সে আমার বন্দিনী পর্ব ৬১
তানিয়া হুসাইন
ইশায়া এতো ভয় পাচ্ছে, বারবার আগুন আগুন
বলে চিৎকার করছে,ভীর কিছুতেই বুঝে উঠতে পারছে না কেন।
ওর এমন অবস্থা দেখে ভীরের মনে একটাই প্রশ্ন উঠছে,
এত ভয়,এত আতঙ্ক, হঠাৎ করে কেন। কাল রাতে তো সে এমন কিছু বুঝে নি।
রুমের মধ্যে সে দাঁড়িয়ে আছে,মিনিট যেন ঘণ্টার মতো ভারি।
____ ডাক্তার বলে,
উনি কোন কিছু নিয়ে খুব বেশি ট্রমাটাইজড হয়ে আছেন।তাকে ঘুমের ইনজেকশন দিয়ে দিয়েছি।
কিন্তু জ্ঞান ফিরলে উনি আবারও ঠিক একই রকম আচরণ করবেন।
ডাক্তারের কথা শেষ হতেই,
ভীর ধীরে ধীরে মাথা তোলে।তার কণ্ঠ নরম নয়, ঠাণ্ডা নয়বরং পাথরের মতো শক্ত।
ও বার বার আগুন আগুন করে চিৎকার করছে কেন?কিছু না কিছু হয়েছে। কেউ কিছু দেখিয়েছে।
কোন কারণ ছাড়া কেউ এভাবে ভয় পায় না।
ভীরের চোখ এদিকে ওদিকে না ঘুরলেও,
পুরো রুমের গার্ডদের গায়ে ঠান্ডা স্রোত বয়ে যায়।
ওদের মুখে এক ধরনের আতঙ্ক,
বললে মরতে হবে, না বললে আরো ভয়ংকর মৃত্যু।
নিক সবাইকে বলে দিয়েছে,ভীর যেন কিছু না যানে
তার আদেশের ভয় আলাদা।
আর ভীরের রাগ একেবারে মৃত্যুর ঘোষণা।
গার্ডরা একে অন্যের দিকে তাকায়।কারো মুখে শব্দ নেই।ঘামের বিন্দু কপাল দিয়ে গড়িয়ে পড়ছে।
হাওয়াও যেন থমকে গেছে।
হঠাৎ ভীরের গলার চিৎকার রুম কাঁপিয়ে তুলে।
___কি বলেছি আমি? দ্রুত বল!না হলে এখানে প্রত্যেক কটার লাশ পড়বে এখানে।
_এক সেকেন্ডে হাঁটু কেঁপে ওঠে সবার।
রাণিয়া চোখ বন্ধ করে ফেলে,
কারণ সে জানে আর লুকানোর জায়গা নেই।
এখন লুকাতে গেলে সবাইকে প্রাণ হারাতে হবে।
____কাঁপতে কাঁপতে রাণিয়া এগিয়ে আসে।
তার কণ্ঠ ভেঙে যাচ্ছে,তবুও সে বলে,
___বস৷!কালকে নিকো স্যার
রাণিয়া পুরো ঘটনা ভীরকে খুলে বলে।
___রাণিয়ার মুখ থেকে বের হওয়া প্রত্যেকটি শব্দ যেন ভীরের শরীরে আগুন ধরিয়ে দিচ্ছে।
শুনতেই ভীরের হাতের শিরাগুলো ফুলে ওঠে, যেন ক্ষেপণাস্ত্র বিস্ফোরণের আগে ফুলে ওঠা আগুনের শিখা।তার দৃষ্টি রক্তের মতো লাল।চোয়াল শক্ত হয়ে গেছে।দুটি ধমনী কান পাশে ধড়ফড় করছে।
এক সেকেন্ড, দুই সেকেন্ডতারপর ভীর হঠাৎ পিছিয়ে যায় বাঘের মতো রুম ছেড়ে বেরিয়ে যায়।
ভীর এতো জোড়ে ধাক্কা দেয় দরজার ফ্রেম কেঁপে ওঠে।
ফুটস্টেপে শুধু রাগ না ঝড়ের পূর্বাভাস।
নিকোর উপর কি ঝড় নেমে আসছে,
সেটা কল্পনা করতেই গার্ডদের বুক ঠাণ্ডা হয়ে যায়।
কি হবে আজ যখন এরা দুজন সামনা সামনি আসবে।
