Home সে আমার বন্দিনী সে আমার বন্দিনী পর্ব ৬৬

সে আমার বন্দিনী পর্ব ৬৬

সে আমার বন্দিনী পর্ব ৬৬
তানিয়া হুসাইন

বেলা বিছানায় শুয়ে শুয়ে ক্যাটালিনার সঙ্গে কথা বলছিল।তার পরনে সাদা শর্ট ড্রেসটা উরু পর্যন্ত ঢাকা, পা দুটো স্পষ্ট দৃশ্যমান।বেলার গলায় চাপা বিরক্তি।
ওপাশে ক্যাটালিনা সে ইসাবেলার কাছ থেকে এখানের প্রতিটা খুঁটিনাটি সব খবর নিচ্ছে।ভীরের সব খবরা খবর,কিছুই তার নজর এড়ায় না।
___ভীর ওইদিন সিনালোয়া থেকে এভাবে চলে গেল কেন?
ক্যাটালিনার গলা ভারী।এত বড় হামলা হলো, আর সে এক মুহূর্তও থাকলো না।এলো ঝামেলা শেষ করল আবার চলে গেল এরকম তো কখনো করে না ও।

___বেলা ঠোঁট বাঁকিয়ে তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে ওঠে।
ব্রো ওই মেয়েটার জন্য পাগল হয়ে গেছে মম।
সে নির্লিপ্ত স্বরে বলে।
ও অসুস্থ কিনা জানি না কিন্তু এই কারণেই ফিরে এসেছে ব্রো।যেখানে সে আগে মাসের পর মাস চলে যেত প্যালেসে আসতো না, সেখানে সে এখন বেশিরভাগ সময়ই প্যালেসে থাকে। খুব গুরুত্বপূর্ণ কাজ ছাড়া সে কখনো যায় না। নিকো ডিয়েগো এরাই এখন সবকিছু হেন্ডেল করে। ব্রো খুব জরুরী ভিত্তিতে গেলেও কাজ শেষ করে আবার দ্রুত ফিরে আসে। তুমি এইখানে থাকলে বুঝতে কি কি হচ্ছে। এজন্যই তোমাকে আমি বলি তুমি এখানে চলে আসো।
আজ মারিয়াকে দিয়ে খবর পাঠিয়েছে, যেন আমি ওই মেয়ের সাথে আগ বাড়িয়ে কোন কথা না বলি।
ওর কাছ থেকে দূরে থাকতে বলেছে।

___ক্যাটালিনার কণ্ঠ ধীরে ধীরে কঠিন হয়ে ওঠে।
এই মেয়ের কাহিনিটা বেশি হয়ে যাচ্ছে, বেলা।
এভাবে চললে একসময় আমাদের হাতে কিছুই থাকবে না।ওকে রাস্তা থেকে সরাতে হবে।
না হলে আমাদের এত দিনের পরিকল্পনা এত চেষ্টা সব বৃথা যাবে।
____বেলা বিরক্তিতে পাশ ফিরে শুয়ে পড়ে।
কিভাবে সরাবে?
তার গলায় রাগ আর বাস্তবতার ঠান্ডা হিসাব।
পুরো আলভারেজ স্টেটে যত গার্ড আছে, তার থেকেও বেশি সুরক্ষা ওই মেয়ের রুমের ভেতরে আর বাইরে।
সে চাপা হাসে।বাইরের বাতাস পর্যন্ত ছুঁতে দেয় না ব্রো ওই মেয়েটাকে। পুরো স্টেট এর সবকিছু ব্রো এই মেয়ের পায়ের কাছে এনে রেখেছে। কারো তাকানো পর্যন্ত নিষেধ।
তার কণ্ঠ হঠাৎ গম্ভীর হয়ে যায়।
আমরা কিছু করতে গেলে যদি কিছু হয়, সেটা জানলে ব্রো আমাদের অস্তিত্বও রাখবে না।

