Home প্রিয় মোনালিসা প্রিয় মোনালিসা শেষ পর্ব

প্রিয় মোনালিসা শেষ পর্ব

প্রিয় মোনালিসা শেষ পর্ব
নীতি জাহিদ

বর্ষাকাল কখনোই ইমরানের ভাগ্যের অনুকূলে থাকতে চায়না। বাচ্চা দুটো সেই সকাল থেকে বায়না ধরে বসে আছে একসাথে ডিনার করবে। আর কত স্পিডে গাড়ি চালানো যায়! রবিন নেই আজ। রবিনের মা অসুস্থ। ফ্যাক্টরির কাজে গাজীপুর যেতে হয়েছে। ঘড়িতে নটা বাজে। বাড়ি পৌঁছাতে আরো কমপক্ষে এক থেকে দেড় ঘন্টা। বৃষ্টির তেজ বাড়ছে। মেয়ে ফোন দিয়ে বলেছে সে পাপা না আসলে খাবেনা। গাড়ি চালাতে চালাতে চোখ গেলো রাস্তার পাশে বৃষ্টির পানি জমা ফুল গাছগুলোর দিকে। হালকা বাতাসেই যেন লাল, হলুদ ফুল গুলো উড়ছে।
কিছুদিন আগে বিবাহবার্ষিকীতে মোনার দেয়া সারপ্রাইজের কথা ভাবতেই ঠোঁটের কোণে আনমনে হাসি ফুটলো। একান্ত, কোলাহলমুক্ত একটা সন্ধ্যা, ঝিকিমিকি তারা জ্বলা আকাশের নিচে পুকুর পাড়ে রাত্রি পার করেছিলো দুজন। অনেকটা সময় পর এভাবে গল্প করে নিজেদের ব্যক্তিগত সময়টাকে উদযাপন করেছে। রিসোর্টে ঢুকতেই ইমরান বেশ অবাক হলো। রিসোর্ট কম গ্রামের বাড়ি বেশি লাগলো। চারদিকে কুঁড়ে ঘর, শাপলা-পদ্ম পুকুর পাড়, জলাশয়, নারকেল বাগান, কল তলা, অন্য পাশে ছোট্ট একটা ঘন বিল, লম্বা তালগাছের ফাঁকে অর্ধ চন্দ্র। মনোমুগ্ধকর পরিবেশ। কিছুটা নাস্তা সেরে বিশ্রাম নিয়ে দুজন বের হলো শহরের বুকে ছোট্ট গ্রামীন জগৎ দেখতে। মোনা আগ্রহ নিয়ে বলেছিলো,

– ইমরান সাহেব আজ পাঞ্জাবি পরেন। আমিও শাড়ি পরবো।
রিসোর্টের পথ ধরে দুজন হাঁটতে হাঁটতে এগিয়ে গেলো পুকুর পাড়ে। হ্যামক সদৃশ দোলনায় বসিয়ে দিলো মোনাকে। ঝিরিঝিরি বাতাস গা ছুঁয়ে যাচ্ছে। মোনা ইমরানকে পাশে বসার আহবান জানালো। বসেই প্রশ্ন করলো,
– মেয়েটা কাঁদবেনা তো?
– উঁহু। আপনার মেয়ে আমার চেয়ে স্ট্রং।
– ইশান কি জানে এখানে আসবে?
– আজ রিসোর্টে মিটিং এটেন্ড করবো একটা ক্লায়েন্টের সাথে এরপর আপনাকে সারপ্রাইজ দিব এটা জানে এর বেশি কিছু জানেনা। প্রশ্ন করে না ছেলেটা। নিজের মতো থাকে।
– বড় হয়েছে হয়তো তাই। তবে অনন্যার সাথে এমন ব্যবহার অনুচিত। একটু বুঝিয়ে বলবে।
মোনা একপেশে হেসে বলে,
– ইমরান সাহেব, আমাদের ইশান ছোট নেই যে ওকে এই ব্যাপার বুঝিয়ে বলবো। তবুও বলবো। তবে ওর মনে কিছু মানুষের প্রতি রাগ টা গেঁথে আছে। সুযোগ পেলেই হাতছাড়া করতে নারাজ। তারই ফল মিসেস অনন্যার সাথে এমন ব্যবহার।

আপনমনে মোনার কথাগুলো ভাবছে। তিক্ত সত্য, ইশান বড় হতে হতে অনেকটা গম্ভীর আর বেশ রগচটা স্বভাবের হয়েছে। ছেলেটা কঠিন পরিস্থিতি নিমেষে সামলে নিলেও অপছন্দের ব্যক্তির এক অক্ষর কথাও যেন কানে তোলা পাপ ভাবে। সামলানোর ব্যাপারে মোনা ছাড়া কাউকেই তোয়াক্কা করেনা। ইমরানের সাথে কম বেশি সব শেয়ার করলেও কিছু ব্যাপার বেশ এড়িয়ে চলে।
হ্যামক থেকে উঠে পুকুরের পানির দিকে চোখ স্থির করলো মোনা। চাঁদটা যেন জ্বলজ্বল করছে সবুজাভ পানিতে। গাছের পাতার প্রতিচ্ছবি পড়ায় রাতের আঁধারে পানিতে সবুজে লাগছে। একটা মাটির ঢিল নিচ থেকে কুড়িয়ে পুকুরে ছুড়ে মারতেই পানি গুলা কেমন ছলাৎ ছলাৎ করে আন্দোলিত হলো। ইমরানের দিকে তাকিয়ে বললো,
– এমন সৌন্দর্য্য কখনো দেখেছি কিনা একদম মনে করতে পারছিনা ইমরান সাহেব।
ইমরান উঠে মোনার পাশে নারকেল গাছটায় ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে বললো,
– আমি বহুবার দেখেছি। ঈদে যখন গ্রামে যেতাম তখন হুলস্থুল কান্ড বেঁধে যেত। শহর থেকে গেলেও কাদা মাটি গায়ে মেখে নেমে পড়তাম পুকুরে, আব্বা আম্মা দুজনই ছেড়ে দিত এমন পরিবেশে। সময়টা খুব মনে পড়ে জানোতো মোনালিসা। আমার ছেলে মেয়ে দুটোকে সেই শৈশব দিতে না পারার প্রচন্ড আক্ষেপ। গ্রামের বাড়িটা এখন জনমানবহীন।

– গেলেই তো পারেন।
– বলা সহজ, গেলেই সব কিছু গুছাতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা সম্পর্ক গুলো অনেক সুন্দর আছে গেলে যদি তা উনারা ঠিক ভাবে এক্সেপ্ট না করে। বিপদে তো কেউ পাশে ছিলোনা। আজ প্রতিষ্ঠিত ইমরান বলতে সবাই অজ্ঞান।
– আপনি তো সম্পর্ক থেকে পালিয়ে বেড়ানোর মানুষ নন তবে পালাচ্ছেন কেনো?
– অনুশোচনায়।
– কিসের?
– আমার ভুলের কারণে আব্বা আম্মা শয্যাশায়ী হলেন। একথা কম বেশি সবাই জানে। বাড়ি গেলেই আমার মনে পড়বে অনেক স্মৃতি।
– ভুলে যান সব। ভালো স্মৃতি মনে রেখে খারাপ গুলোকে দূরে ঠেলে দিন। দেখবেন আবার জীবনে সুখ ধরা দিচ্ছে।
মাথা নাড়লো। খানিকটা হেসে ইমরান বললো,
– জানো মোনালিসা আমার খুব হিমালয়ে যাওয়ার শখ ছিলো। ক্যাম্পিং, হাইকিং সব করেছি একটা বয়স অবধি। আমি ছিলাম মুক্ত পাখি। এরপর নিজেই নিজের পায়ে শেকল বাঁধলাম। লোকে বলেনা সুখে থাকলে ভুতে কিলায়। আমারও তাই হয়েছিলো বুঝলে। এখন সাধ্য আর সুযোগ দুটোই আছে কিন্তু সময়টা আর হলোনা। খুব করে চাইতাম কটাদিন প্রকৃতির টানে হারাবো…
স্বামীর দিকে চেয়ে আছে মোনা। মানুষটা এত ইচ্ছে চাপা দিয়ে রেখেছে। মেয়েলী হাত দুটো দ্বারা জড়িয়ে ধরে বললো,

