Home সে আমার বন্দিনী সে আমার বন্দিনী পর্ব ৫৭

সে আমার বন্দিনী পর্ব ৫৭

সে আমার বন্দিনী পর্ব ৫৭
তানিয়া হুসাইন

ভীরের ঠোঁটে খেলা করা পৈচাষিক হাসি হঠাৎই থেমে যায়।
সেই বিকৃত আনন্দ মুহূর্তেই নিভে যায় যখন তার চোখে ধরা পড়ে,
ইশায়ার শ্বাস নিতে বাঁচার জন্য ছটফট করা হাত-পায়ের মরিয়া ছোটা ছুটি ধীরে ধীরে শিথিল হয়ে আসছে।
যে হাত-পায়ের ছড়াছড়িতে কিছুক্ষণ আগেই পুরো সুইমিংপুলের পানি ঢেউ খেলছিলো,
সেই পানির নড়াচড়া এখন থেমে আসছে।
ধীরে ধীরে সব নিস্তব্ধ হয়ে উঠছে,

কেবল ঠাণ্ডা বরফ-শীতল জলের গহীন অন্ধকারে ইশায়া ডুবে যাচ্ছে।
হারিয়ে যাচ্ছে তার কাছ থেকে,
ইশায়ার হাত থেমে যেতে দেখে ভীরের বুকের ভেতর যেন প্রচণ্ড ঝাঁকুনি লাগে।
শরীর মুহূর্তেই কেঁপে ওঠে।বুকের মধ্যে অজানা ভয় বাসে বাধে,
একটা অদ্ভুত আতঙ্ক তার মাথার ভেতর জেকে বসে।
সে বুঝতে পারছে যাকে নিজের শ্বাস, নিজের রক্ত, নিজের প্রাণ মনে করেছে,
যে মেয়েটার প্রতিটি অবাধ্যতা তাকে ক্ষেপিয়ে তুলেছে,
যাকে নিজের করে রাখার জন্য এতো কিছু করা,
সে মেয়ে আজ সত্যিই তাকে ছেড়ে চলে যাচ্ছে!
হারিয়ে যাচ্ছে,

ভীরের মস্তিষ্কে এগুলো আসতেই সে মরিয়া হয়ে ওঠে,
না, ইশায়া তার প্রাণ।
তার সৌন্দর্য, তার অপার্থিব মায়া,
সেই চোখের দৃষ্টি, সেই ঠোঁটের কাঁপুনি, সেই নরম আদুরে মুখ ভীর কল্পনাতেও মেনে নিতে পারবে না, সে আর এগুলো দেখবে না, আর ছুঁতে পারবে না।
বুকে নিতে পারবে না এই আদুরে তুলতুলে নরম শরীরটাকে,
এক মুহূর্তের জন্য সময় থেমে যায় তার কাছে।
তার চোখ রক্তিম, বুকের ভেতর হাহাকার,
আর ঠিক তখনই ভীর ঝাঁপ দেয় সুইমিংপুলে।
পানি ছিটকে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে।
নিকো দাঁড়িয়ে থাকে ভাবলেশহীন মুখে।
তার ঠোঁটে এক অদ্ভুত, তির্যক হাসি খেলে যায়।
কারণ নিকো জানতো এটাই হবে।
সে জানে, ভীর যতই নিষ্ঠুর হোক, তার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো ইশায়া।
আর ভীরের এই দুর্বলতাটাই তার আক্রোশ।