___ক্যাটালিনা চুপ করে শোনে।
ইশায়ার অবস্থা, ভীরের ডিল তার নতুন টার্গেট। সবকিছুই সে বেলার কাছ থেকেই জানে।
এই নীরবতার মাঝেই বেলা হঠাৎ বলে ওঠে,
__মম, আমি সিনালোয়া আসতে চাই।
___ক্যাটালিনা সঙ্গে সঙ্গে আপত্তি করেন।
কেন? তুমি ওখানে গেলে আমি এখানের খবর পাবো কিভাবে?তুমি এখানেই থাকো।
কিন্তু বেলা নাছোড় বান্দা।
বারবার বলে সে সিনালোয়া যেতে চায়।কারণটা লুকোয় সে।
নিকোর উগ্র আচরণ। তার দৃষ্টি। সব মিলিয়ে বেলার সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে।এজন্যই সে এখানে থাকতে চাইছে না।

____ঠিক তখনই।নিকো বেলার রুমে ঢোকে।
দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দটাও বেলা টের পায় না।
সে ফোনে কথা বলায় এতটাই মগ্ন।
নিকো কয়েক সেকেন্ড থেমে থাকে,বিছানায় শুয়ে থাকা বেলা,তার নির্লিপ্ত ভঙ্গি,ক্যাটালিনার সাথে বেলার কথা সবকিছু সে লক্ষ্য করে।
___নিকো এসে বেলার উরুর ওপর হাত রাখতেই বেলা চমকে লাফিয়ে উঠে।
হাত থেকে ফোনটা মেঝেতে পড়ে যায়, শব্দটা ঘরের নিস্তব্ধতাকে ছিন্নভিন্ন করে দেয়।হঠাৎ সামনে তাকিয়ে নিকোকে দেখে বেলার শরীর জমে যায়।
আতঙ্কে জিভ জড়িয়ে আসে, আমতা আমতা করে সে বলে ওঠে,
___তুমি, তুমি এখানে কেন?
নিকো কোনো তোয়াক্কা না করে বিছানায় গা এলিয়ে দেয়।মুখে অলস, অথচ বিপজ্জনক একটা হাসি।
___হুম… আমি!
সে ধীরে বলে।তারপর চোখ সরাসরি বেলার দিকে,
তো কী বলছিলে ক্যাটালিনাকে?একটু থেমে ঠান্ডা স্বরে যোগ করে,আমাদের শেষ করার কথা নাকি? মা মেয়ে কিসের প্ল্যান চলছিল?

___নিকোর কথায় ইসাবেলা ঘাবড়ে যায়।ভয় আর রাগ একসাথে কণ্ঠে চেপে ধরে।কি যা-তা বলছো!
সে চিৎকার করে ওঠে,
এখানে কেন এসেছো? এই মুহূর্তে বেরিয়ে যাও।
___নিকো উত্তর দেয় না।
তার উপস্থিতিতেই ঘরের বাতাস ভারী হয়ে আসে।
নরম অথচ ভয়ংকর ভঙ্গিতে সে বলে,
ভীরকে জানাবো নাকি?তোমাদের এই কথাবার্তার ব্যাপারে?
___বেলা ঢোক গিলে ।গলা শুকিয়ে আসে তার।
একদম মিথ্যা বলবে না,সে দ্রুত বলে।
আমি শুধু মমকে সিনালোয়া ফিরে যাওয়ার কথাই বলছিলাম।
নিকো ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসে।সে হাসিতে কোনো আনন্দ নেই,আছে দখলের ঘোষণা।
____সেটা তো হচ্ছে না, ম্যাডাম,সে শান্ত গলায় বলে।
হ্যাঁ, আপনি যাবেন ঠিকই কিন্তু সিনালোয়া নয়।
আমার রুমে।তার কণ্ঠে কোনো উত্তেজনা নেই,
শুধু নির্দয় সিদ্ধান্ত।
আজ আপনি আমার রুমে শিফট করবেন,
যা নেওয়ার নিয়ে নিন। আমার দেরি পছন্দ না ম্যাম।
বলেই নিকো দুহাত মেলে আলস্যে আড়মোড়া ভাঙে,
যেন পুরো ব্যাপারটাই তার কাছে নেহাত সাধারণ।