____ভীরের শরীরের প্রতিটা রগ যেন রাগে পুড়ছে। ইশায়ার অবস্থা মাথায় ঘুরে ঘুরে তাকে উন্মাদ করে তুলেছে। রুম থেকে বেরিয়ে সে ঝড়ের গতিতে হাঁটতে হাঁটতে নিকোর ফ্লোরে উঠে আসে। তার চোখ রক্তলাল অনিয়ন্ত্রিত আগুন।
___নিকোর রুমের সামনে এসেই ভীর ঠাস ঠাস ঠাস করে দু’হাতে দরজায় আঘাত করতে থাকে।
অন্যদিকে, ভোররাতে বেলাকে নিয়ে বাড়ি ফিরে নিকো ঘুমিয়ে ছিল গভীর নিস্তব্ধতায়।
হঠাৎ দরজা ধাক্কার আওয়াজে তার ঘুম ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
শব্দগুলো যেন মাথার ভেতর হাতুড়ির মতো বাজছে।
নিকো বিরক্ত, ভ্রু কুঁচকে আধা-ঘুমে দরজার দিকে যায়।দরজা খুলতেই,
ভীর ঝড়ের মতো রুমে ঢুকে তার মুখের ওপর ঘুষি বসিয়ে দেয়।হঠাৎ, অতর্কিত আঘাতে নিকো পেছন দিকে হেলে পড়ে।অবাক চোখে তাকিয়ে থাকে বোঝার চেষ্টা করে মাত্র কি হল।কিন্তু ভীর তাকে বুঝতে সময় দেয় না।আরেকটা, তারপর আরেকটা।হাড়ভাঙা শব্দে ঘুষি পড়ে নিকোর মুখে। প্রেশারের তীব্রতায় ঠোঁট ফেটে রক্ত ঝরে। নিকো হাত তুলেও প্রতিরোধ করে না।ভীরের চোখে মানুষের কোনো ছাপ নেই।শুধু দানবীয়, অন্ধকার, রাগ।
ভীর থামে না। নিকোর মুখের পাশ দিয়ে রক্ত মেঝেতে পড়ে।কিন্তু সে চুপ।নিঃশব্দে মার খাচ্ছে।
___ভীরের রাগ কমে না, বরং বাড়তে থাকে।তার কাঁধ ওঠানামা করছে দ্রুত শ্বাসে।সে রাগে কাঁপছে।
ভীর রিভলভার বের করে নিকোর কপালে ঠেকিয়ে ধরে।রুমের বাতাস থেমে যায়।দু’জনের মাঝখানে মৃত্যুর গন্ধ।
ভীর ট্রিগার টেনে ধরে,কিন্তু শেষ মুহূর্তে আঙুল শক্ত করতে পারে না।
তার হাত কাঁপে।চোখে ভয়ংকর অসহায়তা।
শেষে রিভলভার নামিয়ে মেঝেতে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে বড় বড় শ্বাস নেয়।
___নিকো নিঃশ্বাস নিয়ে কষ্টে বলে উঠে,
ফেলে দিলে কেন? মেরে ফেলো আমাকে!আমাকে মেরে যদি তুমি শান্তি পাও তাহলে ওকে।
আজ এই দিনটাও দেখতে হলো ভীর।
তুমি নিজেকে ঠিক কোন জায়গা নিয়ে এসেছো।
ধ্বংসের সন্নিকটে তুমি।
____ভীর উত্তরে কিছু না বলে পাগলের মতো ঘুরে দাঁড়ায়।তার ভেতরের রাগ কমছে না,
ভীর কাছে থাকা বড় ড্রেসিং টেবিলের আয়নায় ঘুষি মারে সজোড়ে।
___আয়না চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যায়,ভীরের মুষ্টি কেটে রক্ত ঝরতে থাকে।
নিকো নিজের মুখে শরীরে আঘাত নিয়েও রক্তাক্ত হাতে ভীরকে এভাবে দেখে থাকতে পারে না।সে ছুটে এসে ভীরের হাত চেপে ধরে।ভীর! কি করছিস তুই?
