সে আমার বন্দিনী পর্ব ৫৮
তানিয়া হুসাইন
আর যদি সত্যিই মরে যায়,
সে ফিসফিস করে।
তাহলে ভীর আলভারেয এর কি হবে।
একটা অদ্ভুত, অন্ধকার মাখা, গভীর হাসি তার ঠোঁটে ফুটে ওঠে।
নিকো মাথায় হাত দিয়ে গভীরভাবে কিছু একটা ভাবছে।
তার চোখে মুখে এক অদ্ভুত অন্ধকার,
—এতো সহজে তোমাকে জিততে দেবো না আমি,
আমাদের এত বছরের গড়ে তোলা সাম্রাজ্য সামান্য একটা মেয়ের জন্য আমি কিছুতেই শেষ হয়ে যেতে দেবো না।
আমাদের পথে যে আসবে তাকে শেষ হয়ে যেতে হবে।
নিকোর বলা শব্দগুলো বিষের মতো ঠান্ডা।
—কিন্তু এখানে সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে,
নিকো কিছুই করতে পারছে না শুধু একটা কারণেই,
ভীর এর জন্য-ই সে কিছু করতে পারছে না,
না হলে যেদিন থেকে মেয়েটার ঝামেলা শুরু হয়েছে,সেদিনই সে নিজের হাতে সব শেষ করে দিতো।
এক সেকেন্ডও দেরি করতো না।
কিন্তু সেই সুযোগ এখন আর নেই।
কারণ ভীর আলভারেয দ্যা মাফিয়া কিং এই মেয়েটার প্রতি ভয়ংকরভাবে দুর্বল।
এমন দুর্বলতা, যা বছরের পর বছর তৈরি শক্তিকে মুহূর্তে ধ্বংস করে দিতে পারে।
এমন দুর্বলতা, যা শত্রুর হাতে তুলে দেয় নিজের বুকের ভেতরের নরম জায়গা।
আর তার এই দুর্বলতা সবার কাছেই দৃশ্যমান।
কিন্তু তাদের সাম্রাজ্যে দুর্বলতা বলে কিছু থাকতে নেই।
শত্রুরা খুব ভালো করেই জানে আঘাত করতে হলে সেই জায়গাতেই করতে হবে, যেখানে ব্যথা সবচেয়ে বেশি।
নিকো নিঃশ্বাস ফেলে।
সে ভাবছে কি করবে এখন সে?
তারা তাদের লক্ষ্য থেকে সরে যাচ্ছে,
একটা মেয়ের জন্য।
যার সাথে তাদের কোন ভবিষ্যৎ নেই, কোন হিসেব নেই, কোন লাভ নেই।
তাদের টার্গেট বহু দূর পর্যন্ত
পুরো বিশ্ব শাসন।
আন্ডারওয়ার্ল্ডের প্রতিটি র*ক্ত, প্রতিটি অ*স্ত্র, প্রতিটি ডিল সবকিছু তাদের হাতের মুঠোয় চায়।
কিন্তু তাদের এই বিশাল সাম্রাজ্যের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে এই মেয়ে।
___আর না,
নিকো মনে মনে আওড়ায়
এভাবে ছেড়ে দিলে চলবে না।
আমাদের মাঝখানে আসা প্রতিটা কাঁটা আমি উপড়ে ফেলবো।
তার গলা ধীরে ধীরে ঠান্ডা হয়ে ওঠে।
কিন্তু, এমনভাবে করতে হবে যাতে ভীর কিছুই বুঝতে না পারে।
এটাই সবচেয়ে কঠিন অংশ,
ভীরকে টপকে কিছু করা।
সে চোখ বন্ধ করে গভীর চিন্তায় ডুবে যায়,
বোনের মৃ*ত্যু, ভাইয়ের কিডন্যাপিং
এতেও ভাঙেনি এই মেয়ে।
তার মাথা নত হয়নি।
—আর কি করবে তাকে?