___ইসাবেলা রাগে কাঁপতে থাকে।তোমার কথায় আমি চলবো?আমি ইসাবেলা আলভারেয
ভুলে যাচ্ছো তুমি আমি কে?
সে দাঁতে দাঁত চেপে বলে।
এই মুহূর্তে আমার রুম থেকে বেরিয়ে যাও।
বেলা চিৎকার করে করতেই মুহূর্তের মধ্যেই নিকো তার
গলায় চাপ দিয়ে ধরে ফিসফিস করে বলে,
___হুসস। একদম চুপ।
তার কণ্ঠ শান্ত, অথচ হাড় জমিয়ে দেওয়ার মতো।
আমার সাথে চিৎকার করবিনা না।
একটু থেমে যোগ করে বলে,
সেদিনের ডোজ কি কম হয়ে গেছে?
__ইসাবেলা রাগে ফুসছে।
নিকো ফোনটা বের করে চোখের সামনে নাড়িয়ে বলে,
তোর আর তোর মায়ের বলা সব কথার রেকর্ড আছে এখানে,সে ঠান্ডা স্বরে বলে।
ভীরের কাছে পৌঁছাতে এক সেকেন্ডও লাগবে না।
বেলার চোখ জ্বলে ওঠে।রাগ, অপমান আর অসহায়ত্ব মিলিয়ে বুকের ভেতরটা কেমন করে,
কান্না চলে আসে চোখে, কিন্তু সে কোনো শব্দ করে না।
নিকো তার দিকে তাকিয়ে কটাক্ষের হাসি হেসে বলে,
___হেই… বেব।কান্না করো না।একটু থেমে আবারো বলে,ওগুলো তুলে রাখো… রাতের জন্য।বলেও চোখ টিপ মারে।

____মেক্সিকোর রাত নামলে শহরটা আর শহর থাকে না সে হয়ে ওঠে এক নীরব রাজত্ব।দূরে গুয়াদালাহারার পাহাড়গুলো কালো ছায়ার মতো দাঁড়িয়ে আছে। রাস্তার হলুদ আলোয় ভিজে আছে রাতের শিশির, হালকা বাতাসে গাছের পাতাগুলো নড়ছে। রাতের আধারে ফিসফিস করে কথা বলে যেন হাজারো গোপন চু*ক্তি আর র*ক্তের শপথ লুকিয়ে আছে সেই শব্দে। আকাশটা গভীর নীল, তার গায়ে ছড়িয়ে আছে তারার ছাই ঠান্ডা, নির্লিপ্ত, ঠিক এই শহরের নিয়মের মতো।
___চিন্তার ভিড়ে ভয় আর ক্লান্তির মাঝখানে কখন যে ইশায়ার চোখ দুটো ভারী হয়ে আসে, সে নিজেও টের পায় না। মাথার ভেতর হাজার প্রশ্ন, হাজার আতঙ্ক সব ধীরে ধীরে মিলিয়ে যায় নিঃশ্বাসের ছন্দে।ইশায়া ঘুমিয়ে পড়ে।
অন্যদিকে অফিস রুমের আধো অন্ধকারে বসে আছে ভীর।তার সামনে বিশাল স্ক্রিন, সেখানে একটার পর একটা সিসিটিভি ফুটেজ বদলাচ্ছে। কিন্তু তার চোখ আটকে আছে শুধু এক ফ্রেমে। ইশায়া।
তার কিছুই নজরের বাইরে নয়। ভীরের দৃষ্টি ঠান্ডা, স্থির, কিন্তু ভেতরে জমে আছে অদ্ভুত এক আগুন।
সে বলেছিল আজ ইশায়াকে তার মতো থাকতে দেবে।তাকে সময় দিবে নিজের মতো করে।
কিন্তু ভীর আলভারেজ কি আদৌ ছাড় দিতে জানে?

