সে আমার বন্দিনী পর্ব ৬৫
তানিয়া হুসাইন
ভীরের তখন-ই ইশায়ার ভেজা চুলে চোখ পরে,
চুপচাপ তাকিয়ে থেকে নিচু স্বরে বলে,
___শাওয়ার নিয়েছে?
পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মারিয়া এলেনা মাথা নিচু করেই হালকা করে মাথা নাড়িয়ে হ্যাঁ বলে।
ভীরের চোখ তখনো ইশায়ার দিকেই স্থির।কিন্তু পরক্ষণেই তার কণ্ঠ শক্ত হয়ে ওঠে।
__ওর চুল এখনো ভেজা কেন?কি জন্য আছো তোমরা সবাই এখানে?
ভীরের গলা চড়তেই ঘরটা জমে যায়।
মারিয়া এলেনা ভয়ে কাঁপা কণ্ঠে দ্রুত বলে ওঠে,
___বস… ম্যাম কাউকে কাছে ঘেঁষতে দিচ্ছেন না।
তিনি সবাইকে ভয় পাচ্ছেন।সবাই থেকে দূরে থাকতে চাইছেন।
একটু থেমে সে আবার বলে,
কেউ কাছে গেলেই চিৎকার করেন।ডাক্তার বলেছে ওনাকে হাইপার না করতে, পুরো রেস্টে রাখতে।
মারিয়া এলেনা মাথা নিচু রেখেই কথা চালিয়ে যায়,
আমরা কিছু বলতে গেলে যদি রিয়াক্ট করেন এই ভয়ে কিছু বলিনি।যদি ম্যামের মাথায় চাপ পড়ে।ডাক্তার স্পষ্ট করে বলেছেন, ওনাকে কোনোভাবেই উত্তেজিত না করতে।এতে তার ক্ষতি হবে।
ভীর সব কথা চুপচাপ শোনে।তার মুখে কোনো অভিব্যক্তি নেই।
তারপর ধীর, কিন্তু ভয়ংকর শান্ত কণ্ঠে বলে,
___জ্ঞান ফেরার পর ও কিছু বলেছে?পুরনো কিছু কি মনে আছে ওর?আগের কিছু নিয়ে কোনো প্রশ্ন করেছে?
মারিয়া এলেনা সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দেয়,
___না বস।
ম্যামের নিজের নামটাও মনে নেই।
এই কথাটা শোনামাত্রই ভীরের মুখে এক অদ্ভুত প্রশান্তির হাসি ফুটে ওঠে।চোখের ভেতরকার সেই দীর্ঘদিনের চাপ যেন মুহূর্তেই হালকা হয়ে যায়।মনটা অস্বাভাবিকভাবে ফুরফুরে হয়ে ওঠে তার।
অবশেষে,যেভাবে সে চেয়েছে এই মেয়েটাকে ঠিক সেভাবেই সে পাবে।এক সময় ভেবেছিল,সব কিছু করেও সে ইশায়াকে দমাতে পারেনি আর হয়তো পারবে ও না।নিজের হাতের মুঠোয় আনতে পারবে না।
এক মুহূর্তের জন্য নিরাশও হয়েছিল।কিন্তু এখন সব তার হাতের মুঠোয়। এখন সে সফল। সব কিছুর মতো এ জায়গায় তার জয় নিশ্চিত। এখন থেকে যেভাবে সে চাইবে ইশায়া ঠিক সেভাবেই থাকবে।তার কথাই মানবে।তাকেই চিনবে।তার মন মস্তিষ্কে ভীর ছাড়া আর কোনো কিছুর অস্তিত্ব থাকবে না।ভীর খুশি।আজ সে ভীষণ খুশি।আর সেটা তার মুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে।
