Home সে আমার বন্দিনী সে আমার বন্দিনী পর্ব ৫৯

সে আমার বন্দিনী পর্ব ৫৯

সে আমার বন্দিনী পর্ব ৫৯
তানিয়া হুসাইন

মারিয়া এলেনা ধীরে ধীরে ইশায়ার দিকে এগিয়ে আসে।
তার চোখে উদ্বেগ কিন্তু মুখ নির্লিপ্তি সে জানে,
এখানে আবেগ দেখানোর অনুমতি নেই।
মাটিতে পড়ে থাকা ইশায়ার কাঁপতে থাকা কাঁধ দেখে সে এক মুহূর্ত থমকে যায়।
ধীরে ধীরে ঝুঁকে তাকে উঠাতে গেলে,
ইশায়া হঠাৎ ঝাঁপিয়ে পড়ে মারিয়া এলেনাকে জড়িয়ে ধরে।
দুই হাত দিয়ে তার ইউনিফর্ম আঁকড়ে ধরে ইশায়া হাউমাউ করে কাঁদতে থাকে,এক অসহায় মেয়ের কান্না রুমের দেয়ালে প্রতিধ্বনিত হয়,যেন প্রতিটি দেয়াল তার কষ্ট গিলে নিচ্ছে, আর ফিরে ফিরে আওয়াজ ছুঁড়ে দিচ্ছে।
এই কান্না,এই ভাঙচুর হওয়া আর্তনাদ,শুনলে যে কারও বুক ভেঙে যাবে।

রুমে থাকা সকল মহিলা গার্ড তাকিয়ে আছে।
তাদের কারো চোখ লাল,কেউ ঠোঁট কামড়ে কান্না থামাচ্ছে।
কিন্তু একটা কথাও তারা বলতে পারছে না।
কারণ এখানে সহানুভূতি দেখানো মানেই মৃত্যু।
এই সাম্রাজ্যে একটা ছোট ভুলের পরিণাম মৃত্যু।তাই তারা তাদের কাজে মমনোযোগ দেয়।
কিন্তু কান বন্ধ করতে পারে না,ইশায়ার এই আর্তনাদ শোনার পর কোন গার্ডই ভিতর থেকে স্বাভাবিক থাকতে পারছে না।
মারিয়া এলেনা কাঁপা গলায় বলে,

___ম্যাম আপনি অসুস্থ। প্লিজ শান্ত হোন।এভাবে করলে আপনার আরো ক্ষতি হবে।
বস দেখলে রেগে যাবেন। প্লিজ, ম্যাম, থামুন।
কিন্তু ইশায়া শুনছে কোথায়?
তার চোখ লাল, মুখ ভেজা, ঠোঁট কাঁপছে,সে শুধু বারবার চিৎকার করছে,
__মা… মা… মা… আমার আম্মুকে বাঁচান।
ওরা আমার আম্মুকে মেরে ফেলবে,আমার আপুইই কে ও শেষ করে দিয়েছে।
আমার আ..ম্মু।
মারিয়া এলেনা অসহায় গলায় আবার বলে,
___ম্যাম, প্লিজ আপনি অসুস্থ প্লিজ থামুন।
কিন্তু ইশায়ার কান্না থামছে না।
বরং বাড়ছে।তার দম বন্ধ হয়ে আসছে, শরীর কাঁপছে, মাথা ঘুরছে,তবু সে চিৎকার থামাতে পারছে না।
মারিয়া এলেনা আর রানিয়া দু’জন মিলে ইশায়াকে জোর করে উঠিয়ে বিছানায় বসায় ।
কিন্তু ইশায়াকে থামাতে পারেনা কেউ।
চিৎকার করতে করতে তার গলা ভেঙে আসে এরপর
ও তার আহাজারি থামে না।

