Home সিকান্দার শাহ্ সিকান্দার শাহ্ পর্ব ১৭

সিকান্দার শাহ্ পর্ব ১৭

সিকান্দার শাহ্ পর্ব ১৭
Raiha Zubair Ripti

ভোরের দিকে একটা কাণ্ড ঘটে মির্জা বাড়িতে। ফজরের নামাজ আদায় করার জন্য যখন মুনতাহা ওয়াশরুমে গেলো ওজু করতে তখন ওজু করে বের হবার সময় পা স্লিপ করে পরে যায়। এদিকে সিকান্দারের সবে নামাজ পড়া শেষ হয়েছে। রুকইয়াহ করার জন্য সূরা পড়তে যাবে এমন সময় মুনতাহার চিৎকার শুনে তার আর পড়া হলো না। সিকান্দার আর পড়তে পারলো না। জায়নামাজ ছেড়ে উঠে ওয়াশরুমে এসে দেখে মুনতাহা একা একা উঠার চেষ্টা করছে কিন্তু পারছে না। সিকান্দার সাহায্য করলো। মেয়েটা উঠে তো দাঁড়ালো কিন্তু পা আর সোজা করতে পারলো না। মোচড়ে গেছে হয়তো। সিকান্দার তাকে বিছানায় বসিয়ে ভেজা পা টা মুছে ব্যথার স্প্রে লাগিয়ে দিলো। আর বলতে লাগলো-

“ পড়ে গেলেন কি করে? অনেক ব্যথা করছে তাই না? একটু দেখেশুনে চলবেন না? ”
“ কিভাবে যেন স্লিপ কেটে পড়ে গেলাম। আমি নিজেও বুঝতে পারি নি। ”
“ চলুন ডক্টরের কাছে নিয়ে যাই। ”
“ আহারে পা তো ভাঙে নি আমার। স্প্রে তো করে দিলেন। ঠিক হয়ে যাবে। রাতে তো আবার সারিয়াকান্দি যাবেন। ”
“ নাহ্ যাব না। আপনার পা ঠিক হবে তারপর যাব। ”
“ আরেহ্ মশাই দিনের ভেতরই ঠিক হয়ে যাবে। আপনি তো আর আমাকে হাঁটিয়ে নিয়ে যাবেন না। ”
“ তারপরও। কোনো রিস্ক নিব না আমি আপনাকে নিয়ে। ”

সিকান্দার ডক্টর এনেই ছাড়লো। ডক্টরও সেম কথা বললো পা জাস্ট মচকে গেছে। ঔষধ খেলেই একটু পর ঠিক হয়ে যাবে। সিকান্দার তারপরও সেদিন আর গেলো না। তার পরের দিন যাওয়ার প্রস্তুতি নিলো।
এদিকে তান্ত্রিক সিকান্দারের জন্য বানানো পুতুলটায় ঘন্টাখানেক পরপরই এটা ওটা পড়ে সুঁচ ঢুকাচ্ছে। পা মুচড়ে ধরছে। গলা চেপে ধরছে। কিন্তু তেমন কোনো সাড়া পাচ্ছে না। তার রাগ হচ্ছে কিন্তু তিনি হার মানতে নারাজ। আগের থেকে আরো কাজের গতি বাড়িয়ে দিলো। একদিন দুদিন কাজ করবে না। তিন দিনের মাথায় না হোক একদিন না একদিন একটু হলেও এর প্রভাব সিকান্দারের শরীরে পড়বে। তিনি এই কাজে সফল হয়েই ছাড়বেন।
পরের দিন রাতে এশার নামাজ পড়ে ডিনার সেরে নিয়েছিল সিকান্দার আর মুনতাহা। তারপর ধীরে ধীরে নিশ্চুপ হয়ে আসে মির্জা বাড়ি। বিশাল বাড়িটার করিডোরজুড়ে আধো আলো। নিচতলার বসার ঘরে এখনো জ্বলছে ঝাড়বাতির নরম হলদে আলো।
সিকান্দার সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামলো ধীর পায়ে। কালো কোট পরা। এক হাতে গাড়ির চাবি,আর আরেক হাতে ল্যাগেজ। তার পেছনেই নেমে এলো মুনতাহা। তার পরনে কালো রঙের বোরকা নিকাব। আজ রাতেই তারা যাবে সারিয়াকান্দি।
বসার ঘরের সোফায় বসে ছিলেন সেলিম মির্জা আর সাইদা মির্জা। এত রাতে দু’জনকে একসাথে বের হতে দেখে তাদের মুখ গম্ভীর হয়ে উঠলো।
সিকান্দার তাদের পাশ কাটিয়ে যাওয়ার সময় একবার আড়চোখে তাকালো তাদের দিকে। তারপর শান্ত স্বরে বলল-

