সায়রে গর্জন পর্ব ৪৫
নীতি জাহিদ
রাস্তায় কাদামাটি ফুলে ফেঁপে উঠেছে। গাড়ি একটু যায় তো আরেকটু চাকা ডেবে যাচ্ছে। ড্রাইভার গাড়ি উঠাতেই পারছেনা। এখন উপায় একটাই গাড়ি রেখে যেতে হবে নতুবা ফিরে যেতে হবে। দু দুটো গাড়ির একই অবস্থা। বৃষ্টি থেমেই গেলো। দিয়ার নিরবতা সায় দিচ্ছে ঝড় অন্যদিকে উঠতে পারে। বৃষ্টি থেমে যাওয়াতে তো কারো কোনো হাত নেই। গাড়ির দরজা খুলে মেয়েকে নিয়ে বেরিয়ে এলো শাহাদ। দিয়াকেও বের হতে বললো। দেখাদেখি কল্পনারাও গাড়ি থেকে বের হয়ে শাহাদের পিছু নিলো। কল্পনার স্বামী সালিফ বললো,
– দুলাভাই, আমরা আর গাড়ি নিয়ে আগাতে পারবোনা।
শাহাদ প্রশ্ন করলো,
– তাহলে উপায়?
– ভ্যান,রিকশা অথবা দুটো মানব চাকা।
– কতদূর এখান থেকে।
– প্রায় তিন কিলো।
– এই বৃষ্টির রাস্তায় ভ্যান ও তো অসম্ভব।
দিয়া ব্যাগ থেকে ফোন বের করলো। কার যেন নাম্বার ডায়াল করলো। এর মাঝে ফোন ও চলে গিয়েছে।
– আসসালামু আলাইকুম, কেমন আছিস?
ওই পাশে থেকে প্রতিউত্তর,
– আলহামদুলিল্লাহ কি মনে করে?
– ভাই, আমাকে একটা ভ্যান ম্যানেজ করে দিতে পারবি? মনোহরপুর এসেছি। রাস্তায় কাদা।
– কোথায় আটকে আছিস?
– মুন্সীর হাটের ধান ক্ষেতের রাস্তায়।
– থাক, ম্যানেজ করছি।
দিয়া ফোন রাখতেই দেখতে পেলো ড্যাব ড্যাব করে সব কটা চোখ তার দিয়ে চেয়ে আছে। গমগমে গলায় প্রশ্ন ছুড়লো,
– কে?
– আশিক।
দাঁত কিড়মিড় করে বললো,
– ওই ডাক্তার ছেলে টা না? আবার কেনো, আমাকে অকর্মক মনে হয় যে অন্য মানুষের সাহায্য লাগবে।
– এভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে ইচ্ছে করছে না।
– প্রয়োজন হলে হেঁটে যাবে। আমি কোনো আশিকের হেল্প নিবো না। সামনে হাঁটো।
দিয়া থমকে আছে, এর মাঝে শাহাদ কয় পা এগিয়ে গিয়েছে। পুনরায় পিছিয়ে দিয়ার হাত ধরে টেনে নিয়ে আগানো শুরু করলো শেহজাকে নিয়ে। পেছন ফিরে সালিফকে বললো,
– কারো অপেক্ষায় না থেকে হাঁটা ধরুন। এভাবে দাঁড়িয়ে থাকলে রাত হবে।
কল্পনা,রাখি এবং সালিফ মুখ লুকিয়ে হাসছে। দিয়া থমথমে মুখে ধুপধাপ পা ফেলছে। মনে হচ্ছে কেউ টেনে হিঁচড়ে নিয়ে যাচ্ছে। শাড়ি সামলে কাদায় হাঁটা ভীষন কষ্টকর। তবুও মুখটাকে ফুলো লুচির মতো করে রেখেছে। তাল গাছের নিচে এসে শাহাদ থামে। দিয়ার কোলে মেয়েকে দিলো। আশপাশে তাকিয়ে দেখলো কোনো রিকশা বা ভ্যান আছে নাকি। নাহ! কিছুই পেলোনা। অবশেষে শেহজা সুদ্ধ তার মাকে পাঁজকোলে তুলে নিলো। মেয়ের মায়ের চোয়াল ঝুলে গেলো। সামনে চোখ নিবদ্ধ রেখে বললো,
– পড়বেনা, আমার দায়িত্বে আছো। মেয়েকে ধরো শক্ত করে।
– মেয়েটা এভাবে চিৎ হয়ে থাকলে বমি করে সব ভাসাবে। বাড়ি থেকে খাইয়ে এনেছি।
তৎক্ষনাৎ সামনে একটা গ্রামীন রিকশা এলো। মা এবং মেয়েকে নামিয়ে দিলো। শহরের রিকশা থেকে নকশায় ভিন্ন আদল। শাহাদ ডাক দিলো,
– যাবেন?
