সায়রে গর্জন পর্ব ৩০
নীতি জাহিদ
শহরের এক কোণায় বাসা ভাড়া করে থাকে মা-মেয়ে। সাবিনার শ্বশুরবাড়ি চট্টগ্রাম। মেয়ের ডাক্তারি পড়ার সুবাধে এই শহরে থাকা। স্বামী মারা যাওয়ার পর ঢাকা-চট্রগ্রাম আসা যাওয়ার মধ্যে থাকে।তাহি সহজে যেতে চায়না। চাচারা উপরে উপরে আদর করলে ও ফুফুরা কটু নজরে দেখে,অপয়া বলে। এই জিনিসটা তাহি নিতে পারেনা। তাহি কি ইচ্ছে করে রাশেদকে শেষ করেছে। রাশেদ না থাকাতে বরং তাহির পৃথিবী থমকে গিয়েছে। কেউ কারো কষ্ট বুঝেনা, উলটো কষ্ট দেয়। সাবিনা টিফিন ক্যারিয়ারে মেয়ের খাবার রেডি করতে করতে নিজের এবং মেয়ের ভাগ্যকে দুষছে। স্বামী হারা হলো, মেয়ের ভাগ্যেও এমন লিখা ছিলো কেনো? কাল রাত থেকে মেয়েটা কেঁদে যাচ্ছে। দুদিন আগে রাশেদের কবরের সামনে পাথর হয়ে পড়ে ছিলো। শাহীন,লিমন গিয়ে সামলেছে। শাহাদ মাথার উপর ছাদ ছিলো। হয়তো নিজের ছেলেও এতটা করতোনা যতটা বোনের ছেলে করেছে। খালা ডাকার পরিবর্তে ডেকেছে মামনি। ছেলেটা ও আজ অসুস্থ।
– আম্মু আমি বের হচ্ছি ফিরতে রাত হবে।
– খাবার নিয়ে যা।
গায়ে এপ্রোন জড়িয়ে গলায় স্টেথোস্কোপ প্যাচায়। বিনা বাক্য ব্যয়ে খাবার নিয়ে বেরিয়ে পড়ে তাহি। রিকশা ডেকে রিকশায় উঠতেই লাফিয়ে পাশে একজন উঠে পড়ে। তাহি ঘাবড়ে গিয়ে পাশ ফিরে দেখে লিমন। শাহীনের বিয়ের পর থেকে একটা শব্দ ও কথা বলেনি তাহির সাথে। দুদিন আগে ও কথা বলেনি শুধু শাহীনের সাথে সামলে নিয়ে বাড়ি পৌঁছে দিয়েছে। তাহি ক্রোধান্বিত হয়ে বললো,
– এ্যাই ছেলে নামো রিকশা থেকে।
লিমন কেমন যেন মলিন চোখে তাকালো তাহির দিকে। পুনরায় চোখ সামনে নিবদ্ধ করে বললো,
– বড় ভাইজান বলেছে উনি না ফেরা অবধি আমি যেন উনার বোনের খেয়াল রাখি।
– মিথ্যুক, কোথায় বলেছে? দেখাও আমাকে?
– ছোট ভাইয়াকে বলেছে।
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
তাহি তড়িঘড়ি করে ব্যাগ থেকে ফোন বের করে শাহীনকে ফোন দেয়। ওপাশ থেকে শাহীন কি যেন বললো এরপর তাহি আর কথা বাড়ায়নি। লিমন চুপচাপ বসে আছে রিকশায়। বাসা থেকে হসপিটাল পর্যন্ত যেতে মিনিমাম ত্রিশ মিনিট লাগবে। এতক্ষন কি করবে ভেবেই নিজের কেমন লাগছে। তাহি নিরব থাকা ছেলেটার দিকে তাকালো। কেমন যেন চোখ লাল। সারারাত মাছি মে*রেছে নাকি! চেহারার এই অবস্থা কেনো? আচমকা লিমন বলে উঠলো,
– ডাক্তার সাহেবা, এই কয়েকদিনে আমাকে একবারো মিস করেন নি?