“ আসছি। ”
সেলিম মির্জা কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে বললেন-
“ তাড়াতাড়ি ফিরো। ”
সিকান্দার আর কিছু বললো না।
অদ্ভুত ব্যাপার। কোথাও যাওয়ার আগে বিদায় নিলে মানুষ সাধারণত বলে,সাবধানে যেও। কিন্তু সেলিম মির্জা বললেন,তাড়াতাড়ি ফিরো। যেন এই বাড়িতে ফিরে আসাটাই বেশি জরুরি।
বাড়ির সদর দরজা দিয়ে বেরিয়ে আসার সময় সিকান্দার বিরবির করে পড়লো-
“ বিসমিল্লাহি তাওয়াক্কালতু আলাল্লাহ, ওয়ালা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ…”
ঘর থেকে বের হওয়ার সময় সবসময় এই দোয়াটা পড়ে সে। মানুষ ঘর ছাড়ে নিজের ইচ্ছেতে, কিন্তু নিরাপদে ফিরে আসা কখনোই পুরোপুরি মানুষের হাতে থাকে না। সিকান্দার আল্লাহর নামে বের হয়। তার উপরই ভরসা করে। আল্লাহ ছাড়া যে তার কেউ নেই।
মুনতাহা গিয়ে চুপচাপ বসলো গাড়িতে। সিকান্দার গাড়িতে উঠার আগে দূরের ঝোপে লাইটের আলোয় আবার সেই কালো বিড়াল টা দেখতে পেলো। কেউ কি বিড়াল এনেছে নাকি বাড়িতে? বিড়াল টা আজ ফুসলো না। শুধু তাকিয়ে রইলো। তারপর চলে গেলো। সিকান্দার তার চলে যাওয়া দেখে ড্রাইভিং সিটে বসে দরজা বন্ধ করলো ধীরে। কয়েক সেকেন্ড নিশ্চুপ হয়ে বসে রইলো। তারপর ইঞ্জিনে হাত রাখার আগে খুব আস্তে পড়লো,

“ সুবহানাল্লাযী সাখখারালানা হা-যা, ওয়া মা কুন্না লাহু মুকরিনীন, ওয়া ইন্না ইলা রাব্বিনা লামুনকালিবূন…”
এটা কোনো যানবাহনে ওঠার দোয়া। এই দীর্ঘ রাস্তার সবকিছুকে মানুষের জন্য সহজ করে দিয়েছেন আল্লাহ। এটা তারই স্বীকারোক্তি।
সিকান্দার শেষবার চোখ নামিয়ে ধীরে ধীরে সফরের দোয়াটা পড়লো-
“আল্লাহুম্মা ইন্না নাস-আলুকা ফী সাফারিনাল বির্রা ওয়াত-তাকওয়া, ওয়া মিনাল ‘আমালি মা-তারদা। আল্লাহুম্মা হাউয়িন ‘আলাইনা সাফারানা হা-যা, ওয়াত্বয়ি ‘আন্না বু’দাহু। আল্লাহুম্মা আন্তাস-সাহিবু ফিস-সসফার, ওয়াল খালীফাতু ফিল-আহল…”