নিকোর মাথায় ঘুরে বেড়ায় এই প্রশ্ন।
এটাই ভাবছে সে,
হঠাৎ চোখ মেলে তাকায় নিকো,
তার ঠোঁটের কোণে এক ভয়াবহ বাঁকা হাসি জন্মায়।
—হুম!!! বোন তো তোমার আপন বোন ছিল না।
এজন্যই বোধহয় তার মৃ*ত্যু তোমাকে টলাতে পারেনি।
নিকোর কণ্ঠে শীতল ব্যঙ্গ।
রক্ত ছাড়া রক্তের টান কেউ বোঝে না।
ভাবতে ভাবতেই সে পকেট থেকে ফোন বের করে।
কাউকে ফোন লাগায়,
একটা লম্বা, ঠান্ডা, পরিকল্পনাময় কথোপকথন শোনা যায়।
তার গলা নরম, ধীর, কিন্তু ভিতরে ধারালো ছু*রি লুকানো।
অনেকক্ষণ কথা বলে শেষে ফোনটা কেটে দেয়।
তার ঠোঁটের কোনে ফুটে ওঠে বিকৃত হাসি,
একটা ঠান্ডা, নিষ্ঠুর, অমানবিক হাসি।
সে ফিসফিস করে,
এবার দেখি,কি করো তুমি।
_____ভীর রেগে মেগে বেরিয়ে যায় গাড়ি নিয়ে।
রাতটা অদ্ভুতভাবে অন্ধকার,
তীব্র গতিতে সে তার গাড়ি চালাচ্ছে।
স্টিয়ারিং ধরে থাকা তার আঙুলগুলো ফুলে উঠেছে চাপে,
রাগে তার চোয়াল শক্ত হয়ে আছে,
পেশীগুলো টানটান।
দক্ষ হাতে স্টিয়ারিং ঘুরাচ্ছে, চোখে এক ভয়ংকর শূন্যতা।
গাড়ি ছুটে চলছে ঝড়ের গতিতে,
এমন গতি যেন নিজের ভেতরের রক্তপাত থামানোর ওষুধ।
___ডিয়েগো,ম্যাটিয়াস বেরিয়েছে ভীরের পিছু পিছু।
তারা দু’জনেই চেষ্টা করছে ভীরকে ফলো করতে,
কিন্তু ভীরের নাগালই পাচ্ছে না।
তার গাড়ি ধোঁয়ার মতো মিলিয়ে যাচ্ছে আগে।
টায়ারের শব্দ, বাতাসের গর্জন সব মিলিয়ে এক শীতল অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়ছে।
___ভীরকে এতো স্পিডে গাড়ি চালাতে দেখে তাদের আত্মা শুকিয়ে আসছে।
কখন কি ঘটে যায়,
এই ভয়ে ডিয়েগোর গলা শুকিয়ে আসছে।
তারা জানে, ভীরের মাথা ঠিক না থাকলে সে কি করতে পারে।
কয়েক কিলোমিটার পরে ভীরের গাড়ি এসে থামে একটা বারের সামনে।
___বারটা সাধারণ বার নয়
প্রবেশদ্বারটা কালো লোহার তৈরি,
দেয়ালে লাল লাইটে জ্বলছে বারের নাম।
দরজার দুই পাশে দাঁড়িয়ে আছে দু’জন ভারী অস্ত্র হাতে গার্ড,
তাদের মুখে কোন অভিব্যক্তি নেই।
মাফিয়ার নিয়মে, এখানে ঢোকার সাহস কেউ সহজে করে না।
কারণ একবার ভেতরে ঢুকলে
ফিরে যাওয়া সবসময় সম্ভব হয় না।
ভেতরটা একটা অন্ধকার অ্যা*লকোহল আর ধোঁয়ায় ভরা জগৎ।
সাউন্ডবক্সে গর্জে বাজছে,
বেস এত জোর যে মাটিও কাঁপছে।
মঞ্চে মেয়েদের নাচ চলছে,
তাদের শরীর নীয়ন আলোয় ঝলসে উঠছে,
তালের সঙ্গে দুলছে হিপস, চুল, চোখের দৃষ্টি।
আলো-ছায়ার খেলা আর দুলতে থাকা শরীরগুলো
একটা মাতাল করা উষ্ণতা ছড়িয়ে দিচ্ছে পুরো বার জুড়ে।
বিভিন্ন টেবিলে বসে আছে
