Home সে আমার বন্দিনী সে আমার বন্দিনী পর্ব ৬০

সে আমার বন্দিনী পর্ব ৬০

সে আমার বন্দিনী পর্ব ৬০
তানিয়া হুসাইন

অন্ধকারের ভিতরেও সে কাঁপা গলায় ডাকে ইশায়া।
ভীর হঠাৎ ঝটকা দিয়ে উঠে বসে।চোখ দুটো লাল, শ্বাস ভারি।
স্বপ্ন না, স্বপ্ন না তার কাছে একেবারে বাস্তব মনে হয়েছে।
মদের অতিরিক্ত নেশায় মাথাটা ধকধক করছে, গলা শুকিয়ে কাঠ হয়েগেছে।
ভীর বড় বড় শ্বাস নিতে থাকে,
ভীর হাত বাড়িয়ে বিছানায় খোঁজে ইশায়াকে।
কিন্তু তার হাত শুধু ঠান্ডা শূন্য চাদর ছুঁয়ে ফিরে আসে।
ভীরের কপালে ভাঁজ পড়ে।

দুই পাশ, বালিশ, কম্বল সব দিকে তাকায়।ইশায়া নেই।
মুহূর্তেই তার বুকটা ধড়ফড় করে ওঠে,
যেন কেউ ভেতর থেকে মুঠো করে ধরছে হৃদপিণ্ড।
এই মেয়েকে হারানোর ভয় তাকে প্রতিটা সেকেন্ডে পাগল করে দিচ্ছে।
দিন দিন প্রতিদিন তাকে গ্রাস করে ফেলছে এই ভয়।
ভীর তাড়াহুড়ো করে রুমের লাইট অন করে,
উজ্জ্বল আলোয় রুমটা পরিষ্কার, নিস্তব্ধ। ইশায়ার কোনো চিহ্ন নেই।
ভীরের
নজর পড়ে রুমের দরজা ভেতর থেকে লক করা।
এর মানে ইশায়া রুম থেকে বের হয়নি।
একটু স্বস্তি আসে বুকে।কিন্তু কোথায় সে?

___ভীর ধীরে ধীরে ওয়াশরুমের দিকে হাঁটে।
আগে থেকেই তার মস্তিষ্কে হাজারটা ভয় খেলা করছে।
___ওয়াশরুমের ভেতর থেকে পানির শব্দ আসছে।
সে থেমে যায়।একটা ভারী নিঃশ্বাস চাপে। হয়তো শাওয়ার নিচ্ছে নিজেকেই বলে সে।
কিন্তু তখনও সে বুঝতে পারে না,কেন এই মেয়েটার প্রতিটা ছোট ছোট আচরণে তার পুরো সিস্টেম কাঁপতে থাকে।
কেন সে এতো ভয় পায় হারানোর, কেন ভেতরটা এভাবে ছটফট করে।
হয়তো তার জীবনে হারানোর মতো এই একটা জিনিসই আছে।
নেশায় ভার হওয়া মাথা আরও কুয়াশার মতো লাগতে থাকে।
অনেক্ষন পর ও ইশায়াকে বের হতে না দেখে,
একসময় ভীর ওয়াশরুমের দরজার সামনে এসে দাঁড়ায়।
দরজায় নক করতে দেখে দরজা খোলা,চাপানো ছিলো
ভীর ভেতরে ঢোকে,আর ঠিক তখনই তার পুরো শরীর শীতল হয়ে আসে।
সে জমে যায় জায়গাতেই।
ভীরের শিরদাঁড়া বরফের মতো সোজা হয়ে যায়।

___ঠান্ডা মেঝের ওপর ইশায়া নিথর পড়ে আছে।
তার ওপর শাওয়ারের পানি পড়ছে।
কপাল থেকে রক্ত মিশে পানির সাথে ধীরে ধীরে গড়িয়ে যাচ্ছে।
মাথা বোধহয় বাথটাবের কোণায় লেগেছে,হয়তো ইচ্ছে করে করেছে,ভীর বুঝতে পারে।
ইশায়ার ঠোঁট নীলচে।
চোখ বন্ধ।শরীর কাঁপছে না।
এক মুহূর্তের জন্য ভীরের হৃদপিণ্ড সত্যি থেমে যায়।
সে দৌড়ে গিয়ে ইশায়ার পাশে বসে পড়ে।
তার হাত কাঁপছে যেটা কখনো হয় না, কোনোদিন না।
সে ইশায়ার মুখ ধরে দেখে
ইশায়ার শরীর বরফের মতো ঠান্ডা।
কতক্ষণ ধরে পানি পড়ছে সে বুঝতেই পারেনি।