___পানির গভীরে ডুবে যাওয়া ইশায়ার কাছে দ্রুত পৌঁছে যায় ভীর।
তার শক্ত বাহু দিয়ে ওকে আঁকড়ে ধরে নিজের কাছে টেনে আনে।
দু হাত দিয়ে টেনে অচেতন শরীরটা ভীর তার বুকে ঠেসে ধরে সে উপরের দিকে ওঠে।
কিছু সেকেন্ড পর ভীর উঠে আসে পুলের ধারে।
তার ভিজে চুল মুখের সাথে লেগে আছে, নিঃশ্বাস দ্রুত চলছে।
আর তার বুকে নিথর হয়ে পড়ে আছে ইশায়া,
যার চোখ ইতিমধ্যেই বন্ধ হয়ে গেছে।
ঠাণ্ডা ফ্লোরে শুইয়ে দিতেই ইশায়ার মাথা একপাশে হেলে পড়ে।
তার বন্ধ চোখের পাতায় জমে থাকা পানির ফোঁটা, লম্বা পাপড়িগুলো লেপ্টে আছে।
মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেছে,ঠাণ্ডা বরফজলে দেহ জমে গেছে ঠাণ্ডায়।
দুই হাত তখনও শক্ত করে বাঁধা।
ইশায়ার এই অসহায়, অচেতন অবস্থা দেখে ভীরের বুকের ভেতর ঝড় ওঠে।
তার মনে হচ্ছে সবচেয়ে কাছের কিছু সে হারাতে যাচ্ছে।
ভীর জানে এই মেয়েটাকে যদি সে হারায়, সে উন্মাদ হয়ে যাবে।
রাগের বশে সে কী সর্বনাশ ঘটিয়ে ফেলেছে!
ভীর পাগলের মতো ইশায়াকে ঝাঁকাতে থাকে।
তার মাথা কাজ করছেনা,ভীর বার বার ঝাকাচ্ছে ইশায়াকে,
কিন্তু ইশায়ার একটুও নড়চড় নেই,

নিথর হয়ে পড়ে আছে সে।
ভীর দু’হাত দিয়ে ইশায়ার গাল চাপড়াতে থাকে, মরিয়া কণ্ঠে চিৎকার করে ওঠে,
Hey! Heyyy! Open your eyes! উঠো, কথা বলো! তাকাও আমার দিকে! তাকাও, কথা বলো!
Get up, damn it! আমাকে রাগিও না ইশায়া,উঠো বলছি!
তার গলার চিৎকারে সবাই কেঁপে ওঠে।
কিন্তু ইশায়া নিস্তব্ধ, শূন্য, একদম নিশ্চুপ।

দূরে দাঁড়িয়ে থাকা নিকো এই দৃশ্য চুপচাপ দেখছে।
তার ঠোঁটে সেভাবেই একই শীতল ভঙ্গি, কারণ সে আগেই জানতো এটাই হবে।
ভীর যতই রক্ত ঝরাক, যতই শক্তিমান হোক, ইশায়ার কাছে এসে সে দুর্বল হয়ে যায়।
ভীরের হাত কাঁপছে অনবরত, কাঁপতে থাকা হাতে সে ইশায়ার বাঁধন খুলে দেয়।
দু’হাত মুক্ত করেই তার পেটের ওপর দুই হাত চেপে ধরে প্রেশার দিতে থাকে,
কিন্তু তার কোনো সাড়া নেই।
ভীরের নিঃশ্বাস দ্রুত হয়ে ওঠে,

সে আঙুল দিয়ে ইশায়ার ঠোঁট আলগা করে।
তারপর নিজের ঠোঁট ঠেকিয়ে মুখ দিয়ে শ্বাস দিতে শুরু করে।
বারবার।
পাশে দাঁড়িয়ে থাকা হাজারো গার্ড স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকে।
তাদের সেই র*ক্তপিপাসু, নিষ্ঠুর মাফিয়া বস,
আজ একটা মেয়ের জন্য পাগলের মতো করছে।
ভীর ঠোঁটে ঠোঁট লাগিয়ে শ্বাস দিয়েও কিছু হচ্ছে না।
সে আবারও ইশায়ার পেটে জোরে চাপ দেয়।
এভাবে করতে করতে ইশায়ার মুখ থেকে কিছু পানি গড়িয়ে আসে।
ভীর মরিয়া হয়ে আবারও ওর ঠোঁটে নিজের ঠোঁট চেপে ধরে শ্বাস দেয়।
তারপর আবারো আরও জোরে চাপ দেয় ইশায়ার পেটে।

