Home প্রিয় মোনালিসা প্রিয় মোনালিসা পর্ব ৫৮

প্রিয় মোনালিসা পর্ব ৫৮

প্রিয় মোনালিসা পর্ব ৫৮
নীতি জাহিদ

The woods are lovely, dark and deep.
But I have promises to keep,
And miles to go before I sleep,
And miles to go before I sleep.
সূর্যোদয়ের দৃশ্যটা কক্সবাজারের মতো মনোরম হয়তো নয় তবে জীবনের সেরা কয়েকটি সকালের সাথে আজকের সকাল যোগ হলো। হাসপাতালের জানালার সামনে দিয়ে বেশ কিছু কবুতর উড়ে যেতে দেখা গেলো। ধবধবে সাদা, লেজের পেছনদিক টা কিছুটা ধূসর বর্ণের। নিশ্চিন্তে ঘুমিয়েছে ইমরান জায়া গত রাতটা। ব্যাথা ভুলে গিয়েছে স্বামীকে পাশে পেয়ে।রাতের বেশির ভাগ সময়টা স্ত্রীর মুখের দিকে তাকিয়ে, ভবিষ্যৎ – অতীত ভাবতে ভাবতে কাটিয়ে দিলো। ঠোঁটের কোণে আনমনে হাসি ফুটলো। সময় বহমান স্রোতস্বিনীর ন্যায় সকল দুঃখ ভাসিয়ে নিয়ে ইমরানকে দুই সন্তানের জনক করে দিলো। বেশি না বছর খানেক আগেও হয়তো ইমরান ভাবে নি জীবন তাকে দ্বিতীয় বার সাজানো সংসারের কতৃত্ব হাতে তুলে দিবে। জানালা দিয়ে রাস্তার দিকে তাকাতেই চোখে পড়লো পরিচ্ছন্ন কর্মীদের সুসংগঠিত কাজ। তৎপর হয়ে তারা রাস্তা পরিষ্কার করছে। পুনরায় সাজিয়ে তুলছে কাল রাতের ধ্বংসস্তুপ। কি সুন্দর সৃষ্টিকর্তার লীলা। ঠিক যতটা আলোড়ন তুলেছিলো গত রাতে, আজ সকালটা কয়েক গুন বেশি স্নিগ্ধতায় ভরিয়ে দিয়েছে। মিষ্টি সুবাতাস। শরীরে শিহরন জাগায়। দীর্ঘ শ্বাস ফেলে মোনার বেডের কাছে এসে বসলো। ওষ্ঠ ছোঁয়ায় ললাটে। প্রিয় পুরুষের স্পর্শে চোখ খুলে হাসিমুখে তাকায়। ততক্ষনে ইমরান উঠে মেয়ের বেবিকটের সামনে গিয়ে বাবার আদুরে আলতো স্পর্শ দিলো মেয়ের হাতে এবং কপালে। মোনা তাকিয়ে মুচকি হেসে দেখছে মানুষটাকে। মেয়ে পেয়ে কত খুশি অথচ কল্পনায় ও ভাবনাতীত ছিলো এই বর্তমান। মেয়ে কান্না করাতে আলতো হাতে মেয়েকে কোলে তুলে বুকের সাথে মিলিয়ে নিলো। চোখ গেলো সদ্য ঘুম ভেঙে যাওয়া প্রিয় নারীর দিকে। ঠোঁটের মাঝে আজ বাঁধ ভাঙা হাসি রেখে মেয়ের জন্য গেয়ে উঠলো অঞ্জন দত্তের গানের দুটো মিষ্টি চরণ,

– “তুমি না থাকলে সকালটা এতো মিষ্টি হতো না
তুমি না থাকলে মেঘ করে যেত বৃষ্টি হতো না”।
মোনা হাসছে। মানুষটা মেয়ে পেয়ে কত উচ্ছ্বসিত। ভ্রু নাচিয়ে মোনা প্রশ্ন করলো,
– কার জন্য গাইলেন গানটা? আমার না মেয়ের?
ইমরান চমকে গিয় বললো,
– মোনালিসা আর ইয়্যু জেলাস?
– ইয়েস অফকোর্স।
– সিরিয়াসলি?
– অভ্যিয়াসলি।
– শী ইজ আওয়ার ডঠার।
মোনা অধর প্রশস্ত করে দাঁত খিঁচে বললো,
– আই নো শী ইজ। বাট ইয়্যুর ফার্স্ট প্রায়োরিটি শ্যুড বি অন মোনালিসা আন্ডারস্ট্যান্ড?
ইমরান হতবাক, হতচকিত, স্তব্ধ। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো,