তাদের যাত্রা সহজ হোক। পথ নিরাপদ হোক। আর পিছনে ফেলে আসা মানুষগুলো ভালো থাকুক।
দোয়া শেষ করে সিকান্দার ইঞ্জিন স্টার্ট দিলো।কালো গাড়িটা ধীরে ধীরে মির্জা বাড়ির বিশাল গেট পেরিয়ে রাতের অন্ধকার রাস্তায় নেমে গেলো।
রাত তখন গভীর হচ্ছে। ঢাকার আলো পেছনে ফেলে গাড়ি যখন হাইওয়েতে উঠলো, চারপাশ বদলে যেতে শুরু করলো ধীরে ধীরে। রাস্তার দুই পাশে সারি সারি ট্রাক দাঁড়িয়ে। কোথাও চায়ের দোকানে ধোঁয়া উঠছে। বড় বড় বাস শব্দ তুলে পাশ কাটিয়ে যাচ্ছে।
সিকান্দার খুব স্থিরভাবে ড্রাইভ করছিলো।স্টিয়ারিংয়ে রাখা তার লম্বা আঙুলগুলো দেখে মনে হচ্ছে লোকটা কোনো তাড়াহুড়োতেই নেই।
মুনতাহা জানালার পাশে মাথা রেখে বাইরের দিকে তাকিয়ে ছিলো। গাড়ি টাঙ্গাইলের রাস্তা ধরতেই শহরের ভিড় কমে এলো। এখন রাস্তার দুই পাশে শুধু অন্ধকার জমি আর মাঝেমধ্যে দূরের গ্রাম।রাস্তার পাশে ছোট ছোট বাজার। অর্ধেক দোকানের শাটার নামানো। সিকান্দারের কিছুটা তেষ্টা পাওয়ায় গাড়ির ভেতর থাকা ওয়াটার বোতল থেকে পানি খেয়ে নিলো। পানিটা রেখেছিল রেণু। সেই পানিটা ছিলে তান্ত্রিকের দেওয়া। সিকান্দারের অজানা। সেলিম মির্জা আগেই রেণু কে দিয়ে রাখিয়েছিল বোতলটা।
হঠাৎ মুনতাহা আশপাশে তাকাতে তাকাতে বলল-

“ এত রাতের রাস্তা আপনার ভয় লাগে না?
সিকান্দার পাশ ফিরে তাকিয়ে বলল-
“ কিসের ভয়? ”
“ মানুষের ভয়। এখন যদি ডাকাত ছিনতাইকারী রা এসে ধরে তখন? ”
অথচ সিকান্দার রাতকে তার যাত্রাপথের জন্য নির্ধারিত সময় হিসেবে বেছে নিয়েছে তার একমাত্র কারন হলো যাতে তার এক ওয়াক্ত নামাজ মিস না যায় সেজন্য। একটা রাত তাহাজ্জুদ না পড়লেও কোনো সমস্যা নেই।
“ আমি এক আল্লাহ ছাড়া আর কাউকেই ভয় পাই না। এমন কি নিজের মৃত্যুকেও না সেখানে মানুষ কে ভয় পাওয়ার তো প্রশ্নই আসে না। আর আপনি ভয় পাচ্ছেন কেনো হু? আপনার সাথে আমার রব আছে আমি আছি, মানে বুঝতে পারছেন? ডাবল প্রটেকশন আছে আপনার সাথে। কিচ্ছু হবে না। ”