চারদিকে রক্তলাল আলো, ভারী সাউন্ড,
মাফিয়ার আড্ডাখানার সমস্ত উচ্ছৃঙ্খলতা ছড়িয়ে আছে চারদিকে।
আজ ভীর নিজের সীমা ছাড়িয়ে গেছে।
টেবিলের ওপর ছড়িয়ে আছে বিভিন্ন ধরণের নে*শা,
গ্লাসে কালো রঙের ড্রিংক ,ট্রেতে সাজানো সাদা পা*উডারের লাইন,নে*শার ধোঁয়ায় মেঘলা হয়ে আছে পুরো ভিআইপি কেবিন।
ভীরের চোখ আধবোজা, মাথা দুলছে।
হাতের গ্লাস থেকে ড্রিংক ছলকে পড়ছে।কিন্তু সে তোয়াক্কা করছে না, কারণ আজকের দিনটা আজকের সব ঘটনা তার মাথায় ঘুরছে,ঘুরে ঘুরে মগজকে ছিঁড়ে ফেলছে।
যত নে*শাই করছে,কোনোটাই ইশায়াকে ভুলাতে পারছে না।একদিকে ভয়ঙ্কর রাগ,অন্যদিকে অসহায় আবেগ,এই দুই মিশে ভীরের শরীর যেন জ্বলছে।
তার চোখের সামনে বারবার সেই মুখ,ইশায়ার কান্না, অসহায়তা,সেই স্রেফ মায়ায় ভরা দুই চোখ,যে চোখ দুটো তার নে*শা ছাপিয়ে তাকে দগ্ধ করছে।
সে টলতে টলতে উঠে দাঁড়ায়।টেবিলে হাত রেখে নিজেকে সামলায়,কিন্তু চোখে সেই এক মুখ এসবে তার কিছু হবে না,সে ভালো করেই বুঝতেছে নে*শা দিয়েই তাকে নে*শা কাটাতে হবে।তাকে দেখতে ইচ্ছে করছে,
ছুঁতে ইচ্ছে করছে,সে মেয়েটাই তার নে*শা।মেয়েটার বন্ধ হয়ে যাওয়া সেই চোখ আজকে তাকে ভেতর থেকে নাড়িয়ে দিয়েছে।

ভীর এক মুহূর্তের জন্য এটা ভাবতে পারছে না আজকে যদি ওর কিছু হয়ে যেত তাহলে কি হত।
এরপর কি হতো কি করতো সে।তার এত কারি কারি টাকা, পাহাড় সমান সম্পদ সবকিছু দিয়েও তো ওকে আর ফিরিয়ে আনতে পারত না।ও না থাকলে ভীর কিভাবে থাকবে।এই মুখ আর দেখবে না ওই ঠোঁটের তিলে সে আর হারাবে না।
ওই গলায় সে আর মুখ গুজে ঘুমাতে পারবেনা।ওই চুলের ঘ্রান নিতে পারবেনা,বুকে না জড়ালে যে তার ভেতর খালি খালি লাগে।তার শান্তি আর তার থাকবে না।এই একটা জায়গায় ই- তো সে শান্তি পায়।না কিছু হতে দিবো না আমি।আমার কাছেই থাকবে তুমি আমার বুকের মধ্যিখানে,যেখানে বাতাস ও স্পর্শ করতে পারবে না তোমাকে। আমার পাখি, আমার শান্তি আমার হয়েই থাকবে আজীবন, আমার ঘড় আলো করে।ভীর এর প্রান হয়ে।ভীর নিজেকে সামলে এগিয়ে যায় সামনে।