– ভেবেছিলাম মেয়ের মা হওয়ার পর একটু বড় হবে, নাহ! আমি বড্ড ভুল ছিলাম। মেয়ের জন্য দুটো লাইন গাইলাম এতেই তুমি ঝগড়া শুরু করেছো।
– এটাকে ভালোবাসা বলে, ঝগড়া নয়। এখন আমার জন্য গাইবেন। গেয়ে ফেলুন ঝটপট।
বেকায়দায় পড়ে গেলো ইমরান। মনে মনে বেশ চিন্তা নিয়ে ভাবলো, যদি মা মেয়েতে মিলে ঝগড়া শুরু হয় কোনদিকে যাবে সে! ভাবনার মাঝে মোনা একটু জোরে বলল,
– ইমরান সাহেব গান গাইতে বললাম। না গাইলে কিন্তু আমি মেডিসিন নিবনা। খাবার খাবোনা। হরতাল পালন করবো।
মনে মনে হাসছে ইমরান। মোনালিসার জন্য তোলা ছিলো আগের গানের কয়েকটি চরণ। যদি বউটাকে খুশি করা যায়। মুখ খোলার আগেই মোনা বললো,

– কবিতার মতো না। গান গাইতে হবে।
– তেতাল্লিশ বছরের জীবনে কেউ এভাবে ধমকে গান গাইতে বলেনি।
– অনুরোধ করছি। প্লিজ শুরু করেন।
মেয়েটা দুবার কেঁদে আবার বাবার কোলে ঘুমিয়ে পড়েছে। ইমরান সুর তুললো,
– তুমি না থাকলে তাজমহলটা বাননোই হতো না
লাঠা লাঠি এই কাটা কাটি থামানোই যেতো না….
তুমি না থাকলে মোনালিসা কবে হয়ে যেত গম্ভীর…তুমি না থাকলে তোমার চিঠি জমানোই হতো না…
গলা থামিয়ে ইমরান দেখলো মোনার ঠোঁটে হাসি। ইমরান সাহেবের দিকে উড়ন্ত চুমু ছুঁড়ে বললো,
– একদম পারফেক্ট। দূর্দান্ত হয়েছে। আই লাভ ইয়্যু ইমরান সাহেব।
ইমরান অবাক চোখে অর্ধাঙ্গিনীকে দেখে হেসে ফেলে, দুই পাশে মাথা নেড়ে বললো,
– আপনার কেনা সরঞ্জাম আমি, যখন খুশি বাজিয়ে নেবেন। শুধু আদেশ করবেন, বান্দা হাজির হবে।
– আমারই তো।
– তবে মোনালিসা, আমার মেয়েটাকে তোমার প্রতিদ্বন্দ্বী বানিও না। একটা মাত্র মেয়ে আমার। ওকে একটু আদর পেতে দাও আমার। দয়া করে মেয়েটাকে তোমার দস্যিপনাগুলো শিখিওনা।
দাঁত দেখিয়ে মোনা হি হি হি করে হেসে বলে,

– আর শেখাবোনা। যা শেখার পেটে থাকতেই শিখে ফেলেছে।
নার্স এবং ডা. রত্না এসেছে। ইমরান থেকে মেয়েকে নিয়ে ফিডিং করাতে হবে। আইরিন ঢুকলো তখন। সকালের নাস্তা নিয়ে এসেছে। আইরিন মোনাকে ধরে বসালো। রত্না ইমরানের দিকে তাকিয়ে বললো,
– ইমরান বেবির গ্রোথ কিন্তু ফিডিং এর উপর ডিপেন্ড করে। এদিকটা খেয়াল রাখবি। না খেতে চাইলেও জোর করে সময় মত খাওয়াতে হবে।
আইরিনের দিকে তাকিয়ে বললো,
– আপাকে বুঝিয়ে বল। আমি আসছি কিছুক্ষন পর।
– আশ্চর্য আপা কি সবসময় ফিড করাবে নাকি? ভাবীর শরীরের অবস্থা নাজুক। আপা কাছে না থাকলে তখন তো হেল্প করতে হবে।
ইমরান রত্নার দিকে তাকিয়ে বলে,
– তো আমি করাবো নাকি!
রত্না ক্ষেপে বলে,
– তুই না করালে কে করাবে?
উপস্থিত সবাই ইমরানের দিকে ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে আছে, ইমরানে তাদের দিকে তাকিয়ে আছে। ইমরানের মনে হলো, এই সিচুয়েশন তার জন্য বেশ অপ্রস্তুতজনক। কাঁকনের সময়টাতে কাঁকন নিজে করেছে। ইশান মায়ের বুকের দুধ তেমন পায়নি বললেই চলে। এর আগেই কাঁকন নিজের ফিটনেসের কথা চিন্তা করে ছেলেকে সব ধরনের যত্ন থেকে বঞ্চিত করেছে। এই মুহুর্তে ইমরানের এ ধরনের অভিজ্ঞতা থাকার কথা নয়! এরা কেনো বুঝতে পারছেনা ফরমুলা মিল্ক খাওয়ানোতে অভ্যস্ত করেছে ছেলেকে ইমরান, এভাবে সবার সামনে ওকে এসব বলার কি প্রয়োজন। রত্না পুনরায় বললো,