__ইশা…য়া
তার গলা কেঁপে ওঠে।
এই নামটা উচ্চারণ করার ভেতরেও কেমন একটা ব্যথা জমে আছে।
এক সেকেন্ড নষ্ট না করে ভীর ইশায়াকে কোলে তুলে নেয়।
তার বুক গরম, কিন্তু কোলে থাকা মেয়েটা জমে যাচ্ছে
এই বৈপরীত্য ভীরের ভেতরটা আগুনে ফেলে দেয়।
রুমে এনে বিছানায় শুইয়ে দ্রুত ভেজা কাপড় বদলে
শুকনো কাপড় জড়িয়ে দেয় দ্রুত, তার শক্ত মাফিয়া হাতগুলো এত অসহায় কখনো দেখায়নি।
তার চোখ, মুখ সব জায়গায় শুধু একটাই জিনিস লেখা ভয়, নিখাদ ভয়,এই মেয়েটাকে হারানোর ভয়।
ভীর আগেই ডিয়েগোকে কল করে বলেছিল,
ডাক্তার নিয়ে আসতে।
তার কণ্ঠে আজ রাগ নেই।

___দরজায় নক পড়তেই ভীর দরজা খুলে দেয়।
ভীর আজ অদ্ভুতভাবে অস্বাভাবিক শান্ত।
এমন শান্ত, যেটা দেখলে বোঝা যায় ভেতরে আগ্নেয়গিরি ফুটছে।
ইশায়ার বারবার নিজের ক্ষতি করার চেষ্টা
ভীরকে ভেতর থেকে শিকড় উপড়ে ফেলছে।
সে জানে না আর কি করবে,
কিভাবে রাখবে এই মেয়েকে নিজের কাছে সুরক্ষিত।
কিভাবে বাঁচাবে তাকে।
তার ভয়, তার রাগ, তার ভালোবাসা সব একসাথে ভীরকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে এমন জায়গায় যেখানে সে কখনো আগে যায়নি।

___ভীর দাঁড়িয়ে আছে
ইশায়ার দিকেই তাকিয়ে,
আর মনে মনে বলছে
হারানোর মতো আমার জীবনে তুই ছাড়া আর কিছুই নেই।
তোকে হারাতে দেবো না আমি।
____গত দিনের সেই ডাক্তারই এসেছে,
তার মুখ কঠিন,এতো সুন্দর ফুটফুটে ফুলের মতো মেয়েটা কতটা অত্যাচারের শিকার হলে এরকম হতে পারে মেয়েটার জন্য মায়া লাগে তার।
লাগবে নাই বা কেনো।চাদের মতো সুন্দর মেয়েটা এই জা*নোয়ারের হাতে পরছে।
___ভীর চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে ইশায়ার বিছানার পাশে।
তার হাত দুটো শক্ত হয়ে আছে যেনো নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে মুহূর্তেই কিছু ভেঙে ফেলবে।
___ডাক্তার ইশায়ার কপালের ক্ষত দেখে,
ডাক্তার ধীরে, গম্ভীর গলায় বলে,
মিস্টার আলভারেয পরিস্থিতি দিন দিন খারাপের দিকে যাচ্ছে ।উনি নিজে নিজেই মাথায় আঘাত করেছেন। আঘাতটা শারীরিকভাবে মাঝারি হলেও, পরিস্থিতিটা খুবই বিপজ্জনক।

___ডাক্তার হাতে থাকা ব্যান্ডেজ দিয়ে ইশায়ার কপাল জড়িয়ে দিতে থাকে।
হাতের প্রতিটা নড়াচড়া সতর্ক কিন্তু তার মুখের অভিব্যক্তি বলছে, বিষয়টা মোটেই সাধারণ নয়।
সে ইশায়ার শরীর ছুঁয়ে দেখে
শরীরটা এখনো ঠান্ডা, তাপমাত্রা স্বাভাবিকের অনেক নিচে।
ডাক্তার আরও গম্ভীর হয়ে ওঠে।
দীর্ঘক্ষণ পানিতে ভিজে থাকার কারণে উনার শরীরের টেম্পারেচার অনেক কমে গেছে।হাইপোথার্মিয়ার মতো অবস্থা হয়েছিল।
এতে ঝুঁকি খুবই বেশি ব্রেন ফাংশন স্লো হয়ে যায়, হার্ট রেট কমে যায়, শ্বাস কমে যেতে পারে।
তিনি ভীরের দিকে তাকান,
উনার মাথায় আঘাতটা দেখেই বোঝা যায় ইচ্ছে করেই করেছেন।
বারবার নিজের ক্ষতি করা একটা অত্যন্ত সিরিয়াস সিম্পটম।

