সে আমার বন্দিনী পর্ব ৬৪
তানিয়া হুসাইন
___ ডিভানে বসে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ভীর ইশায়ার দিকে। ঘড়ির কাটা যেনো চলছে না।ভীর বার বার তাকাচ্ছে কখন ইশায়ার জ্ঞান ফিরবে এই অপেক্ষায়।ভীর আলভারেযের মাথার ভেতর একটা মাত্র চিন্তা ঘুরছিল,ইশায়ার জ্ঞান ফেরার মুহূর্ত।
এরপর সে কেমন আচরণ করবে, কেমন চোখে তাকাবে তার দিকে এই অপেক্ষায় ভীরের পুরো শরীর টেনশনে শক্ত হয়ে যাচ্ছে। সে কি সামলাতে পারবে সবকিছু,আগের কিছু কি তার মনে থাকবে এগুলোই ভাবছে সে।
___কিন্তু ঠিক সেই সময় খবর আসে।
একজন গার্ড এসে জানায়, তাকে এই মুহূর্তে অফিস রুম যেতে হবে খুব ভয়াবহ একটা নিউজ এসেছে।সবাই আপনার জন্য অপেক্ষা করছে।
___সিনালোয়ায় হামলা হয়েছে।
এই কথা শুনে মূহুর্তের মধ্যেই ভীরের মুখ শক্ত হয়ে যায়।কার এতো বড় সাহস হলো যে তার এলাকায় এসে তার সাথে বিদ্রোহ করার,
ভীর যেতে নিয়ে তাকায় ইশায়ার দিকে, তাকে ছেড়ে যেতে এখন কোথাও ভীরের মন সায় দিচ্ছে না।
ভীর ইশায়ার কাছে এসে ঝুকে চুমু খায় তার কপালে,নরম তুলতুলে গালে তার শক্ত খড়খড়ে হাত দিয়ে আলতো হাত বোলায়।
তারপর শক্ত গলায় বলে,
আমার কেনো জানি মনে হচ্ছে পুরো কায়নাত চায় আমাকে তোমার থেকে দূরে রাখতে,ভীর ইশায়ার গালে বৃদ্ধা আঙ্গুল বোলাতে বোলাতে তাচ্ছিল্য ভাবে হেসে বলে,কিন্তু আফসোস রাজভীর আলভারেয বেঁচে থাকতে কখনো তোমাকে হারাতে দেবে না।
তোমাকে আমার দৃষ্টি সীমানার বাইরে কখনো সরতে দেবো না, যতক্ষণ আমার এই দেহে প্রাণ আছে, যতক্ষণ আমার শ্বাস চলছে কারোর ক্ষমতা নেই তোমাকে আমার কাছ থেকে দূরে নিয়ে যাওয়ার।
আমি না থাকলেও তুমি আমার থাকবে। আজীবন আমার হয়ে বেঁচে থাকতে হবে, সেই ব্যবস্থাও আমি করে যাব। আমি মারা গেলেও তুমি আমার থাকবে। আমার নাম নিয়ে বাঁচবে। ভীর কথা গুলো বলে ইশায়ার ওষ্ঠে আলতো পরশ বুলিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়ায়, তারপর বেরিয়ে যায় দ্রুত।
___ভীর অফিস রুমে ঢুকতেই সবাই উঠে দাঁড়ায়।
ভীর তার জায়াগায় বসতেই,
এনরিকো তাকে একে একে সবকিছু জানায়।
__কথাগুলো শুনতেই ভীরের চোখ ধীরে ধীরে সরু হয়ে আসে।চোয়াল শক্ত হয়ে ওঠে।
এনরিকো সান্তিয়াগো বলতে থাকে।
আমাদের অনেক মানুষ অনেক গার্ড মা*রা গেছে।
এক মূহুর্তের জন্য পুরো রুমে নিস্তব্ধতা নেমে আসে।
তারপরই আগ্নেয়গিরির মতো ফেটে পড়ে ভীর রাগে।
চোখ রক্ত লাল। শরীরের ভেতর জা*নোয়ারটা যেন জেগে উঠে,
তার হারানো রাজ্যগুলোর মাফিয়ারা,যাদের একে একে ধ্বংস করে ভীর নিজের সাম্রাজ্য বানিয়েছে,
এবার সবাই মিলে জোট বেঁধেছে তার বিরুদ্ধে।
ব্লাড কার্টেল যাদের মাথা সে দু’ বছর আগে কেটে রাস্তার মাঝে ঝুলিয়ে দিয়েছিল, মেক্সিকোর সেই ভয়ংকর পাঁচটা কার্টেল, যাদের সে একে একে ধ্বংস করে নিজের রাজ্যের সাথে যুক্ত করেছে,
সবাই এখন একজোট হয়ে ফিরে আসছে প্রতিশোধ নিতে।ভীর জানে এ আক্রমণ শুধু শুরু।টার্গেট তাদের কী সেটা ভালো করেই বুঝতে পারছে।
ভীর চোয়াল শক্ত,রাগে তার শরীর কাপছে,
they Want a war.
