হৃদয়ের সঙ্গোপনে পর্ব ৪৬
তোয়া নিধী দোয়েল
হাতে খাবারের ট্রে নিয়ে রুমে ঢুকে তুর্কি। আদনান বের হবে। তাই সকালের নাস্তা দিয়ে এসেছে। টেবিলে ট্রে রেখে; জগে পানি নিয়ে আসে। এরপর আলমারি থেকে শার্ট বের করে বিছানার উপর রাখে।
আদনান ফ্রেশ হয়ে মুখ মুছতে- মুছতে ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে আসে৷ তুর্কি খুক-খুক করে কেশে আদনানের মনোযোগ আকর্ষণ করার চেষ্টা করে। মৃদু কণ্ঠে বলে—
– স্যার, কখন আসবেন?
আদনান হাত-মুখ মুছে তোয়ালে রেখে বলে—
– দেরি হবে। মিটিং আছে। কেনো কোথাও যাবে?
তুর্কি ভেজা তোয়ালে বারান্দায় মেলে দিয়ে এসে বলে—
– না কোথাও যাবো না। আসার সময় আমার জন্য কিছু নিয়ে আইসেন।
আদনান গায়ে শার্ট জড়াতে-জড়াতে বলে—
– কী আনবো? কী খাবে?
তুর্কি আনমনে কিছু ভেবে ছুটে আদনানের সামনে গিয়ে বলে—
-দিন। আমি লাগিয়ে দিচ্ছে।
ও শার্টের বোতাম থেকে আদনানের হাত সরিয়ে; নিজে লাগাতে থাকে। কিছুক্ষণ ভেবে বলে—
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
-উঁমম… একটা ভ্যানিলা আইস-ক্রিম নিয়ে আইসেন।
-কলেজে যাবে না কেনো?
-ভালো লাগে না। একদম অসহ্য। কে বলে কলেজ লাইফ বেস্ট? এর মত বোরিং আমার কাছে আর কিছুই নেই।
খুব অল্পতেই চলমান কথার ইতি টানে তুর্কি। শার্টের বোতাম লাগানো শেষ হলেই— আদনানের দিকে মুখ উঁচু করে তাকায়। বেহায়া কণ্ঠে বলে —
– স্যার, আমার কপালে একটা চুমু দিন।
আদনান মৃদু হেসে ওর ইচ্ছে পূরণ করে। ওর দুই গালে সন্তর্পণে হাত রেখে কপালে গাঢ় এক চুম্বন এঁকে দেয়। শান্ত কণ্ঠে বলে—
– আমার টা?
তুর্কি ভ্রু কুঁচকে বলে—
– আপনার ও লাগবে?
আদনান উপরে-নিচে মাথা নাড়ায়। তুর্কি পায়ের পাতা উঁচু করে, পায়ের আঙুলে ভর দিয়ে আদনানের কপালে চুম্বন করতে নেয়। তুর্কি পড়ে যেতে পারে বলে— আদনান ওর কোমড় জড়িয়ে ধরে। শান্ত কণ্ঠে বলে—
– আমি কিন্তু কপালে নিবো না। আমার এখানে চাই।
আদনান ওর ঠোঁটে ইশারা করে। তুর্কি দ্রুত আদনানকে ঠেলে ওর বাঁধন থেকে নিজেকে মুক্ত করে। চোখ রাঙিয়ে বলে—
– সরুন। একদম না।
তুর্কি দূরে যাওয়ার আগেই আদনান ওর হাত টেনে ধরে নিজের কাছে আসে। ফের ওর বাঁধনে ওকে বেঁধে বলে—
– কেনো-কেনো? এ কেমন অবিচার? আমি তোমার ইচ্ছে পূরণ করলাম আর আমার বেলায় লবডঙ্কা?
