সে আমার বন্দিনী পর্ব ৫৬
তানিয়া হুসাইন
____এর মাঝে মারিয়া এলেনা দৌড়ে যায় ভীরকে খবর দিতে।
তার মুখ ফ্যাকাসে হয়ে গেছে, চোখেমুখে আতঙ্ক স্পষ্ট। সে জানে এই মুহূর্তে ভীর ছাড়া ইশায়াকে আর কেউ সামলাতে পারবে না।
সে হন্তদন্ত হয়ে সে ছুটে এসে দাঁড়ায় ভীরের সামনে, লম্বা লম্বা শ্বাস নিচ্ছে দম বন্ধ হয়ে আসছে তার,
___এভাবে এখানে মারিয়া এলেনা কে দেখে কপালে ভাজ পড়ে ভীরের।
____বস! ম্যাম… ম্যাম! কণ্ঠ কেঁপে ওঠে তার।
ভীর হাতের গ্লাসটা ধীরে টেবিলে রেখে তার দিকে তাকায় চোখ সরু করে,
–ম্যাম কি করছেন, বস! আপনি একটু দেখেন, ম্যাম পাগল হয়ে গেছেন, আমরা কেউ ম্যামকে সামলাতে পারছি না। তিনি হা…হাতে ছুরি নিয়ে নিয়েছেন।
নিজেকে মে..মেরে ফেলতে চাচ্ছেন
___ভীরের কপালের রগ ফুলে ওঠে।
মারিয়া এলেনার কথা শুনে।
বারবার সে নিজের মনকে বুঝিয়েছে এই মেয়েকে কিছু করবে না, যা হয়েছে ভুলে যাবে।কিন্তু ভবিষ্যতে যেন এটা না হয় তার সম্পূর্ণ ব্যবস্থা নিবে, কিন্তু ইশায়া প্রতিবারই এমন কিছু করছে, যার কারণে তার মেজাজ ভয়ংকরভাবে হারাচ্ছে।
___এক মুহূর্তও দেরি না করে ভীর দ্রুত পায়ে রওনা দেয় রুমের দিকে। তার চোখে ভয়ংকর আগুন, মাথাটা ও টলছে,আজ এই মেয়ের বাড়াবাড়ির শেষ সে দেখে ছাড়বে।
____ভীর উপরে উঠে দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই চোখের সামনে যে দৃশ্যটা ভেসে ওঠে তাতে তার শিরা উপশিরায় রক্ত জমে যায়।
গার্ডরা চেষ্টা করছে ইশায়াকে শান্ত করতে, থামাতে। আর ইশায়া ছুরি হাতে দাঁড়িয়ে আছে কোণায়, ভয়ার্ত চোখে সবাইকে পিছনে সরতে বলছে।
ভীরকে রুমে ঢুকতে দেখেই ইশায়ার মুখ আরও বিকৃত হয়ে ওঠে।
সে ভাঙা গলায় চিৎকার করে ওঠে,
–একদম কাছে আসবেন না! সরে যান,সরে যান এখান থেকে! আমার কাছে আসবেন না আপনি!
তার ডান হাতে শক্ত করে ধরা ছু*রি, আর সেই ছু*রির ধার বাম হাতের কব্জিতে চেপে ধরে আছে।
ভীর স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে, তার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি ইশায়ার ওপর আটকে আছে। প্রতিটি সেকেন্ডে সে হিসেব করছে,কীভাবে গেলে ছুরিটা তার হাত থেকে কাড়তে পারবে। মাথার ভেতর ঝড় বইছে, কিন্তু মুখের ভেতর একরাশ নীরবতা।
সে এক পা এগোতেই ইশায়া ঘাবড়ে যায়।
চিৎকার করে বলে আসবেন না, আসবেন না বলছি..
কিন্তু ভীর আবারো এগোতে নিলেই,
আতঙ্কে হঠাৎ ছুরি চালিয়ে দেয় ইশায়া নিজের হাতে। মুহূর্তেই পাতলা চামড়া ভেদ করে র*ক্ত গড়িয়ে পড়ে ফ্লোরে।
ভীরের চোখ বড় হয়ে ওঠে, শিরায় আগুন জ্বলে ওঠে। সে গর্জে ওঠে,
–হেইইই! স্টপ! ভীর দু-হাত উঠিয়ে বলে আসছি না, আমি আসছি না! আসব না তোমার কাছে! হাত থেকে নামাও ছুরিটা!
