সে আমার বন্দিনী পর্ব ২৬
তানিয়া হুসাইন
ভীর এক পা এক পা করে যতো এগোচ্ছে,
ইশায়া ভেতর ভেতর ঠিক ততটাই ভয়ে কুকুরে যাচ্ছে।
___ইশায়া জড়োসড়ো হয়ে দাঁড়ানো,
ভীর দুহাতে ইশায়ার মুখটা উপরের দিকে তুলে ধরে,
ইশায়ার পুরো মুখে দৃষ্টি বুলায়।
তার চোখে চোখ রেখে ধীরে ফু দেয় ইশায়ার মুখে,
ইশায়া চোখ বন্ধ করে নেয়।
ভয়ের চেয়েও বেশি লজ্জা ও অপমানের অনুভূতিতে বিদ্ধ সে।
__ভীর ঠোঁট ছোয়ায় ইশায়ার ঠোঁটের উপরের ছোট্ট তিলে,
ভীরের উত্তপ্ত নিশ্বাসে ইশায়ার পুরো শরীর কেপে ওঠে।
গা ছমছমে নিস্তব্ধতার মাঝে ভীর তার কানের কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে ঠান্ডা নির্দয় গলায় বলল,
আর কখনো আমার অবাধ্য হওয়ার আগে আজকের এই দিনের কথা মনে রেখো, ইশায়া জারিন।
ভীর আলভারেয ছাড় দেয় ছেড়ে দেয় না।
__ভীরের প্রতিটি শব্দে যেন বিষ ঢুকে পড়ছিল ইশায়ার শিরা-উপশিরায়।
সে কেঁপে কেঁপে উঠছিল বারংবার ভীরের ঘনিষ্ঠ ছোয়ায়,
ভীরের হাতের ছোঁয়া ছিল বেসামাল।
__ ভবিষ্যতে এর থেকেও ভয়ংকর কিছু হবে,মনে রেখো।
এই বলেই ভীর হঠাৎই কোল তুলে নেয় ইশায়াকে।
___ইশায়া কিছু বুঝে ওঠার আগেই তার মাথা ঠেকে বালিশে।
শরীরটা কষ্টে বাঁকিয়ে পড়ে থাকে বিছানায়।
তার মনের ভেতরে একদম স্তব্ধতা।
সে বুঝছে তার সাথে কি হতে চলেছে।
আবারো লজ্জায় ঘৃণায় চোখ বুঁজে নেয় ইশায়া,
যেন এই দুনিয়াকে না দেখতে হয় তাকে আর।
__চোখ বন্ধ হওয়ার আগে তার চোখে পরে,
ভীর এলোমেলো হাতে নিজের শার্টের বোতাম খুলছে।
ইশায়ার চোখের কার্নিশ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ে,
লাজে পীড়ায় ইশায়া জর্জরিত।
বুকের ওপর ভীরের গরম নিশ্বাস তার শরীর জ্বলে যাচ্ছিলো।
দাঁতের তীক্ষ্ণ দংশনে ফুপিয়ে কেদে ওঠে ইশায়া,ভীর তার আওয়াজ বন্ধ করতে আবারো ঠোঁট জোড়া তার দখলে নিয়ে নেয়।
মেতে ওঠে উন্মত্ততায়।
রাত আরও দীর্ঘ হয়।
আরও বেশি নির্দয়, আরও বেশি নির্মম।
ভীরের প্রতিটি ছোঁয়া ছিল যন্ত্রণার, যা ইশায়াকে ভেঙে চুরে ছারখার করে দিচ্ছিল।
ভীর তাকে আবার ও নিজের করে নেয়।
প্রথম রাতের চেয়েও বেশি তীব্র ছিল তার দখলদারি।
কোনো কোমলতা ছিলো না তাতে, না কোন দয়া ছিল শুধু অধিকার প্রতিষ্ঠার জেদ,
যেখানে ভালোবাসা নয়, ছিল আধিপত্যের ছাপ।
তার প্রত্যেকটি ছোঁয়ায়, চাপে, নিশ্বাসে ইশায়ার দম বন্ধ হয়ে আসে,
___ইশায়া চোখ বন্ধ করে সব সয়ে নেয়।
প্রতিটি মুহূর্ত তার কাছে যেন সহ্য করার এক পরীক্ষা।