রিকশা থেমে আগাগোড়া ভালোভাবে দেখে মাথা কাত করে প্রশ্ন করলো,
– কই যাইবেন?
দিয়ার দিকে তাকাতেই দিয়া উত্তর দিলো,
– খামার বাড়ি।
রিকশা চালক উত্তর দিলো,
– ওইহানে তো অহন কেউ থাহে না। মুরাদ সাব আর তেনার বউ মইররা যাইবার পর মাইয়াডা দাদার বাড়ি আছে। মাঝে সাঝে উনার ভাই মানুষ পাডাইয়া পইষ্কার করায়।
শাহাদ বিরক্ত নিয়ে বললো,
– আপনি যাবেন?
– হ হ যামু মামা চলেন।
দিয়া রিকশায় উঠে বসে। এরপর শাহাদ মেয়েকে কোলে নিয়ে বসে। প্রথম চাকা ফেলতেই রিকশা নড়ে উঠলো। মেয়েকে শক্ত করে ধরে বসতেই দেখে মেয়ের মা তার হাত আকড়ে ধরেছে। সহধর্মিণীর কাঁধের উপর হাত ঘুরিয়ে নিজের কাছে এনে মিশিয়ে নেয়। আওয়াজ ছাড়লো,
– মামা একটু আস্তে চালাবেন। দুটো বাচ্চা সামলানো কষ্ট।
রিকশাচালক মুচকি হেসে ঘাড় কাত করলেন। যেতে যেতে অনেক কথাই বললেন। আকাশে মেঘের পুনরায় ঘনঘটা শুরু। শাহাদ মনে মনে প্রার্থনা করলো, বৃষ্টিটা যেন ও বাড়ি গেলেই হয়। এখন হলে মেয়েটা ভিজে যাবে। বাড়ির কাছাকাছি আসতেই ঝমঝমিয়ে শুরু হয়ে গেলো বারিধারা। দিয়া শাড়ির আঁচল তুললো মেয়ের মাথায়। ভাড়া মিটিয়ে শাহাদ এবং দিয়া ছুটলো বাড়ির দিকে। চারদিকে গাছ মাঝে একটা সরু সিমেন্টের রাস্তা। উপরে ছাউনি দেয়া। বাড়ির মেইন গেইট খোলা দেখে বুঝলো কল্পনারা আগেই পৌঁছে গেছে। সামনে ঢুকতেই এই সৌন্দর্য দেখার জন্য শাহাদ মোটেও প্রস্তুত ছিলোনা। মঈন সাহেব বাগানের মালিকে আগেই পাঠিয়েছে সব গুছিয়ে রাখতে। আশপাশে এত ফলের গাছ, বিভিন্ন রকমের ফুল পড়ে আছে ঘাসে, সত্যি একটা টিনের রাজপ্রাসাদ বানিয়েছেন শ্বশুর মশাই। বাড়ির বারান্দায় দাঁড়িয়ে মেয়েকে কোলে নিয়ে দিয়াকে প্রশ্ন করলো,
– ভিজবে?