ইশায়ার গালে রাখা ভীরের হাতটা আরো গাঢ় হয়ে ওঠে।আঙুলের চাপ ধীরে ধীরে গভীর হয়।
তার ভেতরের সেই পৈচাশিক পুরুষসত্ত্বা আজ শান্তি পেয়েছে।
এতোদিন শুধু শারীরিক ভাবে সে থাকলেও।এখন সব ক্ষেত্রে শুধু সেই থাকবে।
হ্যাঁ!সে মাফিয়া বস!রাজভীর আলভারেয।আর সে সব পারে।
ভীর হঠাৎ জিজ্ঞেস করে,
____খেয়েছে ও?
মারিয়া এলেনা মাথা নিচু রেখেউই বলে,
___তেমন কিছু খান নি,শুধু দু-চামচ সুপ খাইয়ে ঔষধ টা দিয়েছি।
___ইশায়ার শরীরে সেই ঠান্ডা হাতের অবাধ বিচরনে ইশায়ার ঘুম ছুটে যায়।
ইশায়া হঠাৎ চোখ মেলে।মাথার ভেতর ঝাঁ ঝাঁ করছে। আলোটা সহ্য হয় না।তারপরই মুখের একেবারে সামনে এক অপরিচিত পুরুষের অবয়ব দেখে ইশায়ার চোখ দুটো বড় হয়ে যায়,শ্বাস আটকে আসে।
____আহহহহহহ!!!!!
মুহূর্তেই ইশায়া চিৎকার করে উঠে বসে।
ইশায়া বিছানা থেকে হড়বড় করে নেমে পড়ে।
চারপাশে মানুষ, গার্ড, এত অচেনা চোখ আর এই লোক টা সবকিছু তাকে আরও আতঙ্কিত করে তোলে।
সে দৌড়ে গিয়ে মারিয়া এলেনার গা ঘেঁষে দাঁড়ায়।
একেবারে শিশুর মতো।যেন এই একজনই এখানে নিরাপদ।
হঠাৎ এভাবে ইশায়ার চিৎকার আর তার দিক থেকে সরে যাওয়া দেখে ভীরের কপালে ভাজ পড়ে।
পরমুহূর্তেই সেই ভাজ বদলে যায় রাগে।কপালের রগ ফুলে ওঠে।হাত দুটো মুঠোবদ্ধ হয়ে যায়।
ইশায়ার তার কাছ থেকে সরে যাওয়া, এইটাই তার রাগের কারণ।
___ইশায়া কাঁপা গলায় চিৎকার করতে থাকে,
কে এই লোক?আন্টি, কে উনি?এখানে কেনো?
তার চোখ দুটো ছুটে বেড়াচ্ছে।
নতুন মানুষ মানেই তার কাছে হুমকি।মস্তিষ্ক কিছু চিনতে পারছে না, কিন্তু ভয়টা প্রবল।অপরিচিত মুখ দেখলেই তার শরীর নিজে থেকেই প্রতিরোধে চলে যাচ্ছে।
মারিয়া এলেনা দ্রুত ইশায়াকে শান্ত করার চেষ্টা করে।
নরম গলায়, ধীরে ধীরে বোঝায়,
____উনি আমাদের বস।আর আপনার হাসবেন্ড।
আপনি ভয় পাবেন না, ম্যাম।
কিন্তু ইশায়া যেন একটাও কথা শুনছে না।তার চোখে আতঙ্ক।শরীর শক্ত হয়ে আছে।
ভীর নিজেকে শান্ত রাখার চেষ্টা করে।কিন্তু স্বভাবসুলভভাবে সে নিজের রাগ কখনোই নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না।
দাতে দাত চেপে চুপ করে বসে শুধু ইশায়ার আচরণ দেখছে।
এদিকে ইশায়া আরও জোরে চিৎকার শুরু করে,
এই লোককে বলুন এখান থেকে চলে যেতে।এই লোককে বলুন চলে যেতে।উনি এখানে কেন?কেন এখানে এসেছেন?কে উনি?বলুন চলে যেতে!
কণ্ঠ ভেঙে যাচ্ছে ইশায়ার।আহাজারিতে রূপ নিচ্ছে তার ভয়।
রাণিয়া আর মারিয়া এলেনা দুজনেই তাকে শান্ত করার চেষ্টা করে।বোঝানোর চেষ্টা করে।কিন্তু ইশায়া যেন ঠিক করে রেখেছে সে কারোর একটা শব্দও শুনবে না।