নামাও বলতে বলতে ভীর পিছিয়ে যায় দু-পা।
তার কণ্ঠে আতঙ্ক আর ক্রোধের মিশ্রণ।
___কিন্তু ইশায়া থামে না। রক্ত গড়িয়ে পড়ছে কব্জি থেকে, ফ্লোরে এক ফোঁটা দুই ফোঁটা লাল দাগ ছড়িয়ে পড়ছে। অথচ আজ তার চোখে কোন ব্যথার ছাপ নেই, যেন ব্যথা তার অস্তিত্বকে স্পর্শ করতেই পারছে না।
__ ভীরের রুম থেকে এত চেঁচামেচির শব্দ শুনে নিকো দৌড়ে আসে।
এসে যা বুঝার সে বুঝে যায়, ইশায়ার প্রতি রাগ টা তার দিন দিন আরো বেড়ে যাচ্ছে।
ভীরকে এভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ক্ষোভে ফেটে পড়ে নিক।
একটুখানি একটা মেয়ের জন্য ভীর ভয় পাচ্ছে এটা নিকোর কাছে অসম্ভব মনে হয়, সহ্যও হয় না তার এসব আদিখ্যেতা।
এই মেয়ে তাদেরকে নাকে দড়ি দিয়ে ঘুরাচ্ছে, আর এসব কিছুর পরও ভীর কোন পদক্ষেপ নিচ্ছে না, এই মেয়েকে সে লেই দিয়ে দিয়ে আরো মাথায় উঠাচ্ছে।
নিকো রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে ইশায়ার দিকে এগোতে নিলেই,
ইশায়া নিকোকে দেখে আতঙ্কে হঠাৎই হাতে আরেকটা টান দেয়। তার কব্জি থেকে র*ক্ত ছলকে পড়ে ফ্লোরে ছড়িয়ে যাচ্ছে, যেন লাল রঙের ছোপে ভেসে যাচ্ছে সাদা মার্বেল।
– ওর কাছে যেও না, ড্যাম ইট!
স্টে ব্যাক।
ভীর চিৎকার করে ওঠে,তার চোখে রাগের ঝলক, গলায় তীব্রতা।
হাজারো মানুষের র*ক্ত ঝরিয়েছে ভীর, অসংখ্য মানুষকে এক নিমিষে মাটিতে ফেলে দিয়েছে,
কিন্তু আজ এই একজনের রক্ত দেখে সে পাগল হয়ে যাচ্ছে।
কী করবে, কীভাবে থামাবে কিছুই বুঝে উঠতে পারছে না। তার সব ক্ষমতা, সব অ*স্ত্র, সব ভয়ংকর ক্ষমতাধর অবস্থান আজ বৃথা মনে হচ্ছে।
ইশায়ার শরীর কাঁপছে, হাতের ব্যথায় কাবু হয়ে পড়ছে তবুও সে হার মানছে না।
তার চোখে এক অদম্য জেদ, আজ সে হারবে না, প্রয়োজনে মরে যাবে, তবুও এই মানুষগুলোর কাছে হার মানবে না।
ভীরের রাগে ভরা গলায় গর্জে ওঠে,
– হাত থেকে ওটা নামাও ইশায়া। না হলে এর ফল খুব খারাপ হবে। ভুলে যেও না তোমার পরিবারের কথা আমি কাউকে ছেড়ে দিবো না।
কিন্তু ইশায়া মানে না।
এক চুলও নড়ে না সে।
আজ কোন ভয়, কোন হুমকি, কোন আবেগই তাকে স্পর্শ করতে পারছে না।
নিকো ভীরকে কিছু বলতেও পারছে না।
ইশায়া বারবার এদিক-ওদিক তাকাচ্ছে, ভীত অথচ দৃঢ় চোখে পিছিয়ে যাচ্ছে ধীরে ধীরে।