ভীর খুব নিচু গলায় বলে,
_Then i will give them a massacre.
এই অবস্থায় ইশায়াকে ছেড়ে যেতে তার মনটাও যেন ছিঁড়ে যাচ্ছে।কিন্তু তার সাম্রাজ্য যেটা সে গড়ে তুলেছে র*ক্ত দিয়ে, আগুন দিয়ে, শ*ত্রুর লা*শ ফেলে, সেটাকে সে ভেঙে পড়তে দেবে না।
ভীর শক্ত গলায় বলে,নিকো ইমিডিয়েট জেট রেডি করো। আমরা সিনালোয়া যাচ্ছি।
বীরের আদেশ অনুযায়ী তৎক্ষণাৎ সবাই সব কিছুর ব্যবস্থা করতে শুরু করে।
_________আলভারেয প্যালেস,
ইশায়া ধীরে ধীরে চোখ মেলে তাকায়।প্রথমেই আলোটা চোখে লাগে ইশায়া আবার চোখ বন্ধ করে ফেলে।
কয়েক সেকেন্ড পর আবার খুব ধীরে, চোখ মেলে তাকায়।
___মারিয়া এলেনা দূরে দাঁড়িয়ে ছিল।
ইশায়াকে তাকাতে দেখে সে এগিয়ে এলেও তার বুক কাঁপছে,আজ সে কেমন আচরণ করবে এই ভয়ে।
মারিয়া এগোয় সামনে, আর রাণিয়া দৌড়ে গেল ডা. লিয়ানা আর এনাকে ডাকতে।
__ইশায়া উঠে বসতে চাইল, কিন্তু মাথা ভারে দুলে গিয়ে আবার শুয়ে পড়ে।মনে হচ্ছে শরীরটা তার নিজের না,শুকনো ঠোঁট, কাঁপা হাত, বুকের গভীর থেকে একটা অচেনা শীতলতা পুরো শরীরে ছড়ানো।
মারিয়া তাকে ধরে বসালো ধীরে, খুব সতর্কভাবে।
ইশায়া চারদিকে তাকায় তার চোখ গোল, ভয়মিশ্রিত, অচেনা,ইশায়া সবার দিকে তাকায় কোন কথা বলে না।
তার দৃষ্টি শুধু সবার মুখের উপর ঘুরে ঘুরে থেমে যায়
ফাঁকা চোখে।যেন সবাই তার কাছে অচেনা ছায়া।
___ডা. লিয়ানা আর এনা ঢুকে রুমে।
এনার চোখে অপরাধবোধ মেয়েটার সাথে কত অন্যায় হচ্ছে।কিন্তু প্রতিবাদ করার সাহস নেই তার।তার ও যে পরিবার আছে
লিয়ানা একেবারে ঠাণ্ডা। তার কাছে ইশায়া শুধু একজন রোগী।আদেশ মানা, পর্যবেক্ষণ করা এটাই তার কাজ।
___ইশায়া বিভ্রান্ত, ভীত, অচেনা মুখ দেখে তীব্র অস্বস্তিতে আছে সে।সে কোথায় আছে জানে না।
এমনকি নিজের শরীর, নিজের নাম সবই যেন অপরিচিত।
সে মুখ খুলে কিছু বলতে চায়,কিন্তু গলা থেকে কোনো শব্দ বের হয় না।শুধু নিশ্বাস ভারী হয়ে ওঠে।
হাত দুটো কাঁপছে,সে নিজের মাথায় হাত দেয়, মনে করার চেষ্টা করে,কিন্তু কিছুই আসে না।
ডা. লিয়ানা ইশায়াকে দেখে,নরম কিন্তু দৃঢ় কণ্ঠে বলে,
মিসেস ইশায়া শান্ত হও। তুমি নিরাপদ।
ইশায়া তাকায়, কিন্তু চোখে এক ধরণের শূন্যতা।
মিসেস ইশায়া শব্দ টা কানে বাজে তার।নিরাপদ কি না এটার কোনো ধারণাই নেই তার।
___ডা. লিয়ানা ধীরে জিজ্ঞেস করে,
তোমার নাম কি?