____ভীর অনেকক্ষণ চুপ করে এই দৃশ্য দেখে।চোয়াল শক্ত হয়ে আছে তার।চোখে জমে উঠছে ঝড়।
শেষমেশ, ধৈর্য পুরোপুরি ফুরিয়ে যায়।
ভীর গর্জে ওঠে।
___I want this room cleared. Everyone leave this room right now.
ভীরের হঠাৎ সেই বজ্রকঠিন চিৎকারে সবাই কেপে ওঠে,
ইশায়া ভয়ে মারিয়া এলেনাকে আরো আকড়ে ধরে।
এক সেকেন্ডের জন্যও কেউ নড়াচড়া করার সাহস পায় না।সবাই জানে ভীর রেগে গেলে কী হতে পারে।ইশায়াকে বোঝানোর হাজার চেষ্টা করেও তারা ব্যর্থ, আর এই ব্যর্থতাই ভীরের রাগকে আরও তীক্ষ্ণ করে তুলেছে।
গার্ডরা একে একে মাথা নিচু করে রুম থেকে বেরিয়ে যেতে শুরু করে।কেউ চোখ তুলে তাকায় না।
একটার পর একটা ছায়া দরজার বাইরে মিলিয়ে যায়।
সবাইকে চলে যেতে দেখে ইশায়া আরও ঘাবড়ে যায়।
ভয়ের চাপে তার শ্বাস দ্রুত হয়ে আসে।
সে আঁকড়ে ধরে মারিয়া এলেনাকে, যেন এই একমাত্র মানুষটা হারালেই সে পুরো অন্ধকারে পড়ে যাবে।
মারিয়া এলেনা তাকে ছাড়ানোর চেষ্টা করে, কিন্তু ইশায়া শক্ত করে জাপটে ধরে আছে।
তার হাত কাঁপছে, চোখে জমে উঠেছে আতঙ্কের জল।
ইশায়া মিনতি করে বলে,
আন্টি আমাকে এখানে একা ছেড়ে যাবেন না, আন্টি আমাকে এখানে ছেড়ে যাবেন না। আমার খুব ভয় করছে… আমাকে নিয়ে যান প্লিজ।
ভীর শক্ত চোখে তাকায় মারিয়া এলেনার দিকে।
তার দৃষ্টিতে কোনো নরমতা নেই শুধু নিয়ন্ত্রণ আর
মালিকানার কঠিন দাবি।
মারিয়া এলেনা জোর করে ইশায়াকে নিজের থেকে ছাড়িয়ে নেয়।
মারিয়া এলেনা বেরিয়ে যেতেই দরজাটা অটোমেটিকভাবে বন্ধ হয়ে যায়।
ইশায়া দৌড়ে গিয়ে দরজায় আঘাত করতে থাকে।
বারবার শব্দ করে ডাকতে থাকে।
চিৎকার করে বলে দরজা খুলতে, কিন্তু ওপাশ থেকে কোনো সাড়া আসে না।
ভীর রুম জুড়ে পায়চারি করতে থাকে।
ভারী বুটের শব্দ মার্বেলের মেঝেতে প্রতিধ্বনি তোলে।
তারপর হঠাৎ থেমে ডিভানের কাছে গিয়ে পায়ের উপর পা তুলে বসে পড়ে।সিগারেট ধরায়।ধোঁয়া ধীরে ধীরে বাতাসে উড়ে ছড়িয়ে পড়ে।
এদিকে ইশায়া ভয়ে জড়োসড়ো হয়ে পড়ে।
চিৎকার করতে করতে একসময় তার গলা শুকিয়ে আসে, শরীর নিস্তেজ হয়ে যায়।
সে হাঁপিয়ে যায়, দেয়ালের পাশে বসে পড়ে, চোখে শুধু আতঙ্ক আর অসহায়তা।
ভীর বসে বসে দেখছে ইশায়া কীভাবে ধীরে ধীরে তার থেকে দূরে সরে যাচ্ছে।যেন প্রতিটা নিঃশ্বাসে সে পালানোর রাস্তা খুঁজছে।