আর এই মেয়েটার বেলায় তো কোন কথাই নেই।এক ইঞ্চি ও ছাড় দিবে না সে।
ইশায়া ঘুমিয়ে পড়তেই ভীর উঠে দাঁড়ায়। কোনো শব্দ না করেই রুমের উদ্দেশ্যে পা বাড়ায়।
রুমে এসে ঢোকে, বেডসাইড টেবিল থেকে এক গ্লাস পানি তুলে নেয়। এক ঢোকে খায়,
তার চোখ পড়ে ইশায়ার কাছে রাখা ফটো ফ্রেমে।
তার ছবি।এক মুহূর্ত তাকিয়ে থেকে ফ্রেমটা আগের জায়গায় সরিয়ে রাখে।তার ঠোঁটে বাকা হাসি ফুটে ওঠে দখলের হাসি।সব কিছুই তার। ইশায়াও।
আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ভীর ধীরে ধীরে শার্টের একটা একটা বোতাম খুলতে থাকে।
ডান কাঁধ বেয়ে নেমে আসা কালো ড্রাগন ট্যাটুটা আলোতে জ্বলজ্বল করে ওঠে হিংস্র, নির্ভীক, শাসকের প্রতীক।তার শরীর জুড়ে অসংখ্য চিহ্ন, প্রতিটা একেকটা যুদ্ধের স্মৃতি।
কিন্তু হঠাৎ তার দৃষ্টি থেমে যায় বুকের পাশের সেই পুরোনো ক্ষতটায়।এই ক্ষত থেকেই তার শুরু।
এই রক্ত থেকেই আজকের ভীর আলভারেজ।

শার্ট খুলে সে ধীরে এগিয়ে যায় বিছানার দিকে।
বিছানার মাঝখানে ইশায়া গভীর ঘুমে ডুবে আছে। মুখটা শান্ত, নিষ্পাপ যেন এই পৃথিবীর কোনো অন্ধকারই তাকে ছুঁতে পারে না। কিন্তু এই অন্ধকার রাজত্বের রাজ্যের রানী সে। ভীর কম্ফোর্টার টেনে নেয়।
এক পাশ দিয়ে শুয়ে পড়ে।তারপর কোনো দ্বিধা ছাড়াই ইশায়াকে নিজের দিকে টেনে নেয়।এক হাতে ইশায়ার গলা থেকে ওড়নাটা আলতো টানে সরিয়ে দেয়।
তার নরম শরীরটা ভীরের শক্ত বুকের সঙ্গে চেপে ধরে।
ভীর গলায় মুখ গুঁজে শুয়ে পড়ে যেন এটাই তার জায়গা, তার অধিকার। ঘুমের মধ্যেই খোঁচা খোঁচা দাড়ির স্পর্শে ইশায়া নড়ে ওঠে।ভীর সঙ্গে সঙ্গে নড়ে না।
বরং খুব আলতো করে তার গলায় ঠোঁট ছোঁয়ায় তাকে শান্ত করে।ইশায়া আবার স্থির হয়ে যায়।
ঠান্ডার রাতে ভীরের উষ্ণ বুকের সঙ্গে লেপ্টে পড়ে থাকে। রাত আরও গভীর হয়।আর সেই রাতের মাঝেই এক মাফিয়া তার বন্দিনীকেননিজের বুকের ভেতর আটকে রাখে।