কথা বলা শেষ করেই তাহির চোখের দিকে তাকালো। তাহি কেমন ঘাবড়ে গেলো। ভ্রু কুচকে বললো,
– আমার ভাবনায়,চিন্তায় একজন মানুষেরই বিচরন তোমাকে কেনো মিস করবো?
– সেটাই, আমাকে কেনো করবেন।
– তুমি আমার বাসার সামনে কখন এসেছো?
– ফযরের নামায আপনাদের মসজিদে পড়েছি।
– এত সকালে?
– আরো পরে হলে পৌঁছাতে দেরি হয়ে যেত। আরো ব্যাপার আছে সেগুলো না জানাই ভালো।
তাহি মুখ ঘুরিয়ে অন্য দিকে ফিরে রইলো। লিমনের ফোন বেজে উঠলো। স্টুডেন্ট এর মা ফোন দিয়েছে। প্রতিটি কথার উত্তরে হুম, হা, জ্বি আপু দিলো। চলন্ত রিকশার গতিতে মনোযোগ। ছেলেটা অমনোযোগী হয়ে উঠাতে তাহি লক্ষ্য করলো তার দিকে। দূরন্ত, বিরক্ত করা ছেলেটা হঠাৎ কেমন চুপসে গেলো। তাহি কৌতুহল দমিয়ে না রেখে বললো,
– চুপ করে আছো যে, তুমি তো চুপ থাকার বান্দা না। কয়েকদিন দেখি আমাকে জ্বালাচ্ছো না।
লিমন ঘাড় ঘুরিয়ে বললো,
– জ্বালালে বুঝি খুশি হতেন!
এমন কথায় ভ্যাবাচেকা খেলো তাহি। বিরক্ত নিয়ে বললো,
– বাজে বকবে না।
লিমন ধীর গলায় বললো,
– একটু আগে স্টুডেন্ট এর মা ফোন দিয়েছিলো। এই মাসের বেতন টা গত সপ্তাহে দেয়ার কথা ছিলো। দিলোনা। আজ থেকে যেতে নিষেধ করে দিলো। বেতন নাকি ওর বাবা ঢাকার বাইরে থেকে আসলে দিবে। আমি আপনাদের মতো এত মেধাবী নই। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ি। মাস শেষে গুণে গুণে একটা এমাউন্ট সেমিস্টার ফি দিতে হয়, বড় ভাইজান থেকে এখন আর নি না। সেই টাকা জোগাড় করতে টিউশন করাই। ভাইজানকে নিষেধ করেছি। বাসার সব খরচ,ভাড়া সব ভাইজান দেয়।ভাইজান নিজেই অসুস্থ। আমি যে এক সেমিস্টার ড্রপ দিয়েছি তা তো ভাইজান জানেনা। জানলে আমাকে মে*রেই ফেলবে। আমার কোনো ফালতু খরচ নেই। সেমিস্টার ফি যোগাতেই টিউশনি করাই।
– ড্রপ দিয়েছো কেনো?
– ফেইল করেছিলাম, খারাপ সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছিলাম এক বছর আগে। আম্মুর জন্য ব্যাক করতে পেরেছি। বড় ভাইজান জানেনা এই কথা।
– তাহলে তো অনেক টাকা সেমিস্টার ফি আসে।
– হুম আটাশ হাজার করে। ট্রাই সেমিস্টার। দুইটা ইন্সটলমেন্ট।
– অনেক টাকা। টিউশনিতে জোগাড় হয় এই টাকা?
– টিউশনি আর পার্ট টাইম জব করে চল্লিশ করতাম। ওখান থেকে কিছু সেভিংস করে অন্য জায়গায় খরচ করতাম।
– কোথায়?
লিমন অন্যমনস্ক হয়ে বলে,
– নানা ভাইয়ার একটি এতিমখানা আছে, ওটা আম্মুর নামে। আমি ওটা চালাই আর নিজের খরচ…
এতটুকু বলে লিমন থামলো। পুনরায় বললো,
– আপনার হসপিটাল চলে এসেছে।
– এখন কোথায় যাবে?
