সে আমার বন্দিনী পর্ব ৫৫
তানিয়া হুসাইন
যেন সে কেবল একটি রাজ্য নয়,তার সবচেয়ে মূল্যবান রত্নটিও নিজের হাতে ধরে রেখেছে।
প্রাসাদের সুবিশাল হলঘর পেরিয়ে, মার্বেলের সিঁড়ি দিয়ে ধীর পায়ে উপরে উঠতে থাকে ভীর।
তার কোলে ঘুমন্ত ইশায়া।
প্রতিটি ধাপ যেন অদৃশ্য এক অঙ্গীকারের সাক্ষী,
তার দৃষ্টি নিবদ্ধ ইশায়ার ঘুমন্ত মুখে।
সেই কোমল মুখশ্রী, যেন চারপাশের অন্ধকারকেও ম্লান করে দেয়।
হাজারো রক্তাক্ত লড়াই, বিশ্বাসঘাতকতা আর অশান্তির ঝড়ের মধ্যে এই একটাই শান্তির দ্বীপ তার জীবনে যার নাম ইশায়া।
এ শান্তি পেতে হলে প্রয়োজনে পুরো পৃথিবীকে জ্বালিয়ে দেবে সে, তবুও তাকে নিজের কাছে রাখবে, নিজের বন্দিনী করে।
তার কাছ থেকে এই মুক্তির স্বপ্ন সে কখনোই দেখতে দেবে না।
যতবার দূরে যেতে চাইবে ঠিক ততবার এভাবেই তাকে আরো কাছে টেনে নেবে।
রুমের কাছে পৌঁছাতেই কাজের লোক দরজা খুলে দেয়।
ভেতরে ঢুকে ভীর আলতোভাবে ইশায়াকে নরম বিছানায় শুইয়ে দেয়, সাবধানে যাতে তার ঘুম ভাঙে না।
তারপরে ধীরে ধীরে তার লম্বা চুলগুলো মুখ থেকে সরিয়ে একপাশে গুছিয়ে দেয়।
লম্বা চুলগুলো গোছাতে সে হিমশিম খাচ্ছে,গোছাতে গিয়ে বার বার এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে তবুও আনারি হাতে সুন্দর করে গুছিয়ে দেয়।
ভীরের চোখে অনিচ্ছাকৃত এক কোমলতা ফুটে ওঠে,
ইশায়ার ঠোঁটের সেই ছোট্ট তিল আর এই ঘন কালো চুলগুলোই তার সবচেয়ে দুর্বল জায়গা।
মনের ভেতরে অহংকারের এক শীতল ঢেউ বয়ে যায়।
যখন প্রথম সে দেখেছিল ইশায়াকে, তার চুল এত লম্বা ছিল না, আর সৌন্দর্যও ছিল অন্যরকম।
সে বরাবরই সুন্দর ছিল, কিন্তু এখন তার মুখে ফুটে উঠে এক অদ্ভুত আভিজাত্য, এক ধরণের রাজকীয় সৌন্দর্য যা চোখ সরিয়ে নেওয়া অসম্ভব করে তোলে।
তার নিজের স্ত্রী, তার নিজের মানুষ এই ভাবনাই ভীরের ঠোঁটে এক হালকা, কিন্তু দম্ভিত হাসি এনে দেয়।
এর কারণ এটাই তার কাছে এসে ইশায়ার সৌন্দর্য বেড়ে গেছে।
আরে সৌন্দর্যের কারণ একমাত্র ভীর,সে এটাই মনে করে।
ভীর হাত বাড়িয়ে ইশায়ার গালের হালকা লালচে দাগের উপর আঙুল বুলায়।
কিন্তু তার চোখে কোনো অনুতাপ নেই যা , এর চেয়েও কঠিন শাস্তি প্রাপ্য ছিল তার,
তবুও কেন যেন এই মেয়েকে কষ্ট দেওয়া তার পক্ষে অসম্ভব।
একটু দূরে রাখা বড় চেয়ারে বসে ভীর ছায়ার মতো চুপচাপ তাকিয়ে থাকে ইশায়ার দিকে।
মাত্র দুইদিন সে তার কাছ থেকে দূরে ছিল, অথচ মনে হয়েছিল যেন দুই যুগ পেরিয়ে গেছে।