ড্রা*গ ডিলার, অ*স্ত্র ব্যবসায়ী, আন্ডা*রওয়ার্ল্ডের লোকজন,
___ ভীরের নাম শুনে দাঁড়িয়ে সোজা হয়ে যায় সবাই।
তারা সবাই জানে,
এই জায়গা ভীর আলভারেযের জায়গা।
এখানে ভু*ল মানে মৃত্যু।
ভীরকে দেখেই ম্যানেজার দ্রুত দৌড়ে আসে।
কিন্তু ভীর হাত তুলে তাকে থামিয়ে দেয়,
আসতে দেয় না কাছে।তার চোখ লাল, মুখ ভারী,
চুল কপালের ওপরে আটকে আছে।
সে একটাও কথা না বলে সোজা হেঁটে যায় নিজের জায়গায় VIP লাউঞ্জে,
যেখানে তার জন্য বিশেষ করে তৈরি করা সিট,
অন্ধকার আলো, কালো চামড়ার সোফা,
আর সামনে একটা পুরো শেলফ ভর্তি সীমাহীন ব্র্যান্ডেড ড্রিং*ক।
ভীর বসে,
হাঁফাতে হাঁফাতে এক গ্লাস টেনে নেয়,
বরফ ছাড়া সরাসরি স্ট্রেইট ভ*দকা।গ্লাসটা ঠোঁটে নেয়, এক ঢোকে গিলে ফেলে।তারপর আরেকটা।আরেকটা।
আবার আরেকটা।
ডিয়েগো আর ম্যাটিয়াস বার-এ ঢোকে,
দূর থেকে তাকিয়ে দেখে ভীরকে।তার হাত কাঁপছে।
তার চোখ লাল।তার গলায় ভাঙা শ্বাস।
ভীর একের পর বিভিন্ন জাতীয় নে*শা নিতে থাকে,
ডা*র্ক লিক্যুর, টে*কিলা শট,
একটা কালো বোতল যেটাকে সবাই ডে*ভিল’স ব্লাড বলে যেটা সাধারণ মানুষ নিলে অচেতন হয়ে পড়ে।
মাফিয়ারাই শুধু সেটা পান করে মাথা ঠিক রাখতে পারে।
সাথে একটা সি*গার ধরায়,পুরো লাউঞ্জ ধোঁয়ায় ভরে ওঠে।তার হাতের আঙুলে নিকোটিন জমে যায়।
ভীরের চোখ আরও অন্ধকার, আরও শূন্য হয়ে ওঠে।
মনে হয় সে প্রতিটি চুমুকে নিজের শরীর থেকে রাগ, জেদ, বেদনা বের করে ফেলতে চাইছে।
চারপাশে গান বাজছে,মেয়েরা নাচছে,
কিন্তু ভীরের চোখের দৃষ্টি শুধু এক জায়গায় আটকে অন্ধকারে।
সেই অন্ধকারে ইশায়ার মুখ ভাসছে বারবার,ইশায়া পানিতে ডুবে যাওয়া,অচেতন হয়ে যাওয়া,ছু*ড়ি হাতের সেই দৃশ্য, তারপর নিজেকে আঘাত করা। বার বার ইশায়ার মুখ তার বুকের ভেতর থেকে মাথা তুলে দাঁড়াচ্ছে।
___আস্তে আস্তে চোখ মেলে তাকায় ইশায়া।
আবারো খিচে বন্ধ করে নেয় চোখ তীব্র মাথা যন্ত্রনায়।
মাথাটা যেন ভারী হয়ে আছে। ওষুধের প্রভাবে পুরো মাথা ঝিমঝিম করছে। ইশায়া আবার চোখ খুলতে চেষ্টা করে,পাপড়ি যেন সিসার মতো ভারী। উপরের দিকে তাকাতেই চারদিকের অন্ধকার তাকে গ্রাস করতে থাকে। কিছুই বুঝে উঠতে পারে না প্রথমে।
কিন্তু কয়েক মুহূর্ত পর, স্মৃতিগুলো ক্ষতবিক্ষত ধারালো ব্লে*ডের মতো ফিরে এসে বুক চিরে ফেলে,
পানি, ডুবে যাওয়া, শ্বাস বন্ধ হয়ে আসা, ঠান্ডার অসহ্য কামড়, ভীরের রাগ তারপর পানির অতলে হারিয়ে যাওয়া, জ্ঞান হারিয়ে ফেলা।