– শোরুমে…
– ওখানে কি?
– সেলসম্যান আমি। আমার সুন্দর চেহারা দেখে টাকা দিবে?
পকেট থেকে মানিব্যাগ বের করে রিকশা ভাড়া মিটিয়ে দিলো। তাহি নিষেধ করাতেও শুনেনি। তাহি বিরক্ত হয়ে বললো,
– এই না বললে, টাকা নেই?
– টাকা নেই বলিনি, টিউশনি চলে গিয়েছে বলেছি। নিজের হাত খরচের টা ভাইজান আসা অবধি রিকশা ভাড়া দেয়ার জন্য বাঁচিয়ে রেখেছি। আরেকটা খুঁজে নিব টিউশন। আর আপনার রিকশা ভাড়া দেয়া আমার জন্য ফরজ। গেলাম ভালো থাকবেন।
লিমন সোজা সামনের দিকে হেঁটে নিজের পথে পা বাড়ালো। তাহি মনে হলো পুরোটাই এটেনশন পেতে এমনটা করেছে। সবসময়ই দেখেছে চাকচিক্যের মধ্যে। এত কষ্ট করার মত ছেলে লিমন নয়। ঢুকে গেলো হাসপাতালের ভেতর।
শাহীনকে দেখে লায়লা ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়লো। সাথে আছে আরো একজন মেহমান। রাশেদ মারা যাওয়ার পর এই বাড়িতে শাহাদ ব্যতীত কারো ধূলাও পড়েনি। রোদসীও আজ এসেছে। হাম্মাদ সব খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছে। টেবিলে নাস্তা রেখে আঁচলে চোখ মুছলেন লায়লা। শাহীন সান্ত্বনা দিয়ে বললো,
– আন্টি একটা খুব দরকারে এসেছি। বুঝতে পারছিনা কিভাবে বলবো বা আপনারা ঠিক কিভাবে আমাকে সাহায্য করবেন?
– বলো বাবা।
– আপনি তো রাশেদ ভাইয়ের জন্মদাত্রী মা নন। একথা কি ভাই জানতো?
রোদসী চমকে উঠলো। প্রশ্ন করলো,
– আম্মু ভাইয়া আমার আপন ভাই না?
লায়লা আঁচলে চোখ মুছে মাথা নাড়ালো বামে ডানে। কম্পিত গলায় বললো,
– কিন্তু ও আমার ছেলে। আমার বাবা।
কান্নায় ভেঙ্গে পড়লেন। রোদসী মাকে জড়িয়ে ধরে বললো,
– ভাই জানতো?
– জেনেছে পরে। ওর মাকে ও খুঁজেছে অনেক। পায়নি। বাবা তো আগেই দুনিয়া ছেড়ে দিয়েছিলেন।
হাম্মাদ প্রশ্ন করে,
– কে ছিলেন রাশেদের বাবা?
লায়লা চোখ মুছে বলে,
– রাশেদের বয়স দু বছর। আমার স্বামী রাশেদের বাবা ফোরকান আবেদীনের ম্যানেজার ছিলেন। ওদের বাড়ি পুরান ঢাকা। কি সুন্দর সংসার ছিলো স্যারের আর ম্যাডামের। স্যারের সাথে ম্যাডামের বিয়ে হয় অনেক ঝুট ঝামেলা করে। ম্যাডামের নাম ছিলো মেহনাজ পাঠান। উনাদের বংশের মেয়েদের অন্য বংশে বিয়ে দেন না। স্যারের আব্বা অনেক অনুনয় বিনয় করে ম্যাডামকে স্যারের জন্য নিয়ে আসেন। ফোরকান স্যার বলে দিছিলেন উনি ম্যাডাম ছাড়া বিয়ে করবেন না। বন্ধুর বিয়েতে ম্যাডামকে পছন্দ হয়েছিলো। ফোরকান স্যাররা ছিলেন তিন ভাই। দুই ভাই এখনো আছেন।
– বাকি দুইভাই কোথায় আন্টি?