অবশেষে সে দরজার কাছে এসে পৌঁছায়।
তার হাত থেকে অনবরত রক্ত চুইয়ে পড়ছে। ভীরের দৃষ্টি সেখানেই আটকে আছে, একেক ফোঁটা রক্ত যেন তার মাথার ভেতর বজ্রপাত ঘটাচ্ছে।
দরজার কাছে পৌঁছাতেই গার্ডরা দরজা ঘিরে দাঁড়িয়ে যায়, দেয়াল হয়ে দাঁড়ায় তার সামনে।
ইশায়া ভীরকে উদ্দেশ্য করে হাঁপাতে হাঁপাতে বলে ওঠে,
–ওদেরকে বলুন সরে যেতে, ওদেরকে বলুন সরে যেতে, না হলে… না হলে আমি কিন্তু,
ভীর দাঁতে দাঁত চেপে তিড় তিড় করে কাঁপছে, রাগে চোখ লাল হয়ে আছে।
এক ঝটকায় সে চিৎকার করে গার্ডদের বলে সরে যেতে।
তার আদেশে সবাই দরজা ছেড়ে সরে দাঁড়ায়।
ইশায়া সুযোগ বুঝে দৌড়ে বেরিয়ে যায় রুম থেকে।
এক নিঃশ্বাসে ছুটে আসে নিচের হল রুমে।
ছুরি হাতে, রক্তাক্ত অবস্থায় তাকে সিঁড়ি বেয়ে নামতে দেখে আশেপাশের সব গার্ড চমকে ওঠে। মুহূর্তেই তারা তাকে চারদিক থেকে ঘিরে ফেলে।
ইশায়া আতঙ্কিত হয়ে পড়ে, তবুও হার মানে না।
তার মাথা ঘুরছে, শরীর দুর্বল হয়ে আসছে, দাঁড়িয়ে থাকার শক্তি ফুরিয়ে যাচ্ছে, তবুও চোখের জেদ অটল।
ভীর দ্রুত নেমে আসে পেছন পেছন।
তার চোখে স্পষ্ট রাগের আগুন।
এই টুকুন শরীর থেকে এতটা রক্ত পড়েছে, এখনো পড়ছে,আর এই দৃশ্যটাই তার মেজাজ খারাপ করছে,
এই মেয়ে যে এত সাহস কোথা থেকে পেলো!
যে কখনো চোখ তুলে তাকায় পর্যন্ত নি, কখনো গলা উঁচু করে কথা বলে নি, সেই মেয়েটা আজ কী করছে!
নিকো এবার আর নিজেকে সামলাতে পারে না। অধৈর্য হয়ে বলে ওঠে,
– তুমি কি মনে করছো তুমি এখান থেকে পালাতে পারবে? এটা বাংলাদেশ না, ইশায়া। এই প্যালেস থেকে বেরিয়ে গেলেও তুমি আর কোনদিন ও বাংলাদেশে ফিরে যেতে পারবে না।
ইশায়া হাতের ছুরি আরও শক্ত করে ধরে।
তার চোখ বারবার নিকো আর ভীরের মাঝে ঘুরে বেড়াচ্ছে।
একদিকে ভয়ংকর দুই পুরুষ, আরেকদিকে গার্ডদের চক্রগূহ।
পিছনে তাকাতে থাকে সে, যেন কোনো গার্ড এসে হঠাৎ ধরে না ফেলে তাকে।
তার চোখে শুধু একটাই সিদ্ধান্ত আজ হয় সে বেরিয়ে যাবে, না হয় মরে যাবে।
নিকো এক ধূর্ত হাসি দিয়ে তাকে উস্কে দেয়, অন্যমনস্ক করার চেষ্টা করে।
–তোমাকে তো আমি সহজ সরল ভেবেছিলাম জ
ইশায়া । কিন্তু এখন দেখছি তুমি তোমার বোনের থেকেও এক কাঠি উপরে। এতদিন কি ভান ধরেছিলেন, ম্যাডাম?