ভীর নিজেকে শান্ত করার চেষ্টায়,সে চাইছে না রাগের মাথায় এমন কিছু করতে যাতে ইশায়ার মস্তিষ্কে তাকে নিয়ে কোন নেগেটিভ ধারনা আসে।এজন্য-ই সে কাছে যাচ্ছে না ইশায়ার।তাকে ঠান্ডা মাথায় সব হ্যান্ডেল করতে হবে।
এই মুহূর্তে ভীরের মাথার ভেতর একটাই কথা ঘুরছে বার বার,ওই সময় যদি সে উপস্থিত থাকত, তাহলে আজ এই দৃশ্য দেখতে হতো না।তাহলে ইশায়া এভাবে মারিয়া এলেনার কাছে আশ্রয় খুঁজত না।তার কাছে ঠাই নিতো। ভয় পেয়ে তার থেকে পালিয়ে বেড়াত না।তার বুকে আশ্রয় নিতো।
ভীর চোখ না সরিয়ে ইশায়ার দিকেই তাকিয়ে থাকে।
হাতের সিগারেটটা ধীরে ধীরে শেষ করে।
শেষ ধোঁয়াটুকু বাতাসে ছেড়ে দিয়ে নিচু, কিন্তু কঠিন গলায় বলে,
— এখানে আসো।
শব্দটা শুনেই ইশায়া আরো সরে যায়।
পিঠ দেয়ালের সাথে ঠেকে যায় আরো,যেনো দেয়ালের ভেতর ঢুকে গেলে সে নিরাপদ থাকবে।
ভীর সব দেখছে।ইশায়ার চোখের ভয়, শরীরের কাঁপুনি, তার দৃষ্টির এড়িয়ে যাওয়া একটাও তার নজর এড়ায় না।
ভীর উঠে দাঁড়ায়।ধীরে ধীরে হাঁটতে হাঁটতে ইশায়ার দিকে এগিয়ে যায়।
ভীর কাছাকাছি আসতেই ইশায়ার বুক ধড়ফড় করে ওঠে। ইশায়া দেয়ালের কোনার সাথে মিশে আছে।হাত বুকের কাছে জড়িয়ে, চোখে ভয়।
ভীর ঠান্ডা গলায় বলে,
—কাছে আসো।
কণ্ঠে কোনো চিৎকার নেই।কিন্তু আদেশটা এমন, যেন দেয়ালও সেটা অমান্য করতে পারবে না।
____ইশায়া মাথা নাড়ে।না বোঝায়, তার ঘোলাটে চোখ জোড়া বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ে, ইশায়া আরও সরে যায়।
ভীরের চোখ সরু হয়।সে শান্তভাবে বলে।
— ভয় পেও না।ভীরের কণ্ঠ ভারী, গভীর।আমি তোমার ক্ষতি করবো না।
ইশায়া ফিসফিস করে বলে,
— আপনি কে? কেন আমাকে এখানে আটকে রেখেছেন?
ভীর ইশায়ার আরো কাছে ঘেষে,শরীরের সাথে হালকা স্পর্শ লাগে,
ইশায়া দম আটকে রাখে।চোখ বড় হয়ে যায়।
—কাছে আসবেন না, কণ্ঠ কাঁপছে ইশায়ার প্লিজ!
___ভীর থামে না।ইশায়া হঠাৎ ছুটতে চায়।
ঠিক তখনই,
ভীর তার এক হাত ধরে টানে।
এক মুহূর্তের মধ্যেই ইশায়া ভীরের শক্ত বাহুতে বন্দী হয়।ভীর তাকে কোলে তুলে নেয়।
ইশায়া ছটফট করে,
— ছাড়ুন! আমাকে ছাড়ুন!
ভীর শক্ত গলায় বলে,
— শান্ত হও। তার কণ্ঠে কোন রাগ নেই।আছে নিয়ন্ত্রণ।
ইশায়া হাঁপাচ্ছে।চোখে পানি জমে উঠেছে।
ভীর নিচু গলায় বলে,
— দেখো কেউ তোমার ক্ষতি করবে না।
ইশায়া কাঁপা কণ্ঠে বলে,
— তাহলে সবাইকে বের করে দিলেন কেন?