তুর্কি মুখ বাঁকিয়ে বলে—
-আপনার ইচ্ছে টা খুব বাজে। এখন এই সব না। চুপচাপ খেতে চলুন। পরোটা ঠান্ডা হয়ে গেলে ভালো লাগবে না৷
আদনান ডানে-বামে মাথা নাড়িয়ে বলে—
-জি না ম্যাডাম। আগে এই দিকে আসুন।
-মোটে ও না। আগে আপনি খেতে চলুন…।
এক প্রকার জোরজবরদস্তি করে নিজেকে বাঁধন মুক্ত করে তুর্কি। এই লোক দিন-দিন এত অসভ্য হয়ে যাচ্ছে বলার বাহিরে! ওর আদনানকে টেনে নিয়ে এসে চেয়ারে বসায়। প্লেটে গরুর গোশত আর পরোটা সাজিয়ে দেয়। আদনান খাওয়ার মাঝে-মাঝে তুর্কিকে ও খাইয়ে দেয়। টুকটাক সুখ-দুঃখের আলাপ করে দু’জন। খাওয়া শেষে তুর্কি ট্রে রেখে আসে। আদনান সম্পূর্ণ রেডি হয়ে কলেজে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হয়। যাওয়ার আগে তুর্কির কপালে ফের একটা গাঢ় চুম্বন এঁকে দেয়। আর বলে—
‘আমার টা বকেয়া রইলো। ফিরে এসে সুদে-আসলে হিসেব তুলবো!’
সকালের রান্নার শেষে— দুপুরের রান্নাবান্ন তোড়জোড় করছে হুমাইরা। রচনা মাছ কাটছে। রেজুয়ান রুমে নেই। তাই, উপমা নিচে নেমে আসে। ছেলেটা গতকাল কখন বাড়ি ফিরেছে ওর জানা নেই। ফজরের নামাজ আদায় করার জন্য উঠেছিলো— তখন দেখেছে রেজুয়ান মাঝে বেশ অনেক জায়গায় রেখে এক কোণে গুটিশুটি মেরে শুয়ে রয়েছে। নামাজ আদায় করে ভেবেছিলো জেগে থাকবে। কিন্তু, কখন যে ঘুমের কোলে ঢলে পড়েছিলো তা ওর জানা নেই। যখন ঘুম ভেঙেছে তখন পাশ ফিরে দেখে রেজুয়ান নেই। সাধারণত ফজরের পরে ঘুমানোর অভ্যেস নেই বলে একটু দেরি হয়ে গেছে ঘুম ভাঙতে।
ও ধীর পায়ে হেঁটে রান্নাঘরে যায়। সেখানে গিয়ে দেখে— হুমাইরা পিঁয়াজ কাটছে। এই দুই দিনে হুমাইরার সাথে ওর তেমন কথা হয়নি৷ আর যে কাজটা করেছে— এর পর ও যে হুমাইরা ওকে মেনে নিয়েছে; এই তো অনেক! ও এক-পা, এক-পা করে এগিয়ে হুমাইরার পাশে গিয়ে দাঁড়ায়। গলা পরিষ্কার করে বলে—
-আমি সাহায্য করি?
উপমার কণ্ঠে পেয়ে মাথা উঁচু করে তাকায় হুমাইরা। হুমাইরার চাউনিতে কিছুটা বিব্রতবোধ করে উপমা। তুর্কি বলেছিলো— হুমাইরার মত শাশুড়ী পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার! এমন মানুষ একটা ও হয় না। ওর নাকি মাঝে মাঝে মনে হয়—ওর মায়ের চেয়ে ও হুমাইরা বেশি ভালো।
হুমাইরা মৃদু হেসে বলে—
– সাহায্য লাগবে না। বসো এখানে।
হুমাইরার হাসিতে— উপমার আড়ষ্টতা এক নিমিষেই কেটে যায়। ও মোড়া টেনে হুমাইরার পাশে বসে। মরিচের ঝুড়ি নিয়ে বলে—
-মরিচ কেটে দেই?
হুমাইরা ওর হাত থেকে ঝুড়ি নিয়ে বলে—
– না না। হাত জ্বলবে। কিছুই করতে হবে না তোমার। আমি কী করছি সেটা দেখো।
উপমা কিছু বলে না। হুমাইরা পিঁয়াজ এক পাশে রেখে; মরিচ কাটতে বসে৷ মৃদু কণ্ঠে জানতে চায়—
– রান্নাবান্না সব পারো?
