাঙ্গ পাঙ্গু নিয়ে। শাহাদ ল্যাপটপ থেকে চোখ না তুলেই বললো,
– এতজন কেনো?
রজত এগিয়ে এসে বলে,
– ভাইজান, দে আর এফ্রেডিং… ওহ স্যরি। ওরা ভয় পাচ্ছে। আপনি তো বখা দিতে ফারেন তাই আমাখে নিয়ে আসিছে। এবারের মত ছাড়িয়ে দিন।
শাহাদ শাহীদের মুখের দিকে তাকিয়ে ভ্রু কুচকে বলে,
– ওর এখানে বাংলা ট্রেইনার কে?
শাহীন দু পাশে মাথা নেড়ে বলে,
– আমি না।
রজত আঙ্গুল দিয়ে বলে,
– লিমন ব্রো।
লিমন তৎক্ষনাৎ ভয়ে আড়ষ্ট হয়ে বলে,
– ভাইজান কসম, আমি ওকে শুদ্ধ বাংলা শেখাতে চেয়েছিলাম অথচ ও বাংলার মান সম্মান বিদেশের মাটিতে ডুবিয়ে এসেছে ক কে খ বানিয়ে, প কে ফ বানিয়ে..
– থামো। এত সময় নষ্ট করতে চাচ্ছিনা। নিশাদ রুমে যাও। বৌমাকে ছেড়ে তোমার এখানে আসা উচিত হয়নি। কাব্য ঘুমাতে যাও।সকালে অতিথিদের আপ্যায়নে সারাদিন ব্যস্ত থাকবে। রজত তুমি বাংলাতে একটু একটু করে বলা শেখো। শুদ্ধ ভাষা তোমার বড় ভাবীমা খুব সুন্দর পারে।উনার কাছ থেকে শিখে নেবে। এখন ঘুমাতে যাও। লিমন থাকো।
সকলে লিমনের দিকে মনমরা চাহনী দিয়ে বেরিয়ে গেলো।লিমনের চোখে আকুলতা। লিমনকে বসার জন্য ইশারা করলো। লিমন শুকনো ঢোক গিললো।শাহীন ইশারা দিয়ে বুঝালো, আমি আছি। শুরু হলো বিচার পর্ব।
এবার বোতল ঘুরলো দিয়ার দিকে। সকলে চিয়ার আপ করে উঠলো। দিয়া ট্রুথ নিতে চায়নি। অনেক রকমের কথা আসতে পারে।শেফালী এক বিন্দুও ছাড় দেবেনা এখন তাই ডেয়ার নিলো। তৎক্ষনাৎ শেফালী বলে উঠলো,
– গান তো ভালো গাও,আজকে নেচে দেখাও।
নিশি ভ্রু কুচকে বলে উঠলো,
-এত রাতে গান ছাড়লে বকা খাবোনা! আর ভাবীজানের কোমড়ে সমস্যা জানো না আপু।উল্টা পালটা ডেয়ার দাও কেনো?
– তাহলে তো গেম হলোনা। খালি গলায় গান গেয়ে নাচুক।
শিফা তিতিবিরক্ত হয়ে দাঁত কটমট করে বললো,
– নাচতে নাচতে গান গাওয়া যায়! আজব কথা বলো।
মনিকা দিয়ার দিকে ফিরে প্রশ্ন ছুঁড়লো,
– ভাবীজান নাচতে পারবেন?
দিয়া মাথা নেড়ে দাঁড়িয়ে পড়লো। তাহি বললো,
– ফোনের সাথে আমার মিনি সাউন্ডবক্সটা লাগা।শব্দ বাইরে যাবেনা বেশি।
নিশি তাহির ব্যাগ থেকে মিনি সাউন্ডবক্স বের করে লাগালো। দিয়া নিজে উঠে গান সিলেক্ট করে কানেক্ট করলো। টেস্টিং এর জন্য বাজাতেই শেফালী বলে উঠলো,
– ওরে ভুতের গান। ঠিকই আছে তোমার সাথে এটাই যাবে।
দিয়া কেমন রহস্যজনক হাসি দিয়ে বললো,
– আপা আমি এটা খুব ভালো পারি।
বাকিরা কেমন উৎসুক হয়ে চেয়ে আছে। মনিকা,তাহি তো একে অন্যের দিকে ভীত হয়ে চোখের ইশারা দিচ্ছে।মনিকা ফিসফিস করে বলে,
– ভাবীজানের কি মাথা ঠিক আছে এত গান ফেলে মঞ্জুলিকা!