ভীর এক মুহূর্ত চুপ করে থাকে।তারপর বলে,
— কারণ তুমি এখন কাউকে বিশ্বাস করতে পারছো না।
আর আমি চাই না তুমি ভয় পাও।
ইশায়া অবিশ্বাসে তাকিয়ে থাকে।
— আমি আপনাকে বিশ্বাস করি না সে ফিসফিস করে বলে।
ভীরের ঠোঁটের কোণে অদ্ভুত একটা হাসি ফুটে ওঠে।
নরম না।ভয়ংকরও না।একটা নিশ্চিত হাসি।
—জানি।ভীর ধীরে বলে, কিন্তু একদিন করবে।
ইশায়া কিছু বলে না।শুধু তাকিয়ে থাকে।
ভীর তার দিকে ঝুঁকে তার গরম নিশ্বাস ইশায়ার মুখে পড়ে, খুব শান্ত গলায় বলে,
— কারণ এই দুনিয়ায় আমি-ই তোমার আপন।
একমাত্র আমি আছি যে তোমাকে কখনো ছেড়ে যাবে না।আমি ছাড়া তোমার আর কেউ নেই
ঘরটা নিঃশব্দ। শুধু ইশায়ার দ্রুত শ্বাস আর ভীরের স্থির উপস্থিতি।
ভীর ইশায়াকে নিজের কোলে নিয়েই বসে।
ইশায়া উঠতে চায় জোর খাটায়।ভীর সঙ্গে সঙ্গে তার নরম উদরের মাঝখানে শক্ত করে চাপ দিয়ে ধরে রাখে।
আঘাত নয় নিয়ন্ত্রন যাতে ছুটতে না পারে ভীরের বাধন থেকে, একটা নীরব অধিকারবোধ,যেটা ভীর বুঝিয়ে দিচ্ছে তার অজান্তে তার বাধন থেকে ছোটা অসম্ভব।ইশায়া চাইলেও তার থেকে দূরে যেতে পারবে না সে।
ইশায়া যত নড়ছে ভীরের হাত তার শরীরে তত শক্ত হচ্ছে,ইশায়ার শরীর মুহূর্তে শক্ত হয়ে আসে,শ্বাস এলোমেলো হয়ে ওঠে।
চোখ দুটো বড় বড় করে সে তাকিয়ে থাকে,
এই লোকটা যেকোনো মুহূর্তে তাকে আঘাত করবে, এই ভয়েই সে যেন পাথর হয়ে গেছে।
___ভীর সেটা বুঝতে পারে।
সে জোর করে কিছু বলে না।কোনো চিৎকার নেই।কোনো আদেশ নেই।
শুধু ধীরে ধীরে, একদম নিচু স্বরে বলে,
_ভয় পেয়ো না,আমি তোমাকে কিছু করবো না।
ইশায়া কাঁপা কণ্ঠে বলে,
— আমাকে ছেড়ে দিন, আমি কিছু বুঝতে পারছি না, আমি এখানে কেন?
ভীর একটুও রাগ দেখায় না।
তার কণ্ঠ আরও নরম হয়ে আসে।
___ তোমার একটা অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছিল। তুমি তখন খুব অসুস্থ ছিলে।
আমি তোমাকে এখানে নিয়ে এসেছি, যেন তুমি নিরাপদে থাকতে পারো।
ইশায়া চোখ কুঁচকে তাকায়।
— আপনি কে…?
এই প্রশ্নটার জন্য ভীর প্রস্তুত ছিল।
সে ইশায়ার চোখের দিকে তাকিয়ে ধীরে বলে,
— আমি রাজভীর।আর তুমি ইশায়া।
ইশায়া নিজের নাম শুনে চমকে ওঠে।
— ইশায়া…?
ভীর মাথা নাড়ে।
— হ্যাঁ।
মিসেস ইশায়া ভীর এটাই তোমার নাম এটাই তোমার পরিচয়।আর আমি তোমার স্বামী।
এই কথাটা ইশায়ার মাথায় ঢোকে না।
সে কিছু বলতে গিয়েও থেমে যায়।মাথা ধরে আসে, বুক ধড়ফড় করতে থাকে।
ভীর সেটা লক্ষ্য করে।
সে আর এক মুহূর্তও চাপ দেয় না।
__এখন এসব বোঝার দরকার নেই।শুধু এটুকু জানো তুমি পৃথিবীর সবথেকে নিরাপদ জায়গায় আছো।এখানে কেউ তোমার কোনো ক্ষতি করতে পারবে না।আমি আছি তোমার সাথে।তোমার ছায়া হয়ে।
ইশায়া চুপ করে থাকে।ইশায়ার চুল হালকা ভেজা।
ভীর ধীরে তাকে সাবধানে কোল থেকে নামিয়ে ডিভানে বসায়।কোনো প্রশ্ন না করেই হেয়ার ড্রায়ার হাতে নেয়।