___ডিয়েগো দূর থেকে ভীরকে দাঁড়াতে দেখে দ্রুত এগিয়ে আসে।
ভীর তাকায়ও না ঠান্ডাভাবে ডিয়েগোকে পাশ কাটিয়ে এগিয়ে যায়।
ম্যাটিয়াস দ্রুত এগিয়ে এসে বলে,
___বস, প্লিজ।আপনি এখন ড্রাংক।এ অবস্থায় ড্রাইভ করলে এ*ক্সিডেন্ট হবে।
আমি ড্রাইভ করি, আপনি পিছনে বসুন।
___ভীর থামে।কিছু বলে না।
শুধু নিঃশ্বাস ফেলে গাড়ির পেছনের সিটে উঠে বসে।
ডিয়েগো আর ম্যাটিয়াস সামনে বসে গাড়ি স্টার্ট দেয়।
গাড়ি রাতের অন্ধকার চিরে ছুটে যায়,বারের আলো পেছনে মিলিয়ে যায়।মাফিয়ার এক ভয়ঙ্কর রাত সামনে এগোয়।
শেষে গাড়ি এসে থামে,ভীরের প্যালেসের সামনে।
প্যালেসের বিশাল গেট পেরিয়ে ভীর ভেতরে ঢোকে।
স্ট্রিপ লাইটের নরম আলোয় তার ছায়া দুলছে,পদক্ষেপ ভারী, মাথা ঝাপসা টলতে টলতে সে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে থাকে। প্রতিটি ধাপ যেন তার ভার বহন করতে পারছিল না।
আজকের নে*শা এবং দিনের সমস্ত রাগ তার শরীর আর মস্তিষ্ক দুটোই অস্থির করে তুলেছে।
রুমের দরজা খুলতেই অন্ধকার।শুধু বেডসাইডের ম্লান আলোটা ঘরের এক কোণাকে ছুঁয়ে আছে।সেই ক্ষীণ আলোয় দেখা যায় বিছানায় কুঁকড়ে শুয়ে থাকা এক নারী। ইশায়া।
___ভীর নিঃশব্দে দরজা বন্ধ করে ভিতর থেকে লক করে দেয়।
____কান্না করতে করতে শরীরের সব শক্তি ফুরিয়ে ইশায়া কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছে সে নিজেও জানে না।
তার মুখের পাশে শুকিয়ে যাওয়া অশ্রুর দাগ,চোখের নিচে কালচে ছাপ,হাতের ক্ষতগুলো লাইটের নরম আলোয় স্পষ্ট।
এই কয়েকটা দিনের মধ্যেই যেন তার সমস্ত প্রাণশক্তি নিংড়ে গেছে।

___ভীর ধীরে ধীরে ইশায়ার দিকে এগিয়ে আসে।কিছুক্ষণ নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে তাকিয়ে থাকে,
তার চোখ গভীর।নে*শার লালচে ভাবের ভেতরে একটা দহন আছে।
ইশায়ার হাতের আঘাত, চোখের নিচের কালচেভাব,
শরীরের হাড্ডি বেরিয়ে আসছে,
ভীরের বুকের ভেতর কেমন যেন মোচড় দেয়।
এত ক্ষমতা এত প্রতিপত্তি সবকিছু তার,কিন্তু তবুও কেন এই মেয়ের এই অবস্থা।
সে ঝুঁকে আসে। শ্বাসরুদ্ধ তীব্রতায় ইশায়ার শুকনো ঠোঁটে খুব নরমভাবে স্পর্শ করে,একটুখানি মায়া মেশানো,অজ্ঞাত এক অধিকারবোধে ভরা চুম্বন।
তারপর ইশায়ার এলোমেলো চুলগুলো সরিয়ে
কানের পেছনে গুঁজে দেয়।
বিছানায় উঠে আসে ভীর,ঘুমাবে সে,গত কয় টা রাত নির্ঘুম কেটেছে তার ঠিক নেই, মেয়েটাকে হারিয়ে পাগলের মতো ছুটেছে আর আজ যখন এইই…. না আর ভাবে না ভীর,কাছে ঝুঁকে ইশায়ার গলায় মুখ রাখে তার শ্বাস গরম,আলতো ছোঁয়ায় ইশায়ার কাঁধ একটু কেঁপে ওঠে।ভীরের ঠোঁট ছুঁয়ে যায় ইশায়ার গলার নরম ত্বকে।দুহাতে ঝাপটে ধরে ভীর ইশায়াকে।

