Home হাওয়াই মিঠাই হাওয়াই মিঠাই পর্ব ১৫

হাওয়াই মিঠাই পর্ব ১৫

হাওয়াই মিঠাই পর্ব ১৫
তামান্না ইসলাম শিমলা

নতুন সকালের সূচনা, চারদিকে আলোর ঝলকানি, পাখিদের কলরব! রাত জাগা পাখির মতোই কেটেছে তনয়ার এ রাত, জানালার পাশে বসে আছে সে।
সবাই সকালের নাস্তা করে যার যার কাজে ব্যস্ত, তবে ঘর থেকে বেরও হয়নি তনয়া। কিছু একটার শব্দ হতেই চোখ মেলে তাকায় সে, তানহা খাবার নিয়ে রুমে এসেছে।
“এই নে, আম্মু পাঠাই দিল। জলদি খা, আমি স্কুলে গেলাম!”
খাবারটা টেবিলে রেখে ব্যাগটা নিয়ে দৌড় লাগাল তনয়া, কিচ্ছু ভালো লাগছে না তার। বিছানা থেকে নেমে টেবিলের কাছে আসল, রুটি আর আলু ভাজি। খাওয়ার ইচ্ছে না থাকা সত্ত্বেও খেতে হবে তাকে, দ্রুত খাবার শেষ করে ওষুধ খেয়ে নিল। আবারও বসে পরল বিছানায়!
এমন সময় দ্রুত পায়ে প্রবশ করল এক ব্যক্তি, তনয়া তাকাল দরজার দিকে। রাফা এসেছে, রাফা দৌড়ে এসে তনয়াকে জড়িয়ে ধরল। খুশিতে গদগদ হয়ে বলল,

“হাইরে তনু, শেষ মেষ তুই আমার জা হবি কি মজা বল।”
তনয়া রাফাকে নিজের থেকে ছাড়িয়ে নেয়, সৌজন্য মূলক হাসে তবে মুখে কিছু বলে না। বয়সে তিন বছরের বড় হবে রাফা তার থেকে, ছোট বেলায় দুজনের ভালোই ভাব ছিল, তবে বাবাদের ঝামেলার রেশ ধরে তাদেরও কথা বলা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল!
“কেমন আছো?”
রাফা বিছানায় উঠে বসল,
“খুব ভালো, তুই?”
তনয়া শুধু হাসল, রাফা তনয়ার হাত ধরে বলে,
“আমি সত্যি অনেক খুশি তনু, আমরা দুজন একসাথে থাকব।”
তনয়ার এসব কথা ভালো লাগছে না, কথা কাটাতে বলল,
“তুমি হঠাৎ এখানে?”
রাফা ভেংচি কেটে বলে,
“কেনরে? আসতে পারি না?”
“আরে না না, সেটা বলেছি নাকি। আসলে..
তনয়াকে পুরোটা বলতে দেয় না রাফা, নিজেই বলে উঠে

“ আরে বুঝেছি বুঝেেছি, আসলে আব্বু আর ভাইয়া এসেছে। আজকে তো ফুপিরা চলে যাবে, তাই বিয়ের ডেট ফিক্স করবে। আমার তো মনে হচ্ছে সামনে শনিবারেই ডেট ফেলবে দেখিস!”
তনয়ার গলা ধরে আসছে, কেন সে কষ্ট পাচ্ছে? বুকে ব্যথা করছে তার, অজানা ব্যথা। অন্যমনসস্ক তনয়াকে ঝাঁকায় রাফা,
“কিরে কি ভাবিস?”
তনয়া মাথা নাড়ে, যার মানে কিছু না। নিজেকে স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করে বলে,
“তুমি দেখছি বিয়ে নিয়ে খুব এক্সাইটেড! “
রাফা খিলখিলিয়ে হেসে উঠে,
“হব না আবার? প্রেমিকের সাথে বিয়ে হলে কে না খুশি হবে বল?”
তনয়া ভ্রু কুঁচকাল, প্রেমিক মানে? তনয়ার চেহারা দেখে রাফা আবারও হাসল, বলতে লাগল,