মধ্যরাত।
আলভারেয স্টেট পাথরের মতো নিশ্চুপ একটা জীবন্ত দুর্গ, যার ভেতর নিশ্বাস পর্যন্ত হিসেব করে নেওয়া হয়। প্রাসাদের উঁচু দেয়াল আর কালো মার্বেলের করিডোরে ছায়ারা জমে থাকে, যেন অন্ধকার নিজেই এখানে পাহারা দেয়। সবাই গভীর ঘুমে, কিন্তু এই ঘুমটা স্বাভাবিক নয় এটা অস্ত্রধারী ঘুম।দূরে দূরে ভেসে আসে কেবল গার্ডদের বুটের নরম, নিয়ন্ত্রিত শব্দ। হাজার হাজার প্রশিক্ষিত সৈনিক আলভারেয স্টেট ঘিরে রেখেছে। প্রতিটি কোণে বসানো অত্যাধুনিক সেন্সর, থার্মাল স্ক্যানার, বায়োমেট্রিক লক, ফেস-রিকগনিশন ক্যামেরা। এই প্রাসাদ শুধু একটা বাড়ি নয় এটা মাফিয়া সাম্রাজ্যের হৃদপিণ্ড।
আর সেই হৃদপিণ্ডের মালিক রাজভীর আলভারেয।
যার নামেই মাফিয়া জগত নতজানু। বহু রাষ্ট্র, বহু কার্টেল তার এক ইশারায় দম বন্ধ করে দাঁড়িয়ে থাকে।
ঠিক এই নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তার ভেতর দিয়েই নিঃশব্দে এগিয়ে আসে এলিজা।
সে করিডোর পেরোয় ধীরে, নিখুঁত ছন্দে। তার পা থামে এমন এক জায়গায় যেখানে আলো কম, ক্যামেরার প্রাকৃতিক ব্লাইন্ড স্পট। জায়গাটা খুব হিসেব করে বেছে নেওয়া। এলিজা চোখ বন্ধ করে দাঁড়ায়।
তার ডান হাতের আঙুলের সেলাই করা চামড়ার ভেতরে একটা ক্ষুদ্র চিপ,চোখে পড়েনা।স্ক্যানেও ধরা পড়েনি।খুব-ই চালাকির সহিত, অনেকদিনের অপেক্ষা আর পরিকল্পনার পর তারা এই জায়াগায় এসে পৌছেছে।
মুখে কোনো শব্দ নেই, কণ্ঠনালী নড়ে না।
তার জিহ্বা আলতো করে তালু ছুঁয়ে সরে যায়।
গলার ভেতরে জন্ম নেয় এক অতি ক্ষীণ কম্পন শব্দ নয়, সংকেত।

___শুনছো তো সময় কম।
এক মুহূর্ত থামে সে।ভীর আজ প্রাসাদ ছাড়বে না। এখানেই থাকবে। তার রুমের গার্ড ডাবল করা হয়েছে।
ওই মেয়ের কাছে যাওয়া অসম্ভব হয়ে উঠছে।আমি বার বার চেষ্টা করেও কিছু করতে পারছিনা। প্যালেসে ঢোকা যতটা কঠিন ছিল, ওই রুমে পৌঁছানো তার চেয়েও দ্বিগুণ কঠিন।একটা গভীর শ্বাস।ইশায়া ওই মেয়েটা ভীরের রুমেই আছে। মেয়েদের গার্ড বদল হবে ভোর চারটার পর। নিকো কাল দক্ষিণ গেট দেখবে। ডিল আছে রিসস্কার সাথে ওর নজর সেদিকেই থাকবে।এলিজা থামে।যেন নিজের ভেতরের অস্থিরতাকে জোর করে শান্ত করছে।
___অন্যদিকে শহরের ভেতর, প্রাসাদ থেকে বহু বহু দূরে একজন লোক দাঁড়িয়ে আছে উঁচু ছাদের কিনারায়। সে ফোনে কথা বলছে না, কিন্তু সব শুনছে। তার মন পড়ে আছে একটাই জায়গায় আলভারেয স্টেটে।
হঠাৎ তার চোখ কুঁচকে যায়।ঠোঁটের কোণে ভেসে ওঠে ক্ষীণ, ভয়ংকর এক হাসি।
এলিজা চোখ খুলে ফেলে। জানালার কাচে নিজের প্রতিবিম্ব দেখে আয়নার মতো শান্ত, অনুভূতিহীন। তারপর ধীরে ঘুরে দাঁড়ায়। সিস্টেম তাকে ছেড়ে দেয়।
গার্ডরা কিছুই বোঝে না।কারণ এখানে সবচেয়ে ভয়ংকর শত্রু, শব্দহীনভাবে ভেতর থেকেই কাজ করছে যেটা তাদের ধারনার বাইরে।
___আর এই প্যালেসের এক ঘরেই, রাজভীরের ছায়ার ভেতরেই আছে সেই মেয়ে যার জন্য এই নিশ্ছিদ্র দুর্গে প্রথমবারের মতো ফাটল ধরার পরিকল্পনা শুরু হয়েছে।