___ইশায়ার বুক হঠাৎ কেঁপে ওঠে,
তার গলা দিয়ে শব্দ বের হয়,গলাভর্তি পানি বেরিয়ে আসে।ইশায়া কাশতে শুরু করে।
____ভীর নিঃশ্বাস ছাড়ে স্বস্তিতে।
এতক্ষণ যেন তার গলার মধ্যে দম আটকে ছিল।
আর এক মুহূর্ত দেরি না করে ভীর ইশায়াকে পাজাকোলে তুলে নেয়।
তার রাগ, ভয়, উন্মাদনা সব মিলিয়ে চোখ লাল হয়ে আছে।
সে দ্রুত সিঁড়ি বেয়ে উপরে ওঠে।
পথে চিৎকার করে ওঠে,
ডাক্তার! এখনই ডাক্তারকে নিয়ে আসো! ফাস্ট!
তার গলা শুনেই গার্ডরা ছুটতে থাকে।
ভীর নিজের রুমে ঢুকে ইশায়াকে বিছানায় শুইয়ে দেয়,সুন্দর করে তার তখনো নড়চড় নেই।
___ভীর তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে মারিয়া এলেনার দিকে তাকিয়ে বজ্রকণ্ঠে বলে ওঠে,
দ্রুত ওর জামা বদলে দাও, দ্রুত করো।
ভীরের চিৎকারে কেঁপে ওঠে সে দ্রুত ইশায়ার কাছে যায়।
ভীরের দুই হাত কাপছে অনবরত।

ভীর এখনো সেই ভিজে কাপড়েই দাঁড়িয়ে আছে, তার দৃষ্টি এক ইঞ্চিও সরছে না ইশায়ার দিক থেকে।
সুইমিং পুলের বরফঠান্ডা পানিতে ডুবে যাওয়ার দরুণ ইশায়ার চোখ-মুখের অবস্থা করুণ,চোখের পাপড়িতে পানি লেগে আছে, ঠোঁট নীলচে, মুখ ফ্যাকাশে। জীবন্ত কোনো স্বর নেই তার শরীরে।
____ডাক্তার ইশায়াকে দেখছেন ভয়ে ভয়ে,
হাত পা কাপছে তার,
ভীরের আদেশে তাকে আক্ষরিক অর্থে টেনে এনেছে এখানে, ডাক্তার কিছু বলতেও পারছে না,সে বুঝতে পারছে ভীরের রাগকে অমান্য করার সাহস এই কক্ষে কারো নেই।
উল্টো কিছু বললে নিজের প্রান খোয়াতে হবে।
ডাক্তার চুপচাপ ইশায়ার হাতে ব্যান্ডেজ করে দেয়।
একবারও ভীরের চোখের দিকে তাকানোর সাহস পায় না।
____ভীর ঠাণ্ডা শরীরে দাঁড়িয়ে সব কিছু পর্যবেক্ষণ করছে, তার চোখ-মুখের কঠোরতা অস্বাভাবিক অন্ধকারে পূর্ণ।
সে কি করতে যাচ্ছিলো এটাই ভাবছে বার বার।
যেন মস্তিষ্ক জুড়ে তীব্র রক্তক্ষরণ হচ্ছে কি হতে যাচ্ছিলো এই ভেবে।
ইশায়া নির্জীব শুয়ে আছে।
শ্বাস আছে কি নেই বুঝতেই সময় লাগছে।
নিঃশ্বাসের গতি খুবই ধীর।
ডাক্তার অনেক্ষন চেক আপ করে ইশায়ার,
আস্তে জিজ্ঞেস করে,
কি…
কি হয়েছে ওনার?