ইশায়া ভীরের কার্যক্রম দেখছে। ড্রায়ারের হালকা গরম বাতাসে ইশায়ার ভেজা চুল শুকোতে থাকে।
ভীর খুব সাবধানে করছে যেন শব্দে বা স্পর্শে ইশায়া আবার ভয় পেয়ে না যায়।হাঁটু সমান লম্বা চুলগুলো সে আলতো হাতে শুকিয়ে দেয়।
—ইশায়াকে অন্যমনস্ক দেখে ভীর আবারো বলে,
কেউ তোমাকে জোর করবে না।কেউ তোমার কাছে আসবে না, যদি তুমি না চাও।এটা তোমার বাড়ি,এখানের সব তোমার,তুমি যেভাবে চাইবে সেভাবেই সব হবে।ঠিকাছে,ভয় পাবেনা।
চুল শুকোতে শুকোতে ইশায়ার শরীরের টান ধীরে ধীরে ঢিলে হয়।চোখের আতঙ্ক পুরোপুরি যায় না,কিন্তু ভয়টা আর আগের মতো ধারালো নেই।
ভীর হেয়ার ড্রায়ার নামিয়ে রাখে।
আজ তুমি রেস্ট নাও। কাল, যখন তোমার ভালো লাগবে, তখন কথা হবে।
____ইশায়া ধীরে মাথা নাড়ে।
কিছু বুঝেছে কি না সে নিজেও জানে না।
কিন্তু এই লোকটা খারাপ না, লোকটার কথায় তার তাকে খারাপ মনে হচ্ছে না, এই মুহূর্তে তাকে আঘাত করছে না এই অনুভূতিটুকুই তার জন্য অনেক।
___ভীর তাকে আবার কোলে তুলে নেয়।ইশায়া হকচকিয়ে তার কলার আঁকড়ে ধরে।
ভীর ধীরে তাকে বিছানায় শুইয়ে, কম্ফোর্টার টেনে দেয়।
এইবার ইশায়া আর বাধা দেয় না।
ভীর উঠে দাঁড়ায়।একবার পিছনে তাকায়।
তার চোখে কোনো কোমল প্রেম নেই।আছে একজন মাফিয়া বসের নিয়ন্ত্রণের শান্ত আত্মবিশ্বাস।
সে জানে এখন ভয় দিয়ে নয়,আজ থেকে সে নতুন করে ইশায়াকে নিজের করে গড়বে।
____ভীর চলে যায়।
রুমের দরজা পেরিয়ে সে বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা সবাইকে ঠান্ডা গলায় বলে দেয়,ওকে একা ছেড়ে দাও। কেউ এখন ওর কাছে যাবে না।
সবাই মাথা নাড়ায়।
কথাটা বলে ভীর শিস বাজাতে বাজাতে করিডোর পেরিয়ে যায়।
তার মুখোভঙ্গি নির্লিপ্ত যেন সে কোনো যুদ্ধক্ষেত্র ছেড়ে আসছে না, বরং দাবার বোর্ডে নিজের গুটি ঠিক জায়গায় বসিয়ে দিয়েছে।
___তার ঠোঁটে লেগে থাকা হাসিটা ভয়ংকর।
এই হাসি বিজয়ের নয় এটা মাইন্ড গেমের প্রথম রাউন্ড জেতার হাসি।ভীর জানে, সে এখন ইশায়ার মাথার ভেতরে ঢুকে গেছে।শরীর নয় মনটাই এবার আসল লক্ষ্য।এবার সে ইশায়ার মন মস্তিষ্ক ও নিজের দখলে চায়।যেভাবে সে চাইছে, ঠিক সেভাবেই ইশায়াকে ধীরে ধীরে নিয়ন্ত্রণ করছে।
____ইশায়া শুয়ে আছে।
চোখ দুটো উপরের দিকে স্থির, কিন্তু তার চোখে কিছুই ধরা পড়ছে না। মিথ্যার বেড়াজাল তাকে চারপাশ থেকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরছে
ভীরের কথাগুলো বারবার তার মাথার ভেতর ঘুরছে।
এক একটা শব্দ নখের মতো মগজে আঁচড় কাটছে।
তারপর মারিয়া এলেনার কথা মনে পড়ে।উনি ও তো কি বলেছেন।ইশায়া মনে করার চেষ্টা করে।
ওই লোকটা একটু আগে যে নামটা বলেছিল,ঠিক সেই নামটাই তো ওই আন্টি বলেছিলেন।
ইশায়ার ঠোঁট শুকিয়ে আসে।
তাহলে এই লোকটাই?এই লোকটাই কি সেই মানুষ যার কথা সবাই ফিসফিস করে বলছিলো?