– যাচ্ছিস কোথায়, কথা শুনে যা।
– কি করতে হবে আপাকে বলে দেয়। আমার এসবের অভিজ্ঞতা নেই।
ইমরান বেরিয়ে যেতেই আইরিন হেসে দিলো। মোনা লজ্জা পেলো। রত্না আইরিনের দিকে তাকিয়ে বলে,
– আপা ও কি এমনই?
আইরিন হাসতে হাসতে জবাব দেয়,
– এই ভেবে শুকরিয়া আদায় করা উচিৎ আমাদের রত্না, ওর দুই দুইটা বেবি হয়েছে। ও আদৌ নিজেকে প্রকাশ করতে পারেনা। যেখানে লজ্জা পাওয়ার প্রয়োজন নেই, সেখানেই লজ্জা পাবে। মোনা, তুই এই এক বছর ধরে ওকে ঠিক করতে পারলিনা?
মোনা লজ্জা পেয়ে বলে,
– আপা থাক না, তুমি আছো; তুশি আপু আছে। সমস্যা হলে তোমরা দেখবে।
রত্না হতাশ গলায় বললো,
– যেমন জামাই তার তেমন বউ।
আইরিন হাসতে হাসতে বলে,
– ঠিক হয়ে যাবে। কটা দিন যাক।

বাসায় গিয়ে পোশাক পালটে কিছুক্ষনের মাঝেই ইমরান চলে আসলো। শরীরের অবস্থা ভালো না। ম্যাজ ম্যাজ করছে। এর মাঝে বেশ বুঝতে পারছে জ্বর এসেছে। সেসব কেয়ার না করে একটা নাপা এক্সট্রা খেয়ে সামান্য নাস্তা করে বের হলো। এসেই চমকে উঠলো। সালাম দিতেই দুই বন্ধু এসে জড়িয়ে ধরলো। ইমরান হেসে বসতে বললো। মেয়েটা শান্ত হয়ে কমান্ডারের স্ত্রীর কোলে ঘুমুচ্ছে৷ শেহজা বাবার কানে ফিসফিস করে কি যেন জিজ্ঞেস করছে। বাবা হেসে ঠোঁট নাড়িয়ে উত্তর দিলো। ইমরান হাতের ইশারায় শেহজাকে ডাকলো। একটা রজনীগন্ধার স্টিক হাতে নিয়ে ইমরানের পাশে দাঁড়ালো। কোলে তুলে প্রশ্ন করলো,

– ভালো আছো আম্মু?
বাবার দিকে তাকাতেই শাহাদ বললো,
– আম্মা আংকেল কি বলে উত্তর দেন।
শেহজা হেসে বলে,
– চাচ্চু এই ফুল টা তোমার জন্য। বেবিকে আর আন্টিকে ও দিয়েছি। আমার গাছের ফুল।
ইমরান খুব জোরে হেসে উঠলো। ফুলটা নিয়ে শেহজাকে আদর করে বললো,
– মাশা আল্লাহ। আম্মাটা আমাদের জন্য তার গাছের ফুল এনেছে?
দিয়া বলে উঠলো,
– ভাইয়া, বাসায় যেই আসুক অথবা যেখানেই যাক হাতে করে রজনীগন্ধা গুলা নিয়ে যাবে। বাসায় যতক্ষন থাকে বাপ বেটিতে ফুল গাছ গুলোর পরিচর্যায় ব্যস্ত থাকে।
ইমরান হেসে বলে,