“ প্রত্যয়ের সাথে তো আমার প্রেম চলছে আজ চার বছর, আমি তো জানতামও না তখন আমাদের বিয়ে ঠিক হয়ে আছে। আর প্রত্যয়ও জানত না, মাঝখানে আমার বাপের জন্য কত ঝামেলা হলো জানবই বা কি করে। কিন্তু ভালোবাসা তো আর বলে কয়ে আসে না!”
শেষ কথাটা কানে বিঁধল তনয়ার, নিজেও আওড়াল,
“ভালোবাসাতো আর বলে কয়ে আসে না!”
তনয়াকে বিড়বিড়াতে দেখে রাফা কপাল কুঁচকাল, এউ মেয়ে একটু পর পর কোথায় হাঁড়িয়ে যায় কে জানে!!
রাফা তনয়ার হাতে টান দিয়ে বলে,
“কি ভাবছিস? তুই এক্সাইটেড না?”
তনয়ার ধ্যান ভাঙে, তবে রাফার কথা তার কানে যায় নি। প্রতিত্তুরে বলে,
“কিছু বললে?”
রাফা তনয়ার মাথায় গাট্টা মেরে বলে,
“তোর মাথা! বলেছি যে তুই এক্সাইটেড না? শিহাব ভাই ও তো সুন্দর, দুটো ভাই একদম এক রকম!”
তনয়া বিছানা থেকে উঠে দাঁড়াল, ভালো লাগছে না এসব কথাবার্তা তার। মস্তিষ্ক জুরে হাজারটা ভাবনা, বুকের ভেতর তীব্র বর্ষন তা তো সে ছাড়া আর কেউ অনুভব করতে পারছে না। নিজের কাঁধে কারো স্পর্শ অনুভব করতেই পেছন ফিরে তাকায়, রাফা গম্ভীর কন্ঠে জিজ্ঞেস করে,

“কি হয়েছে তনু? তুই কি এই বিয়েতে রাজি না?”
তনয়া চোখ ফিরিয়ে নেয়, সে তো রাজি তবে তার মন? তার মন তো বেইমানি করছে, এটা কি করে বোঝাবে।
“কি হলো?”
তনয়া টেবিলে থাকা বই গুলো গোছাতে গোছাতে বলে,
“তেমন কিছু না, আমি রাজি। আসলে হুট করে সব হয়ে যাচ্ছে তো তাই আরকি!”
রাফা নিজেও গাল ফুলিয়ে বলে,
“ঠিক বলেছিস, হুট করে কি বিয়ে হয়? কত শখ ছিল আমার বিয়েতে অনেক বড় করে অনুষ্ঠান করব। নাচ গান হইচই, তা না শুনলাম বিয়ে নাকি ঘরোয়া ভাবে হবে।”
তনয়া চমকায়, ভ্রু কুঁচকে বলে,
“ঘরোয়া ভাবে বলতে?”
রাফা আগের ন্যায় বলে,

“হ্যাঁরে, খালি পরিবারের কয়েকজন লোক মিলে বিয়ে পরাবে। অনুষ্ঠান নাকি দুবছর পর বড় করে করবে, ভালো লাগে না!”
তনয়া আবারো চলে যায় ভাবনার জগতে, কিছু একটা ভেবে চোখ বন্ধ করে নিল। বিয়েটা ঘরোয়া ভাবেই হলেই ভালো হবে, নাহলে যে তেহরাব জেনে যাবে। তেহরাব যদি জানতে পারে তার তনয়ার বিয়ে হয়ে যাচ্ছে কি হবে তখন? ছেলেটা কি করে ঠিক থাকবে, হঠাৎ তনয়ার মনে পরে গেল তেহরাবের বলা সেই কথাটা,
“আমি বাঁচতে চাই তনয়া, তোর সাথে বাঁচতে চাই!”
হৃদস্পন্দন বেড়ে যাচ্ছে তনয়ার, বুকের ব্যথাটাও তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে। হঠাৎ মনে হলো তার বিয়ে হয়ে গেলে তো তেহরাব বাঁচবে না, ছেলেটা সত্যি বাঁচবে না। তনয়া ধপ করে বসে পরল চেয়ারে, দুহাতে চেপে ধরল নিজের কান, বার বার ভেসে আসছে তেহরাবের বলা কথা গুলো।