___ভীরের চোখ রক্তচোখা হয়ে ওঠে, কিন্তু সে এবারও চুপ।
ডাক্তার আরও পরীক্ষা করে বলে,
উনি এখনো অচেতন, কিন্তু রেসপন্স আছে।
তবে মানসিক অবস্থাটা আগের থেকেও খারাপ এর দিকে যাচ্ছে।
__ডাক্তার গভীর নিঃশ্বাস ফেলে ভীরের দিকে তাকিয়ে বলে,
আমি আপনাকে আগেও বলেছি, উনার মেন্টাল কন্ডিশন ঠিক নেই।উনি বার বারএকটা জিনিস করতে চাইছেন।উনার বেঁচে থাকার ইচ্ছা খুব কম।যখন একজন বারবার নিজের শরীরকে আঘাত করে, নিজেকে কষ্ট দেয়, এটা ‘Self-H*arm Behavior’ এর মধ্যে পড়ে।
তার কণ্ঠ আরও গম্ভীর হয়,চিকিৎসা না হলে এই অবস্থা দিন দিন আরও খারাপ হবে।
এগুলোকে ক্লিনিক্যালি বলে
Deliberate S*elf-Harm
Su*icidal Ideation Severe Psychological Trauma-এর সিম্পটম।
যারা এই অবস্থায় থাকে তারা নিজের শরীরের প্রতি কোনো দায়িত্ববোধ রাখে না।কোনো ঝুঁকি বোঝে না।নিজেকে আঘাত করে, ঠান্ডা-গরম সহ্য করে, যেখানে সেখানে পড়ে থাকে কারণ তাদের ভেতর বেঁচে থাকার ইচ্ছেটাই ধীরে ধীরে মরে যায়।

___উনি একদম সেই স্টেজে পৌঁছে যাচ্ছেন।
উনাকে ২৪ ঘণ্টা নজরে রাখতে হবে। এক সেকেন্ডের জন্যও একা রাখা যাবে না।
উনার মেন্টাল স্টেট এখন ‘High Risk Zone’.
যদি সত্যিই উনাকে বাঁচাতে চান উনার মানসিক চিকিৎসা শুরু করতেই হবে।ডিলেই করলে বিপদ আরও বাড়বে।
উনি এখন নিজেই নিজের জন্য বিপদজনক হয়ে দাঁড়িয়েছেন।
আর আমার ভাষায় বললে
উনি S*uicide Attempt এর প্রথম স্টেজে এসে দাঁড়িয়েছেন।
___ভীর তখনও নিঃশব্দ দাঁড়িয়ে চোখ স্থির, চোয়াল শক্ত, পুরো শরীর জোড়া বরফের মতো জমে আছে।
ডাক্তারের প্রত্যেকটা শব্দ তার মেরুদণ্ডে আঘাত করছিল।
____এই ধরনের রোগীরা নিজের শরীরকে শাস্তি দেয়।
নিজেকে আঘাত করে, আঘাত ঢাকার আগে আবার আঘাত করে এটা কোনো সাধারণ মানসিক সমস্যা না।
___ভীর নীরব।
কিন্তু নীরবতার নিচে যেন আগ্নেয়গিরি ফুঁসছে।

___আজকে হয়তো ক্ষতটা কম ছিল অথবা আপনি ছিলেন বলে বড় ধরনের কিছু হয় নি।কিন্তু ভবিষ্যতে এর থেকে অনেক ভয়ঙ্কর হতে পারে।
___ভীরের চোখে লাল, সে কিছু বলে না শুধু ফ্যাকাশে মুখে ইশায়ার দিকে তাকিয়ে আছে।
___উনার মেডিকেল ট্রিটমেন্ট লাগবে শুধু শারীরিক না, মানসিকও।
___উনাকে এই বাড়িতে রাখাটা এখন সত্যিই রিস্ক।
তার নিজের জন্যও
এবং আশেপাশের মানুষের জন্যও।
___এই কথা বলার সাথে সাথেই ভীরের মাথা ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল।
তার চোখে এমন এক বিষাক্ত শীতলতা যা মানুষকে মুহূর্তে হ*ত্যা করতে পারে।