____কি চাও তুমি? কেন নিজেকে এভাবে শেষ করছো,কেনো ভুলে যাচ্ছো তুমি কে।মাফিয়াদের দুর্বলতা থাকতে নেই।
____ভীর পুরো শরীর কাঁপছে
এ যেন রাগ নয়, ভয়ের মতো গভীর যন্ত্রনা।
____নিকো ভীরকে শান্ত করতে হাত বাড়াতেই ভীর তাকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দেয়।
নিকো টলে গিয়ে শূন্য দৃষ্টিতে ভীরের দিকে তাকায়,
কিন্তু ভীর তখন মানুষ নয়,রক্তে তপ্ত এক আগ্নেয়গিরি।
____ইশায়ার সাথে এমন কেন করলি তুই!
কে তোকে বলেছে আমাদের মাঝে আসতে?
ভীরের গলা ফেটে যাচ্ছে।
প্রতিটি শব্দে জমে থাকা আতঙ্ক, রাগ আর অসহায়তা কাঁপছে।ও পাগল হয়ে যাচ্ছে, নিক!ওর মানসিক অবস্থা ভয়ংকর!ডাক্তার বলেছে এভাবে চলতে থাকলে
ওকে বাঁচানোই সম্ভব না।
ভীরের কণ্ঠ কেঁপে ওঠে,
ও নিজেই নিজেকে শেষ করে দিতে চাইছে!
আর তুই পরিস্থিতিটা আরও বিগড়ে দিলে, কি হতে পারতো আজকে। কেন করলি?? বল!
ভীরের শ্বাস ভারী হয়ে ওঠে।রাগে তার বুক ওঠানামা করছে দ্রুত।
আমি কি করবো এখন?কিভাবে ওকে সুস্থ করবো?
কেন পারছি না আমি,কেন পারছি না ওকে নিয়ন্ত্রণ করতে?
একটা সাম্রাজ্যের রাজা আজ একটা মেয়ের সামনে নিজেকে হেরে যেতে দেখছে।আমি হেরে যাচ্ছি নিকো।
রাজভীর আলভারেয হেরে যাচ্ছে।আমি ওকে রাখতে পারছিনা আর নিজের খাচায় ও উড়ে যেতে চাইছে।
পুরো সাম্রাজ্য আমার নিয়ন্ত্রণে!
মেক্সিকো থেকে গুয়াতেমালা বুড়ো সাম্রাজ্যের
সবাই আমায় ভয় পায়,
সবাই আমার কথায় উঠে বসে।কিন্তু একটা ইশায়াকে,
একটা মেয়েকে কেন আমি থামাতে পারছি না? কেনো??
ভীরের গলা ভেঙে যায় শেষ কথাটা বলতে গিয়ে।
আমি ওকে হারাতে চাই না নিক।আমি ওকে হারাতে চাই না!আমার ওকে লাগবে,ওকে লাগবে আমার।
আমি ওকে হারাতে পারব না।
কোন কিছুর মূল্যে আমি ওকে হারাতে পারবো না।
ভীরের গলা কাঁপছে,
অভিমান, যন্ত্রণা আর ভয় তাকে ছিঁড়ে খাচ্ছে।
ও চলে যাচ্ছে।আমার কাছ থেকে হারিয়ে যাচ্ছে,নিস্তেজ হয়ে পড়ছে,ওকে ঘুমের ইনজেকশন দিয়ে রাখতে হচ্ছে। জ্ঞান ফেরার পর আবার কি করবে জানিনা। ওর সারা শরীরে ক্ষত রক্তাক্ত,
ভীরের চোখ দুটো আগুনের মতো জ্বলতে থাকে,
আমি এত আগলে রেখেও, কেন রাখতে পারছি না ওকে?
