Home সে আমার বন্দিনী সে আমার বন্দিনী পর্ব ৬৩

সে আমার বন্দিনী পর্ব ৬৩

সে আমার বন্দিনী পর্ব ৬৩
তানিয়া হুসাইন

রহমান বাড়িতে অদ্ভুত এক শূন্যতা।
একটা সময় যেখানে ইশায়া আদ্রিয়ান সাফার হাসির শব্দ গমগম করত,আজ সেখানে চাপা কান্নার মতো একটা নীরবতা।সায়মা বেগম বারান্দার দিকে বারবার তাকাচ্ছেন চোখে ঘুম নেই, মুখ শুকনো, তবুও শক্ত আছেন।ওই কাজের মেয়েটা কে ছিলো,কে পাঠিয়েছে তাকে এটাই ভাবছিলেন তিনি,কি উদ্দেশ্য ছিলো তার,কার নজর পড়েছে তাদের পরিবারের উপর, তারা তো কারোর কোন ক্ষতি করেনি।
এই বাড়ির ওপর সবার উপর যে ঝড় নেমেছে এজন্য তিনি আজ মিলাদের আয়োজন করেছেন একটু শান্তির জন্য।
বাড়ির বড় ড্রয়িংরুমে পরিষ্কার করে সাদা চাদর বিছানো হয়েছে।মেঝেতে সারি সারি বসার ব্যবস্থা, কোণে কোরআনশরীফ ঢেকে রাখা টেবিল।মেয়েরা খাবারের আয়োজন করছে।
মিলাদের প্রস্তুতি চলার সময় সায়মা বেগম দেখেন রাহি রান্নাঘরে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে।তাদের এই দুঃসময়ে অন্ধকার জীবনে এই মেয়ে আলো হয়ে এসেছে, একটু হলেও তারা ভালো আছে,রাহি না থাকলে যে কি হতো তাদের,তাকে ইশায়ার বাবাকে খুব আগলে রাখে,খাওয়া-দাওয়া থেকে শুরু করে ওষুধ নিয়েছে কিনা সবদিক নিজের নজরে রাখে, আদ্রিয়ানের ও যতটুকু সে পারে যত্ন নেয়।আদ্রিয়ান সবসময় দূরত্ব নিয়ে চললেও সে যত পারে তার সাথে থাকার চেষ্টা করে। জান্নাত তো তার ছেলেকে নিয়েই ব্যস্ত থাকে বেশির ভাগ সময়,এই মেয়ে না থাকলে তাদের সংসার টা ভেসে যেতো।এই মেয়ের জন্য মন থেকে দোয়া আসে তার।তাদের এই বিপদে আল্লাহ তাকে পাঠিয়েছে তাদের কাছে।

____এই অ্যাক্সিডেন্টের পর রাহির মা তাকে নিয়ে যেতে এসেছিলেন,
সায়মা বেগম কে ও বলেছেন রাহিকে নিয়ে যেতে।তিনি কিছুই বলতে পারেন নি শত হোক সে তো আর তার পেটের সন্তান না।
____চল মা, এখানে আর থাকার দরকার নেই।
কিন্তু রাহি একধাপও নড়ে নি,সে শুধু মৃদু গলায় বলে,
__মা! এই পরিবারের আমাকে প্রয়োজন।
এরা ভেঙে পড়েছে,আমি গেলে কে সামলাবে।
মায়ের চোখের জল গড়িয়ে পড়ে,কিন্তু তিনি মেয়েকে আর জোর করেন না।রাহির কথা শুনে সায়মা বেগমের বুক কেঁপে ওঠে।কতটা আপন ভাবলে একটা মেয়ে নিজের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা না করে, তাদের সাথে রয়ে যায় শুধুমাত্র তাদের ভালো রাখার জন্য।
তিনি রাহিকে বুকে টেন।চোখে পানি নিয়ে বলেন,
তুইই আমার আরেকটা মেয়ে।আমাকে ছেড়ে যাস না মা ইশায়ার মতো।

___সায়মা বেগম বহুবার ফোন করেন।
আদ্রিয়ান একবারও ধরেনি।
আদনান রহমান ফোন দেন,
কিন্তু আদ্রিয়ান একটা মেসেজ পাঠায়,
আমি আসতে পারব না।
___এই বাক্যটাই সায়মা বেগমকে চুপ করে দেয়।
আদ্রিয়ান আসেনি।
মেহমানরা আসছে, অজু করছে, কোরআন তেলাওয়াতের শব্দ উঠছে,সবকিছুর মাঝেও সায়মা বেগমের চোখ বারবার দরজার দিকে যায়।হয়তো মনে মনে আশা করেন হয়তো এখন এখন দরজা খুলবে।আদ্রিয়ান ঢুকবে।