– যান ঘুরে আসেন হিমালয়। আমি অনেক খুশি হবো। একটা ইচ্ছে পূর্ণ করুন।
– পাগল আমি! বয়স আছে নাকি এখন। যদি কখনো যাই ইনশাআল্লাহ তোমাকে নিয়ে যাবো। ডল আরেকটু বড় হোক। ইশানের গতি হোক এরপর…
– এরপর বুড়োবড়িতে ঘুরতে বেরিয়ে যাব কেমন…
– আমি বুড়ো তুমি বুড়ি নও মোনালিসা।
এতটুকু বলেই হাসছে ইমরান। মোনা রাগ করার ভাণ ধরে বলে,
– আপনি সব সময় এমন করেন। আপনি বুড়ো হলে তো আমিও বুড়ি হবো। আমি কি যুবতী থাকবো নাকি?
– তুমি আমার কাছে আমার অনন্ত যৌবনা মোনালিসা। যাকে দেখতে দেখতে মধ্য বয়স থেকে বার্ধক্যে পরিণত হচ্ছি। যার সৌন্দর্য্য ও ক্ষমতার নিকট বাকি সব তুচ্ছ ইমরানের কাছে।
– তাহলে সেদিন যে বললেন, মোনালিসা তুমি আগে থেকে পঁচা হয়ে যাচ্ছো?
– হ্যাঁ তাই তো। আমাকে সময় না দিলে বলবোনা। দাও নাকি সময়? সেদিন দেখলাম রাতে নতুন ডিজাইন নিয়ে বসেছো আর আমি একটু কাছে গিয়ে আদর করতে চাইলাম আমাকে তাচ্ছিল্য করে বললে দূরে যান। ভুলিনি আমি সেসব।
মোনা চোখ রাঙিয়ে বললো,

– ওমা সব দোষ আমার, তার আগে যে আমাকে রাগিয়ে তুলেছেন তা বললেন না কেনো? কেন আমাকে বললেন যে, মোনিকা বেলুচ্চি সুন্দর?
– সুন্দরকে সুন্দর বলবো না?
মোনা চিৎকার দিয়ে বললো,
– ইমরান সাহেব…
এই এক ইতালীয়ান তারকার নাম শুনলে মোনা সবসময় রেগে যায়। ইমরান রাগানোর জন্য বার বার বলে। আজো একই কাজ করেছে। মোনা যখন রেগে যায়, ইমরান তখন বেশ মজা পায়। হাতে একটা গাছের ডাল নিয়ে মোনা ছুটছে ইমরানের পেছন পেছন। আর ইমরান দৌঁড়াতে দৌঁড়াতে বলছে,
– মোনালিসা, তোমার এত বড় স্পর্ধা তুমি স্বামীকে
মা/রবে? হাত থেকে ওটা ফেলো। মোনিকা তো সত্যি সুন্দর। হাসলে কি সুইট লাগে।
মোনা ছুটছে। আজ থামবেনা। ইমরানের মুখ থেকে ওই মেয়ের নাম মুছেই তারপর শান্ত হবে। ইতালী থেকে সব ইতালীয়ান কালচার ঢুকে গিয়েছে এই লোকের মাঝে। ইমরান দৌঁড়ে যাচ্ছে উচ্ছল বালকের মত অথচ মোনা হাঁপিয়ে উঠেছে। ক্লান্ত মোনাকে দেখে থেমে পড়লো ইমরান। ইমরানের বুকে এসে ধাক্কা খেলো মোনা। হাত থেকে ডাল ফেলে দিলো ইমরান। ঘেমে যাওয়া চুলগুলো কানের পাশে গুঁজে দিলো প্রেয়সীর। গেয়ে উঠলো,

– যদি হিমালয় হয়ে দুঃখ আসে
এ হৃদয়ে, সে কিছু নয়
শত আঘাতেও, নিঃস্ব যে আজ
তার আবার , হারানোর ভয়…
মোনার কপালে ওষ্ঠ ছুঁয়ে বললো,
– পাগলী, মোনিকা বেলুচ্চির বয়স এখন ষাট। আমি মজা করি তোমার সাথে। তবে শী ইজ রিয়েলী এট্রাক্টিভ দেন আদারস। কিন্তু আমার মোনালিসার মতো ন্যাচরাল বিউটি নয়।
– আর বলবেন?
– না আর বলবোনা। কিন্তু সুন্দরের প্রশংসা করবোনা?
– আবার…

ইমরান হাসছে। জোরে হাসছে। প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। মোনা দেখছে। মোনার ঠোঁটেও হাসি। প্রাপ্তির হাসি। এই ইমরানকে নিজের করে পেতে কত স্বপ্ন দেখতে হয়েছে, কত রাত না ঘুমিয়ে কাটিয়েছে, কত প্রহর প্রতীক্ষায় কাটিয়েছে।
গাড়ির সামনে কিছু একটা এসে পড়তেই ইমরান ব্রেক কষলো। সুখের ভাবনা থেকে বেরিয়ে সামনে তাকিয়ে দেখে একটা গাছের ডাল। ঝড়ের দিনে রাস্তায় গাড়ি চালাতে এই মুছিবত৷ ছোট ডাল। গাড়ি পুনরায় স্টার্ট করতেই গড়িয়ে পড়লো ডালটা। কিছুদূর এগিয়ে যেতেই দেখলো কারা যেনো দাঁড়িয়ে আছে। কোনো কপোত-কপোতী মনে হলো। গাড়ি সামনে নিতেই দেখতে পেলো একটি দোকানের পাশ দেয়ালে গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে একজন গর্ভবতী এবং পাশে একজন পুরুষ। নিজের জীবনের বিভৎস সেই রাত ভেসে উঠলো চোখের সামনে। না ভেবে বেরিয়ে এলো দরজা খুলে। ছুটে গিয়ে সামনে গিয়ে প্রশ্ন করতেই জানতে পারলো নারীটির লেবার পেইন উঠেছে। রাস্তায় দাঁড়িয়ে গাড়ির জন্য অপেক্ষা দুজনের। এই ঝড় বাদলের রাতে কোনো গাড়ির দেখা পাওয়া অসম্ভব বটে। বিন্দুমাত্র সময় অপচয় না করে দুজনকে গাড়িতে উঠার অনুরোধ জানালো। হাসপাতাল অবধি পৌঁছে দেয়া যে মানবিক দায়িত্ব। যুগলদের চোখে মুখে কৃতজ্ঞতা ফুটে উঠেছে।

রাত বারোটা বিশ। মুখ ফুলিয়ে বসে আছে বাড়ির সবাই। গেট দিয়ে ঢুকছে কালো মটর গাড়িটা। সকলের দৃষ্টি সদর দরজায়। পা টিপে দরজা দিয়ে ঢুকতেই দেখে বাড়ি ড্রইং রুম সাজানো। কিছুটা অবাক হলো। মনে মনে ভাবলো, নিশ্চিত কোনো বিশেষ দিন আজ ভুলে গিয়েছে। টেবিলে বসে আছে বাড়ির সব সদস্য। সাথে অতিথি আছে নয়ন, রিক্তা এবং নাহিয়া। কান ধরে গুটি পায়ে ঢুকতে ঢুকতে বললো,
– এবারের মত মাফ করে দাও প্লিজ। একটু হাসপাতালে গিয়েছিলাম। এর মাঝে বৃষ্টি…
এত টুকু শুনেই সকলের রাগ পড়ে গেলো। ঔশান এবং ইতু ছুটলো ইমরানকে ধরতে। দুজনই ঝাঁপিয়ে পড়লো কোলে। বাকিরাও ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়লো হাসপাতাল শুনে। চেয়ারে বসে দেরি হওয়ার কারণ জানাতেই সকলে কিছুটা আশ্বস্ত হলো। মোনা ফ্রিজ থেকে একটা কেকের বক্স এনে সামনে রেখে বললো,
– নিন কেটে বাচ্চাদের একটু খাওয়ান। ওদের পেটে দানাপানি পড়েনি এই আশায় যে কখন পাপা আসবে আর কেক খাইয়ে দিবে।
– কিসের কেক?
ইশান আর সোহান পপার্স ফাটাতেই সমস্বরে শুভেচ্ছা ভেসে এলো,
– হ্যাপি বার্থডে টু ইউ।
ইমরান চমকে উঠলো। নিজের জন্মদিন ভুলে গেলো। প্রতিবছর এই দিনটা ব্যস্ততায় কাটায় নতুবা বাবা মায়ের কবর জিয়ারত করে। পরিবারের সকলের উচ্ছ্বসিত চেহারা দেখে হেসে বললো,
– বুড়ো বয়সে জন্মদিন পালন করছো আমার। ব্যাপার টা কেমন যেন?
সোহান বলে উঠলো,
– মামা জন্মদিনের আবার বুড়ো জোয়ান কি? আপনি আমাদের কাছে সবসময় এভারগ্রীন।
ইমরান হাসছে। কেক কাটা শেষ করে সবাই খেতে খেতে মজা করছে। আজ নয়ন চুপচাপ। ইমরান বেশ লক্ষ্য করলো নয়নের নিরবতা তার পছন্দ হয়। নয়ন যেখানেই যাবে আসর মাতিয়ে রাখবে এটাই হবে তার কাজ তা নয় আজ একেবারে নিরব। প্রশ্ন করলো,