“তোর শরীরে আমার আমি ব্যতিত কারো নামের বেনারসি উঠবে না এলোকেশী! যদি উঠে তবে সেদিন আমার শরীরে উঠবে কাফনের কাপর!”
তনয়া চিৎকার করে উঠল,
“নাহহহ”
তনয়ার অচানক এমন আচরণে হকচকিয়ে উঠল রাফা, দ্রুত তনয়ার পাশে গিয়ে দাঁড়ায়। তনয়া গালে হাত রেখে নিজের দিকে ঘোরায়, তনয়া কাঁদছে, ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদছে মেয়েটা। চোখ বেযে অনর্গল পানি পরছে, রাফা আশ্চর্য হযে তাকিয়ে আছে সেই পানে। সে যা ভাবছে তাহলে কি তাই?
রাফা তনয়ার চোখ মুছে তাকে জড়িয়ে ধরে,
“শান্ত হো বোন, কি হয়েছে সোনা বল আমায়। কাঁদছিস কেন? কি হয়েছে বল?”
এতটা সময় ফুপিয়ে ফুপিয়ে কান্নার বেগ রাফার নরম কন্ঠে আরো বেড়ে গেল, সাথে কান্নার শব্দ। হাও মা-ও করে কেঁদে উঠল তনয়া, তনয়াকে এভাবে কাঁদতে দেখে রাফা কিছু একটা আন্দাজ করল। দ্রুত তনয়াকে ছেড়ে দরজা আটকে দিল, ফিরে আসল তনয়ার কাছে। হাঁটু গেঁড়ে তনয়ার সামনে বসল,তনয়ার দুগালে হাত রেখে আশ্বাসের স্বরে বলল,

“তনু কাঁদে না বোন আমার, শান্ত হো। কান্না থামা, কি হয়েছে বল আমাকে, আপু আছে তো বল কি হয়েছে।!”
নাহ তনয়া কিচ্ছুটি বলে না, উল্টো মুখে হাত দিয়ে কাঁদতে শুরু করে।. রাফা তনয়ার হাত সড়িয়ে নরম শান্ত কন্ঠে প্রশ্ন করে,
“কাউকে ভালোবাসিস? এই বিয়ে করতে চাস না তুই?”
তনয়াকে এবারও কিছু বলতে না দেখে কিঞ্চিৎ রাগ হলো রাফার, উঠে দাঁড়াল।
“ঠিক আছে বলতে হবে না, কাঁদ তুই। এভাবেই কাঁদতে হবে।!”
তনয়া অশ্রুসিক্ত দৃষ্টি নিক্ষেপ করে রাফার দিকে, কান্নামিশ্রিত কন্ঠে বলে,
“আপু লোকটা বাঁচবে না, আমার বিয়ে হয়ে গেলে লোকটা বাঁচবে না, সত্যি মরে যাবে। লোকটা পাগল, আমি কি করব আপু?”
রাফারও কান্না পাচ্ছে তনয়াকে এভাবে কাঁদতে দেখে, রাফা আবারো তনয়াকে জড়িয়ে ধরল। পিঠে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলল,
“শান্ত হো, সবটা বল আমায়। কে সে? ভালোবাসিস তাকে?”
তনয়া শান্ত হয় না, উল্টো সেভাবেই বলে,

“আমি বারবার তাকে প্রত্যাখ্যান করে গেছি, সবসময় ইগনোর করে গেছি তবুও মানুষটা আমার জন্য পাগলামি করেছে৷ ইভেন এখনো করছে, আমি না চাইতেও তার প্রতি দুর্বল হয়ে পরেছি। কিন্তু আমি তাকে চাই না আপু, আমি তাকে চাই না। কিন্তু সে তো বুঝতে মই চায় না আমার কথা, আমার বিয়ে হয়ে গেলে ছেলেটা সত্যি মরে যাবে।”
তনয়ার প্রতিটি কথা শুনল রাফা, কি বলবে বুঝতে পারছে না সে। তনয়াকে বিছানায় বসিয়ে দিল, আবার চোখ মুখ মুছে দিয়ে বলল,
“তুই ভালোবাসিস তাকে? তাহলে চাস না কেন? আমি চাচি আর চাচ্চুর সাথে কথা বলব, চাচ্চু তোর ইচ্ছার বিরুদ্ধে কিচ্ছু করবে না এটা তুইও জানিস। বলছিস না কেন বাসায় কাউকে?”
তনয়া হেঁচকি তুলতে তুলতে বলে,
“হ্যাঁ ভালোবাসি, কিন্তু আমি তাকে আমার জীবনে জুড়তে চাই না। বিষয়টা আব্বু আম্মু বা আমার নয়, আসল কথা আমি তাকে আমার জীবনে জড়াতে চাই না, কিন্তু বারবার বলার পরেও লোকটা বুঝতে পারছে না, বোঝার চেষ্টাও করছে না। আমি কি করব আপু? “
তনয়ার কথা রাফার মাথার উপর দিয়ে যাচ্ছে, এ মেয়ে কি বলছে এসব? ভালোবাসে কিন্তু নিজের জীবনে জড়াতে চাই না, এটা কেমন কথা?