কথাটা শুনে মুনতাহা চুপ হয়ে গেলো। গাড়ি এগিয়ে চললো। যমুনা সেতুর দিকে যেতে যেতে রাত আরো গভীর হতে লাগলো। ব্রিজের উপর উঠতেই চারপাশ যেন অন্ধকারে ঢেকে গেলো। নিচে কালো নদী দেখা যাচ্ছে না ঠিকমতো, শুধু ঠান্ডা বাতাস এসে আছড়ে পড়ছে গাড়ির গায়ে।
মুনতাহা অজান্তেই একটু সরে এসে কাছাকাছি বসল। সিকান্দার একবার তাকালো তার দিকে। তারপর গাড়ির স্পিড কমিয়ে দিলো।
সেতু পার হয়ে বগুড়ার রাস্তা ধরতেই চারপাশ পুরো বদলে গেলো। এখন রাস্তার দুই পাশে শুধু বিস্তীর্ণ মাঠ। ধান কাটা শেষের মৌসুম। কোথাও খড়ের গাদা, কোথাও ধান মাড়াইয়ের মেশিন কাপড় দিয়ে ঢেকে রাখা। গ্রামের সরু রাস্তার ধারে ধারে শুকনো খড় উড়ছে বাতাসে। দূরে কোথাও বাঁশঝাড়ের আড়াল থেকে কুকুরের ডাক ভেসে আসছিলো।
মুনতাহার চোখে তখন ঘুম নেমে এসেছে ধীরে ধীরে। সে কয়েকবার চোখ খোলার চেষ্টা করলো। পারলো না। একসময় মাথাটা সিটে এলিয়ে ঘুমিয়ে পড়লো। সিকান্দার কিছুক্ষণ চুপচাপ তাকিয়ে রইলো তার দিকে। বাড়ির কাছে আসতেই মেয়েটা ঘুমিয়ে গেল!

গাড়ির ভেতরের হালকা হলুদ আলোয় মুনতাহাকে অদ্ভুত শান্ত লাগছিলো।
তার হাত ঠান্ডা বাতাসে কুঁকড়ে আছে। সিকান্দার খুব আস্তে নিজের কোটটা খুলে মুনতাহার গায়ের উপর জড়িয়ে দিলো। মুনতাহা ঘুমের মধ্যেই নিঃশ্বাস ফেললো ধীরে। সিকান্দার এক হাত দিয়ে স্টিয়ারিং ধরে অন্য হাতে তাকে নিজের দিকে টেনে আনলো। মুনতাহার মাথাটা এসে ঠেকলো তার বুকের উপর। লোকটা খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতেই আবার রাস্তার দিকে তাকালো। যেন এভাবেই থাকার কথা ছিলো মুনতাহার সারা টা রাস্তা।
গাড়ির বাইরে তখন গভীর রাতের গ্রামবাংলা। প্রায় রাত তিনটের দিকে তারা সারিয়াকান্দির ভেতরের কুতুবপুর গ্রামের রাস্তা ধরলো। এখানকার পথ আরও সরু। মেঠো আঁকাবাঁকা পথ। থেকে থেকে উঁচু নিচু রাস্তা। ঝাকি যেন না লাগে সেজন্য সিকান্দার ধীর গতিতে যাচ্ছে এই রাস্তা। কাঙ্খিত এক বাড়ির সামনে এসে তাদের গাড়িটা থামলো। বাড়ির বাহিরে পাঁচিলে লেখা আলী বাড়ি। গাড়ির আলো সব নিভে গেলো। পকেট থেকে ফোনটা বের করে মামাকে ফোন দিবে তার আগেই তার মামা এসে সদর দরজা টা খুলে এগিয়ে আসলো। সিকান্দার গাড়ির কাঁচ নামিয়ে সালাম দিলো নিচু স্বরে। হোসেন আলী সালামের জবাব দিয়ে গাড়ির ভেতরে তাকাতেই দেখলেন মুনতাহা ঘুমিয়ে আছে। পেছন থেকে ল্যাগেজ নিয়ে বললেন-

