সে আমার বন্দিনী পর্ব ৪৭
তানিয়া হুসাইন
আকাশে হালকা নীলচে আবহ, পাখিরা ডানায় ডানায় বিশ্রাম নিচ্ছে, আর বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে নিস্তব্ধতা।
এই মুহূর্তে আদ্রিয়ান তার ঢাকার বাড়ির ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে।
নীলচে আকাশটা তার চোখে ধরা পড়ছে অন্যরকম এক শূন্যতা নিয়ে।
সে ঠাণ্ডা হাওয়ায় চোখ বন্ধ করে ভেতরের সমস্ত ক্লান্তি ঝেড়ে ফেলতে চাইছে।
হাত দুটো রেলিংয়ে রাখা, এক অদৃশ্য অস্থিরতা তাকে ঘিরে আছে।
চোখের কোণটা জলে ভিজে থাকলেও মুখে অদ্ভুত প্রশান্তির ছাপ।
তখনই হালকা টোকা পড়ে দরজায়।
আদ্রিয়ান ভাইয়া, আসবো?
—রাহির কণ্ঠ।
আদ্রিয়ান ধীরে চোখ মেলে, দৃষ্টিতে নেমে আসে বাস্তবতার ছায়া।
এতক্ষণ ছিল সে কল্পনার মাঝে বিভর,
আয়।
—নরম স্বরে উত্তর দেয়।
রাহি ভেতরে ঢোকে।
তার হাতে দুটো কফির কাপ।
একটা আদ্রিয়ানের দিকে বাড়িয়ে দেয়।
এটা তোমার জন্য ভাইয়া।
আদ্রিয়ান কফির কাপটা হাতে নিয়ে বলে,
থ্যাঙ্ক ইউ,নরম গলায়।
রাহি মুচকি হেসে ঘুরে যাওয়ার সময়, হঠাৎ আদ্রিয়ান পিছন থেকে বলে ওঠে,
_তো, নেক্সট প্ল্যান কি তোর?
রাহি ঘুরে তাকায়।
কি প্ল্যান?
আদ্রিয়ান ভেতরে এসে বসে পড়ে সিঙ্গেল সোফায়।
এইচএসসি শেষ করলি, এখন সামনে কি,ভর্তি পরীক্ষা দিবি তো?
রাহি চোখ নামিয়ে মাথা নাড়ে
হ্যাঁ, দিবো।
___প্রিপারেশন কেমন?আদ্রিয়ান গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে প্রশ্ন করে।
এই তো,মোটামুটি।
মোটামুটি দিয়ে হবে না রাহি।
আদ্রিয়ানের কণ্ঠ গম্ভীর হয়ে ওঠে।
ঢাবি, সাস্ট, এসব জায়গায় চান্স পেতে হলে কষ্ট করতে হবে। সিরিয়াস হতে হবে। কোন হেল্প লাগলে আমাকে বলিস।
রাহি একটু থেমে,
আবেগ ছুঁয়ে যাওয়া গলায় বলে,
তুমি আমাকে হেল্প করবে?
আদ্রিয়ান হালকা হাসে।
হুম। পড়া না বুঝলে আমাকে বলিস, কোন বইগুলো ভালো হবে আমি সাজেশন দেবো।
রাহির চোখে ঝিকমিক করছে আনন্দের রেশ।
সে মাথা নাড়ে, তার চোখে একরাশ কৃতজ্ঞতা।
ঠিক আছে ভাইয়া, ধন্যবাদ।
বলেই সে চলে যেতে যেতে একবার ফিরে তাকায়।
আদ্রিয়ান কফির মগে এক চুমুক দেয়।
আদ্রিয়ান দেখে তার পর খুশিতে দৌড়ে যায় এই খবর সায়মা বেগম আর জান্নাত কে দেওয়ার জন্য।
পাহাড় ঘেষা ছোট্ট নিঃশব্দ গ্রামটা যেন আজ মৃত্যুর ছায়ায় মোড়ানো।
চারদিক থেকে ঘিরে রেখেছে কালো পোশাকে সজ্জিত ভীরের গার্ড বাহিনী। তাদের চোখে শুধু আগুন, মুখে উত্তাপ।
বহু গাড়ি নিয়ে তারা ঘিরে ফেলেছে পুরো গ্রাম। বাতাস থমকে গেছে, পাখিরা উড়ে পালিয়েছে অনেক আগেই।
আবারো গর্জে উঠে মাইক।
এই গ্রামে যদি কেউ এসে থাকে, তার উপস্থিতি আমাকে জানাও। আমরা কাউকে কষ্ট দিতে আসিনি। তবে যদি মিথ্যা বলো, আশ্রয় দাও ভুল মানুষকে তবে তার ফল হবে ভয়ঙ্কর।
তিনবার এই ঘোষণা শোনা গেল।
তবুও কেউ এল না।
কেউ দরজা খোলেনি।
এই নিস্তব্ধতা আরও তীব্র করে দেয় ভীরের দলকে।
নিকো একটা কালো শেডের সানগ্লাস চোখে দিলেও তার চোখের নিচের কালি আর ক্লান্তির রেখা লুকাতে পারেনি।
সে গাড়ির ছাদে উঠে দাঁড়ায়।
তার চোখে রক্তিম আগুন, ঠোঁট চেপে ধরা।
চারপাশের গার্ডদের উদ্দেশ্যে সে গর্জে উঠে,
একটা ঘর,একটা কোণা, কুঁড়েঘর থেকে শুরু করে একটা টিনের চালাও যেন বাদ না পড়ে!