____মিলাদ শেষ।মেহমানরা একে একে বিদায় নিয়েছে। বাড়িটা আগের তুলনায় নীরব।
__রাহি জান্নাত দুজন মিলেমিশে ড্রয়িংরুম পরিষ্কার করছে।সেন্টার টেবিলের ওপর ছড়িয়ে থাকা টিশু, পানির গ্লাস, সব ঠিকঠাক গুছিয়ে রাখছে তারা।
রাহির মন খারাপ,আজকের সবাই ছিলো কিন্তু আদ্রিয়ান ভাই এলোনা,এটা তার মনকে আরও ভারী করে রেখেছে।
জান্নাত ধীরে বলে,
—ওর মাথাটাই খারাপ হয়ে গেছে মনে হয়,সব কিছু সহ্য করতে করতে ছেলেটা ভেঙে পড়েছে।
রাহি কোনো উত্তর দেয় না। শুধু নিঃশ্বাস ফেলে।
___ঠিক তখনই ওপর তলা থেকে দ্রুত পায়ের শব্দ আসে।সিঁড়ি বেয়ে দৌড়ে নিচে নেমে আসেন সায়মা বেগম।তার মুখ ফ্যাকাসে, চোখে ভয়।
শাড়ির আঁচল এক হাতে চেপে ধরে হাঁপাচ্ছেন।
—রাহি! জান্নাত! দ্রুত উপরে আয়,ইশায়ার বাবার বুকে খুব ব্যথা করছে।রাহির হাত থেকে মোমবাতির স্ট্যান্ডটা মাটিতে পড়ে শব্দ করে।এক মুহূর্ত দেরি না করে সে দৌড়ে সিঁড়ির দিকে ছুটে যায়।
জান্নাত দ্রুত আবিরকে ফোন দেয়।তার কণ্ঠ।কাঁপছে,আবিরকে দ্রুত আসতে বলে,জান্নাত উপর উঠতে উঠতে আদ্রিয়ানকেও কল দেয়।ফোন বারবার রিং হয়, কিন্তু সে ধরেনা।

___ঘরে ঢুকতেই দেখা যায়,
আদনান রহমান বিছানায় হেলে পড়ে আছেন। এক হাত বুকের ওপর চেপে ধরে আছেন, মুখ কুঁচকে আছে ব্যথায়।
সায়মা বেগম তার পাশে বসে কান্না চেপে বলছেন,
— অলরেডি স্প্রেটা দিছি, কিন্তু ব্যথা কমছে না।
জান্নাত এগিয়ে এসে বাবার কাঁধ ধরে বলে,
— বাবা, চলেন। এখনই হাসপাতালে যাই।
আদনান সাহেবের কণ্ঠ দুর্বল, শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে তার।
___কারো জন্য অপেক্ষা না করে, রাহি নিজেই রওনা দেয়, কারন অপেক্ষা করলে আর ও বড় কিছু হয়ে যেতে পারে। সায়মা বেগম আদনান রহমান কে ধরে পেছনের সিটে বসান।
রাতের ফাঁকা রাস্তায় গাড়ি ছুটে চলতে থাকে।সায়মা বেগম বারবার দোয়া পড়ছেন, আর রাহি চোখের পানিটা আটকে গাড়ি চালাচ্ছে দ্রুত।

___হাসপাতালে পৌঁছানোর পর নার্সরা স্ট্রেচার এনে আদনান রহমানকে নিয়ে যায়।
ডাক্তার এসে স্টেথোস্কোপ লাগিয়ে দ্রুত বলে,
— ইসিজি লাগান, ব্লাড প্রেসার চেক করুন, অক্সিজেন দিন।
__রাহি আর সায়মা বেগম অপেক্ষার ঘরে দাঁড়িয়ে,
দুজনেই কাঁপছে ভয়ে আতঙ্কে।সায়মা বেগম বারবার বলেন,আল্লাহ,ওনাকে সুস্থ করে দিন।
ইসিজি রিপোর্ট আসে ১০ মিনিট পর।ডাক্তার তাদের রুমে ডেকে নেন।
___ডাক্তার শান্ত গলায় বলে,
উনার আগে থেকেই হার্টে একটা সমস্যা ছিল। অতিরিক্ত চিন্তা, টেনশন আর মানসিক চাপের কারণেই অ্যাঞ্জাইনা অ্যাটাক হয়েছে।ভয়ের কিছু নেই। স্টেবল আছেন এখন।
সায়মা বেগম চোখ মুছে বলেন,