___অপ্রত্যাশিত স্পর্শেইশায়ার ঘুম ভেঙে যায়।
অন্ধকার চারপাশে কেবল শ্বাসের শব্দ।
__সেই মুহূর্তে ইশায়ার মনে পড়ে যায় আগের ঘটনা,
ভয়, অপমান, আতঙ্ক সব মিলেমিশে মাথা ঘুরিয়ে ওঠে।ইশায়া ছটফটিয়ে উঠে বসার চেষ্টা করে,শ্বাস কেঁপে ওঠে ভয়ে।এই ভেবে এখানে অন্য কেউ,
___ভীর থেমে যায়।চোখ মেলে তার কণ্ঠ ভারী, ক্লান্ত, নেশায় মোড়া,
ডোন্ট মুভ, জান,ঘুমাতে দাও।আমি খুব ক্লান্ত।
___এই গলার স্বর,ইশায়ার শরীর থামিয়ে দেয়।
এটা নিকো নয়,এটা ভীর। ইশায়ার চোখে পানি চলে আসে,কিন্তু এবার ভয়ের সঙ্গে অদ্ভুত স্বস্তি মিশে।
ইশায়ার মাথার নিকোর কথাগুলো ঘুড়তে থাকে,নিকোর করা কাজ। তাকে বলে যাওয়া প্রত্যেকটা কথা।ইশায়ার হাত থামিয়ে দেয়।

___ইশায়া আর বাধা দেয় না দেখে ভীর থমকে যায়।
সে মাথা তুলে তাকায়,ইশায়ার কাঁপতে থাকা ঠোঁটে খুব আস্তে একটি চুমু এঁকে দেয়।
ধীরে, অস্পষ্ট স্বরে বলে,
__আই লাভ ইউ!!!
ব্যথা করছে?ঠিক হয়ে যাবে,Don’t worry.
আমি আছি।সব ঠিক হয়ে যাবে। আমি সব ঠিক করে দিবো।
___ইশায়া হতবাক।এই মানুষটা যে রাগে সব থামিয়ে দিতে পারে সে আজ এত নরম কেমন করে?
এতো দিনের দূরত্বে ইশায়াকে কাছে পেয়ে ভীর মেতে ওঠে ইশায়াকে নিয়ে, তার মস্তিষ্ক আজ তার নিয়ন্ত্রনের বাইরে।আবার ও ইশায়ার ঠোঁটে একটু গভীর চুমু এঁকে দেয়,এবার আগের চেয়ে বেশি দৃঢ়।তারপর অত্যন্ত ধীরে ইশায়ার পিঠে হাত রেখে তাকে একটু তুলে নিজের দিকে টেনে নেয়।ইশায়ার দুই হাত তুলে নেয় তার গলায়,যেন তাকে নিজের বৃত্তের মধ্যে আটকে ফেলছে ধীরে ধীরে, ইশায়ার জামার চেন নামিয়ে দেয়, কাঁধের উপর থেকে কাপড় সরিয়ে ভীর সেখানে মুখ রাখে আলতো চুম্বনে ভালোবাসা জুড়ে দেয় ধীরে, নরমভাবে,কিন্তু নিজের মতো করেই সে ডুবে যায় ইশায়ার ভেতরকার পৃথিবীতে তার অধিকার,তার নেশা, তার স্বত্বা হয়ে।

___প্যালেসের করিডোর নিস্তব্ধ।নিকো ইসাবেলার রুমে ঢুকেই টের পায়,রুম ফাঁকা।লাইট জ্বলছে, জানালায় পর্দা দুলছে,কিন্তু ইসাবেলা নেই।
এক মুহূর্তে তার ভ্রু কুঁচকে যায়।চোয়াল শক্ত হয়ে ওঠে।
___এতো রাতে আবার কোথায় গেলো এই মেয়ে?
সে তো সিনালোয়া যায় নি।এখানেই থাকার কথা,
____ক্ষুব্ধ শ্বাস ফেলে সে ফোন বের করে নিকো লোকেশন ট্র্যাক চালায়।এক মুহূর্ত পর স্ক্রিনে জ্বলজ্বল করে ওঠে লোকেশন,একটা নাইট ক্লাব।
___নিকোর চোখ লালচে হয়ে ওঠে রাগে।
পারফেক্ট।বেলা আজ তো তোকে ছাড়বো না।
___নিকো দরজা ধাক্কা মেরে বেরিয়ে যায়।
___নাইট ক্লাবের বিকট আলো, বেজে ওঠা মিউজিক,
রঙিন লাইটে নাচতে থাকা ভিড়,সব কিছুই নিকোর কাছে আরো বিরক্তিকর লাগছে,কারণ সে জানে
এখানে-ই আছে বেলা।
নিকো ভিড় ঠেলে এগোতে থাকে,চোখ শিকারির মতো চারদিকে ঘুরছে।
হঠাৎই দেখে ফেলে তাকে।
ইসাবেলা। একটা ছেলের সঙ্গে ডান্স ফ্লোরে ঘনিষ্ঠভাবে নাচছে।