ভেতরে ঢুকো খুঁজো, উল্টে ফেলো, টেনে আনো যদি সে থাকে, সে যেন মাটির নিচে লুকিয়েও পার না পায়!
চারপাশে হঠাৎ শব্দ উঠতে থাকে,
হ্যাঁ বস!
অর্ডার ক্লিয়ার!
গার্ডদের হাতের অ*স্ত্রগুলো চকচক করে উঠছে রোদে।
তারা দল বেঁধে প্রবেশ করতে শুরু করে একেকটা ঘরে।
কেউ জানালায় ঢুকছে, কেউ দরজা ভেঙে ঢুকছে,
টেবিল বিছানা সব উল্টে উল্টে ফেলছে,
কেউ এগিয়ে আসার সাহস করছে না সবাই জড়োসড়ো হয়ে দাঁড়িয়ে আছে
গ্রামের লোকেরা থরথর কাঁপছে ভয়ে।
মাথা নিচু করে ঘরের কোনায় সেঁধিয়ে আছে সবাই।
কিন্তু বাইরে যারা দাঁড়িয়ে আছে, তাদের চোখে কোনো মায়া নেই।
শুধু হুকুম। শুধু লক্ষ্য।
তাদের খুঁজে বের করতেই হবে।
গার্ডদের নিঃশব্দ চালচলন, পায়ের আওয়াজ, চিৎকার, ব*ন্দুকের আওয়াজে গ্রামটা কেঁপে কেঁপে উঠছে।
একটা ভয় ছড়িয়ে যাচ্ছে বাতাসে।
নিকো এবার নিচে নেমে হাঁটতে থাকে।
তার পেছনে হেঁটে চলেছে আরও গার্ডরা।
তার শরীরী ভাষা বলে দিচ্ছে আবারো মাইকে বলছে,
এখানে কেউ থাকলে বা কেউ তাকে আশ্রয় দিলে এই গ্রামটা জ্বালিয়ে দেওয়া হবে।
তাই ভালোয় ভালোয় বেরিয়ে আসো।
ডিয়েগো বলে,
আমরা একটা মেয়েকে খুঁজছি।
সে পালিয়েছে।
ভীর তাকে ছাড়বে না।
তোমরা যদি কেউ সাহায্য করে থাকো তো*মাদের রক্তে আমাদের হাত রঞ্জিত হবে।
কিছু গার্ড গাছের ঝোপ, পুকুর পাড়, গোয়ালঘর সব জায়গা তল্লাশি করতে থাকে।
একেকজন ঘর থেকে চিৎকার করে বলে,
ক্লিয়ার!
এখানে কেউ নেই!
পিছনের দিকে আর কয়েকটা ঘর বাকি!