ইশায়ার শ্বাস থেমে যায় মুহূর্তের জন্য,
সে মুখ খোলে কিন্তু কোনো শব্দ আসে না।
ডা. লিয়ানা আবার জিজ্ঞেস করে,
শুনতে পাচ্ছো? তোমার নামটা বলো।
ইশায়া এবার চোখ নামিয়ে ফেলে।ঠোঁট নড়ে, কিন্তু শব্দহীন।সে উত্তর দিতে পারে না।
বা হয়তো পারে কিন্তু তার মাথায় নামটাই নেই।
মারিয়া এলেনার বুক ফেটে যাচ্ছে দেখে,কিন্তু সে স্থির।
ইশায়া শুধু ফিসফিস করে,
আমি… আমি… কে?তার কণ্ঠ ভেঙে যায়।
রুমের বাতাস ভারী হয়ে ওঠে।
রুমের বাইরে বুটের শব্দ,আঠারো গার্ডের টহল।
ইশায়া সেই শব্দ শুনে চমকে ওঠে।রুমজুড়ে ১০/১২ জন একই পোশাকের কিছু মহিলার দাঁড়িয়ে, এসব কিছু দেখে ইশায়ার চোখ আরো ভীত হয়ে যায়।সে পিছিয়ে যেতে চায়, কিন্তু শক্তি নেই।
মারিয়া এলেনা তার কাঁধে হাত রাখে,
আপনি ভয় পাবেন না,আপনি নিরাপদ, কিছু হবে না।
যদিও সে নিজেই জানে,
এই প্যালেসে কেউ সত্যিই নিরাপদ নয়।
_____সিনালোয়ার আকাশ আজ ধোঁয়ায় ঢাকা।
ভীর পৌঁছাতেই চারদিকের লোকজন ছুটে এসে দাঁড়ায়।মাটিতে র*ক্ত, পোড়া গাড়ি, ভীরের গার্ডদের লা*শ পড়ে আছে ছড়িয়ে ছিটিয়ে।কারো চোখ খোলা, কারো হাত ভাঙা, কারো মাথায় গু*লি।
এ দৃশ্য দেখতেই ভীরের বুকের ভেতর আগুন যেন আরো লাফিয়ে উঠে।
ম্যাটিয়াস এগিয়ে এসে গম্ভীর কণ্ঠে বলে,
বস! ওরা উত্তর দিক দিয়ে ঢুকেছিল। গার্ডরা ঠেকাতে পারেনি,ওরা হঠাৎ করে এসে আক্রমণ করে, অনেকজন ছিলো সাথে ভা*রী অস্ত্র।সবকিছু সামলে ওঠার আগেই…
ভীর রি*ভলবারটা কোমর থেকে বের করে,তার চোখ দুটো অন্ধকার।কোথায় ওরা?গম্ভীর স্বরে বলে।
সান্তিয়াগো ইশারা করতেই নিকো লক্ষ্যবস্তু দেখাল
পুরনো বন্দর, যেখানে শত্রুরা এখনও আছে।
ভীর তার টিম নিয়ে বন্দরের দিকে এগোয়।
বন্দরের ভেতর ঢুকতেই শ*ত্রুরা গু*লি ছুঁড়তে থাকে।
ভীরের লোকেরা আশ্রয় নেয় আড়ালে, কিন্তু ভীর দাঁড়িয়ে রয় সোজা,যেন গু*লিকে উপহাস করছে সে।
নিকো চিৎকার করে বলে,ভীর সামনে থেকে সরো।
ডিয়েগো ডাকছে, কিন্তু ভীর শুধু হাসে,ঠান্ডা, ধারালো, ভয়ংকর হাসি।
তারপর দুই হাতে গুলি ছুড়তে থাকে সামনের দিকে,আর এগিয়ে যেতে থাকে।মুহূর্তের মধ্যে চারপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়তে থাকে নিথর শরীর।