— ডাক্তার সাহেব, কিছু হবে তো না?
ডাক্তার মাথা নেড়ে বলেন,একটা জিনিস মনে রাখবেন
এখন থেকে তাকে কোনো রকম মানসিক চাপ, টেনশন, দুশ্চিন্তা দেওয়া যাবে না।ওষুধ নিয়মিত খেতে হবে।
খাবারে লবণ কম, নিয়মিত হাঁটা, আর সবচেয়ে জরুরি মনটা ভালো রাখতে হবে।তারপর প্রেসক্রিপশন লিখে দিয়ে বলেন,যে ওষুধগুলো দিলাম এগুলো মিস করবেন না।যদি আবার বুকে চাপ অনুভব করেন, শ্বাস নিতে অসুবিধা হয় তা হলে সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালে নিয়ে আসবেন।
রাহি কৃতজ্ঞ হয়ে মাথা নিচু করে।
_আদনান রহমান এখন স্টেবল।নার্স তাকে অক্সিজেন দিয়ে রেখেছে, কিছুক্ষণ পর বাড়ি যেতে দেবে।
রাহি দরজার পাশে বসে দেখছে,মনে মনে শুধু একটা কথাই প্রতিধ্বনিত হচ্ছে,আল্লাহ এই পরিবারের সুখ শান্তি ফিরিয়ে দাও একটার পর একটা বিপদ আসছে।

___সায়মা বেগম পাশে বসে কাঁদছেন চুপচাপ।
আদ্রিয়ান ফোন ধরেনি।সে জানে ও না।
আবির এসে পৌছায়, ডাক্তারের সাথে গিয়ে কথা বলে।
সায়মা বেগম কে এসে জড়িয়ে ধরে ,সান্তনা দেয় মা কে, বলে সব কিছু ঠিক হয়ে যাবে চিন্তা না করতে।
সায়মা বেগম এর মাঝেও জিজ্ঞেস করে আদ্রিয়ান কোথায়,আবির জানায় সে জানে না।
রাহির কণ্ঠ ভেঙে যায়,
— মামনি, আদ্রিয়ান ভাই এভাবে নিজেকে কেন শেষ করছে?
সায়মা বেগম শুধু মাথা নিচু করে বলেন,
— দুই সন্তান এর মাঝে একজনকে হারালাম, আরেকজন নিজের মতো করে হারিয়ে যাচ্ছে।
ডাক্তারের রিপোর্ট হাতে নিয়ে বের হওয়ার সময় আবির হাঁফ ছাড়ে,ভয়ে পেয়ে গিয়েছিলো সে,এক প্রকার উড়ে এসেছে এখানে।
ডাক্তার আশ্বস্ত করে, গুরুতর কিছু হয়নি। দুশ্চিন্তা, ক্লান্তি আর খাবারে অনিয়মের কারণে সামান্য হার্ট স্পাজম হয়েছে। নিয়মিত ওষুধ নিলেই ঠিক থাকবে।
রাহি সঙ্গে সঙ্গে সায়মা বেগমের হাত ধরে গাড়িতে তোলে।আবিরও সবাইকে নিয়ে বাসায় ফেরে।

___ঘরে ঢুকতেই আদনান রহমান ধীরে ধীরে হাঁটতে হাঁটতে সোফায় বসে পড়েন।
জায়ান দাদাকে দেখে খুশি হয়ে আদো আদো পায়ে কাছে আসে, আদনান সাহেব কোলে তুলে নেন তাকে।
আদনান সাহেব দুর্বল হাসি দিয়ে নাতির মাথায় হাত বুলিয়ে দেন।
কিন্তু পরিবারের সবাই তাকে উপরে গিয়ে বিশ্রাম নিতে জোর করে।
আবির নরম গলায় বলে,
বাবা, একটু রেস্ট নাও। আজকে অনেক ধকল হয়েছে তোমার।
__তিনি ধীরে বলেন,
তোমরা তো আছো,আমি ঠিক আছি।
___ডিনারের সময় সবাই চুপচাপ।ডিনার শেষ হলে একে একে সবাই নিজ নিজ ঘরে চলে যায়।সায়মা বেগম স্বামীর সাথে চলে যান।এই সময়ে তাকে কোনোভাবেই একা রাখা যাবে না,কখন কি প্রয়োজন হয়।
___রাহি টেবিলের কাছে এক কোণে চুপচাপ বসে আছে,জান্নাত কয়েকবার তাকে খেতে বললেও সে মাথা নাড়ে।আমি খাবো না ভাবী, আদ্রিয়ান ভাই ফিরুক আগে।জান্নাত আর কিছু না বলে চলে যায় তার রুমে।
___রাত বাড়তে থাকে।ঘুম তাকে গ্রাস করে, তবুও সে উঠে যায় না।শেষ পর্যন্ত সোফাতেই কুঁজো হয়ে ঘুমিয়ে পড়ে।