“ বউমা রে নিয়ে তুমি ভেতরে আসো সিকান্দার। তোমার মামা মামি নানি সবাই জেগে আছে তোমার আসার খবর শুনে। ”
সিকান্দার আলতো করে ডাকলো মুনতাহা কে। মুনতাহা পিটপিট করে চোখ খুললো। নিজেকে সিকান্দারের বুকের উপর দেখে তড়িঘড়ি করে সরে এসে বলল-
” এসে গেছি আমরা? ”
“ হু। ”
সিকান্দার গাড়ি থেকে নেমে তাকেও নামতে সাহায্য করলো। তারপর হাত ধরে আলী বাড়ির ভেতরে চলে গেলো। রাতের অন্ধকারে তেমন একটা বোঝা যাচ্ছে না আশপাশ টা। তবে সিকান্দারের মামা রা সিকান্দার দের মতো খুব একটা আর্থিক ভাবে স্বচ্ছ নয়। বিশাল পুরনো বাড়ি। টিনের চাল। কাঠের বারান্দা। বিশাল উঠান। পাশে আরো দুটো টিনের দোচালা ঘর। আর একটা ছনের ঘরের রান্নার ঘর। একটা গোয়াল ঘর ও আছে টিনের। সেখানে হয়তো ছাগলও আছে। ডাক পাড়ার আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। সেখান থেকে অদ্ভুত গন্ধ আসছে গরুর মলমূত্রের। ধীর পায়ে তারা কাঠের বাড়ি টার ভেতরে ঢুকলো। পাটি বিছিয়ে বসে আছে সিকান্দারের মামা মামিরা। তাদের দেখামাত্রই এগিয়ে এসে ভালোমন্দ জিজ্ঞেস করতে লাগলো।
হুমায়ুন আলী বউ ভাবি দের ধমকে বলল-

“ ওদের আগে রুমে গিয়ে বিশ্রাম নিতে দাও। খেয়ে দেয়ে ঘুমাক। অনেকটা পথ পেরিয়ে আসছে। সকালে কথা বলো। ভাগ্নে তুমি বউ মা কে নিয়ে রুমে যাও। ”
হুমায়ুন আলীর বউ খাবার ঘরে গিয়ে খাবার আনতে গেলে সিকান্দার বাঁধা দিয়ে বলে-
“ মামি আমরা খেয়েই রওনা দিয়েছিলাম এখন আনবেন না। আমরা কেউই খাবো না। ”
“ অল্প করে খাও কয়টা? ”
“ না মামি এখন খেলে ঘুম আসবে না। মুনতাহা ঘুমে ঢোলে পড়ে যাচ্ছে। ”
হুমায়ুন আলীর বউ তাকালো মেয়েটার দিকে। আসলেই মেয়েটা ঘুমে বারবার চোখ বুজে ফেলছে। হোসনেআরা বেগমও সিকান্দারের সাথে একমত হলো। সিকান্দার নানি কে জাগনা দেখে একটু অসন্তুষ্ট হলো। এতো রাত অব্দি জাগার কোনো মানে হয়? তাকেও ঘুমাতে বললো।

সিকান্দার তার মা হুমায়রার রুমটায় চলে আসলো। সিকান্দার এ বাড়িতে আসলে তার মায়ের রুমেই থাকে। আজও ব্যতিক্রম হলো না। মুনতাহা বোরকা খুলে সোজা বিছানায় গিয়ে শুয়ে পরলো। তার আগে ঘুম দরকার। সিকান্দার দীর্ঘ এক শ্বাস ফেললো। মেয়েটা হাত মুখও ধুলো না! সিকান্দার কলপাড়ে এসে হাতমুখ ধুলো। তার মামি এসে কল চেপে দিতে চাইলে সিকান্দার বাঁধা দিলো। তার এসবে অস্বস্তি লাগে। মনে হয় সে কোনো ভীনদেশী। তাদের বাড়িতে অতিথি হয়ে এসেছে সেজন্য এমন করছে। কিন্তু সিকান্দার তো এবাড়িরই একজন। একেবারে হাত মুখ ধুয়ে ওজু করে রুমে গিয়ে শুয়ে পরতেই মুনতাহা এসে তার বুকটা দখল করে নিলো।
তাদের ঘুম ভাঙলো ফজরের আজানের সময়। দুজনেই সেই ভোরে কলপাড়ে এসে ওজু করলো। সিকান্দার তার মামাদের সাথে মসজিদে গেলো নামাজ পড়তে। আর মুনতাহা রুমে এসে পড়লো।
সিকান্দার মসজিদে নামাজ পড়ার পর আর বাড়িতে আসে নি। মামাদের সাথে বাজারে গিয়েছিল। তাদের সাথে টঙের দোকানে বসে চা বিস্কুট খেলো। যেই এসে বসছে তাকেই তারা সিকান্দারের পরিচয় দিচ্ছে। সিকান্দারের বাবাকে তো প্রায় সবাই চিনে। অহংকারে এ দিকে পা অব্দি দেয় না। সেখানে তার ছেলে কি সাধারণ ভাবে মিশুক হয়ে কথা বলছে!

