Home হাওয়াই মিঠাই হাওয়াই মিঠাই পর্ব ৪৩

হাওয়াই মিঠাই পর্ব ৪৩

হাওয়াই মিঠাই পর্ব ৪৩
তামান্না ইসলাম শিমলা

আল আকসা মাদ্রাসা ও এতিম খানার সামনে এসে বাইক থামলো তেহরাবের, তনয়া কিছুটা৷ বিস্মিত নয়নে দেখতে লাগল চারদিক, গ্রামের মাঝ বরাবর অবস্থিত এই ছোট্ট মাদ্রাসা। তনয়া বাইক থেকে নামল, তেহরাবো নামল। তনয়ার হাত ধরে টিনের গেইট পার হয়ে ভেতরে প্রবেশ করল তেহরাব, সাথে সাথে তিনজন বাচ্চা ছেলে মেয়ে দৌড়ে আসলো তেহরাবের কাছে।
তাদের মাঝে একজনের বয়স বারো, নাম সালমান। এইটুকু বয়সেই কোরআন মুখস্ত করে ফেলেছে সে, আরেকজন রাকিব, বয়স নয়। এরও শেষের দিকে। আরেক জনের বয়স সাত, নাম আলী। এই তিনজন বাচ্চার ভরণপোষণের দায়িত্ব নিয়েছিল তেহরাব, আজ থেকে নয়, গত চার বছর ধরে চালিয়ে আসছে, বাচ্চা গুলো এতিম। কারো মা বাবা থেকেও নেই, কেউ বা জানেই না বাবা মার পরিচয়।
তেহরাব তনয়ার দিকে তাকাল, পরিচয় করিয়ে দিল সকলের সাথে। সাথে তেহরাবের বন্ধু লিমনের সাথেও, মাদ্রাসার শিক্ষক সে। মাদ্রাসাটাও তার বাবারই দেওয়া।
“আচ্ছা বাচ্চারা যাও পড়তে যাও, আর ভাবি আসুন বাড়িতে যাই।”
লিমনদের বাসা মাদ্রাসার সাথেই, পাশাপাশি। লিমন বেরিয়ে তাদের নিজেদের বাড়িতে নিয়ে আসলো, বসতে দিল দুজনকে।

“লুপা বলছিল তুই নাকি আসবি, সাথে যে ভাবিকে নিয়ে আসবি তা তো বলিসনি।”
লিমনের কথায় পাত্তা না দিয়ে তেহরাব সোফায় গিয়ে পা তুলে বসে পরে,
“তোকে বলতে যাব কেন? আমার বউ আসি যেখানে খুশি নিয়ে আসবো। “
লিমন নিজ মনে মাথা নাড়ে, এই ছেলেটা বড্ড ত্যাড়া।
দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে,
“আচ্ছা বসুন আপনারা, আমি আসছি।”
লিমন যেতে নিলে তেহরাব আটকায়,
“আমি কিছু খাব না, তনয়া তুই খাবি? জানি খাবি না, তোর কষ্ট করে কিছু আনতে হবে না। খালা কই? আর লুপা?”
তেহরাবের বলতে না বলতেই একটি চার পাঁচ বছর বয়সী বাচ্চা দৌড়ে রুমে আসে, ছোট্ট শরীরে বোরখা আর কালো হিজাব। মাশাআল্লাহ কি সুন্দর লাগছে, পিচ্চিটি কিছুসময় দাঁড়ালো, অতঃপর তেহরাবকে দেখে দৌড়ে ছুটে এসে জড়িয়ে ধরে তেহরাবকে।
তনয়া কিছুই বুঝতে পারছে না, সে শুধু হা করে তাকিয়ে দেখছে সবটা।

“তুমি এত পরে আসলে? আরেট্টু পরে আসলেই তো আমি চলে যেতাম।”
লুপার কথা শুনে অজান্তেই হাসে তনয়া, কি মিষ্টি বাচ্চাটা। তেহরাব লুপার গালে চুমু খেয়ে বলে,
“রেডি হয়ে কোথায় যাওয়া হচ্ছে আমার সোনাপাখিটার?”
লুপা চোখ মুখ কুঁচকাল, কিছু একটা ভেবে বলল,
“আমি সো নিন্নির কাছে যাব, নানাভাই আসবে নিতে।”
তেহরাব মুচকি হাসে, লিমন ঘড়িতে সময় দেখে বলে,
“তেহরাব আমি যাইরে, ক্লাস করাতে হবে। আম্মা পাশের ঘরেই আছে, যাওয়ার সময় দেখা করে যাস।”
তেহরাব কিছু বলে না, লিমন নিজেও জানে তেহরাব কিছু বলবে না। তাই নিজেই চলে গেল।
লিমন যেতেই তনয়া তেহরাবের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করল,