____বাড়ির সামনে বিদ্যুতের আলোয় কালো একটি গাড়ি এসে থামে।ইঞ্জিন বন্ধ হতেই নীরব রাতের ভেতর সেই শব্দ অস্বাভাবিক শোনায়।
দরজা খুলে নেমে আসে আদ্রিয়ান।চোখ লাল, মুখ ক্লান্ত, চুল এলোমেলো,একটা শোক, একটা ভাঙন আর একটা অপরাধবোধ মিলে পুরো মানুষটা শুকিয়ে গেছে।
আজকাল কিছুই তাকে টানে না।সে হারিয়েছে শুধু প্রিয় মানুষকে নয়,হারিয়েছে নিজের একটা অংশ।
তারপর একটার পর একটা দুর্ঘটনা,সে যতই ভাবছে ততই মনে হচ্ছে এর পেছনে অন্য কারও হাত আছে।
কিন্তু এতদিন খুঁজেও কোনো সূত্র পায়নি এটাই তাকে আরেক ধাপ ভেঙে দেয়।
সে শিওর শতভাগ নিশ্চিত এই সবকিছুর পেছনে একজনেরই হাত আছে, যার কারনে সাফা আর ইশায়ার আজ তাদের সাথে নেই, আর এটাই খুঁজে বার করার চেষ্টা করছে সে। কিন্তু বারবার শূন্য হাতেই ফিরতে হচ্ছে তাকে।
___আদ্রিয়ান চাবি বের করে দরজার লক খুলে ভেতরে ঢুকে।দরজা খোলার শব্দে রাহির ঘুম ভেঙে যায়।
সে চোখ মেলে উঠে দাঁড়ায়।
আদ্রিয়ান ভেতরে ঢুকে রাহিকে দেখে থমকে দাঁড়ায়।
তার দৃষ্টি শূন্য, গলা শুকনো,

__তোকে কতবার বলেছি, আমার জন্য অপেক্ষা না করতে।বলে সোজা উপরে যাওয়ার জন্য পা বাড়ায়।
___কিন্তু রাহির ক্ষীণ, ভাঙা গলা তাকে থামিয়ে দেয়,
তোমার কি তোমার বাবা মায়ের ওপর কোনো দায়িত্ব নেই?
আদ্রিয়ান ঘুরে তাকায়।দৃষ্টি আরও তীক্ষ্ণ, কিন্তু ক্লান্ত।
রাহি এক নিঃশ্বাসে বলে যেতে থাকে,
বাড়ির সবাই সকাল থেকে একটার পর একটা তোমাকে ফোন দিচ্ছে।কিন্তু তুমি কারোর ফোন ধরার প্রয়োজন মনে করোনি।কেনো? ওরা কি তোমার কেউ না।
___আদ্রিয়ান ভ্রু কুঁচকায়,রাহির এরকম আচরন তার কাছে অস্বাভাবিক।
রাহি এগিয়ে গিয়ে বলে,
আজ যদি বড় বাবার কিছু হয়ে যেত,তুমি কি কোনোদিন ও নিজেকে ক্ষমা করতে পারতে?
এই কথা শুনে আদ্রিয়ান মুহূর্তে থমকে যায়।
তার চোখে বিস্ময় ও ভয়,

__কি হয়েছে বাবার?তার গলা কেঁপে ওঠে।
রাহি তাচ্ছিল্য মিশ্রিত কষ্টের হাসি দেয়,
জেনে কি করবে?তুমি তোমার প্রেমিকা হারানোর শোক পালন করো।বাবা-মা, পরিবার এসব তোমার কাছে কিছু না,সব চুলোয় যাক। তাই না?
তারপর কাঁপা গলায়, কিন্তু দৃঢ় স্বরে বলে,শুধু সাফা আপুই মারা যায়নি, আদ্রিয়ান ভাই ইশায়া ও মারা গেছে।কিন্তু সেটা হয়তো তোমার মনে নেই।
___আদ্রিয়ানের মুখ ফ্যাকাসে হয়ে যায়।
তোমার বাবা-মা তাদের একমাত্র মেয়েকে হারিয়েছে।
এই শোকটা তারা আজও কাটিয়ে উঠতে পারেনি।
ওদের এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন তাদের ছেলেকে।
রাহির কণ্ঠ ভারী হয়ে আসে,কিন্তু তারা তোমাকে পায় না।মেয়ে হারিয়ে শূন্য বাবা-মা প্রতিদিন কষ্ট পায় তোমার জন্য।আজ বড় বাবার কি অবস্থা হয়েছিল জানো?একটু ভালো হওয়ার পর প্রথমেই তোমার কথা জিজ্ঞেস করেছেন।
তার পর রাহির গলা ভেঙে কান্নায় ডুবে যায়, কিন্তু তুমি ছিলে না,এটা দেখেই উনার মুখ ছোট হয়ে গেছিলো।
রাহি চোখ মুছতে মুছতে বলে,ওদের তোমাকে প্রয়োজন, তারা দুজনেই অসুস্থ,তাদেরকে একটু শান্তি দাও।শেষ বয়সে এসে তাদের একটু শান্তিতে থাকতে দাও।লতার শেষ বাক্যটা আদ্রিয়ানের বুক ছিন্নভিন্ন করে দেয়।