শাহীনের প্রশ্ন শুনে ঘাবড়ে গেলো লায়লা।
– আমি জানিনা বাবা।
– আচ্ছা আপনার কাছে কি করে এলো রাশেদ ভাই।
– রাশেদের দ্বিতীয় জন্মদিন সেদিন। ম্যাডাম আমাদের ও দাওয়াত দিছিলো। ঘরোয়া আয়োজন। ফোরকান স্যার পছন্দ করেন না ধুমধাম। রাত তখন সাড়ে এগারোটা। ম্যাডামের ফোনে খবর আসলো স্যারের গাড়ি এক্সিডেন্ট হইছে। আমরা ছুটে হাসপাতালে গেলাম। কিন্তু স্যার ততক্ষনে দুনিয়া থেকে চলে গেছেন। ম্যাডাম পাগলের মত হয়ে গেলো। স্যারের বাবা এক বছর আগে বিদায় নিয়েছে। ম্যাডামের পরিবার স্যারকে কম পছন্দ করতেন। ম্যাডামের রূপের বর্ননা আমি দিয়ে শেষ করতে পারবোনা। সেই রূপই ম্যাডামের জন্য কাল হয়ে দাঁড়ালো। স্যারের মারা যাওয়ার এক সপ্তাহ পরের ঘটনা। আমি প্রায় থাকতাম ম্যাডামের কাছে। একা বাড়ি ভয় পাইতেন। সেদিন রাতে রাশেদ বাথরুম যাবে। ম্যাডামের শরীর ভালোনা। আমি নিয়ে গেলাম। ওর ক্ষুধা লাগছে বলাতে খিচুড়ি খাইয়ে রুমে আনতেই দেখি ম্যাডাম আমার সামনে দৌঁড়ে এসে বলে, লায়লা রাশেদকে নিয়ে পালাও। আমার কিছু হলে তুমি ওকে দেখে রেখো। আমি তখনো বুঝি নাই কি হতে যাচ্ছে। ম্যাডামকে অনেক বুঝালাম কিন্তু ম্যাডাম আসলোনা আমার সাথে। গেটের কাছে অনেক গুলো গাড়ির আওয়াজ। কতগুলো পায়ের শব্দ। গোলাগুলি। রাশেদ ভয় পাচ্ছিলো। ম্যাডাম আমার পায়ে ধরে ফেললেন রাশেদকে নিয়ে যেতে। আমিও হতবিহ্বল হয়ে ছুটলাম পেছনের দরজার দিকে। এরপর দেখি ম্যাডাম সিড়ি দিয়ে মুখোমুখি হয়েছে তাদের। আমার যতদূর ধারণা সেদিন ম্যাডামের সাথে খুব খারাপ কিছুই হয়েছিলো।
– আপনি কাউকে চেনেন নি? ম্যাডাম কি বেঁচে ছিলেন?
– আমার মনে হয় ম্যাডাম আছেন। কারণ রোদসীর বাবার কাছে প্রতি মাসে একটা এমাউন্ট কেউ রাশেদের নামে পাঠাতো। রাশেদ যেদিন মা রা যায় ওই এমাউন্ট আসা বন্ধ হয়ে যায়। সাথে একটা করে চিঠি থাকতো। চিঠিতে সরাসরি ধমক থাকতো যেন এই টাকা নেন। নাহলে হুমকি আসতো কখনো রোদসীর ক্ষতি করবে অথবা কখনো আমার। একটা সময় আমরাও অভ্যস্ত হয়ে যাই।
– রাশেদ ভাই জানলেন কিভাবে?
– রোদসীর বাবা মা রা যাওয়ার পর আমি ওই এমাউন্ট রাশেদকে দিতাম। ও অবাক হয়ে একদিন প্রশ্ন করলো, আম্মু আমাদের সংসার চালাতে হিমশিম খাই অথচ এত টাকা আমাকে কিভাবে দাও তুমি? এভাবেই জেনে গেছে। ও মা রা যাওয়ার বছর খানেক আগে জেনেছে আমি ওর আসল মা না। এর পর শুরু করে খোঁজ, একদিন ফোনে বলেছিলো ওর মা সম্পর্কে জানার পর থেকেই ছেলেটা গোমড়ে গেছে। বাঁচতে দিলোনা ওরা আমার ছেলেটাকে।
– আন্টি আর কিছু কি জানেন আপনি?