এই মেয়েকে দেখার ক্ষুধা তার মধ্যে এমনভাবে জন্মেছে, যা কখনো মিটবে না বরং প্রতিদিন আরও বাড়ছে।
নেশার মতো তাকে ছাড়া একটি মুহূর্তও থাকতে পারে না ভীর।
সে নিজেই জানে না এর কারণ কী।
শুধু জানে, এই মেয়ের দিকে অন্য কারো চোখ পড়ার চিন্তাই তার শরীরে রক্তের তাপ বাড়িয়ে দেয়।
ইশায়া কেবল তার এটাই একমাত্র সত্য।
ভীর বসে আছে এক কোণে, চোখ দুটি ইশায়ার উপর স্থির। আজ তার দৃষ্টিতে কেবল জেদ বা অধিকার নেই আছে এক অদ্ভুত অস্থিরতা, এক তীব্র অনুসন্ধান। তার চোখ প্রতিবার ইশায়ার শরীরের প্রতিটি রেখা, প্রতিটি ভাঁজ, প্রতিটি ছায়া খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে যাচাই করছে, যেন কোনো চিহ্ন খুঁজছে।
এই মেয়েকে যদি সে ছাড়া অন্য কেউ ছুঁয়ে থাকে,তাহলে সেই মানুষকে সে পৃথিবীর সবচেয়ে ভয়ংকর মৃত্যু দিবে। আর ইশায়া তাকেও সে ছাড়বে না,ছেড়ে দেওয়ার প্রশ্ন ও আসে না, তার শরীর আগুনে পুড়িয়ে ছাই করে দেবে সে, যদি তার শরীরে সে ছাড়া অন্য কোন পুরুষের স্পর্শ থাকে । ভীরের কাছে ইশায়া এমন এক সম্পদ, যাকে চোখ তুলে দেখাও অপরাধ, স্পর্শ তো অকল্পনীয় অপরাধ।
দুই দিন মাত্র দুই দিন ইশায়া তার কাছে ছিল না। তবুও ভীরের কাছে মনে হয়েছে যেন দুই যুগ পেরিয়ে গেছে। গুয়াতেমালার প্রতিটি গলি, প্রতিটি ছায়া, প্রতিটি কুঁড়েঘর থেকে বাড়ি সব খুঁজেও তাকে পাওয়া যায়নি। আজ অবশেষে, নিজের প্রাসাদের ভেতরে ফিরিয়ে আনা হয়েছে ইশায়াকে। কিন্তু ভীরের মন শান্ত হয়নি। তার মাথায় একটাই প্রশ্ন অবিরাম ঘুরছে এই দুই দিনে কি অন্য কেউ ওকে ছুঁয়েছে? ওই ছেলের জন্য এত দরদ কেনো দেখালো ও।
ওই ছেলেটি কি সাহস করেছে তার নারীকে নিজের মতো করে স্পর্শ করার?
এসব ভাবনাই ঘুরপাক খাচ্ছে ভীরের মাথায়,
এর মাঝে একজন গার্ড এসে জানায়,
___ডাক্তার এসে গেছে, স্যার।
ভীর ঠাণ্ডা গলায় বলে,
___ভেতরে আনো।
ভীরের নির্দেশে প্রাসাদের এক কক্ষে তৈরি করা হয় পরীক্ষা ঘর। ধাতব যন্ত্রপাতির ঠাণ্ডা আলোয় ঘর ভরে উঠে, জীবাণুনাশকের তীব্র গন্ধ চারপাশ জুড়ে।
মারিয়া এলেনা এসে ইশায়াকে ডেকে তুলে। ইশায়া ঘুম ঘুম চোখ মেলে দেখে সে এসে গেছে সেই ঘরে যেখান থেকে তার এই বন্দিত্ব শুরু হয়েছিল। মারিয়া এলেনা তাকে নিয়ে যায়, কিছু বুঝে ওঠার আগেই তাকে বসানো হয় সাদা লেদারের চেয়ারে। তার চোখে ক্লান্তি, ঠোঁটে অপ্রস্তুত নীরবতা সে জানে না সামনে কি হতে যাচ্ছে।
ভীর ধীরে ধীরে ডাক্তারের দিকে তাকিয়ে ঠাণ্ডা কণ্ঠে বলল,