___রাহি আর কোনো কথা না বলে উপরে উঠে যায়।
রাহির প্রতিটি কথাই যেন ছুরির মতো বুকে বিঁধতে থাকে আদ্রিয়ানের।হঠাৎ তার মনে হয় সাফার মৃত্যুর শোক সামলাতে গিয়ে সে নিজের পরিবারকে সম্পূর্ণ হারিয়ে ফেলছে।
তার চোখে এক মুহূর্তের জন্য অপরাধবোধ জমে ওঠে।
বুকে কষ্টের ঢেউ আছড়ে পড়ে।
__আমি….. আমি কি সত্যিই ওদের ফেলে রেখেছি?
সে স্থির দাঁড়িয়ে থাকে,ঘরের নীরবতায় নিজের শ্বাসের শব্দও ভারী হয়ে ওঠে।
রাগ নেই তার, আছে দগদগে অপরাধবোধ আর গভীর শূন্যতা।
ধীরে ধীরে সে নিজের রুমের দিকে হাঁটে।
রুমে ঢুকতেই অন্ধকার তাকে যেন গিলে ফেলতে চায়।
সে দরজা বন্ধ করে দেয় ধীরে তারপর দেয়ালে ভর দিয়ে বসে পড়ে মাটিতে।
দুটো হাত দিয়ে মুখ ঢেকে ফেলে।
___বার বার কানে বাজছে,
ইশায়া ও মারা গেছে। তোমার বাবা-মা তাদের একমাত্র মেয়েকে হারিয়েছে।এই কথাগুলো তাকে ভিতর থেকে ভেঙে দিচ্ছে।তার মনে হয় সে যেন শুধু প্রেমিক নয়, একজন ভাই হিসেবে ব্যর্থ, আর সবচেয়ে কষ্টকর একজন ছেলে হিসেবেও ব্যর্থ সে।একটু সময় সেই অন্ধকার ঘরে বসে থাকে।চোখে পানি ভরে ওঠে, কিন্তু কাঁদে না।সে শুধু নিশ্বাস ফেলে ভারী, গা-ছমছমে।
শেষমেশ ধীরে পা টেনে উঠে দাঁড়ায়।চোখ মুছে বাবা-মায়ের রুমের দিকে হাঁটে।

____দরজাটা আস্তে খুলতেই দেখা যায় রুমের হালকা নরম আলোয় দুজনেই গভীর ঘুমে।
প্রথমে সে মায়ের দিকে তাকায় ক্লান্ত, শুকিয়ে যাওয়া মুখ।তারপর বাবার দিকে মুখটা আগের তুলনায় অনেক হালকা, চোখের পাশে কালি, গাল একটু দেবে গেছে।
আদ্রিয়ানের বুকটা মোচড় দিয়ে ওঠে।কতদিন কথা হয় না তার বাবার সাথে।মনে পড়ে যায় ডাইনিং টেবিলে করা তাদের খুনসুটি গুলো।বাবার বকা-আদর আহ্লাদ, বোনের সাথে ঝগড়া। আদ্রিয়ানের চোখ বেয়ে এক ফোটা অশ্রু গড়িয়ে পরে।আজ যদি সত্যি-ই কিছু হয়ে যেতো তখন কি করতো সে।
আদ্রিয়ান নিঃশব্দে গিয়ে বাবার পাশে বসে।হাত বাড়িয়ে আস্তে করে বাবার মাথায় রাখে।

___ঠান্ডা হাতের ছোঁয়ায় আদনান সাহেবের ঘুম ভেঙে যায়।
তিনি চমকে উঠেন,
কে?
আদ্রিয়ান আস্তে বলে,আমি বাবা। উঠো না, শুয়ে থাকো।
আদনান সাহেব এক সেকেন্ড তাকিয়ে থাকেন।
তার মুখে এমন এক হাসি ফুটে ওঠে,
যে হাসিতে শান্তি আছে, আর যেন একটু স্বস্তিও।
এসেছিস তুই,তার গলায় সেই অনুভূতি স্পষ্ট।
আদ্রিয়ান একটু মাথা নেড়ে বলে,হ্যাঁ। এখন কেমন লাগছে শরীর?
আদনান সাহেব নরম স্বরে বলেন,
আলহামদুলিল্লাহ।এখন ভালো আছি। তেমন কিছু হয়নি।তুই খেয়েছিস?
আদ্রিয়ান মিথ্যে বলে মাথা নাড়ে,