“তুই কি বলছিস তুই বুঝে বলছিস তো? মানে তুই ভালোও বাসিস আবার তাকে চাস না, মানে কিচ্ছু বুঝতে পারছি না!”
তনয়া নিজেই নিজের চোখ মুছে নিল,
“ আমি শুধু চাই সে ভালো থাকুক, আমাকে ছাড়াই ভালো থাকুক। আমাকে ভুলে যাক, আর কিচ্ছু জানি না আমি!”
রাফা হতভম্বের ন্যায় কিছু সময় তাকিয়ে থাকে তনয়ার মুখের দিকে,
“ছেলেটা কে?”
এতক্ষণে তনয়ার কান্নার বেগ কমে গেছে, শুধু হেঁচকি তুলছে। রাফার প্রশ্ন শুনে তার দিকে তাকাল তনয়া, বলবে কি বলবে না এটাই ভাবছে!
কিছু সময় চুপ থেকে অতঃপর বলে,
“আমি নাম বলতে পারব না আপু, শুধু আমাকে একটা হেল্প কর!”
“কি হেল্প?”
তনয়া স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করে বলে,

“বিয়েটার বিষয়ে যেন কেউ না জানে, অর্থাৎ আমার আর শিহাব ভাইয়ের বিয়ের বিষয়ে। তুমি একটু ম্যানেজ করে দেবে প্লিজ? আমার বিয়ের কথা শুনলে লোকটা নির্ঘাত কিছু করে বসবে!”
রাফা তনয়ার কাঁধে হাত রাখে, দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে,
“আমি জানি না কি এমন হয়েছে, তবে আমি দেখছি কি করা যায়। কান্নাকাটি করিস না, যাকে জীবনে জুড়তে চাস না তাকে মনে জুড়ে লাভ কি?”
তনয়া মাথা নিচু করে বসে রইল, এইদর জবাব তার কাছে নেই। রাফা বেরিয়ে গেল রুম থেকে, তনয়া চোখ বন্ধ করে বসে রইল ঠাঁই!

“কিরে চুন্নি আজকের খবর কি?”
তানহার কথায় তার প্রিয় বান্ধবী রিমু লেখা বাদ দিয়ে তার দিকে ঘুরে বসল।নিজের নাক মুছতে মুছতে বলল,
“আর খবর, আজকে তেহরাব ভাইয়া বের হয়নি বাড়ি থেকে। সকালে বাড়ি গিয়েছিলাম, বড় আম্মু বলল আজকে ইরা আপুকে দেখতে আসবে। আর ভাইয়ার নাকি জ্বর এসেছে আজকেই, কি একটা অবস্থা। ওদিকে কালকে বড় বাবাও স্ট্রোক করেছিল!”
এক নাগারে কথা গুলো বলে থামল রিমু, মেয়েটা তেহরাবের চাচাতো বোন। তানহা কিছুটা চিন্তিত হলো তেহরাবের কথা শুনে,
“জ্বর এসেছে? ইশ, ওষুধ খেয়েছে?”
তানহার কথা শুনে রিমু হেসো উঠে,
“আহারে কত দরদ, এতই যখন দরদ তাহলে তুই গিয়েই বরং ওষুধ খাইয়ে দিয়ে আয়!”
তানহা মুখ ভেঙিয়ে বলে,
“সে সুযোগ থাকলে এখানে বসে থাকতাম বুঝি? ওষুধের সাথে সাথে আরো কত কি খাইয়ে দিয়ে আসতাম!”
রিমু তানহার বাহুতে ধাক্কা দিয়ে বলে,

“মানুষ হয়লি না শালি!”
তানহা ভাব নিয়ে বলে,
“ওই শালি বলিস কাকে হুহ? ভাবি বল ভাবি! তেহরাব ভাইয়ের বউ আমি হুহ!”
বলেই দুজনে হেসে উঠে এক সাথে, হাসি থামিয়ে রিমু বলে,
“আজ প্রাইভেটে আসলি না কেন?”
তানহা হাসি হাসি মুখ করে বলে,
“ আরে আজকে আপুর বিয়ের পাকা কথা, কি জানি আম্মুর হঠাৎ কি হলো। আমাকে বলল আজ প্রাইভেটে যেতে হবে না, আমার তো ঈদ লেগে গিয়েছে!!”
রিমু নিজেও হাসি হাসি মুখ করে বলে,

হাওয়াই মিঠাই পর্ব ১৪

“তাহলে তো ভালোই হলো, আপুর বিয়ে কবে? দাওয়াত দিবি তো?”
তানহা খাতায় অংক তুলতে তুলতে বলে,
“ডেট আজ ঠিক করবে শুনলাম, আর কাউকে না দিলেও তোকে তো দেবই। যতই হোক আমার ননদীনি বলে কথা।”

হাওয়াই মিঠাই পর্ব ১৬