উপমা উপরে-নিচে মাথা নাড়িয়ে বলে—
– জি। আমার তো মা নেই। তাই বাসায় রান্না করতে হতো।
বলা বাহুল্য— উপমার সৎ-মা যেহেতু উপমাকে বেশি পছন্দ করতো না। তাই, ও তার চোখে নিজেকে নূন্যতম ভালো রাখতে বাড়ির সব কাজ একাই করতো।
উপমার মা নেই জেনে; হুমাইরার চলমান হাত যেনো থেমে গেলো। তিনি মায়াভরা দৃষ্টি নিয়ে তাকায় উপমার দিকে। উপমা, হুমাইরার দিকেই তাকিয়ে ছিলো। হুমাইরা, উপমাকে ফের প্রশ্ন করে—
– তোমার মা নেই?
উপমা ডানে-বামে মাথা নাড়িয়ে বলে—
-নাহ্। অনেক ছোট বেলায় মারা গেছে। বলা যায়— এক দম আমাকে পৃথিবীর আলো দেখিয়েই!
রান্নাঘরের দরজায় থেকে ভেসে আসে তুর্কির কণ্ঠ। ও চঞ্চল পায়ে হেঁটে এসে; মোড়া টেনে উপমার পাশে বসে। উপমার দিকে তাকিয়ে বলে—
– ডোন্ট অরি, আপু। এমন শাশুড়ী পেয়েছো— বুঝতেই পারবে না, এইটা শাশুড়ী নাকি নিজের মা। এত্ত…ভালো!
তুর্কি কথায় মৃদু হাসে উপমা। হুমাইরা ঠোঁটে আঁকা হাসি নিয়ে বসা থেকে ওঠে আলু আনতে যায়। তুর্কি, উপমার দিকে ঝুঁকে ফিসফিসিয়ে বলে—
– তা না হলে, আমি যে তিড়িং-বিড়িং করি— অন্য শাশুড়ী হলে ঘাড় ধরে এত দিন বের করে দিতো। নিহাত আমার শাশুড়ী বলে সব সহ্য করে৷
তুর্কির কথায় এবার একটু শব্দ করেই হাসে উপমা। হুমাইরা আলু নিয়ে আসলে তুর্কি আবার বলে—
– এই যে দেখো, এই বাড়িতে কেউ আলু পছন্দ করে না। কেউই না। শুধু মাত্র আমি আলু ছাড়া অন্য সবজি পছন্দ করি না বলে— আম্মু সব তরকারিতেই আলু দেয়। যে তরকারিতে আলু চলে না সেই তরকারিতে ও দেয়।
উপমা মৃদু হেসে বলে—
– আমার ও আলু ভীষণ পছন্দ।
মাছ ধুয়ে-কুটে এনে রচনা বলে—
-বাহ্! তাহলে তো ভালোই হলো— বউদের শুধু আলু খাইয়েই রাখবো। অন্য সব আনাজপাতি কিনে টাকা নষ্ট করা লাগবে না।
রচনার কথায় হেসে উঠে দুই বউ। হুমাইরা ও মৃদু হাসে। চার বউ-শাশুড়ী মিলে এই রকম হাসি-ঠাট্টা করতে-করতে রান্নার কাজ শেষ করতে থাকে। যদিও দুই বউকে কোনো কাজে হাত লাগাতে দেই নি শাশুড়ীরা। হুমাইরা সব সময় বলে— এ সংসার বউদের। যখন তাঁরা থাকবে না তখন তো ওদেরই বুঝে নিতে হবে সংসার। তখন সব কাজ করবে। এখন একটু ঘুরেফিরে কাটাক।
কথা বলার এক পর্যায়ে তুর্কির চোখ পড়ে উপমার দিকে। উপমা এমনিতেই অল্পভাষী। আর তুর্কি কথা না বলেই থাকতে পারে না। উপমা কী সুন্দর মাথায় ঘোমটা টেনে বসেছে। আর ও! কোনো রকম ওড়না গায়ে জড়িয়ে রেখেছে৷ ও উপমাকে দেখে ওড়না সুন্দর করে টেনে মাথায় টানে। যতই হোক ও তো বড়-বউ!