সে হেসে আবার বলে,
–উফফ! তোমাকে দেখে আজ আবার ও তোমার বোনের কথা মনে পড়ে যাচ্ছে। ও যদি থাকতো, তাহলে দুই বোন একসাথে থাকতে পারতে। কিন্তু আফসোস তোমার বোন চলে গেছে। ও চলে যাওয়ায় আমারও খুব খারাপ লেগেছিল।
নিকোর কথাগুলো ইশায়ার মনে ঝড় তোলে।
সাফার কথা মনে পড়ে যায় তার, সেই দিনটার মর্মান্তিক দৃশ্য, শেষবার বুকে আঁকড়ে ধরার মুহূর্ত, আর তারপর তাদের নির্মম প্ল্যান, তার সারা শরীর গা জ্বালিয়ে দেওয়া।
ক্ষোভে তার চোখ জ্বলে ওঠে ইশায়ার সাফার সেই করুন অবস্থার কথা মনে করে, তার মৃত্যুর পিছনে একমাত্র দায়ী ছিল এই নিকো।
ইশায়া ছুরি হাতে নিকোর দিকে তেড়ে যায় তাকে আঘাত করার জন্য।
এটাই ছিল নিকোর অপেক্ষার মুহূর্ত।
ইশায়া তার দিকে আসতেই ভীর পিছন দিক থেকে ঝাপটে ধরে তাকে।
দু’হাতে শক্ত করে চেপে ধরে ইশায়াকে।
ইশায়া ছটফটিয়ে উঠে, মরিয়া হয়ে নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করে,
কিন্তু ভীরের সাথে সে কখনোই পেরে উঠবে না,
নিকো এগিয়ে এসে ইশায়ার হাত থেকে ছুরি টেনে ছিনিয়ে নেয়।
_____ইশায়া নিজের সর্বশক্তি দিয়ে ভীরের বাঁধন থেকে মুক্ত হওয়ার চেষ্টা করছে।
তার ক্ষুদ্র শরীরের প্রতিটি পেশি জোর দিচ্ছে মুক্তি পাবার জন্য, কিন্তু ভীরের শক্তির সামনে সে কিছুই না। তার বাহু যেন লোহার তৈরি অটল, অদম্য।
ভীর এটাই বুঝিয়ে দিচ্ছে সে না চাইলে তার কাছ থেকে কখনোই ছোটার ক্ষমতা নেই তার।
ইশায়া বারবার চিৎকার করছে তাকে ছেড়ে দেওয়ার জন্য,
___আহহহহ ছাড়ুন আমাকে।
আমি শেষ করে ফেলবো এই জা*নোয়ারটাকে,
হঠাৎই ভীর ইশায়াকে ছেড়ে দিয়ে এক ঝটকায় ঠাসসস করে তার গালে একটা থা*প্পড় বসিয়ে দেয়।
ধাক্কায় ইশায়ার মাথা একপাশে হেলে যায়।
ভীর তার গাল শক্ত করে চেপে ধরে ফুঁসে ওঠে,
_বাড়াবাড়ি বেশি করে ফেলতেছিস না তুই! তুই চিনিস আমাকে? আমি কি করতে পারি সেটা তুই ভালো করেই জানিস! আমাকে রাগাস না,না হলে আমি ভুলে যাব তুই কে।
থাপ্পড়ের তীব্রতায় ইশায়ার মাথা ঝিমঝিম করে ওঠে।
চোখের সামনে সবকিছু দুলে উঠছে তার।
ভীরের কোন কথায়-ই তার মধ্যে কোন ভ্রুক্ষেপ দেখা যায় না।
ইশায়া নিকোর দিকে যেতে চাইলে,
ভীর মুহূর্তেই তার হাত চেপে ধরে টেনে নেয়।
ভীর ঠান্ডা, তীক্ষ্ণ চোখে তার কার্যকলাপ লক্ষ্য করছে।
সে দেখতে চাইছে ইশায়া কতদূর যেতে পারে, তার জেদের সীমা কোথায়।
তার ওপরে আজ ভীর ড্রাঙ্ক, আর সেই সাথে ইশায়ার এই অবাধ্যতা যেন তার ভেতরের আগুন দ্বিগুণ করে তুলছে।
ইশায়া এবার রাগে জেদে চিৎকার করে ওঠে,
– ছাড় আমাকে! ছাড় আমাকে জা*নোয়ার,শ*য়তান কোথাকার তোর এই নোংরা হাতে আমাকে স্পর্শ করবি না! রাস্তা…
কথাটা সম্পূর্ণ শেষ করার আগেই ভীর আবার বাজিয়ে থাপ্পড় মারে তার গালে।
ঠাসসসসস!