একজন সামনে এগিয়ে আসতেই তার গলা টিপে ধরে দেয়ালে ছুঁড়ে মারে।বন্দরের ভেতর ভীর যেন একা এক সেনাবাহিনী।
নিকো, সান্তিয়াগো, এনরিকো,ডিয়েগো ভীরের সব সৈন্য সবাই লড়ছে,কিন্তু ভীরের আক্রমণ এমন যে,শত্রুরা আতঙ্কে পিছিয়ে যাচ্ছে।
এটাই ভীর আলভারেয।একটা নাম যেটা শুনলেই সবার বুক কেঁপে ওঠে।
অল্প সময়েই শত্রুপক্ষের বেশিরভাগ লোক মারা পড়ে।বাকিরা পালিয়ে যায় জীবন বাঁচাতে। র*ক্তে ভিজে গেছে বন্দর।আগুনের আলোয় ভীর দাঁড়িয়ে তার চোখে রক্তিম ক্রোধ ও পাগলামির ছায়া।
ডা. লিয়ানার টিম ইশায়াকে পরীক্ষা করে দেখে হার্টবিট নরমাল, ব্রিদিং স্টেডি।
পরীক্ষা শেষ হতেই যব কিছু অবজারভ করে, লিয়ানা হাসি চাপতে পারলো না তাদের কাজ সফল হয়েছে।
ডাক্তার নিজের খুশি আটকে রেখে নরম গলায় ইশায়াকে রেস্ট নিতে বলে,
এরপর তিনি বেরিয়ে যান, এনা ও তার পিছু পিছু বেরিয়ে গেল।
রুম নিস্তব্ধ হয়ে যায়, শুধু চারপাশে লম্বা-বডি আর্মড উইমেন গার্ডরা দাঁড়িয়ে আছে পাথরের মতো নিষ্প্রাণ,যেন মানুষ নয় প্রশিক্ষিত যন্ত্র।
ইশায়া আবার ও ধীরে চোখ মেলে তাকায় চারপাশে।
কিছু মনে করার তীব্র ইচ্ছা যেনো তার মস্তিস্কে ররক্তক্ষরণ করছে।
চারদিকে এত অচেনা মুখ, দেয়াল ভারী পর্দা, শীতল বাতাস সবকিছু তাকে আরও বিভ্রান্ত করছে
সে মাথা তুলতে চাইল, কিন্তু শরীরে বিন্দুমাত্র শক্তি নেই। মাথা ভার, বুক ধুকপুক করছে।
মারিয়া এলেনা এগিয়ে আসে,
কিন্তু তার নিজের হাতই কাঁপছে কারণ সে জানে, ভীর তাকে কি করতে বলেছে। আজ ইশায়ার সামনে তাকে একটা পুরোপুরি সাজানো মিথ্যে দুনিয়া দাঁড় করাতে হবে।
ইশায়া গোল গোল চোখে সবার দিকে তাকাচ্ছে
সে কাউকে চেনে না।হৃদস্পন্দন বেড়ে যাচ্ছে। চুপচাপ ফিসফিস করে বলে
আমি কে আন্টি? আমার নাম কী? আমি… কিছুই চিনতে পারছি না কেনো?আপনি কে?
মারিয়া নিজের ভয় গিলে ফেলে শান্ত স্বরে প্রথম বাক্য উচ্চারণ করল,
__আপনার নাম ইশায়া, মিসেস ইশায়া আলভারেয।
আপনি আমাদের বস রাজভীর আলভারেয এর ওয়াইফ। এই পুরো প্যালেস আপনার।আমরা আপনার সেবায় নিয়োজিত।
ইশায়া বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকে।
বিবাহিত সে?
তার ভ্রু কুঁচকে আসে,আমার কিছুই মনে পড়ছে না কেনো?