– নয়ন, তোর কি হলো? আজ এত নিরব কেনো?
নয়ন খেতে খেতে ইমরানের দিকে তাকিয়ে বললো,
– জানিস বন্ধু সন্ধ্যা থেকে ভাবছি তোকে বিশেষ কি উপহার দিব। সবাই বেশ ভালো ভালো উপহার দিয়েছে তোর জন্য। মিনহাজ ভাই থেকে পরামর্শ চাইলাম ভাই বলে সব শার্ট, প্যান্ট আর পারফিউমের ব্র্যান্ড। ওগুলো কমন। আমার পছন্দ হলো না। নিজ থেকে একটা জিনিস নিলাম। তোর পছন্দ হবে কিনা তাই ভাবছি?
ইমরান সহাস্য জবাব দিলো,
– হবে না কেনো? অবশ্যই হবে। তোরা যাই দিবি সেরা উপহার আমার জন্য।
এর মাঝে রিক্তা বলে উঠলো,
– কি এমন বিশেষ উপহার আনলে কই দেখলাম না তো? আমি নিজেই তো এখানে এসে জানলাম আজ জন্মদিন ইমরান মামার।
– আরেহ ওটা পারসোনাল উপহার। ইমরান খাবারের পর আমাকে দশ মিনিট সময় দিস।
ইমরান মাথা ঝাঁকিয়ে সায় দিলো। এর মাঝে খাবার পর্ব শেষ। স্টাডি রুমে বসেছে নয়ন এবং ইমরান। নয়নের দিকে অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। টেবিলের সামনে নয়নের দেয়া উপহার। এযাবৎকালের এমন উপহার কেউ দিয়েছে কিনা ইমরান হলপ করে বলতে পারছেনা, এরচেয়ে বড় কথা কেউ কখনো দেয়ার সাহসটুকুও করবেনা। নয়ন দুপাটির সব কটা দাঁত দেখিয়ে বললো,

– বন্ধু এই ডিভাইসে আমার সব প্রিয় গান আছে তোরে নিয়ে, যেমন ধর- কালো কোকিল কলঙ্কেরই কালি লাগাইলো, কালো জলে কুচলা তলে, কালা আমার হাতের কাকন, ওরে কালাচাঁন সহ সব। তোর যখনই মন চাইবে চাবিটা ঘুরাবি আর ইঁদূর টা নাচবে, আর বিলাইটা ধরার চেষ্টা করবে। ইউনিক গিফট না? এই গিফট অর্ডার দিয়ে চায়না থেকে বানিয়ে এনেছি আরো আগে। কখন দিবো বুঝতে পারছিলাম না। আজ মোক্ষম সময় মনে হলো। কত্ত খাটুনি গিয়েছে। সিম্বোলাইজ করতে চাইলে করতে পারিস। বিড়ালটা মোনা আর ইঁদুর টা তুই ভাবার্থে।
ইমরান হতভম্ব। এই উপহার সবার সামনে নয়ন খোলেনি এটা ইমরানের জন্মভাগ্য। কি উপহার দিলো এটা! একটা বিড়াল থাবা দিয়ে ইঁদুর ধরার চেষ্টা করে সুইচ অন করে চাবি ঘুরালে। আর সেই সাথে গান বাজে। নির্বাক দৃষ্টিতে চেয়ে আছে বন্ধুর দিকে। নয়ন সহসা বলে উঠলো,
– এটার লাইভ ও আছে।
টেবিলের পাশে থাকা বড় একটা ঝুড়ি বের করে ঢাকনা উল্টাতেই ভেতরে পার্সিয়ান ব্রিডের একটা বাদামী বিড়াল ম্যাও ম্যাও করছে। ইমরান সাথে সাথে উচ্চারণ করলো,
– ইয়া আল্লাহ, আর কি দেখাবে।
নয়ন বললো,

– ইঁদূর ধরতে চাইলাম বন্ধু কিন্তু ভয় লাগে পরে যদি বাচ্চাগুলার জিনিস কাটে। মোনা তো আমাকে আস্ত রাখবেনা। তাই আপাতত বিড়াল দিয়ে চালিয়ে নে।
ইমরানের ক্রোধান্বিত চোখ দেখে নয়ন ঢোক গিলে বললো,
– এভাবে তাকাচ্ছিস কেনো আরো আছে গিফট। ওগুলা মোনাকে দিয়েছি। পারফিউম আর সান গ্লাস। কিন্তু এটা স্পেশাল তাই তোকে পারসোনালি দিলাম। এই বিড়ালের একটা নাম দিয়েছি ইমু, নাম টা সুন্দর না! তোর নামের সাথে মিল আছে।
চেয়ার ছেড়ে ইমরান উঠে গিয়ে স্টাডি রুম থেকে বেরিয়ে এসে দেখলো তার রুমে সবাই আছে। ওকে দেখে সকলে দাঁড়িয়ে পড়লো। নয়ন পিছু ছুটলো। রিক্তার দিকে তাকিয়ে ইমরান বললো,
– রিক্তা, নয়নের উপহার দেখেছো আমার জন্য এনেছে যে?
রিক্তা ঘাবড়ে গেলো আওয়াজ শুনে। আমতা আমতা করে বললো,

– জ্বি মামা, মোনা দেখালো মাত্র।
– ওটা নয়। ও আমার জন্য বিড়ালের বাচ্চা এনেছে। আরেকটা তো নাই বললাম।
উপস্থিত সকলে ঘাবড়ে গেলো। ভাগ্যিস বাচ্চারা রুমে নেই। মোনা ফিক করে হেসে বলে,
– ভালোই তো বিড়াল আমার পছন্দের।
নয়ন হি হি করে হেসে বলে,
– এইতো আমার মেয়েটা খুশি হয়েছে। তুই শুধু শুধুই এমন করিস।
ইমরান মৃদু ধমকে মোনাকে বললো,
– তুমি তাল দেবেনা ওকে। আর রিক্তা দুদিন পর আমি নয়নের জন্য রিটার্ন গিফট পাঠাবো আমার শেপার্ডের কুইনকে।
নয়ন কুকুর ভিষণ ভয় পায়। শেপার্ড থেকে দশ হাত দূরে থাকে। সেখানে বাসায় একটা দানব কুকুরের রানী পাঠাবে ভেবে চিৎকার দিয়ে উঠলো।
– না না দোস্ত। আমি বিড়াল নিয়ে যাব। কুইন পাঠাস না। আমি তো তোর ভালোর জন্য এনেছি ইমুকে।
আইরিন বললো,

– ইমু কি?
ইমরান কথা কেড়ে নিয়ে বললো,
– ওর বেড়ালের নাম। সাহস দেখেছো? ইনডিরেক্টলি আমার নামে রাখলো। নো প্রবলেম আমিও শেপার্ড কুইন নয়নাকে পাঠাচ্ছি রিক্তা যত্ন করতে পারবেনা? যদিও আমি জানি তুমি কুকুর পছন্দ করো। অবশ্য আমি একজন লোক দিয়ে দিব যত্নের জন্য। তুমি শুধু মাঝে মাঝে নয়না আর নয়নকে নিয়ে হেঁটে আসবে।
মোনা হো হো করে হাসতে হাসতে বলে,
– নয়না!
রিক্তা মুখ টিপে হেসে বললো,
– জ্বি মামা, অবশ্যই। নাহিয়াও পছন্দ করে এনিমেল। কোনো সমস্যা নেই।
নয়ন চেঁচামেচি শুরু করে দিয়েছে সে কোনো কুকুর পালবেনা। ইমরান মনে মনে হাসছে আর ভাবছে,
– ব্যাটা অনেক জালিয়েছিস। এবার আমার পালা।