___ডাক্তার সাহস করে বলেন,
উনাকে হসপিটালাইজড করা উচিত।
সাইকিয়াট্রিক ওয়ার্ডে ২৪ ঘণ্টা স্পেশাল কেয়ারে থা….
____এরপরই ভীরের দৃষ্টি তার চোখে পড়ে।
ওই দৃষ্টি যেন খু*নের আগের নীরব দৃষ্টি।
মেক্সিকোর আন্ডারওয়ার্ল্ডে যাকে দেখে সবাই ভয়ে নিঃশ্বাসও নিতে ভুলে যায়।
___ডাক্তার বাক্য শেষ করতে পারলেন না।
তার ঠোঁট শুকিয়ে আসে,
তিনি বুঝতে পারছেন আর এক শব্দ বেশি বললে হয়তো আজ এখান থেকে বেঁচে ফিরবেন না।
___ডাক্তার ঢোক গিলতে গিলতে বললেন,
মেডিসিন আগের গুলোই কন্টিনিউ করবেন,
আর দয়া করে উনাকে একা রাখবেন না।

___তারপর আর এক সেকেন্ডও বসেন না তিনি দাঁড়ান।
___ডাক্তার কে যেতে দেখে
ডিয়েগো কে উদ্দেশ্য করে ভীর বলে,
ডাক্তারের এখানে থাকার ব্যবস্থা করে দাও
__ডাক্তার অবাক হয়ে যায় ভীরের কথা শুনে।
তিনি কিছু বলতে গেলে,
___ডিয়েগো বলে নিজে আর নিজের ফ্যামিলির ভালো চাইলে চুপচাপ যেটা বলা হয়েছে সেটা করুন।
___ডাক্তার এনা আর কিছু বলতে পারেন না।
তিনি জানেন ওদের কথা না মানলে এর পরিণতি কি হবে।
___ডিয়েগোর সাথে বাইরে চলে যান তিনি।
____দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দটুকুই শুধু রুমের নীরবতা ভেঙে দেয়।
____ভীর একটুও নড়ে না।
তার চোখে ছায়ার মতো ভয়।
তার বুকের ভেতরে চাপা বাজের মতো ধকধকানি
___সে আমার কাছ থেকে পালাতে চায়, নিজেকেও শেষ করতে চায়।
এই ভাবনা তাকে ছিঁড়ে ফেলছে।
দেয়ালের দিকে তাকানো চোখে আগুন জ্বলে,

কিন্তু ইশায়ার দিকে তাকালে সেটা ভয় আর অসহায়তায় পরিণত হয়।
সে ধীরে, খুব ধীরে বিছানার ধারে বসে,
তার আঙুল কাঁপছে।
এই মেয়েকে হারানোর ভয়
তার পায়ের নিচের জমি টেনে নিয়েছে।
যে ভীর সবকিছু ধ্বংস করতে পারে, আজ সেই মানুষটা একটি মেয়েকে হারানোর ভয়ে কাঁপছে।

নিকোর গাড়ির ভেতর ভারী নীরবতা।
বেলার বুক উঠানামা করছে ব্যথায়, চোখ দুটো লাল কাঁদেনি, কিন্তু ব্যথা আর অপমান ঠিকই গিলে রেখেছে।
সে কিছুই বলেনি, রাগ জেদ সব নিজের মধ্যে চেপে রেখেছে।
কারণ সে জানে, একটা ভুল শব্দ মানে নিকোর আরও আগ্রাসন, আরও নিষ্ঠুরতা।
এ লোকটা মুখে হাসে আর সেকেন্ডের মধ্যে মানুষ মেরে ফেলার মতো হিংস্র হয়ে ওঠে।
তার মাথা এখনো সিটের পাশে ধাক্কা লেগে ধকধক করছে, হাত কাঁপছে, কিন্তু সে জানে নীরবতা এখন তার একমাত্র অস্ত্র।
___বেলার শুধু একটাই কথা মাথায় আসছে বার বার,
সেদিন কেনো সে এই জানোয়ারটার কাছে গেল?
কেনো নিজের পায়ে নিজে কুড়াল মারলো।
___বেলা শুধু এটাই ভাবছে এই জা*নোয়ার এর হাত থেকে রেহাই পাবে কি করে,
ভীর… ভীর তো নিকোকে কিছু বলবে না।
ভীরের জন্য মম ও কিছু করতে পারবে না।
অর্থাৎ বেলা একা। সম্পূর্ণ একা।একাই করতে হবে যা করার।
নিকো আড়চোখে তাকায় ইসাবেলার দিকে,
তারপর ঠোঁট বাঁকিয়ে ধীরে বলে,