মারিয়া এলেনা সেই মুখস্থ করা বুলি নিখুঁতভাবে আওড়িয়ে যায়, যেন সে একটা রোবট,
__আপনার একটা অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছিল ম্যাডাম বেশ বড় ধরনের।এ কারণেই আপনার স্মৃতি চলে গেছে।
ডাক্তার বলেছে খুব শীঘ্রই সব ঠিক হয়ে যাবে।
ইশায়া আরও বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে।
সে বারবার নিজের হাত,মুখ গলায় নিজের মাথায় হাত রাখছে কোনো এক পরিচিতি খুঁজছে, কিন্তু খুঁজে পাচ্ছে না।
মারিয়া তার কাঁধে হাত রেখে আবার বলে,
বস আসলে আপনাকে সব বুঝিয়ে বলবেন। আপনি মাথায় কোনো চাপ দিবেন না, ডাক্তার আপনাজে স্ট্রেস নিতে নিষেধ করেছে।
ইশায়া আস্তে আস্তে বলে,
_কে… বস?
মারিয়া মাথা নিচু করে উত্তর দেয়,
ভীর স্যার।
রাজভীর আলভারেয।মেক্সিকোর বাদশাহ!আর আপনার স্বামী।
___নামটা ইশায়ার কানে বাজতে থাকে।কিন্তু তার মস্তিস্ক শূন্য, হাজার চেষ্টা করেও কিছু মনে করতে পারছেনা।সবকিছু দুঃস্বপ্নের মতো।এত অচেনা কথা, অচেনা মুখ, অচেনা জীবন তার মাথার ভেতর ঘূর্ণিঝড়ের মতো সব ঘুড়তে থাকে।
ব্যথায় কুঁকড়ে উঠে সে ধীরে ধীরে বিছানায় শুয়ে পড়ে।
শরীর পুরো কাঁপছে, মাথা ব্যথায় ভরে গেছে।চোখ দুটো ভারী হয়ে এলে সে আর কিছু বলে না চুপচাপ চোখ বন্ধ করে শ্বাস নিতে থাকে।
চারপাশে থাকা গার্ডদের বুক-ফাটা নিস্তব্ধতা আর ঠান্ডা দৃষ্টিতে পুরো রুমটা যেন আরও ভুতুড়ে, আরও অচেনা হয়ে ওঠে ইশায়ার কাছে।
ইশায়ার জন্য এই পৃথিবী এখন শুধু একটা অন্ধকার, অপরিচিত, ভয়ংকর গোলকধাঁধা।
___ভীরের হাতে ধরে ত*লোয়ারের ধার বেয়ে রক্ত গড়িয়ে পড়ে।ভীরের শরীর পুরোপুরি র*ক্তে ভিজে গেছে নিজের না, শত্রুদের।
বেশিরভাগ শত্রুপক্ষের লোকই মাটিতে লুটিয়ে পড়ে আছে, নিথর।কিন্তু যারা পালিয়ে গেছে
তাদের নামই এখন সবার ঠোঁটে ঠোঁটে।সবাই খুঁজছে ওদের।ভীর চিৎকার করছে,ওদেরকে বেরিয়ে আসতে বলছে।গার্ডদেরকে বলছে চিৎকার করে ওদেরকে খুঁজে বের করতে। ভীরের রাগ নিয়ন্ত্রণের বাইরে।সে মৃ*ত দেহগুলোর ওপরও এলোপাতাড়ি ত*লোয়ার চালিয়ে যাচ্ছে।মরা শ*রীরেও যেন তার রাগ কমছে না।
__নিকো এগিয়ে এসে ভীরকে শান্ত হতে বলে।
কিন্তু ভীর কারোর কথা শুনতে নারাজ।
এই জানোয়ারগুলোর কারণেই আজ তাকে এই অবস্থায় আসতে হয়েছে,
এই জিনিসটাই তার মাথার ভেতর আগুন জ্বালিয়ে রাখছে।
___এদিকে, সিনালোয়ার প্যালেসে ক্যাটালিনা জাকজমক আয়োজন শুরু করে দিয়েছে।
ভীর আসবে এই খবর সে আগেই জানত।ভীরের রুম পরিষ্কার করা থেকে শুরু করে তার পছন্দের খাবার সব কিছুর ব্যবস্থা করা হয়েছে।