___কিন্তু চারিদিকে এমন নিস্তব্ধতা যে মনে হয় বাতাসও ভয় পেয়ে গলা আটকে ফেলেছে।
গার্ডরা কেউই কিছু বলে না।
ডাক্তারের দ্বিতীয়বার প্রশ্ন করার মতো সাহসও আর থাকে না।
কি বলবে সে,
শুকনো ঢোক গিলে আবার ও কাজে মন দেয়।
তার মুখের অভিব্যক্তি ভয়ে জমে আছে,
—তাপমাত্রা বিপজ্জনকভাবে কমে গেছে।
নীরবতা ভেঙে ভীর ঠাণ্ডা স্বরে সব বলতে শুরু করে,
ইশায়ার আজকের আচরণ, হঠাৎ বদলে যাওয়া, এগ্রেসিভ হয়ে ওঠা, নিজেকে আঘাত করতে চাওয়া,
ভীরের কণ্ঠে রাগ নেই বরং এক ধরনের পাগলামি মেশানো ভয়।

___বলতে বলতে থামে ভীর,
গলা শুকিয়ে আসছে তার,।আজ কি হতে যাচ্ছিল,কি হতো… ভাবতেই মাথা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।রাগে মন চাচ্ছে সব কিছু ধ্বংস করে দিতে।
ডাক্তার এবার গভীর পর্যবেক্ষণে নামে,
অক্সিজেন স্যাচুরেশন চেক করে, ফুসফুসে পানি ঢুকেছে কি না যাচাই করে।
চোখের রিয়্যাকশন, লিঙ্গুয়াল রিফ্লেক্স, মোটর রেসপন্স, সব পরীক্ষা করে দেখে মস্তিষ্কে আঘাত পেয়েছে কি না।
শরীর জমে যাওয়ায় হাইপোথার্মিয়ার লক্ষণ চেক করে।
তারপর মানসিক অবস্থার প্রাথমিক মূল্যায়ন,আত্মহত্যার ভাবনা, অনিয়ন্ত্রিত ভীতি, পূর্বের সুইসাইডাল আচরণ এসবই যাচাই করে।
ডাক্তার কয়েকটে টেস্ট দেয়,প্রয়োজন হলে চেস্ট এক্স-রে করার পরামর্শ দেয়,অ্যাস্পিরেশন হলে তা বোঝার জন্য।
আর তাৎক্ষণিকভাবে সাইকিয়াট্রিক কনসাল্টের কথা বলে।
উনার মেন্টাল কন্ডিশন ঠিক নেই।
এরকম চললে উনি খুব দ্রুত আরও খারাপের দিকে যাবেন। মানসিকভাবে সম্পূর্ণ ভেঙে পড়তে পারেন,পাগল হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনাও আছে।
ওনাকে শান্ত পরিবেশে রাখতে হবে, হাসিখুশি রাখতে হবে।
অতিরিক্ত চাপ, ভয় এসব ওনাকে ভেতর থেকে শেষ করে দিচ্ছে।
ডাক্তার এবার একটু থামে,
তারপর আবার ভয়ে ভয়ে বলে,
উনি বারবার সু*ইসাইডাল এটেম্পট করবেন।
উনার ভিতর থেকে বাঁ*চার ইচ্ছাটা ম*রে গেছে, তাই উনি বারবার নিজেকে শেষ করে দিতে চাইছেন।

____ভীরের মুখ পাথরের মতো শক্ত হয়,
____ ডাক্তার আরও সাবধানে বলে,
উনাকে একা রাখবেন না।
কোনো ট্রিগার, কোনো চাপ একেবারে না।
আমি কিছু মেডিসিন লিখে দিয়েছি, এগুলো দ্রুত আনান।
আর ওনি হয়তো ঠিকমতো খাওয়া-দাওয়া করেন না, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।
দিন দিন তিনি হাইপার হয়ে উঠবেন।
ওনাকে নিরাপদ পর্যবেক্ষণে রাখতে হবে।
মেন্টাল হেলথ টিম দরকার,২৪ ঘণ্টা নজরদারি দরকার।
শান্ত পরিবেশে না নিয়ে গেলে অবস্থার অবনতি হবে।
সব কথা বলেই ডাক্তার প্রায় দৌড়ে বেরিয়ে যায় যেন এই ঘর থেকে যত দ্রুত সম্ভব দূরে যেতে চাইছে।
একজন গার্ড দ্রুত ওষুধ আনতে দৌড়ে যায়।
ডাক্তারের সাবধান বাণীর পর পুরো ঘরে এক অস্বাভাবিক নীরবতা নেমে আসে।
এক ধরনের ভারী উদ্বেগ যেন দেয়ালের গায়ে গায়ে জমে ওঠে।
ভীরের চোখ আরও অন্ধকার হয়ে ওঠে , আরও বিপজ্জনক।
ডাক্তার যা বলে গেছে তা যেন ভিতরে কোথাও নরম কোনো জায়গায় দাঁত বসিয়ে দিয়েছে এমন,
ভীরের মুঠি শক্ত হয়ে ওঠে।
তার কণ্ঠ, তার দৃষ্টি বলছে সে এখনই পৃথিবী উলটেপালটে দিতে পারে, শুধু ইশায়াকে বাঁচাতে।
কিন্তু এই প্রথম সে স্বীকার করছে,
সে তাকে নিয়ন্ত্রণ করলেও, তাকে হারানোর ভয় তাকে গ্রাস করে ফেলছে।