– না বাবা।
– আচ্ছা আজ উঠি।
– কিছু তো খেলেনা, মেহমান নিয়ে আসলে।
– আরেকদিন আন্টি। কাজ আছে।
দুজনই বেরিয়ে পড়ে। শাহীন দুয়ে দুয়ে চার মিলাচ্ছে। হাম্মাদ গাড়িতে উঠে শাহীনকে বলে,
– শাহীন আমি যা ভাবছি আপনি ও কি তাই ভাবছেন।
শাহীন মাথা ঝাকিয়ে বলে,
– মেহনাজ পাঠান ওরফে মেহেরজান আম্মা। সেদিন কি হয়েছিলো? আরেকটা ব্যাপার হাম্মাদ খেয়াল করেছেন, আমরা ওই বাড়ির দেয়ালে কিছু পারিবারিক ছবি দেখেছিলাম ওখানে একজনকে আমার বেশ পরিচিত লেগেছে। কিন্তু মনে করতে পারছিনা। ছবিটা আমি ভাইজানকে সেন্ড করেছিলাম। সুস্থ হলে হয়তো দেখবে।
হাম্মাদ গাড়ি চালাতে চালাতে শাহীনের দিকে তাকিয়ে একটা হাসি দিয়ে বললো,
– ইনশাআল্লাহ শাহাদ সুস্থ হবে। আল্লাহ মালিক।
ল্যাপটপে কানেক্ট করেছে ভিডিও কল। এই কয়েকদিনে অনেকটাই শুকিয়ে গিয়েছে। সকলকে সালাম দিয়েই একটা হাসি দিলো। পরনে সেই হাসপাতালের পোশাক। সুলতানা কবির ছেলের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। মায়ের দিকে তাকিয়ে বললো,
– আম্মু আপনি শুকিয়ে গিয়েছেন আগে থেকে। খাওয়া দাওয়া করেন না ঠিক মতো।
ছলছল চোখে ছেলের দিকে তাকিয়ে বললো,
– আমার বাবু নেই, খাবার টেবিলে বসে বাবুর চেয়ারটার দিকে তাকালে আমার বুকটা খাঁ খাঁ করে মানিক।
– ঠিক মত খাবেন,আমি এসে যেন দেখি আমার আম্মু আগের মত ফিট এন্ড ফাইন। ওকে?
নাক টেনে আঁচলে চোখ মুছে হেসে মাথা নাড়ায়। শাহাদ এবার বাবাকে বলে,
– আব্বু ডাক্তারের রিপোর্ট তো ভালো না আপনার। এত চিন্তা করছেন কেনো। আপনার ভরসায় সবাইকে রেখে আসলাম আপনি যদি নড়বড়ে হোন কিভাবে চলবে?
রায়হান সাহেব ভ্রু কুচকে বললেন,
– তোমার ডাক্তারের কাছে আর যাবোনা। ব্যাটা ফাজিল তোমাকে এসব পাঠায় কেনো? আমার মা*র খাবে এরপর ব্যাটা।
শাহাদ হো হো করে হেসে উঠলো। ওর হাসির আওয়াজে শেফালী, শিফা ছুটে এলো। বাবা মায়ের পেছন দিকে দাঁড়িয়ে পড়লো। দিয়া একপাশে আছে। শাহাদের সামনে আসেনি। সবাই একদৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখছে সেই হাসি। সুলতানা কবির দোয়া পড়ে স্ক্রিনে ফু দিচ্ছে জোরেই বললো,
– আমার বাবুর দিকে কারো নজর যেন না লাগে।
শাহাদ হাসি থামিয়ে বলে,
– হ্যাঁ আপনার আটত্রিশ বছরের বাবু। বাবুর বাবুটা কই? আচ্ছা থাক ওকে সামনে আনার দরকার নেই।
অকস্মাৎ পেছন থেকে শেফালী বলে উঠলো,
– ভাইজান…
শাহাদ বোনের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসি দিয়ে বললো,
– ভালো আছো?