সিনালোয়া আক্রমণের পর ভীর আসবে এটা ক্যাটালিনা খুব ভালো করেই জানে।
আর ভীর যে এসে গেছে,
এই খবর সে পেয়েছে বলেই এত আয়োজন।
ভীর যতবারই কোনো প্রয়োজনে সিনালোয়া এসেছে,প্রতিবারই ১০–১২ দিন এখানেই থাকে।
___ক্যাটালিনা তার ভাইয়ের মেয়েকে ফোন করে আসতে বলেছে।ভীর সিনালোয়া এসেছে শুনে সারা ও পাগল হয়ে জানায় সে এক্ষুনি বের হচ্ছে।
___ভীর এর মাঝে প্রাসাদে ফোন দিয়ে ইশায়ার খোঁজ নেয়।জানতে পারে ইশায়ার জ্ঞান ফিরেছে।
এই খবরটা শুনে এক মুহূর্তের জন্য সে থেমে যায়।
কত দিন ধরে সে এই খবরটার জন্য অপেক্ষা করছিল,কত রাত, কত অস্থির সময়।আর এখন সে সেখানে নেই।
নিকো ভীরকে বলে,
উঠো ব্রো।
ওরা পালিয়েছে কিন্তু আমাদের লোক গেছে আমরা ঠিকই ওদের খুঁজে বের করবো।
__ভীর হঠাৎ বলে ওঠে,
জেট রেডি করতে বলো এখনই।
নিকো অবাক হয়ে তাকায়।
কেনো?এখানে থাকবেন না? ওরা এখ….
__ভীর শক্ত, ঠাণ্ডা গলায় বলে,
নো।
___ডিয়েগো কিছু বলতে যায়,কিন্তু
ভীর গর্জে ওঠে,
___জেট রেডি করো!
তার কণ্ঠে এমন এক আদেশ, যেখানে প্রশ্ন করার জায়গা নেই।নিকো আর ডিয়েগো কিছু বলে না।
___র*ক্তে ভেজা যুদ্ধক্ষেত্র পেছনে ফেলে, মিনিটের মধ্যেই ভীরের প্রাইভেট জেট রানওয়েতে নামানো হয়।
কালো ম্যাট ফিনিশের জেট আলভারেয সাম্রাজ্যের চিহ্ন আঁকা।
সিনালোয়া থেকে গুয়াদালাহারা যেতে সময় লাগে আনুমানিক ২ ঘণ্টা ২৫ মিনিট
জেট আকাশে উঠতেই ভীর জানালার দিকে তাকিয়ে থাকে।তার চোখে নেই কোনো অনুভূতি শুধু জমাট বাঁধা রাগ।
তার শরীর এখনো র*ক্তে ভেজা।শত্রুর র*ক্ত।
গুয়াদালাহারার আকাশ অন্ধকার।জেট আলভারেয এস্টেটের ব্যক্তিগত এয়ারস্ট্রিপে এসে থামে।
চারপাশে সারি সারি অস্ত্রধারী গার্ড।
জেটের দরজা খুলতেই,ভীর নেমে আসে।
কালো শার্ট পুরোপুরি রক্তে ভেজা লাল আর কালোর মিশেলে ভয়ংকর এক রং।উজ্জ্বল শ্যাম বর্ণের মুখে ক্লান্তি নেই আছে উন্মাদ আগুন।ঘাড় সমান এলোমেলো চুল।দাড়ি আগের চেয়ে বড় রুক্ষ, অযত্নে বেড়ে ওঠা।
কোমরে এখনো অ-স্ত্রের ভার।
ভীরকে দেখামাত্র সবাই মাথা নত করে সম্মান জানায়।
কেউ চোখ তুলে তাকানোর সাহস পায় না।
ভীর প্যালেসে ঢোকে।
সিঁড়ির দিকে যেতে নিয়েও কি মনে করে থেমে যায়।
কিছু একটা মনে পড়ে যায় তার।সে এখন এই রূপে ইশায়ার সামনে যাবে না।
ভীর উল্টো দিক ঘুড়ে সোজা অফিস রুমে ঢোকে।দরজা বন্ধ করে ওয়াশরুমে চলে যায়।
লম্বা একটা শাওয়ার নেয়।
গরম পানি তার শরীর বেয়ে নামছে।র*ক্ত ধুয়ে যাচ্ছে।
চোখ বন্ধ করলে ভেসে ওঠে
ইশায়ার মুখ।সে নিজেকে শক্ত করে ধরে।