চোখে অসহায় ঝড় নিয়ে ভীর শেষবারের মতো বলে,ওকে এনে দে আমাকে নিক।ওকে এনে দে!
বলতে বলতে ভীরের শক্ত শরীর ভেঙে পড়তে শুরু করে।
দাঁড়িয়ে থাকার শক্তিও আর ধরে রাখতে পারে না
সে ধপ করে বিছানায় বসে যায়।
দুই কনুই হাঁটুর ওপর রেখে মাথা চেপে ধরে।
এতটা হেলপ্লেস সে কখনো হয়নি।
____নিকো ভীরকে এভাবে টুকরো ভেঙে পড়তে দেখে
গভীর গলায় বলে,
___তুমি কি ভালোবেসে ফেলেছো ওকে?
রুমটা কয়েক সেকেন্ড নিস্তব্ধ হয়ে যায়।
ভীর ধীরে মাথা তোলে।তার চোখ রক্তলাল,
রাগ, আধো-ব্যথা, আধো-স্বীকারোক্তি মেশানো ভয়ংকর দৃষ্টি।
___আমি শুধু চাই,ও আমার সামনে থাকবে।
আমার চোখের সামনে থাকবে জীবনভর।
That’s it.
একটা মুহূর্তও দেরি না করে ভীর আবারো বলে,
___আমার কোনো ভালোবাসা লাগবে না।
আমার ভালোবাসার প্রয়োজন নেই, আমার ওকে প্রয়োজন।
___আমার জীবনে ও থাকবে না,ওকে আমি দেখতে পারবো না,এটা আমি মেনে নিতে পারছি না নিক।
ভীরের গলা কেঁপে ওঠে।
আমার ওকে চাই।ওকেই চাই ওর পরিবর্তে অন্য কাউকে না।
___ভীর আবার মাথা নিচু করে,দুই হাত চুলে গেঁথে ধরে বলে,
কিন্তু পরিস্থিতি আমার হাতের বাইরে চলে যাচ্ছে,
আমি কি করবো কিছুই বুঝতে পারছি না,
ওকে আমি নিয়ন্ত্রণ করতে পারছি না,এইটা আমাকে পাগল করে দিচ্ছে।
___ভীর মাটির দিকে তাকিয়ে খুব ধীরে বলে,
একটা বছর আমি ওকে বন্দি করে রেখেছি।
চাইলেই সারা জীবন বন্দি করে রাখতে পারবো।
কিন্তু এখন।পরিস্থিতিটা এরকম হয়ে গেল কেন।
___পুরো প্রাসাদে হাজারো গার্ড আছে,
এত ক্ষমতা, শক্তি…এত প্রতিপত্তি
কিন্তু এরপর ও একটা ১৮ বছরের মেয়েকে আমি নিয়ন্ত্রণে আনতে পারছি না।
তার ওই শেষ বাক্যটা রুমের দেয়ালে ধাক্কা খেয়ে ফিরে আসে,ভীর আলভারেযের জন্য এটা সবচেয়ে বড় পরাজয়।
রক্তমাখা হাত, ভারী শ্বাস, চোখের কোণে জমে থাকা শূন্যতা,একটা মেয়ের জন্য এতটুকু ভেঙে যেতে দেখে