শব্দটা পুরো হলে গর্জে ওঠে।
___ব্যাথায় ইশায়ার ঠোঁট ভেঙে আসে, ঢোক গিলে কান্না আটকানোর চেষ্টা করছে সে, গাল লাল হয়ে ওঠেছে, কান গরম হয়ে ব্যথায় জ্বলছে।
কিন্তু নিজেকে কোনোভাবে সামলে নেয়।
তার চোখে এক ভয়ংকর আগ্রাসী রূপ ভেসে ওঠে আজ সে দমে যাবে না।
হঠাৎই ইশায়া রাগে এক দলা থুথু ছুঁড়ে মারে ভীরের মুখে।
ভীর চোখ বন্ধ করে নেয়।রাগে সে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলে,
দুই হাত মুহূর্তেই মুষ্টিবদ্ধ হয়ে যায়, শিরায় শিরায় আগুন ছুটছে।
নিকোসহ আশেপাশে দাঁড়িয়ে থাকা সব গার্ড স্তম্ভিত হয়ে যায় ইশায়ার এই দুঃসাহসে।
তাদের চোখে ভয় এমন কাজের পর ভীর ইশায়ার কী পরিণতি ঘটাবে, সেটা ভেবে তারা নিজেরাই শিউরে উঠছে।
ইশায়া চিৎকার করে বলে,
–আমার চরিত্রের দিকে আঙুল তুলিস! তোর কি আছে? তোর চরিত্র বলে কোন জিনিস আছে, তোর জন্মের ঠিক আছে নাকি,তুই
____ভীর মুহূর্তেই ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে।
ইশায়ার শেষের কথাটা শুনে,
ভীর কোনো কথা না বলেই এক ঝটকায় ইশায়ার গলা চেপে ধরে শক্ত হাতে।
তার আঙুলের চাপ এতটাই ভয়ানক, এতটাই নির্মম যে ইশায়ার শ্বাস আটকে আসে।
___ইশায়া হাত বাড়িয়ে ভীরের হাত ছাড়ানোর জন্য ছটফট করে।
হা করে একটু শ্বাস নেওয়ার জন্য।
কিন্তু ভীরের শক্ত মুঠো থেকে মুক্তি পাওয়া অসম্ভব।
ইশায়ার দম বন্ধ হয়ে আসছে।
তার ঠোঁট কাঁপছে, বুক দপদপ করছে, চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে অনবরত।
অক্সিজেনের জন্য তার চোখ লাল হয়ে উঠছে।
কিন্তু ভীরের ভেতরে বিন্দুমাত্র দয়া নেই, মায়া নেই।
তার হাতের চাপ আরও শক্ত হয়ে ওঠে,
প্রতিটি সেকেন্ডে মৃত্যু আরও কাছে টেনে আনছে।
___নিকোর ঠোঁটের কোনে হাসির রেখা।
সে এই ভীরকেই দেখতে চেয়েছিলো।
_____কয়েক সেকেন্ড পর ভীর নিজেই হাত ছেড়ে দেয়।
ইশায়া হাওয়ার জন্য হাঁপাতে থাকে, গলা জ্বলে যাচ্ছে, বুক ফেটে যাবে মনে হচ্ছে তার।
ইশায়া ফ্লোরে বসে পড়ে,গলা ধরে দুইহাতে অনবরত কাসতেছে।
ভীর দেখে সেই দৃশ্য, তারপর ঠান্ডা অথচ ভয়ংকর কণ্ঠে বলে ওঠে,
–মরতে চাস তুই? মরার খুব শখ তোর, তাহলে এত সহজ মৃত্যু আমি তোকে দিব না।
কথাগুলো বলেই ভীর ইশায়ার চুলের মুঠি শক্ত করে চেপে ধরে।
বসা থেকে চুল চেপে ধরে ওঠায় ভীর,ইশায়া কঁকিয়ে ওঠে,ব্যাথায় তার মুখ লাল হয়ে উঠেছে, শরীর নিস্তেজ হয়ে আসছে।
কিন্তু ভীরের চোখে একটুও দয়া নেই শুধু রাগ, জেদ আর নিয়ন্ত্রণ করার অন্ধ আকাঙ্ক্ষা।
ভীর ইশায়ার চুলের মুঠি শক্ত করে ধরে টানতে টানতে নিয়ে যায় বিশাল সুইমিংপুলের কাছে।
তার প্রতিটি টান যেন ইশায়ার শরীরের ভেতরের সাহসটুকু ছিঁড়ে ফেলছে।
ইশায়া নিজেকে ধরে রাখার চেষ্টা করেও পারছে না,
ভীরের হাতের মুঠো এতোই শক্ত যে তার মনে হচ্ছে তার সব চুল উঠে আসবে।
চারপাশের গার্ডরা হতবাক, কিন্তু কেউই সেখানে যাওয়ার সাহস পায় না।
ভীরের চোখের আগুন, মুখের হিংস্রতা সবাইকে পাথর করে দিয়েছে।