– থাম, চুপচাপ দেখে যা।
দিয়া কোমড়ে আনারকলির ওড়না বাঁধলো। এখানে আসার আগে শাশুড়ীর কাছ থেকে অনুমতি নিয়েছে আনারকলি পরার।শ্বাশুড়ি অনুমতি দিলো।গরমে গ্রামে জামাই ভালো। এর মধ্যে শেহজা ছোট। এদিকে কেউ খেয়াল করেনি শেফালী ইচ্ছে করে গানের আওয়াজ বাড়িয়ে দিলো যেন বাকিদের সমস্যা হয়,
আমি যে তোমার,
শুধু যে তোমার
মেরি চাহাতে তো ফিজা মেবহেঙ্গে
জিন্দা রেহেঙ্গে হোকে ফানা
আমি যে তোমার, শুধু যে তোমার…
ও পিয়া…
আমি যে তোমার
শুধু যে তোমার….
দিয়া নাচ শেষ করে কোমড় থেকে ওড়না খুলে দাঁড়ায়। নাচের মুদ্রা দেখে বিস্মিত প্রত্যেকে। পুরোদমে প্রফেশনাল নৃত্যশিল্পী মনে হচ্ছে। তাহি চমকিত হয়ে প্রশ্ন ছুড়ে,
– ভাবিজান আপনি নাচ পারেন?
– হুম ক্লাসিকেল পারি।
বিদিপ্তা বললো,
– তুমি পারোনা এমন কিছু আছে ভাবী?
দিয়া একটা চমৎকার হাসি দিয়ে বললো,
– অনেক কিছু,এই ধরো মানুষ খু*ন করতে পারিনা। যদি পারতাম এতদিনে অনেক গুলো লা*শ ফে*লে দিতাম।
গায়ের জামা কাপড় ঝাঁড়তে ঝাঁড়তে দিয়ে কথা গুলো বলে উঠলো। অকপটে বলা কথাগুলো শুনে বাকরুদ্ধ হয়ে থাকা প্রতিটি প্রানীর চোখে মুখে আতঙ্ক। হঠাৎ চোখ যেতেই দেখে দরজার ওপাশে শাহাদ মেয়েকে কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। দিয়া বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে মাথা নোয়ালো। শাহাদ সোজা রুমে ঢুকে যাওয়াতে সবাই দাঁড়িয়ে পড়লো। শেহজাকে দিয়ার কোলে দিয়ে সকলকে চমকে দিয়ে বলে উঠলো,
– প্রথম লা*শটা বোধ হয় আমি হতাম তাই না!
এমন কথা কামরাজুড়ে বাঁজ পড়ার মতো শোনালো।দূর্বলতায় আঘাত করেছে। সামনে দাঁড়ানো মানুষটার বুকে আঁছড়ে পড়তে মন চায় অন্ধকার দিনগুলোতে। অথচ মানুষটার কাছে নগন্য সে।এতরূপ থাকার সত্ত্বেও সেই রূপ আজ মূল্যহীন। শাহাদ প্রসঙ্গে বদলে বললো,
– এত উচ্চশব্দে গান বাজানোর প্রয়োজন কি! বিবেকবুদ্ধি হারিয়েছো?
শেফালী বলে উঠলো,
– ভাইজান ভাবীজান নাচতে চেয়েছে…
শেহজাকে কোলে নিয়ে নির্বিঘ্নে পা ফেলে দিয়া বেরিয়ে এলো কামরা থেকে। বাকিরা চেয়ে রইলো। শাহাদ গম্ভীর কণ্ঠে বললো,
– ঘুমিয়ে পড়ো সকলে।
শেফালী তখনো ফোঁড়ন কাটে,
– অসভ্য মেয়ে কিভাবে ভাইজানের মুখের উপর চলে গেলো।
শাহাদ বিরক্তিকর নেত্রে বলে উঠলো,
– তুমি যে কতটা অস্বাভাবিক তা কি তুমি জানো! এদের মাঝে কি করো! ঘুমাতে যাও।
শাহাদের ধমকে কেঁপে উঠে বাকিরা। নিশি তড়িঘড়ি করে সাউন্ডবক্স খুলে ব্যাগে ঢুকায়। শাহাদ বেরিয়ে যায়।প্রতিটি কামরায় অতিথি। শাহাদ এতক্ষন এই কামরায় ছিলো জানে সে। কামরা জুড়ে মানুষটার শরীরের ঘ্রান ভেসে বেড়াচ্ছে। শেহজা খেতে খেতে ঘুমিয়ে পড়েছে। খচ করে দরজা খোলার আওয়াজ হতেই দিয়া সামনে তাকায়। শাহাদ চেয়ার টেনে হেলান দিয়ে বসে মাথায় হাত রেখে বলে,
– ফারাহ…
– জ্বি
– খুব সুন্দর নাচো।
দিয়া বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে আছে শাহাদের দিকে। শাহাদের চোখের উপর হাত। দিয়া প্রশ্ন করে,
– আপনি দেখেছেন?