“বাচ্চাটা কে?”
“বাচ্চা কাকে বলছো হুহ? আমি অনেক বড়, এই দেখো।”
দ্রুত জবাব লুপার, বলেই সোফার উপর দাঁড়িয়ে নিজের সাথে তনয়ার উচ্চতার তফাত নির্ণয় করতে লাগল সে৷ তনয় হাসল, লুপাকে নিজের কোলে নিয়ে বলল,
“নাম কি তোমার?”
লুপা গাল ভরে হেসে বলল,
“আমি লুপা, আর চাচ্চু সোনার সোনাপাখি। তুমি কে? তোমার নাম কি?”
তনয়া কি বলবে বুঝতে পারছে না, তেহরাব নিজেই বলল,
“এটা হলো তোমার চাচ্চু সোনার বউ, তোমার মামনী। “
লুপা দ্রুত তনয়ার গালে চুমু খেল,
“কি মজা, আমারো মামনী চলে এসেছে।”
তনয়া হাসে, সাথে তেহরাব। এমন সময় ডাক পরে লুপার, তার নানাভাই এসেছে।
“তোমরা থাকো আমি আসছি।”
কাউকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে ছুটলো লুপা, তেহরাব হাসছে। সে হাসি স্নিগ্ধকর, খেয়াল করল তনয়া। নিজের হাসিটা গায়েব হয়ে গেল, তবুও হাসার চেষ্টা করে জিজ্ঞেস করে বসে,

“আপনার বাচ্চা অনেক পছন্দ তাই না?”
তেহরাব দরজার তিকে তাকিয়ে ছোট্ট করে জবাব দেয়,
“হুম।”
তনয়া তেহরাবের চোখের দিকে কিছু সময় তাকিয়ে রইল, কিছু বলল না। অতঃপর জোরপূর্বক হেসে চোখ নামিয়ে নিয়ে বলল,
“আমাকে বিয়ে না করলেও পারতেন।”
তেহরাবের কর্ণে এই বাক্য প্রবেশ করা মাত্রই তেহরাবের চোখ মুখ শক্ত হয়ে গেল, তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকাল তনয়ার দিকে। তনয়া মাথা নত করেই বসে আছে, নিজের জন্য, তেহরাবের জন্য তাদের জীবনের জন্য তার আফসোস হচ্ছে।
“জানিস লুপার মা নেই,জন্মের সময়ই মারা গিয়েছে। হাসপাতালে আমিও ছিলাম, বাচ্চাটাকে আমিই প্রথম কোলে নিয়েছিলাম, কারন লিমন ততক্ষণে নিজের মাঝে ছিল না। বড্ড ভালোবাসত মরিয়মকে, কিন্তু ভাগ্য তাদের আলাদা করে দিল। লুপাকে আমার নিজের সন্তানই মনে হয়, কি সুন্দর নিষ্পাপ বাচ্চাটা। লিমন তেমন একটা কথা বলে না লুপার সাথে, ওর দাদিই ওকে বড় করছে। মাঝে মাঝে ওর নানা এসে নিয়ে যায়, এভাবেই কাটছে ওর জীবন। দেখ ওর আসলে কেউ নেই, কেমন অদ্ভুত না?”
তনয়া থ মেরে বসে আছে, কি বলবে বুঝতে পারছে না। তেহরাব স্মিত হেসে তনয়ার দিকে তাকাল, তনয়া অসহায় নয়নে তাকিয়ে আছে।

“জীবনে কিছু অপূর্ণতা সুন্দর, বুঝলি?”
তনয়া জবাব দেয় না, তেহরাব উঠে দাঁড়ায়।
“চল এবার বাড়ি যাওয়া যাক।”
তেহরাব বের হতে নিলে তনয়া পেছন থেকে হাত ধরে আটকায়, তেহরাব পিছু ফিরে তাকায়। তনয়া ছলছল নয়নে তাকিয়ে বলে,
“লুপাকে নিয়ে যাওয়া যায় না আমাদের সাথে?”
তেহরাব আবারো হাসে, তনয়ার মাথায় হাত রেখে বলে,
“দূর থেকেই কিছু সম্পর্ক সুন্দর থাকে, থাকুক না ও ওর আপন মানুষদের ভীরে। আমরা পর হয়েই বরং মাঝে মাঝে উদয় হবো, কি বলিস?”
তনয়া চোখের পাতা নেড়ে সম্মতি জানায়, তেহরাব হাসে। তনয়া হলেই তার চলবে!