ইশায়া চোখ বন্ধ করে নেয়। ঠোঁটের ফাঁক দিয়ে একটা দীর্ঘ, নিঃশ্বাস বেরিয়ে আসে।
___মুক্তি?
না, সে জানে। এই জীবনে আর সেই শব্দটা তার জন্য নেই।
এখান থেকেই হয়তো তাকে শেষ পর্যন্ত মরতে হবে।
হাতের কাটা জায়গাটায় ব্যথা আরও জ্বলে ওঠে,ব্যান্ডেজ করা হাতে স্যালাইনের টিউবটা দুলছে হালকা হাওয়ায়।
সে ভেবেছিল,হয়তো আজ-ই শেষ হবে সবকিছু।
হয়তো আজ-ই মুক্তি পাবে এই বন্দী জীবন থেকে।
কিন্তু না,তার জীবনে এতো সুখ নেই।এখন আর সে কিছুই ভাবতে পারে না।মাথা ভারী হয়ে আছে,
মনের ভেতর নিঃশেষ হয়ে যাওয়া এক ক্লান্তি।
বাঁচার ইচ্ছে নামক জিনিসটা যেন স্তব্ধ হয়ে যাচ্ছে ধীরে ধীরে।
দিন দিন যেন মৃ*ত্যুকে হাত বাড়িয়ে ডাকছে সে।
আপন জন দের চোখে দেখার ইচ্ছাটাও মরে যাচ্ছে দিন দিন।
কষ্ট করে উঠে বসে ইশায়া।রুমজুড়ে ফিকে অন্ধকার।
দেয়ালের কোনায় এক টিমটিমে আলো, ঠিক যেন মরার আগে আগুনের শেষ শিখা।
সেই ক্ষীণ আলোয় বোঝা যায়,
সামনে কেউ বসে আছে।পায়ের উপর পা তুলে।
ইশায়া বুঝতে সময় লাগে না কে বসে আছে এখানে।
যার থাকার কথা সে-ই আছে।
___হঠাৎ সেই পরিচিত, ঠাণ্ডা গলা শোনা যায়,
কি ইশায়া রহমান,জ্ঞান ফিরেছে আপনার?
গলার সুরটা যেন বরফ ঠাণ্ডা সুঁচের মতো ঢুকে যায় ইশায়ার শরীরে।
ইশায়া সাথে সাথে গুটিয়ে নেয় নিজেকে।
মাথা নিচু করে ফেলে।শ্বাস কেঁপে ওঠে তার।
কারণ সে জানে,এই গলাটা ভীরের নয়।
আর একটা নির্মম সত্য হলো
ইশায়া ভীরের থেকেও বেশি ভয় পায় এই জা*নোয়ারটাকে।নিকো রামিরেজ।
_____ইশায়ার কোনো উত্তর নেই দেখে নিকো ধীর গতিতে উঠে দাঁড়ায়।আশেপাশে ঘন নীরবতা।
সে এগিয়ে গিয়ে দেয়ালের সুইচ অন করে।
এক ঝলকে আলোকিত হয়ে ওঠে পুরো রুম তীক্ষ্ণ, নির্মম, সত্যের মতো উজ্জ্বল আলো।
____ইশায়া চোখ তুলে তাকায় না।
মুখ নিচু করে নিজের জামা শক্ত করে মুঠোয় ধরে রাখে, যেন এটাই একমাত্র ঢাল তার।
___নিকো তাকে দেখে হেসে ওঠে,
একটা নোংরা, বিদ্রূপমাখা হাসি।
সে তাকিয়ে থাকে বিছানার উপর বসে থাকা মেয়েটার দিকে,এলোমেলো চুলগুলো বিছানায় ছড়িয়ে আছে অগোছালোভাবে ,ফ্যাকাসে মুখ, তবু অদ্ভুত এক সৌন্দর্য লুকিয়ে আছে তাতে।
এই মেয়েটার জন্য ভীর কতটা পাগল নিকো খুব ভালো করেই জানে।
___নিকী গলা পরিষ্কার করে নিকো বলে,
কি হলো? ভুল বললাম নাকি?