হুমাইরার উদ্দেশ্যে ডাকতে-ডাকতে এক বয়স্ক বৃদ্ধা ওদের বাড়িতে আসে। তুর্কি বৃদ্ধা টাকে দেখে উপমার কানে-কানে বলে—
-আপু, এই যে এই মহিলাটা দেখছো; এখন তোমার কাছে এসে বলবে—
(একটু নাটকীয় স্বরে তুর্কি বলে) এই যে নতুন বউ ভালা আছোনি? হুনো দিনকাল ভালা না। তাড়াতাড়ি কইরা পুলাহান লইয়া লইও। নইলে পড়ে মেলা সমস্যা দেহা দিবো৷ আমাগো বেলায় তো বিয়ার কয়দিন বাদেই পুলাহান পেটে আইয়া পড়ছে।
তুর্কির কথায় কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে পড়ে উপমা। ও আড়ষ্ট কণ্ঠে বলে—
-চুপ। কী সব বলছিস।
তুর্কি আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে জবাব দেয়—
– বিশ্বাস হলো না? ওকে। ওয়েট অ্যান্ড সি!
সত্যি-সত্যি বয়স্ক বৃদ্ধা এসে উপমাকে তুর্কির বলা কথা গুলো আওড়ায়। এতে উপমা অনেক বেশি অপ্রস্তুত হয়ে পড়ে। তুর্কি ঠোঁট টিপে হেসে উপমাকে ফের বলে—
– কি আপু, বিশ্বাস হলো তো আমার কথা?
আয়নার সামনে বসে চুল আঁচড়াচ্ছে তুর্কি। পরনে সবুজ রঙের থ্রি-পিস। ওড়না বিছানার উপরে রাখা। গুন-গুন করে গান গাইছে আর আদনানের কথা স্মরণ করছে। একটু আগে কল করেছিলো কিন্তু, আদনান ফোন তুলে নি। হয়তো ব্যস্ত।
একটু আগে তুর্কির সিটির রেজাল্ট প্রকাশিত হয়েছে৷ ও পাশ করে গেছে। কিন্তু, ভেবে পাচ্ছে না ও বায়োলজিতে সবার কম কীভাবে পেলো? ওর সব চেয়ে ভালো হয়েছিলো বায়োলজি। আর সব চেয়ে জঘন্য হয়েছিলো ফিজিক্স। অথচ সেই ফিজিক্স-ই সব চেয়ে হাইয়েস্ট মার্কস এসেছে! আর বায়োলজিতে মোড়ে-মোড়ে পাশ! ওর মতে ফিজিক্স সব চেয়ে জঘন্য তম সাবজেক্ট পৃথিবীতে। কিন্তু, যদি সেই সাবজেক্টের টিচার ওর জামাই হয়; তাহলে অন্য কথা।
এই রকম আরও আজে-বাজে কথা ভাবতে-ভাবতে ড্রেসিং টেবিলের উপর রাখা ফোন বেজে ওঠে। বোধহয় আদনান ফোন করেছে। ও দ্রুত চিরুনি ফেলে ফোন তুলে। আদনানের নাম্বার ভেসে উঠতেই মুখে ফোটে লম্বা হাসি। ফোন তুলেই হাস্যোজ্জ্বল কণ্ঠে লম্বা করে ডাকে—
– স্যার….!
-হুম, ম্যাডাম।
তুর্কি চেয়ার ছেড়ে ওঠে বিছানায় গিয়ে বসে। বালিশ টেনে শুয়ে বলে—
– ব্যস্ত?
-একটু ছিলাম। খাওয়া-দাওয়া করেছেন?
-হুম। আপনি?
– না। এখন খেতে যাবো।
-এখনো খান-নি? কী করছিলেন এতক্ষণ?
-কত দিন ছুটি কাটালাম? অনেক কিছু জমে গেছে।
-আচ্ছা ঠিক আছে। আগে খেয়ে নিন। তারপর কল দিন।
-প্রব্লেম নেই। বলো। রেজাল্ট দিয়েছে?
-হুম। আর আমি পাশ করে গেছি।
-পজিশন কত এসেছে?
পজিশনের কথা শুনে বিরক্ততে ছেঁয়ে যায় তুর্কির মুখশ্রী। পাশ করেছে এই তো অনেক। আবার পজিশন লাগবে কেনো? ও বিরক্ত কণ্ঠে বলে—
– স্যার, পাশ করেছি এইতো অনেক। আবার পজিশন লাগবে কেনো?
-কত?
-জানিনা। তবে, আপনার তুলনায় বেশি!
আদনান খাবার অর্ডার করে ভ্রু কুঁচকে বলে—
-মানে?