— কি ম্যাডাম, কিছু বলবেন না?
তার কণ্ঠে ব্যঙ্গের সাথে একধরনের তাচ্ছিল্য মেশানো। এনার্জি শেষ নাকি?
___বেলা ভেতরে ভেতরে ফুসছে।ব্যথায় দেহ কাঁপছে, কিন্তু ভাঙল না।
ধীরে ধীরে সে মাথা তুলে তাকাল।
চোখে আগুন, দাত কটমট করে চেপে ধরা, এক ফোঁটা শব্দও বের করল না।
___নিকোর হাসিটা আরও গভীর হলো।
ওহ নীরবতা? ঠিক আছে। ভালো কথা বলবেন না।চুপ থাকাই শ্রেয় তোমার জন্য।
নিকো কোন কথাতেই কান দিলো না বেলা।
তাকিয়ে রইল শূন্যে।
এই অসভ্যের দিকে আর একটা শব্দও অপচয় করবে না।
ব্যথা সহ্য করবে, অপমান গিলে নেবে, কিন্তু তার কাছে ভাঙবে না।
গাড়ির ভেতর এই নীরবতা
নিকোর কাছে মজা,আর বেলার কাছে জ্বালা।

_____আবির পুলিশের সাথে কথা বলছে।
স্যার, ঘটনার পর থেকে আমাদের বাসায় কাজ করা মেয়েটা সে আর নেই। হুত করেই গায়েব।
তার গলা যেন ভারী হয়ে আসে।
আমরা সন্দেহ করছি এই আগুন এটা দুর্ঘটনা না। ওই মেয়েটা কিছু করেছে।
___ওদের বাড়িতে থাকা মেয়েটির নাম, ঠিকানা, মোবাইল নম্বর
সবই আবির পুলিশের হাতে দেয়।
___অফিসার বলেন,
আমরা মেয়েটিকে যত দ্রুত সম্ভব খুঁজে বের করার চেষ্টা করবো, মি. রহমান।
সায়মা বেগম ঠিক থাকলেও রাহির গরম ধাতব ওভেনের পাশে লেগে তার বাঁ হাতের চামড়া উঠে যায়।

___রাহির সাথে হাসপাতাকে জান্নার ছিলো।
তেমন গুরুতর ও আঘাত না হওয়ায় রাহিকে আজ রিলিজ দিয়ে দিবে।
___আদ্রিয়ান কে কেভিনে ঢুকতে দেখে জান্নাত বেরিয়ে আসে।
___আদ্রিয়ান গিয়ে বসে বেডের পাশের টুলে বসে,
রাহি আদ্রিয়ান কে দেখে,খুশি হয় সে আদ্রিয়ান তার কাছে আসায়।
আদ্রিয়ান গলা খাকারি দিয়ে বলে,
___তুই যা করেছিস রাহি, আমি কখনো ভুলবো না।
তুই না থাকলে যে কাল কি হতো।
___রাহি হালকা হাসে
তার ব্যান্ডেজ মোড়া হাতটা আদ্রিয়ানের হাতের উপর রাখে।
হঠাৎ এরকম স্পর্শে আদ্রিয়ান তাকায় রাহির দিকে।
রাহি নরম গলায় বলে,আমি যা করেছি, মামনির জন্য করেছি।আর তুমি কেন আমাকে ধন্যবাদ দিচ্ছো?
আমি কি বাইরে মানুষ, আদ্রিয়ান ভাই?

রাহির হাসি ছিল সহজ,কিন্তু চোখের গভীরতা অন্য কিছু বলছিল।
আদ্রিয়ান আর কিছু বলে না।সে শুধু তাকিয়ে থাকে রাহির দিকে কৃতজ্ঞতার দৃষ্টিতে ।
তার চোখে কৃতজ্ঞতা, অপরাধবোধ, আর এক অদ্ভুত নরম কোমলতা।
আর রাহি একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে আদ্রিয়ানের মুখের দিকে।এই মানুষটাকে দেখার তৃষ্ণা, স্বাদ হয়তো কোনোদিনই শেষ হবে না তার।
কিন্তু তার মনে একটা কথা বাজে এই মানুষ টা আমার হবে না,দূর থেকে ভালবেসে যেতে হবে আজীবন।
___আদ্রিয়ান বলার মতো কিছু পায় না,
এদিক ওদিক তাকাচ্ছে,রাহির এরকম তাকানোতে সে বিব্রত হচ্ছে।
__কিছু সময় পর আদ্রিয়ান বলে,
খালা আসছেন।
__রাহি বলে,
হুম।
তুমি চুল দাঁড়ি কাটোনা কেনো আদ্রিয়ান ভাই।তোমাকে পুরো বন মানুষ লাগছে।