___এক পা এগিয়ে এসে ঠান্ডা কণ্ঠে যুক্ত করলো,
তুমি তো এখন মিসেস ইশায়া ভীর তাইনা।
ইশায়া রহমান নয়।
___ইশায়া কোনো কথা বলে না।মুখ ও তোলে না।
তার শরীরের প্রতিটি কোষ কাঁপছে আতঙ্কে।
নিকো হালকা হাসে, মাথা কাত করে বলে,
ঠিক আছে, কথা বলতে হবে না।
___তোমার জন্য একটা সারপ্রাইজ এনেছি,সেটা অন্তত দেখো।
তার চোখের দৃষ্টিতে এক অদ্ভুত অন্ধকার,একটা গভীর রহস্য।
আলোটা পুরোপুরি জ্বলে উঠতেই নিকো আবারো ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে আসে, ঠোঁটের কোণে এক শয়তানি হাসি।তার চোখে স্পষ্ট রাগ,
আজ এই মেয়ের জেদ ভাঙবে সে।
___নিকোর নির্দেশে দু’জন মহিলা গার্ড এগিয়ে আসে। চুপচাপ, আতঙ্কজনক নীরবতায় তারা একটি বড় পর্দা নামিয়ে দেয়, সামনের দেয়াল জুড়ে।
মুহূর্তের মধ্যেই স্ক্রিনটা জীবন্ত হয়ে ওঠে,
একটা বাড়ির লাইভ ফুটেজ।
ইশায়া প্রথমে বুঝতেই পারে না এটা কি দেখানো হচ্ছে। চোখ ঝাপসা, মাথা ভারী।কিন্তু কয়েক সেকেন্ড পর
ফ্রেমটা পরিষ্কার হতে থাকে।দৃষ্টি গভীর হয় ইশায়ার।
তার নিঃশ্বাস থেমে আসে।
এটা…তার বাড়ি।
যে বাড়ির প্রতিটি ইটের সঙ্গে তার স্মৃতি লেগে আছে।
যেখানে সে বড় হয়েছে,হেসেছে,হেঁটেছে।
গলায় একটা তীক্ষ্ণ ব্যথা উঠে আসে।অজান্তেই চোখের কোনা ভিজে ওঠে।পানির ফোঁটা গড়িয়ে পড়ে গাল বেয়ে।অনেক দিন পর,অসংখ্য নির্ঘুম রাত পর
নিজের পরিবারকে দেখছে।হলরুমে সবাই বসে আছে,
তার বাবা আদনান রহমান,
ইশায়া নিজে নিজে আওড়ায় বাবা।কতদিন পর দেখছে বাবাকে।কত দিন পর ঠিক মনে নেই তার।
কিন্তু বাবাকে ছাড়া সে একটা মুহূর্ত থাকতে পারতো না।নানার বাড়ি খালা বাড়ি মামার বাড়ি কখনো কোথাও গিয়ে একটা রাত পর্যন্ত থাকেনি বাবার জন্য।
সেই বাবাকে কতটা দিন পর দেখছে।
কেমন জানি শুকিয়ে গেছেন আরো।
ইশায়া বার কয়েক ডাকে বাবা বাবা বলে।ভেতরে কি যেন একটা করছে তার।ইশায়া আবারো ডাকে ও বাবা শুনো না আমার কথা,একটু তাকাও না বাবা আমার দিকে।
___মা,আবির ভাই,জান্নাত ভাবি,রাহি সবাই,সবাই আছে।শুধু নেই একজন।ছোট দাদাভাই।
ইশায়ার বুক কেঁপে ওঠে।আদ্রিয়ানের নাম মনে আসতেই সাফার মুখ ভেসে ওঠে,সেই মৃত্যু, সেই শোক।