সবাইকে বাড়ি ঘুরে দেখতে বলে দিয়া শাহাদের হাত ধরে টেনে নিয়ে যাচ্ছে নিজের কামরার দিকে। রুমে এসে দরজা আটকে শেহজার জামা বদলে দিলো। বাচ্চাটা স্থির হয়ে বসছেনা ছটফট করছে এদিক সেদিক যেতে। রুমের ডান পাশে কর্ণারে গিয়ে দুয়ার কাঁটা উঠিয়ে আরেকটা দরজা খুলে দিলো। এতেই যেন উন্মুক্ত হলো এই বাড়ির প্রকৃত রহস্য। ছোট্ট একটা পদ্ম পুকুর। ঘরের ভেতর থেকেই দেখা যাচ্ছে পুকুরে বিচরন করছে রাজহংসী ও তার দল। পদ্মতে ভরা পুকুর। ঝনঝন করছে বৃষ্টির ফোঁটা টিনের চালে। ভেজা মাটির সোদা গন্ধ। বেল গাছের পাতা বেয়ে টুপ টুপ করে পানি পড়ছে বসার জায়গাতে। শাহাদের কোলে মেয়েকে দিয়ে দু হাত মেলে নেমে পড়লো বাড়ির উঠোনে। মুরাদ মজুমদার মেয়েকে ঠিক কতটা ভালোবাসতেন আজ শাহাদ অনুমান করতে পারছে। একটা ছোট্ট রাজ্য বানিয়ে দিলেন মেয়ের জন্য। ধারণা ছিলো শেহজা তার কাছে তার সবটা জুড়ে, আজ বুঝতে পারলেন দিয়া মুরাদের কতটা জুড়ে ছিলো। এতটা বছর বাবা বিনা এই মেয়ে কিভাবে টিকে ছিলো? শেহজা হাত দিয়ে দেখাচ্ছে মায়ের কাছে যাবে। শাহাদ জোর করে আটকে রেখেছে মেয়েকে। দিয়া বৃষ্টিতে ভিজেই চলেছে। এই মেয়ে নির্ঘাত শয্যাশায়ী হবে। যেভাবে টানা ভিজেই যাচ্ছে। দিয়া চিৎকার দিয়ে বললো,
– শেহজার বাবা, আপনি যেখানটাতে দাঁড়িয়ে আছেন সেখানে বাবাজান দাঁড়িয়ে থাকতেন। আমি এখানে ভিজতাম। আম্মিজান পুকুরে নেমে আমার জন্য শালুক তুলে আনতো। এরপর আমরা মা মেয়ে ভিজতাম। এই যে বেল গাছটাতে বারো মাস বেল ধরতো। টেবিলে সাজানো থাকতো বেলের শরবত। বাবাজান বৃষ্টিতে ভিজতেন না। একদিন বাবাজান বলে বসলেন, “একদিন আমি আর আমার মেয়ের জামাই বসে বেলের শরবত খাবো, সেদিন আর আমি একা থাকবোনা। তোমরা মা- মেয়ে আমাকে ফেলে ভিজছো তো, সেদিন আমি দেখে নিব।” অথচ আজ দেখুন বেল নেই, আমার বাবাজান নেই, আপনি আছেন সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে, আমি আছি আমার জায়গায়, আমার আম্মিজান নেই। কি দোষ ছিলো আমার বাবাজানের -আম্মিজানের?