শেফালী কাত করে মাথা নাড়ায়।
– আপনার শরীর কেমন?
চোখের পলক ঝাপটিয়ে বলে,
– আলহামদুলিল্লাহ। আমার মামা কোথায়?
– ঘুমায়।
– আচ্ছা।
ভাই কথা বলতে চাইছেনা বুঝে শেফালী চুপ হয়ে গেলো। তখনই শাহাদ বলে উঠলো,
– বিজনেস করবে নাকি কলেজে পড়াবে?
দরদর করে ঝরতে লাগলো চোখের পানি। দুহাতেও আটকাতে পারছেনা। দুপাশে মাথা ঝাঁকিয়ে বলে,
– কিছু করবোনা। বাসায় থাকবো। আবিরের বেস্ট মাম্মা হবো।
– যাই করো বুঝে শুনে করো ভাইজান যতদিন বেঁচে আছি পাশে পাবে। আর ধন্যবাদ পাওনা রইলো তোমার। ভুলতো অনেক বড় করেছো। তবে তার মাঝে ও ঠিক কাজটা করেছো নিজেকে নষ্ট করোনি অবৈধ কিছু করে। খালেদ পারভেজ ডিভোর্স পেপারে সাইন করে দিয়েছে। শাহীনের কাছে আছে। শয়তানি বুদ্ধিতে চালাক হয়ে গিয়েছিলে। সেই বুদ্ধি কাজে লাগালে তুমি আজ আমার শিফা ফুলের মতো আমার মাথার তাজ হয়ে থাকতে।
– স্যরি ভাইজান।
– শরীরের প্রতি যত্ন নাও। ছেলেকে সময় দাও।
ভাইজানের অগোচরে কিছুই ছিলোনা। খালেদ পারভেজকে বিয়ে করেছিলো এই খবর ভাইজান জানে। সেদিন ভয়ে বলেনি কারণ এর এক সপ্তাহ আগেই খালেদ বিয়ের কথা অস্বীকার করে হুমকি দিয়েছিলো। নিজের কাজে বিয়ের কাবিন নামা ও ছিলোনা। নোমানকে হারিয়ে জীবনের সবচেয়ে বড় ভুলটা করেছিলো।
– শিফা…
শিফা ভাইজানের সম্বোধনে হাসি দিয়ে বলে,
– আই মিস ইউ ভাইজান। কখন আসবেন? আমার বাসাতে ভালো লাগে না আপনাকে ছাড়া। ছোট ভাইয়াও বাইরে থাকে।
– রেজাল্ট যেন ভালো হয়। পড়াশোনা করো ঠিক আছে। এরপর বিয়ে দিয়ে দিব।
সকলে চমকে উঠলো। একে অন্যের মুখ চাওয়া চাওয়ি করে শাহাদের দিকে তাকাচ্ছে। শাহাদ সকলের ঘোর ভেঙ্গে বললো,
– মজা করেছি। মজা বুঝোনা তোমরা।
শিফার মনে হলো হাফ ছেড়ে বাঁচলো। এর মাঝে আফিয়া এক কাজ করে বসলো। শেহজা ঘুম থেকে উঠে কাঁদছিলো। ওকে এনে সোজা সুলতানা কবিরের কোলে বসিয়ে দিলো। মেয়েটা ল্যাপটপের স্ক্রিনে বাবাকে দেখে চুপ হয়ে গেলো। হাত বাড়িয়ে স্ক্রিন ধরছে। শাহাদ এতক্ষন স্বাভাবিক থাকলেও এবার নড়েচড়ে বসলো। স্ক্রিনে আঁচড় কা*টছে, কিন্তু কথা বলছে না। একবারো আজকে বাবা ডাকছেনা। সুলতানা কবির বললো,
– দাদুমনি দেখো বাবা,এই যে। কথা বলো।
ঠোঁট উলটে রেখেছে কিন্তু কথা বলছে। শাহাদ মেয়ের দিকে তাকিয়ে দেখছে মেয়ের অভিমান। এই মেয়ে ফুঁফিয়ে কাঁদছে চিৎকার ও করছেনা। শাহাদ নিজের বুকে হাত দিয়ে কাঁপা গলায় মেয়েকে ডাকলো,
– আম্মাজান, বাবার সাথে কথা বলবেন না?