সিকান্দারের মামিরা গোয়ালঘর থেকে গরু ছাগল,খোপ খেতে হাস মুরগী বের করে মাটির চুলায় রান্না বসালো। সকালের জন্য রুটি ডিম, আলু ভাজি,মিষ্টি কুমড়া ভাজি করলো। ভাত রাঁধে নি।
হোসেন আলীর দুটো মেয়ে আছে। একজন কলেজে পড়ে নানির বাড়িতে। আর একজন দশম শ্রেণী তে পড়ে কমার্স নিয়ে। বড়টার নাম রিয়া। আর ছোট টার নাম হিয়া। তাকে পাঠালো মুনতাহা কে ডাকার জন্য।
রুমের সামনে এসে ভাবি বলে ডাকলো। মুনতাহা যদিও দরজায় ছিটকানি লাগায় নি। চাইলেই হিয়া ভেতরে ঢুকতে পারতো। কিন্তু তার মা বলে দিছে সোজা ভেতরে ঢুকতে না। শহুরে মানুষজন এসব পছন্দ করে না। মুনতাহা এসে ভেড়ানো দরজা খুলে দিতেই দেখতে পেলো একটা মিষ্ট চেহারার মেয়েকে।
হিয়া তাকে দেখেই বলল-
“ ভাবি মা ডাকে আপনারে খাইতে। আহেন। ”
হিয়া চলে যাবে এমন সময় মুনতাহা তাকে ডেকে বলল-

“ নাম কি তোমার? ”
“ জ্বে হিয়া। ”
“ তোমার ভাইয়া এসেছে? ”
“ সিকান্দার ভাই? আহে নাই হেয়। আব্বার লগে এহনও মনে হয় বাজারে আছে। আপনি আহেন। আপনের খিদা লাগে নাই? আমার লাগছে মেলা। ইস্কুলে যামু। আহেন আপনি। আপনার লগে খামু বলে এহনো আমি না খাওয়া। আপাও বলে আইজকা আইবো বাড়িতে আপনাগোর আসার কথা শুইন্না। ”
মুনতাহা তার পেছন পেছন এসে বলল-
“ তোমার আপাও আছে? কয় ভাই বোন তোমরা? ”
“ দুই বোইন আমরা। রিয়া আপায় নানির বাড়ি থাকে। ওন থে হের কলেজ অনেক কাছে। তাই আব্বা নানির বাড়ি থাকতে কইছে। ”
“ আর ছোট মামার? ”
“ হের পোলাপান নাই। একটা মেয়ে হইছিলো তাও জন্মের দুই মাস পর ম’রে গেছে। তারপর আর পুলাপান হয় নাই। ”