___রাহির মুখে এই কথা শুনে কেনো জানি আদ্রিয়ানের ঠোঁটের কোনে হাসি ফুটে ওঠে,
চলে যায় সে পুরো মধুর স্মৃতিতে।
___এই জংলি,বন মানুষ কোথাকার যে আর কি হালাত বানিয়ে রেখেছিস তোকে দেখেই রাগ উঠছে আমার।
সর সামনে থেকে সরে যা তুই।
___সাফার কথায় আদ্রিয়ান অসহায় মুখ করে বলে,
কাল কাটিয়ে নিবো বেবস,এরকম করছিস কেনো,একটু কাছে আয়।বলে আদ্রিয়ান সাফার হাত ধরতে নিলেই সাফা রাগে কটমট করে তাকিয়ে বলে,
___চুপ থাক।একদম ছুবি না আমায়।
আগে বন মানুষ থেকে মানুষ হয়ে আয়।
তোকে দেখেই আমার রাগ উঠছে।
পুরো কথা মনে হতেই হাসে আদ্রিয়ান।

___রাহি এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে আদ্রিয়ানের দিকে।
কতটা দিন পর এই মুখে হাসি দেখছে।
__কি হলো হাসছো কেনো।
রাহির কথায় আদ্রিয়ানের ধ্যান ভাঙে,
বাস্তবতা সামনে আসতেই দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে ভিতর থেকে।
___আদ্রিয়ান বলে,
দেখার মানুষ নেই,বলার মানুষ নেই,রাগ করার মানুষ নেই,অভিমান করার মানুষটা নেই।
আমার সবকিছুর দিকে নজর রাখার মানুষটা নেই।
এজন্যই আর কিছু করতে ইচ্ছা করে না।
বলে উঠে দাঁড়ায় আদ্রিয়ান।
আর এক মুহূর্ত সেখানে না দাড়িয়ে বেরিয়ে যায় কেবিন থেকে।
__রাহি তাকিয়ে দেখে আদ্রিয়ানের চলে যাওয়া।

ভীর অনেকক্ষন চুপচাপ বসে থাকে ইশায়ার কাছে।
ভাবছে সে কিছু একটা। কিভাবে সেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনবে এটাই তার মাথায় ঘুরছে। টাকা পয়সা ক্ষমতা দিয়ে যদি কিছু হতো সেটা সে মুহূর্তেই করে ফেলতো,ডাক্তারের কথা গুলো বার ভার ভাবাচ্ছে ভীরকে।
ইশায়াকে হসপিটালাইজড সে করতে পারবে না। কোন কিছুর কারণেই সেই ইশায়াকে চোখের আড়াল হতে দিবে না।
যা করবে যা করতে হবে তার চোখের সামনেই।
___আরো ভালো ডাক্তার আনবে সে,সব কিছুর ব্যবস্থা এখানেই করবে, শুধু ভালো ডাক্তার না। পথিবীর সেরা ডাক্তার আনবে ।
এরপর তিল পরিমাণ ক্ষতি হতে দেবে না ইশায়ার।
____ভীর গভীর নিঃশ্বাস নিয়ে ধীরে ধীরে রুম থেকে বেরিয়ে যায়।
তার পদক্ষেপের শব্দ পুরো করিডোরে প্রতিধ্বনি হতে তোলে একটা ভারী, অস্থির, নিয়ন্ত্রণহীন ক্ষমতার মত।
___অফিস রুমে ঢুকেই ভীরের ভেতরের রাগ ফেটে বেরোয়।
ভীর ডিয়েগো কে ডাকে।
____দুই সেকেন্ডও লাগেনা।
ডিয়েগো হাজির।
ভীর তার দিকে ফিরে তাকায়,ইশায়ার ফাইল এগিয়ে দিয়ে বলে,এর স্পেশালিষ্ট,সব থেকে ভালো ডাক্তার নিয়ে এসো।
ডিয়েগো মাথা নিচু করে সম্মতি জানায়।
ভীর আবার গর্জে ওঠে,