– ভালো আইডিয়া। ঔশান বড় হলে আমিও বাগানের পরিচর্যা করবো এভাবে।
শেহজা পুনরায় বললো,
– চাচ্চু তোমার বেবিটা অনেক সুন্দর, ডলের মত।
– আমার বেবিটা তোমার পছন্দ হয়েছে?
উপর নিচ মাথা নেড়ে শেহজা বলে,
– হুম অনেক। একটু বড় হলে আমার সাথে খেলতে দিবে? আমি ভাইকেও অনেক আদর করি, একদম মা/রিনা। পঁচা বাচ্চা না আমি। বাবাকে জিজ্ঞেস করো?
শাহাদ বলে উঠলো,
– মেজরের ছেলের কথা বলছে। ওর ন্যাওটা শাদবীর। সারাক্ষন দুটোতে ঘর মাতিয়ে রাখে। আর শেফালির টা বড্ড অসহায়। এই দুটোকে পাহারা দেয়।
তখন নয়ন ঢুকলো। সবাইকে দেখে খুশিতে লাফিয়ে উঠলো। শেহজাকে কোলে নিয়ে দুষ্টুমি শুরু করে দিয়েছে। দিয়া এবং রাই দুজনই কথা বলছে মোনার সাথে। দিয়ার দিকে তাকিয়ে মোনা স্তব্ধ হয়ে দেখছে। কি সুন্দর মায়া মায়া চেহারা। স্নিগ্ধ আর নমনীয় একজন স্ত্রী এবং মা। আগে শুনেছে আজ দেখছে। অন্যদিকে রাই এর ব্যক্তিত্বে মুগ্ধ। অত্যন্ত চটপটে আর শক্ত হাতে সামলে নেয়া রমনী। নয়ন বলে উঠলো,

– নাফি তোর পিচ্চি কই?
– মা আর ভাবীমার কাছে রেখে আসছি।
রাইফা বলে উঠলো,
– ভাই সাহেব ওটাকে এখানে নিয়ে আসলে হসপিটাল মাথায় তুলতো। সারাক্ষন তিড়িং বিড়িং গঙ্গাফড়িংয়ের মত লাফাবে। আর হাঁটার সময় যে জায়গায় হাঁটবে কিছু না কিছু ভেঙে যাবে৷ যদি প্রশ্ন করি ভেঙেছো কেনো, উত্তর দিবে জিনিসটা আমার পাপার। তাই ভেঙেছি। মারতে গেলে পাপা বলে এক চিৎকার দেয়। পরে আপনাদের বন্ধু আসলে বাপ বেটিতে মিলে গ্লু গান, ক্লে এসব দিয়ে ওই ভাঙা জিনিস জোড়া লাগিয়ে সাজাবে। আমার প্রশ্ন হলো তুমি ভাঙলে কেনো আর কেনোই বা জোড়া লাগাচ্ছো। উত্তরে বলে, আমি শিখছি। মানে আমাকে অতিষ্ঠ করে ফেলে মাঝে মাঝে। ওর বাবাও এমন ছিলো।
শাহাদ এবং ইমরান মুখ চেপে হাসছে। নয়ন আগুনে ঘি ঢেলে বলে,
– ছিঃ নাফি। তুই এমন ছিলি?
নাফিস হতভম্ব হয়ে বললো,
– সব দোষ তো এখন বাবার। ঠিক আছে মেয়ে নিয়ে আমি দূরে কোথাও চলে যাবো।
রাই খানিকটা ভ্রু কুচকে বলে,

– মেয়ে আমাকে ছাড়া থাকতে পারেনা। সাহস কত। আমার তিন বছরের বাচ্চা টা নিয়ে নাকি চলে যাবে? খারাপ স্বভাব সব আপনার স্বীকার করেন না কেনো?
ইমরান মেয়েকে কোলে তুলে নিলো। নাফি এবং রাইকে বাঁধা দিয়ে বললো,
– কাউকে কোথাও নিয়ে যেতে হবে না ভাবী। এটা কমন যুক্তি যে বাচ্চারা দুষ্টুমি সব বাবার পায়, আর ভালো,ভদ্র,শান্ত বৈশিষ্ট্য সব মায়ের পায়।
নয়ন অট্টহাসি দিয়ে বললো,
– মোনা শান্ত?
মোনা ভ্রু কুঁচকে বললো,
– আপনি আমাকে এভাবে বলতে পারলেন ইমরান সাহেব?
– আমি নির্বাক ছিলাম মোনালিসা। প্রশ্নটা তোমার মামাকে করো। অযৌক্তিক কথা বলে সবসময়।
দিয়া শাহাদের দিকে তাকিয়ে হাসছে। শাহাদ কানের কাছে মুখ নামিয়ে স্ত্রীকে বললো,
– তোমাকে বলেছি না, বেচারা আতঙ্কে থাকে ভাবীসাহেবা কখন কি করে বসে। বেশ প্রতিবাদী শুনেছি, তোমার সাথেও মিল আছে। ইমরানের আশেপাশে কাউকে সহ্য করেনা।
দিয়া মুখে হাত চেপে বললো,