নিকোর বুকের ভেতর অদ্ভুত রাগ জমে ওঠে।
রাগ ইশায়ার ওপর নয়…রাগ ভীরের ওপর।
এত শক্তিশালী একজন মানুষ সে কিনা মানসিকভাবে ভেঙে পড়ছে একটা মেয়ের জন্য।
কিন্তু নিকো ভীরের মুখে অসহায়তা দেখে তার গলা নরম হয়ে যায়।
এই মানুষটাকে সে অনেক বছর ধরে দেখেছে,
ভীর কখনো এতটা ভেঙে পড়েনি।
___নিকো ধীরে জিজ্ঞেস করে,কি করবে,কিছু ভেবেছো?
____ভীরের মাথা নিচু জবাব আসে না।
নিকোও চুপ থাকে।
রুমের দেয়ালে টিক-টিক শব্দ ছাড়া আর কিছু শোনা যায় না।
__অনেকক্ষণ পর ভীর নিজেই বলে,
সারা দেশের বেস্ট ডাক্তারকে নিয়ে আসবো।
ট্রিটমেন্টে ঠিক হয়ে যাবে অবশ্যই।আর গার্ড বাড়িয়ে দেবো ২৪ ঘণ্টা নজরদারিতে থাকবে।
এক সেকেন্ডও একা নয়।তার গলা ঠান্ডা।
__নিকো সামান্য সামনে ঝুঁকেএকদম নির্দয় ভঙ্গিতে বলে,
ঠিক করতে চাইছো কেন ওকে?
___ভীরের মাথা ধীরে ওঠে।
মানে? তার গলা শক্ত হয়ে যায়।
__নিকো এবার কোনো হেয়ালি না করে বলে,
ইশায়া কখনো তোমার সাথে স্বাভাবিক কোন সম্পর্ক জড়াতে পারবে না, ওর বয়স কম, তার উপর ফ্যামিলির থেকে দূরে,কারো সাথে যোগাযোগ নেই দেখা পর্যন্ত নেই, তারউপর আর বোন মারা গেছে আমাদের জন্য,এই সবকিছুর পর কখনো কোন মেয়ে কারো সাথে মানিয়ে নিতে পারে না।
আর এখন ওর অবস্থা দেখে তো বোঝাই যাচ্ছে,
এই রকম হয়ে যাওয়া টা একদম স্বাভাবিক।
নিকো চোখে চোখ রেখে বলে
এখনো যেটা করছে,যেকোনো সময় নিজের ক্ষতি করে ফেলতে পারে,না হলে তোমার।
___ভীরের চোয়াল শক্ত হয়ে ওঠে।
কিন্তু নিকো থামে না।
___তুমি নিজেই ওর কাছে সেইফ না।
তুমি ওর সাথে বেশি সময় থাকো।রাতে ঘুমাও পাশে,
যদি কোনো রাতে ও তোমাকে অ্যাটাক করে?
তখন তুমি কি করবে?তোমার দুর্বলতার সুযোগ নিলে তখন কি করবে, ইশায়ার দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে,ও এই মেন্টাল ট্রমা থেকে বের হয়ে আসলেও হার মানবে না।ভুলে যাচ্ছো ওইদিনের ইন্সিডেন্ট হাজারো গার্ডকে ফেলে পালিয়ে গেল, তারপর পুরো দুইদিন আমাদের থেকে আড়ালে ছিল,
ছোট কিছু পারবে না বলে অগ্রাহ্য করা কি ঠিক বলে মনে করো তুমি।
শত্রু কখনো বাইরে থেকে তৈরি হয় না, শত্রু তৈরি হয় ভেতর থেকে।
ভাগ্য না করুক এটা যেন কোনদিন না হয় ওই আমাদের ধ্বংসের কারণ হয়ে দাঁড়ালো। তখন মেনে নিতে পারবে তো এটা।
___ভীরের চোখ একটু বিস্তৃত হয়।সে প্রথমবার ভাবছে এটা কি অসম্ভব।
___নিকো নিঃশ্বাস ফেলে বলে,
আর কতদিন এইভাবে?
আমি ভেবেছিলাম তুমি মনোরঞ্জনের জন্য ওকে রেখেছো,কয়েকদিন পর এমনিতেই ছেড়ে দেবে।
কিন্তু এখন দেখি তোমার মাথায় অন্য কিছু।
___নিকো শেষ লাইনটা বলার আগে ভীরের দিকে তাকায়,আমি তোমার বন্ধু নয়,একজন কড়া উপদেষ্টা হিসেবে বলছি আমার মনে হয়,
তুমি যেটা ভাবছো সেটা না করে অন্য কিছু করলে ভালো হবে।
___ভীর চুপচাপ নিকোর কথা শুনছিলো এতোটা সময়।
এতোক্ষন পর নীরবতা ভেঙে বলে,অন্য কিছু মানে?