মুনতাহা এসে উঠানে দাঁড়ালো। উঠান জুড়ে খড় ছড়িয়ে রাখা। একপাশে বাঁশের খুঁটিতে বাঁধা গরু। তাদের সামনে ধানের তুষ রাখা। আরেকপাশে গোলাঘর। বাড়িতে অনেক গুলো নারিকেল আর সুপারি গাছ আছে। বাড়ির ডান পাশে ঝোপের ফাঁকা দিয়ে দেখা যাচ্ছে বিশাল পুকুর। ঘাটের সিঁড়িতে শ্যাওলা জমেছে। সে চোখ মেলে কিছুক্ষণ স্থির হয়ে তাকিয়ে রইলো চারপাশে। এক অর্ধবয়স্ক মহিলা লাউ শাকের পাতা হাতে নিয়ে বাড়ির ভেতরে আসতে লাগলো। এটাই হুমায়ুন আলীর বউ। নাম রেখা। বিয়ের বয়স ১৬ বছর। সন্তান হয় নি দ্বিতীয় বার আর তারপর হুমায়ুন আলী কখনো সন্তানের লোভে বিয়ে করে নি। রেখা কে নিয়েই কাটিয়ে দিচ্ছে। পছন্দ করে বিয়ে করেছিল। পাশের গ্রামের মেয়ে রেখা। দুজনই মাঠে ছাগল চড়াতে যেত। সেখান থেকেই ভালো লাগা। তারপর হুমায়ুন আলী তার মায়ের কাছে বিষয় টা বলে। তারপর সব পারিবারিক ভাবেই হয়।
অথচ এখনকার দিনে মানুষ সামান্য মনোমালিন্য হলেই একে ওপরকে ছেড়ে দেয়। হুমায়ুন আলী তার বউকে অনেক ভালোবাসেন। রেখা একবার বলেছিল দ্বিতীয় বিয়ে করতে তখন হুমায়ুন আলী বলেন-

“ যেই সন্তানের মা তুমি হতে পারবে না,সেই সন্তানের বাবা আমি কি করে হই? আমি দ্বিতীয় বিয়ে করবো না। তোমার ভালোবাসার ভাগ কাউকে দিব না। ”
এ কথা শুনে সন্তান পালক নিতে বলেছিলো রেখা। তখনও হুমায়ুন আলী বলেছিলেন-
“ দরকার কি আমাদের সন্তানের? দেই না কাটিয়ে সন্তান ছাড়া। তুমি আমি টোনাটুনির সংসার,এমনই থাকুক। বুড়ো বয়সে আমি তোমারে টানবো। তুমি আমারে টানবা। ”
বাচ্চাও আর পালক নেয় নি তারা। এভাবেই কাটিয়ে দিচ্ছে বছরের পর বছর। এমন ভালোবাসা দেখতে ভালো লাগে তাই না? এই যে মুনতাহার ভালো লাগছে।
মহিলাটা এগিয়ে এসে তার সামনে দাঁড়ালো। গালে মাথায় হাত রেখে আদর করলো। মুনতাহার মাথায় হাত রেখে কেউ আদর করলে তার খুব কান্না পায়। রেখা তাকে আর হিয়াকে নিয়ে ভেতরে আসলো। পাটি বিছিয়ে খাবার বেড়ে বলল-

“ সিকান্দার ফোন দিছিলো। তোমারে খাবার খাইয়া নিতে কইলো। আইতে নাকি দেরি হইবো। গাঙের ওদিকে গেছে হেগো লগে। তুমি খাইয়া নাও। ”
“ নানি খেয়েছে? ”
“ হ। আম্মারে অনেক সকালে খাইতে দিতে হয়। ঔষধ খায় তো। এহন ঘুমাইতাছে। ”
মুনতাহা আরো দুটো প্লেটে খাবার বেড়ে বলল-
“ আমরা দুজন কেনো খাব? আপনি আর বড় মামিও খেয়ে নিবেন। ”
হোসেন আলীর বউ রুমা গরু চড়াইতে গেছিলো মাঠে। এসে তাদের এখনো খেতে না দেখে জিজ্ঞেস করলো-
“ এহনও খাও নাই তোমরা! ”
রেখা তার প্লেট টা তার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল-
“ তোমার লাইগাই অপেক্ষা করতাছিলো আফা। বাড়ির বেডাগো আইতে দেরি হইবো। আমাগো খাইয়া নিতে কইছে। আহো বহো। পরে কইরো বাদবাকি কাজ। ”