নিশ্চুপ শাহাদ, অনেক দিন পর চোখ দুটো ভারী হয়ে এসেছে। শেহজাকে বুকের সাথে চেপে ধরেছে। শেহজাকে দিয়ার সাথে কল্পনা করতেই অন্তরাত্মা কেঁপে উঠলো। একা এই দুনিয়াতে মুরাদ,আমিরা ছাড়া তার ফারাহ্ ঠিক কতটা অসহায় ছিলো? নিজেকে সামলাতে না পেরে ছেড়ে দিলো চোখের জল। সামনে তাকিয়ে দেখে দিয়া কাদার মধ্যে বসে পড়েছে। শেহজা কাঁদছে ওদিকে যাবার জন্য। মেয়েকে সামলে পুনরায় সামনে তাকালো। তাকিয়ে দেখে দিয়া নেই। হন্তদন্ত হয়ে এদিক সেদিক চোখ বুলালো। ছুটে গিয়ে দিয়ার রুমের দরজা খুলে কল্পনাকে ডেকে শেহজাকে দিলো। রুমে এসেই বৃষ্টিতে নিজেই নেমে গেলো। আশপাশটা গাছ পালায় ভর্তি। হঠাৎ চোখ গেলো পুকুরে। ভেতরটা কেঁপে উঠলো। দিয়ার আঁচল ভাসছে। ঝাঁপিয়ে পড়লো পুকুরে। যা ভেবেছিলো এই মেয়েকে সামলানো যাবেনা! তাই হলো। পানিতে ডুব দিয়ে হাতড়ে কোমড় জড়িয়ে জোর করে উঠালো। উঠবেনা বলে ধাপাধাপি করছে পানিতেই। ধমকে বললো,
– পাগল হলে মেয়ে? কি করছিলে?
দিয়ার মুখে হাসি। চোখ ঝাপটা দৃষ্টিস্থির শাহাদের মাঝে। রাজহংসী গুলো ঘিরে ধরেছে তাদের। দিয়া হেসে বলে,
– কমান্ডার সাহেব, আমার মনে হচ্ছে এখানে আম্মি জানের ছোঁয়া পাচ্ছি। উঠোনে টিনের চালে বাবাজানের গন্ধ। যখন ডুব দিলাম মনে হলো আম্মিজান আমাকে কোলে তুলে আদর করছে। কেনো দিলেন না আরেকটু ডুবে থাকতে?
বার বার চোখের পলক ফেলা মেয়েটির এক গালে হাত রেখে আদুরে ভঙ্গিতে বললো,
– চলো ফারাহ্, আম্মিজান – বাবাজান আমাদের জন্য অনেক দোয়া করেছেন। উনারা থাকলে কি তোমাকে এভাবে বেপরোয়াভাবে থাকতে দিতেন। এই যে পুকুরে ঝাঁপ দিচ্ছো, বৃষ্টিতে ভিজেই যাচ্ছো। তুমি অসুস্থ হলে যে শেহজাও অসুস্থ হবে।
দিয়া হাসে আর বলে,
– আপনি একদম বাবাজানের মতো। বাবাজান ও আম্মিজানকে বলতো, আমিরা জানেমান আপনি কি এভাবেই ভিজবেন আর পুকুরে সাঁতরে যাবেন? আপনাকে দেখে তো মেয়েটা দুষ্টু হচ্ছে। অসুস্থ হয়ে পড়বে যে আমাদের মা টা।
পদ্ম পুকুরের মাঝে কপোত-কপোতীদের এত সুন্দর দৃশ্য হয়তো কখনো কেউ দেখবেনা, দেখার সুযোগ হবেনা। কল্পনা এবং রাখি শেহজাকে নিয়ে কামরায় আসতেই চক্ষুবদ্ধ হলো এই মনোরম, সুদৃশ্য। কল্পনা ফোন বের করে দুটো ছবি তুলে নিলো। ছবি তুলেই বের হয়ে গেলো কপোত-কপোতীর ব্যক্তিগত কামরা থেকে।