ভীর তার কানে ফিসফিসিয়ে বলে,
ঘনিষ্ঠতার চরম পর্যায়ে ভীর আনমনে বলে,
তুই আমার, একমাত্র আমার। তোর ওপর অধিকার শুধু আমার আছে।
___ইশায়ার মনের দরজাগুলো এক এক করে বন্ধ হয়ে যায়।
ভিতরে জাগে না কোনো বিদ্রোহ, শুধু একরাশ অন্ধকার।
আর এই অন্ধকারেই দিন দিন তলিয়ে যাচ্ছে সে।
আলোর ছিটেফোঁটা ও নেই আর তার জীবনে,
সে হারিয়ে যাচ্ছে নিজের অস্তিত্ব নিয়ে।
সে আর লড়াই করতে চায় না।
লড়াই করে হারাতে চায় না আর আপন কাউকে।
মেনে নেয় আজ স সব, ভেঙে পড়ে মানসিকভাবে।
ভীর ইশায়াতে মগ্ন আর ইশায়া তার ভাবনাতে।
___রাতের শেষে বিছানায় নিথর হয়ে পরে থাকে ইশায়া।
ভীর তখনো তাকে বুকে জড়িয়ে আছে।
তার চোখে মুখে প্রশান্তির ছোয়া।
ইশায়াকে বুকে নিয়েই ঘুমিয়ে পড়ে সে।
রাতে একপ্রকার দৌড়ে হাসপাতালে পৌঁছায় রহমান পরিবারের সবাই।
সারারাত ধরে আবিরের সন্ধানে ছিল তারা।
সব জায়গায় খোঁজ করেছে।
কিন্তু কোন খবর পায় নি।
শেষ রাতে ফোন পেয়ে সবাই হাসপাতালে দৌড়ে এসেছে।
___আবিরের রক্তাক্ত অবস্থা দেখে সায়মা বেগম ছেলের মাথায় হাত দিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন।
আমার ছেলেটারে মাইরা ফালাইলো গো! কে এমন করলো?
আমার মেয়েটারে ও মেরে ফেললো এখন ছেলেটা।
আমার সাথেই কেন এমন হয়। কি দোষ করেছে আমার বাচ্চারা।
___ জান্নাত কেদেই যাচ্ছে।
ছেলেকে রেখেই চলে এসেছে সে।
কেবিনের বাইরে দাঁড়িয়ে হাউমাউ করে কাঁদছে।
আবির,
চোখ খোলো আমি আসছি, তুমি কথা বলো আমার সাথে।
তোমার ছেলে তোমার অপেক্ষা করছে,
জান্নাত অনবরত বলে যাচ্ছে।
জান্নাতের মা এসে সামলায় তাকে।
___ডাক্তার বেরিয়ে আসতেই আদনান সাহেব আর আদ্রিয়ান দ্রুত তার কাছে যায় কি অবস্থা জানতে।
___কিন্তু ডাক্তার জানাই ইমারজেন্সি রক্ত লাগবে, না হলে রোগীকে বাঁচানো যাবে না।
এরকম কথা শুনে ভয় পেয়ে যায় সবাই।
___সবাই ছুটে বেড়ায় রক্ত খুঁজে আনতে।
আদনান সাহেব এর শ্বাসকষ্ট বেড়ে যাওয়ায় আবির ইনহেলার দেয় তাকে।
আদনান সাহেবকে রেখে সে বেরিয়ে যায় রক্তের সন্ধানে।
___যেকোনো কিছু দিয়ে হলেও বাঁচান ডাক্তার,আমার ছেলেটাকে বাঁচান কাঁদতে কাঁদতে বলে সায়মা রহমান ডাক্তার কে।
___আপনি নিশ্চিন্তে থাকুন মিসেস রহমান আমরা আমাদের যথাসাধ্য চেষ্টা করছি বাকিটা আল্লাহর ইচ্ছা। বলে ডাক্তার আবার চলে যায়।
___ঘরে তখন শুধু রয়ে যায় রাহি আর কাজের মেয়েটি।
রাহি জানালার দিকে তাকিয়ে বোবা দৃষ্টিতে বসে আছে।