ইশায়া উঠে বসে।আগের মতো আর ছটফট করছে না সে।ভয়ের জায়গাটা এখন কৌতূহলে রূপ নিচ্ছে।
ইশায়া ধীরে ধীরে পুরো রুমে চোখ বোলায়।
খুঁটিয়ে দেখে একটা একটা কোণ, দেয়াল, সাজানো জিনিসপত্র।
এই রুমটা বিলাসবহুল।কিন্তু অস্বাভাবিকভাবে শান্ত।
হঠাৎ তার চোখ গিয়ে পড়ে দেয়ালের মাঝখানে ঝুলে থাকা বিশাল এক ফ্রেমে।ওই লোকটার ছবি।ইশায়ার বুক ধড়াস করে ওঠে।আগে ভয়ের কারণে তাকায়নি।কিন্তু এখন তাকায় সে গভীর দৃষ্টি, কঠোর চোয়াল, ঠান্ডা চোখ এই লোকটা তার স্বামী।শব্দটা মাথার ভেতর গেঁথে যায়।
ইশায়া ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়িয়ে ফ্রেমটার সামনে যায়।কাঁপা হাতে ছবির ওপর হাত বোলায়।ঠান্ডা কাচের ওপারে থাকা মানুষটা যেন তাকিয়েই আছে তার দিকে।
_____=অন্যদিকে ভীর বসে আছে তার অফিস রুমে।
ডার্ক লাইটিং, চারপাশে স্ক্রিন।সব স্ক্রিনেই ইশায়া।
তার রুমের সিসিটিভি ফুটেজ চলছে,সে কী করছে, কী দেখছে, কোথায় তাকাচ্ছে একটা মুহূর্তও তার নজর এড়াচ্ছে না।ভীরের ঠোঁটে ফুটে ওঠে সেই তীক্ষ্ণ, ভয়ংকর হাসি।এটাই সে চেয়েছিল।
ইশায়া তাকে নিয়ে ভাবছে।
___রুম জুড়ে ছড়িয়ে আছে ইশায়ার অসংখ্য ছবি।
ইশায়া দেয়ালে ঝোলানো কয়েকটা ছবির সামনে দাঁড়ায়।বিশেষ করে সেই ছবিগুলো যেখানে ভীর তার পাশে।
সে বারবার তাকায়।চোখ সরাতে পারে না।
একটা অস্বস্তিকর অনুভূতি তার ভেতর ঢুকে পড়ে।
ও কি সব ভুলে গেছে?এগুলো দেখেও কেনো তার কিছু মনে পড়ছে না।
তার সাথে সত্যিই কিছু একটা হয়ে গেছে?এগুলো তো মিথ্যা না।সব কিছুই তো তার চোখের সামনে,ইশায়া মাথায় হাত চেপে ধরে।
____ভীর ব্ল্যাক কফিতে ধীরে চুমুক দেয়।
তার দৃষ্টি স্ক্রিনে স্থির যেখানে বৃষ্টির মতো নেমে আসছে ইশায়ার প্রতিটা নড়াচড়া।সে অপেক্ষা করছে।
___ইশায়া আবার বেডসাইড টেবিলের কাছে আসে।
ওখানে রাখা একটা ছবি তার চোখে পড়ে।
লাল দুপাট্টায় ঢাকা তার নিজের মুখ।চেনা, অথচ অচেনা।
ইশায়া ছবিটা হাতে নিয়ে বসে পড়ে।হৃদয়ের ভেতর অদ্ভুত একটা অনুভূতি জন্ম নেয়ভয়, প্রশ্ন, আর অজানা টানের মিশ্রণ।
সে আমার বন্দিনী পর্ব ৬৪
ইশায়া বুঝতে পারে না এই ঘরটা কি তার কারাগার,
নাকি ধীরে ধীরে তৈরি হওয়া একটা ফাঁদ?
আর ভীর সে জানে,একটা মেয়েকে আটকে রাখার সবচেয়ে ভয়ংকর উপায় হলো তার মনে সন্দেহ ঢুকিয়ে দেওয়া,তার বাস্তবতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করা,আর শেষমেশ তাকে বিশ্বাস করানো,এই বন্দিত্বই তার নিরাপত্তা।এখানেই সে সুরক্ষিত।আর সেই তার একমাত্র আপন।