___সেই মুহূর্তে নিকোর মাথায় রক্ত চড়ে যায়।
তার চোখ লাল,
এক সেকেন্ডও দেরি না করে
কমরের হোলস্টার থেকে রি*ভলভার বের করে
সরাসরি শূন্যে গুলি ছুঁড়ে।
মহূর্তেই ক্লাবের গান থেমে যায়।মানুষ চিৎকার করে সরতে থাকে।ভিড় সরে গিয়ে নিকোর সামনে একটা ফাঁকা জায়গা তৈরি হয়।
সবাই আতঙ্কে তাকিয়ে থাকে
___কিন্তু ইসাবেলা বিস্ময়ে জমে যায়।নিকো?
তার চোখ বিস্ফারিত।সে তো জানেই না নিকো আর ভীর দেশে ফিরে এসেছে।
নিকোর চোখ ততক্ষণে বেলার উপর রাগান্বিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সে।
___নিকো এগিয়ে এসে বেলার হাত চেপে ধরে একটানে কাছে টেনে নেয়।
___ইসাবেলা চমকে ওঠে।
নিকো, কী আচরণ এটা? ছাড়ো আমাকে!
এভাবে সিনক্রিয়েট করার মানে কি। এটা কোন ধরনের অসভ্যতা।

___নিকো দাঁত চেপে বলে,
অসভ্যতা?অসভ্যতা তুমি করেছো, বেলা।
আমাদের নাম, আমাদের ক্ষমতা জেনেও এভাবে মাঝরাতে ক্লাবে এসে অন্য ছেলের সাথে নাচো?
ইসাবেলা চিৎকার করে উঠে, তুমি কে আমাকে এভাবে টানার?
___নিকোর চোখ ভয়ংকরভাবে সরু হয়।
___আমি কে? সেটা তোকে পরে বুঝাচ্ছি। বলে বেলার হাত ধরে টানতে থাকে।
যে ছেলেটার সাথে ইসাবেলা নাচছিল,সে এগিয়ে আসে,
ইসাবেলার অপর হাত ধরে বলে,
___হে! নো মানে নো বুঝতে পারো না?লেট হার গো!
____এই একটা বাক্যই
নিকোর চোখে মৃ*ত্যুদণ্ড হয়ে দাঁড়ায়।
দ্বিতীয় সেকেন্ডের মধ্যেই নিকো ঘুরে দাঁড়িয়ে
ছেলেটার মুখ বরাবর ঘুষি মারে।
ছেলেটা ছিটকে পড়ে যায়, মেঝেতে ধপ করে।
ইসাবেলা চিৎকার করে,

___নিকো! স্টপ!থামো!
কিন্তু নিকো থামে না।সে হিংস্রভাবে ছেলেটার কলার ধরে তাকে আবার উঠিয়ে আরেকটা আঘাত করে,একের পর এক আঘাত করতেই থাকে।
____ইসাবেলা চেষ্টা করে তাকে থামাতে,
কিন্তু নিকোর শক্তিতে কোথায় সে পেরে ওঠে,নিকো, প্লিজ!
নিকো গর্জে ওঠে,
___তুই চুপ কর বেলা!
সবাই তাকিয়ে আছে,কেউ নড়ছে না,কেউ সাহস করছে না এগিয়ে যেতে।
নিকো রাগে ফুঁসতে ফুঁসতেইসাবেলার হাত ধরে টান দিয়ে বলে,
___চল।এক মুহূর্তও আর এখানে না।
ইসাবেলা কাঁপতে থাকা কণ্ঠে বলে,