তার বুকটা কাঁপছে অসম্ভব ভয় হচ্ছে তার কিছু না আবার হয়ে যায়।
কয়দিন আগেই ইশায়া, সাফা আপু মারা গেল এখন আবার আবির ভাইয়ের এই অবস্থা আল্লাহ তুমি আবির ভাইকে সুস্থ করে দাও,
না হলে যে পরিবারটা ধ্বংস হয়ে যাবে।
সায়মা রহমানের জন্য খুব মায়া হয় তার।আদ্রিয়ান ভাইয়ের জন্য ও খারাপ লাগে।
কিভাবে সারাদিন মনমরা হয়ে থাকেন, ঠিকমতো খাওয়া-দাওয়া করেন না।
সারাদিন কাজের মধ্যে লেগে থাকেন,
এমন অবস্থায় যদি আবির ভাইয়ের কিছু হয়ে যায় তাহলে তো মামনিকে কিছুতেই সামলানো যাবে না, এই ভয় হচ্ছে তার।
রাহির এসব ভাবনার মাঝেই, ছোট বাচ্চাটা কেদে ওঠে সে দ্রুত যায় ওকে সামলানোর জন্য।
দুধের বাচ্চা মা ছাড়া কতক্ষন থাকবে।
এই দৌড়াদৌড়ির মধ্যে -ই রাতটা পার হয়ে যায়।
সূর্যের আলো ঢুকেছে বড় জানালার ভেতর দিয়ে।
ঘরের পরিবেশ নীরব, বাতাসে ঘন ক্লান্তি।
ভীরের ঘুম ভাঙে।আড়মোড়া ভেঙে চোখ খুলেই দেখে, ইশায়া চুপচাপ তাকিয়ে আছে ছাদের দিকে।
একদম চুপ,নিঃশব্দ।
ভীর একটু হাসে।
এটা তার প্রাপ্তির প্রশান্তির হাসি।
তারপর ইশায়াকে টেনে নেয় কাছে,
অনাবৃত শরীরটা জড়িয়ে ধরে নিজের সাথে।
তার ঘাড়ে নাক ঘষে দিয়ে বলে,
__কোনো সমস্যা হচ্ছে?
ইশায়া চুপ।
তার চোখের পাতা যেন কিছু বলার আগেই চুপ হয়ে গেছে।
তার ভেতরে অনুভূতি শুকিয়ে গেছে।
একটি কোল্ড, শূন্যতা ঘেরা অস্তিত্ব।
ভীর কিছুক্ষণ শুকনো আদর করে তাকে।
তারপর ইশায়াকে চাঁদরে মুড়িয়ে নিজের কোলে তুলে নেয়।
একসাথে শাওয়ারের নিচে দাঁড়ায় তারা।
জলের ধারা দুজনের শরীর বেয়ে পড়ে,
ভীর ধীরে ধীরে ইশায়ার কপাল স্পর্শ করে,
তার হাত ইশায়ার পিঠে, গলায়,
ধীরে ধীরে যেন জলের নিচে নিজস্ব একটি নেশায় ডুবে যেতে থাকে।
ভীর শুধু ফিসফিসিয়ে বলে,
তুমি আমায় ভাঙতে পারবে না ইশায়া।
না মুক্তি পাবে,
যত দ্রুত সবকিছু মেনে নিবে নিজেকে মানিয়ে নিবে ততই সহজ হবে সবকিছু তোমার জন্য।
না হলে এভাবেই বাঁচতে হবে সারা জীবন।
তুমি আমার হয়ে গেছো,
আর আমার রাজ্য থেকে মরার আগ পর্যন্ত মুক্তি নেই তোমার।
ইশায়ার চোখে জল মিশে যায় শাওয়ারের জলের সাথে।
সে বুঝে এই কারাগারের দরজায় আর কোনো আলো নেই।
এটা ভালোবাসা না এ তার দাসত্ব।
____শরীর ধুয়ে পরিষ্কার করলেও
মনের ভিতরের যন্ত্রণাগুলো যেন গায়ে গায়ে লেগে থাকে।
শাওয়ার শেষে এক টুকরো স্নিগ্ধতা খুঁজে নেয় সে।
একটা কালো লং স্কার্ট আর টপস পরে নেয়,ভিজে চুল হেয়ার ড্রায়ার দিয়ে শুকিয়ে বিনুনি করে নেয়, কোমল চোখে বেদনার রং।