বাংলাদেশ।
রহমান ভিলা।সকালের নরম আলো ধীরে ধীরে রহমান ভিলার জানালা ছুঁয়ে পড়ছে। ঘরের ভেতর একটা শান্ত, নিরিবিলি আবহ। যেন দীর্ঘ সময়ের ঝড় পেরিয়ে বাড়িটা আবার একটু একটু করে নিঃশ্বাস নিতে শিখছে।
আদনান রহমানের শরীর এখন আগের থেকে অনেকটাই ভালো। মুখে সেই পুরোনো দৃঢ়তা ফিরে না এলেও চোখে আছে বাঁচার চেষ্টা। সায়মা রহমান, রাহি সবাই মিলে সকালের রান্নার ব্যবস্থা করছে। রান্নাঘর জুড়ে ভেসে আসছে ভুনা খিচুড়ির গন্ধ। জান্নাত মন দিয়ে ডাইনিং টেবিল গুছাচ্ছে প্লেট, গ্লাস, চামচ এক এক করে সাজাচ্ছে।
আদনান রহমান নাতিকে কোলে নিয়ে বসে আছেন, শিশুটার হাসির দিকে তাকিয়ে নিজের কষ্টগুলো আড়াল করেন।
আবির অফিসে যাওয়ার জন্য একেবারে রেডি হয়ে নিচে নামে চোখে তাড়াহুড়ো, তবু মুখে একটা প্রশান্ত ভাব।আজ অনেকদিন পর সায়মা বেগম রান্না করেছেন ভুনা খিচুড়ি, গরুর মাংস, বেগুন ভাজা আর ইলিশ ভাজা। অনেকদিন পরে এই ঘরে আবার উৎসবের মতো রান্না। সবাই আসার পর রাহি আর জান্নাত মিলে খাবারগুলো নিয়ে যায় ডাইনিংয়ে।
আস্তে আস্তে তারা স্বাভাবিক জীবনের দিকে ফিরে যাচ্ছেন। আদ্রিয়ান তাদের সাথে একটু কথা বলে, তাদের সময় দেয়, আগের থেকে একটু একটু করে পরিবারের পাশে থাকার চেষ্টা করে।
সময় সবকিছুই বদলে দেয়। বড় থেকে বড় ক্ষত ভুলিয়ে দেয়। মনের এক কোনায় থেকে গেলেও জীবনের সাথে সাথে সবাই সামনে এগিয়ে যেতে শিখে যায়।
কারণ জীবন কারোর জন্য থেমে থাকে না।
মাস পেরোতে পেরোতে বছর হয়ে আসছে।

____আদ্রিয়ান সকালে উঠে অফিসের জন্য রেডি হয়। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে সে নিজেকে দেখে,
ছয় ফুট লম্বা শরীর, ছিপছিপে গঠন, ঘন কালো চুলগুলো পরিপাটি করে আঁচড়ানো। চুল দাড়ি কাটিয়েছে সে মায়ের কথায়। চোখের নিচে হালকা ক্লান্তির ছাপ থাকলেও মুখের রেখায় ফুটে ওঠে একধরনের দৃঢ়তা।
হালকা রঙের শার্ট, ডার্ক প্যান্ট অফিস গেটআপে আদ্রিয়ান বরাবরের মতোই স্মার্ট। পুরো সাজে যেন বোঝা যায়, ভেতরে ঝড় থাকলেও বাইরে সে নিজেকে সামলে রাখতে শিখেছে।
আদ্রিয়ান রেডি হয়ে ঘড়ি আর মানি ব্যাগ নেয় বের হওয়ার জন্য।
মানি ব্যাগ হাতে নিয়েই হঠাৎ কী মনে করে সেটা খুলে।
খুলতেই সেখান থেকে সাফার হাস্যজ্জ্বল একটা ছবি বেরিয়ে আসে।
আদ্রিয়ান ছবিটার দিকে তাকিয়ে ধীরে বলে,