সারা রাত মন আনচান করেছে। ফজরের সালাতের পর এক মনে দাঁড়িয়ে আছে দুটো কবরের সামনে। পাশে আছে ভাই,ভাগ্নে এবং ছেলে। এই দিনটাতে ইমরান দেশে থাকলে সবাই যতটা খুশি হয় তার চেয়ে বেশি ব্যাথিত হয় ইমরানের কষ্ট দেখলে। সবাইকে জোর করে বাড়ি পাঠিয়ে দিতে চাইলো। কেউ যাচ্ছেনা। পরিশেষে ইশতিয়াকের দিকে তাকিয়ে বললো,
– বাড়ি গিয়ে সবাইকে তৈরি হতে বল। গ্রামে যাবো।
ইশতিয়াক চমকে উঠলো। কোন গ্রামে যাবে ভাই! পুনরায় প্রশ্ন করলো,
– কোন গ্রামে?
– রসুল পুর।
পৈতৃক ভিটাতে যাবে বলেছে ইমরান। ইশতিয়াক স্পষ্ট শুনলো। ভাই যখন বলেছে তার মানে যাবেই। এত বছর পর! ইশানকে রেখে সোহানকে নিয়ে বের হয়ে গেলো কবরস্থান থেকে।
বাবা মা দুজনই শায়িত আছেন চিরনিদ্রায়। যদি একবার বাবা উঠে মাথায় হাত রেখে বলতেন,
– ভেঙ্গে পড়িস না ইমন। তুই আমার সেই লাঠিটা যাতে ভর দিয়ে আমি আগানোর সাহস পেয়েছি।
কখনো বলবেনা বাবা কারণ সেই অহংকার যে ভেঙ্গে চুরমার করে দিয়েছে সে। এসব এখন নিছক অবান্তর মনোভাবনা।

– পাপা?
ছেলের ডাকে সম্বিত ফিরে পেলো। ইষৎ হেসে বললো,
– যাওনি।
– একসাথে যাব। তুমিও চলো। দাদুভাই আর দাদিমা দোয়া করছে তোমার জন্য। মন খারাপ করলে কিভাবে হবে। তোমাকে মন খারাপ মানায় না। বাড়ি চলো।
মাথা নেড়ে পা ফেললো আগানোর উদ্দেশ্যে। কথার মাঝে ইশান প্রশ্ন করলো,
– ইনফরমেশন পেয়েছি, পরশু প্রোডাক্ট আসার সময় কুমিল্লা হাইরোডে ঝামেলা হতে পারে। ভেবেছো কিছু এই ব্যাপারে? আর তুমি এভাবে একা একা রাস্তায় নামো কেনো? কাল রবিন চাচ্চু ব্যস্ত ছিলো মানলাম আমাকে কল করোনি কেনো ফেরার পথে? আমি যেয়ে নিয়ে আসতাম।
অবাকপানে ইমরান ছেলের দিকে তাকালো। বাবার তাকানো দেখে ইশান কিছুটা বিচলিত হলেও নিজেকে সামলে বললো,
– স্যরি পাপা, কথাটা ওভাবে বলতে চাইনি। আমি জানি তুমি একা চলতে পছন্দ করো। কিন্তু এটাও তো আমাদের ভাবতে হবে যে তোমার আর মায়ের উপর আক্রমণ বেশি হয়। ডলকে তো আমি বা সোহান ভাইয়া কেয়ারে রাখি কিন্তু তোমরা দুজন তো অনেক কাজেই বাইরে থাকতে হয়…
ইমরান ছেলেকে থামিয়ে বললো,

– পড়াশোনা শেষ করো এরপর অন্যকিছুতে মন দেবে। আর প্রোডাক্টের দেখাশোনা আমি করবো। দেশের পরিস্থিতি ভালো না। লাইসেন্স পেয়েছো তার মানে এই না যে সাথে এমন ভয়ানক অস্ত্র নিয়ে দিন দাহাড়ে ঘুরে বেড়াবে। সেফটি শুধু আমার নয় তোমার আর সোহানের ও প্রয়োজন। আমি তোমার সাধারণ জীবন-যাপন পছন্দ করছি। এমন কিছু করবেনা যাতে করে আমি বাবা হিসেবে সন্তানের জন্য হাহাকার করি। তুমি আমার অক্সিজেন এটা খুব ভালো করেই জানো।
মাথা নত ইশানের। বাড়ন্ত ছেলের জন্য দুশ্চিন্তা ঘিরে ধরেছে বাবাকে৷ ইমরানের নখদর্পনে থাকে ইশানের আনাগোনা। বড় হতে হতে স্পষ্ট হচ্ছে, এই যেন ছোট্ট ইশান নয়, ইমরানের অনুরূপ আরেকটা ভার্সন তৈরি হচ্ছে। ছেলের জন্য নিজের সাদামাটা জীবনটাকে বেছে নিয়েছে অথচ ছেলে সেই পথেই এগিয়ে যেতে চায়। বিচক্ষণতার সাথে আগালে ইমরানের সকল সহযোগিতা পাবে, অন্যথায় ছেলেকে বুঝানোর সময় চলে এসেছে। বাড়ি পৌঁছেই ইমরান কামরায় প্রবেশ করলো। ঔশান বাবার গলা জড়িয়ে রাজ্যের আবদার জুড়ে দিয়েছে। মেয়েটাকে কাছে পেলে মনে হয় পৃথিবীতে দুঃখ নেই। আকাশী গোল জামাতে ছোট্ট একটা আকাশ লাগছে। মেয়ে মায়ের নামে একটানা নালিশ জানাচ্ছে বাবাকে। ইমরান মুখ টিপে হাসছে। সকাল থেকে অবশ্য বউটা চোখের সামনে পড়েনি। হয়তো সবাই মিলে গ্রামে যাওয়ার প্রস্তুতি চলছে। ছোট্ট আওয়াজে বাবাকে বললো,

– পাপা, মোনালিসা কাল ডোরিকে চকলেট দেয় নি। বলেছে তোমাকে বলে দিবে আমাকে না দিতে।
– ছিহ! আম্মা, মোনালিসা কি? তোমার তো মা হয় জান।
– মা বলবোনা। চকলেট দেয় নি কেনো?
– তোমাদের দুজনের জন্যই তো ইকুয়েল- ইকুয়েল চকলেট এনেছি। তোমার গুলা কি করেছো?
– খেয়েছি।
– তাহলে মায়ের টা কেনো নিচ্ছো?
ঔশান গাল ফুলিয়ে বাবার গলা ছেড়ে দিয়ে রাগ করে চলে যাচ্ছে ইমরান মেয়েকে আকড়ে ধরলো। এ যেন আরেকটা মোনা। তৎক্ষনাৎ দরজা দিয়ে মোনা ঢুকছে। ঢুকতেই দেখলো বাবা মেয়েকে মানাচ্ছে। এদের আবার কি হলো! ইমরান মোনার দিকে তাকিয়ে বললো,
– মোনালিসা তুমি আমার ডলকে কাল চকলেট দাওনি?
মোনা এতক্ষণে বুঝতে পেরে বললো,
– আপনার ডলকে প্রশ্ন করুন, নিজের টা খেয়ে আমারটা কেনো ধরেছে? আমি কি তার টা খাই? গত মাসে তার কাছে একটা আইসক্রিম চেয়েছিলাম, আমাকে দেয় নি। তবে চকলেট চায় কি করে আমার কাছে?
ইমরান চমকে স্ত্রীকে প্রশ্ন করলো,
– তুমি কি মেয়ের সাথে প্রতিযোগিতায় নেমেছো বউ?
– ইয়েস। খান সাহেবের ভালোবাসা, চকলেট এন্ড আইসক্রিম নো কম্প্রোমাইজ।
বাকরুদ্ধ ইমরান। কপালে বলিরেখা। এই পরিস্থিতি কি কাউকে বুঝানো যাবে না বলা যাবে! এদিকে মেয়ে মুখ লুকিয়ে রেখেছে বাবার বুকে। দীর্ঘ শ্বাস ফেলে মোনাকে বললো,