___নিকো, এটা অপমান! এভাবে তু…?
নিকো চোখ কুঁচকে তার দিকে তাকায়,
যা করেছো তার পরিণামই মাত্র শুরু, বেলা।
নিকো ইসাবেলাকে টেনে হিঁচড়ে ক্লাব থেকে বের করে আনে।
ভিড় দু’দিকে সরে যায় কেউ বাধা দেয় না।
বাইরে এসে এক ধাক্কায় বেলাকে গাড়ির ভিতরে ফেলে দেয় নিকো।
দরজা বন্ধ করে নিজে ড্রাইভিং সিটে উঠে গাড়ি স্টার্ট দেয়,
গাড়ির ভেতরের আলোতে ইসাবেলার মুখটা ফ্যাকাসে হয়ে উঠেছে।
রাগে, অপমানে সব মিলিয়ে তার বুক ধড়ফড় করছে।
হঠাৎ বেলা চিৎকার করে উঠে,
___গাড়ি থামাও! নামবো আমি!
___স্টিয়ারিং শক্ত করে ধরে থাকা নিকো এক চিলতে হাসি দিয়ে বলে,আজ আমাকে সহ্য করতে পারছ না?স্টিয়ারিং ঘুরাতে ঘুরাতে নিচু গলায় বলে,
কিন্তু মনে নেই সেইদিন? তোমার ইচ্ছেতেই তুমি আমার কাছে এসেছিলে।নিজে থেকে এসেছো তুমি,বাধ্য করিনি আমি কিন্তু এখন বের হবে আমার ইচ্ছায়।
আমার রাজ্যে ঢুকে আমার অনুমতি ছাড়া কেউ পালাতে পারে না, ইসাবেলা।
__বেলা তীব্র চোখে তাকিয়ে বলে,সেই সময় আমার প্রয়োজন ছিল।প্রয়োজন শেষ তোমার কাজও শেষ।এখন আর তোমার৷ প্রয়োজন নেই আমার।

___নিকো শ্লেষ মেশানো হেসে বলল,
প্রয়োজন নেই?নাকি আমাকে সহ্য করার মতো ক্ষমতা নেই?
___বেলা তাকে কেটে দেয়, গলায় শীতল তাচ্ছিল্য
আমি ইসাবেলা আলভারেয।
তোমার মতো চাকরের কাছে থাকার প্রশ্নই আসে না।
ওটা শুধু এক রাতের আকাঙ্ক্ষা ছিল।শেষ।
গাড়ি থামাও।
__নিকো এবার পুরোপুরি চুপ।চোখ দুটো অন্ধকার হয়ে ওঠে।পেডাল চাপিয়ে আরও স্পিড বাড়ায়।
বেলা আবারো বলে,
তোমার সারাজীবন ভীরের গোলামি করতেই যাবে।তুমি হকে ভীরের বেতন ভুক্ত কমচারী।
তোমার নিজের কি আছে।
এই সাম্রাজ্যের সব কিছু ভীরের, তুমিএকজন চাকর৷ আর একজন চাকর ইসাবেলার সাথে?হাস্যকর।