এই রূপে নয়।এই রক্তে ভেজা রূপে নয়।ইশায়ার সামনে সে অন্যরকম হয়ে উঠতে চায়।তাকে নিজের কাছে রাখতে সে সব করতে পারবে।
সিনালোয়ার ধ্বংসস্তূপের ভেতর থেকে যারা বেঁচে ফিরেছে, তারা অন্ধকারে সীমান্ত পেরিয়ে পৌঁছায়
এক গোপন ঘাঁটিতে,
যেখানে অপেক্ষা করছে তাদের বস।
ডন লরেঞ্জো ডি লুকা
ইতালির আ*ন্ডারগ্রাউন্ডে পরিচিত নাম।
এই মানুষটাই ইউরোপের অ*স্ত্রপথ নিয়ন্ত্রণ করে। প্রতিশোধ নেয় ধীরে, নিশ্চিতভাবে।
ডন লরেঞ্জো ডি লুকা চেয়ারে বসে সিগার টানছিল।
চোখ না তুলে শুধু একটাই প্রশ্ন করে,
বেঁচে আছে ওরা?
___কারো মুখে কোন কথা নেই।
এই নীরবতায় উত্তর পেয়ে যায় লুকা।
__ভালো।
দ্রুত মরলে খেলাটা ছোট হয়ে যেত।
কিছুক্ষন চুপ থেকে সে বলে,
রাজভীরকে সরাসরি যুদ্ধে হারানো যাবে না।
কারণ সে যুদ্ধের জন্য তৈরি,ক্ষতি তাকে দুর্বল করে না,বরং আরও হিংস্র বানায়।
ভীরের শক্তি নয় তার দুর্বলতা।আর সেই দুর্বলতার নাম একটাই,মিসেস ইশায়া আলভারেয ।
ডন লুকা শান্ত গলায় বলে,
আমাদের লোক কি ভিতরে ঢুকেছে?
একজন সামনে এগিয়ে আসে,
__হ্যাঁ, ডন। এলিজা ভার্গাস এখন আলভারেয এস্টেটের ভেতরে।
___ডন লুকা হাসে, খেলা শুরু হয়ে গেছে।
লুকা বলে, এলিজা যোগাযোগ করলে তাকে
বলে দিবে,নিজ থেকে যেনো কিছু করতে না যায়।
তাকে শুধু ওই মেয়েটার সব খবর নিতে বলবে,আর
নিরাপত্তার ফাঁকগুলো মনে রাখতে বলবে।
এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ
ওই মেয়ের মনে ভীর সম্পর্কে প্রশ্ন তৈরি করা,
ডন লুকার নির্দেশ স্পষ্ট,
আমরা তাকে ছিনিয়ে নেব না।আমরা তাকে ভাঙব।
যাতে সে নিজেই রাজভীরের হাত ছেড়ে দেয়।আমাদের সাথে মিলে তাকে শেষ করে।
___এইবার আক্রমণ হবে,নীরব ধীর ভিতর থেকে,
কোনো বিস্ফোরণ নয়।
ডন নিকো শেষ কথা বলে,
রাজভীর আলভারেযকে হারাতে হলে তার সাম্রাজ্য নয় তার হৃদয় দখল করতে হবে।
____ভীর শাওয়ার শেষ করে দ্রুত পায়ে তার রুমের দিকে যায়।ভেজা চুল থেকে এখনো ফোঁটা ফোঁটা পানি ঝরে পড়ছে।
সাদা শার্টটা গায়ে লেপ্টে আছে।শার্টের বোতাম দু’টা খোলা, গাঢ় শ্যাম বর্ণের শরীর, শক্ত বুক, কাঁধের পেশিগুলো টানটান।
ভেজা চুল ঘাড় ছুঁয়ে আছে, চুলের ফাঁক দিয়ে কপাল ঝরে পড়া পানি গড়িয়ে পড়ে চোখের কোণে। চোখে ক্লান্তি কিন্তু তার চেয়েও বেশি এক ধরনের অস্থিরতা।
সিড়ি বেয়ে উপরে উঠতে উঠতে তার বুক ধুকপুক করছে।এই যুদ্ধ, এই র*ক্ত, এই মৃ*ত্যু সব কিছুর পরেও তার মাথার ভেতর একটাই প্রশ্ন ঘুরছে, ইশায়া তাকে দেখে কী করবে? ভয় পাবে? চমকে উঠবে? নাকি চিনতেই পারবে না?