তুর্কি শোয়া থেকে ওঠে বসে বলে—
– এই যে, আপনি একজন কলেজের টিচার হওয়া সত্ত্বেও— আপনি শুধু ফিজিক্স পড়ান। শুধু ফিজিক্স খাতাই দেখেন।
আর আমি? একজন সাধারণ, অবলা স্টুডেন্ট হয়ে ফিজিক্স, কেমিস্ট্রি, বায়োলজি, ম্যাথ, বাংলা, প্র্যাকটিক্যাল সহ দুনিয়ায় সব পড়া একাই পড়ি! এক সাথে পরীক্ষা দেই। আর স্যাররা শুধু একটা সাবজেক্টেরই খাতা দেখে। তাহলে একজন টিচারের তুলনায়; একজন স্টুডেন্টের প্যারা বেশি না? কষ্ট বেশি না? তাহলে আমরা পাশ করি তাই তো অনেক। পজিশন দিয়ে কী করবো?
তুর্কির বক্তব্য শুনে লম্বা শ্বাস ফেলে আদনান। চোখ ছোট-ছোট করে বলে—
– তুমি এই সব আজগুবি কথা আবিষ্কার করো কই থেকে? আমি সব কিছু না পড়েই এত দূর এসেছি?
– কে জানে! বাদ দেন। পাশ করেছি এই অনেক। আপনি আসবেন কখন?
-দেরি হবে।
– অহ্! আচ্ছা শুনেন।
-হুম। শুনছি।
– আইস-ক্রিমের সাথে একটা বেলি ফুলের মালা ও নিয়ে আইসেন।
-আচ্ছা। আর কিছু?
-আপাতত নাহ্!
খাবার আসতে-আসতে আরও কিছুক্ষণ কথা বলে দু’জন। আদনান ফোন কেটে দিলে তুর্কি কিছুক্ষণ ওই ভাবেই কানে ফোন ধরে রাখে। ধীরে-ধীরে ফোন কান থেকে নামিয়ে বুকের সাথে চেপে ধরে। ঠোঁটে আঁকা হাসি নিয়ে চোখ বুজে আদনানের কথা স্মরণ করে। লোকটাকে এত ভালো লাগে কেনো কে জানে!
গোসল শেষে চুলে তোয়ালে প্যাঁচাতে-প্যাঁচাতে বাহিরে আসে উপমা। বিছানার দিকে চোখ পড়তেই দেখে— ক্লান্ত রেজুয়ান শান্ত হয়ে বসে রয়েছে। ফ্যান চলমান থাকা সত্ত্বেও কপালে বিন্দু-বিন্দু ঘামের ছিঁটে। মেঝের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে পা দোলাচ্ছে। ও উপমাকে খেয়াল করে নি।
উপমা ভেজা কাপড়ের বালতি নিয়ে ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে আসে। রেজুয়ানের উদ্দেশ্যে বলে—
– কই ছিলে তুমি?
উপমার কণ্ঠস্বর শুনে মাথা উঁচু করে তাকায় রেজুয়ান। সদ্য গোসল সেরে বেরিয়েছে উপমা। সতেজ দেখাচ্ছে ভীষণ। ও ক্ষণকাল তাকিয়ে থাকার পর চোখ ফিরিয়ে নেয়। শান্ত কণ্ঠে বলে—
-বাইরে।
উপমা এক ভ্রু উঁচু করে বলে—
-বাইরে মানে? রাতে কই ছিলে?