___ভীর তখন প্যান্ট পরে বেরিয়ে আসে।
একটু থেমে তাকায় ইশায়ার দিকে গভীরভাবে।
এই মেয়েকে একেক সময় একেক রকম লাগে।
___ক্যাবার্ড থেকে আমার জামাকাপড় বের করো
ভীর হঠাৎ বলে ওঠে,
স্বাভাবিক, অথচ হুকুমের সুরে।
___ইশায়া প্রথমে একটু চমকে উঠল।
কিছুক্ষণ বোঝার চেষ্টা করল বিষয়টা,
তারপর নিঃশব্দে ক্যাবার্ড খুলে জামা বের করে দেয়।
ভীর এবার বলে,
__তুমি পরিয়ে দাও।
ইশায়া থমকে যায়।
অধিকার আর হুকুম এর সহিত কথা বলে ভীর।
ইশায়া কিছু না বলে ভীরের দিকে এগিয়ে যায়।
কাঁপা কাঁপা হাতে শার্টটা তুলে ধরে তার শরীরে পরিয়ে দেয়।
আঙুলগুলো কাঁপে বোতাম লাগাতে গিয়ে,
কিন্তু মুখে কিছু নেই, চোখে কিছু নেই।
ভীর তখনো একদৃষ্টে শুধু তাকিয়ে থাকে তার মুখের দিকে।
তার চোখে সেই চিরন্তন আকর্ষণ,
যা শুধু তার বন্দিনীর জন্যই বরাদ্দ।
___জুতো পরিয়ে দাও,
আরেকটা নিরব নির্দেশ।
___ইশায়া জানতো এরকম কিছুই বলবে,
নিঃশব্দে হাঁটু গেড়ে বসে,
ভীরের পায়ের কাছে গিয়ে তার জুতো পরিয়ে দেয়,
প্রেম নয়,
আনুগত্য নয়,
এ যেন নিজের অস্তিত্ব মুছে দেওয়া এক চূড়ান্ত উপলব্ধি।
___ভীর উঠে এবার সব ওষুধ হাতড়ে
একটা পেইন কিলার এগিয়ে দেয় তার দিকে।
__খাও এটা,
নরম গলায় বলে,
___জানি তোমার শরীর আজকেও সহ্য করছে।প্রতিদিনই করতে হবে কিছু করার নেই, নিজেকে ও শরীরকে সবকিছু জন্য মানিয়ে নাও।
এটাই হবে এখন থেকে প্রতিদিন।
ইশায়া একটু থামে, মাথা নিচু করে ঔষধ খায়।
কোনো কথা নেই তবুও অনেক কিছু বলে দেয় তার চাহনি।
তখনই মারিয়া এলেনা দরজা ঠেলে ঢুকে পড়ে।
হাতে ট্রেতে করে গরম নাস্তা, সাথে এক গ্লাস দুধ।
___ মারিয়া এলেনা ইশায়ার সামনে নাস্তা এগিয়ে দেন।
গ্লাস তুলে দিলে ইশায়া না করে সে এটা খাবেনা।
দুধ খেতে পারিনা আমি।
___পারবে খাও।
শক্ত গলায় বলে ভীর।
ইশায়া একবার তাকায় গ্লাসটার দিকে, তারপর ভীরের দিকে।
না খেতে পারার কথা বলতে চায় আবার, কিন্তু বলে লাভ হবেনা জানে সে,
সে আমার বন্দিনী পর্ব ২৫
___ভীরের মুখে কোনো রাগ নেই,
তবুও তার চোখে সেই বারুদ,
যা স্পষ্ট করে দেয়, সে যদি কথা না শোনে
তবে ফল ভালো হবেনা।
ইশায়া ধীরে ধীরে গ্লাস তুলে নেয়।
ঠোঁট রাখে গ্লাসে।
দুধ ঠান্ডা, অথচ গলায় যেন আগুন বইয়ে দেয়।
তবুও খেয়ে নেয়।
খাওয়া শেষে ভীর আয়নায় দাঁড়িয়ে নিজের চুলগুলো সেট করে নেয়,
একবার চাহনিতে ইশায়াকে পরখ করে নেয় আরেকবার,
তারপর নিঃশব্দে বেরিয়ে যায় রুম থেকে।