– প্রতিবাদী বলেই তো ইমরান ভাই এতটা আগলে রেখেছেন। কজন পারে ভাবীর মতো এমন দুঃসাহস দেখিয়ে মানুষটাকে ভালোবাসতে। বয়সের গ্যাপটা আমাদের চেয়েও বেশী। আমার তো উনাদের দুজনকে বেশ পছন্দ হয়েছে কমান্ডার সাহেব। কি মিষ্টি কাপল।
– তা তো অবশ্যই। তবে নাফিস কম আতঙ্কে থাকেনা যা বুঝলাম।
দিয়া হেসে বলে,
– আপনি কিন্তু অনেক শান্তিতেই থাকেন।
– শান্তি! হ্যাঁ অনেক! সে আর বলতে! আমার জন তো আমাকে তীরের গোড়ায় বরফ লাগিয়ে বান মা/রে যাতে করে হৃদপিন্ডে লাগার পর পরই আমি জমে যাই। মুখটা এমন অসহায় বানায় আমার আর কিছুই বলার থাকেনা।
– কি ভয়ানক কথা কমান্ডার সাহেব!
নয়ন শাহাদের দিকে তাকিয়ে বললো,
– থাম, এটা হসপিটাল। প্রেম করার কথা ইমরানের। তোরা দুইজন করছিস কেন? বুঝতেছি ভাবী আপনার জীবনটাও কমান্ডারের জালায় অতিষ্ঠ।
দিয়া লজ্জা পেয়ে একটু সরে এলো।
নাফি প্রশ্ন করলো,
– আবোল তাবোল বকিস কেনো? ইমরান কিভাবে প্রেম করবে?
নয়ন দম ফেলে বলে,

– বেচারা অনাহারে ছিলো কিনা…
জিভে কামড় পড়লো সকলের। মোনা তৎক্ষনাৎ মাথা নত করে নিলো। মনোযোগ দিয়ে নিজের মানুষটাকে দেখছিলো আড়চোখে। শান্ত নদীর মত। মেয়েকে কোলে নিয়ে বসে আছে। বাবার কোলে মেয়েকে দেখলেই যেন ভেতরটা প্রাশান্তিতে ছেয়ে যায়। নয়নের বেফাঁস কথা শুনে ইমরান ক্রোধ নিয়ে সকলের সামনে দাঁত খিঁচিয়ে বলে,
– নয়ন, এখানে ভাবীরা আছে। মুখ সামলে কথা বল। ব্যাচেলরস’ ক্লাব পেয়েছিস?
নয়ন পুনরায় বললো,
– ভালো কথা বললেও দোষ।
পুনরায় ইমরান চোখ রাঙাতেই মুখ ভেঙচি দিয়ে বললো,
– আরেকটা জিনিস লক্ষ্য করলাম সবারই তো মেয়ের বাম্পার ফলন হলো। ছেলে শুধু আমাদের ইশান। নাহ! দেশে তো ছেলে কমে যাবে৷ কমান্ডার, নাফিস তোরা কেনো নতুন মেহমান আনছিস না?
নাফিস পালটা প্রশ্ন করলো,

– তুই আনছিস না কেনো?
– দুঃখ রে ভাই। বউটা রাজি হয়না। বলে আরেকটা আসলে ওটা নাকি আমার ডাবল হয়ে আসবে। আর আমি কি ইমরানের মতো এত পটেনশিয়াল যে বুড়া বয়সে বাপ হবো?
নাফিস জবাব দিলো,
– ঠিক তো, আমরা সবাই এভারগ্রীন আর তোর বয়স সত্তর বছর।
বিরক্ত হয়ে ইমরান বসা থেকে দাঁড়িয়ে পড়ে। আর কিছুক্ষন থাকলে নয়নকে আর নিয়ন্ত্রণ করা যাবেনা। ইমরানের তীক্ষ্ণ চোখের দিকে তাকিয়ে নয়ন বললো,
– সত্যি কথাই তো বললাম। ভাবীরা প্লিজ কিছু মনে করবেন না। আমার ভালো লাগে ইমরানের পেছনে লাগতে।
শাহাদ এবং নাফিসের দিকে তাকিয়ে ইমরান বললো,
– বাইরে চল। ভাবী আপনারা গল্প করুন। আমি একটু ডাক্তারের সাথে কথা বলি৷
নাফিস নয়নকে ধমকে যাচ্ছে ধীর গলায়,
– ভাবী যে তোর ভাগ্নী এটা কি ভুলে যাস? তোকে থাপড়ে দেয় নাই ইমরান এই অনেক।
– আগে বন্ধুর বউ। ভাগ্নীকে তো বলছিনা। বন্ধুকে বলছি।
ইমরান বেরিয়ে যাবে মোনা পেছন থেকে বললো,