-ফ্রেণ্ডের বাসায়।
এই বলে বসা থেকে ওঠে দাঁড়ায়। বারান্দা থেকে তোয়ালে এনে গোসলের উদ্দেশ্যে আসে। উপমাকে উপেক্ষা করে ওয়াশরুমে ঢুকতে গেলে— উপমা বালতি রেখে ওর হাত টেনে ধরে৷ ওর মুখো মুখি হয়ে বলে—
– যা জিজ্ঞাসা করলাম তার উত্তর দেও। দুই রাত তুমি বাইরে ছিলে। কী এমন দরকার যা আমার কাছে বলা যায় না? আমি তোমার সহধর্মিণী। অবশ্যই আমার অধিকার আছে তোমার সম্পর্কে সব জানার।
রেজুয়ান দীর্ঘশ্বাস নিয়ে বলে—
– বলা যাবে না কেনো। আগে গোসল সেরে আসি? ভীষণ ক্লান্ত লাগছে।
উপমা, রেজুয়ানের ম্লান মুখের দিকে তাকিয়ে নিভে গেলো। হাত ছেড়ে কিছু না বলে বালতি নিয়ে ছাদের উদ্দেশ্যে হেঁটে চলে যায়। যতক্ষণ পর্যন্ত উপমা দৃষ্টির বাইরে না যাচ্ছে ততক্ষণ পর্যন্ত রেজুয়ান ঘাড় ঘুরিয়ে তাকিয়ে থাকে ওর দিকে।
মাগরিবের নামাজ আদায় করে জানালা বন্ধ করতে যায় তুর্কি। পরিবেশে এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা বিরাজমান। মাগরিবের এই সময় টা বাকি সময়ের তুলনায় যেনো একটু অন্য রকম। জানালা বন্ধ করে এসে পড়ার টেবিলে বসে। আদনান এখনো বাড়ি ফিরে নি। সেই চিন্তাই ওর মাথায় হানা দিচ্ছি বারবার। যতই মিটিং থাক এত দেরি তো কখনো করে না। ও অনেক বার কল করেছে কিন্তু ফোন তুলে নি। কল ব্যাক ও করেনি। মাগরিবের আজান পেরিয়ে গেছে। কখন আসবে কে জানে।
ও বাংলা বই বের করে ‘সোনার তরী’ কবিতায় চোখ বুলাতে থাকে। পড়ায় মন বসছে না। ও বিরক্তিতে বই বন্ধ করে ফেলে। টেবিলের উপর থেকে ফোন হাতে নিতেই— ফোন বেজে ওঠে। ওর বুকে কিঞ্চিৎ কাঁপুনি ধরে। বোধহয় আদনান ফোন করেছে। লোকটাকে আজ ইচ্ছা মত বকবে। এত বার কল দিচ্ছে না ধরুক; কেটে দেওয়া যায় তো। ওর তো চিন্তা হয়।
স্কিনে চোখ পড়তে সব উচ্ছ্বাস নিভে যায়! কারণ একটা আননোন নাম্বার। তুর্কির কপালে ভাঁজ পড়ে। ও মনে দ্বিধা নিয়ে ফোন তোলে। ওপাশ থেকে একটি মেয়েলী কণ্ঠস্বর ভেসে আসে—
– আসসালামু-আলাইকুম। এইটা কি মিঃ সারফারাজ আদনানের বাড়ির নাম্বার?
তুর্কি কপালে ভাঁজ আর গাঢ় করে জবাব দেয়—
– জি। উনার ওয়াইফ বলছি। আপনি কে বলছেন?
– আমি মানিকগঞ্জ সদর হাসপাতাল থেকে বলছি। মিঃ সারফারাজ আদনানের অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছে। আপনারা দ্রুত সম্ভব মানিকগঞ্জ সদরে চলে আসুন।
এই বলে মেয়েটি কল কেটে দেয়। কথাটি শুনে তুর্কির অন্তরাত্মা কেঁপে ওঠে! শরীরের লোম দাঁড়িয়ে যায়! সময় যেনো থমকে গেছে! ও কানে থেকে ফোন নামাতে ভুলে গেছে। ও কী শুনলো? ও কি ভুল শুনলো? মেয়েটা কী বললো? ওর হাত-পা, ঠোঁট অস্বাভাবিক ভাবে কাঁপতে থাকে৷ ও কম্পিত কণ্ঠে বলে—
– অ্যাক্সিডেন্টে… মানে কীসের অ্যাক্সিডেন্ট? উনি কোথায়? কেমন আছে এখন? হ্যালো…হ্যালো…!