ছলছল চোখে কেঁদে দিয়ে দুহাত বাড়িয়ে দিলো। বুঝালো কোলে নাও। জোরে চিৎকার দিয়ে কাঁদছে, বা বা। আর কেউ সামলাতে পারছেনা শেহজাকে। সুলতানা কবির দাঁড়িয়ে পড়লো কোলে নিয়ে, শিফা কোলে নিতে চাইলো কারো কোলে যাচ্ছেনা। গলা ফাটিয়ে চিৎকার করছে বাবা বলে। দিয়া এসে কোলে নিলো। আজ মাকেও মানছেনা। একপাশে চলে গেলো সুলতানা কবির। এই মেয়েটাকে এখন আনাই উচিৎ হয়নাই। দিয়াকে শিফা আর শেফালী ধরে স্ক্রিনের সামনের বসিয়ে দিলো। শাহাদ দেখতে পেলো সহধর্মিণীকে। গুছালো দিয়া আর নেই। চোখ ভেতরে ঢুকে গিয়েছে, গাল ফোলা। আবার দুহাত বাড়িয়ে চিৎকার দিচ্ছে। শাহাদ এবার মুখ থেকে হাত সরিয়ে ডিসকানেক্ট করে দিলো লাইন। শাহীন শেহজাকে কোলে নিয়ে বেরিয়ে গেলো। মেসেজ আসলো দিয়ার ফোনে,
Farah, Dua korte bolbe sobaike amar jonno. Jananor sahosh pacchilam na, aj e operation. Jodi na firi dukkho rekho na mone. Khoma kore dio. Ar jodi firi sob pushiye debo.
~ Shahad Imroz
দিয়া চোখের পানি মুছে বললো,
– আম্মু আপনার ছেলের আজ অপারেশন। দোয়া করতে বলেছে সবাইকে।
উঠে চলে গেলো রুমে দিয়া।
শাহাদ লাইন বিচ্যুত করে দুহাতে মুখ ঢাকে। মেয়ের জন্য বুক পুড়ছে। সব ফেলে ছুটে যেতে ইচ্ছে করছে। এই মেয়েটা তার সব। যেদিন শেহজার জন্ম হয় সেদিন একটা সমাবেশে ছিলো। দিয়ার কষ্ট সচক্ষে কখনো দেখতে চায়নি। সবাইকে হাসপাতালে থাকতে বলে নিজে সমাবেশে চলে এসেছিলো। গাড়িতেই শুনলো মেয়ে হয়েছে। ছুটে গিয়েছিলো হাসপাতালে। মেয়েকে কোলে নিয়ে আলাদা কেবিনে ঢুকে প্রায় আধঘন্টা মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে ছিলো। সদ্য জন্ম নেয়া শেহজা বাবার দিকে তাকিয়ে পিট পিট চোখে শুধু হেসেছে। একদম বুকের সাথে মিশিয়ে ফেলেছিলো মেয়েটাকে।
সায়রে গর্জন পর্ব ২৯
যে কটা দিন হাসপাতালে ছিলো দিয়া, মেয়েকে নিয়ে পাশের কেবিনে থাকতো শাহাদ। মাকে দিয়ার কেবিনে রেখেছে। খাবারের সময় মেয়েকে নিয়ে যেত, এরপর আবার দিয়ে যেত। মেয়ের জন্য এভাবে কাঁদবে ভাবতে পারছেনা। চোখ মুছে হামজাকে ফোন দিলো। অপারেশনের আগে স্রষ্টাকে স্মরণ করা উচিত।নিজের জন্য কখনো কিছু চায়নি, খুব করে আজ চাইবে যেন সুস্থভাবে ফিরে যেতে পারে বাংলাদেশ।