সময় গড়াতে থাকে, ঘামের গন্ধ আর ধুলোর সাথে ভয়ের ঘনত্ব বাড়তে থাকে।
এই যেন এক শিকার, যেখানে শিকারি হয়ে উঠেছে পাগল।
তাদের সামনে কিছু দাঁড়াবে না।
তাদের লক্ষ্য ইশায়া জারিন।
মাফিয়া বসের বউ,যাকে উদ্ধার করাই তাদের একমাত্র উদ্দেশ্য।
___ডেলমার এতোক্ষন করা প্রশ্নের পর এবার ইশায়া মুখ খুলে,
মাথা নিচু করে বলে,
__আমার নাম ইশায়া,আমি পালিয়ে এসেছি।
ওরা আমাকে খুঁজছে,কিন্তু আমি কাউকে কিছু করিনি।
প্লিজ আমাকে বের করে দিও না,আমি যেতে চাই না ওখানে।
আমাকে সাহায্য করুন,দয়া করুন আমাকে।
ওরা আমাকে নিয়ে যাবে,আমি যেতে চাই না।
আমাকে সাহায্য করুন প্লিজ।
ইশায়া হাঁপাতে হাঁপাতে ডেলমার পায়ের কাছে বসে পড়ে। অশ্রুসজল চোখে দুহাত জোড় করে কাঁপা কণ্ঠে আবারো বলে,
আন্টি, প্লিজ আমাকে সাহায্য করুন। আমি ওদের সঙ্গে যেতে চাই না, ওরা আমাকে মেরে ফেলবে, দয়া করে আমাকে বাঁচান।
আমি তো আপনার মেয়ের মতো আন্টি,আজ আমার জায়গায় যদি আপনার মেয়ে থাকতো তাহলে কি আপনি এভাবে আমাকে ওদের মাঝে ছেড়ে দিতেন।
___ডেলমা থ হয়ে যায়। চোখ বড় বড় হয়ে তাকিয়ে থাকে কাঁদতে থাকা মেয়েটার দিকে। তার হৃদয়ে কেমন যেন একটা যন্ত্রণার ঢেউ খেলে যায়।
সে কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে, কিছুই বুঝে উঠতে পারছে না। তার মস্তিষ্ক একদিকে বলছে এই মেয়েটাকে আশ্রয় দিলে তার ছেলের জীবনও বিপন্ন হবে। এই লোকেরা যদি জেনে ফেলে সে এই মেয়েটাকে লুকিয়েছে, তাহলে ওদের রক্ষা থাকবে না।
তবুও,তবুও এই ছোট্ট মেয়েটার অশ্রু, তার মুখের আতঙ্কে ভয়ে ডেলমার ভিতরটা ছিঁড়ে যাচ্ছে। তার ও তো এমন ফুটফুটে একটা মেয়ে ছিলো, নিজের মেয়ের কথা মনে পড়ে যায়।
একটা নিষ্পাপ মুখ, যে আজ নেই,
মিগুয়েলের লোকেরা তাকে তুলে নিয়ে গিয়েছিল,
ধ*র্ষণ করে, মেরে রক্তে ভাসিয়ে রেখে গিয়েছিল একটা লা*শ।
বিচার চাওয়া তো দূরের কথা, প্রতিবাদ করার ও সাহস হয়নি সেদিন তাদের।
মিগুয়েলের মৃত্যুতে সব থেকে বেশি খুশি হয়েছিল ডেলমা নিজে।
কিন্তু আজ এত বছর পর সেই ভয়াবহ দিনের কষ্ট, সেই হারিয়ে যাওয়া মেয়ের মুখ আরেকবার যেন জীবন্ত হয়ে উঠেছে ইশায়ার মাঝে।
ডেলমা অসহায়ের মতো ঠায় দাঁড়িয়ে আছে। কাঁপা হাতে দেয়ালে ঠেস দিয়ে আশ্রয় নেন।
ঠিক তখনই,
তীব্র শব্দে দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ হয়।
ইশায়া চমকে ওঠে।
তার চোখ বিস্ফারিত হয়ে ওঠে আতঙ্কে।
গলার স্বর কেঁপে ওঠে ভয় আর কান্নায়,
আবারও সেই বন্দিত্বের ভয়।
আন্টি! প্লিজ, প্লিজ খুলবেন না! ওরা এসেছে,ওরা এসে গেছে, আমাকে নিয়ে যাবে! আমাকে বাঁচান!
তারপর দৌঁড়ে এসে ডেলমার কোমর জড়িয়ে ধরে সে।
নরম কাঁপা হাতে আঁকড়ে ধরে বলে,আমি আর পারব না, আপনি আমাকে এখান থেকে বের হওয়ার পথ বলে দিন,
ডেলমা দাঁড়িয়ে থাকে স্থির। মুখ পাথরের মতো।
চোখে জমে ওঠে জল। বুকের ভেতর এক চঞ্চল ঢেউ।
ভিতরে ভিতরে তোলপাড় চলছে,
সে আমার বন্দিনী পর্ব ৪৬
সে কি তার মেয়ের মতো আরেকটা মেয়েকে সেই নরকের আগুনে ঠেলে দেবে?
নাকি সাহস করে আজ একটা সঠিক সিদ্ধান্ত নেবে।
ওপাশ থেকে আবার কড়া নাড়ার শব্দ হয়।
ডেলমার চোখে জ্বলজ্বলে কিছু একটা জ্বলে ওঠে। সে একবার ইশায়ার দিকে তাকায়।