রুমা বেগম বসলেন। চারজন মিলে খেয়ে উঠলো সকালের নাস্তা। হিয়া স্কুলে চলে গেলো রেডি হয়ে। ৯ টার পরপর সিকান্দার রা ফিরলো বাড়িতে। গাঙের পাড় থেকে টাটকা মাছ কিনে এনেছে তারা। শরীর পুরো ঘামে ভিজে গেছে। গাঙের পাড়টায় ঠাটা পরা রোদ। বাড়িতে ঢুকে সিকান্দারের চোখ দুটো খুঁজলো মুনতাহা কে। মামিদের সাথে বসে ছিলো বাগানে গাছের নিচে পাতা মাচায়। পেছন ফিরে সিকান্দার কে দেখেই এগিয়ে আসে। সিকান্দারের গোসল করা লাগবে। ঘামে শরীর চুলকাচ্ছে। সেজন্য বললো শার্ট আর প্যান্ট এনে দিতে মুনতাহাকে। মুনতাহা রুমে থেকে শার্ট প্যান্ট এনে সিকান্দার কে দিতেই সিকান্দার কলপাড়ে এসে কল চেপে গোসল করলো। মুনতাহা চেপে দিতে চেয়েছিল কিন্তু সিকান্দার দেয় নি করতে। গোসল শেষে ভেজা জামাকাপড় উঠানের রশি তে মেলে দিলো। রুমে এসে ভেজা চুল গুলো মুছে মুনতাহা কে জিজ্ঞেস করলো-

“ খেয়েছেন? ”
“ হু। ”
রেখা বেগম এসে সিকান্দার কে ডেকে গেলেন। সিকান্দার খাবার ঘরে এসে মামাদের সাথে খাবার খেয়ে নিলেন।
বাহিরে রুমা বেগম মাছ কাটছে। মুনতাহা গিয়ে মাছ কাটতে নিলে তিনি বাঁধা দেন। তিনি শুনেছেন সিকান্দার মুনতাহা কে পানির গ্লাসটা অব্দি ভরে খেতে দেয় না। সেখানে তিনি নাকি তারই বউকে দিয়ে মাছ কাটাবেন! হাত কেটে গেলে তখন?

রুমা বেগম আর রেখা বেগমই কাটলেন মাছ গুলো। মাছ কাটা শেষে সেগুলো ধুয়ে দুপুরের রান্না বসালেন।
বিকেলের দিকে রিয়া আসলো বাড়িতে। একমাত্র ফুফুর ছেলে আর তার বউ এসেছে আর রিয়া আসবে না তা আবার হয় নাকি? এসেই মুনতাহার সাথে গল্প জুড়ে দিছে। রিয়া আবার খুব মিশুক মেয়ে। মানুষের সাথে সখ্যতা করতে তার সময় লাগে না। মুনতাহার আবার এমন মেয়ে পছন্দ যদিও মুনতাহা ইন্টেভার্ট প্রকৃতির। ছোট থেকে একা একাই থেকেছে তো। তার ভালো লাগছে রিয়া কে। কথা আলার সময় অদ্ভুত ভাবে চোখ মুখের ভঙ্গিমা বদলায়। হিয়া বড়ই আর লবন মরিচের গুঁড়া নিয়ে এসেছে। তারা তিনজন মাচায় বসে গল্প করছে আর বড়ই খাচ্ছে।

সিকান্দার শাহ্ পর্ব ১৬

সিকান্দার খাবার খেয়ে দুপুরে একটু ঘুমিয়েছিল। আছরের আজানের আগ দিয়ে ঘুম থেকে উঠে। উঠতে এক প্রকার বাধ্য হয়। শরীরে আকস্মিক এক রকমের অস্বস্তি টের পাচ্ছে সে। ঘুম হচ্ছিলো না ভালো মতো সেটার কারনে। শরীরে ভারী কিছু টের পাচ্ছিল সে। সেজন্য শোয়া থেকে উঠে শার্টের বোতাম খুলে নিজের শরীরের দিকে তাকাতেই দেখতে পেলো ছোট ছোট লাল লাল দাগ বসে আছে সারা শরীরে। জ্বলছে না বা ব্যথা হচ্ছে না। কেবল এক প্রকার অস্বস্তি হচ্ছে তার। সারাদিন রোদে থাকায় এমন টা হলো নাকি? তার তো আবার রোদে গরমে ঘামে এলার্জি হয়।

সিকান্দার শাহ্ পর্ব ১৮