দিয়াকে কোলে নিয়েই পুকুর থেকে উঠে আসলো। কপালে অধর ছুঁয়ে দিলো প্রেয়সীর। দিয়া বুকের সাথে কতগুলো পদ্ম জড়িয়ে ধরে রেখেছে। শাহাদের বুক থেকে বেরিয়ে এলো দীর্ঘ শ্বাস। পৃথিবীর সবটুকু ভালোবাসা ঢেলে দিলেও এই মেয়ের শূন্যতা অপূরণীয়। নিজেকে আজ বড্ড অপরাধী লাগছে। এতদিন অপরাধ বোধ ছিলো দুবছর এই মেয়েকে সাজা দেয়ার। আজকের অপরাধ বোধ হলো এই মেয়েকে সারাজীবন ভালো রাখতে না পারার, সেই ক্ষমতা না থাকার। দো জাহানের সমস্ত সুখ এনে তার সহধর্মিণীর পায়ের কাছে বিছিয়ে দিলে যে তার সিকিভাগ ও পূর্ণ হবে না সে কথা আজ যথেষ্ট জানা হয়েছে। কারণ তার দুনিয়া-জাহান তো ছেড়ে চলে গিয়েছে আট বছর আগে। এই আট বছরে মেয়েটা শতবার ভেঙেছে,সহস্রবার নিজেকে গড়েছে। সেরা স্ত্রী হয়েছে, সেরা মা হচ্ছে। শাহাদ ইমরোজ তুচ্ছ প্রাণী, অধম স্বামী। তার কোনো যোগ্যতাই নেই এই নারীর অর্ধাঙ্গ হবার। এই নারীকে অর্ধাঙ্গী হিসেবে পেয়েছে বলে, কত সহস্র সময় শোকরানা আদায় করলে তার আত্মা শান্তি পাবে? আদৌ কি সময়ের হিসেব হবে?
সুলতানা কবির ডাইনিং রুমটাকে এলাহি আয়োজনে ভরিয়েছেন। শেফালীকে শক্ত পোক্ত ভাবে বারণ করেছেন যেন ঘর থেকে বের না হয়। কলিং বেল বেজে উঠলো। রায়হান সাহেব উঠে দাঁড়ান, দরজায় সবাইকে দেখে এগিয়ে গিয়ে আগে জড়িয়ে ধরেন নোমানকে। নোমান বিব্রত বোধ করে। সাবেক শ্বশুর এভাবে তাকে আগলে নেবে ভাবেনি। এরপর শাহীন এবং পাভেলকে জড়িয়ে ধরেন। দুপুর দুটোয় এয়ারপোর্টে নেমেছে। সাথে পাভেল ও আছে। সুলতানা কবির উঁকি দিয়ে মুখে হাসি রেখে তিনছেলেকে জড়িয়ে ধরেন। তিনজনের মাথায় হাত বুলিয়ে বললো,
– আমার তিন মানিক। আয় ভেতরে আয়।
ছেলেদের ছেড়ে নওরীনকে জড়িয়ে ধরে কপালে আদর দিয়ে বলে,
– বৌমা তোমাকে অনেক মিস করেছি। আমার সংসারের চাঁদ সূর্য দুটোই আমার থেকে দূরে ছিলো এতদিন এখন আসার সময় হয়ে এলো বলে। চাঁদটা যে প্রথম হয়ে গেলো এবার বাবুর আব্বু।
সোফায় বসে হাসতে হাসতে রায়হান সাহেব বললেন,
– এবার তাহলে সূর্যকে আসতে বলো। বাকি যা পরীক্ষা এই বাড়ি থেকে দিক। বাড়িটা যে শূন্য সবাইকে ছাড়া। আমার শেহজা দিভাই টাও নাই। পরিপূর্ণ বাড়ি দেখে শেষ নিশ্বাস নিতে চাই।
শাহীন,পাভেল এবং নোমান কপট চোখে তাকাতেই বললো,
– মজা করেছি এমন করে তাকাস কেনো? সবাই ফ্রেশ হয়ে নেয়। তোদের মা অনেক মজার খাবার রেঁধেছে। একটু চেখে দেখবো ভাবলাম! ছুঁতেই দিলোনা। উলটো গলা ছাড়ে আগে আমার ছেলেরা আর ছেলের বৌ আসুক এরপর একসাথে। এখন তোরা এই বুড়ো বাপের উপর কৃপা করে তাড়াতাড়ি আয়।