আমি বিস্তারিত জানতে চাই। শেষবার কবে…কথা থামিয়ে সে ইশায়ার দিকে তাকায়, চোখে শিকারির ক্ষুধা আমি ছাড়া আর কেউ ওকে ছুঁয়েছে কিনা।
ডাক্তার সামান্য ভয় মেশানো কণ্ঠে উত্তর দেয়,
আমরা শারীরিক পরীক্ষার মাধ্যমে কিছু বিষয় জানতে পারব। গায়ে আঘাতের চিহ্ন, ত্বকের ক্ষত, নখের দাগ সব দেখা হবে। রক্তের হরমোনের মাত্রা এবং অভ্যন্তরীণ টিস্যুর পরিবর্তন দেখে অনুমান করা যায় শেষ কবে তীব্র শারীরিক সংস্পর্শ হয়েছে। প্রয়োজনে ডিএনএ স্যাম্পল নেওয়া হবে। গত ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে জোরপূর্বক কিছু হয়ে থাকলে, কিছু জৈবিক প্রমাণ পাওয়া সম্ভব।
ভীরের ঠোঁট বাঁকা হয়, কিন্তু চোখে কোনো উষ্ণতা নেই,শুধু শীতল দৃঢ়তা।
ডাক্তার গ্লাভস পরে এগিয়ে আসে। ইশায়ার শ্বাস দ্রুত হয়ে উঠছে। তার আঙুল চেয়ারের হাতলে শক্ত করে আঁকড়ে ধরা, মনে হচ্ছে কিছু বলতে চায় কিন্তু গলা শুকিয়ে গেছে।
ভীর ধীর পায়ে এগিয়ে এসে তার সামনে দাঁড়াল। নিচু হয়ে, ঠোঁট ইশায়ার কানে স্পর্শ করে ফিসফিসিয়ে বলল,
তুই কথা না বললেও চলবে, কিন্তু আমি জানব। সব জানব। আর তারপর তোর সব কাজের ফল তুমি পাবি।
তোর এই বোকামির জন্য যদি কিছু হয়ে থাকে তাহলে আমি তোকেও ছাড়বো না
ইশায়ার চোখে জল ভরে উঠে লজ্জা অপমান আর ঘৃণায়। সে ছাদের দিকে তাকিয়ে রয়, যেন নিজের মনকে এই মুহূর্ত থেকে দূরে সরিয়ে নিতে চাইছে।
পরীক্ষা শুরু হয়।
ডাক্তার গায়ে কোথাও ক্ষত, আঁচড়, নখের দাগ আছে কিনা দেখে। তারপরে রক্তের নমুনা নেয়, হরমোন লেভেল পরীক্ষা করার জন্য যা বলে দিতে পারবে শেষ দুই দিনের মধ্যে শরীরে কোনো তীব্র শারীরিক কার্যকলাপ ঘটেছে কিনা। অভ্যন্তরীণ পরীক্ষা করে দেখল টিস্যুর কোনো ক্ষত বা তাজা আঘাত আছে কিনা, যা জোরপূর্বক সংস্পর্শের প্রমাণ হতে পারে। বিশেষ কিছু স্থানে তুলোর ছোঁয়ায় নমুনা নেওয়া হলো, যাতে অন্য কারো ডিএনএ থেকে থাকলে তা ধরা পড়ে।
প্রতিবার ডাক্তার তার শরীরে হাত বাড়াতেই ইশায়া কেঁপে উঠছে। চোখে অপমান আর ক্ষোভ, কিন্তু ঠোঁট বন্ধ।
ভীরের সামনে কিছু বলার মানে সে জানে, আরও বিপদ ডেকে আনা।
ডাক্তাররা তাদের কাজ চালিয়ে যায় নির্লিপ্তভাবে।
প্রাসাদের ভেতরের কক্ষটা যেন একেবারে অন্য দুনিয়া।
ঘরের দেয়ালে ঝুলছে কালো ল্যাম্প, তার আলোয় ধোঁয়ার আস্ত একটা পর্দা নেমে এসেছে।
দীর্ঘ টেবিলটা ভরা সাদা সাদা পাউডারের রেখায়, আয়নার ওপর ছড়ানো গুঁড়ো যেন চাঁদের আলোয় ঝলমল করছে।
ভীর মাথা নিচু করে, টেবিলের একপাশ থেকে টেনে নেয় সোনালী টিউব, আর আস্তে আস্তে গুঁ*ড়োটা টেনে নেয় ভেতরে।