____নিকোর গলার শিরা ফুলে ওঠে। চোখ লাল, রাগে জ্বলন্ত হয়ে উঠেছে সে।
বেলা ঠান্ডা গলায় আরও এক ধাপ এগোয়,
তোমার লেভেলের কাউকে খুঁজে নাও।ভীরের প্যালেসে অনেক আছে।কাউকে বেছে নাও তোমার মতো।
হঠাৎ গাড়ি বিকট শব্দে থেমে যায়।সামনের দিকে ধাক্কা খেয়ে এগিয়ে পড়ে বেলা।
___পরের মুহূর্তেই নিকোর হাত তার চুলে।
এক টানে তাকে নিজের দিকে ঘোরায়,চোখে যেন আগুন জ্বলছে।
____চুপ,গর্জে ওঠে সে।
পর মূহুর্তেই তার ঠোঁটের রূক্ষ চাপ বেলার মুখে পড়ে এটা কোনো ভালোবাসার চুম্বন ছিল না,এটা ছিল দখল, রাগ, অপমানের জবাব।
___বেলা ছটফট করে ওঠে, চিৎকার করার চেষ্টা করে,
নিকো তাকে ছাড়ে না তার শক্ত বাহুতে বেলাকে বেঁধে রাখে।
গাড়ির পেছনের সিটের দিকে ঠেলে নিয়ে যায় তাকে।
বেলার নিশ্বাস কাঁপছে, ভয় চোখে ছায়ার মতো।
___নিকো! হাত ছাড়ো!
কিন্তু নিকো যন্ত্রমানবের মতো,কোনো কথা শোনার অবস্থায় নেই।
বেলা ধস্তাধস্তি করে শুরু করে, নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করলে নিকো তার কোমরের বেল্ট খুলে বেলার হাত বেধে দেয়,
নিকো শক্ত গলায় বলে,নেক্সট আমাকে অপমান করার আগে দু’বার ভাববে।
তার গলা গভীর, বিপজ্জনক শান্ত।
___বেলা সরে যেতে চাইলে নিকো তার দুই কাঁধ চেপে ধরে ঝাঁপিয়ে পড়ে তার উপর।নিকোর চোখে তখন শুধু একটাই কথা,তুই আমার।নিজের অজান্তেই আমার জীবনে এসে ফেসে গেছো।এখন এখান থেকে বেরোবার কোন পথ অবশিষ্ট নেই।
আর বেলার চোখে,আতঙ্ক,প্রতিবাদ।আর নিস্তব্ধ ভয়।
___গাড়ির জানালার বাইরে মেক্সিকোর রাত নীরব অন্ধকার।

_____চারপাশ শূন্য, ধূলোয় ভরা রাস্তাহীন প্রান্তর।
রাতের আকাশ গভীর কালো, চাঁদের আলোও নিভে গেছে যেন।
ইশায়া দৌড়াচ্ছে।তার নিঃশ্বাস ছিন্নভিন্ন, চোখ ভয়ে বিস্ফারিত।সে দিকবেদিক তাকাচ্ছে
কোথাও নিরাপত্তা নেই, কোথাও আলো নেই,
শুধু আতঙ্ক আর অন্ধকার।
দূর থেকে গাড়ির হেডলাইটের আলো চারদিক ফালা কেটে ছুটে আসে। ঝড়ের মতো গর্জে ওঠে ইঞ্জিনের শব্দ,ভীরের গাড়ি।পেছনে তার সৈন্যরা।আরো চার-পাঁচটা গাড়ি তাকে ঘিরে অবরোধ তৈরি করছে।
ইশায়া পিছনে তাকায় ভীরের চোখে ধরা পড়ে তার ব্যাকুল দৃষ্টি।ওই দৃষ্টি যেন তাকে ছিঁড়ে খেতে চায়,
যেন বলে পালিয়ে লাভ নেই।
দৌড়াতে দৌড়াতে ইশায়া হোঁচট খায়।ধূলা উড়ে যায়, আর সে মাটিতে ধপ করে পড়ে ।
তার নিঃশ্বাস ভারী, আতঙ্কে কাঁপা কিন্তু সে আবার উঠে দাঁড়ায়।গাড়ি গুলো ঘিরে ফেলেছে তাকে,ইশায়া দৌড়াতে চায়।
কিন্তু বাম দিকে দৌড়ালে গার্ডরা ঢাল তৈরি করে দাঁড়ায়।ডান দিকে গেলে আরও চারজন অ*স্ত্র হাতে পথ আটকে রাখে।
সামনে এগোতে গেলে কালো পোশাকে দাঁড়ানো এক বৃত্ত তাকে ঘিরে ফেলে।মাটি, আকাশ, বাতাস সবকিছুই যেন ইশায়াকে আটকে দিয়েছে।
এমন মুহূর্তে ভীর গাড়ি থেকে নামে। তার পায়ের শব্দ ধীরে ধীরে কাছে আসে একটা শিকারী জন্তুর মতো।
প্রতিটি পদক্ষেপে ইশায়ার রুহ কেপে উঠছে।