হুম, খেয়েছি।
আদনান সাহেব ছেলের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলেন,কি অবস্থা করেছিস শরীরের? ঠিকমতো খাওয়া-দাওয়া করিস না।এরকম আর কতদিন?
আমাদেরও তো বয়স হচ্ছে আর কতদিন বাঁচবো আমরা?তোকে এভাবে রেখে মরেও শান্তি পাবো না বাবা।নিজেকে ঠিক কর।
কথাগুলো শুনে আদ্রিয়ানের মন ভারী হয়ে ওঠে।সে নিচু গলায় বলে,কিছু হবে না তোমার ঔষধ টাইম মতো খাবে।আর কোন চিন্তা করা লাগবেনা।আমরা আছি তোমার সাথে, ইশু পাখি যদি তোমার এই অবস্থা দেখতো ও খুব কষ্ট পেতো বাবা।ও যেখানেই আছে তোমাকে দেখছে এরকম করোনা,নিজের যত্ন নাও।
তোমার কিছু হলে আমরা কিভাবে থাকবো বলো।
ঠিক তখনই সায়মা বেগমের ঘুম ভেঙে যায়।তিনি চোখ মেলে ছেলেকে দেখে স্থির হয়ে যান,তারপর সঙ্গে সঙ্গে উঠে বসে বলেন,
তুই এসেছিস? সারাদিন ফোন ধরলি না কেন?
কণ্ঠে বকা, কিন্তু ভিতরে চাপা আনন্দ।

__আদ্রিয়ান মাথা নিচু করে কিছু বলে না।এড়িয়ে যায়। তারপর বলে,মা, একটু কফি বানিয়ে দাও তো।
এই একটি বাক্যেই সায়মা বেগমের মুখ নরম হয়ে যায়।
এতদিন পরে ছেলের এমন স্বাভাবিক কথায় তার বুক ভিজে ওঠে তৃপ্তিতে।
তিনি হাসিমুখে বলেন,ঠিক আছে, বস তুই। আমি আনছি।
আদনান সাহেব বলেন,
আমি নিয়ে আসি তোমার জন্য।
সায়মা বেগম দুজনকেই থামিয়ে দিয়ে বলেন,
থাক, আমি-ই করি।
তারপর কিচেনে চলে যান।
ছেলের জন্য কফি বানাতে বানাতে তার মনে শান্তির ঢেউ, এই মুহূর্তটাই যেন বহুদিন পর পাওয়া রত্ন।
এদিকে রুমে বাবা-ছেলে বসে ব্যবসার কথা, কয়েকটা দোকানের ভালো-মন্দ, কিছু হিসাব অনেকদিন পর এমনভাবে তাদের কথা হয় পুরনো দিনের মতো।
আদ্রিয়ানও ধীরে ধীরে শান্ত হয়,রুমের ভার কমে আসে।ঠিক তখন সায়মা বেগম তিনটা কফির কাপ হাতে নিয়ে ঢোকেন।ট্রের কাপগুলো থেকে ধোঁয়া উঠছে,
গরম কফির গন্ধ রুম ভরিয়ে তোলে।তিনজনে একসাথে বসে কফি খেতে থাকে।আদনান সাহেব আর সায়মা বেগম দুজনের চোখেই একই রকম শান্তি।
ছেলের ফিরে আসার আনন্দ।আদ্রিয়ান চুপচাপ তাদের দেখে,তার বুক হঠাৎ হালকা লাগে।
বাবা-মায়ের হাসিমুখ,যেটা সে বহুদিন দেখেনি,
এটুকুই যেন তাকে একটু বাঁচিয়ে তোলে।রুমে এক ধরনের পারিবারিক উষ্ণতা ফিরে আসে।যেটা অনেকদিন ছিল না।

মেক্সিকোর সবচেয়ে সুরক্ষিত সাম্রাজ্য Alvarez Estate।
রাতের অন্ধকারে প্রাসাদটি দাঁড়িয়ে আছে কংক্রিট আর পাথরে গড়া এক বিশাল দানবের মতো,নীরব কিন্তু ভেতরে যেন বজ্রপাতের মতো উত্তেজনা জমে আছে।
আজকের এস্টেট অন্যরকম।শান্তি নেই, নিস্তব্ধতা নেই
আছে শুধু পরিবর্তনের গর্জন।ভীরের আদেশ ইশায়ার ট্রমা-সেশন শেষ হওয়ার পর ডাক্তার বলেছে,৪৮ ঘন্টার মধ্যে জ্ঞান ফিরবে।
তার কাছে এতটুকুই সময় যেভাবে ইশায়ার স্মৃতি থেকে মুছে ফেলেছে সবকিছু, সেভাবেই মুছে ফেলবে এই প্যালেসের সবকিছু।