– ও মোনালিসা, চকলেট আছে এখন তোমার কাছে?
– কেনো?
– একটা ধার দাও। আমার মেয়েটা খাক। তোমাকে পুষিয়ে দিব।
– সত্যি তো?
– তিন সত্যি।
মোনা আলমারি খুলে চকলেট বের করে ইমরানের হাতে দিলো। ইমরান ঔশানের দিকে বাড়িয়ে দিতেই মেয়েটা ঝামটা মে/রে হাত সরিয়ে উচ্চ শব্দে কেঁদে দিয়ে না করে দিলো সে চকলেট খাবেনা। অপ্রস্তুত হয়ে গেলো ইমরান এবং মোনা দুজনই। ইমরান মেয়েকে কোলে নিয়ে আদর করতে করতে প্রশ্ন করলো,
– কি হয়েছে বাবা, কেনো কাঁদছে বাবার জানটা। চকলেট দিলাম তো।
হেচকি তুলতে তুলতে বলে,

– ডোরি এই চকলেট খাবেনা। ডোরিকে পাপা নতুন চকলেট এনে দিতে হবে।
ইমরান মেয়ের অভিমান বুঝতে পেরেছে। মোনার চকলেট আর খাবেই না। ইশানকে ফোন দিয়ে নতুন চকলেট আনালো। সেই চকলেট খুলে ইমরানকে খাওয়ালো। মোনা মন খারাপ করে কাপড় গুছাচ্ছে। ঔশান চকলেট নিয়ে বাইরে চলে গেলো ইতুকে খাওয়ানোর জন্য। স্ত্রীকে জড়িয়ে ধরে বললো,
– আচ্ছা জানোই যখন মেয়েটা তোমার ডুপ্লিকেট। তবে কেনো কষ্ট দাও। সারাক্ষণ তো দুটোতে আনন্দ করো। চকলেট আর আইসক্রিমের ক্ষেত্রে এমন করলে চলে?
– সারাক্ষণই চকলেট, আইসক্রিম খায় তাই দিতে চাইনা।
– আদর করে বুঝালেই তো পারো।
তখনই দরজায় কড়া নড়লো। দরজা খুলতেই দেখতে পেলো ইশান বোনকে কোলে নিয়ে ভেতরে ঢুকেই মোনার সামনে এলো। মেয়েটা মায়ের দিকে চকলেট এগিয়ে বললো,
– স্যরি ডোরির মা। ডোরি তোমাকে ছাড়া চকলেট খাবেনা। খাও। আমার টা শেষ হলে তোমার টা থেকে ডোরিকে দিও।
ইমরানের ঠোঁটের কোণে হাসি। মোনা মেয়ের থেকে চকলেট নিলো। এরপর ভাই এবং বাবাকে খাইয়ে ছুটে রুম থেকে আবার বেরিয়ে গেলো। ইশান হেসে বলে,

– আমাকে রুমে গিয়ে বলে, ভাই একটু চকলেট খাও। ইতুপাকে দিয়েছি। প্রশ্ন করলাম, সবাইকে দিয়েছে কিনা? বলে- সবাইকে দিতে চাই কিন্তু মা খাবেনা। আমরা রাগ করেছি। পরে বুঝিয়ে বলতেই বললো, তাহলে মাকে আগে দিই। এরপর তো নিয়ে আসলাম।
ইমরান হাসছে। ইশান রুম থেকে বের হতেই ইমরান বললো,
– এটা আমার মেয়ে মোনাশা ইকবাল। তোমার মত হিংসুটে নয়।
মোনা রাগ করে রুম থেকে বেরিয়ে যেতেই ইমরান হাত ধরে টেনে বাহুতে নিলো। ললাটের চুল গুলো সরিয়ে ওষ্ঠ ছুঁইয়ে বললো,
– দিন দিন আরো বেশি সুন্দর হচ্ছো, রহস্য কি? গত রাতে তো সময় দিতে পারিনি তবে আজ রাতটা কি?
– আমরা গ্রামে যাচ্ছি। এলোমেলো কথা ছাড়ুন। যেতে দিন তৈরি হবো।
– গ্রামের আবহাওয়ায় প্রেম বেশি জমে। চাঁদোয়া রাতটা আজ মোনালিসার নামে।

আইরিন ফোন দিয়ে জানিয়ে রেখেছিলো সমস্ত বন্দোবস্ত করে রাখতে। ইমরান আসবে শুনে সবাই যে যার যার জায়গা থেকে আজ একত্রিত হওয়ার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়েছে। পুরোনো রেশ অনেকটাই ভুলে গিয়েছে। মানুষ আশায় বাঁচে, সুখে থাকার আশায় কখনো বা সুখে রাখার আশায়। সুখ কিসে! কারো সুখ টাকায়, কারো সুখ কাছের মানুষকে ভালো রাখায় আর কারো সুখ অন্যের মুখে হাসি ফোটানোতে। রসুলপুর জমিদার বাড়ি দেখতে পাঠানগড়ের মতো ছোট নয়। এই বাড়ি ঐতিহ্য বহন করে। বুড়িগঙ্গার পাড়ের গ্রাম। জসীমউদ্দিনের অনবদ্য চরিত্র আসমানীর গ্রামের নাম ছিলো রসুলপুর। আসমানীর কথা ভাবতেই মনে পড়ে যায় সেই কবিতা যা জসীমউদ্দিন ‘ এক পয়সার বাঁশি’ তে লিখেছিলেন,

” আসমানীরে দেখতে যদি তোমরা সবে চাও,
রহিমদ্দির ছোট্ট বাড়ি রসুলপুরে যাও।
বাড়ি তো নয় পাখির বাসা ভেন্না পাতার ছানি,
একটুখানি বৃষ্টি হলেই গড়িয়ে পড়ে পানি। ”
সেই বিখ্যাত কবিতা যার মধ্যে দিয়ে আজ পুরো দেশ চিনে আসমানীকে। এই রসুলপুর, সেই রসুলপুর নয় তবে দুই রসুলপুরের সৌন্দর্য্যই অতুলনীয়।
গাড়ি চলছে রসুলপুরে উদ্দেশ্যে। কাছাকাছি যেতেই ইমরান গাড়ির উইন্ডো খুলে পেছনে তাকালো। যা বুঝার বুঝে গিয়েছে। কন্ট্রোলের বাইরে চলে গিয়েছে। আর মাথা না ঘামিয়ে সম্মুখে তাকালো। গাড়ি থামলো বাড়ির সদর দরজায়। সকলে মিলে গেট পেরিয়ে ভেতরে প্রবেশ করছে। ইমরান পিছিয়ে ছেলে এবং ভাগ্নের দুহাত ধরে আটকে দিয়ে ওদের নিয়ে আড়াল হলো বাড়ির ঝোপের দিকে। দুজনকে বকা দিয়ে বললো,
– এজন্য তোমাদের বলেছিলাম না গাড়িতে আসো। বাইকে আসার কি প্রয়োজন ছিলো?
ইশান ভ্রু কুচকে বললো,
– পাপা, তুমি দিন দিন পাষান হয়ে যাচ্ছো। দেখো হাত দিয়ে রক্ত ঝরছে আর তুমি আমায় বকা দিচ্ছো। মাকে কি বলবো?
ইমরান ধমক দিয়ে বললো,
– যাও তোমার মাকে গিয়ে বলো যে,’ মা আমি মারপিট করেছি রাস্তায়। ‘ এরপর আমিও দেখতে চাই তার প্রতিক্রিয়া।
ইশান দমে গেলো। সোহান অসহায় মুখ করে বলে,