জান্নাত ভাবি বাচ্চাকে বুকে ধরে বসে আছে।
এই বাচ্চাকে নিয়ে তার কত শখ ছিল কিন্তু একবার ও সে দেখতেই পারেনি।
___ইশায়া হাত বাড়ায় মা কে একবার ছোয়ার ইচ্ছা তার ভেতরটাকে দুমড়ে মুছরে দিচ্ছে।উঠে যেতে চায়,
কিন্তু পারে না।
দুর্বল শরীর, অসুস্থতা, ঝাপসা দৃষ্টি সব মিলিয়ে মনটা শুধু কাঁদে।
তার ভেতরে একটাই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে,
__আমাকে কি ভুলে গেছে সবাই…?
___নিকো একদৃষ্টে তাকে পর্যবেক্ষণ করছে খুব ঠাণ্ডাভাবে।চোখে কোনো দয়া নেই।
হঠাৎ ইশায়ার নজরে পড়ে পরিচিত মুখগুলোর মাঝে একটা অপরিচিত মুখ।
একজন মহিলা, শান্ত হয়ে দাড়িয়ে আছে, ইশায়ার বুকটা হিম হয়ে যায়।ওই তো ভীরের পাঠানো লোক।
____ ইশায়াকে বিচলিত হতে দেখে নিকোর ঠোঁটে ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ে শয়তানি হাসি।সে ফোন তুলে কানে দেয়।
___স্ক্রিনের ভিতরের সেই মহিলা যাকে বাড়ির লোকদের সাথে মিশে রাখা হয়েছে,
ফোন বাজতেই আড়ালে চলে যায়।
___ইশায়া শ্বাস আটকে তাকিয়ে থাকে।
নিকো ঠাণ্ডা গলায় বলে,
যা করতে বলেছি, সেটা করো।একটুও ভুল যেন না হয়।
____ইশায়ার মাথা ঘুরে ওঠে।তার অস্তিত্ব যেন বরফ হয়ে যাচ্ছে।
নিকো ফোন কেটে দেয়।বাঁকা, রক্তশীতল হাসি।
চোখে অদ্ভুত আনন্দের ঝিলিক।
ইশায়ার দম বন্ধ হয়ে আসছে।শরীর কাঁপতে থাকে তার।এখন কী হবে?আবার কি করতে চাচ্ছে তারা,
ভয়ে আতঙ্কে ইশায়া কিছু বলতেও পারছে না।
হঠাৎ স্ক্রিনে দেখা যায়,ওই মহিলা রান্নাঘরে ঢুকছে।
তারপর গ্যা*স সি*লিন্ডারের পাইপে ফুটো করতে থাকে।গ্যা*স বেরিয়ে আসছে তীব্র গতিতে।
___ইশায়ার মনে হয় যেন পৃথিবী থেমে গেছে।
সে চিৎকার করে ওঠে,কিন্তু গলা শুকনো, দুর্বল।
শব্দ বের হয় ভাঙা, কাঁপা, আতঙ্কে,
___কি করছে ও?
থামান! দয়া করে থামতে বলুন ওকে!
আমার পরিবার… ওরা কি করেছে আপনাদের?
ওদের কিছু করবেন না।প্লিজ দয়া করুন,থামান।
ইশায়া বিছানা থেকে নামতে চায়,
কিন্তু পায়ে শক্তি ধরে না।
বিছানা থেকে নামতেই মেঝেতে পড়ে যায় ধপ করে।
নিকো তাকিয়ে থাকে,
তার কোনো তাড়াহুড়া নেই,
তার চোখে মুখে শুধু এক ভয়ংকর আনন্দ।
____ইশায়া তবুও থেমে থাকে না।
হাত দিয়ে মেঝে আঁকড়ে নিজেকে টেনে তোলে, হাঁটতে হাঁটতে টলতে টলতে নিকোর দিকে এগোয়।