___ইশায়ার জ্ঞান ফেরার আগেই
ভীর ডিয়েগোকে বলে,পুরো Alvarez Estate চেঞ্জ করে ফেলতে।ইশায়ার চোখে পুরোনো কিছুর ছায়াও যেন না পড়ে।
ডিয়েগো ও কাজে লেগে পড়ে তৎক্ষনাৎ এটা শুধু আদেশ নয়,এটা অতল ভয় আর প্রেমের মিশ্রণ।
ইশায়ার পুরোনো সব জিনিস সরিয়ে ফেলা হয়,
তার ঘর, তার ব্যবহারের জিনিস, তার পুরোনো পোশাক কোন কিছুই বাদ পড়েনা,সব সরিয়ে ফেলা হয়। যেখানে সে ট্রমায় ছিলো পুরোনো সব কিছু
যেখানে সে আতঙ্কে ছিলো এমন কিছু আর ভীর রাখবে না।সেসবের চিহ্ন ও একটুও রাখা হয় না।
দেয়ালের রঙ বদলে দেওয়া হয়।অন্ধকার রঙ, ট্রিগারিং প্যাটার্ন সব মুছে ফেলা হয়েছে।ভ্যানিলা সুগন্ধির নরম পরিবেশ পুরো এস্টেটে বসানো হয় বিশেষ হালকা ভ্যানিলা ডিফিউজার।ভ্যানিলা মানসিক শান্তি আনেডাক্তার সুপারিশ করেছে।
ঘরে, করিডোরে, বিশ্রাম কক্ষে শান্ত, নরম, নিরাপদ অনুভূতি।অ*স্ত্র সব কিছু সরিয়ে ফেলা হয়, ইশায়া যদি ভয় পায়,উত্তেজিত হয়,বা চমকে ওঠে এই ভয়ে।
কোনো ধারালো পয়েন্ট যেন তাকে আঘাত না করে।
রুমের জন্য সব নতুন করে সাজানো হয়।

__ভীরের স্পষ্ট নির্দেশ,
ইশায়ার সামনে কেউ উচ্চস্বরে কথা বলবে না।
কেউ ভীতিকর আচরণ করবে না।মাফিয়া সাম্রাজ্যের কিছুই যেনো তার সামনে না আসে।তাকে বাইরের কোন কিছু যেনো না বলা হয়।অতিরিক্ত সব নিষিদ্ধ করা হয়।
ভেতরের গার্ডদের হাতে কোন অ*স্ত্র থাকবে না।
কারণ ভীর জানে,ইশায়ার চোখে অ*স্ত্র মানেই আতঙ্ক।
তাকে শান্ত রাখতে হবে।
ভয়ের কিছু দেখানো যাবে না।কিন্তু বাইরের গার্ড দ্বিগুণ বৃদ্ধি করা হয়।ভীরের এই আদেশের সাথে সাথে,ছাদে স্না-ইপার ইউনিট দক্ষিণ ও পশ্চিম গেটে ডাবল সেন্সর টাওয়ার,প্রাসাদের বাগানে মোশন অ্যালার্মআকাশে নাইট ড্রোন প্যাট্রোল সব তোরজোর আগের থেকে দ্বিগুন করা হয়।ভীর জানে, ইশায়া শুধু তার বন্দী নয়,সে তার দুর্বলতা।আর তার দুর্বলতা মানে শত্রুর নিশানা।

___ভীর নিজেই সবকিছুর তদারকি করছে।
প্যালেস সেজে উঠছে নতুন রুপে।
মারিয়ে এলেনা আসে,মাথা ঝুকিয়ে সম্মান জানায় ভীরকে,
ভীর মারিয়া এলেনাকে ধীরে, কিন্তু ভয়াবহ দৃঢ়তায় বুঝিয়ে দেয় ইশায়ার সামনে ঠিক কী কী বলতে হবে, কীভাবে বলতে হবে, এবং কীভাবে তার চারপাশে একটা নিখুঁত মিথ্যে দুনিয়া দাঁড় করাতে হবে। যেই দুনিয়া জুড়ে শুধু মাত্র রাজভীরের রাজত্ব থাকবে। প্রতিটি কথা ভীর এত সূক্ষভাবে বলে দেয় যে ভুল করার কোনো সুযোগই থাকে না।আর ভুল করলে এর পরিমাণ কি হবে সেটা সবাই খুব ভালো করেই জানে।
মারিয়া এলেনা নির্বিকার পাথরের মতো দাঁড়িয়ে সব শুনে যায়। আজ ভীরকে দেখে তার মনে অন্যরকম রকমের ভয় দানা বেধেছে। ভীরের চোখে সেই অচেনা উন্মাদনা যা সে আগে কখনও দেখেনি। তার গায়ে সাদা শার্ট, আর শার্টের কোনাগুলোয় ছিটে ছিটে শুকনো র*ক্তের দাগ। কোমরের পাশে গোঁজা রিভ*লবার,
উজ্জ্বল শ্যামবর্ণের মুখটা আজ আরও কঠিন, আরও হিংস্র দেখাচ্ছে ঘাড় পর্যন্ত নেমে আসা এলোমেলো চুল, আর আগের তুলনায় একটু বড় হয়ে যাওয়া দাড়ির কারণে তার চেহারায় একটা ভয়ংকর ছায়া নেমে এসেছে।
ভীরের এই আচরণ, এই অবস্থা সবাইকে তার প্রতি আরও বেশি ভীত করে তোলে।