– মামা গাড়িটা আমাদের গাড়ি গুলোকে ফলো করছিলো। উত্তম মধ্যম দেয়ার পর বলে কোন নেতা যেন পাঠিয়েছে নির্জনে আমাদের পরিবার শেষ করতে। পরে এক্সিডেন্ট বলে চালিয়ে দিবে।
– তাই বলে তোরা মারামারি করবি? আমি ছিলাম না? সজীব আর মিনার ব্যাপারটা দেখতো।
ইশান বাবার দিকে তাকিয়ে বললো,
– এই বয়সে মা/রামা/রি করবে আমরা থাকতে?
ইমরান রেগে বললো,
– অনেক বছর হয়েছে তোমাকে চড় দিয়েছি যে, সেই কাজ যেন আমাকে আবার রিপিট করতে না হয়।
শুকনো ঢোক গিলে ইশান পিছিয়ে বললো,
– আর করবোনা।
সন্দিহান চোখে ছেলের দিকে তাকাতেই, ছেলে পুনরায় প্রতিজ্ঞা করলো আর করবেনা। সোহানের দিকে তাকানোর আগে হড়বড় করে বললো,
– আমি তো শুধু কিল ঘুষি দিয়েছি। ইশান নাক ফাটিয়ে দিয়েছে। হাত পা ভেঙে দিয়েছে।
ইমরান কথা না বাড়িয়ে বাড়ির দিকে পা বাড়ালো। বড় হতে হতে এরা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। তবে ঠোঁটের কোণে হাসির রেখা। ছেলেগুলো কাপুরষ হয়নি। বিপদে ঝাঁপিয়ে পড়ে সমাধান করতে শিখেছে।
হাসি-আড্ডায় মেতে উঠেছে জমিদার বাড়ি। ইমরানকে দেখে বাড়ির ছেলেরা এগিয়ে এলো। ভাতিজারা জড়িয়ে ধরলো। এত বলে কয়েও চাচাকে বাড়িতে আনতে পারলোনা। এত বছর পর সবাই যেন খুশির জোয়ারে ভাসছে। ইশান এবং সোহানকে সবার শেষে আসতে দেখে মোনা প্রশ্ন করলো,

– দেরি হলো যে তোমাদের?
এর মাঝে ইতু চিৎকার দিয়ে বলে,
– বড় মা দেখো ইশান ভাইয়ার হাতে ব্যান্ডেজ।
মোনা উঠে দাঁড়ায়, সামনে এসে বলে,
– দেখি?
ইশান শান্ত বাচ্চার মতো হাত এগিয়ে দিলে মোনা দেখে কোনো প্রশ্ন না করে ইমরানের দিকে রাগী চোখে তাকালো। ইমরান ভড়কে গেলো। মনে হলো যেন ছেলের হাত সে কেটে দিয়েছে। ইমরান মোনার তাকানো দেখে ইশানের দিকে চোখ পাকিয়ে তাকালো। ইশান -সোহান একে অন্যের দিকে তাকিয়ে আছে। মনে মনে যুদ্ধ হয়ে যাচ্ছে একেকজনের। ইশান মায়ের দিকে তাকিয়ে বললো,
– মা বাইকে সমস্যা হচ্ছিলো। রাস্তায় দাঁড়িয়ে ঠিক করছিলাম আমরা দুজন। তখনই লেগে হাত কেটে গিয়েছে।
মোনা দাঁত খিচে ছেলে শোনা মতে বললো,
– তোমার শরীরে তোমার বাবারই রক্ত আছে। আমাকে মিথ্যে বলা শুরু করেছো কবে থেকে?
রাগ করে মোনা সামনে থেকে চলে গেলো। ইমরানের পাশে বসে ক্ষীণস্বরে ফিসফিস করে দাঁত খিচে বললো,
– ছেলের আজকের অবস্থার জন্য আপনি দায়ী। একা হলে আপনার সাথে বোঝাপড়া আছে আমার।
ইমরান মুখে হাসি রেখেছে সবাইকে দেখানোর জন্য। ধীর আওয়াজে বললো,
– হ্যাঁ তাই তো, সব আকাজের দায়ভার আমার। কিন্তু প্রশ্রয় তোমার ছেলে প্রথম বার চার বছর আগে মা থেকেই প্রথম পেয়েছিলো।
– যাই বলুন না কেনো, আপনার আজকে খবরই আছে।
উঠে গেলো মোনা ইমরানকে ঠান্ডা হুমকি দিয়ে। সব কিছু তার উপর দিয়ে যায়।

আগের চেয়ে বেশ সুস্থ আছে মিনহাজ। নিয়ম করে মেডিসিন নিতে হচ্ছে। ব্যাপারটা মিরাকল নয়। স্বাভাবিক, খুব স্বাভাবিক। মহান আল্লাহ চেয়েছেন তাই সুস্থ হয়েছেন মিনহাজ। এখনো মনে পড়ে ভয়ংকর প্রতিটি রাত। আল্লাহ তার একমাত্র সন্তানকে একেবারে এতিম করে দেন নি। মেয়েটা বড় হয়েছে, বিয়ে হয়েছে, সংসার করছে এবং মা হয়েছে তবুও সে বাবার রাজকন্যা। কিছুক্ষন আগে নাতনীর সাথে কথা হলো। পুরো মোনার ছোট ভার্সন। অনেক দিন পর আলমারি থেকে স্ত্রীর ছবিটা বের করে চোখের পানি ফেলছে। সব আছে অথচ প্রিয়তমা স্ত্রী নেই। মানুষ দ্বিতীয় বিয়ে করার সাহস যোগায় অথচ সে পারলোনা। মা এখনো চায় ছেলে এই বয়সে সংসারী হোক। অথচ মিনহাজের বার বার মনে হয় মাইশার জায়গা কেউ নিতে পারবেনা। অপূরণীয়। মাইশা হয়তো বাস্তবে নেই তবে মিনহাজ তাকে মনের মাঝে আজন্ম বাঁচিয়ে রেখেছে। কখনো সিদ্ধান্ত নিতে সমস্যা হলে রাত জেগে আপন মনে স্ত্রীর সাথে আলাপ করেছে। অদ্ভুত ভাবে ভালোবাসার শক্তির এতো টান যে সকালে তার মন সমাধান খুঁজে পেয়ে গিয়েছে। বহুবার হয়েছে এমন। মোনা- ইমরানের বিয়ে নিয়ে মনের মধ্যে উঁচু নিচু অনেক সিদ্ধান্ত উঠানামা করেছে। এক পর্যায়ে তার অশান্ত মনে আল্লাহ শান্তি ঢেলে দিলেন। স্বপ্নে দেখলেন স্ত্রী মাইশাকে। ইঙ্গিত দিলেন ইমরানের সাথে মেয়ের জোট বাঁধার। জীবন সংগ্রামে মিনহাজ জিতে গিয়েছে। কত কথা, কথা মানুষ শুনিয়েছে অথচ পাশে ছিলো গুটিকতক মানুষ। মেয়েটা ভালো আছে এই শান্তি। এছাড়া বাড়ির প্রতিটি মানুষ বেশ হাসিখুশিতে দিন কাটাচ্ছে। বোনটা বাইরে থেকে ফোন দেয়। বোনের একটা ছেলে আছে। ফোন দিয়ে মামার সাথে আদো আদো বুলিতে কথা বলে। এই তো সুখ।

বাড়ির চারপাশটা নিরবে হেঁটে হেঁটে দেখছে। কত আবেগ, স্মৃতি এই বাড়ি ঘিরে। বাবা মাকে মনে পড়ছে। একটার পর একটা সি*গারেট শেষ করছে। বাবা মারা যাওয়ার দিনের কথা মনে পড়লো। দূরে সরিয়ে রেখেছিলো সবাই ইমরানকে। ছুঁতে পারেনি বাবাকে। চোখ বুজলো বাবা অভিমান নিয়ে, চিরদোষী বানিয়ে গেছে ইমরানকে।
গাছপালা পুকুরের কারণে পরিবেশ বেশ শীতল। ছায়া ঘেরা বাড়ি। সন্ধ্যা নেমেছে বহু আগে। রাতের সালাত আদায় করলো গ্রামের মসজিদে। সবার সাথে দেখা করে বাড়ি ফিরতে ফিরতে বেশ রাত। একসাথে খাবার খেয়ে বাড়ির আলোচনা কক্ষে পুরুষরা সবাই কিছুক্ষণ গল্প স্বল্প করলো। রুমে ঢুকতেই ভ্রু কুচকে সামনে তাকালো। ইমরানকে দেখে না তাকিয়ে পাশ কেটে চলে গেলো। বেশ অবাক হলো। অন্যদিন হলে বলতো,
– ইমরান সাহেব কালো পাঞ্জাবি আর সাদা চাদরে আপনাকে মানিয়েছে।
অথচ আজ ফিরেও তাকায়নি। নিজেকে একবার আয়নায় দেখলো। নাহ! বেশ মানানসই লাগছে তবে বউটার কি হলো! মোনার পরনে কালচে খয়েরী রঙা বেনারাস কাতান মায়ের। এই শাড়ি ইমরান চেনে। শরীর জুড়ে সব গয়না হয়তো এখানকার। রাজকীয় সাজ তবে এভাবে এভাবে ইমরানকে কারণ ছাড়া উপেক্ষা করার হেতু খুঁজে পেলো না। ইমরান এগিয়ে গিয়ে প্রশ্ন করলো,