___তোর আদ্র আবার আগের মতো হয়ে যাবে, যেমনটা তুই চাইতি সবসময়। কিন্তু আফসোস সেটা দেখার জন্য আর তুই নেই।বাবা-মার জন্য হলে ও জীবনটা আমাকে গুছিয়ে নিতে হবে।তোকে হারিয়েছি, ইশু কে হারিয়েছি আর কিছু হারানোর শক্তি যে আমার নেই জান।নতুন করে আর কাউকে হারাতে চাই না রে আমি।
বাবা-মা আমার মুখ চেয়ে বেঁচে আছেন। আর আছে একটা পাগলি মেয়ে যে সব কিছু জেনে শুনে ও আমার পেছনে পাগলের মতো পড়ে আছে।বলতো জান তোর আদ্র তোকে ছাড়া আর কাউকে কিভাবে ভালোবাসবে।
কেনো বুঝে না ও।আদ্রিয়ানের ভেতর থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে।
বাস্তবতার খাতিরে, বাবা মায়ের জন্য, যদি আমাকে অন্য কারোর হতে হয়,তুই কি ক্ষমা করতে পারবি আমাকে পাখি।
তুই সবসময় আমার মনের মধ্যেই থেকে যাবি। আমি তোকে খুব ভালোবাসি পাখি।আই লাভ ইউ জান।তোর আদ্র তোর ছিলো তোর-ই থাকবে।এই কথাটুকু বলতেই আদ্রিয়ানের চোখের কোনে বেয়ে এক ফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়ে।চোখের পানি মুছে সে ব্যাগটা আবার পকেটে ভরে নেয়।

___নিচে নামতেই দেখে বাড়ির সবাই একসাথে।
মুহূর্তের মাঝে ট্রেনের মতো চোখের সামনে ভেসে ওঠে সাফা, ইশায়া, তাদের সাথে কাটানো আগের দিনগুলো।
আজ সবই স্মৃতি।আজ শুধু তা দীর্ঘশ্বাসের কারণ।
আদ্রিয়ান নেমে আসে।
আদ্রিয়ানকে দেখে সায়মা রহমান বলেন,
বাবা, নাস্তা তো করবি না? টিফিন দিয়ে দেই তোকে একটু। সময় করে খেয়ে নিস।তোর পছন্দের সব রান্না করেছি আজ।
___আদ্রিয়ান কিছু না বলে সোজা এসে টেবিলে বসে সবার সাথে।সবাই অবাক হয়।
সাথে সাথে খুশিও হয়।সায়মা রহমানের খুশিটা তার চোখে-মুখে ফুটে ওঠে।আদনান রহমান ছেলেকে বসতে দেখে আবেগে আপ্লুত হয়ে বলেন,
ছেলেকে খেতে দাও। বড় পিসটা বেছে দাও তাকে।মাছের ডিম দাও।
__সায়মা রহমান দিতে গেলে রাহি থামিয়ে দিয়ে বলে,
মামুনি, তুমি বসো। আমি দিচ্ছি সবাইকে।
সবাই একসাথে বসে অনেকদিন পর ব্রেকফাস্ট করে।
হাসি নেই,কোন কথা নেই তবুও মনভরা একটা সকাল।পরিবারের একটা সুন্দর মুহূর্ত। যা হারিয়ে গিয়েছিলো আজ যেনো তা আবার নতুন করে ফিরে আসছে।