____ইশায়ার হাতে নল লাগানো, স্যালাইন চলছে।
তার দেহ নিস্তব্ধ।
চোখের পাতায় কাঁপুনি নেই, ঠোঁট জমে রয়েছে ফ্যাকাশে রঙে।
ডাক্তারের ইনজেকশন দিয়েছে,
জ্ঞান ফিরবে আরও দুই–তিন ঘণ্টা পর।
ঘরের বাতাস ভারী।
নিস্তব্ধতা যেন দেয়ালেও জমে আছে।
ভীর ধীরে ধীরে ইশায়ার দিকে এগিয়ে আসে।
তার ভেজা জামাকাপড় এখনও শরীরে লেপ্টে আছে,
কিন্তু রাগ হাড়ভাঙা, ছায়া গাঢ়, রাগ তার চোখ দুটোকে আরও তীক্ষ্ণ ও রক্তিম করে তুলেছে।
ইশায়ার নির্জীব, অসহায়, দেহটা দেখে তার ভিতরে অদ্ভুত দ্বন্দ্ব জেগে ওঠে,
রাগে শরীর কাঁপছে,
কিন্তু এই অসুস্থ শরীরটাকে আর কত আঘাত দেবে সে?
কতটুকুই বা সহ্যের মতো আছে তার ভিতরে?
ভীর দাঁতে দাঁত চেপে ধরে।
তার কণ্ঠ নিচু, ঠাণ্ডা, কিন্তু ভিতরে জ্বলন্ত আগুন,

___এতো সহজ আমার রাজ্য থেকে চলে যাওয়া, হ্যাঁ?
এতোই সহজ?
সে ইশায়ার নির্জীব মুখের কাছে ঝুঁকে আসে।
চোখের ভেতর দহন, ভয়, অধিকার,
সব মিলেমিশে কালো ঝড়।
আমি তোকে কোথাও যেতে দিবো না।
কোথাও না। এইখানেই থাকতে হবে তোকে।
আমার কাছে।আমার সামনে।
আমার চারপাশে।
পাগল হলেও এইখানেই আমার কাছেই থাকতে হবে, তোর শ্বাস টা চললেই হবে আমার, আর কিছু লাগবেনা।
মরা এত সহজ না আমার থেকে।
মরে গিয়ে বেঁচে যাবি ভাবছিস, এটা কখনোই সম্ভব না।
আমার হাত থেকে বাঁচতে পারলে তো তুই মরবি?
ভীরের নিশ্বাস গরম হয়ে উঠে।
তার গলা ভেঙে যাচ্ছে ভয়, রাগ, প্রেম আর তীব্র অধিকার সবকিছুর ভয়ংকর মিশ্রণে।