তার চোখ ভেজা,গলা কাঁপছে,মৃত্যুর মতো ভয় তার শরীর জুড়ে,
___ও কি করেছে…?
ওরা তো কিছু করেনি,প্লিজ… ওদের কিছু করবেন না।
আমাকে মেরে ফেলুন,তবু ওদের ক্ষতি করবেন না।
তার কণ্ঠে যন্ত্রণার আর্তনাদ।একটা মরিয়া, নিঃস্ব, অসহায় মিনতি।
নিকো ধীরে ধীরে নিচু হয়ে তার কানে বলে,
___এইটাই তো তোমার জন্য সারপ্রাইজ, ইশায়া।
স্ক্রিনে ফুটেজ চলছে, তখনই দেখা যায়,
কাজ শেষ করে মহিলা চুপচাপ ওপরে উঠে যায়, যেন কিছুই হয়নি।
কিছুক্ষণ পর সে আবার নিচে নেমে আসে।
সায়মা বেগম সামনে বসে আছেন,মহিলাটি এগিয়ে এসে সম্মানের ভঙ্গিতে বলে,
___ম্যাডাম…, ছোট সাহেব বলেছেন,তার জন্য একটু কফি করে দিতে।
এই কথা শুনতেই রাহি দ্রুত উঠে দাঁড়ায়,
উৎসাহ নিয়ে বলে,
__আমি বানিয়ে দিচ্ছি!
___কিন্তু মহিলা তাড়াতাড়ি হাত বাড়িয়ে রাহিকে থামিয়ে দেয়।
আমতা-আমতা করা কণ্ঠে বলে,
_না!ছোট সাহেব বলেছেন,বড় ম্যাডামের হাতের কফি খেতে ইচ্ছে করছে.।
___সায়মা বেগম থমকে যান।
অবিশ্বাস, অবাক, আর একটু সুখ তার চোখে ঝলসে ওঠে।
তার ছেলে যে এখন আর তার কাছে কোনো আবদারই করে না।
বাড়িতেই থাকেনা। কিন্তু আগে তার এই ছোট ছেলে ছোট মেয়ের হইহুল্লোরে পুরো বাড়ি মেতে থাকতো।
দুই ভাই বোন এটা খাবে ওটা খাবে এটা নিয়ে সারাটা দিন ঝগড়া করতে থাকতো।
হায়রে কোথায় হারিয়ে গেলে তার সেই দিনগুলো।
চোখ ভিজে ওঠে সায়মা বেগমের।
কখনো ভেবেছিলেন না যে আদ্রিয়ান কোনোদিন আবার তার কাছে কিছু চাইবে।অনেকদিন পর
একটা ছোট, ক্ষুদ্র অনুরোধ তার বুক ভরে তোলে।
সেজন্য তিনি নিজেই অন্য সবাইকে থামিয়ে দিয়ে বলেন,
___আমি-ই করে দিই। ওর ইচ্ছে হয়েছে যখন।
___এদিকে জায়ান হঠাৎ কান্না শুরু করে।
জান্নাত দ তাকে কোলে নিয়ে ওপরে চলে যায়।
জান্নাতের সঙ্গে সঙ্গে আবিরও তাদের রুমে যায়।
____স্ক্রিনের সামনে বসে থাকা ইশায়া,চোখে অশ্রু, শ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে,অসহায় চাহনিতে তাকিয়ে আছে।
তার মা,
দুর্বল দেহ সহযোগিতা করছে না তার।
ইশায়া নিকোর পায়ে দু’হাতে জড়িয়ে ধরে।
তার চিৎকার রুমটাকে কাঁপিয়ে দেয়,
__আল্লাহ!
এরকম করবেন না।
আমার মা,আমার মা! মরে যাবে আমার মা।
এটা করবেন না,চিৎকারের সাথে সাথে কান্নায় তার গলা ভেঙে ফেলছে।অসুস্থ শরীর তার আরো নেতিয়ে পড়ছে।
আমার পরিবার আপনাদের কি করেছে?
ওদের কিছু করবেন না।
আমাকে মেরে ফেলুন, কিন্তু ওদের না প্লিজ! প্লিজ!আমার মা।
___ইশায়ার কান্না দেখে গার্ড রা মারিয়া এলেনার চোখে জল এসে যায়,সে মুখ ঘুরিয়ে নেয়,কিন্তু কিছু করার ক্ষমতা নেই তাদের।
নিকো হাত গুটিয়ে দাঁড়িয়ে আছে,
চোখে শয়তানির ঝিলিক,মুখে সন্তুষ্টির হাসি।
ইশায়ার ভেঙে পড়া, তার কান্না, তার কাতরানো
সবকিছু নিকোর কাছে একটা খেলা।
___ইশায়া নিকোর পা আঁকড়ে ধরে আর্তনাদ করতে থাকে,
আপনারা যা চান বলুন।
আমি করব,সারা জীবন আপনাদের কেনা হয়ে থাকব।
শোনব সব কথা,কিন্তু আমার মাকে মেরে ফেলবেন না,
দয়া করুন।গলা শুকিয়ে গেছে ইশায়ার,শব্দ ভেঙে যাচ্ছে, শরীর কাঁপছে।
নিকো ঠান্ডা গলায় ফিসফিস করে,
_দয়া?