____ম্যাটিয়াস ও সান্তিয়াগো তিনদিন ধরে ব্যাকগ্রাউন্ড চেক চালায়।ভীর আগেই ইশায়ার জন্য প্রশিক্ষিত নতুন গার্ড নিয়োগ করতে বলেছে, সিকিউরিটি আরো বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে।তাদের মতে সব প্রার্থীই ক্লিন।
কিন্তু তারা বুঝতে পারেনি,শত্রুরা এবার দল বেঁধে নেমেছে।যে রাজ্যগুলো ভীর একে একে দখল করেছে,
যাদের সাম্রাজ্য ধ্বংস করেছে তারা সবাই এক হয়েছে তার বিরুদ্ধে তাকে ধ্বংস করতে। আর গুয়াতেমালার ঘটনার পর তারা স্পষ্টভাবে দেখেছে, ভীরের দুর্বলতা ইশায়া রহমান।আর সেটাই এখন তাদের টার্গেট।
___ গার্ড নিয়োগের সময় ইন্টারভিউতে ছিল অদ্ভুত শান্ত চোখের এক মেয়ে।তার মেডিক্যাল রিপোর্ট জাল
তার পরিচয় সম্পূর্ণ ফেইক,তার নথিপত্র সব বানানো।
কিন্তু তার আসল পরিচয়?
ইতালীয় আন্ডারগ্রাউন্ড সি*ন্ডিকেটের বিশেষ ট্রেনিং প্রাপ্ত অপারেটিভ।
তার লক্ষ্য Alvarez Estate এর ভিতর থেকে তথ্য চুরি,
নিরাপত্তা ভেদ করা,এবং সবচেয়ে বড় কথা, ইশায়াকে টার্গেট করা।
এলিজা শান্ত মুখে সবার সঙ্গে মিশে যায়।কেউ সন্দেহ করতে পারল না এমনকি ম্যাটিয়াসও না।

___প্রাসাদ পুরোপুরি বদলে গেছে।একদম নতুন, নিরাপদ, নরম পরিবেশ। নতুন বিশজন নারী গার্ড দাঁড়িয়ে আছে,কিন্তু এখনো তাদের পরিধি ঠিক করে দেওয়া হয়নি। সেই সারির একপ্রান্তে শান্ত মুখের ছায়ার মতো দাঁড়িয়ে আছে এলিজা।
এলিজা ছায়ার মতো প্রাসাদের ভেতর চলাফেরা করে।ইশায়ার রুমের বাইরে দাঁড়ায়,কিন্তু ভেতরে প্রবেশ করার অনুমতি পায় না।
সে রুমে ঢুকতে পারে না,কিন্তু তীক্ষ্ণ চোখে সব পরোখ করে। সে দেখছে প্রতিটি দরজা প্রতিটি ক্যামেরা প্রতিটি লক প্রতিটি সেন্সর অস্বাভাবিক শান্ত মুখে তথ্য জমা করছে।তার চোখে ঠান্ডা, নির্দয় ঝিলিক।
ধীরে খুব আস্তে আঙুলে গ্লাভসের সেলাই স্পর্শ করে ফিসফিস করে,

সে আমার বন্দিনী পর্ব ৬২

Soon, Alvarez…
your empire will burn
from the inside.
তার কণ্ঠ এতটাই ঠান্ডা,
যেন এই মুহূর্তেই সে ধ্বংসের ঘোষণা দিয়ে গেল।
___শত্রুর ছায়া ভেতরে ঢুকে পড়েছে।আর ভীর,
তার জীবনের সবচেয়ে ভয়ংকর যুদ্ধের দরজায় দাঁড়িয়ে আছে।

সে আমার বন্দিনী পর্ব ৬৪