___এই সুযোগ তোকে আর দিবো না।
অনেক বেশি ছাড় দিয়ে দিয়েছি তোকে।
এবার দেখবি তুই ভীরের বন্দিত্ব কাকে বলে।
রাজভীর আলভারেজ ঠিক কী কী করতে পারে। আর কতটা কঠোর হতে পারে।
রাগে ভীর পাশের টেবিলের ওপর থাকা ভারী ফ্লাওয়ার ভাসটা তুলে নেয়,
এক ঝটকায় সে সেটা ছুড়ে ফেলে দেয় মেঝেতে।
মুহূর্তেই টুকরো টুকরো হয়ে যায় ভাস।
ভাঙা কাঁচের শব্দে ঘর কেঁপে ওঠে।
গার্ডরা ভয়ে সিটিয়ে যায়,
কেউ নড়ার সাহসও পাচ্ছে না।
ভীর একবারও পিছনে তাকায় না।
তার বুক ওঠানামা করছে ক্রোধে, মুঠি কাঁপছে।
আর এক সেকেন্ড যদি এই ঘরে থাকে,
সে জানে, সে ইশায়াকে আঘাত করে ফেলবে।
নিজেকে থামিয়ে রাখতে পারছে না।
আবার এই বিধ্বস্ত শরীরটাকে আর স্পর্শ করে আঘাত দিতেও মন সায় দিচ্ছে না।
দুই দিকের সংঘর্ষে তার ভিতরের পৈশাচিক দানব
আর মানুষের হৃদয় একে অপরের গলা চেপে ধরছে।

ভীর শেষবার একবার তাকায়
তার বন্দিনী, তার শ্বাস, তার আসক্তি শুয়ে আছে।
তারপর হনহনিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে যায় ভীর।
পদশব্দ প্রতিটা যেন বিস্ফোরণের মতো ঘরে ধ্বনিত হয়।
গার্ডরা আতঙ্কে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে,কারও সাহস নেই নড়ার।
আর বিছানায় ইশায়া নিস্তব্ধ, জমাট, অচেতন।
তার চারপাশে ছড়ানো অন্ধকার আর ভীরের অদৃশ্য, শ্বাসরুদ্ধ ভালোবাসার ছায়া।
______ভীর রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে নিচে তার অফিস রুমে ঢোকে।
মাথায় খুন চড়ে আছে তার,
মাথা কাজ করছে না একদম শূন্য, অন্ধকার।
আজ…আজ সে এই মেয়েটাকে হারাতে বসেছিল।
মাত্র দুইটা দিন চোখের সামনে ছিল না, আর তার ভেতরটা কী অবস্থায় গিয়েছিল,কু*ত্তার মতাও ছটফট করেছে সে প্রতিটা সেকেন্ড,
ভাবলেই ভীরের বুকের মধ্যে আগুন ছড়িয়ে পড়ে।
আর যদি একেবারে,
না… না… না!
হঠাৎ ভীর টেবিলের উপর থেকে ল্যাপটপটা তুলে পুরো শক্তিতে ছুড়ে মারে।
ধ্বংসস্তুপ হয়ে ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে।
—এটা হবে না!
তার গলা ফেটে যায় রাগে।
কিছুতেই হবে না। এরকম কিছু আমি হতে দেবো না!

____ভীর যা হাতের কাছে পাচ্ছে, একের পর এক সব ছুড়ে ফেলতে থাকে।
কয়েক মিনিটের মধ্যে পুরো অফিসটা যেন একটি যুদ্ধক্ষেত্র হয়ে গেছে।
কাঁচ ভাঙার শব্দ, ধাতব শব্দ, চেয়ার ভেঙে টুকরো
সব মিলে জায়গাটা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে।
বাইরে দাঁড়িয়ে আছে ডিয়েগো।
কিন্তু ভেতরে ঢোকার সাহস নেই তার।
এ অবস্থায় বসকে থামাতে গেলে এক সেকেন্ডেই তার জীবন শেষ হয়ে যাবে, এটা সে খুব ভালোই জানে।
__তবুও ভীর যখন থামার নাম নেয় না,
রুমের ভিতরের আওয়াজ যখন আরও ভয়ংকর হতে থাকে,
ডিয়েগো আর দেরি না করে দৌড়ে ছুটে যায় নিকোর কাছে।