__সবচেয়ে ভালো চাই।দাম যতই হোক, যে দেশেই থাকুক,এয়ারলিফট করে নিয়ে আসো।
Tonight… Do you hear me, Diego?
Not tomorrow.
Tonight.
ডিয়েগো মাথা নাড়ে।যত তাড়াতাড়ি সম্ভব করছি বস।
ভীর চুল খামছে ধরে নিজের।
তার শরীরের প্রতিটা স্নায়ু যেন অধৈর্য হয়ে উঠেছে।
____ভীর ঠাণ্ডা গলায় সান্তিয়াগোকে বলে,
গার্ড ডাবল করে দাও।আরো কিছু ওয়েল ট্রেইন্ড মহিলা গার্ড লাগবে।
সান্তিয়াগো মাথা নাড়ায়।
___ ঠিক সেই মুহূর্তে রাণিয়া দৌড়ে আসে,
বস… ম্যাম-এর জ্ঞান ফিরেছে।কেমন যেন করছেন বুঝতে পারছি না।
মারিয়া এলেনা ধরতে গিয়েছিল উনি… ফুলদানি দিয়ে মাথায় আঘাত করেছেন।
____ভীরের চোখের মণি সংকুচিত হয়ে পাথরের মতো শক্ত হয়ে যায়।
এক সেকেন্ড সময় নষ্ট না করে সে রুমের দিকে ঝড়ের মতো ছুটে যায়।
____দরজা জোরে খুলতেই দেখে,

পাঁচজন মহিলা গার্ড মিলে ইশায়াকে চেপে ধরেছে।
ইশায়ার নিঃশ্বাস হাঁপিয়ে উঠছে, মুখে আতঙ্কের ছাপ, চোখ লাল অস্থির হয়ে আছে।
ভীরের প্রবেশ মাত্র গার্ডরা ভয় পেয়ে সরে যায়।
মাটিতে পড়ে আছে ভাঙা ফুলদানি আর রক্তমাখা কাঁচের টুকরো।
___ইশায়া ভীরকে দেখেই স্থির হয়ে যায়,
তার কয়েক সেকেন্ড আগের উগ্রতা মুহূর্তেই নিভে যায়।
____ভীর কাছে গিয়ে বসতেই ইশায়া কাঁপা গলায় বলে,
আমি কিছু করিনি,আমি কিছু করবো না, আমি কিছু করবো না..আমার মা-কে মারবেন না,হুম।
আমার মা-বাবাকে ছেড়ে দিন প্লিজ।
তার ভয় এতটাই প্রগাঢ়, যে কথা বলার ফাঁকে শ্বাস কেঁপে উঠছে।
সে ধীরে ধীরে স্বাভাবিকের মতো কথা বলার চেষ্টা করলেও হঠাৎই ভয় তাকে ছিঁড়ে ফেলে।ছোট্ট শরীরটা বারবার কেপে কেঁপে উঠছে।

___ভীর দু’হাতে ইশায়াকে আগলে নেয় বুকের মধ্যে খানে ।
শোনো, রিল্যাক্স… কেউ কিছু করবে না।
ওরা সেইফ আছে। সবাই ভালো আছে।
____কিন্তু ইশায়ার ভেতরের আতঙ্ক।
হঠাৎ সে ভীরের শার্টের কলার চেপে ধরে চিৎকার করে উঠে,
আমার মা আগুনে পুড়ে যাবে!
ছেড়ে দিন! ছেড়ে দিন!
আমি সব শুনবো,সব কথা শুনবো আপনাদের!
যা বলবেন সব করবো, সব।
ডাক্তার এনা সাইড থেকে বলে ওঠে,
__এটা সাধারণ ভয় নয়।
এটা এমন এক mental break যেখানে মানুষের মস্তিষ্ক বাস্তবতা হারিয়ে ফেলে
একে বলে acute psychotic panic.
___ইশায়ার চোখে তখন আগুনের প্রতিবিম্ব,
যেন সে সত্যিই দেখছে তার মা আগুনে পুড়ে যাচ্ছে।
তার চিৎকারে রুম কেঁপে ওঠে।ভীর তাকে বুকের সাথে আরো শক্ত করে টেনে নেয়,
____শান্ত হও।কিছু নেই এখানে। তাকাও, দেখো তাকিয়ে দেখো এখানে কিছু নেই। কোন আগুন নেই।
কিন্তু ইশায়া শুনতে পাচ্ছে না।কিছুই সে শুনছেনা।

__ডাক্তার পাশে দাঁড়িয়ে আছে, কিন্তু এগোতে ভয় পাচ্ছে,
ইশায়া হঠাৎ ভীরের বুক ঠেলে দূরে যেতে চায়।
কিন্তু ভীরের শক্ত শরীরের সাথে সে পেরে উঠে না।
___মা… মা… বলে চিৎকার করে কাঁদতে থাকে ইশায়া।আগুন! আগুন! আমার আম্মু! কেউ বাঁচান!
___ভীর তাকে শক্ত করে ধরে রাখে,
আর তখনই ইশায়া তার হাত ধরে,পুরো শক্তিতে দাঁত বসিয়ে দেয়।
মাংস ছিঁড়ে রক্ত বেরিয়ে আসে।
যন্ত্রণায় ভীরের শ্বাস থেমে যায়।তবুও সে ছাড়ে না।
ইশায়াকে শক্ত করে আকড়ে ধরে আছে।
____ইশায়া থামছে না,
আরও জোরে চিৎকার করতে থাকে।
___হুসসসস, কেউ নেই সব ঠিক আছে।
ইশায়া কিছুই মানে না চিৎকার করতে করতে, কান্নায়, আতঙ্কে, সে ভীরের বুকের উপর ঢলে পড়ে।
____ভীরের হৃদস্পন্দন তখন যেন ভেঙে পড়ছে।