হেসে তিনজনই ফ্রেশ হতে চলে গেলো। শিফা,আফিয়া,তাহি টেবিল গুছায়। লিমন এখন সুলতানা মঞ্জিলে আছে। সবাইকে বুঝিয়ে ম্যানেজ করে নেয় শাহাদ। রত্নাও ছেলেকে বাইরে রাখতে চাচ্ছেনা। এখানে নিরাপদ। দেখাশোনা কে করবে! তাহি দুবেলা ডাক্তার নিয়ে এসে দেখে যায়। এই অনেক বাপ মরা ছেলেটার জন্য। মাথার উপর ভাসুর এবং শাহাদ থাকাতে রত্না নিশ্চিন্তে থাকে। সুস্থ হয়ে উঠলে আর কখনো বাইক চালাতে দেবেনা। সব দোষ এই বাইকের! শাহাদের সাথে বসে লিমনের বাইক চালানো বন্ধ করতে হবে।
খাবার টেবিলে সব খাবার লোভনীয়। ঘরনীরা দাঁড়িয়ে নিজেদের মানুষগুলোকে খাওয়াচ্ছে। হাতের রান্নার প্রশংসা কে না শুনতে চায়। ছেলেরা সরাসরি জানালো নিজেরা নিয়ে খাবে। সুলতানা কবিরকে বসতে বলায় বসলেন না তিনি। নোমান প্রিয় চিংড়ীর মালাইকারীটা মুখে দিয়ে বললো,
– আহ! কি স্বাদ। মালয়েশিয়াতে কাছাকাছি খাবার পাওয়া গেলেও চিংড়ীর মালাইকারীটা পাওয়া যায়না। এই কয়টা দিন অনেক মিস করেছি।
পাভেল নিরব ভূমিকা পালন করছে। নিজের মত খাচ্ছে। শিফা এসে একটা রোস্ট তুলে দিলো। আজ চুপচাপ খেয়ে নিচ্ছে। কোনো কথাই বাড়ানো যাবেনা। কথায় কথা বাড়বে। নোমান খাসির কলিজা ভুনা নিয়ে মুখে পুরলো পোলাও দিয়ে মাখিয়ে। আচমকা টেবিলের সবাই চুপ হয়ে গেলো। অভ্যাসবশত কাজটা করেছে সবাই বুঝতে পেরেছে। এই বাড়িতে খেতে বসলে সবার আগে কলিজা ভুনা দিয়েই শুরু করতো। কিছু একটা টের পেয়ে সুলতানার দিকে তাকিয়ে হেসে বলে,
– মা শুনেন, আমি মানুষটা জীবনসঙ্গী হয়তো বদলে ফেলেছি তবে ছেলেটা আপনারই আছি। তাই আপনার হাতের সেই স্বাদ, অভ্যাস ভুলিনি আর ভুলবোনা।
তারপর টমেটো চাটনী নিলো। মুখের দিয়েই বুঝতে পারলো এটা কার বানানো। খেতে খুব মজা হলেও বেশি খেলোনা। সবার খাওয়া শেষ হলে শিফার বানানো ডেজার্ট একটু করে সবাই মুখে তুলছে। শাহীন আর নোমান প্রশংসা করতে করতে মুখের ফেনা বের করে ফেললো।
– আহ! শিফা এবার তোকে বিয়ে দিব। এত ভালো হয়েছে পায়েসটা।
নোমানের কথায় শিফা লজ্জা পেয়ে পাভেলের দিকে তাকায়। পাভেলের মাথা নোয়ানো। কিছু ইঙ্গিত পেয়ে নোমান পাভেলকে ডাকে। দেখতে পায় ছেলেটার মুখটা মলিন। বুঝতে পারলো নিজের মতো ভুলটা বন্ধুও করতে বসেছে। খাবার শেষে পাভেলের চিলেকোঠা খোলা হলো বিশ্রামের জন্য। পাভেল চলে যাবে বলাতে ধমক দিলো সুলতানা। সুলতানা বেরুতেই নোমান বিছানায় শুয়ে হেসে বললো,
– মামা আমার মতো একই ফাঁদে পা দিছোস?