– ইশান কোথায় ইমরান সাহেব?
– বাড়িতে আছে।
– আমি ছেলেটাকে দুদিন দেখিনি। ও আমাকে দেখতেও এলোনা।
– ছিলো কাল রাত অবধি। আজ বললো, মায়ের জন্য কি সারপ্রাইজ রেডি করছে। ওটা শেষ হলেই আসবে। গল্প করো আসছি আমি।
রাই ঔশানকে কোলে নিলো। মোনা ইমরানের যাওয়ার দিকে চেয়ে মিটমিটিয়ে হাসছে। সহসা ফোনে মেসেজ আসলো,
– হাসছিলে কেনো মোনালিসা?
মোনা, দিয়া এবং রাইয়ের সাথে গল্প করতে করতে মেসেজের উত্তর দিলো,
– ধন্যবাদ ইমরান সাহেব এই শার্ট টা পরার জন্য। অনেক স্মার্ট লাগছে। গ্রে কালার ও কাউকে এত স্যুট করে জানতাম না।
কিছুক্ষণ পর মেসেজের রিপ্লাই আসলো,
– তুমি সুন্দর, তোমার দেখার চোখ সুন্দর।
– মোটেও না আপনি সুন্দর।
– নিজেকে টিনেজ মনে হচ্ছে। প্রেম করছি মেসেজে। তাড়াতাড়ি সুস্থ হও।
– এরপর।
– পুনরায় অস্থির ইমরানকে সামলানোর দায়িত্ব নিবে।
মোনা মিটমিটিয়ে হাসছে। বাকি দুজন বেশ লক্ষ্য করছে। এসব সিচুয়েশন তারাও পার করে।
মিনিট কয়েক পর গানের চরণ দিয়ে মেসেজ আসলে মোনা চমকে গেলো,

– মোর প্রিয়া হবে, এসো রানি,
দেব খোঁপায় তারার ফুল।
কর্ণে দোলাব তৃতীয়া তিথির
চৈতি চাঁদের দুল॥
নিজেও লিখলো,
– আমি লজ্জা পাচ্ছি ইমরান সাহেব।
– আমার গানের সাত সুর দিয়া
তোমার বাসর রচিব প্রিয়া,
তোমারে ঘিরিয়া গাহিবে আমার
কবিতার বুলবুল॥
মোনা ফোনই রেখে দিলো এক পাশে। গালের দুপাশ লালাভ রঙ ধারণ করলো। রাইফা হঠাৎ বললো,
– ভাই ছিলো ফোনে তাই না।
মোনা উপর নিচ মাথা নেড়ে হাসলো। তা দেখে দিয়া আর রাইফাও হেসে দিলো।

মায়া, সালমা এবং রিক্তা ছিলো বিকেল থেকে রাত অবধি। ইমরান মিটিং শেষ করে এসে দেখলো স্ত্রী- কন্যা দুজনই ঘুমে। আগামীকাল বাসায় চলে যেতে পারবে। হসপিটালের বেড গুলো অনেক সংকীর্ণ শুতে বেশ অসুবিধা। কপালে হাত দিয়ে শুয়ে আছে। বিকেল থেকে শরীর আরো খারাপ লাগছে। ঠান্ডা কাল খুব খারাপ ভাবে লেগেছে। ইনহেলার নিয়েছে দু বার। মাঝে মাঝে নিজের বোকামীর জন্য নিজের উপরই ভীষণ রাগ হয়। কি দরকার ছিলো গতকাল এত চিন্তা নিয়ে ভেজার! এখন যদি অসুস্থ হয় এদের মা-মেয়ে দুজনের কে সেবা করবে! বেশ অস্বস্তির নিয়ে উঠে দাঁড়ায়। এর মাঝে গরম লাগছে। উঠে গিয়ে জানালার পাশে দাঁড়াতেই রাতের আকাশ স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। বেশ স্বচ্ছ।