তার চোখ আধখোলা হয়ে আসে, মাথাটা পিছনে হেলিয়ে দেয়,
ঠোঁটে ফুটে ওঠে সেই ভীতিকর, বাঁকা হাসি।
এক নিশ্বাস ছাড়তেই ঘর ভরে যায় নে*শার গন্ধে।
ভীরের কণ্ঠ ভারী, অথচ থমথমে।
তার ডানদিকে বসে আছে নিকো।
গ্লাসে হুইস্কি ঢালছে সে, বরফের কিউব গ্লাসে পড়তেই শব্দ হয়।
নিকো গ্লাস উঁচু করে হেসে বলে,
একটা রাজ্য পতন হলো, এখন আবারো আমাদের পতাকা উড়বে। কাল আরেকটা তারপর আরেকটা। একদিন পুরো মানচিত্রটাই হবে আমাদের।
ভীর মৃদু হাসে, গ্লাস হাতে নেয়।
তার চোখে এখন শুধু রক্ত আর আগুনের স্বপ্ন।
আজ গুয়াতেমালার পতাকা উড়ছে আমার ছাদে।
মেক্সিকো,কলম্বিয়া,পানামা হন্ডুরাস, আর এখন গুয়াতেমালা সব আমার নিয়ন্ত্রনে।
কাল উঠবে আরেকটা পতাকা। যতদিন না প্রতিটা রাজ্য আমার দখলে আসে আমার উদযাপন শেষ হবে না।
তার চারপাশে বসা মাফিয়া সদস্যরা হইহই করে ওঠে।
ম*দ, হাসি মিলে যেন পুরো ঘরটা এক অন্ধকার উৎসবের মঞ্চে পরিণত হয়েছে।
কয়েকদিনের দুশ্চিন্তা শেষে যেন পুরনো সেই আমেজ ফিরে এসেছে।
মৃত্যুর ভয় পেছনে ফেলে আবার নতুন রাজ্য দখলের উল্লাস।
ঠিক তখনই, দরজা খুলে ঢোকে এক গার্ড।
সে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকে, কণ্ঠে চাপা উত্তেজনা,
___বস, রিপোর্ট এসে গেছে। সবকিছু প্রস্তুত।
ঘরের আবহ যেন হঠাৎ থমকে যায়।
ভীরের চোখ গার্ডের দিকে ঘুরে যায়।
সে গ্লাস নামিয়ে ধীরে বলে,
ভিতরে আনো।
বাকিরা চলে যায় একে একে রুম থেকে।
কিছুক্ষণের মধ্যেই ভেতরে ঢোকে ডাক্তার।
সাদা কোটের ভেতর তার গলার কাছটা ঘামে ভিজে গেছে।
হাতে ধরা ট্যাবলেট স্ক্রিন তাতে জ্বলজ্বল করছে পরীক্ষার রিপোর্ট।
ডাক্তার নিচু গলায় বলে,
আমরা সমস্ত পরীক্ষা শেষ করেছি, স্যার। শরীরে কোনো নতুন আঘাতের চিহ্ন নেই, কোনো জোরপূর্বক সংস্পর্শের প্রমাণ নেই।
ভীর স্থির দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে আছে।
ডাক্তার এর কণ্ঠ আরও নিচু হয়ে আসে,
ম্যামের শরীরে আপনার ডিএনএ ছাড়া আর কিছু পাওয়া যায়নি। রিপোর্টে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে শেষবার শারীরিক সম্পর্ক হয়েছে আপনার সাথেই দুই দিন আগে।
কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে থাকে ভীর।
ডাক্তার ফাইলটা ভীরের হাতে দিয়ে মাথা নিচু করে সরে যায়।
ভীর গ্লাসে আস্তে চুমুক দেয়।
তার চোখ আধখোলা, মাথা এলিয়ে দেয় পিছনের কালো চামড়ার সোফায়।
ঠোঁটে এক অদ্ভুত হাসি ফুটে ওঠে,