এই ভাবনাগুলোর মাঝেই ভীর ইশায়ার রুমের সামনে এসে দাঁড়ায়।
দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা গার্ড সঙ্গে সঙ্গে দরজা খুলে দেয়। ভীর ভেতরে ঢোকে।
রুমে ঢুকে এগিয়ে যায়, তার চোখ যায় বিছানার দিকে।
___ইশায়া নিজেকে পুরোপুরি কম্ফোর্টারে মুড়িয়ে শুয়ে আছে। মাথাটুকুও দেখা যাচ্ছে না।
এক মুহূর্তের জন্য ভীরের বুকটা হঠাৎ ফাঁকা হয়ে যায়।
কেন জানি তার মনে হয় ইশায়া এখানে নেই।
ওইদিন ইশায়ার পালিয়ে যাওয়ার ভয়টা এখনো তার ভেতরে গেঁথে আছে। এই প্রাসাদ, এই পাহারা, এই ক্ষমতার মাঝেও ভয়টা তাকে ছাড়ে না।
ভীর দ্রুত পায়ে এগিয়ে গিয়ে ইশায়ার শরীর থেকে কম্ফোর্টারটা সরিয়ে দেয়।
ইশায়ার মুখ দৃশ্যমান হতেই ভীরের ভেতরটা প্রশান্তিতে ঠান্ডা হয়ে আসে। একটা গভীর নিশ্বাস বেরিয়ে আসে তার বুক থেকে তাকে দেখে।
গাঢ় কমলা রঙের, সুতার কাজ করা আরামদায়ক একটা সুন্দর সুতির গোল জামা পরা ছোট্ট শরীরে এই জামাটা ফুটে ওঠেছে। এই রঙটা ইশায়ার গায়ে অসম্ভব মানিয়েছে। ঘুমের ঘোরে মুখটা কতটা স্নিগ্ধ লাগছে।
ইশায়াকে দেখেই ভীরের চোখ মুখে আলাদা একটা নূর ফুটে ওঠে।
এতোক্ষণের ক্লান্তি তার মূহুর্তের মধ্যেই শেষ।
ভীর আবেশে তার পাশে বসে পড়ে।
___চারপাশে গার্ডরা দাঁড়িয়ে আছে, মারিয়া এলেনা সাইডে মাথা নত করে দাঁড়িয়ে। এই রুমে কারোরই মাথা তুলে তাকানোর সাহস নেই।
ভীর আগেই কড়া করে বলে দিয়েছে, যার যে কাজ দেওয়া হয়েছে, সে শুধু সেটাই করবে। ইশায়ার দিকে তাকানো সে পছন্দ করে না। সে মহিলা হোক বা পুরুষ কোনো পার্থক্য নেই।তার নারীর দিকে কেউ তাকাবে না এটাই তার কথা।
ভীর ইশায়ার পাশে বসে ঝুঁকে পড়ে। শব্দ করে তার গালে ঠোঁট ছোঁয়ায়।
সাদা নরম গালে আলতো করে হাত বোলায়। তার ঠান্ডা হাত শরীরে লাগতেই ঘুমের মাঝেই ইশায়ার কপালে হালকা ভাঁজ পড়ে। সে একটু সরে যেতে নেয়।
সে আমার বন্দিনী পর্ব ৬৩
ঘুমের মধ্যে ইশায়ার মুখের ভঙ্গি দেখে ভীর হালকা হাসে।
এই এক মুহূর্তে একটু আগের যুদ্ধ, র*ক্ত, খু*ন, চিৎকার সবকিছু ভুলে গেছে সে।
ভীরের তখনই ইশায়ার ভেজা চুল চোখে পড়ে।
চুপচাপ তাকিয়ে থেকে নিচু স্বরে বলে,
শাওয়ার নিয়েছে?