– ছেলে মেয়েরা কি ঘুমিয়েছে?
এবারো প্রশ্নের উত্তর দিলোনা। ভীষণ আশ্চর্য হলো। কোমড়বন্ধনী ঝুম ঝুম করে বাজছে। নাকে পরেছে চেইন টানা নোলক, চূড়ির শব্দ তো কানে বাজছেই। আজকের সাজ ইমরানের জন্য নয় স্পষ্ট। হয়তো বাড়ির সবাই এভাবে সাজিয়েছে প্রথমবার এই বাড়িতে পা রাখাতে। পালংকে বসে ইমরান দ্বিতীয় প্রশ্ন করলো,
– মোনালিসা, কথা বলছো না কেনো? কি হয়েছে?
রুমের বাতি নিভিয়ে চুপচাপ এই ভারী গয়না, শাড়ি সব পরেই শুয়ে পড়লো। ইমরান চরম মাত্রায় আশ্চর্য হয়ে অধর আলগা করে বললো,
– এসব পরে কেউ ঘুমায়। কি করছো? আমার অপরাধ কি?
ফোনের দিকে তাকিয়ে দেখলো, মেসেজ এসেছে নয়নের।
– মোনা রেগে আছে কেনো দেখ। ঔশানকে বকে ঘুম পাড়িয়েছে। ইশানের সাথেও কথা বলেনি। সন্ধ্যায় ইশানকে খুব বকা দিয়েছে ইশান ফোনে বললো।
ইমরান উঠে রুমের পাশে লাগোয়া খোলা বারান্দায় এসে ইশানকে ফোন করলো। ইশান ফোন ধরতেই প্রশ্ন করলো,

– প্রিন্স ঘুমিয়েছো?
– না পাপা ঘুম আসছেনা।
– কি হয়েছে মা বকেছে কেনো?
– অনেক গুলা কারণ। নিজের দোষের টা খেয়েছি সাথে তোমার দোষের টাও।
– কিভাবে?
– মা বুঝতে পেরেছে পাপা আমি কোনো ভাবে বিজনেসে ইনভলভ হয়েছি। তাই খুব বকা দিয়েছে। আমাকে কড়া করে বারণ করেছে যেন তোমার অস্ত্রের বিজনেসে যোগ না দিই। আর তোমার দোষের টা হচ্ছে তুমি স্মোক করেছো মা দেখেছে। ডলকে অনেক বকেছে আজ। ও কেঁদে কেঁদে ঘুমিয়েছে। হয়তো ঢাকা থাকলে আজ মা/র ও খেতো। আমাদের সব রাগ ওর উপর তুলেছে।
ইমরান দীর্ঘ শ্বাস ফেলে বললো,
– ঠিক আছে।
কিছুক্ষণ শান্ত থেকে ইশান বললো,

– স্যরি পাপা। মা আজ অনেক কষ্ট পেয়েছে।
– এটা আমাদের দুজনের প্রাপ্য। বলতে পারো শাস্তি। দুজনই চেয়েছি তোমার মাকে ভালো রাখতে অথচ দুজনই নিজের অজান্তে কষ্ট দিয়েছি। ঘুমিয়ে পড়ো। আমি দেখছি।
– ওকে পাপা।
ইমরান রুমে প্রবেশ করতেই দেখলো মোনা নিরবে শুয়ে আছে। বারান্দার দরজা আটকে শুয়ে পেছন থেকে দৃঢ়ভাবে জড়িয়ে ধরলো মোনাকে। নিজের সাথে মিশিয়ে বললো,
– প্রতিজ্ঞা করছি একটাও ছুঁবো না।
শান্ত মোনা। অধর ছোঁয়ালো মোনার উন্মুক্ত পিঠে। ব্লাউজের পেছনটা বেশ বড়। সহধর্মিণীর মাঝে প্রতিক্রিয়া দেখতে না পেয়ে আষ্টেপৃষ্টে ধরলো। এবারো পাথরের মতো পড়ে আছে রমনী। রেগেই বললো,
– ভালো হচ্ছেনা মোনালিসা। কথা বলো।
জোর করে মোনাকে নিজের দিকে ফেরালো। চোখ বন্ধ মোনার। এত রাগ করেছে! দু গাল হাতের আজলে তুলে বললো,
– ঘুমের ভান করোনা। আমার স্পর্শ এত অনুভূতিহীন নয় যে তুমি প্রতিক্রিয়া দেখাবেনা। চোখ খোলো। কথা ছিলো আজকের রাতটা আমাদের…
চট করে চোখ খুললো। সোজাসাপটা প্রশ্ন,

– কথা তো অনেক কিছু ছিলো। কখনো সিগারেট না ছোঁয়ার কথা ছিলো। তা কি মানা হয়েছে? ছেলেটাকে নিজের মত মাফিয়া বানানোর প্রয়োজন ছিলো নাতো।
– মাফিয়া হলাম কখন?
– কম তো কিছুনা। এত সাধারণ জীবন যাপনের মাঝে আতঙ্কে থাকতে হয় কখন কে কিভাবে আক্রমণ করে। মেয়েটা বড় হচ্ছে। কদিন পর ওর নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে।
– সামলে নেবো ইনশাআল্লাহ। বিজনেস তো লিগ্যাল। অন্যায় তো করছিনা।
– যেসব বৈধতা নিয়েও কঠিন জীবন পার করতে হয়, এমন বৈধতা গ্রহন না করাই শ্রেয়।
– বিজনেস ছাড়তে বলছো?
– নাহ, ছেলেকে দূরে রাখতে বলছি। সময় হয়নি ওর এখনো। যা করবেন ওর পঁচিশের পর করুন। পড়াশোনা শেষ করুক। ম্যাচিউরিটি আসুক। রাগ নিয়ন্ত্রণে আনুক। আপনি মাথা ঠান্ডা রেখে সব ডিল করতে পারলেও ছেলে অল্প কিছুতেই চট করে রেগে যায়। এতে নিজের ক্ষতি ডেকে আনে। আজো হাত কেটে বসে আছে।
ইমরান হাসছে। তীক্ষ্ণ চোখে প্রশ্ন করলো,

– হাসার মতো কি বললাম?
– দেখছি। ছেলেকে জন্ম না দিয়েও এত ভালোভাবে বুঝো কি করে? এজন্যই হয়তো ইশান তোমার ন্যাওটা।
– কথা ঘুরাবেন না। ঔশান আমার পেটের। ইশান না। ওর দিকে আমার যত্ন, খেয়াল এবং অবজারভেশন সবসময় বেশি থাকে। মায়েরা সব পারে।
কথা শেষ করে মোনা ঘুরে যাবে ইমরান জোর করে আটকে দিলো। ক্রোধ নিয়ে মোনা বললো,
– ইশানের প্রবলেমটা সলভ করেছি। আপনারটা হবে না। ক্লান্ত আমি ঘুমাতে দিন অথবা ট্রলিতে আরো দু প্যাকেট দেখেছি তার মজা নিন রুম থেকে বের হয়ে।
ইমরান উঠে গিয়ে ট্রলির প্যাকেট দুটো নিয়ে দুমড়ে মুচড়ে বিনে ফেললো। পুনরায় শুয়ে বললো,