তুর্কি কম্পিত কণ্ঠে এক নাগাড়ে বলে চলে কথা গুলো। ওপাশ থেকে আর কোনো উত্তর আসে না। ওর নিশ্বাসের গতিবিধি বাড়ছে। জোরে-জোরে শ্বাস ফেলছে। হাত থেকে ফোন আপনা-আপনি মেঝেতে পড়ে যায়। চোখ থেকে উত্তাপ জল গড়িয়ে নামে। স্মৃতির পাতায় ভেসে ওঠে আদনানের হাস্যোজ্বল মুখ। গম্ভীর মুখ। প্রেম মাখা সেই মুখ! ও বিরক্ত করলে সন্তর্পণে ওর নাকে টোকা দেওয়া।
এই তো সকালে ওর কাছে একটা চুম্বন আবদার করেছিলো মানুষটা! ও তো আবদার টা রাখে নি। এই নিয়ে কি লোকটা অভিমান করলো ওর সাথে? ও তো বলেছে বাড়ি ফিরলে ওর আবদার পূরণ করবে। তাহলে হাসপাতাল থেকে কল কেনো এসেছে? মেয়েটা ওই সব৷ বললো কেনো? ও আর ভাবতে পারছে না।
গতকাল রাতের একটা কথা ভেসে ওঠে স্মৃতির পাতায়—
‘এই মানবজীবন ভীষণ ক্ষণস্থায়ী, বেগম সাহেবা। এক সেকেন্ডের ও ভরসা নেই। সবাইকে পৃথিবীর মায়া একদিন ত্যাগ করতে হবে। তবে এই টুকু ওয়াদা তো করতেই পারি— যদি সৃষ্টিকর্তা চান তবে মৃতু ব্যতীত, তোমার আমার দূরত্ব অসম্ভব ম্যাডাম। চিন্তা মুক্ত থাকো।’
ও দুই হাত দিয়ে মাথা চেপে ধরে। সব বাজে কথা মানসপটে ভেসে ওঠে ভীষণ যন্ত্রণা দিচ্ছে! লোকটার কিছু হতে পারে না। ওকে কথা দিয়েছে— লোকটা ওকে রেখে কোথাও যাবে না। নবীন থেকে প্রবীণ! এখনো ওদের অনেক পথ চলা বাকি। সব বাজে কথাকে উপেক্ষা করে ও চেয়ার ছেড়ে ওঠে দাঁড়ায়। আদনানের কাছে যেতে হবে।
এখন এই সব ভাবার সময় না। বিপদের সময় বাজে কথা মাথায় বেশি আসে। ও বিছানার উপর থেকে কোনো রকমে ওড়না নিয়ে কাঁপা-কাঁপা পায়ে ছুট লাগায় বাইরে৷ মনে মনে সৃষ্টিকর্তাকে স্মরণ করতে থাকে—
– আল্লাহ্ তুমি উনার কিছু করো না। আল্লাহ্! আল্লাহ্!
নামাজ শেষে বাড়ি আসছে মুজাহিদ। বারান্দা পেরোনোর সময় খেয়াল করে তুর্কি ছুটে এই দিকে আসছে। ওকে এইভাবে ছুটতে দেখে মুজাহিদ কপালে ভাঁজ ফেলে দাঁড়িয়ে যায়৷ তুর্কি, মুজাহিদের সামনে এসে অশ্রুভেজা কণ্ঠে বলে—
– চাচ্চু…চাচ্চু… উনার…উনার অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছে। সদরে ভর্তি।
মুজাহিদ অবাক কণ্ঠে বলে—
-উনি মানে? আদনান?
তুর্কি উপরে- নিচে মাথা নাড়ায়। মুজাহিদের ধড়ে যেনো আর প্রাণ নেই! দুই ভাতিজা তাঁর কাছে কী এ আর নতুন জানার নয়। কাঁপা-কাঁপা কণ্ঠে উচ্চারণ করে— ‘বাচ্চা!’ সে তুর্কিকে ফেলে উলটো সিঁড়ির দিকে ছুটে৷ পাঞ্জাবির পকেটে হাত দিয়ে দেখে মানি-ব্যাগ নেই। সে ফের ঘরের দিকে ছুটে। মাথায় যেনো কাজ করছে না।
তুর্কির কান্নামাখা কণ্ঠ শুনে বেরিয়ে আসে হুমাইরা- রচনা। হুমাইরা আগে-আগে এসে তুর্কির সামনে গিয়ে বলে—
হৃদয়ের সঙ্গোপনে পর্ব ৪৪+৪৫
– মা… কী হয়েছে? এই ভাবে কাঁদছিস কেনো?
তুর্কি হুমাইরা কে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে। বুকে মাথা ঠেকিয়ে কম্পিত কণ্ঠে বলে—
– আম্মু…আম্মু…। তোমার ছেলের অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছে!