___ভীরের ঠোঁটে সেই পরিচিত নিষ্ঠুর বাকা হাসি।
___হেই,মাই লিটল প্রিন্সেস,ভীরের কণ্ঠে নরমতা নেই,
আছে অধিকার আর দখলের প্রচণ্ড বল।
আমার থেকে পালিয়ে বাঁচা যায় না।তোমার শেষ গন্তব্য আমি।তোমার জীবন আমার।তুমি আমার।আমার বন্দিনী হিসেবেই তুমি বাঁচবে।
___ভীর ধীরে ধীরে এগিয়ে আসে।ইশায়ার চোখ ভয়ে বড় হয়ে ওঠে কিন্তু তবুও সে পিছোতে থাকে,যেন শেষ সীমাটুকুও ধরে রাখতে চায়।
ভীর হাত বাড়িয়ে দেয়,তার কব্জিতে ধরার আগেই
রাতে আগুনের মতো ঝলসে ওঠে কয়েকটা গুলির আলো।চার দিক স্তব্ধ হয়ে যায়।সময় থেমে থাকে।
ইশায়ার শরীর কেঁপে ওঠে,পরপর চার-পাঁচটা বু*লেট এসে বিঁধে তার বুক, কাঁধ, পেট জুড়ে।লাল রক্ত ছিটকে এসে পরে ভীরের চোখে-মুখে পরে।
ভীর থমকে যায়।চোখের সামনে যেন তার দুনিয়া ভেঙে পড়ে।

___ইশায়া নিচে পড়ে যাওয়ার আগেই সে ঝাঁপিয়ে ধরে,দুই হাতে শক্ত করে বুকে চেপে ধরে রাখে।
না… না… না!ভীরের কণ্ঠ কেঁপে যায় তার বুকের হাড় ভেঙে যাচ্ছে।
ডিয়েগো, নিকো, গার্ডরা অ*স্ত্র হাতে ওদিকে ছুটে যায়।
কেউ বলে স্যর আক্রমণকারী।
___কিন্তু ভীর কাউকে শুনছে না।তার সবকিছু জমে গেছে শুধুই এক মুখে ।ভীর তার গালে থাপড়াতে থাকে,
গলার আওয়াজ ভেঙে আসে,তবুও বলে,
জান! জান, চোখ বন্ধ করিস না।আমি আছি।আমি আছি এখানে কিছু হবে না তোর।আমি থাকতে তোর কিছু হতে দেব না।
___ ইশায়ার শরীর রক্তে ভেসে যাচ্ছে।
তবুও তার ঠোঁটে হালকা হাসির রেখা।
সে ধীরে ধীরে বলে,
এবার… মুক্ত আমি আপনার খাঁচা থেকে,মুক্ত! আর আমাকে বন্দি করতে পারবেন না। আ…আ.ম
তার কণ্ঠ দুর্বল, ভাঙা শব্দগুলো শেষ হওয়ার আগেই তার মাথা ভীরের কাঁধে হেলে পরে।নিঃশ্বাস থেমে যায়।
___ভীরের শরীর এক ঝটকায় স্থির হয়ে যায়।
তার পর মুহূর্তেই,

সে আমার বন্দিনী পর্ব ৫৮

___নাআয়ায়ায়ায়ায়ায়ায়ায়া ইশায়া!
পুরো প্যালেস ভীরের সেই এক চিৎকারে কেঁপে ওঠে।
চোখ মেলে ঘুম থেকে উঠে বসে ভীর।
চোখে আতঙ্ক, বুক ধড়ফড় করছে,মনে হচ্ছে ঠিক এইমাত্রসে সত্যি সত্যিই ইশায়াকে হারিয়ে ফেলেছে।
___অন্ধকারের ভেতরেও সে কাঁপা গলায় ডাকে ইশায়া।

সে আমার বন্দিনী পর্ব ৬০