– ইমরান সাহেব?
পেছন ফিরে দেখে মোনা ডাকছে। কাছে এলো,
– উঠলে কখন?
– এইযে এখন। কাছে আসুন।
ইমরান মোনার পাশে বসতেই প্রশ্ন করলো,
– আপনাকে এমন দেখাচ্ছে কেনো?
– শরীর টা ম্যাজ ম্যাজ করেছে সারাদিন। গতকালকের বোকামোর ফল ভোগ করছি।
মোনা কপালে হাত দিয়ে বললো,
– বেশ গরম।
– দুশ্চিন্তা করোনা। ঠিক হয়ে যাবো।
– একটা কথা বলি ইমরান সাহেব?
– দুইটা বলো।
মোনা হেসে বলে,
– আমার সব কিছুতে এত প্রশ্রয় কেনো দেন? আজ ফুফি, চাচী এবং মামী তিনজনই বলছিলো, আপনি আমার সব কিছু মেনে নেন এক কথায়।
নির্লিপ্ত চাহনি ইমরানের। খানিকটা ভেবে বললো,
– তুমি মানুষটাই আমার এক কথায় মেনে নেয়ার মত একজন। তোমার মাঝে দ্বিমুখীতা কখনো দেখিনি। যখন যাকেই ভালোবেসেছো সব উজাড় করে বেসেছো।
– এটাই কি কারণ?
– অনেক কারণ। মোস্ট ইম্পর্ট্যান্ট আমার দুই সন্তানের মা তুমি। এর উপর পৃথিবীর সকল যুক্তি তুচ্ছ।
ইমরানের কপালে ওষ্ঠ ছুঁয়ে দিলো মোনা। ইমরান হেসে বলে,
– ইমরানের কপাল খুলে গিয়েছে।
মোনা হাসছে। ইমরান বাম গালে হাত দিয়ে দেখছে সেই হাসি। ইমরানের নিজেরই মাঝে মাঝে মনে হয় কি পাগলামো করছে এসব! অথচ প্রতি মুহুর্তে মনে পড়ে যায় মিনহাজের সেই কথা,
– আমার মোনা তোকে তার জেনারেশনে নিয়ে আসবে, আর নিজেকে তোর জেনারেশনে।

মোনাকে রিলিজ দেয়া হয়েছে। ওদের গাড়ি এখন ‘সোনালী সকালের’ সামনে কিন্তু ভেতরে ঢুকতে দেয়া হচ্ছে না কারণ ইশানের মস্ত বড় আয়োজন। মোনা বাড়ির নেম প্লেটের দিকে তাকিয়ে বলে উঠলো,
– ইমরান সাহেব নেম প্লেট চেঞ্জ করলেন কখন?
পাশে আইরিন ছিলো। হাসছে সে। ইমরান রবিনের সাথে বসেছে। পেছন ফিরে বললো,
– সারপ্রাইজ।
ইশান এগিয়ে এসে গাড়ির ডোর খুলে মাকে জড়িয়ে ধরলো। মোনা তিনদিন পর ছেলেকে দেখে খুশিতে বলেই ফেললো,
– আমার সাথে একদম কথা বলবেনা তুমি।
– মা স্যরি। আগে তো এদিকে আসো। দেখো নেম প্লেটটা আমি আর সোহান ভাইয়া চেঞ্জ করেছি সুন্দর হয়েছে না?
ইশান বাবার কাছে থেকে বোনকে কোলে নিয়ে নেমপ্লেটের কাছে নিয়ে বললো,
– আমার ডলের নেমপ্লেট পছন্দ হয়েছে?
মোনার চোখে পানি। স্পষ্ট লিখা নেম প্লেটে ‘ Ocean Palace ‘। মোনা চোখ মুছে প্রশ্ন করলো,
– ঔশান প্যালেসই কেনো? ইশান বা ইতু তো আগে এসেছে।
তুশি উত্তর দিলো,
– কারণ ঔশান, ইশান এবং ইতুর আদরের। ওদের সব ঔশানের।
ভেতরে এলাহি আয়োজন। পুরো বাড়ি সাজানো বেলুন ফুলে। ইতু বড় আম্মুকে দেখে কোলে আসতে চাইলো। মোনা নিতে চাইলে তুশি দিলো না। বললো,