কেটে গেছে আরো কয়েকটি মাস, ইদানীং তনয়ার মাথা ব্যথার রোগটা বেড়েছে। বড্ড যন্ত্রণা হয়, তবে কাউকে কিছু বলে না। তেহরাবকেও না।
নিজের ঘর গুছিয়ে ওয়াশরুমে ঢুকলো তনয়া, সকালে এক বালতি কাগড় ভিজিয়েছে। এখর এগুলো নিজেকেই ধুতে হবে,কি আর করার। মাথা ব্যথা নিয়েই লেগে পরলো কাজে, বাড়িতে আজ কেউ নেই। তাসলিমা ইউসুফ গিয়েছে ইরাদের বাড়ি,রাতের দাওয়াত পরেছে তাদের। তনয়াকেও বেশ জোর করেছিল তবে তনয়া যায়নি, কারন তেহরাব আজ ঢাকা থেকে ফিরবে, গতকাল কাজে গিয়েছিল সে।
কাপড় ধুয়ে তা নিয়ে ছাদে চলে আসলো৷ কাপড়চোপড় মেলে দিতে দিতে হঠাৎ নজর পরল পাশের বাসার ছাঁদের দিকে। এটা রিমুদের বাসা, ছাদে বসে আছে এক মধ্যবয়সী পুরুষ। যে কিনা একাধারে সিগারেট টানছে আর অদ্ভুত ভাবে তনয়াে দিকে তাকিয়ে হাসছে। তনয়ার অস্বস্তি লাগছে, লোকটাকে তো সে এর আগে কখনো দেখেনি। লোকটা উঠে এসে ছাদের রেলিং এ ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে শিশ বাজালো, তনয়াকে পা থেকে মাথা পর্যন্ত পর্যবেক্ষন করে বলল,
“তুমিই তবে এ বাড়ির নতুন বউ?”

লোকটান কন্ঠ শুনলেও কেমন গা ঘিনঘিন করে উঠছে তনয়ার, এক হাতে নিজের ওড়না খামচে ধরে মাথা নাড়ল। লোকটা কেমন বিশ্রি নজরে তাকাচ্ছে,
“বাসায় বুঝি কেউ নেই? তোমাকে দিয়ে সব কাজ করাচ্ছে? তুমি বললে আমি আসি? একটু সাহায্য করে দেই?”
তনয়া দ্রুত অন্য দিকর ঘুরে দাঁড়ায়, তার এসব ভালো লাগছে না। উল্টো পাশ হয়েই কাপড় মেলতে লাগলো, আবারো ভেসে আসলো কন্ঠস্বর,
“ তেহরাব তো দেখি হেব্বি লাকি, বউ পেয়েছে কড়া। একদম……উম একদম পারফেক্ট। “
তনয়ার কেমন গা গুলাচ্ছে, শরীরের পশম দাঁড়িয়ে উঠেছে। লোকটা এভাবে নোংরা কথা বলছে? ছিহ।
কোনো রকম কাপড় মেলে দিয়ে নিচে চলে আসলো তনয়া, এসব লোকজন তার মোটেও পছন্দ না। আর না এমন দৃষ্টি!
ঘাম মুছতে মুছতে নিচে আসছিল এমন সময় কলিং বেল বেজে উঠল, অজানা কারনেই তনয়ার বুকের ভেতর ধক করে উঠলো। রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে পরল সে, কে আসলো? তনয়া নিচে নামলো না, উল্টো এক পা এক পা করে উপরে পেছাতে লাগলো। তার ভয় হচ্ছে, আবারো বেল বাজলো। তনয়া এবার দৌড়ে নিজের রুমে এসে দরজা বন্ধ করে নিল, হাত পা রীতিমতো কাঁপছে তার। আপনাআপনিই বিড়বিড়াচ্ছে,
“খুলব না, দ দরজা খুলব না আমি।”

তনয়া বিছানা হাতরাতে লাগলো, খুঁজতে লাগলো নিজের ফোনটা। কিন্তু কই গেল? পাচ্ছে না সে, আরো ঘাবড়ে গেল তনয়া। এবার বোধহয় কান্না করেই দেবে, বারবার হাত দিয়ে মুখ মুছছে, ঠোঁট জোড়া কাঁপছে তিরতির করে।
এমন সময় কানে খট করে কিছু খোলার শব্দ পেয়ে সেভাবেই জমে যায় তনয়া, পেছনে তাকানোর সাহসটাও পেল না। ঠাস করে পরে গেল মেঝেতে,শেষে তেহরাবের কন্ঠস্বর ও চিৎকারটাও শুনতে পেল না তনয়া।
তেহরাব দৌড়ে এসে তনয়াকে ধরে, তনয়ার দাঁতে দাঁত লেগে গেছে। তেহরাব বুঝতে পারছে না এমন হওয়ার কারন কি, সদর দরজাও চাবি দিয়ে খুলে এসেছে, আর নিজের রুমেও তাই। তবে এমন কিছু হবে বা হতে পারে মোটেও আশা করেনি তেহরাব।
তেহরাব তনয়াকে কোলে নিয়ে বিছানায় শুইয়ে দিল, চোখে মুখে পানির ছিটা দিল। দাঁতটাও ছুটিয়ে দিল, তবে তনয়া কাঁপছে, সাথে কি যেন বিড়বিড় করছে। তেহরাব দ্রুত তনয়াকে জড়িয়ে নিল নিজের সাথে, শুরতে পেল তনয়ার আওয়াজ,