____অন্য কিছু মানে… এমন কিছু যার কারণে ইশায়া তার অতীতের সব কিছু ভুলে যাবে। তার স্মৃতি থেকে মুছে ফেলা তার ১৮ বছরের জীবনের সবকিছু।
____কথাটা শুনে রাজভীরের ভ্রু শক্তভাবে কুঁচকে আসে।
মাথার ভেতর যেন ধাতব শব্দে আঘাত লাগে,
নিকো ঠিক কি বলতে চাইছে বুঝতে পারছে না সে।
তার শরীরের সব শক্তি যেন মুহূর্তেই টানটান হয়ে ওঠে।
নিকো রাজভীরের মুখের সেই বিভ্রান্তি দেখে আবারো বলে, এবার আরেকটু ধীরে, কিন্তু এমন স্বরে যেন কথাগুলো মস্তিষ্কে খোদাই হয়ে যায়,
___স্মৃতি মুছে গেলে ও ভুলে যাবে ও কে ছিল,
কে ওর পরিবার,ওর ছোটবেলা,বাংলাদেশের সবকিছু।
যখন ওর মস্তিষ্ক একেবারে শূন্য হয়ে যাবে, তখন ও যা দেখবে, ওকে যা দেখানো হবে, ওকে যা বোঝানো হবে
ও সেগুলোই সত্যি বলে বিশ্বাস করবে।
____রাজভীর শব্দহীন হয়ে তাকিয়ে থাকে।
নিকোর কণ্ঠ আরো গাঢ় হয়ে ওঠে,
___যখন ও অতীতের সব নেগেটিভ জিনিস ভুলে যাবে কোন পিছুটান থাকবে না।
তখন ও আপন বলতে শুধু তোমাকেই চিনবে।
বাঁচতে হলে তোমাকেই আঁকড়ে ধরবে।
____কথাগুলো কাঁটার মতো ভীরের বুকে বিঁধতে থাকে, তবুও নিকো থামে না,
এটা ছাড়া, আমি মনে করি না যে ও কোনদিন তোমার সাথে স্বাভাবিক আচরণ করবে।
কারণ ও মানিয়ে নেওয়ার মেয়ে না, ভীর।
যদি মানিয়ে নিতে পারতো তাহলে একটা বছর পরেও এতো চেষ্টা করত না পালানোর।
ও জানে এখান থেকে ও পালিয়ে বাঁচতে পারবে না।
এরপরও বারবার চেষ্টা করেছে।
ও হার মানার মেয়ে না।
____রাজভীরের চোয়াল শক্ত হয়ে ওঠে,
নিকোর চোখ সরাসরি রাজভীরের চোখে,
___এখন দেখো তুমি কি করবে।
আমার যেটা বলার ছিল আমি সেটা বলেছি।
নিকোর এই নির্মম বাস্তব সত্যের সামনে রাজভীরের মনে যেন ঢেউ আছড়ে পড়ে।
তার চোখ একটু নামলেই ইশায়ার ছিন্নভিন্ন অবস্থা মনে পড়ে,
রক্তে ভেজা হাত, সকালের সেই নির্জীব দৃশ্য, আতঙ্কে ভরা চোখ।
সবকিছু যেন একসাথে মাথায় ধাক্কা দেয়।
নিকোর কথাগুলো ভীরের মাথার ভেতর ঘুরতে থাকে।
ঘরের নিস্তব্ধতা হঠাৎই ভারী হয়ে উঠেছে।
ভীর অনেকক্ষণ চুপচাপ বসে থাকে।
সে ভাবছে, সে-ই তো চেয়েছিল ইশায়া তাকে ছাড়া আর কাউকে না ভাবুক।অন্য কারো জন্য যেন তার চোখে পানি না আসে,
তাকে ছাড়া আর কারও মুখ যেন ইশায়া দেখতে না পারে।
তার প্রতিটি নিঃশ্বাস, প্রতিটি মুহূর্ত শুধু তার চারদিকে ঘুরুক।ইশায়ার মন, তার মস্তিষ্ক, তার পুরো অস্তিত্ব তাকেই কেন্দ্র করেই ঘুরবে পৃথিবীর আর কিছুই তাকে স্পর্শ করতে পারবে না।
___এই মেয়েটা তার কাছে থাকলেই সে আলাদা একটা স্বস্তি অনুভব করে,
আর যদি ইশায়া নিজে থেকেই তার কাছে থাকতে চায়, ভয় বা জোরাজুরি নয়, বরং নিজের ইচ্ছায় তাকে আঁকড়ে ধরে,