– হুম। একটা কথা ছিলো?
– কি!
– চাইলে মুক্তি পেতে পারো।
– আমার মেয়েটা!
– আমার কাছেই থাকুক অথবা নিয়ে যেতে পারো মাঝে মাঝে দেখা করতে দিও এই মানুষটাকে।
– থাকতে পারবেন মেয়েকে ছাড়া?
– অনেক কিছুই তো পারিনা করতে হয়।
– কখন দিতে চান ডিভোর্স।
শাহাদ চোখের উপর থেকে হাত না সরিয়েই বললো,
– সেকথা তো বলিনি। সরাসরি বিচ্ছেদে চলে গেলে?
– মুক্তি মানে কি!
– তুমি যা মনে করো।
– আচ্ছা।
শাহাদ উঠে কাঠের বাড়ির বারান্দায় দাঁড়ালো। দিয়া শেহজাকে শুইয়ে দিয়ে নিজেও বারান্দায় চলে আসে।শাহাদ অন্তরীক্ষে চেয়ে আছে। চাঁদটা কেমন হাসছে। মেঘাচ্ছন্ন আকাশ। অথচ দ্যুতি ছড়াচ্ছে বহুদূর। দিয়ার দিকে একবারো লক্ষ্য করলোনা। বেশ কিছুক্ষন কাটে দুজনের নিরবতায়।
অকস্মাৎ দিয়া শরীরের সমস্ত জোর দিয়ে শাহাদকে নিজের দিকে ফিরিয়ে জড়িয়ে ধরে। ফুফিয়ে কেঁদে উঠলো। কেনো বললো ওই সময়টাতে মানুষটার লা*শের কথা। ক্রন্দনরত গলায় বলে উঠলো,
– কেনো বললেন ওই কঠিন কথাটা! আমি আপনার কিছু নাই হতে পারি। আপনি আমার কি জানেন না!
আরো শক্ত পোক্ত ভাবে আকড়ে ধরলো স্বামীকে।আঁৎকে উঠে শাহাদের অন্তরাত্মা। বুকের স্পন্দন নিজের কান অবধি আসছে আর প্রিয়দর্শিনী শুনবেনা তা তো অসম্ভব! শাহাদের টি শার্টের দুটো বোতাম খুলে লোমশ বুকে নিজের অধর ছুঁয়ে দেয় বার কয়েক। পুরুষালি সত্ত্বা কেঁপে উঠে। অদম্য অনুভূতি দমাতে বারান্দার কাঠের গ্রীল আঁকড়ে ধরেছে। শ্বাস প্রশ্বাস বৃদ্ধি পাচ্ছে। দুচোখ বন্ধ আজ।
সায়রে গর্জন পর্ব ১০
দম আটকে ফেলেছে। যত শ্বাস ছাড়বে হৃদস্পন্দন বৃদ্ধি পাচ্ছে সমানুপাতিক হারে। এ যেন যুদ্ধ চলছে মোলায়েম অনুভূতি এবং কঠিন সত্ত্বার জেদের সাথে।শিথিল হয়ে অনড় পাথরের ন্যায় তখনো দাঁড়িয়ে শাহাদ। আগলে ধরেনি ক্রন্দনরত রমনীকে। বুকে মুখ লুকিয়ে কাঁদছে দিয়া। এতটা বছর পর একান্ত পুরুষের সান্নিধ্যে পেয়ে ভুলেই গিয়েছে সকল গ্লানি। গমগমে স্বরটা কানে বাজছে,
– ঘুমাতে যাও ফারাহ। আমার অস্বস্তি হচ্ছে।