– ফেলে দিয়েছি।
– হুম। শুভ রাত্রি।
– এত স্পর্ধা আমাকে উপেক্ষা করার?
মোনাকে চেপে ধরে আলতো হাতে নাকের নোলক খুলে দিলো। একাধারে কান পাশা, গলার সিতা, বিনুনী কাটা, হাতের মানতাশা, চূড়া সব খুলে পাশে রেখে ললাটে অধর ছোঁয়ালো। চক্ষু নিমীলিত মোনার। ওষ্ঠ ছুঁলো নয়নজোড়া, নিখুঁত নাক এবং প্রিয়ার কোমল অধরে মেলালো অনমনীয় অধর। অধর ছেড়ে চুপটি করে আছে। চোখ খুলছে না মোনালিসা। বুকের মাঝে ধুকপুক করছে তার। ঠোঁট কামড়ে হাসছে ইমরান। দু লাইন গাইলো,
– একটু যদি তাকাও তুমি মেঘ গুলো সোনা
আকাশ খুলে বসে আছি তাও কেনো দেখছোনা।
চোখ খুললো ইমরান পত্নী। আজকের জন্য শেষ বাক্য আওড়ালো প্রেমিক পুরুষ ,
– ইমরানের উত্তালতা উপেক্ষা করার ক্ষমতা মোনালিসার আগেও ছিলোনা, এখনো হয় নি, ভবিষ্যতেও হতে দিবোনা। তুমি ইমরানের খসখসে প্রকৃতির এক পশলা বৃষ্টি, আমার দ্বিতীয় প্রহর।
গলায় মুখ ডুবালো ইমরান। আবেশে চোখ বুজলো মোনা। অধরে হাসি ফুটিয়ে মনে মনে বললো,
– নির্লজ্জ মন আমার! অধৈর্য্য ভালোবাসা আপনার। উপেক্ষা করার অপশনই থাকেনা দুটো।

জমিদার বাড়ির সুনশান বাঁশঝাড়ে নেমেছে অধিকতর হিংস্রতা। এখানেই বডি প্যাকেট করা শেষ। জায়গাটা ধুয়েমুছে চকচকে করা হলো। সকালের সূর্য জানতে পারবেনা আজ রাতের নৃসংসতার কথা। তিনটে সাদা বডি প্যাকেট। জিপার লক করা হলো। তিনজন কালো পোশাকে আবৃত মানবের বৃহৎ কাঁধে লাশ তিনটি। প্রস্থান হলো তাদের। কে ছিলো এরা! কারা হত্যা করেছে। পেছনের বাঁশ ঝাড়ের পুকুরটা পরিত্যাক্ত হয়ে পড়ে আছে। পানি স্বচ্ছ। এদিকটাতে কেউ তেমন আসেনা। রক্ত মাখা হাত দুটো প্রথমে হ্যান্ডওয়াশ দিয়ে ধুয়ে স্যানিটাইজ করে নিলো। বাকি চারজনের দিকে তাকিয়ে বললো,
– যতবার অশুভ দৃষ্টি পড়বে আমার অস্তিত্বে ততবার সমূলে উৎপাটিত হবে। কাজ এমন ভাবে করতে হবে হাতে যেন প্রমাণ লেগে না থাকে। গট ইট?
সমস্বরে উত্তর এলো,
– ইয়েস স্যার।
– যাও ঘুমিয়ে পড়ো সকাল হওয়ার দেরি নেই।

বাবার বুকের উপর শুয়ে আছে ঔশান। মোনার ডাকাডাকিতে চোখ খুলে মেয়েকে উঠিয়ে দিলো। নাস্তার টেবিলে খেতে খেতে সবার আড্ডা জমে উঠেছে। তখন বাইরে থেকে বাড়ির একজন গার্ড এসে বললো,
– স্যার রাতে কি বাড়িতে চুরি বা ডাকাতি কিছু হইছে?
বাড়ির লোকজন বেশ অবাক হয়ে প্রশ্ন করলো,
– নাতো কেনো?
– বাড়ির গেট থেকে সদর দরজা পর্যন্ত কাদা মাটিতে হাঁটা জুতার ছাপ, আবার বাড়ির পেছন দিকটাতেও বাশ ঝাঁড় পর্যন্ত সেই ছাপ আছে। বাঁশ ঝাড় পুরা ভিজা।
সোহান তখন বলে উঠলো,
– পরিষ্কার করে ফেললেই তো হয়। বাড়িতে চুরি, ডাকাতি হলে কি আমরা সুস্থ থাকতাম! কথা কম বলে পরিষ্কার করে ফেলো। আমাদেরই পায়ের ছাপ হবে। কাল কতবার বের হলাম, এদিক সেদিক গেলাম।
ছুরির ধারালো অংশের সাহায্য কেকের পিছ টা কেটে ছুরি দিয়েই মুখে পুরলো ইমরান। ইশান বাবার দিকে তাকিয়ে একপেশে হাসছে। ইমরান আপন সুখে কেক চিবাতে চিবাতে মেয়েকে খাইয়ে দিচ্ছে। গার্ড কথা বাড়ালে ইশান বলে উঠলো ,

– চাচা এগুলো কোনো ব্যাপারই না। কত পায়ের ছাপ পড়বে, কত জায়গা ভিজবে। আমরা তো কিছুদিন থাকবো। আপনি চোখ বন্ধ করে পরিষ্কার করানোর ব্যবস্থা করুন।
ছেলে আর ভাগ্নের দিকে তাকিয়ে চোখ ঝাপটালো ইমরান। দুজনই খাবারে পূর্ণ মনোযোগ দিলো। মোনা ইমরানের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘ শ্বাস ফেললো। ইশান যখন গত রাতে ঔশানকে রুমে দিয়ে গিয়েছে তখন মোনার চোখে পুরোপুরি ঘুম ছিলোনা। এই পায়ের ছাপ এদের তিনজনের মোনা নিশ্চিত। হয়তো রাতে তিনজন হাঁটতে বেরিয়েছে। ইমরান সাহেব হয়তো ছেলেদের বুঝিয়েছে এসব মারপিট না করার ব্যাপারে । যাক অবশেষে মোনা নিশ্চিন্ত।
খাবার শেষে কামরায় এলো সবাই। তখন মোনা ইমরান এবং ইশানকে ধন্যবাদ দিয়ে বললো,
– কাজটা তোমাদের। রাতে তিনজনই হাঁটতে গিয়েছিলে আমি জানি। ইশান পাপা বুঝিয়ে বলেছে না যে পড়াশোনা শেষ করতে হবে? মারামারি, কাটাকাটিতে মন দিবেনা। পাপার বিজনেস পাপা দেখুক। মনে থাকবে?
ইশান হেসে বলে,

– অবশ্যই মা। সব মনে থাকবে। এখন থেকে আমি তোমার কথাও শুনবো, পাপার কথাও শুনবো। কোনো ভুল করবোনা। হাত কাটার তো প্রশ্নই আসেনা ইনশাআল্লাহ। সাবধানে থাকবো যেন হাত না কাটে।
– ধন্যবাদ ইমরান সাহেব।
ইমরান হেসে স্ত্রী সন্তানদের জড়িয়ে ধরে মনে মনে বললো,
– তোমাদের ভালো রাখার জন্য আমি সব করতে রাজি। এর মাঝে যা কিছু ঘটবে, যা কিছু আসবে সবকিছুর দায়ভার নিতান্তই আমার। তোমাদের দিকে হাত বাড়ালে শাস্তিস্বরূপ জীবনের হিসেব মিটিয়ে নিতে হবে। ছাড় পাবে না একজনও। পথিক ভুলেছি, পথকে ভুলিনি। পথের কাঁটা সরিয়ে মসৃন পথ তৈরি করা যে দায়িত্বের নেশা। আল্লাহ সবাইকে হেফাজতে রাখুন।

প্রিয় মোনালিসা পর্ব ৫৯

মোনার অপরিমেয় বিশ্বাস ধরে রাখার চেষ্টা, অন্যদিকে পরিবারের সুরক্ষার পণ যেন আজ সবকিছুর উর্ধ্বে। যতই চেষ্টা করা হোক চাইলেই স্বাভাবিক জীবনে ফেরা অসম্ভব । তবে জীবনটাকে সহজ করা সম্ভব। পরম্পরা বজায় থাকুক। বাবার আদর্শে সুস্থ ভাবে ছেলে বেড়ে উঠুক। এইতো প্রাপ্তি।

সমাপ্ত