“না দয়া করুন, আমাকে না। মরে যাব, না না আমাকে না, কাছে আসবেন না।”
তেহরাব আশ্চর্য হয়ে গিয়েছে, এমনটা তো আগে কখনো হয়নি। তবে হঠাৎ কি হলো তনয়ার?
“পাখি, সোনা, জান তাকা একটু, দেখ এটা আমি। তোর তেহরাব, কি হয়েছে বল? ভয় পেয়েছিস কিছু দেখে? কেউ এসেছিল? তনয়া তাকা, এই তনয়া।”
তেহরাব অস্থির হয়ে উঠছে, সে নিজেই বা কি করবে বুঝতে পারছে না। মাথায় কাজ কেছে না, তনয়া এখনো বিড়বিড় করেই চলেছে।
“তেহরাব, কই আপনি। মেরে ফেলবে আমাকে, আসুন। না না আমি মরে যাব, ছুবেন না,মরে যাব।”
এসবই বিড়বিড় করছে তনয়া, আর তেহরাব? সে নিজেও রাগে ফেটে পড়ছে,
“,কোন কু*ত্তার বাচ্চা এসেছিল বাড়িতে, কাউকেই ছাড়ব না। কে কি বলেছে একবার জেনে নেই, তাদের কলিজা কু*ত্তা দিয়েই খাওয়াব।”
তেহরাব তনয়াকে কোলে তুলে নিল, এই মুহূর্তে তনয়াকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে তাকে।

হাসপাতালেের কেবিনে বসে আছে তেহরাব, তনয়ারমকে ঘুমের মেডিসিন দেওয়া হয়েছে। ডাক্তার বলেছে কোনো কিছু নিয়ে ভয় পেয়ে এমন হয়েছে, তেহরাব আর কিছু বলেনি। তবে মনে মনে তার ঝড় চলছে, এই তান্ডবে যখন তখন সব তছনছ করে তুলতে পারে।
“ শুধু জ্ঞানটা ফিরুক, কি হয়েছিল আমাকে বলিস বাকিটা আমি দেখে নিব। আমার তনয়াকে ভয় দেখানো, একটম মে*রে ফেলব।”
তনয়ার হাত ধরে তাতে মাথা ঠেকিয়ে বসে আছে তেহরাব, তারও অস্থির লাগছে। কেন বারবার তনয়ার সাথেই এমন হয়? আজ যদি সে সময় মতো বাড়িতে না আসতো তবে কি হতো? জানা নেই তেহরাবের।
“উঠনা জান, একবার বল কি হয়েছিল। দরকার পরলে এই বাড়ি এই গ্রাম এই শহর ছাড়ব তবুও তোর কোনো ক্ষতি আমি হতে দিব না জান, এবার তাকা।”
তনয়া চোখ টিপটিপ করছে, তেহরাব সোজা হয়ে বসে, অস্থির কন্ঠে ডেকে উঠে,

“জান…. কি হয়েছে তোর? কেন ভয় পেয়েছিলি? কি হয়েছিল?”
তনয়া শুধু এক পলক তেহরাবের দিকে তাকায়, দুর্বল হাতে তেহরাবের হাতটা শক্ত করে ধরে বলে,
“আমাকে একা রেখে কোনোদিন কোথাও যাবেন না দয়া করে, আমি একা থাকতে পারি না। ভয় করে আমার, খুব ভয় করে। “
তেহরাবও তনয়ার হাত নিজের দুহাতে শক্ত করে ধরে অধর ছোঁয়ায়, মাথা নেড়ে বলে,

হাওয়াই মিঠাই পর্ব ৪২

“উহু আর একা রেখে যাব না, এইযে প্রমিস। দরকার পরলে তোকে নিয়ে যাব, আর নাহয় তোর বাড়িতে দিয়ে তারপর যাব।”
তনয়া কিছু না বলে চোখ বন্ধ করে নেয়, আলতো করে জড়িয়ে ধরে তেহরাবকে। মনে মনে বিড়বিড়ায়,
“তনয়া সত্যি আপনাকে ছাড়া অচল, এত ভীতু কেন আপনার তনয়া?”

হাওয়াই মিঠাই পর্ব ৪৪