সে জানতো ফলাফল এমনই আসবে, কিন্তু তবুও এই রিপোর্ট চাইছিল।
কারন ইশায়াকে নিয়ে পারসেন্টও সন্দেহ রাখতে চায় নি সে। ইশায়াকে নিয়ে এক বিন্দু ও কম্প্রোমাইজ করবেনা সে।
তার অসুস্থ মস্তিষ্ক যেন দিন আরও অসুস্থ হয়ে পড়ছে।
___ভীরের চোখে আবার সেই ভয়ংকর দৃঢ়তা ঝলসে ওঠে।
ওর সবকিছু আমার কাছে পানির মতো স্বচ্ছ থাকতে হবে। প্রতিটি নিশ্বাস, প্রতিটি ছোঁয়া, প্রতিটি মুহূর্ত।
ইশায়া, তার বন্দিনী। তার অধিকার, তার অবসেশন।
ইশায়া চুপচাপ বসে আছে তার রুমের এক কোণে।
আট ঘণ্টা ধরে যেভাবে বসেছিল, ঠিক সেভাবেই বসে আছে তার চোখের ও এক ফোঁটা নড়াচড়া নেই, মুখে কোনো অভিব্যক্তি নেই।
কিন্তু ভেতরে ভেতরে সে ভেঙে চুরমার হয়ে যাচ্ছে।
যা ঘটেছে তার সাথে
সেটা একটা মেয়ের জন্য সবচেয়ে বড় অপমান।
লজ্জা, ঘৃণা, অপমানে তার বুক ফেটে যাচ্ছে।
তার মনে হচ্ছে যেন নিজের দেহটা এখন তার নিজের আর নেই যেন কেউ ছিনিয়ে নিয়েছে তার আত্মা।
চোখে পানি জমলেও সে কাঁদতে পারছে না।
কাঁদতে কাঁদতে তার চোখের পানিও শুকিয়ে গেছে,
এখন বুকের ভেতরে এক অজানা শূন্যতা, একটা জ্বলন্ত আগুন শুধু তাকে ভিতর থেকে খেয়ে নিচ্ছে।
তার নিজের উপরই রাগ হচ্ছে,
কেন সে এখনো বেঁচে আছে।
কেন আল্লাহ তাকে এই দুনিয়া থেকে তুলে নিচ্ছে না,
কেন এই জাহান্নামের আগুনে প্রতিদিন তাকে পুড়তে হচ্ছে।
তার এত এত প্রশ্ন কিন্তু এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়া বা তার এই প্রশ্নগুলো শোনার মতো কেউ নেই।
সে নিঃস্ব একেবারে নিঃস্ব এখানে দিন দিন একেবারে নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে।
তার এই কান্না তার এই চিৎকার তার এই বুকফাটা আর্তনাদ দেখার মত কেউ নেই।
কিছুক্ষণ নিঃশ্বাস বন্ধ করে বসে থেকে ইশায়া তারপর ধীরে ধীরে মাথা তুলে তাকায়।
তার মনে তখন একটা সিদ্ধান্ত,
একটা জিনিস-ই ঘুরপাক খাচ্ছে বারবার,
সে আর বাঁচবে না।
আ*ত্মহত্যা মহাপাপ, কিন্তু তার কাছে এখন আর কোনো রাস্তা খোলা নেই।
যা হয়েছে তার পর আর বেঁচে থাকার চেয়ে মরাই তার কাছে শান্তি।
ঘরে প্রহরার মতো দাঁড়িয়ে আছে দশ-বারো জন গার্ড।
প্রত্যেকে তার প্রতিটি নড়াচড়া লক্ষ্য করছে।
ইশায়ার চোখ ঘরের এদিক-সেদিক ঘুরতে থাকে, যেন কিছু খুঁজছে।
হঠাৎ সে উঠে দাঁড়ায়, একটার পর একটা ড্রয়ার খুলতে থাকে।
হাতে যা পাচ্ছে তাই টেনে ছুড়ে ফেলছে মেঝেতে।
গ্লাস, বই, কাগজ সব ছিটকে পড়ছে।
একজন গার্ড এগিয়ে এসে নরম গলায় বলে,
___ম্যাম… আপনি কি খুঁজছেন? আমাকে বলুন, আমি এনে দিচ্ছি।
কিন্তু ইশায়া কোনো জবাব দেয় না।