বার বার একইরকম পপরিস্থিতি, ভীর ইশায়ার চুল মুখ থেকে আলতো করে সরিয়ে তাকে শোয়াতে চায়। কিন্তু চুল মুখ থেকে কানের কাছে নিতেই তার হাতে কিছু উষ্ণ ভেজা জিনিস লাগে।
ভীর হাত তুলে তাকাতেই দেখে,রক্ত।
তার হাতে লাল রক্ত।
ভীরের পুরো সত্তা কেপে ওঠে।
সে দ্রুত ইশায়াকে সামনে আনে দেখে,
নাক আর কান দিয়ে রক্ত বের হচ্ছে।মুখ নিস্তেজ।
দিশেহারা ভীর চিৎকার করে ডাক্তারকে ডাকে,
ডাক্তার!রক্ত কেন বের হচ্ছে?
কী হয়েছে?

____তার কণ্ঠ ভেঙে যাচ্ছে।
ভীর আলভারেজের ভয় পাওয়ার দৃশ্য কেউ জীবনে দেখেনি।
ডাক্তার ভয়ে ভয়ে এগিয়ে আসে।
ভীর তখনো ইশায়াকে বুকের মাঝে জড়িয়ে রেখেছে
তার শরীর কাঁপছে।
ডাক্তার বলে,
বিছানায় শুইয়ে দিন, এখনই।
ভীর নিজে হাতে ইশায়াকে শুইয়ে দেয়।
ডাক্তার দ্রুত লাইট জ্বালিয়ে নাক-কান পরীক্ষা করে।
তার মুখের রং পাল্টে যায়।
ভীর গর্জে ওঠে,বলুন! কী হয়েছে?!
ডাক্তার গভীর শ্বাস নিয়ে বলে,মিস্টার আলভারেজ…
তার মানসিক অবস্থা এখন ‘Acute Stress-Psychotic Break’।
তার ভয়, ট্রমা, হ্যালুসিনেশন
এসব মিলে তার ব্লাড প্রেসার হঠাৎ ভয়ানকভাবে বেড়ে গেছে।”
এটাকে আমরা বলি,
Hypertensive Crisis with Capillary Rupture
মানে রক্তচাপ এত বাড়ে যে,নাকের ভিতরের রক্তনালী ফেটে যায়কানের ভিতরের নালীও ফেটে রক্তপাত শুরু হয়,মস্তিষ্কের ওপর তীব্র চাপ পড়ে
এতে অজ্ঞান হয়ে পড়া খুবই স্বাভাবিক.
ডাক্তারের কণ্ঠ নিচু হয়, যদি এটা আর একটু বাড়তো,
উনি স্ট্রোক করতে পারতেন।এমনকি জীবনও ঝুঁকিতে চলে যেত।

___ভীরের পুরো শরীর নিস্তব্ধ হয়ে যায়।তার চোখ নিস্পন্দ।তার নিঃশ্বাস ভারী।
উনি বাস্তব-অবাস্তব আলাদা করতে পারছে না।
উনি এখন যে কাউকে বিপদে আছে মনে করবেন।
___ভীরের নিচু গর্জন বের হয়
এটা এখনই বন্ধ করুন। যেভাবেই হোক।
ডাক্তার ভয়ে ভয়ে বলে,
উনাকে এই মুহূর্তে কঠোর মনিটরিং, সেডেশন এবং স্থায়ী সাইকিয়াট্রিক কেয়ারের দরকার।

সে আমার বন্দিনী পর্ব ৫৯

____আমার মনে হয় উনি কিছু দেখে খুব বেশি ভয় পেয়েছেন এজন্যই ট্রমাটাইজড হয়ে আছেন।
___ভীর ও বুঝতে পারছে না হঠাৎ ইশায়ার এত ভয় পাওয়ার কারণ কি এর আগুন কোথা থেকে এসেছে। বার বার একই কথা আওড়াচ্ছে।

সে আমার বন্দিনী পর্ব ৬১