_____মেক্সিকোর গুয়াদালাহারা শহর,ভোরের আলো ধীরে ধীরে কালো পর্দা ছিঁড়ে ঢুকে পড়ছে বিশাল প্রাসাদের জানালায়।পাথরের দেয়ালে আলো পড়ে ছায়া নাচছে নির্বাক, ভয়ংকর।ভীরের মাস্টার বেডরুম।
ঘন পর্দার ফাঁক গলে ভোরের আলো এসে পড়ে বিশাল বিছানায়।সেখানেই ঘুমে মগ্ন দুজন একজন আরেকজনের সাথে মিশে।
ইশায়ার ঘুম ধীরে ধীরে ফুরিয়ে আসে।কাঁচা ঘুমের ভেতরেই শরীরজুড়ে অদ্ভুত একটা ভার টের পায় সে।
ইশায়া নড়তে চায় কিন্তু পারে না।বুকের ওপর যেন পাথর চাপা দেওয়া।শরীর ব্যথায় অবশ হয়ে আছে।
নিঃশ্বাস নিতে ও কষ্ট হচ্ছে তার।এই তীব্র অস্বস্তিতে ঘুম ভেঙে যায় ইশায়ার।ইশায়া ঘুম ঘুম চোখ মেলে তাকায়।মুহূর্তে তার নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসে,
তার শরীরের ওপর অর্ধেক ভার রেখে, তাকে আষ্টেপিষ্ট জড়িয়ে ধরে গলায় মুখ গুঁজে ঘুমিয়ে আছে একজন পুরুষ।অপরিচিত অথচ ভয়ংকরভাবে পরিচিত।
ইশায়া একবার চোখের পলক ফেলে।তারপর আবার তাকায়।না সে ভুল দেখছে না।ওই লোকটাই।যে লোকটা বলেছিল সে তার হাজবেন্ড।ভয়ের ধাক্কায় ইশায়ার শ্বাস বন্ধ হয়ে আসে।চিৎকার করতে চায় কিন্তু কণ্ঠ থেকে কোন শব্দ বের হয় না।ইশায়া নড়তে চায় কিন্তু এই বলিষ্ঠ শরীরের ভার এ সে এক চুলও নড়তে পারে না।

___ইশায়ার বার বার নড়াচড়াতে ভীরের ঘুমের ব্যাঘাত ঘটে।ঘুমের ঘোরেই ভীরের হাত ইশায়ার শরীরের চারপাশে আরও শক্ত হয়ে আসে।
ইশায়ার শরীর আরো জমে যায়।জামার অভ্যন্তরে ভীরের হাতের স্পর্শ আরো গাঢ় হয়, ইশায়ার শরীর কেঁপে ওঠে,শিরদাঁড়া বেয়ে ঠান্ডা স্রোত নেমে যায়।অস্বস্তি ভয় হয়ে বুক চেপে ধরে।তার কিছুই মনে নেই।
কোনো স্মৃতি নেই, কোনো সম্পর্ক নেই।এই মানুষটা তার কাছে একেবারে অচেনা।এই অবস্থায় সে নিতে পারছেনা এসব কিছু।লোকটা তো বলেছিল তাকে সময় দিবে সব কিছু বুঝে ওঠার জন্য।
হঠাৎ সাহস জড়ো করে ইশায়া শরীরের সব শক্তি এক করে ভীরকে ধাক্কা দেয়, নিজের থেকে সরানোর চেষ্টা করে।
ঘুমের ব্যাঘাত ঘটায় ভীর বিরক্ত হয়।ঘুমের ভেতরেই সে ইশায়ার শরীরের ওপর এক পা তুলে আরও শক্ত করে আঁকড়ে ধরে।পিঠের মাঝখানে টান দিয়ে আবার তাকে নিজের বুকে টেনে নেয়।একটা শব্দহীন আদেশের মতো।ইশায়ার নিঃশ্বাস এলোমেলো হয়ে আসে।
উন্মুক্ত ত্বকে সেই উপস্থিতি তার কাছে আতঙ্ক।

সে আমার বন্দিনী পর্ব ৬৫

___ভীরের ঘুমের ঘোরে হাস্কি, ভারী কণ্ঠে বলে,
Don’t disturb me. Let me sleep. Stay quiet and Don’t move. শব্দগুলো নরম।
কিন্তু শেকলের মতো শক্ত।ইশায়ার চোখের কোণে পানি জমে ওঠে।এই প্রাসাদ, এই মানুষ, এই স্পর্শ সবকিছু তার কাছে নতুন।

সে আমার বন্দিনী পর্ব ৬৭