তার চোখ লাল হয়ে আছে, মুখে শুধু হতাশার ছাপ।
সে খুঁজেই যাচ্ছে, আর ছুড়ে ফেলছে জিনিসপত্র।
গার্ডরা হতবাক।
যে মেয়ে এতদিন সবসময় শান্ত, চুপচাপ বসে থাকত, আজ হঠাৎ কেন এমন করছে তারা নিজেরাই বুঝে উঠতে পারছে না।
কেউ কাছে যাওয়ার সাহস করছে না কারণ তারা জানে, এই মেয়ে বসের কাছে কী মানে রাখে।
ঠিক তখনই দরজা খোলে।
ভেতরে ঢোকে মারিয়া এলেনা, হাতে খাবারের ট্রে।
সে মিষ্টি গলায় বলে,
___ম্যাম, আপনার জন্য খাবার এনেছি। আপনি আসার পর থেকে কিছু খাননি, খেয়ে নিন প্লিজ। বস যদি শুনেনযে আপনি খাননি, উনি খুব রেগে যাবেন।
কথা বলতে বলতে ভেতরে ঢুকে সে।
কিন্তু চোখের সামনে যে দৃশ্য দেখে তার মুখ শুকিয়ে যায়।
ড্রয়ার নিচে পড়া, জিনিসপত্র মেঝেতে ছড়িয়ে আছে।
আর ইশায়ার চোখ রাগ, ঘৃণা আর হতাশায় জ্বলছে।
মারিয়া অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতেই,
ইশায়া এগিয়ে আসে তার দিকে খাবারের ট্রের দিকে তাকায়।
তার দৃষ্টি আটকে যায় ট্রের ভেতরে রাখা ছুরির দিকে।
এক মুহূর্ত দেরি না করে,
ট্রে থেকে ছুরিটা তোলে হাতে।
মারিয়া ভয়ে চিৎকার করে ওঠে,
___না ম্যাম! না!
তার কল্পনার বাইরে ইশায়া এমন কিছু করবে,
গত ১০-১১ মাসে ইশায়াকে এমন আচরণ করতে দেখে নি সে।
আশেপাশের সব গার্ড দৌড়ে আসে,
ইশায়াকে ঘিরে ধরে তারা, থামাতে চায়।
কিন্তু ইশায়া পিছিয়ে যায়, ছুরিটা শক্ত করে বাম হাতে চেপে ধরে।
তার কণ্ঠ কাঁপছে, তবু তীক্ষ্ণ গলায় বলে,
দাঁড়াও! দাঁড়াও সবাই! এক পাও সামনে আসবে না!
এক পাও যদি এগোও, আমি এখানেই নিজেকে শেষ করে দেবো!
গার্ডরা একে অপরের দিকে তাকায়, কারো সাহস হয় না এগোনোর।
তারা জানে যদি ইশায়ার শরীর থেকে এক ফোঁটা রক্তও বের হয়, ভীর তাদের কাউকে আস্ত রাখবে না।
রাজভীর আলভারেয তার বন্দিনীকে আঘাতপ্রাপ্ত অবস্থায় দেখলে সবাইকে শেষ হয়ে যাবে।
ইশায়ার হাত কাঁপছে, ছুরির ধার তার কব্জির খুব কাছে।
তার শ্বাস দ্রুত উঠছে-নামছে, চোখে পানি চিকচিক করছে।
___পিছনে যাও! সবাই পিছনে যাও!
নাহয়….
গার্ডরা আস্তে আস্তে পিছিয়ে যায়।
তাদের মুখে ভয়।
না ইশায়ার জন্য না নিজেদের জন্য ভয় পাচ্ছে তারা, এই মেয়ে যদি কিছু করে ফেলে, তবে শুধু তার নয়, তাদেরও মৃ*ত্যু নিশ্চিত।
সে আমার বন্দিনী পর্ব ৫৪
____এর মাঝে মারিয়া এলেনা দৌড়ে যায় ভীরকে খবর দিতে।
তার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেছে।
সে জানে, ভীর ছাড়া আর কেউ ইশায়াকে থামাতে পারবে না।