– মানে?
– তুই ভালোবাসিস নাকি তোকে বাসে পিচ্চিটা?
পাভেল চমকে উঠে নোমানের মুখ চেপে ধরলো। আশপাশটা দেখে বলে,
– একদম চুপ একটা কথাও উচ্চারন করবিনা।
দরজায় কড়া নাড়ার আওয়াজ শুনে উঠে দরজা খুললো। তাকিয়ে দেখে শিফা দাঁড়িয়ে আছে বাইরে। নোমান উঁকি মে*রে হেসে দিলো। শিফা ধীর গলায় বললো,
– একটু বাইরে আসবেন?
– নাহ।
– প্লিজ…
নোমানের দিকে তাকিয়ে দেখে সুরাইয়ার সাথে ভিডিও কলে ব্যস্ত। তাই দরজা আবজে ছাদের কর্ণারে দাঁড়ালো। সময় নষ্ট না করে শিফা বললো,
– পাভেল ভাই, না বলে চলে গেলেন কেনো সেদিন? এত ফোন দিয়েছি রিসিভ করেন নি বিপরীতে ব্লক করে দিলেন। আমার অপরাধ কি?
– আমার পিছু পিছু ঘুরা।
– এভাবে বললেন?
– আবেগের বয়সে এমন হবেই। পড়ো কয়েক মাস পরেই তো পরীক্ষা। মাথা থেকে এসব বাদ দাও।
– পড়বোনা। বলেন কি হয়েছে?
পাভেল কিছুটা দম নিয়ে বললো,
– বস সেদিন কিছুটা অনুমান করে ফেলেছে তোমার কৃতকর্ম। ভেবেছে দোষ আমার। তাই ছেড়ে দিতে বলেছে চিলেকোঠা।
শিফা আঁৎকে উঠলো। ভয় পেয়ে বললো,
– আপনি বলেন নি আমার দোষ?
– না।
– ভাইজান কি মে*রেছে আপনাকে?
– না।
– আমরা বুঝিয়ে বললে ভাইজান শুনবে।
মেজাজ হারিয়ে ধমকে পাভেল বললো,
– তোমার মত অবুঝ পেয়েছো বসকে। কথা বুঝোনা কেনো? আমি তোমাকে পছন্দ করিনা। কেনো পেছনে পড়ে আছো এবং আমার বিপদের কারণ হচ্ছো। বস জানতে পারলে কি করবে তোমার ধারনা আছে? আমার লা*শ খুঁজে পাবেনা এই তল্লাটে। রেহাই দাও আমাকে। দু হাত জোড় করে বলছি মাফ করো আমাকে এসব থেকে। শেফালীর কথা মনে নেই? কি পরিণাম হয়েছে। নোমানকে যত্ন করছে কারণ দোষটা শেফালীর ছিলো। আমাকে মে*রে কুকুর বেড়ালকে দেবে আমার গোস্ত। কারণ দোষটা আমার। নোমান না বুঝে ভুল করেছে। আমি সেই ভুল থেকে শিক্ষা না নিয়ে একই ভুল করে অপরাধী হলে সাজাটাও কল্পনাতীত হবে। যাও সামনে থেকে।
চোখের পানি মুছে শিফা হুংকার ছাড়লো,
সায়রে গর্জন পর্ব ৪৪
– বিয়ে করলে আপনাকেই করবো, নতুবা ম*রে যাব।
ছুটে বেরিয়ে গেলো এই মেয়ে। পিলারের সাথে হেলান দিয়ে বেঞ্চিতে বসলো পাভেল। বিড়বিড় করে বলতে লাগলো,
– কেনো বুঝতে পারছোনা মেয়ে, এই সম্পর্ক হবার নয়। বাচ্চামি করে সব আদায় করা সম্ভব নয়।