সরি, আমি এসব দয়া-টয়া করতে পারি না।
___এদিকে স্ক্রিনে দেখা যায়,
সায়মা বেগম ম্যাচেস জ্বালাতে যান।
এক সেকেন্ডের মধ্যেই হঠাৎ করেই আ*গুন ছিটকে ওঠে।সায়মা বেগম চিৎকার করে ওঠেন।
___আআআআহহহ!
ইশায়া স্ক্রিনে দেখে
নির্মম আতঙ্কে পুরো শরীর কেঁপে ওঠে।
সে গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে,
___মা!
___ড্রয়িং রুমে তখন রাহি ছিলো।
সায়মা বেগমের চিৎকার শুনে সে ছুটে আসে।
আগুন দেখে স্তব্ধ হয়ে যায়।তারপর প্রাণপণে দৌড়ে যায় তার কাছে,
__মামনি!!
চারদিকে আগুন।
মেয়েটা ভয় পায়, তবুও মায়ের দিকে ঝাঁপিয়ে পড়ে।
___ওই নারী দ্রুত আড়ালে মিলিয়ে যায়,
কেউ টের পাওয়ার আগে।
___উপরের শব্দ পৌঁছাতেই আদ্রিয়ান আর আবির ছুটে আসে।
ইতিমধ্যেই রাহি সায়মা বেগমকে নিজের ওড়না দিয়ে ঢেকে চেপে ধরে।
___মামনি ভয় পেও না, আমি আছি।
আতঙ্কিত গলায় বলে রাহি।
___পুরা রান্নাঘর জুড়ে আ*গুন ছড়িয়ে পড়ছে।
আবির আগুন নেভানোর চেষ্টা করছে,
জান্নাত ফায়ার সার্ভিসে কল দেয়।
আদ্রিয়ান দৌড়ে গিয়ে সায়মা আর রাহিকে টেনে বের করে আনে।
ইশায়া স্ক্রিনে সব দেখে সে আর সহ্য করতে পারছে না,
সে পাগলের মতো চিৎকার করছে,দম বন্ধ হয়ে আসছে,তার চোখ লাল,হৃদপিণ্ড ধকধক করছে।
___মা… মা… রাহি,আল্লাহ বাঁচাও।
রাহি অজ্ঞান হয়ে যায় সঙ্গে সঙ্গে।
আদ্রিয়ান তাকে ধরে।
আবির তার মাকে কোলে তুলে উপরে নিয়ে যায়।
___নিকো ঠোঁট বাঁকিয়ে একটা দীর্ঘ শ্বাস ফেলে বলে,
উফফ… কপাল ভালো।
এই যাত্রায় তোমার পরিবারটা বেঁচে গেলো।
তার মুখের শয়তানি হাসি
চোখে বিষাক্ত সন্তুষ্টি।কিন্তু প্রত্যেকবার যে বেঁচে যাবেন এমন কিন্তু নয়।
এটা শুধু একটা ট্রেলার ছিল, তুমি আজ যেটা করেছ এরপর যদি এরকম কোন কিছু হয়, তাহলে তোমার পুরো পরিবারকে আমি এক মুহূর্তে ধ্বংস করে ফেলব।
আমি ভীর না যে ছেড়ে দিবো।
___এটা জাস্ট তোমাকে বোঝানোর জন্য , সামান্য একটা দৃশ্য তোমার চোখের সামনে তুলে ধরা।
বোনের পরিণতি আশা করি ভুলো নি,যদি পরিবারের ঠিক একই পরিণতি না চাও তাহলে শুধরে যাও।
ভীরের বাধ্য হয়ে থাকবে তোমার পরিবার প্রাণে বেঁচে যাবে। বুঝেছো।
ইশায়া পড়ে যায় ফ্লোরে,লাশের মতো নিথর মাথা ঠিকিয়ে শুয়ে থাকে নিচে।
চোখে শুধু জল আর আতঙ্ক।
সে আমার বন্দিনী পর্ব ৫৭
____নিকো গার্ডকে বলে সবকিছু পরিষ্কার করতে। আর এই মুহূর্তের সিসিটিভি ফুটেজ যেন ডিলিট হয়ে যায়।এই সম্পর্কে ভীর যেন কিছু না জানে।
বলে নিকো বেরিয়ে যায়।