কেবল নিকো ধীরে ধীরে ভীরের পিছু যায়,সে জানে আজকের রাতে কিছু ভয়ঙ্কর ঘটতে যাচ্ছে।
কারন ইশায়া আজ যা নিয়ে কথা বলেছে,
এই বিষয় নিয়ে ভীর ছাড় দিবে না।
ভীরের জীবনের সবথেকে দুর্বল জায়গা হল এটা,
নিকোর এই ভেবে স্বস্তি লাগছে,
ইশায়া জারিন চ্যাপ্টারটা একেবারে ক্লোজ হয়ে যাবে।
আবার এটাও ভাবছে এর পর ভীর কি করবে।
____ভীরের কানে তখনো বাজছে সেই কথাটা,
তোর জন্মের ঠিক আছে…
এই একটি বাক্য যেনো তার মাথায় আগুন জ্বালিয়ে দিচ্ছে।
সবকিছু ধ্বংস করে ফেলতে মন চাচ্ছে তার,
ভীর ইশায়ার চুল ছেড়ে দেয়।
তারপর মাথা উঁচু করে আকাশের দিকে তাকায়, বুক ভরে টেনে নেয় লম্বা এক নিঃশ্বাস।
তার চোখ লালচে হয়ে উঠেছে, শিরাগুলো ফেটে বেরিয়ে আসছে।
ইশায়া কেঁপে ওঠে।পানির ধারে এনে দাঁড় করিয়েছে ভীর তাকে।
তার বুকের ভেতর ভয়ের ঢেউ ক্রমেই উথলে উঠছে এখানে তাকে কেন আনা হলো, ভীর কি করতে যাচ্ছে।
____ঠিক সেই মুহূর্তে, ভীর হিংস্রভাবে ইশায়ার গলা থেকে ওড়নাটা এক টানে তার হাতে নিয়ে নেয়।
এরপর কোনো রকম দয়া না দেখিয়ে সেই কাপড় দিয়ে তার হাত দুটো শক্ত করে বেঁধে ফেলে।
___ইশায়া বিস্ফারিত চোখে তাকায় ভীরের দিকে।
তার চোখে আতঙ্ক, বুকের ভেতরে কাঁপুনি, কী হচ্ছে, ভীর আসলে কী করতে যাচ্ছে সে জানে না!
ভীর ঝুঁকে তার চোখের গভীরে তাকিয়ে ঠান্ডা কণ্ঠে বলে,
মরার খুব সখ না তোর? তোর এই সখ আমি আজ পূরণ করবো,
বলে ভীর ইশায়ার দিকে আরেকটু ঝুকে তার ঠোঁটে ছোট্ট একটা চুমু খায়।
ভীর মুখ উঠিয়ে ইশায়ার মুখ টা একবার দেখে তারপর এক ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয় তাকে সুইমিংপুলের গভীর জলে।
____একটা প্রচণ্ড জোরে শব্দ হয়।
ভীর সঙ্গে সঙ্গে গার্ডদের দিকে ঘুরে তাকায়, কণ্ঠে বিষ ঢেলে আদেশ দেয়,আ
পুলের পানি যেন একেবারে বরফের মতো ঠাণ্ডা হয়।
গার্ডরা আতঙ্কিত মুখে ছুটে যায়।
নিকো দাঁড়িয়ে রয় নির্বাক।
ইশায়া সাঁতার জানে না, উপরন্তু তার হাত দুটো শক্ত করে বাঁধা।
বিশাল, গভীর পুলের পানি তাকে পুরোপুরি গ্রাস করে নিচ্ছে।
সে মরিয়া হয়ে ছটফট করছে।
তার চোখে আতঙ্ক ভেসে উঠছে, বুক ফেটে আসছে শ্বাস নিতে না পেরে।
তার নাকে মুখে পানি ঢুকে যাচ্ছে।
এক মুহূর্তের জন্য সে পানির উপরে উঠে হাঁপাতে হাঁপাতে শ্বাস নিতে চায়,
কিন্তু বাঁধা হাত তাকে অসহায় করে ফেলে।
সে আমার বন্দিনী পর্ব ৫৫
বরফের মতো ঠাণ্ডা পানি তার শরীরকে জমিয়ে দিচ্ছে, তার শক্তি নিঃশেষ করে দিচ্ছে।
ইশায়ার ভেজা লম্বা চুলগুলো পানির উপরে ভেসে উঠছে। চোখে অশ্রু আর আতঙ্ক মিশে যাচ্ছে পানির সাথে।
প্রতিটি চেষ্টা ব্যর্থ, প্রতিটি ছটফট তাকে আরও গভীর অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
ভীর সেই দৃশ্য দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছে।
তার চোখে মায়ার লেশমাত্র নেই।
বরং তার চোখের দৃষ্টি ক্রমে আরও শীতল, আরও ভয়ঙ্কর হয়ে উঠছে।
তার ঠোঁটে ক্ষীণ বাঁকা হাসি খেলে যাচ্ছে।