এই ভাবনাই ভীরের শরীরের ভেতর অদ্ভুত এক শান্তি ঢেলে দেয়।
যেন সে এমন এক জগৎ কল্পনা করছে যেখানে ইশায়ার অস্তিত্ব শুধুই তার।
কিন্তু পরের মুহূর্তে তার মনে ভয় কাজ করে। কণ্ঠ কিছুটা ভারী হয়ে যায়,
___এটা কি সম্ভব? কিন্তু এতে ওর কোন ক্ষতি হলে?
ওর শরীরে কি কোন ইফেক্ট পড়বে?
নিকো আগের মতোই স্থির, ঠাণ্ডা গলায় বলে,
___সবকিছু সম্ভব। আমাদের কাছে অসম্ভব বলতে কিছু নেই।আর না কোনো ক্ষতি হবে না।
শুধু ওর পুরনো স্মৃতিগুলো তার জীবন থেকে মুছে যাবে—এটাই।একটা মেডিসিনের মতো,বলতে গেলে ইঞ্জেকশন। অবশ্য তার মেয়াদ আছে এই মেয়াদ শেষ হওয়ার পর আবার দিতে হবে। তার গলা সোজা
আর দৃঢ়।
___এর কোনো সাইড এফেক্ট হবে না।
ভীর স্থির হয়ে তাকিয়ে থাকে।
এত বড় সিদ্ধান্ত এত নির্মম পথ কিন্তু ইশায়াকে বাঁচাতে হলে?তাকে তার কাছে ধরে রাখতে হলে আর কোন উপায় নেই।ভীর কোন কিছুর বিনিময়ে ইশায়াকে হারাতে পারবে না।
___নিকো এবার একটু এগিয়ে আসে, নরম গলায় কিন্তু যুক্তিগ্রাহ্যভাবে বোঝাতে থাকে,
আমরা দেশের বেস্ট ডাক্তারদের দিয়ে করাবো।
তেমন কোনো সমস্যা হওয়ার কথা না।আর যদি হয়ও
ডাক্তাররা যা বলবে, তাদের পরামর্শ অনুযায়ী বোঝা যাবে কী করা উচিত।
___ওকে।
যা করার করোদ্রুত করো। As soon as possible.
আমি আর কোন ক্ষতি চাই না ওর।
যত দ্রুত সম্ভব সবকিছুর ব্যবস্থা করো।
তার চোখে কঠিন আগুন
একই সাথে ভয় আর অধিকারবোধ।
___কিন্তু আগে আমি ডাক্তারের সাথে কথা বলবো।
পুরো প্রসেস জানার পর কি করা যায় দেখব।
তুমি যত দ্রুত সম্ভব ডাক্তার এখানে আমার কাছে ব্যবস্থা কর।
এই সিদ্ধান্ত শুধু নিখুঁত হতে হবে না,বরং ইশায়াকে আবার নিজের করে নিবে।একেবারে শূন্য থেকে।
___ভীর রুম থেকে বের হওয়ার আগে সে নিকোর দিকে তাকায়,
ভীর ঠান্ডা গলায় নিকোকে ক্ষতস্থানের ড্রেসিং করে, ওষুধ লাগাতে বলে বেরিয়ে যায়।
দরজা বন্ধ হতেই নিকো এক কোণে বসে পড়ে, ভীরের চলে যাওয়ার দৃশ্য দেখে ঠোঁটের কোণে এক ব্যঙ্গ-হাসি ফুটে ওঠে।
সে জানে ভীর রাগের বসেই এটা করেছে, এগুলো ছিলো তার বিস্ফোরণ,সবকিছুই ছিল উত্তেজনার ঝড়।
___কিন্তু নিকোর কোন আফসোস নেই।
সে যেটা করেছে, তার কাছে ঠিকই মনে হয়েছে।