নিকো ছুটে আসে ডিয়েগোর কথা শুনেই।
অফিস রুমে ঢুকে যা দেখে তার কপাল কুঁচকে যায়।
রুমটা যেন বিস্ফোরণের পরের অবস্থা।
আর ভীর,
উজ্জ্বল শ্যামবর্ণ চেহারাটা আজ ভয়ানকভাবে মলিন,
ঘাড়সমান লম্বা চুলগুলো এলোমেলো,
দু হাত থেকে অঝোরে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে,
কাচ ভাঙার টুকরোতে কেটে গেছে।
নিকো তড়িঘড়ি করে সামনে আসে।
ভীরের হাত ধরে থামাতে যায়,
ভীর তাকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দেয়।
নিকো চেঁচিয়ে ওঠে,

__What the hell is wrong with you, Veer?
কি ছেলেমানুষী এগুলো! ভুলে যাচ্ছো তুমি কে!
এভাবে চলতে থাকলে আর বেশিদিন নেই,
তোমার হাতে থেকে তোমার এই সাম্রাজ্যটাই ফসকে যাবে।
মনে রেখো আমার কথা!
মিলিয়ে নিও।
___একটা সামান্য মেয়ের জন্য,
মাফিয়া বস ভীর আলভারেয এর এই অবস্থা দেখে সবাই হাসবে!
___শব্দ শেষ হওয়ার আগেই
ভীর রাগে নিকোর নাক বরাবর ঘুষি মারে।
নিকো দু পা সরে যায় পিছনে।
___বউ হয় আমার!
ভীর শক্ত গলায় জবাব দেয়,
চোখ রক্তলাল এই চোখের ভাষায় যেনো অনেক কিছু বুঝিয়ে দেয় ভীর।

____নিকো স্তব্ধ হয়ে যায়।
চোখ তুলে তাকিয়ে থাকে ভীরের দিকে,
একটা পাগলামির ঝড় বইছে ভীরের চোখে।
ভীর গর্জে ওঠে,
___কিসের সাম্রাজ্য?কিসের মাফিয়া বস?
একটা মেয়েকে নিজের কন্ট্রোলে আনতে পারলাম না! কি আমি? কি আমিইইইইই ভীর!
হঠাৎ-ই ভীর কোমর থেকে রিভলভার বের করে,
শূন্যে তাক করে সবগুলো বুলেট ছুড়ে দেয়।
ধোঁয়া, গন্ধ, গুলির প্রতিধ্বনি
পুরো জায়গাটা কেঁপে ওঠে।
___তারপর ভীর পাগলের মতো অফিস রুম থেকে বেরিয়ে যায়।

ভীর বেরিয়ে যেতেই নিকো গুরুগম্ভীর গলায় বলে,
ডিয়েগো, ওকে ফলো করো।
ওর মাথা ঠিক নেই একদম।
সাথে অস্ত্রও নেই।
যেকোনো মুহূর্তে কিছু ঘটতে পারে।
তার পিছু যাও এখনই!
ডিয়েগো এক সেকেন্ডও নষ্ট না করে দৌড়ে ছুটে যায় ভীরকে অনুসরণ করতে।
____নিকো এক চেয়ারে বসে পড়ে।
পায়ের ওপর পা তুলে, চোখ বন্ধ করে,
এক হাতে কপাল ঘষছে
আজকের এই ঘটনা,
ভীরকে ভেতর থেকে নাড়িয়ে দিয়েছে।
একটু মরে যাওয়ার আশঙ্কা,
শুধু এইটুকুতেই ভীর এমন ভেঙে পড়েছে।

সে আমার বন্দিনী পর্ব ৫৬

নিকোর ঠোঁটের কোনে ধীরে ধীরে তীক্ষ্ণ এক হাসি ফুটে ওঠে।
আর যদি সত্যিই মরে যায়,
সে ফিসফিস করে।
তাহলে ভীর আলভারেয এর কি হবে।
একটা অদ্ভুত, অন্ধকারমাখা, গভীর হাসি তার ঠোঁটে ফুটে ওঠে।

সে আমার বন্দিনী পর্ব ৫৮