– আগে সুস্থ হও ভাবী। ও হাত পা ছুঁড়লে ব্যাথা পাবে।
মোনা চেয়ার টেনে বসে ইতুকে কোলে নিয়ে বললো,
– ইতু আমার বড় মেয়ে। ওর অধিকার বেশি। এমন করবেনা।
ইশতিয়াক হেসে বলে,
– এই বাড়ির বাচ্চাগুলাকে দুষ্টুমিতে প্রশ্রয় দেয়ার জন্য অন্য কেউ লাগবে না। ভাবী আপনি একাই একশো।
মোনা ইশানকে ইশারা দিয়ে কাছে ডাকলো। হেসে বললো,
– সবগুলো আমার তাই আদর, প্রশ্রয় সব আমার। এখন আমাদের একটা ছবি তুলে দেন তো।
ইশানের কোলে ঔশান, মোনার কোলে ইতু। সোহান বলে উঠলো,
– ভালো তো, আমি বাদ।
আইরিন ধমকে বললো,
– তুই কি বাচ্চা?
মোনা হাত দিয়ে ডেকে বললো,
– তোমাকে ডাকতে হলো কেনো? চলে আসো।
সোহান পেছনে দাঁড়িয়ে পড়ে ইশানের সাথে। তুশি ছবি তুলছে। ইমরান একটু পিছিয়ে দাঁড়িয়ে দেখছে। চোখ দুটো ভরে উঠেছে। ইচ্ছে করছে বাবা- মাকে এনে দেখাতে, আমি সুন্দর পরিবার করেছি, তোমরা দেখে যাও আব্বা, আম্মা। শাহাদাত সাহেব সবসময় বলতেন গর্ব করে,

– আর কেউ কি করবে জানিনা, আমার ইমন শতে একজন। সেরাদের সেরা।
সেই সাথে তাল মিলিয়ে মিসেস শাহাদাত বলতেন,
– ইমনের মাঝে সবাইকে আগলে রাখার ক্ষমতা অনেক প্রবল। ছেলেটা আমার পরিবারকে জুড়ে রাখবে।
শেষ সময়ে বাবা- মা দুজনের এই আত্মবিশ্বাসে পানি ঢেলে দিয়েছিলো ইমরান। হারিয়ে ফেললো জীবন থেকে সবচেয়ে কাছের ভরসার হাত গুলো। আইরিন কাঁধে হাত রাখতেই চোখের পানি আড়াল করে বললো,
– কিছু বলবে আপা?
– আব্বা- আম্মার অনেক দোয়া আছে তোর জন্য। নে এই দলিল টা আম্মা যাওয়ার আগে আমাকে বলেছিলেন যদি তোর মেয়ে হয় ভবিষ্যতে তাকে যেনো দিই। ছেলেদের সবাই দেয়। মেয়েরা বঞ্চিত হয়। এত বছর আগলে রেখেছি এখন এটা দেয়ার মানুষ চলে এসেছে।

– রেখে দাও তোমার কাছে।
– কিসের জেদ তোর এখনো।
– জেদ না। আমি এটার যোগ্য না। আম্মা কষ্ট পেয়ে চলে গেছে। যাওয়ার আগে আমাকে মাফ করে যায়নি।
– আম্মা অনেক আগেই তোকে মাফ করে দিয়েছে। যাওয়ার আগে এটাও বলেছে যেন আমি তোর আরেকবার বিয়ে দিই। তখনই এই দলিল দিয়েছে। সেদিন কেঁদে কেঁদে বলেছিলেন, আইরিন আমার ইমনটা অবুঝ। না বুঝে ভুল করেছে। বড় বোন হিসেবে আগলে নিস আমি না থাকলে। আর এই কথা গুলো আগেও তোকে বলেছি। তোর এক জেদ আম্মা তোকে কেনো বলেনি? মনের মাঝে রাগ তো ছিলো আম্মার। নিজের সংসারের সমৃদ্ধি আর সুখ দেখে কি তোর মনে হয় নি আব্বা আম্মার দোয়া আছে তোর উপর?
ইমরান চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। আইরিন পুনরায় বললো,

– নে ধর।
– যার জিনিস সে তো এসেছে তাকে দাও।
– অনুমতি দিচ্ছিস?
– হুম দাও।
আইরিন এগিয়ে গিয়ে ভাস্তির হাতে ছোঁয়ালো দলিল। ইমরান ভাবে এক মায়ের কত রূপ। জগৎ সংসারের সব দিকে তার খেয়াল ছিলো। ভবিষ্যৎ নাতনীর জন্য ও তিনি স্থায়ী ব্যবস্থা করেছেন যাতে সে ভবিষ্যতে বলতে পারে,

প্রিয় মোনালিসা পর্ব ৫৭

– আমার একটি নিজের বাড়ি আছে।
মেয়েদের বাবার বাড়ি হয়, স্বামীর বাড়ি হয়। কিন্তু নিজের বাড়ি হয়না। হলেও সেই বাড়ি হতে জীবন পার হয়ে যায়। জীবন পেন্ডুলাম এর মাঝেই আটকে যায়। ঔশান খুব ভাগ্য করে পৃথিবীতে এসেছে। দাদী না থেকেও তার ভালোবাসা পেয়েছে।

প্রিয় মোনালিসা পর্ব ৫৯