তার কোনো এক ফোঁটা দোষবোধ নেই বরং একটা থমকে থাকা শান্তি।
নিকো নিজের কাঁধ মেলে, রক্তমাখা শার্ট খোলার সময় এক ধরনের তৃপ্তি নিয়ে বলে ওঠে,
____তার চোখে অন্ধকার আলো জ্বলে ওঠে।
আর এখন যেটা হবে এটা করার পর ইশায়া একেবারে পুতুল হয়ে যাবে। তখন আর নিকোর তাকে নিয়ে কোন ভয় নেই।
___ভীর রুমে যায়।
দরজা খোলামাত্র রুম ভর্তি গার্ডরা সোজা হয়ে দাঁড়ায়।
তাদের চোখে ভয়, সম্মান আর অদৃশ্য কম্পন।
গার্ডরা সরে দাঁড়ায়, পথ পরিষ্কার হয়।
___ভীর এগিয়ে গিয়ে ধীরে ওর গালে হাত রাখে।
আঙুলের টানে তার নিজের হাতও কেঁপে ওঠে,
যেন সে আশ্বস্ত হতে চায়, ও এখনো আছে।ওকে হারায়নি।
ভীর আজ যখন ইশায়াকে এমন নিস্তেজ ভাবে পড়ে থাকতে দেখেছে তখন তার মনে হয়েছে এই নিশ্বাস হয়তো চিরতরে বন্ধ হয়ে গেছে।
ভীর ইশায়ার মুখে হাত বুলিয়ে ডাক্তারকে আদেশ করে,
___ওকে ঘুমের ইনজেকশন দিয়ে রাখুন।শব্দগুলো ঠাণ্ডা, নিয়ন্ত্রিত।
তারপর রুমে থাকা গার্ডদের দিকে তাকায়,চোখে আগুন।
___ওকে দেখে রাখবে,তার কণ্ঠ গর্জে ওঠে,
ওর শরীরে যদি আর তিল পরিমাণ কোন আঁচড় পড়ে
কাউকে আস্ত রাখবো না আমি।
গার্ডদের মুখ ছোট হয়ে আসে।
____এদিকে নিক তার কাজে লাগে পরে।
সে রক্ত টিসু দিয়ে মুছতে মুছতে ফোনে একের পর এক নাম স্ক্রোল করছে।এ কাজের জন্য কোন ডাক্তার ভালো হবে,তা ঠিক করাই এখন তার প্রধান দায়িত্ব।
মাফিয়া দুনিয়ায় এমন কাজ করতে পারে,মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট অংশে হস্তক্ষেপ, স্মৃতি সংশোধন, সিলেক্টিভ অ্যামনেশিয়াএসব করার মতো ডাক্তার বিশ্বের খুব কম।আর নিকো জানে কোন জনটা ভয়ের হলেও পারফেক্ট।
ড. আলেহান্দ্রো কাস্তেলান (Dr. Alejandro Castellan)
সে আমার বন্দিনী পর্ব ৬০
—The Mind Sculptor নামে আ*ন্ডারওয়ার্ল্ডে পরিচিত।
বিশেষজ্ঞ: নিউরাল রিরাইটিং, ট্রমা-মে*মরি রিমুভাল, ই*লেক্ট্রোকে*মিক্যাল সাইক রিসেট।
—অনেক দেশ থেকে নিষিদ্ধ, শুধু মাফিয়া ও ব্ল্যা*ক-অপসে কাজ করেন।
নিকোর ফোন স্ক্রিনে তার নম্বর জ্বলতে থাকে,
নিকোর ঠোঁটে ফুটে ওঠে গভীর হাসির রেখা।
___এই কাজটা সেই করবে।
